রাক্ষসের দাঁত মাজা ও অনিকেতের বিস্ময় : সুদীপ ঘোষাল

fail

অনিকেত কয়েকদিন ধরেই সকালবেলা উঠেই লক্ষ্য করছে তার দাঁত মাজার ব্রাশ ভিজে থাকে। কে যেন তার আগে দাঁত মেজে চলে গেছে কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। বাড়ির লোকদের জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারে না, কে যে তার ব্রাশ নিয়ে ব্যবহার করে, সে আজ পর্যন্ত ধরতে পারেনি। অগত্যা ভিজে ব্রাশে দাঁত মাজে সে। কিন্তু তার মনে মনে একটা জেদ জন্মায় কে এই ব্রাশ ব্যবহার করে তাকে ধরতেই হবে। তাইতো সে তালে তালে থাকে বিকেল, সন্ধ্যা এবং সকালে এসে যখন দাঁত মাজে তখন তার আগে তার লক্ষ্য স্থির রাখে ।
পাড়ায় মোড়ের মাথায় যখন বেড়াতে বেরিয়ে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে ছিল এই ব্যাপার নিয়ে বন্ধুরা ওকে বলেছে যে হ্যাঁ সকাল বেলা দাঁত মাজতে গিয়ে সত্যিই ভিজে ভিজে লাগে আর এক বন্ধু বলেছে রাক্ষস বলে সত্যিই আমাদের হিন্দুদের শাস্তি পাওয়া যায় এবং তাদের আমরা অসুরও বলে থাকি। অনিকেতের বন্ধু স্বদেশ বলে, রাক্ষস হল হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী একপ্রকার দানবীয় প্রাণী। রাক্ষসরা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ পুরাণে স্থান লাভ করে। রাক্ষসদের মানুষ ভক্ষণ করার কথাও বর্ণিত আছে। স্ত্রী রাক্ষসকে রাক্ষসী বলা হয় এবং মানুষের রূপ ধরা রাক্ষসীকে বলা হয় মনুষ্য-রাক্ষসী। কখনো কখনো অসুর এবং রাক্ষসবৃন্দ একই রূপে আখ্যায়িত হয়।ইন্দোনেশিয় এবং মালয় ভাষায় ‘ রাক্সাসা ‘র অর্থ “বিশালকায় দৈত্য”, “প্রকাণ্ড” বা “বৃহৎ এবং শক্তিশালী” বা “রাক্ষস”।বাংলা ভাষায় ‘ রাক্ষস ‘-এর অর্থ এমন ব্যক্তি যে কোনো লাজলজ্জা বা থামবার প্রয়োজন অনুভব না করেই খায়। তেমনি ভাবেই, ইন্দোনেশিয় এবং মালয় ভাষায় ” রাকুস “-এর অর্থ হয়েছে লোভী।
অনিকেত বলে, এখন কথা হল রাক্ষস বলে যদি কোন প্রাণী থাকে তারা যেমন সবসময় খেয়ে যায়, দিনের বেলা দুপুর বেলা, সন্ধ্যা বেলা মানে না, তেমনি তাদের নিশ্চয়ই কোনদিন নিজেদের গা পরিস্কার করা বা দাঁত পরিষ্কার করার প্রয়োজন অনুভব করে।স্বদেশবলেহিন্দুধর্মে ধর্মগ্রন্থ রামায়ণে বর্ণিত নিকষা ছিলেন একজন রাক্ষসী৷ তিনি রাবণের মা ছিলেন৷ গাত্রবর্ণ কষ্টিপাথরের মত হওয়ায় তিনি নিকষা নামে অধিক পরিচিত হলেও তার আসল নাম ছিলো কৈকসী বা কেশিনী৷ তাহলে বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকা আশ্চর্যের কিছু নয়।
স্বদেশ বলে, বাস্তবে আগেকার চেয়ে বড় বড় রাক্ষস এখনো পৃথিবীতে আছে তারা কেউ দাঙ্গাবাজ কেউ তোলাবাজ কেউ শিশু ধর্ষণকারী।
