মেটামরফোসিস থেকে এল আলেফ – একটি উড়াল : তমাল রায়

fail

The three of them knew it. She was Kafka’s mistress. Kafka had dreamt her. The three of them knew it. He was Kafka’s friend. Kafka had dreamt him. The three of them knew it. The woman said to the friend, Tonight I want you to have me. The three of them knew it. The man replied: If we sin, Kafka will stop dreaming us. One of them knew it. There was no longer anyone on earth. Kafka said to himself Now the two of them have gone, I’m left alone. I’ll stop dreaming myself.

Jorge Luis Borges

ফ্রাঞ্জ, ব্রড আর ফেলিস। তিন বন্ধু! আর কিছুটা দূরে বোর্হেস। ধরে নেওয়া যাক এটা একটা পিরামিডের স্ট্রাকচার। যার শীর্ষে বসে বোর্হেস। আর নীচের তিন বিন্দুতে তিন বন্ধু। তারপরেও একটি বিন্দু থেকে যাবে। চতুর্থ বিন্দু যার নাম জিরো। ধরা যাক সময়টা, ১৯১৩-১৪। যে সময়ে রবি ঠাকুর নোবেল পেলেন, সংস অফ অফারিংস-এর জন্য। আধ্যাত্মিকতা ও কাব্যের মিলনকে, প্রাচ্যের সেন্ট লাইক ঠাকুরকে টেগোর বানিয়ে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, সেই সময়েই কিয়েরসলিং,হাঙ্গেরি-অস্ট্রিয়া রাজের অংশীদার। যা পরে চেক প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিতি পাবে, আর প্রাগ হয়ে উঠবে রাজধানী। সে অবশ্য অনেকটা পরের কথা। আপাতত বলা যাক এক অস্থির তরুণের কথা। যে প্রথম জীবনে ভ্রাম্যমান ফেরিওয়ালা। ফিরি করেন ইনসিউরেন্স৷ মজার না? যে নিজের জীবনকে অকিঞ্চিকর মনে করে, সে অন্যের জীবনের নিরাপত্তা বেচে৷ বাপের সাথে প্রবল মতদ্বৈধতা। প্রতিদিন ই ক্যাচরম্যাচর লেগেই থাকে। আর সে মনোকষ্টে অস্থির! বিরক্ত লাগে তার সব কিছুই। শহুরে জীবনের অত্যধিক কোলাহল মুখরতা, কানে ইয়ারবাড গুঁজে চুপ করে বসে থাকে। ইস! অকারণ কর্মব্যস্ততার মাঝে যদি কোথাও একটু নিরিবিলি লেখার জায়গা পেত…একটু প্রেম, শান্তি। ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাবার আগের মুহুর্ত পর্যন্ত সময়টা যে বড় অর্থহীন সে বুঝে ফেলেছে আগেই৷ তাই সে চতুর্থ বিন্দুর দিকে অগ্রসরমান। জিরো। এই যাত্রা পথে সে ছুঁয়ে যাচ্ছে ফেলিসকে। ফেলিস বন্ধু ব্রডের কাজিন। আলাপ হয়েছিল এক ট্রেন যাত্রার আগের নৈশ ভোজে৷ কাঁটা চামচ আর ডিশ বোলের যত শব্দ শোনা গেছে তত অন্তত মুখ নিসৃত শব্দ নয়। কারণ বোলতি ও বন্ধ হোতা হয়। কথারা যে জমেও যায়,গলার কাছে। তারপর ফেলিস চলে গেলে অবশ্য ফের শুরু হল কথা। বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল প্রেম ফ্রাঞ্জ আর ফেলিসের। প্রতিদিন অজস্র শব্দের বিনিময়, কিন্তু সে শব্দের উচ্চারণ নেই। কালি ও কলমে লেখা। খুব দরকারে হয়ত টেলিগ্রাম। হয়ত ব্যর্থ ফ্রাঞ্জের সাময়িক ফেনিল আবেগ উথলোচ্ছে। কথা হত ব্রডের সাথেও৷ যার অধিকাংশই বিরক্তির প্রকাশ। মেজাজ হারানো আত্মম্ভরি বাপের আচরণে ব্যথা পেয়ে একাই বলে যাওয়া..ব্রড স্বান্তনা দিচ্ছে। ফেলিস ও। স্বান্তনা কি প্রেমের বিকল্প,বন্ধুতার? অরুণাংশুর ফুল পিসেমশাই ঈশ্বর কমলেশ্বরের যেমনটা হয়েছিলো, খুব আবেগ নিয়েই হয়তো পৌঁছলেন ফুল পিসির কাছে, বর্ষার সকাল। আকাশ জুড়ে ঘন নীল মেঘ। কমলেশ্বর দেহী পদপল্লব মুদারম, বলে শোনাতে গেলেন, সরযু তব আঁখিপল্লবে পুঞ্জিত মেঘমালা হতে ধেয়ে আসে শ্রাবণ কদম্ব রেণু…

– মরণ নেই গা তোমার, এসব কোবতে লিখে কী হয় গা? মেলা কাজ পড়ে, এখন এসো। কেটে যাওয়া বালবের মতই কমলেশ্বর পালিয়ে এলেন, কোথায় যাবেন এখন? কী করবেন? মনে তারও শ্রাবণ ছাইলো। ছাদের আলসেয় উঠে বাড়িয়ে দিলেন দুই হাত৷ তারপর অরুণাংশুদের বাড়ির উঠোনে কদম ফুল না, পড়েছিল কমলেশ্বরের দেহ। আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা?

