বারনাবত : তাপস কুমার দাস

fail

শুধু খিদে পেয়েছিল বলে মেরে দিবি বাপ?
আর এই যে তোরা বিরাট হাঁ করে
খেয়ে নিলি জল জঙ্গল, সভ্যতা হবে –
ফলটা শিকড়টা কন্দটা অবধি সভ্যতার বেড়া দিয়ে ঘেরা –
ছুঁতে পারি না, রাস্তার কুকুরের ও খিদে পায়
আমি কুকুরের ও অধম কিছুই বুঝতে পারিনা
মেরে ফেলার আগেও ড্যাবড্যাব করে চেয়ে ছিলাম
কেন মারছে ছবি তুলছে কি করলাম কিছুই জানি না
তোদের ছেলে মেয়ে নাতি নাতনির অন্নপ্রাশনের পর
রাস্তা জুড়ে টাল করে ফেলে দেওয়া খাবার
অফিস ক্যান্টিনে আধথালা ভাত খেয়ে বাকিটা ডাস্টবিনে রোজ
শুধু দুটো ভাত নিয়েছি বলে মেরে দিলি কমরেড?

বাইশে ফেব্রুয়ারী, দু হাজার আঠেরো, বৃহস্পিতিবার। মধু চিন্দাকি নামে বছর সাতাশ (মতান্তরে তিরিশ) বয়সের এক আদিবাসী যুবক পুলিশের জীপের ভিতর মারা গেলেন। আগালি পুলিশ চৌকির জিপগাড়িটা ছুটছিল কেরালার ওয়েইনাড় রাজ্যে কোট্টাথারা গ্রাম পঞ্চায়েতের গভর্নমেন্ট ট্রাইবাল স্পেশ্যালিটি হসপিটালে পৌঁছোনোর জন্য – যদি কোনোভাবে মধুকে বাঁচানো যায়। পারা যায়নি, তার আগেই হৃদস্পন্দন থেমে যায় মধুর।

পলাক্কাড় জেলার আত্তাপাড়ি অঞ্চল, মধু সেখানকার মানুষ। আদিবাসী। কুরুম্বা উপজাতির যে আদিবাসীরা বংশানুক্রমে ঘর বেঁধেছেন পশ্চিমঘাট পর্বতমালার আত্তাপাড়ি অভয়ারণ্য এবং সংরক্ষিত এলাকায়, মধু তাদের ই একজন। কুরুম্বারা আত্তাপাড়ি অঞ্চলের (এবং সমগ্র কেরালারই) প্রাচীনতম আদিবাসীদের অন্যতম। সভ্য জগতের অত্যাচারে, জঙ্গল কেটে, ভূমিপুত্রদের তাড়িয়ে ধনতন্ত্রের ব্যাপক প্রসারে তাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন, এবং ক্রমক্ষীয়মান। প্রায়ই ভালো করে পেটের ভাত জোটে না এঁদের অনেকেরই। সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে মাত্রই সাড়ে পাঁচশোর মতো কুরুম্বা পরিবারের বাস (প্রধানত পুদুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়), এবং মোট জনসংখ্যা সাড়ে বাইশশোর আশেপাশে। কুরুম্বা ছাড়াও, মুদুগার আর ইরুলার প্রজাতির আদিবাসীরাও আত্তাপাড়ি অঞ্চলের ভূমিপুত্র। বিভিন্ন উপজাতিরা মিলেমিশেই থাকেন, গোষ্ঠীদ্বন্দের কোনো খবর সেভাবে প্রকাশ্যে আসেনি কখনো।

নিরীহ, অতিনিরীহ আদিবাসী যুবক মধু, যতদূর জানা গেছে পরে, সামান্য মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন ইতস্ততঃ, রাত কাটতো কোনো গুহায়। একুশে ফেব্রুয়ারী বুধবার রাতে গুজব ছড়ায় কালক্কান্ডা এলাকার এক মুদির দোকান থেকে চাল চুরি করেছেন মধু। তার ওপরে ভিত্তি করে জনা পনেরো স্থানীয় লোকজন লাঠি সোঁটা নিয়ে মধুকে খুঁজতে বেরোন। পাহাড় জঙ্গল ঢুঁড়ে ধরে আনা হয় মধুকে, মেরে ছিঁড়ে দেওয়া হয় জামাকাপড়, লুঙ্গি দিয়ে দু হাত বেঁধে, দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় তাকে। চলে বেধড়ক মারধোর। সেই মারধর করার ছবি তুলে রাখেন মধুর আক্রমণকারীরাই। সেইসব ছবি পোস্ট করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তার মধ্যে এক ছবিতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে চশমাপরা, হালকা দাড়ি ওয়ালা সুবেশ সম্ভ্রান্ত এক যুবা, মধুকে মারা হচ্ছে সেই দৃশ্য ব্যাকগ্রাউন্ড এ রেখে হাসিমুখে সেলফি তুলছেন। মধুকে নির্মম ভাবে পিটোনোর ভিডিও তোলা হয় অপূর্ব উল্লাসে। সগর্বে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।

