গেদু মন্ডলের উদাস রোগ : শুভ্র মৈত্র

fail

মেয়েমানুষ দেখলে গেদু’র কাপড়েই চোখ আটকায় প্রথমে। এদিনও কোনও ব্যতিক্রম ছিল না। ওই ঘোলাটে আলোয় নজরে পড়েছিল ফ্যাকাশে রঙের কাপড়টা,সবুজ নাকি কমলা! যাই হোক এখন সাদার ভাগই বেশি। নইলে চোখে পড়ে কী করে? হ্যাঁ, শাড়িঢাকা একটা মেয়েমানুষ ঐ ভাঙ্গা টিন আর শ্যাওলা মাখা ইটের উপর শুয়ে ছিল। শুয়ে থাকার মধ্যে একটা আরাম আছে, সেখানে তা ছিল না। গেদু এর বেশি কিছু দেখতে পায়নি, পর্যাপ্ত আলো, মানে আজকের ভাষায় ‘হাই মাস্ট ল্যাম্প’ থাকলে হয়তো দেখতে পেত, কাপড়ের অনেকটা অংশই ছেঁড়া। অনেক দাগও ছিল তাতে। সেই মুহূর্তে ও জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল, এভাবে শুয়ে আছে কেন, পিঠে খোঁচা লাগছে…ইত্যাদি। কিন্তু তার আগেই স্পষ্ট স্বরে গোঙানির শব্দ এসে বুঝিয়ে দিল যে আওয়াজটা শুনে এসেছিল তার উৎস কোনও চারপেয়ে নয়।
দাঁড়িয়ে পড়েছিল গেদু। নিজের স্বভাব বিরোধী হয়েই দাঁড়িয়েছিল। পৃথিবীর কোনও আশ্চর্য তালিকা গ্রন্থে এর স্থান হয় নি। গেদু’কে যারা চেনেন বা নিছকই জানেন গেদু আছে এই মহল্লায়, তারা কেউ গবেষণা করেছিলেন কিনা জানা যায় নি, কিন্তু করলেও যে কোনও দুর্বোধ্য কারণই এ গবেষণা পত্রের উপসংহারে লেখা হতো তা সকলের জানা। কারণ গেদু খুঁজে দেখতে চেয়েছিল শব্দের উৎস। নিতাই স্যাঁকরার দোকানের সাইনবোর্ডে ঝুলতে থাকা হাসি মুখের গয়না পড়া মেয়েটা দেখেছিল গেদু দোকানের পেছনে গিয়েছিল, অন্ধকার মাখা পেছনটায়। যেদিকে লোকে হিসি চাপলে যায়। সেই সন্ধ্যায় গেদু’র হিসি চাপে নি, বা চাপলেও তার বেগ এত ছিল না যে বাড়ির দরজা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায় না। তবু গেদু গিয়েছিল ওই নোনা ধরা দেওয়াল টার পিছনে। যেখানে রাস্তার আলো পৌঁছানোর আগেই হাঁফ ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে, সেখানে উঁকি মেরেছিল গেদু। এবং দেখেছিল একটা আস্ত মেয়েমানুষ।
মেয়েমানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা গেদু’র স্বভাবে ছিল না। শেফালি’র যে চুলে পাক ধরেছে, অথবা মাঝে মধ্যে হাঁটুতে টান লেগেছে, একথাই বা গেদু জানলো কবে? সে না হয়, নিজের বউ, আলাদা করে তাকানোর নিয়ম নেই, অন্য মেয়েছেলের দিকেও কী আর তাকিয়েছে? নাহ। তবু, সেদিন যখন সন্ধ্যা সবে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে হাইরোডের পাশে আগাছার মতো গজিয়ে ওঠা ঝাঁপগুলির গায়ে, সেদিন কি জানি কেন সব ঝাঁপ বন্ধ ছিল, গেদু দাঁড়িয়ে পড়েছিল মেয়েমানুষটাকে দেখে।