দুর্ঘটনার মতই হয়ত বন্ধুতা বা প্রেম ফ্রাঞ্জের। ব্রড বা ফেলিসের সাথে। যেখানে প্রেম, নৈকট্যের বদলে বিনিময় হয় মৃত্যুর। বিষাদের। দূরের আকাশের গায়ে আর তেমং রঙের খেলাও নেই। বাতাসে বিষ ঢুকছে। কান পাতলেই শোনা যায়, কে যেন বলছে মর মর। অনেক তো হল এবার! ব্যবসায়ী বাপ ফ্রাঞ্জের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিচ্ছেন তাচ্ছিল্য। আর ফ্রাঞ্জ কি করে যেন এগিয়ে চলেছে চতুর্থ বিন্দু জিরোর দিকে। ঢিমে ত্রিতালে শরীরে বাজছে টিউবারকিউলোসিস, ফেলিস পাল্টে গিয়ে সেখানে আসছে মিনেস্কা। সাংবাদিক, অনুবাদক।

– স্যার মে আই ট্রান্সলেট ইওর দ স্ট্রোকার?

– ক্যান ইউ ট্রান্সক্রিয়েট মি?

– হোয়াট?

– ক্যান ইউ ইনডিউস ভাইরাস অব লাভ, ইন মাই পেনফুল এগজিসটেন্স?

ফেলিস সরে তৃতীয় বিন্দুতে এবার মিনেস্কা৷ নতুন পাতা গজাচ্ছে আবার ফ্রাঞ্জের নুয়ে পড়া গাছের মত শরীরে। গভীর রাত অবধি অক্ষরের পর অক্ষর বসছে,চলে যাচ্ছে মিনেস্কার ঠিকানায়…

– মিনেস্কা উড ইউ শেয়ার ইওর লাইফ উইদ মি?

– নো,আই কান্ট৷ ম্যারেড আয়াম।

– লিভ হিম। টুগেদার উই উউল লিভ।

– আই কান্ট!

বিকেলের আলোয় আকাশ রেঙেছে৷ ফ্রাঞ্জ একা হেঁটে যাচ্ছে পথ দিয়ে৷ আকাশের ওই রক্তিমাভা কি তবে যন্ত্রণা?

১৯২২। ফ্রাঞ্জ চলে গেছে বার্লিনে। সুস্থ হতে। এই টিউবারকিউলোসিস তো আর সারেনা।

দ স্ট্রোকার অনুবাদ করার সূত্রে যার সাথে আলাপ। পরে নিবিড় প্রেম। আসলেই কি প্রেম? বিনিময় হয় কথার। ফ্রাঞ্জ কেবল হতাশার কথাই বলে। বলতে থাকে৷ আলাপ হয়েছে ডোরার সাথে। ডোরা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা।

বাচ্চাদের প্লে স্কুলে পড়ায়,তাই তার মনে, মুখে এক অন্য আলো। হাঁটতে গিয়েই আলাপ ফ্রাঞ্জের সাথে। ব্রড ও এসেছে সাথে বার্লিনে। সেই তৃতীয় বিন্দুতে এবার মিনেস্কা সরে গিয়ে ডোরা। ডোরা এবার অনুরোধ রেখেছে। সেও উঠে এসেছে ফ্রাঞ্জের এপার্টমেন্টে৷ ফ্রাঞ্জের ইচ্ছে করে মিলিত হতে ডোরার শরীরের সাথে। কিন্তু ফ্রাঞ্জ তো আত্ম প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত। নিজের শরীরে হাত বুলিয়ে মেপে নিতে চায় উত্তাপ। আছে কি? বোঝেনা ঠিক। এ কারণেই প্রাগে থাকতে সে চলে যেত ব্রথেলে। ভারি নিতম্ব আর উন্নত স্তনের উন্মুক্ত নারীদের দেখে পরখ করতো, নিজেকে। অসাড় হল বুঝি শরীর৷ ডোরার সাথে মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষা ছিলোই, কিন্তু ওই যে সন্দেহ নিজের প্রতি। এবং মৃত্যু যখন দুয়ারে কড়া নাড়ে, সেই মৃত্যুবীজ কি প্রিয়তমার মাঝে কি সঞ্চারিত করা যায়৷ অতএব নিজেকেই নিষিদ্ধ করলো ফ্রাঞ্জ। বন্ধু,ডোরা ও সে একই এপার্টমেন্টে আর তিন বিন্দুর মধ্যে তখন কুয়াশা জমেছে। আলো ক্রমে মিলাইতেছে।

নাট্যমঞ্চে

Facebook Comments

1 thought on “মেটামরফোসিস থেকে এল আলেফ – একটি উড়াল : তমাল রায় Leave a comment

  1. খুব লাগলো। খুব ধৈর্য নিয়ে পড়তে বাধ্য করালো এই লেখা। সাবাশ।

Leave a Reply