অমানুষিক মারধর করে মধুকে তুলে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে, তখন আধাসংজ্ঞাহীন অবস্থায় মধু বমি করতে শুরু করেছেন। তাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় হাসপাতালে। কিন্তু রাস্তাতেই সব শেষ হয়ে যায়। শুক্ল পক্ষ, সপ্তমী তিথি, লক্ষ্মীবারে চলে গেলেন মধু। যে লক্ষী কে মানা হয় খাদ্যের দেবী হিসেবে, ভাতের দেবী, অন্নদা, তাঁর আরাধনার দিন’ই দুটো চাল চুরি (?) করার `অপরাধে’ গণধোলাই খেয়ে মরলো হতভাগা মধু চিন্দাকি।

কোভালম-এর আদিবাসী উন্নয়ন সংক্রান্ত সক্রিয়তাবাদী ধন্যা রামন (কেরালার কাসারগড়ে জন্ম) সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করেন মধুকে অত্যাচার করার ফটো এবং ভিডিও। পরের দিন যা ভারতবর্ষের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাপা হয় এই মর্মান্তিক, নিষ্ঠুর, ঘৃণ্য খুনের খবরের সাথে।

খবরের কাগজের সেই ছবিতে, প্রথমেই, নজরে পড়ে মধুর দুটো চোখ। শুধু দুটো চোখ। কোঁকড়া চুলের নিচে থেকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে – কি করেছে জানে না – খিদে পাওয়া অপরাধ সেটা কেউ বলে দেয় নি তাকে। খাবার নেওয়া অপরাধ সেটাও বলেনি। এটাও বলেনি যারা আজ দশকের পর দশক ধরে কেড়ে নিয়েছে এদের মুখের খাবার, গায়ের জোরে, নির্লজ্জ ভাবে, কুকুরের মতো তাড়িয়ে ভিটেছাড়া করেছে তাদেরই হকের জমি জঙ্গল থেকে, তারা চোর নয়, একটু ভাত খেতে চেয়ে সে চোর, সেটা সে বুঝতে পারে নি – তাই ওরকম ভাবে চেয়েছিলো। তীর খাওয়ার পরে ব্যাধের দিকে তাকায় যেমন বনের শম্বর – চেয়ে ছিলো। ঘৃণাও ছিল না চোখে – ভয় আর ঘৃণা চাপা পড়ে গিয়েছিলো বিস্ময়ে – মানুষ এরকম হতে পারে, সভ্য মানুষ, সেটা সে বিশ্বাস করতে পারেনি – তাই ওভাবে তাকিয়ে ছিলো?

নজরে পড়েছিল শুধু, চোখ, শুধু দুটো চোখ – অবাক, স্তব্ধ, স্তম্ভিত।

সে চোখের মনি স্বচ্ছ জলের মতো, মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের ভান ধরে রাখার গভীর গোপন আয়নার মতো। সে মুকুরে প্রতিফলিত হয়েছিল তাবৎ ভারতবর্ষের সভ্য ও শিক্ষিত মানুষের হাজার হাজার বছরের নির্লজ্জতার ইতিহাস। ভারতবর্ষের বঞ্চিত ভূমিপুত্রদের ওপর লাগাতার অত্যাচারের ইতিহাস।

সেই দৃষ্টি দয়াভিক্ষুর নয়, অপরাধীর তো নয় ই। বিস্ফারিত সেই চোখ প্রশ্নকারীর চোখ, আসমুদ্র হিমাচল এই দেশের যাবতীয় সভ্য মানুষের সমষ্টিগত বিবেক কে তীব্র প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া সেই দৃষ্টি দেখে অনন্ত আত্মধিক্কারে মাথা নিচু হয়ে যাবে যে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষেরই।

কি দেখছিল সেই দুই চোখ? সভ্যতার ভাঙ্গন? কিন্তু সে তো নতুন নয় – চিরকালীন। বঞ্চনার এই ঐতিহ্য তো মহাভারতের কাল থেকেই। পাঁচ হাজার বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। বারণাবতে জতুগৃহ দাহ হলো – সভ্যতা ও ধর্মের প্রতিমূর্তি পাণ্ডবদের জননী কুন্তী লোভ দেখালেন এক অভুক্ত নিষাদকন্যা কে – সেই অসহায়া মহিলা আর তাঁর পাঁচটি ভুখা সন্তান একটু খাবার পাওয়ার আশায় আর সভ্য মানুষদের বিশ্বাস করে খেতে এসে মাদক মেশানো খাওয়ার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন – সেই ঘুম আর ভাঙলো না, তাদের পোড়া দেহগুলো ব্যবহার করে বাঁচানো হলো ধর্মরাজ ও তাঁর পরিবার কে।