প্রথম যেদিন তার উদাস রোগ দেখা দিয়েছিল, সেদিনও এমন দাঁড়িয়ে পড়েছিল ও। তখনও আমাদের গেদু মন্ডল তিন মেয়ের বাপ হয়নি। মানে তখনও গেদু’র সেই বয়স হয়নি বলেই ভাবতো ওর বাপ দাদারা। দাদার বাচ্চাকে কোলে নিয়েই মকশো করত গেদু। সে যুগে বৌদিরা ম্যাটিনি শো ‘বই’ দেখতে যেত, মিষ্টি পানও খেত হলে ঢোকার সময়। তা সেসব জোগাড়ের দায়িত্ব যে গেদু’র উপরেই পড়বে, তা আর বলার কী আছে! ঠাকুমার হাঁটুতে ব্যথাও হতো, মালিশের তেলও আনতে হতো।

গেদু’র যে একটা রীতিমতো সরকারি নাম ছিল — গদাধর, গদাধর মন্ডল, সে কথা জানতো না প্রায় কেউই। আসলে জানার প্রয়োজনও হয় নি। গেদুতেই দিব্ব্যি কাজ চলছিল।

তখনও আচাজ্জি গিন্নী অনায়াসে গেদুর হাতে ধরিয়ে দিতে পারতো বাজারের ব্যাগ। খুব আলগা হাতেই দিত। দশ টাকা, হ্যাঁ ঠিক দশ টাকাই দিত ব্যাগের সঙ্গে। বাড়তি একটা পয়সাও দিতে হয়নি আচাজ্জি গিন্নীকে। বাপের মনোহারী দোকানে যাওয়ার অনুমতি যেদিন পেল গেদু, সেদিনও কোনও শঙ্খধ্বনি হয় নি, রাজকুমারদের অভিষেকে যেমন হতো বলে শোনা যায়। আসলে গেদু তো দোকানে গিয়েও ক্যাশবাক্সে বসার অনুমতি পায় নি। ওই চাল-ডাল-তেল-নুন ওজন করে মেপে দেওয়া, খুব বেশি হলে সাবান শ্যাম্পু আর মুখে মাখার ক্রীম হাতে হাতে এগিয়ে দেওয়া—এই ছিল ওর কাজ। না, সেই কাজের ফাঁকে কোনও অষ্টাদশীর আঙ্গুলে আঙুল ছুঁয়ে যায় নি গেদু’র। দোকানের কর্মচারী হারান’দা যে ওকে নিজের লোক ভাবতো, তাতেও কোনোদিন গেদু’র আঁতে লেগেছে বলে শোনে নি কেউ।

