দাঁত : সোমনাথ ঘোষাল

fail

গতরাতে আমিটা ফেটে যাওয়ার পর, মনে হয়েছিল চিকেনেই মাথা রেখে ঘুমাই। কেন যে এত রাতমারানিরা নেশার ভেতর বিরক্ত করে! এমনিতেই করোনার জন্য দশবার হাত ধুতে গিয়ে কিছুই হয় না… হ্যাঁ, কিছুই হয় না! বারবার হাতের গন্ধ শুঁকে দেখি। সুগন্ধি আছে কি না! তারপর এতটা রাস্তা এসে, ছোলা বাদাম কাঁচা হলুদ থানকুনি পাতা পাতি লেবু নিয়ে বন্ধুর বাড়ি। কাজে। বালের কাজ হবে। খানিকপর মদ খাব। গা ধুয়ে বসে। কুটুর কুটুর মেসেজ করব। তারপর চারটে গেলাস। এখন আদা গোল মরিচ দিয়ে রাম খাই। কিন্তু এই বিষয়টা না বললেও চলত। যেহেতু নেশার করার অজুহাত থাকে। তাই এই শুরুটাও একটা অজুহাত!
প্রথম পেগে কিছুই হয় না। রাজনৈতিক খবর দেখি। দেশ থেকে দ্বেষভক্তি। সাতশো ছিয়াশি হাতে ট্যাটু করা। তাই করাত দিয়ে হাত কাটা হয়েছে। লোকটি বিছানায় শুয়ে। সত্যি তাই! হ্যাঁ, ভগবানের ওদের নিয়ে খুব সমস্যা আছে। ওরা ভগবানের সন্তান নয়। আচ্ছা যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে চুম্বকের কথা ঠিক হবে? “এই গরুর মাংস বোলো না… আমাদের খুব মারবে। কেন রে বাঁড়া? এটা ইউপি নয়। তা হলেও খুন করতে কী আর লাগে? মেরে দেবে! শুয়োর খেলেও মেরে দেবে… হ্যাঁ দিতেই পারে! কিন্তু ছাগল খেলে? গরু বলে মেরে দেবে… কেন জানো না? ওটা তো ছাগলের মাংস ছিল। গরু বলে চালিয়েছে…” দাঁতের ফাঁকে গরুর ফাইবারটা আটকে গেছে। চিলি বিফ এর আগে কোনোদিন খাইনি। নেশা আসেনি। পাশের ঘরে আলো বন্ধ করলাম। না কি হজরতের নামে কীসব বলা হয়েছে! তাই এলাকার আলো বন্ধ করে সমস্ত বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তা বন্ধ। পোড়া টায়ারের গন্ধে কুকুরগুলো কাঁদছে। মানুষগুলো জানে না আসলে তাদের ধর্ম কী? দ্বিতীয় পেগ।
টম এন্ড জেরি এখনও খুব ভালো লাগে। বেড়ালের প্রতি আমার বেশ প্রেম। মনে হয় সবাইকে লাগানোর তাল করছে! খুব ন্যাকা। আদুরে। আর ইঁদুর সেতো খুব ছোট। চাবাগানের ধারে একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে পাওয়া যায়। মেয়েটার ধর্ম খুঁজতে ব্যস্ত। মিডিয়া। না মেয়েটা গাঁজা খেত না! রক্তমাখা। মরে গেছে। ইঁদুরে খেয়েছে। বলছে। না না, জেরি নয়! ইঁদুর। আঙুলগুলো নেই। একটা চোখ নেই। কিছু চা পাতা পড়ে আছে গায়ে। না এখনও ধর্ম খোঁজা যায়নি! রাষ্ট্র টম হলে কি পারত ইঁদুরটাকে মেরে ফেলতে…? চকমকিরা পাউডার খেয়েছে। এখন সাদা ভূতের মতন ফুটেজ খাচ্ছে! সেতো রাষ্ট্র জানে। সেই শুণ্ডির মানুষগুলো সবাই বোবা ছিল। বরফি ওদের বোবা করে রাখল। বরফিই তো রাষ্ট্র। মন্ত্র বলে বোবা আর বোতাতোতা বানিয়ে রাখে। আমরা শুনবো। আরে চাষি মরলে মরবে। আমরা চিপস বার্গার খাব। আরে, বাবু মান্দিররর হুবে নাহহহ…! আমরা শুনবো না দেখব না! রাজাবাবু আজ বাদে কাল যুদ্ধ হবে! বালের যুদ্ধ। চীনের মাল আমাদের মাল! এই ফুসসসসসস মন্তর ছাড়ল ফুল গাঁড়ে… সবাই সবার গাঁড় দিয়ে কথা বলি… ফোদী বরফি ভক্তলোচন বানিয়েছেন। আহা হাল্লা চলেছে যুদ্ধে… আহা হাল্লা হাল্লা হাল্লা… ধুর ল্যাওড়া বালের যুদ্ধ! সুশান্ত আর রিয়ার কেসটা কী বলত? মরে গেল! বালটা…