এই তো সভ্য মানুষের, কৃষ্টিশীল উন্নত নাগরিকের মানবধর্ম। নতুন তো না এ জিনিস। হাজার হাজার বছর ধরে এই `সভ্যতা’ ই কি রক্তে, বোধের গভীরে, চেতনায় বয়ে বেড়াচ্ছি না আমরা? ভারতবর্ষের তথাকথিত সভ্য নাগরিকরা? বারণাবতের সেই নিষাদ মহিলা কে এতোই অকিঞ্চিৎকর করে রেখে দেওয়া উচ্চবর্ণের তাবৎ সাহিত্যে, যে, গোটা মহাভারতে তার নামটুকু পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না – শুধু জনৈকা নিষাদ রমণী বলেই তার পরিচয়। কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের পাতা উল্টোলে আমরা দেখবো জতুগৃহ দাহর বর্ণনা রয়েছে আদি পর্বে, একশো আটচল্লিশতম অধ্যায়ে। বৈশম্পায়ণ বলছেন:
`ক্ষুধাতুরা এক নিষাদী কালপ্রেরিত হইয়া জয়লাভ প্রত্যাশায় পঞ্চপুত্র সমভিব্যাহারে তথায় উপস্থিত হইয়াছিল। কুন্তীভোজদুহিতা দয়ার্দচিতে উত্তমরূপে তাহাদিগকে পান-ভোজন করাইলেন। নিষাদী পুত্রগণ সমভিব্যাহারে প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান করিয়া হতজ্ঞান ও মৃতকল্প হইয়া সেই স্থানেই অবস্থান করিল।’

তাদের পোড়াদেহ দিয়ে যখন ধোঁকা দেওয়ার বন্দোবস্ত হলো কৌরবদের, সেই বর্ণনাতেও নিষাদীর কোনো ব্যাক্তিপরিচয় দিতে মাথা ঘামায়না এলিট মহাকাব্য। কালীপ্রসন্নের মহাভারতে একশো পঞ্চাশতম অধ্যায়ে তাই বৈশম্পায়ন বলেন:

`তদনন্তর পৌরগণ পাণ্ডবগণের অন্বেষণার্থে অগ্নি নির্বাণ করিতে করিতে ভস্মীভূত নিরপরাধ নিষাদী ও তাহার পঞ্চপুত্রকে দেখিতে পাইল; তাহারা উহাদিগকেই পঞ্চপুত্র-সমবেতা কুন্তী বলিয়া স্থির করিল।’

ব্যাস। এটুকুই। সমগ্র মহাভারতে হতভাগ্য নিষাদ রমণী আর তার পঞ্চপুত্রের উল্লেখ এই দুবার ই মাত্র। পঞ্চপান্ডব ও মাতা কুন্তীর প্রাণ বাঁচাতে যাদের বলি দেওয়া হলো, তাদের জন্য এর বেশি একটি শব্দ ও খরচ করতে রাজি হননি মহামান্য ব্যাসদেব।

চোরের মার খেয়ে মরা মধু চিন্দাকি, সে তুলনায়, বড়োই ভাগ্যবান! বড়োই সম্মান তার, যে, অন্তত তার নামটুকু লোকে জানলো, জনৈক নিষাদ হিসেবে না জেনে – তার থেঁতলানো মৃতদেহের ওপরে একটা নেম ট্যাগ দিলাম আমরা – আমাদের, সভ্য মানুষদের, সুশীল সমাজের, এই মহতী কর্তব্যবোধের প্রশংসা শতমুখে না করে পারা যায়?

মহাভারতের কাল খুব যে পরিবর্তিত হয়েছিল পরবর্তী সময়ে, এমন ভাবলে ভুল হবে। ব্রিটিশ শাসনকালে, আঠেরোশো একাত্তর খৃষ্টাব্দে তৈরি হয় ক্রিমিন্যাল ট্রাইবস এক্ট। যার জোরে একটা গোটা উপজাতি কে দেগে দেওয়া যেত `অপরাধপ্রবণ’ হিসেবে, এবং সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যেত সেই উপজাতির প্রত্যেকের গতিবিধি। একটা গোটা উপজাতির সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে (সন্দেহ হলে ছোটদের ও) প্রত্যহ লোকাল থানায় বাধ্যতামূলকভাবে হাজিরা দিতে হতো এমন উদাহরণের অভাব নেই ইতিহাসে। স্বাধীনতার পর, উনিশশো ঊনপঞ্চাশ সালে এই এক্টের কিছু লঘুকরণ হয়, এবং শেষমেশ উনিশশো বাহান্ন খ্রীষ্টাব্দে, ক্রিমিন্যাল ট্রাইবস এক্টে উল্লিখিত `অপরাধপ্রবণ’ তালিকা থেকে উপজাতিগুলির বিমুক্তিকরণ (ডিনোটিফায়েড ট্রাইবস) ঘটানো হয়। কিন্তু `চোরের জাত’ দের এই সামাজিক অসম্মানের সম্পূর্ণ অবসান হয়েছে বর্তমান ভারতে, এমন ধারণা করলে তা মন কে চোখ ঠারাই হবে শুধু। খাতায় কলমে `এক্স ক্রিমিনাল ট্রাইবস’ (ঠিক কতখানি অবমাননাকর এই নাম, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকে না কোন) দের বিভিন্ন রাজ্য যার যার নিজের মতো করে `কন্ট্রোলে’ রাখে একাধিক `হ্যাবিচুয়াল অফেন্ডার্স এক্ট’ এর আওতায় ফেলে।