সত্যি বলতে কী, এতো কথা গেদু’র সম্পর্কে বলতে হত না। আসলে সেই সময়টা নিয়েই বলা। যে সময়টা ভোট আসতো পাঁচ বছর পর। এসেও উঠোন দিয়েই চলে যেত, ঘরের দাওয়ায় উঠতো না। মেলাও বছরে একবারই আসতো, নতুন ধান উঠলে। ছেলে ছোকরারা তখনও পাড়ার বালক সঙ্ঘের ফুটবল ম্যাচ আর সুচিত্রা সেন-সুপ্রিয়াকে সবে হঠিয়ে আসা মাধবী-তনুজাদের এর বাঁকানো ভুরুর মধ্যে আটকে ছিল। তা সেসময়েই যখন গেদুরও যৌবন এর প্রথম পাঠ তখন সেও যে সাইকেল চালানো কোনও মেয়ের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকবে, সে আর আশ্চর্যের কী! হ্যাঁ, ওই দোকান যাওয়ার পথেই ওর সামনে চক্কোত্তি বাড়ির ছোট মেয়ে বুড়ি, বুড়িই ছিল বোধহয় নামটা, হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল সাইকেল নিয়ে। সেদিন গেদু চমকে গেছিল বৈকি। আর সে সাইকেলও তো আজকের ইস্কুলে পাওয়া ফিনফিনে নীল সাইকেল নয়, রীতিমতো গ্রাম্ভারি সবুজ রঙের র‍্যালে সাইকেল। ময়লা সাদা ফ্রক পড়া ঝাঁকড়া চুলের সেই মেয়ে নিজেই উঠে দাঁড়ায়। অন্তত দাঁড়ানো অবস্থাতেই দেখা গেছিল। গেদু যে নিজের সাইকেল থেকে নেমে ওকে সাহায্য করবে, তেমন শিভালরি’র কোনও লক্ষণ দেখা যায় নি। ইতিহাসে লেখা আছে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে গেদু তখনও দাঁড়িয়েছিল। লেখা নেই দাঁড়িয়েছিল হাঁ করে, ভেবলে গিয়ে। আর একটা কথাও কেউ কোনোদিন জানতে পারে নি, মেয়েটির ঠোঁটের উপর একটা অত্যাশ্চর্য তিল।
আজকেও গেদু দাঁড়িয়ে আছে। ওই শুয়ে থাকা মেয়েমানুষটাকে দেখে। মাথার ভিতর চিন্তা কিছু এসেছিল কিনা জানা যায় নি। আসলে হয়তো এটাই ভাবতো, কোথা থেকে এলো, কোন ঘরের মেয়ে। এভাবে শুয়েই বা আছে কেন। যেহেতু, কোন চিন্তা মাথায় এসেছিল তা জানা যায় না, তাই এগিয়ে যাওয়াটাই লিপিবদ্ধ হয়েছে। আরও কাছে। ‘তুমি কে গা?’—মানে, এসব ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন যেটা হয়, সেটাই বলতে চেয়েছিল গেদু। কিন্তু তার আগেই থেমে গেল যেন। নজরে পড়েছিল অন্য কিছু।
তা বলছিলাম, প্রথমবার এমন দাঁড়িয়ে থাকার কথা। মানে ওই র‍্যালে সাইকেলের কিশোরীকে দেখে দাঁড়িয়ে যাবার কথা। সে অবস্থায় গেদু কতক্ষন ছিল, মানে আজকের ভাষায় ফ্রিজ শট হয়ে, তা জানা যায় না। তবে হারাধন পণ্ডিত কে যে ওইসময়েই ওই রাস্তা পার হতে হবে, এমনটা বোধহয় লিখনে ছিল। তেমন বললে ওই আধাগঞ্জে রাস্তাই বা কয়টি? হারাধন পণ্ডিত না এসে সুবল কামারও আসতে পারতো সে পথ দিয়ে। কিন্তু ওই হারাধনই এলো। এবং দেখে ফেলল গেদুর হাঁ-করা দশা। যজমানির কাজে তাকে যেতে হয় এদিক সেদিক। সঙ্গে গ্রহ নক্ষত্রের চলাফেরার হিসাবও রাখতে হয়। সেই চোখেই নাকি ধরা পড়েছিল গেদু’র এমন অবস্থা। আর গেদু’র বাপ-দাদাদের কাছেও সেই অসুখের কথা বোধকরি ধরা পরে হারাধনের ভাষ্যে।

