দ্বিশতবর্ষে এঙ্গেলস : বাসু আচার্য

fail

কমরেড লেনিন একবার বলেছিলেন, বিপ্লবীদের জীবৎকালে প্রতিবিপ্লবীরা তাঁদের অনবরত গালাগাল করে; কিন্তু যেই না তাঁদের মৃত্যু হয়, এই একদা খিস্তিবাজের দল তাঁদের কুলুঙ্গিতে তুলে শাঁখঘণ্টা বাজিয়ে পুজো করতে শুরু করে। এই কাজ তারা করে মহান বিপ্লবীদের নির্জীব বিগ্রহে পরিণত করতে, তাঁদের বৈপ্লবিক শিক্ষা ও আদর্শ থেকে বিযুক্ত করে জনগণকে ধোঁকা দিতে।কমরেড লেনিনের এই কথাগুলো যে শুধু তাঁর নিজের আমলে বা তার পরবর্তীতেই সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা নয়, অতীতেও এর অভিপ্রকাশ আমরা দেখেছি—দেখেছি এমনকি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্রষ্টাদের যুগেও।
সময়টা ১৯ শতকের শেষের দিকে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের যুগ শুরু হয়েছে সবে। মার্কস মারা গিয়েছেন বেশ ক’বছর…। তাঁর পরম সুহৃদ কমরেড এঙ্গেলস বৃদ্ধ হয়েছেন। তা সত্ত্বেও, নিজের যুগান্তকারী সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধাবলী রচনা করে, সাংগঠনিক ও মতাদর্শগত কাজ সামলিয়ে, একে একে সম্পাদনা করে চলেছেন মার্কসের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নোট এবং লেখাপত্র। তাঁর জন্যেই দিনের আলো দেখেছে ‘পুঁজি’-র দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড, সংকলিত হয়েছে (কাউটস্কির সাহায্যে) ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব’ যা ‘পুঁজি’-র চতুর্থ খণ্ড হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।
কিন্তু প্রথম আন্তর্জাতিকের নৈরাজ্যবাদীদের মতো দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেও তখন ঘাপটি মেরে আছে কিছু লোক, যাদের আপাতভাবে বিপ্লবী মনে হলেও আদতে তারা বিপ্লব-ভীরু। এঙ্গেলস একবার লিখেছিলেন, বিপ্লব জিনিসটাই একটা কর্তৃত্বমূলক ব্যাপার; সেখানে এক শ্রেণী আর এক শ্রেণীর ওপর তার কর্তৃত্ব কায়েম করে, এবং তা বজায় রাখে রীতিমতো সশস্ত্র উপায়ে। বলা বাহুল্য, এমন ভয়ানক কথা বিপ্লব-ভীরুদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এরা তো অনেকটা রবি ঠাকুরের ‘বাল্মিকি প্রতিভা’র প্রথম দস্যুর মতন—’লাঠালাঠি কাটাকাটি, ভাবতে লাগে দাঁত-কপাটি’ ধরনের। ফলে মুখে বিপ্লব, ইত্যাদি বললেও কাজে শুধুই লেখালিখি, মিটিং, মিছিল, সেমিনার…।
এই সময়ে, ১৮৯৫ সালে, মার্কসের লেখা ‘ফ্রান্সে শ্রেণী সংগ্রাম’ (১৮৪৮ থেকে ’৫০-র মধ্যে লেখা একগুচ্ছ প্রবন্ধের সংকলন) শীর্ষক বইয়ের একটা যুগোপযোগী ভূমিকা লেখেন এঙ্গেলস। তাতে তিনি দেখান কীভাবে প্যারি কম্যুনের রক্তাক্ত পরিসমাপ্তিতে শ্রমিক আন্দোলনের ভরকেন্দ্র জার্মানিতে সরে এসেছে, এবং জার্মান শ্রমিকরা নির্বাচনী সংগ্রামকে কেমন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যাবহার করছেন। তৎকালীন জার্মানিতে বেআইনি আন্দোলনের থেকে আইনি আন্দোলনের সুযোগ এবং প্রভাব যে আগের তুলনায় অনেকটাই বেশি, —তিনি এমন কথাও বলেন সেইখানে। কিন্তু বৃদ্ধ দার্শনিক বোঝেননি, বিপ্লব ভীরুদের কাছে তাঁর এই রচনাই হয়ে উঠবে নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা ও ভীতিকে বিপ্লবী মোড়কে ঢেকে রাখার উপায়বিশেষ। এই লেখার থেকে খাবলা খাবলা অংশ তুলে নিয়ে একদিন য়্যুলিয়াম লিবনেখট ও তার চ্যালা-চামুণ্ডারা জর্মন সমাজ গণতন্ত্রী দলের মুখপত্র ‘আগে বাড়ো’-র পাতায় ছেপে দেয়। এঙ্গেলস কিছুই জানতে পারেননি। হঠাৎই কাগজ খুলে এহেন কাণ্ড দেখে তিনি রাগে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। কাউটস্কিকে সেদিনই, অর্থাৎ ১লা এপ্রিল, এক চিঠিতে লেখেন—’প্রচণ্ড বিস্ময়ের সাথে আজকের ‘আগে বাড়ো’-র পাতায় দেখলাম আমার লেখা ভূমিকার কিছু অংশ, যা আমার অনুমতি না নিয়েই ছাপা হয়েছে এবং এমনভাবে কাটছাঁট করা হয়েছে যাতে মনে হয় আমি যে কোনও মূল্যেই আইনসর্বস্বতার ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পূজারী।’ এর পর তিনি জানান যে তাঁর ‘বক্তব্য বিকৃত’ করার জন্য তিনি লিবনেখট ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের এক হাত নেবেন।
এই ঘটনার দু’দিন পর, মানে ৩রা এপ্রিল, পল লাফার্গকে তিনি ওই একই বিষয়ে আর একটা চিঠি দেন। তাতে তিনি বলেন, ‘লিবনেখট আমার বিরুদ্ধে বেশ সুন্দর একটা চাল চেলেছে। ১৮৪৮ ও ১৮৫০-র মধ্যবর্তী ফ্রান্স সম্পর্কে মার্কসের প্রবন্ধগুলোর যে মুখবন্ধ আমি লিখেছিলাম, তার থেকে সে নিজের খুশিমতো সেই সবই নিয়েছে যা তাকে সাহায্যে করবে যেকোনও মূল্যে শান্তির রণকৌশলকে প্রতিষ্ঠা করতে এবং বলপ্রয়োগ ও হিংসার বিরোধিতা করতে, বিশেষ করে এমন একটা সময়ে যখন বার্লিনে দমনমূলক আইন তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমি এই কৌশল (অর্থাৎ সর্বজনীন ভোটাধিকারের) প্রচার করেছি কেবল মাত্র আজকের জার্মানির জন্যেই, এবং তাও একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সহযোগে। ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম বা অস্ট্রিয়াতে এই কৌশল সার্বিকভাবে অনুসরণ করা সম্ভব নয়, এবং হয়তো জার্মানিতেও আগামী দিনে এটা আর প্রয়োগোপযোগী থাকবে না।’
নাঃ, এক হাত নেওয়ার সুযোগ এঙ্গেলস পাননি। কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে ক’মাসের মধ্যেই নিভে যায় তাঁর জীবনদীপ। সেই সুযোগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতৃত্ব দখল করে নেয় বার্নস্টাইন, কাউটস্কি, লিবনেখট প্রমুখ বিপ্লবভীরু শান্তিবাদীরা।
১৮৮০ সালে, জুল গেসদেকে সঙ্গে নিয়ে, ফরাসী শ্রমিক দলের কর্মসূচী তৈরি করার সময় তার ভূমিকায় মার্কস লিখেছিলেন, উৎপাদনের উপকরণসমূহের থেকে উৎপাদক বা সর্বহারা শ্রেণীর বিচ্ছিন্নতা দূর করতে হলে তাঁদের নিজেদের একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল তৈরি করতে হবে, যার হাতে থাকবে সর্বপ্রকারের কৌশল, এমনকি সর্বজনীন ভোটাধিকারও। লেনিনও এই কথা বার বার বলেছেন, বলেছেন পরিস্থিতি অনুযায়ী রণকৌশল গ্রহণ করতে। ১৮৪৮ সালে এঙ্গেলস যেমনটা বুঝেছিলেন, দেখা যাচ্ছে সমস্ত প্রকৃত মার্কসবাদী বিপ্লবীরই উপলব্ধি ছিল একই রকম। ‘কম্যুনিস্ট ইস্তাহার’-এর প্রথম দুটো খসড়ার অন্যতম ‘সাম্যবাদের মূলনীতি’ (১৮৪৮) তৈরির সময় এঙ্গেলস বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে কি ব্যক্তি সম্পত্তির বিলোপ সম্ভব? যদি এমনটা সম্ভব হয় তাহলে সাম্যবাদীদের এটাই মনোগত বাসনা হওয়া উচিৎ। … কিন্তু তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, প্রায় সমস্ত সভ্য দেশগুলোতে সর্বহারার বিকাশ কী হিংসাত্মকভাবেই না রোধ করা হচ্ছে, এবং এইভাবেই সাম্যবাদের বিরোধীরা সর্বশক্তি দিয়ে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের পক্ষে কাজ করছে। যদি শোষিত সর্বহারাশ্রেণীকে অবশেষে অভ্যুত্থানের পথে যেতে বাধ্য করা হয়, তাহলে আমরা, সাম্যবাদীরা, তাঁদের স্বার্থরক্ষার্থে কাজেই নেমে পড়ব যেমন এখন আমরা তাঁদের রক্ষা করছি লেখা ও কথার সাহায্যে।’ ‘কাজ’ বলতে এখানে এঙ্গেলস কি বোঝাচ্ছেন সেটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
১৮৪৮ সালে বলা এই কথাগুলো আজও সমান তাৎপর্যপূর্ণ, লাফার্গকে লেখা ৩রা এপ্রিল ১৮৯৫-র চিঠিটাও তাই। দুটো সফল বিপ্লবের এবং বেশ কিছু ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, এক ব্যতিক্রমী অবস্থা সৃষ্টি না হলে শাসকশ্রেণী কখনোই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা পরিত্যাগ করে না। নানান আইনি ও বেআইনি উপায় অবলম্বন করে তারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, হিংসার সাহায্যে গণমানসকে দমন করে। এমতাবস্থায় কম্যুনিস্টরা যেমন আইনি সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহার করে নিজেদের মতামত জনগণের মধ্যে পৌঁছে দেয়, দাবিদাওয়ার সংগ্রাম থেকে শুরু করে অন্যান্য ছোটখাটো লড়াই চালায়, তেমনই চালায় বেআইনি সংগ্রাম, চূড়ান্ত পর্যায়ে যা সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করে।
ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও আমাদের অভিজ্ঞতা অভিন্ন। ১৯৪৭-এর রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরেও দেশ রয়ে গেছে সাম্রাজ্যবাদের তাঁবে। গত সাত দশকে কিছু আবরণগত পরিবর্তন দেখা গেছে ঠিকই, কিন্তু বিশেষ কোনও গুণগত রূপান্তর পরিলক্ষিত হয়নি। একাধিক বিলিয়নর তৈরির সাথে সাথেই লাফিয়ে বেড়েছে গরীব মানুষের সংখ্যা, ক্রমশ কমে এসেছে কাজের নিরাপত্তা। ঠাণ্ডাযুদ্ধোত্তর যুগে পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের যে ন্যূনতম সাবেক কল্যাণকর মুখোশটা ছিল, তাও খসে পড়েছে। তার তীব্র প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের দেশে। নয়া ঔপনিবেশিক বন্ধনে আবদ্ধ এই আধা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ প্রভাবাধীন সংঘটিত ক্ষেত্র এক অতীতের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত মানুষের প্রায় ৮০% আজ দিনে ২০ টাকা কি তার সামান্য বেশি আয় করেন। না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যাও আমাদের এই দেশেই সর্বাধিক। তার ওপর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার হরণ… এসব তো লেগেই আছে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও দেশের মানুষ বিক্ষোভে, অভ্যুত্থানে, বিপ্লবে ফেটে পড়ছেন না। পড়ছেন না কারণ আশপাশের দেশগুলোর থেকে ভারতবর্ষের