`বিমুক্ত জাতি’ র মানুষদের এই অন্তহীন অবমাননার ইতিহাস, এবং তাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থান জানতে মহাশ্বেতা দেবীর একাধিক কাজ, বিশেষ করে খেড়িয়া-শবর দের জীবন নিয়ে অসামান্য কাজগুলি, পড়ে দেখা যেতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই শবর উপজাতির উল্লেখ মহাভারতেও আছে। মহাশ্বেতা দেবীর কাজ নিয়ে শাশ্বতী তালুকদারের দু হাজার এক সালে বানানো সাতাশ মিনিট উনচল্লিশ সেকেন্ডের রঙিন তথ্যচিত্র `মহাশ্বেতা দেবী: উইটনেস, এডভোকেট, রাইটার’ দেখলে এ বিষয়ে অনেকটাই জানা যাবে। বিমুক্ত জাতি সম্পর্কে জানতে আরেকটি তথ্যচিত্র – `এক্টিং লাইক এ থিফ’ – ২০০৫ এ পি. কারিম ফ্রিডম্যান এবং শাশ্বতী তালুকদারের বানানো পনেরো মিনিটের রঙিন তথ্যচিত্র দেখাটাও সম্ভবতঃ জরুরী।

এই অন্তহীন অবমাননার ইতিহাসের পেছনে কাজ করে আতংক। তথাকথিত সভ্য সমাজের একপ্রকার নিদারুন ভয়, যে, আদিম ভূমিপুত্রদের এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে পারে বহু সহস্রক ধরে গড়ে তোলা ক্ষমতার গঠন। যে পাওয়ার স্ট্রাকচারের নির্মাণ সেই ভূমিপুত্রদের অস্থি দিয়ে। এই ভোগবাদী সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে দধীচির হাড় তো প্রান্তিক জনগণের পুঞ্জীভূত বেদনাই। সভ্য সমাজ, উচ্চবর্ণের সমাজ, নাগরিক সমাজ তাই ভয় পায় – এই বুঝি ভারতবর্ষের প্রাচীনতম রক্তের কোনো প্রতিনিধি এগিয়ে এসে তার ন্যায্য অধিকার দাবি করে। ব্যবস্থা রাখে সেই অধিকারের দাবীদারকে মুহূর্তে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে। উনিশশো সালের নয়ই আগষ্ট উলগুলানের বিরসা-ভগবান তাই রক্তবমি করে লুটিয়ে পড়েন রাঁচির সেন্ট্রাল জেলে।

এবং নিষাদ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্যের সাথে একাকার হয়ে যান `বিমুক্ত জাতির’ প্রতিনিধি গোয়ালডিহির লোধা-শবর দিনমজুর শম্ভুনাথ কন্যা চুনি কোটাল।

আর, চরম নিস্পৃহতায় আমরা তা অবধারিত ভুলে যাই। দু হাজার ষোলোর সতেরোই জানুয়ারী, জাত- বৈষম্যের স্বীকার হয়ে রোহিতে ভেমুলার দুর্ভাগ্যজনক আত্মহত্যার সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপ্লব তুলে ফেলা কতজন মনে রেখেছিলেন, বা আদৌ জানেন, উনিশশো বিরানব্বই সালের ষোলোই আগস্ট লোধা সম্প্রদায়ের সর্বপ্রথম স্নাতক সেই যুবতীর আত্মহত্যার কথা? প্রান্তিক রক্তের প্রতিনিধি হয়েও পরিশীলিত ভারতীয় সমাজের অন্দরমহলে ঢুকে পড়ছেন শুধুমাত্র মেধা এবং অনমনীয় লড়াই এর জোরে, সেই `অপরাধে’ কি চরম অবমাননার স্বীকার হয়ে মাত্র সাতাশ বসন্ত পেরিয়ে সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন দিনমজুর শম্ভুনাথ কোটালের কন্যা, তা সেইসময়ের নথিপত্র ঘেঁটে দেখলে ধারণা করা যাবে। আর ধারণা করা যাবে চুনির লেখা পড়ে। উনিশশো বিরানব্বই এর একত্রিশে অক্টোবর দেশ পত্রিকার যে সংখ্যা প্রকাশিত হয় সেখানে চুনির একটি লেখা ছিলো `ভারতের আদিবাসী শিশু সমস্যা’ নামে। যে কোনো জাতিকে গড়ে তোলার পেছনে সেই জাতির শিশুদের শিক্ষাদানের ভূমিকা কতখানি, সেই নিয়ে আলোচনা রয়েছে সেখানে, লোধা উপজাতির শিশুদের বেড়ে ওঠার আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ করে। আর চুনির নিজের, একান্ত নিজের বেড়ে ওঠা এবং লড়াইয়ের বর্ণনা পাওয়া যাবে চুনির স্নাতকস্তরের মাস্টারমশাই অর্থনীতির শিক্ষক শ্রী কুমারেশ ঘোষের স্মৃতিচারণে, ওই সংখ্যাতেই যা প্রকাশিত হয়েছিলো প্রচ্ছদ নিবন্ধ হিসেবে। চুনির মৃত্যুর তেরো দিন পরে, ইকোনোমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলি জার্নালের ঊনত্রিশে আগস্ট সংখ্যায় মহাশ্বেতা দেবী লিখলেন `স্টোরি অফ চুনি কোটাল’, গোটা ঘটনাটির আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করে।