বাপ-দাদারা খুব উতলা হয়ে অবশ্য ওঠেনি। ওই যে বলছিলাম, সেই সময়টার কথা! তখন মায়েরা চার-পাঁচটি না বিইয়ে শ্বাস নিতেন না। সে সংসারে কারও জন্যই এমন উতলা হওয়ার চল আসেনি। তবু নাকি গেদুকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কি হয়েছে। নিজেকে উত্তমকুমার আর না জানি কাকে সুচিত্রার আসনে বসিয়েছিল গেদু—এমন ভাবনাটা কারও মনে ঘাই মেরেছিল বলে শোনা যায় নি।গেদুও মাটিতে সম্পূর্ণ মিশে যাবার আগে শুধু বলতে পেরেচ্ছিল, ‘উদাস লাগে’। তাই পন্ডিত মশায়ের কথা শুনে গেদুর বাপ যখন নিদান দিলেন মেয়ে দেখার জন্য, সবাই ভেবেছিল এমন অব্যর্থ ওষুধ আর হয় না। গেদু অবশ্য তখনও উদাস।
এমন ভেবলে যাওয়া গেদুকেই দেখা গেছিল তার বিয়ের আসরে। নাহ, সেই র‍্যালে সাইকেলের ঝাঁকড়া চুল মেয়ে ঘোমটা টেনে দাঁড়ায় নি গেদুর সামনে। ওর তেমন অভিলাষের কথাও কেউ জানে নি। এমনকি বিয়ের আসরে হাজির মেয়েদের দলেও তাকে দেখা যায় নি। তেমন হলে অবশ্য গল্পের খাঁড়ি অন্য দিকে বইত। আসলে গেদু যে বিবাহযোগ্য হয়েছে তা বুঝেছিল বাপ-দাদারাই। তাদের কোনও একান্ত সাক্ষাৎকার খবরের কাগজে চারের পাতায় প্রকাশিত হয় নি। তাই কেউ জানতেও পারে নি গেদু’র কোন লক্ষ্মণটায় স্পষ্ট হয়েছিল এবার গেদুর বিয়ে দেওয়া আবশ্যক। হয়তো সেই উদাস রোগের কথাই বলতো তারা। অবশ্য ইতোমধ্যেই বাপ দাদা’র দোকানে দু’চারবার ক্যাশবাক্স সামলেছে গেদু।

বলছিলাম সেই সময়টার কথা। সে সময়ে বাপ-কাকা’রা বা খুব বেশি হলে হারাধন পন্ডিতরাই বিয়ের লক্ষ্মণ বোঝার দায়িত্বে থাকতেন। বউয়ের নাম হতো সন্ধ্যা বা মাধবী। ঈশিকা বা মধুছন্দা-রা তখনও নামে নি এই বঙ্গ ধামে। এমন থ্যাবড়া নাকের চাপা রঙের শেফালি নামের মেয়েটি যে সন্ধ্যায় গেদু’র গলায় মালা দিল, উলুধ্বনি পড়েছিল নিয়মমতো, আর সে শব্দে চাপা পরেছিল মেয়ে পার করার দীর্ঘশ্বাস। বসাকবাড়ির ছোট নাতিটা সে রাতে নেমন্তন্নের আসরে আমড়ার টক খানিক বেশীই চেখেছিল বলে অনুমান, পেট ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠেছিল মাঝ রাতে। তাও কেউ গেদু’র ফুলশয্যার ঘরে উঁকি মেরেছিল বলে জানা যায় নি। শুধু গেদুর অসুখ সেরে গেছিল, সবাই তাই বলে। চাপা রঙের নতুন বৌয়ের ঠোঁটে কোনও তিল ছিল না। হাই তোলা গেদু’কে সকালে দাদা কেবল বলেছিল, ‘থাক আজ আর দোকানে গিয়ে কাম নাই’। সে ঘোষণাতে কোনও নাটক ছিল না। রোমাঞ্চও না।

প্রথম মেয়ে জন্ম নেওয়ার দিনকয়েক পরে যেদিন গেদু বাবাকে বলেছিল, ‘ভেবেছি নিজেই দোকান দিব একখান’, সেদিন নাকি সত্যনারায়নের প্রসাদ মুখে দিয়ে হিক্কা খেয়েছিল ওর বাপ। মাথায় বাড়ি মারতে হয়েছিল ‘ষাট ষাট’ বলে। সন্দেহের তীর স্বাভাবিকভাবেই ছুটেছিল বউয়ের, মানে সদ্য নতুন মায়ের দিকে। কারণ সদ্যজাত’র তখনও এমন পরামর্শ দানের ক্ষমতা হয় নি। তবে সন্দেহের গতি অনেক শ্লথ ছিল। সে সময় সিবিআই বা ইডি’র কথা জানত না কেউ। আলোচনাও হয় নি। টিভিই নেই, তার মুরুব্বীরা আসবে কোত্থেকে? শুধু চক্কোত্তি মশাই মণ্ডল দাওয়ায় বসে বলেছিল, ‘জোলাপ কোষ্ঠকাঠিন্যের অব্যর্থ ঔষধ’। কেউ আপত্তি করেছিল বলে জানা যায় নি।