মদে বরফ দিয়ে খেতে ভালো লাগে না! ভয় করে। ঠাণ্ডা লেগে যায় যদি! আদাই খুব ভালো। উপকারি। কাঁটা চামচে টুকরো মাংস তুলে নেওয়ার সময় মনে হয় এই তো জীবন! পাশের বাড়িতে একজন আত্মহত্যা করেছে। শোন, আস্তে কথা বল। কিন্তু কেউ কাঁদছে না! আওয়াজ নেই! না কি মরেনি! সিরিয়াল চলছে? এই দেখ না! মরে যাবে কেন? ধুর বাল। মদ খা। পুলিশ এসেছে। কেন রে মালটা কোন পার্টি করত? এই বালটা খা না! তোর কী রে বাঁড়া? না না, কেন মরল? ধুর তুমি জানো, এই করোনার সময় কত মানুষ আত্মহত্যা করে? না। কত? কত? কত? বুঝতে পারছি না? বল কত? আমার এক কাকু গলায় দড়ি দিয়েছে। টেলিফোনে কাজ করত। না না… শোন না, কিন্তু ওই লোকটা কেন মরে গেল? এই একটু ছোলা দে। আচ্ছা আমারও কি মরে যাব? এখন? শোন একটু দে। নেশা হচ্ছে না!
বৌদি শোনো, আমার এই শরীর তোমার জন্য। তোমাকে বড্ড ভালোবাসি। তুমি কী নরম। উফফফফ… আমাকে একটু করতে দেবে? দাদা যখন থাকবে না! উফফফফফ তুমি কী দুষ্টু…। সেকি রে বালটা? পানু দেখছিস? এইসব পানু? কেন বাঁড়া সবসময় খুব ভালো হতে হবে? কী ভালো এইগুলো! খুব মিষ্টি বাল! এই তো মরে যাওয়ার কথা বললি! এখন পানু? তো লাগাবো না? দেখ ভাই। রাষ্ট্র মারাতে দিয়েছে। তাই মারাতে হবে। হ্যাঁ রে। তুই আরও মদ খা। এই নে।
বারান্দায় রাতের দিকে তাকিয়ে। আলগোছে ছায়াআলো। ছায়ায় কুকুরের ডাক। খাবারের খোঁজ করে। না, আজ আর বাড়ি ফেরা হবে না! আমার বাড়িটাও ঠিক আমার মতই। নিজের হতেই পারে না! চোখের সামনে এত এত বাড়ি। ঘুমিয়ে আছে। তার ভেতর মানুষ ঘুমিয়ে আছে। তার ভেতর আরও একটা ঠিক কে যেন? ঘর না মানুষ? শোন বেশি রাত করিস না! আড়াইটে বাজে। খেয়ে নে। ঘুমো। না রে আমি কল করব। শোয়ার আগে। না থাক আজ তুই পারবি না! খেয়ে নিস। টা টা।
আরে, ওঠো খাবে তো। ওঠো… এই বাঁড়া ওঠ। শোন এখন কি এডিট করবি? ধুর আমি খাব না! শোন সকালে শরীর খারাপ হবে। খেয়ে নে… এই নে চিকেন। রুটি। এই নে … ওঠ… খা…
সকালে ঘুম ভাঙতেই। মাথা খুব ভার। যন্ত্রণা। খুব খিদে পেয়েছে। তলানি বাসি মদ পড়ে আছে। সাদা দেওয়াল। মেঘলা দিন। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ধূসর হয়ে আছে। তিনজন যে যার মতন ঘুমোচ্ছে। প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল সবাই মরে গেছে। অথবা আমি মরে গেছি! গা গুলিয়ে উঠছে। খিদের চোটে। কেমন যেন হাসপাতাল হাসপাতাল। অনেক লোকজন ঘরের মধ্যে। কিন্তু কোনো শব্দ নেই। রান্না ঘরের সামনে গতরাতের খাবারের টুকরো। পচা গন্ধ আছে। সঙ্গে অনেকদিনের না ফেলা বাসি খাবার। পোকা ভনভন করছে। তীব্র গন্ধ। ভাবলাম শুয়ে পড়ি। এগারোটা বাজে। খেতে হবে। খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু খাবারের পচা গন্ধে আরও গা গুলিয়ে উঠছে। বেসিন থেকে থালা বাসন উপচে আছে। চর্বি ধোয়া তেলজল। কোনোরকমে ব্যাগ থেকে ব্রাশ বের করে দাঁত মাজার কথা ভাবি। পেটে মোচড় দিচ্ছে। খেতে হবে কিছু। কিন্তু কী খাব? সবাই ঘুমোচ্ছে। ভালো করে ব্রাশ ধুয়ে মাজন নিয়ে দাঁত মাজতে শুরু করি। আমার দাঁত মাজার সময় আয়না লাগে। নিজেকে দেখি। ছোটবেলায় ফেনা নিয়ে খেলতাম। হাঁ করে রাক্ষস হওয়ার চেষ্টা চালাতাম। অনেকটা মাজন নিয়েও ফেনা হচ্ছে না! হাঁ করলেই, দেখছি আমিটা দাঁতে আটকে আছে। হাঁ … হাঁ … হাঁ করে থাকতে থাকতে ব্রাশ ঘষতে থাকি। আমিটা তাও আটকে থাকে। মানে নেশা কাটেনি। ওটা আমি না! তাহলে কে? ওই লোকটা। যে আত্মহত্যা করলো রাতে? না কিন্তু ওটা তো আমি! এই ওঠ … এই ওঠ … খুব গা গুলোতে থাকে। সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে। কুলকুচি করেও আমিটা যায় না। বারবার জল দিয়ে দাঁত ধুতে থাকি। আঙুল দিয়ে ঘষি। তাও থেকে যায়। আমিটা।
মনে হয় এখনও রাতের নেশা কাটেনি। ডাইনিং টেবিল বসে খুঁটতে থাকি, দাঁতে লেগে থাকা গতরাতের মাংসের টুকরো। খুব খিদে পেয়েছে। নাহলে মরে যাব।

Facebook Comments

Leave a Reply