এই অবধি এসে, একথা আমাদের খুব পরিষ্কার ভাবে বুঝতে হবে, যে, প্রান্তিক রক্তের সাথে বর্তমান `সভ্যতার’ এই যে সুপ্রাচীন সংগ্রাম, তাকে শুধু জাতের লড়াই বলে দাগিয়ে দিলে এই লড়াইয়ের প্রকৃত মার্ক্সীয় চরিত্রটি চাপা পড়ে যায় – কিংবা প্রকৃত প্রস্তাবে, চাপা দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় অনেক সময়, সুকৌশলে। জাতপাতের বিভাজন আর শ্রেণী (মার্ক্সীয় দর্শনের আলোকে) বিভাজন – এই দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনা আদতে একটি ডায়ালেক্টিক ডিসকোর্স – আপাতদৃষ্টিতে এরকম মনে হলেও আসলে তা নয়। এ সংঘাত প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাহীন এবং ক্ষমতাশালীর সংগ্রাম, প্রকৃত প্রস্তাবে যা কিনা শ্রেণী-সংগ্রাম ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। নিরন্ন, ক্ষুদার্থ, বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষগুলোকে তাদের পেটের ভাত এবং বাসস্থানের বন্দোবস্ত করার কমফোর্ট জোন থেকে নিরন্তর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানো হচ্ছে, এবং তা করা হচ্ছে ক্ষমতা এবং পুঁজির কেন্দ্রীকরণের স্বার্থেই, এই সহজ জিনিসটি সোজাসাপটা বুঝে নিতে পারলে, `জাতপাতের লড়াইয়ের তত্ত্ব’র চোখ দিয়ে এই সংঘর্ষ কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টার মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন ফাঁকি টা ধরা পড়তে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

প্রাচীন জনগোষ্ঠীকে এই নিরন্তর তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তাদের জন্তু জানোয়ারের পর্যায়ে সামিল করে – এই প্রক্রিয়া প্রকৃতপক্ষে তথাকথিত সভায় মানুষের চিন্তা এবং যাপন প্রক্রিয়াকে মানবসভ্যতার আদিম সারল্য (যা উপজাতিদের জীবনযাত্রার সম্পদবিশেষ) থেকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত – আধুনিক সভ্যতায় বাড়ছে জটিলতা, আত্মস্বার্থ-কেন্দ্রিকতা, এবং সেই স্বার্থ পূরণে অন্যকে বঞ্চনা করার অপরাধ-প্রবণতা। ফলস্বরূপ বেড়ে চলেছে সমষ্টিগত মানসিক কলুষতা। এছাড়াও, ভোগবাদী সভ্যতার বিস্তারে প্রাচীন জনজাতিদের তাড়িয়ে অরণ্য উচ্ছেদ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে , ডেকে আনছে পরিবেশ সংক্রান্ত নানারকম বিপদ। সেসবের বিভিন্ন বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি। ভোগবাদ শুধুমাত্র তার মুনাফা লোটার স্বার্থে মানবজাতিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে অন্তহীন বিপদের দিকে। মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, ধনতন্ত্রের বিকাশ মানবজাতির সার্বিক প্রয়োজন বা সামাজিক ন্যায়ের উদ্ধেশ্যে নয়, পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি একমাত্র মুনাফাই। মুনাফার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে, শ্রমিক শ্রেণী কে, নিঃস্ব হতদরিদ্রদের ক্রমাগত বঞ্চনা করে যাওয়ার ফলশ্রুতি হিসেবে ক্লাইমেট চেঞ্জ এর বিপদ একদিন সমগ্র পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করে দেবে। সেই ভবিষৎবাণী আজ ভীতিজনকভাবে বাস্তব। ভোগবাদের স্বার্থে জল জঙ্গল ধ্বংস করে আদিম জনজাতির প্রতিনিধিদের নিরন্তর শোষণের পরিণাম তাই বহুস্তরীয় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