অনিকেত তো অনেক রাত অব্দি আজেবাজে রাক্ষস সম্বন্ধে ভেবে, জেগেছিল ভালমতো ঘুম হয়নি। সকালে উঠে শুনলো একটা খারাপ খবর। চারদিকে পুলিশের ভিড় অনিকেত পাশের বাড়ির খবর নিতে ছুটে গেল। ভিড় ঠেলে ছুটে গেলে অনেকেই। এগিয়ে যেতে লাগল অনিকেত। তারপর এগিয়ে গিয়ে শুনল পাশের বাড়ি কিশোরী মেয়েটি গতরাতে ধর্ষিতা হয়েছে। সে সন্ধ্যেবেলায় টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরছিল। রাস্তায় ওত পেতে বসে ছিল মানুষের রূপে এক বড় রাক্ষস। কিশোরী মেয়েটি চারজনের অত্যাচারে আজ মৃত চারিদিকে তাকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের ভিড় সভায় হা-হুতাশ করছে কিন্তু অপরাধীদের দেখা এখনো পায়নি পুলিশ।
অনিকেতের পাড়ার মেয়ে পিউ স্কুটি চালিয়ে বাজারে গেছিলো। বাবাকে বাজার করতে দেয় না। বাবা পুজো নিয়ে ব্যসত থাকেন। আজ পিউ এর পায়ে একটা পাথর লেগেছে। ব্যাথা হচ্ছে। ঢালাই এর পাথরগুলো রাক্ষসের মতো দাঁত বের করে আছে। নামেই ঢালাই। আর হবে না কেন। যারা রাক্ষসের স্বভাবে মানুষের জীবন দখল করে বসে আছে তারা রক্ত খাবে। তবে অনুমোদন দেবে তৈরি করার সামগ্রী কেনার । তারপর যে রাক্ষসের দল তৈরি করবে সে খাবে। তারপর তলানির দল । এতে আর কি হবে।ভিতরে ঢুকতেই পিউ এর বাবা বললো,কি হলো পায়ে। পিউ বললো,ও কিছু না,একটু লেগেছে। মা বললো,যা করবি একটু দেখে শুনে করবি।পিউ ব্যাগ রেখে তার প্রিয় বান্ধবী রূপাকে ফোন করলো। ছোটোবেলা থেকে ওর সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একবার ওরা সকলে রমার সঙ্গে রাক্ষস দেখেছিলো। সেই রাক্ষসদের মাতলামি মনে ছিলো ওদের। সেদিন ওরা বেঁচে গেছিলো একসঙ্গে দলমিলে থাকার ফলে। কিন্তু আমাদের মানুষরূপী রাক্ষসের দল একটা মেয়েকে একা দেখলেই ছুঁক ছুঁক করে। কিশোর থেকে বুড়ো ভগামের রাক্ষসের দল। তাদের বয়স নেই, দেশ নেই, নেই কোন সম্পর্কের অভিধান। তারা শুধু যোনী চেনে যোনী। মেয়ে হলেই হল। শিশু থেকে শুরু করে আশ্রমের বৃদ্ধাকেও এই রাক্ষসগুলো বাদ দেয় না চিবিয়ে খেতে। হায় রে মানুষ সমাজ।
অনিকেতের মনটা খারাপ ছিল সারাদিন। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল বেরোতে বেরোতে নদীর ধার দিয়ে গেল। সেখানে নদীর ধারে দেখল কয়েকজন লোক জটলা করছে। তাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনল গতরাতে যে মেয়েটাকে ধরে ছিলাম সেই মেয়েটির বয়স অল্প ছিল। সে কি মরে গেছে।
আর একজন বলছে নিশ্চয়ই মরে গেছে সে হয়তো বাঁচবে না। তবে আজকে আমরা রাতে আমরা ঠিক ওখানেই থাকবো।
অনিকেত সোজা থানায় গিয়ে খবরটা পুলিশকে জানালো এবং জায়গার নাম টাও বলে দিল। সে যে ঠিক শুনেছে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাস করল,তুমি কেন গেছ ওদিকে?
— আমি সকালে হাঁটতে গিয়ে ওদের কথা শুনেছি।
— ঠিক আছে, আমরা আজকে দেখছি। প্রয়োজনে তোমাকে ডেকে পাঠাবো।

