এই হাত আগুনের (মেটাফর): ভারতীয় প্রতিস্পর্ধী কবিতার অনুবাদ : তনুজ ও শর্মিষ্ঠা

fail

এই হাত আগুনের (মেটাফর) : ভারতীয় প্রতিস্পর্ধী কবিতার অনুবাদ
নির্বাচন, অনুবাদ ও প্রাক-কথন : তনুজ ও শর্মিষ্ঠা
উৎসর্গ : এই দুনিয়ার সমস্ত শাহিনবাগকে

পঞ্চম কিস্তি
রোহিথের কবিতা
মূল ভাষা ও অনুবাদের সোর্স ভাষা : ইংরেজি

রোহিথের জন্ম অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুরে।কবিতা লেখেন ইংরেজিতে ও গদ্য, তার মাতৃভাষা তেলেগুতে। পাশাপাশি তেলেগু থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের সঙ্গেও যুক্ত। ইতিমধ্যে অনুবাদ করেছেন ভারভারা রাওয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা। তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে The Sunflower Collective, Cafe Dissensus, The Brown Critique, Raiot এবং Coldnoon journal-এর মতন উল্লেখযোগ্য ওয়েব-কাগজে। রোহিথ ডাক্তারি পড়ছেন।

মায়াকভস্কির পিস্তল

~

‘বারো বছর ধরে ব্যক্তি মায়াকভস্কি তিলে তিলে ধ্বংস করছিলেন কবি মায়াকভস্কিকে।শেষমেশ তেরোতম বছরে উঠে দাঁড়ালেন কবি এবং গুলি করলেন তাঁকে,ব্যক্তি মায়াকভস্কিকে…আসলে বারো বছরব্যাপী সেই আত্মহত্যা ছিল,শুধু এক মুহুর্তের জন্যও তিনি ট্রিগারটা টানেন নি,এই যা।’

—মারিনা ৎসেতায়েভা

অতঃপর মায়াকভস্কি লেখাটা শেষ করলেন।
তার সেই শেষ কবিতায় তিনি লিখলেন,
‘এভাবেই কোনো দুর্ঘটনা দ্রবীভূত হয়,
যখন প্রিয় নৌকোটা আছড়ে পড়ে
প্রাত্যহিকতার আতঙ্কে।’
কবিতাটা শেষ করেই দেখলেন
সামনে সুসজ্জিত টেবলের ওপর
পিস্তলটা রাখা আছে,
স্বপ্নপুষ্ট একটা অপচ্ছায়া যেন।

তিনি ভাবলেন,কোনো কমরেডকে
টেলিগ্রাম পাঠাবেন কিনা,
তারপরই তার সিদ্ধান্ত পাল্টালেন;
তখন ঘরের বাইরে ছিল অবিরাম তুষারপাত ও
রাতের আকাশটা ছিল বহুবার পঠিত
কোনো চিঠির মতন,ইদানীং যা অক্ষরবর্জিত,
শাদা হয়ে গেছে ফের।

মায়াকভস্কি একবার আয়নায় দেখলেন নিজেকে,
তাঁর অস্তিত্ব তাঁর কাছে নগণ্য মনে হল।
তাঁর শরীর,তাঁর চিরকালীন ব্যথার আধার
প্রাচীন এক কারাগারের বন্ধ দরজার মতন
খান খান করে ভেঙ্গে পড়ছিল।
গহীন মাংস ভেদ করতে সক্ষম,দারুণ ক্ষতের মতন
একটা চাঁদও উঠেছিল সেদিন।

বাইরের পৃথিবীটা গতিময় ট্রেনের জানালা থেকে
প্রতিসরিত দৃশ্যের সম্ভার যেন,ফুরিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত।
চেনা রাস্তাঘাটগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল প্রায়,
হাসপাতাল ও থিয়েটারগুলো পড়ে ছিল জনমানবশূন্য হয়ে,
প্রাণোচ্ছল যত ভাটিখানা,তারা আজ ফাঁকা।

তাঁর এই প্রস্থানে বিন্দুমাত্র অতিরেক ছিল না,
বাক্যশেষের সাধারণ বিরামচিহ্নের সাথে
তার তুলনা টানা যেতে পারে
অথবা দুটো পানপাত্রের ঠোকাঠুকিতে
যে মৃদু আওয়াজ,অতটাই,
তার চাইতে বেশি কিছু নয়,
যেন হৃদের প্রশান্তিতে পলকা ঢিল ছুঁড়েছে কেউ
অথবা কোনো বিদায়ী চুম্বন যেন
কিংবা একটা বরফের মিহি টুকরো,
যা আগামী জিভের ছোঁয়ায় গলে যাবে।

আমরা ও তারা

~

তারা জুলুম করে।আমরা প্রতিবাদ করি।তারা পুলিশ নামায়।
আমরা ইতিহাস নির্মাণ করি।তারা পাঠ্যবই লেখে।আমরা তাদের স্কুলেই পড়তে যাই।

তারা বলে,আমরাই শত্রু।আমরা নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করি।
এই লড়াই তারা টিভিতে দেখায়।
আমরা মরে যাই।আমরা তাদের কাগজে খবর হই।
আমরা তাদের খবরের কাগজ কিনেই তা জানতে পারি।

তারা বলে দেয় কি বলতে হবে।আমরা তাদের ভাষাতেই যা বলতে হবে বলি।
তারা আমাদের ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করে রাখে।

আমরা শিল্প করি।তারা প্রচার করে।আমরা দেখি শিল্পকে বদলে যেতে টাকায়।
তারা মনোরোগ আবিষ্কার করে।আমরা বিষন্ন হই।তারা ওষুধ তুলে দেয় হাতে।