ভারতের প্রাচীনতম জনজাতি গুলির সমস্যা, তাদের অবমাননা, এবং তাদের তরফ থেকে সেগুলি প্রতিরোধের সংগ্রাম কে সুতরাং আলোচনা করতে হবে মার্ক্সীয় দর্শনের ভিত্তিতেই, অন্য কোনো ভাবে সেই চেষ্টা করলে, সেই সংগ্রামের আংশিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে মাত্র। সেই লড়াই জেতা যাবে না কোনোদিন ই।

রাক্ষস বধ করতে বেরিয়ে, তাই, রাক্ষসকে চিহ্নিত করা একটা জরুরি ধাপ। রাক্ষস ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ। তার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে না পারলে তাই অতর্কিত চোরাগোপ্তা আক্রমণে রাক্ষস ঝাঁপিয়ে পড়বে, তারপর শিকার কে চিবিয়ে খেয়ে দাঁত মেজে ফেলবে নির্বিকার। মাজে, রাক্ষস ও দাঁত মাজে, দাঁত তাকে মাজতে হয় দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা মাংসখন্ড আর রক্তের ছাপ পরিষ্কার করে ফেলতে, ভদ্ররূপ ধরতে, ছদ্মবেশ ধরতে, যাতে রাক্ষস বলে তাকে চেনা না যায়, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যেই মিশে থেকে সাধারণ মানুষকেই খেয়ে ফেলতে একটুও অসুবিধা না হয় তার। দাঁত মাজা রাক্ষস দেখলে, অতএব, নিরীহ বা স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত ভাবার কারণ নেই কোনো। ভাবলে তা মারাত্মক ভুল হবে, গুনাগার টানতে হবে শ্রেণী-যুদ্ধে পরাভূত হয়ে।

ভারতবর্ষের প্রাচীন রক্তের অধিকার বনাম ভোগবাদী সভ্যতা-রাক্ষসের এই শ্রেণীসংগ্রামের রণকৌশল নির্ধারণে বামপন্থী রাজনীতির বিশেষ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন, কেননা একমাত্র বামপন্থাই সেই আদর্শ যা শ্রেণীহীন সমাজে উত্তরণের জমি তৈরী করতে পারে। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্বে থাকা প্রান্তিক মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে প্রাচীনতম রক্তের অধিকারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য করে তোলার, কারণ সেই ভূমিপুত্ররা প্রকৃত প্রলেতারিয়েতের বেঁচে থাকার, রুটি রুজির লড়াইয়ের, কাষ্ঠস্তম্ভ – টোটেম পোল। তাঁরা প্রান্তিক সমাজের মুখপাত্র। সরস চিক্কণ প্রগতিশীল নন কোনো। সাবল্টার্ন দের ল্যাংগুয়েজ উচ্চকোটির মানুষের কাছে কম্যুনিকেবল কিনা, এবং উচ্চকোটির মানুষের সাথে একবার কম্যুনিকেশন শুরু হলে, সেই কম্যুনিকেটর আর প্রকৃত সাবল্টার্ন থাকেন কিনা – এ বিষয়ে তাত্ত্বিক তর্কের অবকাশ আছে হয়তো। নিপীড়িত (অপ্রেসড) আর প্রান্তিক (সাবল্টার্ন) দের মধ্যে গায়েত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের টানা সীমারেখার তত্ত্ব গ্রহণ যোগ্য, নাকি আন্তোনিও গ্রামশির কালচারাল হেজিমোনির বৃহত্তর প্রেক্ষিতে অন্য্ কোনো ভাবে বিচার করা প্রয়োজন সাবল্টার্ন ভয়েসের, তা নিয়ে সর্বসম্মত কোনো মতামত তত্ত্বগতভাবে সম্ভবত এখনো গড়ে ওঠেনি। বোভেনত্যুরা দ্য সান্তোসের সাবল্টার্ন কসমোপলিট্যানিজমের তত্ত্ব অনুযায়ী এটা ধরে নেওয়া হয়তো ভুল হবে না, যে, সাবল্টার্নের ভয়েস নন-কম্যুনিকেবল নয়, আজকের প্রেক্ষিতে অন্তত। ফলে প্রান্তিক ভূমিপুত্রদের `সাবল্টার্নত্ব’ সাসটেইনেবল কী না – সেই নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু মানবসভ্যতার এই ক্রান্তিকালে, ভোগবাদ কে পুঁজি করে বিরুদ্ধ ফ্যাসিস্ত শক্তির যখন দেশজুড়ে রমরমা, তখন এইসব শুকনো পান্ডিত্য চালাচালির থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বামপন্থী আন্দোলনে যোগদানকারী সমাজের প্রান্তিক সত্ত্বার মুখপাত্র দের সংখ্যা বাড়ানো। প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে আসা নেতা বা নেত্রী ব্রিগেডে বক্তৃতা দিতে এলে সেই প্রান্তিক মানুষের গায়ে কলোনিয়াল পাওয়ারের প্রলেপ পড়বে কিনা সেই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামানো তাই এই অন্ধকার সময়ে বিলাসিতা মাত্র। বামপন্থা কেবলমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, তা এক যাপন প্রক্রিয়াও বটে – উদাহরণ হিসেবে সামনে তুলে ধরার – এবং সেই প্রেক্ষিতে প্রাচীন রক্তের প্রতিনিধিদের এই মুহূর্তে দরকার আছে – ভীষণই দরকার আছে।