অথচ, আজ এই মুহূর্তে মেয়েমানুষকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই যত বিপত্তি। হাউমাউ করে কান্না জুড়ে সে শুধু একবার গেদু’র কানে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, ওর না জানা কিছু শব্দ। এরপরে গেদু’র আবার উদাস হওয়াটাই বোধহয় স্বাভাবিক ছিল।

হাঁড়ি পাতিলের গোনা গুনতি করে নিয়ে সত্যিই যেদিন গেদু’র বউ আলাদা ভাত চাপালো, সেদিন সকালে খাওয়ার পাতে নিম বেগুন পাওয়া যায় নি। দোকানে যেতেও খানিক দেরী হল। এ ছাড়া গেদু’র জীবনে কোনও বিপর্যয় নেমে আসে নি। ভাঙনের কোনও চিহ্ন চোখে মুখে দেখতে পায় নি কেউ। সাঁঝের বেলা, মানে রেডিও’র খবর শুরুর আগেই, দোকান বন্ধ করে, তালাগুলি বেশ কয়েকবার টেনেটুনে, শেষমেশ কাগজে আগুন লাগিয়ে তিনবার গোল করে ঘুরিয়ে কিছু না বলেই বাড়ি ফিরেছিল। বউয়ের চোখ কোনদিনই তেমন সূক্ষ্ম নয়, নইলে ধরা পড়তো, সেই রাতেও গেদুকে উদাস রোগে ধরেছিল। আর ধরতে পারেনি বলেই ওষুধের কথা ভাবে নি কেউ। কিন্তু এ তো আর এমন অসুখ নয় যে ওষুধ ছাড়া সারবে না। তাই, বোধকরি সেরেও উঠেছিল গেদু দিনকয়েকের সংসার যাপনের পর।

দ্বিতীয়বার যখন বউ মেয়ে বিয়োল, অনেকেই গেদু’কে শলা দিল, ‘বার বার তিনবার’। তা সে শলা মেনেই হোক, বা অন্য কারণে, গেদু চেষ্টা করেছে বটে, মানে শুধু গেদু নয়, ওর বউও সামিল ছিল সে চেষ্টায়। তবে সব চেষ্টায় কী আর সুফল মেলে? এবারেও আঁতুড় ঘরের কান্না শুনে ভিতরে গিয়ে গেদু দেখে, সেই মেয়ে। মুহ্যমান গেদু আরেকবার নিজের কপালকেই দুষলো। ঠাকুরের কাছে মানত করা পূজা আর চড়াতে হয় নি, এই যা সান্ত্বনা।