আমরা খাটি।তাদের লাভ হয়।আমরা তাদের নির্দষ্ট করা পারিশ্রমিক পাই।
তারা দূষণ করে।আমরা অসুস্থ হই।তারা আগেভাগেই হাসপাতাল বানিয়ে রাখে।

আমরা ভোট দিই।তারা নেতা-মন্ত্রী হয়।আমরা তাদের সেবার্চনা করি।
তারা আইন বানায়।আমরা ধরা পড়ি।আমরা দেখি তারাই বসে আছে কোর্টে-কাছারিতে।

আমরা ফলাই শষ্য।তারা ভরপেট খেয়ে ঢেকুর তোলে।আমরা উপোসী বসে থাকি।
তারা বিক্রি করে বোমা।আমরা যুদ্ধে মারা পড়ি।তাদের দেশপ্রেম উচ্ছসিত হয়।

আমরা প্রশ্ন করি।তারা আমাদের ঈশ্বরের কাছে পাঠায়।
উত্তরের জন্য আমরা সারারাত প্রার্থনা করতে থাকি।

কবিরা কী করে

~

(কে.শিবরেড্ডির তেলেগু কবিতা,
‘কাভুলেম চেষ্টারু’ পড়ার পর)

কবিরা কী করে?
তারা রাষ্ট্রের বিরোধিতায়
কথা বলে।

কবিরা কী করে?
তারা গেরিলাদের
অস্ত্র সরবরাহ করে।

কবিরা কী করে?
তারা জনগণকে সরব হতে,
স্লোগান দিতে উস্কে দেয়।

কবিরা কী করে?
তারা বিদ্রোহের
নক্সা তৈরি করে।

কবিরা কী করে?
তারা ভোররাত অবধি
লেনিনের লেখা পড়ে।

কবিরা কী করে?
ওহো,ভুলেই গেছিলাম যে
তারা কবিতাও লেখে।

শহীদদের নামে ডেকো না

~

‘আমার ভয় হয়,আমরা তাকে নামের ভীড়ে ভুলে যেতে পারি’
-মাহমুদ দারবিশ

শহীদদের নামে ডেকো না,
ইতিহাস এমনিই এত এত নামে ভরে আছে যে
একটা বাড়তি নাম শুধু রক্তমাংসবিহীন
ফাঁকা আওয়াজের মত শোনাবে।
বরং চিরকাল তাদের রক্তাক্ত সকালের মত উজ্জ্বল
কোনো তাজা ঘা হয়ে থেকে যেতে দাও।

শহীদদের নামে ডেকো না
তাদের পরিণত কোরো না নিছক প্রতীকে
অথবা মুঠোভরা ছাইয়ে,
যা এক ফুঁতেই মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়।
বরং পৃথিবীকে যা মোহাচ্ছন্ন করে রাখে,গ্রীষ্মের সেই
অসময়ের বৃষ্টি হয়ে তাদের ঝরে পড়তে দাও।

শহীদদের নামে ডেকো না,
তাদের বিবরণের জঞ্জালেও নামিয়ো না টেনে ।
অতীতের ভূতকে স্মৃতির কবর থেকে তুলে
জানতে চেয়ো না নাম।
বরং তাদের বিপ্লব পরবর্তী কোনো এক নতুন শহরের
কোনো এক নামহীন সড়কের পরিচিতি দাও।

ফ্যাসিস্ট কালের চিত্রহার

যুক্তিবোধ নাকি
কুত্তার বাচ্চার মতন
উন্মাদনার প্যাঁচালো
জঙ্গলে নিরুদ্দেশ

হল।

একটা ত্রিশূল
কোনো একটা স্লোগানের গলায় বিঁধে আছে:

বাহ্, পেয়ে গেছি আমাদের সময়ের একটি রূপক।

লেখক এইমাত্র
তার নোটবুকে
‘শান্তি’র বার্তা লিখতে শুরু করেছিল

তারপর

দরজায় করাঘাত

গুলির আওয়াজ

মৃত্যু

সবুজ আলোর বদলে লাল আলো
ক্যামেরার স্যুইচ বন্ধ
পুলিশ সরিয়ে নেয়া হল
আলো নিভল

এভাবে
একটা দাঙ্গা
শুরু হয়।

ব্রেশট্ বলেছিলেন:
‘কী সময় এসেছে,
গাছের বিষয়েও কিছু বলা বারণ
কারণ তারাও অনেক বিভীষিকাকে
উহ্য করে রাখে।’

কিন্তু এই সময়ে কে চুপ থাকবে,
কে গর্জে উঠবে?

আমি বলতে চাইছি
এই চক্রটাই বা কে চালাচ্ছে,
কারা চালাচ্ছে?

বিদ্রোহের শক্ত মুঠো
ঠিক একটি পাখির মত
যে অসময়ের বৃষ্টিতে
বাতাসের বিপক্ষে গিয়ে

নিজের বাসাটা খুঁজে নেয়।

সময়ের ঘুলঘুলিতে
আটকে থাকা টেলিফোনটা
বেজেই চলেছে:

আমাদের সময়ের আরও একটা রূপক।

_______________________________________________________

[তনুজ – কবি,অনুবাদক,গদ্যকার ও সম্পাদক-( ‘হারাকিরি’)
শর্মিষ্ঠা – অনুবাদক, ইদানীং ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় প্রতিস্পর্ধী কবিতা অনুবাদ করে চলেছেন।]

Facebook Comments

Leave a Reply