সাজানো রোদের পৃথিবীতে রাক্ষস কি দাঁত মাজে না ! – সুবীর সরকার

fail

কত কিছুই তো ঘটে, ঘটে চলে আমাদের চারপাশে। আঞ্চলিক নদীর জলে ভোররাতে মুখ ধুতে আসে বাদুরেরা। নীলপরী আর লাল পরি হাত ধরে মর্নিং ওয়াকে বেরোয়। আর বাঘ জল খেতে আসে মানুষের উঠোনে। ডুবে যাওয়া নৌকো আবার ভেসে ওঠে। জীবনের পরতে পরতে জেগে ওঠে আবার ঘুমিয়ে পড়া গল্পগুলি।

১.

ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এই প্রাকসন্ধ্যের বিষণ্ণ আলো শরীরে মাখতে মাখতে কত কথাই যে মনে আসে অনিমেষের! কথার জালে জড়িয়ে যেতে যেতে, স্মৃতির পাকে পাকে জড়িয়ে যেতে যেতে এই প্রায় পঞ্চাশে অনিমেষ কি তবে চূড়ান্তরকম তাড়িত হয়! সে কি শাহ আব্দুল করিমের গান শুনতে শুনতে জীবনের আরো গভীরেই ঢুকে পড়তে থাকে! এত এত বছরের কবিতা লিখবার জীবনে এত ক্লান্তি জমে কেন! এই জনপদের সবচেয়ে অপমানিত কবি অনিমেষ। কবিতার জন্য কত কিছু ছাড়তে হয়েছে তাকে। ভালোবাসতে ভালোবাসতে কি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে সে। আগুনের ভেতর দিয়েই তো একজন স্রষ্টাকে হেঁটে যেতে হয়। সেই ৩০ বছর আগে এক কিংবদন্তি কবি তরুণ অনিমেষকে এই কথা বলেছিলেন। তারপর থেকেই অনিমেষ বেছে নিয়েছে কবিতা লিখবার এক জীবন। প্রবল অভিশপ্ত এক জীবন। তাড়িত দুঃখের মতন সে কেবল জীবনের পরতে পরতে বাদ্য ও বাজনার সমস্বর মিশিয়ে দিতে চেয়েছে। এই বিকেল সন্ধ্যের মাঝামাঝি অনিমেষ তার চোয়ালের পেশিতে এঁকে রাখতে থাকে এক চিলতে হাসি। আর পাখিরা ফিরে আসতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে।

২.

মানুষের ঘরবাড়ি থেকে যাপনের গল্পগুলি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। চাঁদের আলোয় রহস্য গড়িয়ে নামে। ভাঙ্গা হাটের টুকরো টুকরো অংশগুলি তখনও জেগেই থাকে। আর উকিল মুন্সীর গান গাইতে গাইতে হারাধন তার চায়ের দোকানে একটা ময়মনসিংহ একটা নেত্রকোনা আর হাউড়ের জলের শব্দ শুন্তে থাকে বুঝি! হারাধনের দু’চোখ তখন বন্ধ। চোখে জলের ধারা। দেশ ছেড়ে এসেছে কবে, কিন্তু আজও সে তার শরীরে; তার সমগ্রতার ভেতর বহন করেই চলেছে তার দেশ। অনিমেষ সামান্য দূর থেকে এটা দেখে। সে এগোতে থাকে হারাধনের গানের দিকে। না কি গানই এগিয়ে আসে তার দিকে_

‘আখ খেতে ছাগল বন্দী
জলে বন্দী মাছ
নারীর কাছে পুরুষ বন্দী
ঘুরায় বারো মাস’

এটাই তো জীবন। জীবনের বাঁকে বাঁকে বাঁকে কে বুঝি গুঁজে দিতেই থাকে প্রসন্ন বিজধান।

৩.

একা একা হাঁটতে হাঁটতে অনিমেষ কেমন দূরাগত হয়। স্মৃতির গোপন কুঠুরি থেকে গত জন্মের রহস্যময় বাতাস তাকে জাপটে ধরে। কিছুই তখন আর করার থাকে না। সে দেখতে পারে গোলক গঞ্জের কলেজ মাঠে জুলুস। রংবেরঙের মানুষের ভিড়। মাইকে বাজতে থাকা গোয়ালপাড়া অঞ্চলের গান। কি এক আগ্রহে সে ক্রমে ঢুকে পড়তে থাকে সেই জমায়েতের ভিতরে।
সে ছিল ভোটের সভা। ইয়াকুব গিদাল এবারো ভোটের ক্যান্ডিডেট। দুই দুইবারের বিজয়ী এম এল এ তিনি। লোকগানের লোক। গান লেখেন। দোতারা বাজিয়ে গান গান। আর মরুচমতি শিল্পী সমাজের মহিন মাস্টারের সাথে ঘুরে বেড়ান জনপদের পর জনপদ। ইয়াকুব গীদাল কেন জানি না কখনো ইয়াকুব এমেলে হতে পারলেন না।
কোনো ভোটেই তাকে ভোট চাইতে হয় না। তার কোন ভোট প্রচার নেই। তিনি কেবল জুলুসের পর জুলুস গানে গানে ভরিয়ে দেন। মানুষ গান শুনতে শুনতে মাতোয়ারা হয়। আবার নেচেও ওঠে দু চার পাক।
কোন জুলুসের জনমানুষেরা তাদের ভেতর ফাউ হিসেবে পেয়ে যায় আব্দুল জব্বার কিংবা কেরামত আলীকে। বাতাসে গান ভাসতে ভাসতে চলে যায় গঙ্গাধরের দিকে, মুন্সী বাড়ির বাহির খোলানের দিকে_
“চাষার মুখত আর নাইরে সেই গান
বড় সাধের বাপ কা লা নি আমার ভাওয়াইয়া ভাসান”।

অনিমেষের মুখ জুড়ে নেমে আসতে থাকে এক লুপ্ত পৃথিবীর নাশপাতি গন্ধ।

৪.