হাঁড়ি পৃথক হলেও বাচ্চার কোল পিঠের অভাব হতো না সেই সময়। আমাশা, বিষফোঁড়া, পাঁচরা, সর্দিতে ঢ্যাবঢ্যাবে নাক নিয়ে বড় হয়ে যেত সবাই নিয়ম করে। সে সময়ে নাকি এমনই চল ছিল। তাই গেদু বা তার বউয়েরও তেমন বিপদ হয়নি তিন মেয়েকে নিয়ে। পড়শী আর আত্মীয়স্বজনের কোলে কাঁখেই ধ্যারধেরিয়ে বাড়ছিল তিন মেয়ে। শুধু এই সময়েই গেদু’র আরেকবার উদাস রোগ ধরা পড়েছিল যেদিন বড় মেয়ে পুঁটি গেদুর লজঝরে সাইকেলটা হাফ প্যাডেলে চালিয়ে মেজটাকে ইস্কুল দিয়ে এসেছিল। ও কবে সাইকেল চালানো শিখল, সে কথা জিজ্ঞ্যেস করে নি গেদু, শুধু রোগে ধরল ওকে।এই নিয়ে তৃতীয়বার। পড়শীদের হিসেবে দ্বিতীয়বার। তাদের স্মৃতিতে আছে, এই রোগ শেষবার দেখা গেছিল গেদু’র বিয়ের প্রাক্কালে। কারণ মাঝের বিচ্যুতিটা অনেকের চোখে পড়ে নি।

অবশ্য এবারে রোগের লক্ষ্মণ বড় তীব্র। চোখে না পরে যায় না। সে সকালেই নাকি খাওয়ার পাতে ভাত ভাঙ্গতে গিয়ে ইষ্ট নাম নিতে ভুলে গেছিল গেদু। বউ দেখেছে। তবু হয়তো মেনে নিত সবাই নিছক খেয়াল বলে। কিন্তু গোল বাঁধল সেই বিকেলে দোকানদারির সময়ে। পঞ্চাশ গ্রাম জিরা নিতে আসা মুখুজ্জ্যেদের কাজের মেয়েটিকে গেদু হঠাৎ করেই বলে বসে, ‘সাইকেলের টাল সারাতে পারিস?’ সে মেয়ে খানিক ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে জিরার পুঁটলি কোঁচরে করে দে ছুট। দোকানে কাজ করা মানিক সেই ক্ষনে গেদু’কে সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘দাদাবাবু, শরিলটা কী জুতের ঠেকছে না? ঝাঁপ বন্ধ করি?’

ভেবলে গিয়ে খানিক তাকিয়ে থেকে গেদু আবার পয়সা গুনতে থাকে। কিন্তু ওই অনুচ্ছেদেই এ পর্ব শেষ হওয়ার কোনও লক্ষ্মণ দেখা গেল না। এমনিতে কোনোদিন কারও সাত এবং পাঁচে থাকে না গেদু, আট নয়েও নয়। থাকার জন্য কেউ তাকে কোনোদিন জোরও করে নি। যোগ্যতা আছে বলেই ভাবে নি কেউ। সেই গেদু কিনা বসাকবাড়ির প্রায় মুচ্ছো যাওয়া দোলনচাঁপা গাছটার গোড়ায় খুরপি নিয়ে বসে গেল ওটার হাল ফেরাতে! বউ শুধোতে গেলে বলে, ‘কিছু না, ওই একটু উদাস লাগে’।

এ মফঃস্বলে ততদিনে পসার জমিয়েছে কানাই ডাক্তার। হোমিওপ্যাথির সাদা গুলির সাথে করলার চেয়েও তেতো ট্যাবলেট দিত ওষুধ হিসেবে। তবু পানু কবরেজেই আস্থা ছিল মন্ডল বাড়ির। কবরেজ মশাইকে কেউ খবর দেয় নি তখনও। উদ্যোগটা যার তরফে আসার কথা, অর্থাৎ গেদু’র তিন মেয়ের মা—সে তখনও আমল দেয় নি তেমন। নাওয়া খাওয়া, বাহ্যে যাওয়া, এমনকি দোকান যাওয়াতেও কোনও বেচাল ছিল না বলেই বোধহয়। এযুগে যে সব কারণে বউরা সংসার মাথায় করে, তেমন কিছুই না। আড়ি পেতে স্বামীর গতিবিধিতে নজর রাখার চেষ্টা করে নি ওর বউ। লোকে বলে, তেমন ফুরসতও নাকি ছিল না কয়লার উনুনে রান্না করা তিন মেয়ের মায়ের। তাছাড়া তেমন তো কিছু হয়ও নি। মাঝে মাঝে ওই শুধু একটুক উদাস লাগা। তা, সেই সময়টায় সত্যনারায়নের সিন্নি পর্যন্তই এহেন উদ্বেগের রশির টান।লক্ষ্মণ টক্ষন প্রকট করেও রোগ অবশ্য তার নিজের নিয়মেই বিদায় নিল। গেদু সুস্থ হোল। সুস্থ বলতে, উদাস লাগার কথা বলল না কিছুদিন পর থেকেই। আর বাকি তো সব ছিল নিজের খেয়ালেই।