এবং বামপন্থী রাজনীতিতে জল জঙ্গল পাহাড়ের সেই ভূমিপুত্রদের আরো বেশি করে যুক্ত করার প্রক্রিয়া ভারতবর্ষের বামপন্থী উন্নাসিকতার অচলায়তন ভাঙতে সাহায্য করবে। লেফটিস্ট এলিটিজম, শব্দবন্ধ হিসেবে সোনার পাথরবাটির মতো শোনালেও, দুঃখজনক ভাবে বাস্তব। তাই যে কোনো আন্দোলনের সময় নাগরিক সমাজের সমস্ত নজর কেন্দ্রীভূত হয় জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশবিদ্যালয় বা প্রেসিডেন্সি কলেজের (কিংবা সেই গোত্রের এলিট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির) ওপর। মালদহর গণিখান চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজির পড়ুয়ারা দু হাজার আঠেরো সালে যখন জীবনপণ করে আন্দোলে বসেন, তা নাগরিক সমাজের এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নজরে আসতে বহুদিন লেগে যায় – এবং শেষ পর্যন্ত খুব যে কিছু সহায়তা পায় নাগরিক বা রাজনৈতিক সমাজের কাছে, এমনও নয়। খাস কলকাতার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা ওই অবস্থানে বসলে `উদারপন্থী’ এবং `বিপ্লবী’ মানুষের কাছে তা আলাদা সমাদর পেতো, সেই তেতো সত্য অস্বীকার করলে তা আত্মপ্রবঞ্চনাই হবে।

এই এলিট বামপন্থা ভোগবাদী সভ্যতার সুবিধা করে দিয়েছে। শত্রুপক্ষ, প্রতিক্রিয়াশীল বিরুদ্ধশক্তিকে সীমিত কয়েকটি জায়গাতে ঘনসন্নিৱিষ্ট করে ফেলতে পেরেছে। হাতে গোনা কয়েকটি জায়গার বদলে, সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে গেলে ফাসিস্ত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়তো এবং বামপন্থী আন্দোলনের জন্য সহজ হতো তাদের মোকাবিল করা। আত্মপ্রবঞ্চিত আমরা ইন্টেলেকচুয়াল এলিটিজম দিয়ে, মার্কসিস্ট এলিটিজম দিয়ে, ফাসিস্ত শক্তির হাত ই শক্ত করেছি। এ দুঃখজনক সত্য অস্বীকার করে লাভ নেই।

তাত্ত্বিক এলিটিজমের, বামপন্থী এলিটিজমের অনভিপ্রেত বোঝা ভারতবর্ষকে বহন করে আসতে হয়েছে বহুকাল – নেতৃত্বে এলিটিজম, কর্মপন্থা নির্ধারণে এলিটিজম, এমনকি `বিপ্লবী’ চিহ্নিতকরণে এলিটিজম। সজ্ঞানে এবং অজান্তেও। বিরসা ভগবানের উলগুলান তাই কেবল পাঠ্য বইয়ের বিষয় হয়েই রয়ে গেলো শেষ অবধি – খুব জোর `অরণ্যের অধিকার’ ধরণের গুটিকয়েক ফিকশনের পাতা’তে তার প্রকাশ। `ডহর বাবু’ র পরিবারকে মাইকে ডাকাডাকি করায় এলিট নাগরিক সমাজের যে হাস্যপরিহাস, তা যে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে তাদের দিকেই ফিরে আসবেনা কখনো, সেই নিশ্চয়তা তাই দেওয়া গেলো না এখনো পর্যন্ত।

দিনের শেষে রাক্ষস তাই দাঁত মেজে চলে গেছে, ছদ্মবেশে নতুন শিকার ধরতে। তাকে চিহ্নিতকরণ আরো দুরূহ হয়ে পড়েছে। রাক্ষসকে সেই সুবিধা আমরাই করে দিয়েছি, প্রান্তিক মানুষদের বিপুল শক্তিকে সংঘবদ্ধ করতে না পেরে। প্রাচীন রক্ত বনাম ভোগবাদী সভ্যতার লড়াইয়ে সরাসরি সেভাবে কোনো পক্ষ না নিয়ে, সেই লড়াইকে শ্রেণী সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত না করে জাতপাতের লড়াই হিসেবে দেখে, বা জাতপাতের লড়াই হিসেবে দেখানোর কুশলী অপচেষ্টায় বিভ্রান্ত হয়ে গিয়ে।