হায়রে মানুষের জীবন! জন্ম মরন শাসিত এই জীবনের বড় মায়া গো! ফেলে আসা এক পৃথিবীতে কোন এক গ্রাম্য মেলায় চন্দ্রকান্ত মন্ডল অনিমেষকে এই কথা বলেছিল। প্রায় চার কুড়ির সুঠাম বৃদ্ধ গদাধর নদীতে মাছ ধরে আর গৌরীপুরের হাট এর পাইকারদের কাছে সেসব বেচে।
অনিমেষ তখন গৌরীপুরের লালজি রাজার হাতিক্যাম্পের ওপর কাজ করবার জন্য প্রায়ই গৌরীপুর আসে আর লালজির জিপে চড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। আর সময় পেলেই চন্দ্রকান্ত মণ্ডলের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠে। পুরনো দিন আর ইতিহাসের গল্প শুনতে শুনতে বুদ হয়ে ওঠে।
সে এক অন্যরকম জীবন ছিল অনিমেষের।

৫.

অনিমেষ ভাবে। তাকে ভাবতেই হয়। কত কত স্মৃতির তাড়সে তাকে তাড়িত হতে হয়। এত বছরের কবিতা লিখবার জীবনে কত অভিজ্ঞতা অনিমেষের কবিতা জীবনকে ক্রমে বদলে বদলে দিয়েছে। ভাঙা সম্পর্ক থেকে সে কেবল তুলে এনেছে সাঁকো কিংবা শালবনের কবিতাগুচ্ছ। নুতন কলমের প্রতি চিরদিনের আগ্রহ তার। নিজে পাশে দাঁড়িয়ে তরুণ কলমকে স্বাগত জানিয়েছে চিরকাল সে। সে তো চিঠির যুগের স্মৃতিজড়ানো মানুষ। শুরুর দিনগুলিতে তেমন কোন অগ্রজর স্নেহের হাত তার পিঠে পায় নি। চারপাশের দেশ দুনিয়া আর গঞ্জ হাট তাকে শিখিয়েছে। পুষ্ট করেছে। দাউদাউ এক আগুন ছুঁতে ছুঁতে আজ অনিমেষ সামান্য হলেও একটা নিজের দাঁড়াবার জায়গায় এসে পৌঁছেছে। তাই সে বোঝে নুতন কলমের অসহায় এক আশ্রয়হীন পরিসর টুকুর কথা। বড্ড আবেগ আর নিঃশর্ত এক আকুতি নিয়ে তরুণ কবির ভুবনকে দু হাতের দশ আঙুল দিয়ে প্রবল স্পর্শ করতেই চে য়ে ছে অনিমেষ। কিন্তু এই আবেগ তাকে কষ্ট দিয়েছে। হাহাকার দিয়েছে। ভয়াবহ এক বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মনে পড়ে, বছর দশ আগে সুনেত্রা এসেছিল। মেয়েটির কবিতায় এক প্রখরতা ছিল। আগামীর সম্ভাবনা অনিমেষ দেখতে পেয়েছিল সুনেত্রার কবিতায়। সুনেত্রা অনিমেষের পরামর্শ প্রত্যাশা করেছিল। কবিতা জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে অনিমেষ তার পাশে দাঁড়িয়েছিল, যেমন সে দাঁড়ায়। একটা সময় অনিমেষ বুঝে গেল, সুনেত্রা পড়াশোনা দিয়ে মেধা মননকে আরো ধারালো করবার কঠিন শ্রম করতে চায় না। খুব হালকা কিছু পড়াশোনা দিয়ে সামান্য পথও এগোন যায় না। এর পর সুনেত্রা সরে গিয়েছিল। তার পৃথিবী জুড়ে তখন অন্যরকম মানুষেরা। নাম যশ খ্যাতি আলোর দিকে কিভাবে বুঝি হারিয়েই গেলো সুনেত্রা।
ভারি ধাক্কা খেয়েছিল অনিমেষ। দশ বছর বাদেও যা ভোলা যায় না।

৬.

একবার ভরা নদীর উজানে যেতে যেতে উন্মনা হয়ে পড়া অনিমেষ একনাগাড়ে দেখছিল আকাশে ঝুলে থাকা মেঘেদের। বুঝি বদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘ দল।
স্তরে স্তরে সাজানো। তার মনে হচ্ছিল বুঝি দাত না মেজে দাঁড়িয়ে থাকা রাক্ষসের ঘুম ভাঙ্গবে এক্ষুনি। তাই সে একটা প্রতিরক্ষা ও সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়তে চাইছিল। বারবার তো একটা সমাধান সূত্র হীন বিপন্নতার দিকে কবি অনিমেষ দত্তকে এভাবে ঝুঁকে পড়তে হয়েছে! খানিকটা ছায়ার ভিতরে মাদুর বিছিয়ে রাখবার মতন।
আসলে অজানাগুলি একসময় জানায় রূপান্তরিত হলে আমাদের ঘুমের মধ্যে প্রবলভাবে ঢুকে পড়ে গান। গিটার বাজাতে থাকে ৯০০ প্রজাতির ভূতেরা। আর আমরা ভাবতে শুরু করি_ “আচ্ছা, রাক্ষস কি সত্যি দাঁত মাজে না!”

Facebook Comments

Leave a Reply