গল্পের নটে গাছটিকে এখানেই চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে চিবুতে পারতো সুকু গয়লার খয়েরি গরুটা। লাঠি নিয়ে কেউ তেড়ে আসতো না। কারণ সময় বেশ খানিক পাল্টেছে। পাঠক খেয়াল করবেন, আধাগঞ্জ জনপদ আগেই মফঃস্বল হয়েছে। বেশ কিছু বাড়ির ছাদে দেখা যাচ্ছে অ্যান্টেনা, রবিবার সকালে মহাভারত দেখতে ভিড় জমাচ্ছে অনেকে। মুখুজ্জ্যে গিন্নি ধুপ দুনো দেন নিয়ম করে সিরিয়াল শুরুর আগে। মন্ডল বাড়িতে টিভি এসেছে। গেদু’র ঘরেও। ট্রেনে করে কলকাতা গেলে এখন কেউ আর ফিরে এসে গল্প করে না। বালক সঙ্ঘের খেলা থাকলে তেমন ভিড় জমে না, ইস্টবেঙ্গলের চিমা ওকরি গোল করলে যেমন হই হই হয়। এখন অনেক মেয়েই সাইকেল চালায়, রীতিমতো লেডিস সাইকেল। যেখানে সামনে বসিয়ে কাউকে ডবল ক্যারি করা যায় না।

বলা যেতেই পারতো, ইদানীং বয়স হয়েছে গেদু’র। কিন্তু তাতে প্রশ্ন উঠবে, কবে ওর বয়স হয় নি। গেদু’র যৌবন, মানে যৌবন বলতে যা বোঝায়, সেসব আর কবে হোল! বরং বলা যাক, তার বউয়ের চুলে পাক ধরেছে বেশ কিছু কাল আগে। বড় দুই মেয়ে কিভাবে পার হয়েছে, সে খবর বিস্তারিত পাওয়া যায় তার বউয়ের কাছেই। এমনকি ছোটটার জন্য পাত্র খোঁজার দায়ও তারই। গেদু শুধু সংসারে আছে, আগেও যেমন ছিল, এই যা। মানিক বহুদিন ধরেই দোকানের হিসাব পত্র কত্তামা’কেই দেয়। শুধু কেউ জানে না, গেদু রাত্রে ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝেই একটা স্বপ্ন দেখে, একটা ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের সাইকেল চালিয়ে ছুটছে সাঁই সাঁই করে, ঠোঁটের উপর তিল, গেদু দাঁড়িয়ে থাকে, এই বুঝি উঁচু ঢিবিটায় ধাক্কা খেল, হোঁচট খেয়ে পড়ল…। ঘুমের মধ্যেই উদাস হয় গেদু।