অনিকেত মনে সাহস দেখে বলল ঠিক আছে স্যার প্রয়োজনে আমাকে ডাকবেন আমি আছি আমি ওদের ভয় করিনা।
তারপর অনিকেত হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পথে পা বাড়ালো। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে, পাশের বাড়ির কিশোরী মেয়েটি নাম ছিল রমা। সে আইপিএস অফিসার হবে বলতো। জিজ্ঞেস করলেই বলতো, আমি আইপিএস অফিসার হব। সবেমাত্র মাধ্যমিকের স্টার মার্কস পেয়ে এ এবার মাধ্যমিক পাশ করে ইলেভেনে ভর্তি হয়েছিল। আর তার মধ্যেই এই দুর্ঘটনা টিউশানি পড়তে যাওয়ার পথে। সকালে ম্যাডামের সময় হয় না তাই রাতে পড়ত রমা ম্যাডামের কাছে।বাড়ির পাশে একটা জঙ্গল। তার পরেই ম্যাডামের বাড়ি। গ্রামের মেয়ে সে। প্রতিদিন যাওয়া আসা করে কিন্তু একদিন সে রাক্ষসদের রাজত্বে পা দিল অজান্তেই।
রমার ইচ্ছে ছিলো নদী হবে। কুলু কুলু বয়ে যাবে নিরন্তর। পাড় উপচে আসবে ভাসানো ঢেউ। মনে রোমাঞ্চ জাগাবে। কিন্তু কিছু লোকের বদখেয়ালে আর অর্থের লালসায় সব ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। মিতা তার বাল্যবন্ধু। সে বলে, চাপা ইতিহাস ফুঁড়ে বেরোয় বটগাছের রূপ নিয়ে। একদিন রোদ ছিলো, সবুজ গাছ ছিলো। কিছু কাঁটাঝোপ থাকা স্বাভাবিক। সেই বাধা পেরিয়ে অনেকটা পথ একা হেঁটেছে রমা। সঙ্গে ছিলো অদম্য ইচ্ছে। আজ কিশোরী রমা অসফল কিছু রাক্ষসের জন্য। ইতিহাস কথা বলে মৃদুস্বরে।
অনিকেত যথারীতি বাড়িতে এসে খেয়েদেয়ে দুপুরে ঘুমিয়েছে। কাউকে কোনো কথা বলেনি। সে শুধু মনে মনে তার কথাটা গোপন রেখেছে এবং সে মনেপ্রাণে চেয়েছে জানো সেই চারজন অপরাধী ধরা পড়ে। অনিকেত ভাবে পাশের বাড়ির মিনা আমার বোনের মতো ছিল। তাকে আমি ছোট থেকে বড় হতে দেখলাম। আর চোখের সামনেই তার মৃতদেহ দেখে আমার একদম ভালো লাগছে না। আমার মন খারাপ হয়ে গেছে। তাই আমি মনেপ্রাণে চাই হে মধুসূদন ওই চারজন বদমাশ যেন ধরা পড়ে।
অনিকেতের প্রার্থনা বিফলে যায়নি পরের দিন সকালে দেখল চারজন অপরাধীকে কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। তার আগে এই চোর চোর গুন্ডা বদমাশ দের সনাক্ত করার জন্য তাকে ডাকা হল। পুলিশ অফিসার বললেন, দেখতো নদীর ধারে বসেছিল সেই চারজনে কিনা?
অনিকেত বলল, হ্যাঁ এই সেই গুন্ডা বদমাইশদের দল যাদের কাছে আমি খারাপ কথা শুনেছিলাম, যেটা উচ্চারণ করতে আমার লজ্জা লাগছে।পুলিশ গুন্ডা রাক্ষসগুলোকে বেধড়ক পেটাতে পেটাতে থানায় নিয়ে গেল।
অনিকেত নিশ্চিন্তে দুপুরে একটা শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হল। সে দিবাস্বপ্নে দেখল, এখনও কত রাক্ষস দাঁত বের করে রক্তমুখে নেচে চলেছে। একটা মরছে তো আর একটা রক্তবীজ জন্ম নিচ্ছে রাবণ রাতে। এর কি কোন শেষ নেই? তারপর অনিকেত হঠাৎ অনুভব করল তার ব্রাশটি ভিজে সপ সপ করছে । রাক্ষসরা আকাশে উড়তে পারে। সীতা দেবিকে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গেছিল রাক্ষস রাবণ। এখনও কত সীতা রাবণের আক্রোশে জীবন যৌবন হারিয়ে ফেলছে তার ইয়ত্তা নেই। আকাশে রাক্ষসগুলে ভেসে বেড়ায়। তাই হয়তো অনিকেতের পাড়ার সকলের ব্রাশগুলো নিয়ে তারা ব্যবহার করে এবং তাতেই ভিজে থাকে ব্রাশ গুলো। সে স্বপ্নে দেখল মানুষের মাঝে রাক্ষসগুলে ভিড়ে মিশে রয়েছে।তাদের বিষাক্ত থুতুতে যেন ভিজে যাচ্ছে সকাল, সন্ধা, রাতে তাদের পাড়ার লোকের সব দাঁত মাজার ব্রাশগুলো।স্বপ্নেও সে বিস্মিত আর দুঃখিত হলো ব্রাশ ভিজে থাকার কারণ জেনে।

Facebook Comments

Leave a Reply