মধু চিন্দাকির বিস্ফারিত দৃষ্টি তাই রাক্ষসদের দেখে চলে আজ ও – যুগে যুগে যে রাক্ষস তার কুটিল ধোঁকায় শিকার করে এসেছে বারণাবতের সপুত্র নিষাদ রমণী, একলব্য, বিরস মুন্ডা, চুনি কোটাল, রোহিত ভেমুলা – আরো অনেক কে। এবং চকিতে দাঁত মেজে নিয়ে সেই রাক্ষস আবার বেরিয়ে পড়বে পরবর্তী শিকারের সন্ধানে, তার ই তাল কষছে।

সভ্যতা-রাক্ষসের কাছে প্রাচীন এই জনজাতিরা সেই কোন অনাদি অতীত থেকে অবহেলিত – বিজিত রক্ত হিসেবে অবমাননার শিকার –

`সেই অপরাহ্নের ছায়ায় পাহাড়ের উপর সে বিশাল তরুতলে দাঁড়াইয়া যেন সর্বব্যাপী শাশ্বত কালের পিছন দিকে বহুদূরে অন্য এক অভিজ্ঞতার জগৎ দেখিতে পাইলাম – পৌরাণিক ও বৈদিক যুগও যার তুলনায় বর্তমানের পর্যায়ে পড়িয়া যায়।

দেখিতে পাইলাম যাযাবর আর্যগণ উত্তর-পশ্চিম গিরিবর্ত্ম অতিক্রম করিয়া স্রোতের মতো অনার্য আদিমজাতি শাসিত প্রাচীন ভারতে প্রবেশ করিতেছেন – ভারতের পরবর্তী যা কিছু ইতিহাস এই আর্যসভ্যতার ইতিহাস। বিজিত অনার্য জাতিদের ইতিহাস কোথাও লেখা নাই। কিংবা সে লেখা আছে এই সব গুপ্ত গিরিগুহায়, অরণ্যানীর অন্ধকারে, চূর্ণয়মান অস্থি কঙ্কালের রেখায়। সে লিপির পাঠোদ্ধার করিতে বিজয়ী আর্যজাতি কখনো ব্যস্ত হয় নাই। আজ বিজিত হতভাগ্য আদিম জাতিগণ তেমনই অবহেলিত, অপমানিত, উপেক্ষিত। সভ্যতাদর্পী আর্যগণ তাহাদের দিকে কখনো ফিরিয়া চাহে নাই, তাহাদের সভ্যতা বুঝিবার চেষ্টা করে নাই, আজও করে না। ..ইতিহাসের এই বিরাট ট্র্যাজেডি যেন আমার চোখের সম্মুখে সেই সন্ধ্যায় অভিনীত হইল। ‘
(একাদশ পরিচ্ছেদ, আরণ্যক – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৩৯ সালে প্রথম প্রকাশ।)

সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আরো অসংখ্য প্রয়োজনীয় কারণে, সর্বোপরি ভোগবাদ এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্বার্থে, প্রাচীন জনজাতির সাথে নাগরিক সমাজের মেলবন্ধন যে অসম্ভব জরুরি, তা বুঝতে হবে। জরুরি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিনিময় ও, এবং তার মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বাস অর্জনের প্রক্রিয়াটি চালু রাখার।

ধনঝরি শৈলমালার সেই বিষণ্ণ গোধূলিতে, ক্ষীণকায়া চাঁদ যখন সবে উঠবে উঠবে করছে, রাজকন্যা ভানুমতীর সাথে আরণ্যকের লেখক বনের ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রাচীন বটের তলায় চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা বিজিত রক্তের রাজা দোবরুপান্নার কবরে –

`ঠিক সেই সময় ডানা ঝটপট করিয়া একদল সিল্লী ডাকিতে ডাকিতে উড়িয়া গেলো বটগাছটার মগডাল হইতে। যেন ভানুমতী ও রাজা দোবরুর সমস্ত অবহেলিত অত্যাচারিত প্রাচীন পূর্বপুরুষগণ আমার কাজে তৃপ্তিলাভ করিয়া সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন – সাধু! সাধু! কারণ আর্যজাতির বংশধরের এই বোধ হয় প্রথম সম্মান অনার্য রাজ-সমাধির উদ্দেশে।’

আরণ্যক লেখার পর বহুবছর কেটে গেছে। সম্মান দেখানো সেভাবে হলো কই আমাদের? মধু চিন্দাকিরা কি অনন্তকাল এভাবেই বোবা-চোখে প্রশ্ন করে যাবে তাবৎ `সভ্য’ মানুষকে?

[লেখক : ভারত সরকারের পরমাণু গবেষণা দপ্তরে কর্মরত মহাকাশবিজ্ঞানের অধ্যাপক।]

Facebook Comments

Leave a Reply