আর মেজ মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে শীতবস্ত্র দিয়ে যেদিন পাঠানো হয়েছিল গেদু’কে, সেদিন বেয়াই বাড়িতে গেদু’র খাতির যত্ন নেহাৎ কম হয় নি। মেয়ের অনুপ্রবেশ ছাড়াই গেদু’র পাতে একপাশে কাত হয়ে পড়েছিল কাতলা মাছের মাথা, একটা চোখ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল গেদু’র দিকেই। অন্য চোখটা দেখার জন্য মাথাটা উল্টোতে হতো, তা অত পরিশ্রম গেদু’র ধাতে নেই। বরং সেই বাটি না ছুঁয়েই খাওয়া শেষ করেছিল গেদু। বাড়িতেও যেমন অভ্যস্ত ছিল সে। নাহ, সেই সময় দরজার আড়াল থেকে মেজ মেয়ে বাবাকে মাছের মুড়োর জন্য কোনও তদ্বির করে নি, সে তখন রসুইঘরে পাটভাজায় বেসন মাখার প্রতিই বেশি মনোযোগী হয়েছিল বলে শোনা যায়।
সেই দিন, অর্থাৎ সেই বিকেলে বাড়ি ফেরার সময়, গেদু হাঁটার কথা ভাবে নি। ভাবা ছেড়ে দিয়েছিল আগেই, কারণ ততদিনে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ রাজবল্লভপুর স্ট্যান্ডে দাঁড়ালেই বাড়ি যাবার জন্য বাস পাওয়া যেত, পাওয়া যেত অন্যান্য বাহনও। গেদু অভ্যস্ত হয়েছিল ভাড়ার খুচরো দুই টাকা প্রায় বিনা আয়াসে বের করে দিতে। হাটখোলায় ধুলোমাখা পাম্পশুটা যখন বাসের পাদানি থেকে নেমেছিল, তা দেখার জন্য কেউ ছিল কিনা জানা যায় নি, কারণ তখন সূর্য পাটে গিয়েছিল বলে অনুমান। অবশ্য গেদু’র পা ফেলা আর পদার্পণ হলো কবে? শুধু বাড়ি ফেরার পথে অর্থাৎ নিতাই স্যাঁকরার বন্ধ সোনার দোকানের পাশ দিয়ে যেতে গিয়েই একটা গোঙানির শব্দ পেয়েছিল গেদু। খেয়াল করার কথা নয়, তবু করেছিল। কারণ শব্দটা কোনও মেয়ের গলা থেকেই এসেছিল বলে গেদু’র মনে হয়েছিল।
কী যেন একটা টেনে নিয়ে গেছিল ওকে। আরেকটু কাছে। আলো কম ছিল, মানে যতটা থাকলে কাপড়ে রক্তের দাগ দেখা যায়, ততটা ছিল না। কিন্তু ওই চোখ দুটো চিনতে পেরেছিল। সাইকেল চালাতো এই আধা গঞ্জের রাস্তায়, ঝিম ধরে থাকা মাঠের মাঝখান দিয়ে। ঘুমের কথা আর জিজ্ঞেস করেনি গেদু। জানতে ইচ্ছে করছে, শাড়ী পরে সাইকেল চালাতে অসুবিধে হয় না? এত বছর পরেও সেই আশ্চর্য তিলটার বয়স বাড়ে নি। প্রথম মালকিন বুঝি যত্ন করে তুলে দিয়েছে পরেরজনের ঠোঁটে, যেভাবে দানা তুলে দেয় মা চড়ুই। খুব কাছে, হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায় যেন।
প্রথম যেদিন তিলটা দেখেছিল গেদু, সেই উদাসবেলায়, ঝাঁপিয়ে পরেছিল ওই তিলটার উপর, ছটফট করছিল মেয়েটা, কেউ ছিল না আশেপাশে, তখন কেউ আসতো না। চিৎকার করে নি মেয়ে, তখন চিৎকার করার রেও্যাজ ছিল না। উঠে দাঁড়িয়েছিল ধুলো ঝেড়ে। হারাধন পণ্ডিত দেখেছিল যাওয়ার পথে।
‘উঃ মাগো’, কাঁদছিল ওই শাড়ী, ফ্যাকাশে রঙের শাড়ী। গেদু আরও কাছে যায়, কী যেন বলছে, ‘লোকগুলান তোমার মতোই দেখতে’। উদাস রোগের লক্ষ্মণ টের পেল গেদু।

Facebook Comments

Leave a Reply