একট তাৎপর্যপূর্ণ তফাৎ আছে। এখানে এক দিকে যেমন ধনিক জমিদার, সামন্তপ্রভু ও সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁঠছড়া বাঁধা বড় বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রতিনিধিরা সংসদ এবং আইনসভাগুলোর দখল নিয়ে বসে আছে, তেমনই অন্য দিকে পার্লামেন্ট ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে কিছুটা মোহও তৈরি করতে পেরেছে। লেখা রয়েছে, জনগণের তাঁদের পছন্দ মতো জনপ্রতিনিধি বাছার অধিকার আছে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসককে ছুঁড়ে ফেলার ক্ষমতা আছে, ইত্যাদি। ১৯৭৭ সালে কেন্দ্রে বা রাজ্যে কংগ্রেসি জরুরী অবস্থার ‘মুহতোড় জবাব’ তাঁদের এই মোহকে কয়েকগুণ বারিয়ে দিয়েছে। সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সেই সময় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব কিভাবে কাজ করেছিল সে ব্যাপারে তাঁরা মাথা ঘামাননি। পাশের বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে যেভাবে সামরিক সরকার বার বার গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরেছে, ভারতে তা আজও দেখা যায়নি। এসবই মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করেছে। যদিও বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন অনেক বেশী, জল-জমি-জঙ্গল থেকে মানুষের অধিকার কেড়ে কর্পোরেটদের পায়ে সমর্পণ করছে সরকার, তবু সমস্ত দ্বন্দকে পার্লামেন্টের এক দেহে ধারণ করার অভূতপূর্ব ক্ষমতার বলে দেশের অধিকাংশ মানুষ আজও সংসদমুখী। গোটা দেশে মোট ভোটদাতার মধ্যে ৫০ শতাংশেরও অধিক মানুষ আঙুলে কালি লাগান। এর অনেকটাই ‘আপস ভোট’, কিন্তু তা বাদে নিজের পছন্দমত দল বা প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার লোকের সংখ্যাও তো নেহাত কম নয়। তাই নির্বাচনী সংগ্রাম বা আইনি লড়াইয়ের গুরুত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি। তবে, এর উদ্দেশ্য কখনোই সংসদীয় রাজনীতিকে দৃঢ় করা নয়। উলটে, নির্বাচনী সংগ্রামের লক্ষ্য— শান্তিপূর্ণ পথের সীমাবদ্ধতা মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া, মানুষের আরও কাছে যাওয়ার সুযোগকে গ্রহণ করা। মূল লড়াইয়ের ক্ষেত্র যে দেশের বহ্নিমান ক্ষেত-খামার, আদিবাসী ও মূলনিবাসী জনগণের পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা টেরেন এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো, এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না। সংগ্রামের মূল রূপ যে হতে হবে অসংসদীয় এবং বেআইনি –এটাও সন্দেহাতীত। কিন্তু সেই রূপকে গ্রহণ করতে হবে দেশের অবস্থা কী রয়েছে তার ভিত্তিতেই। এখানে আমরা যেমন অসম বিকাশের প্রশ্নটাকে মনে রাখব এবং এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতির ওপর জোর দেব, তেমনই ভুলে গেলে চলবে না আমাদের গ্রামাঞ্চল আর আগের মতো নেই। যে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম ব্যবস্থা পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর বা আশির দশকের শুরুতেও আমরা পেয়েছি, তা আজকে আর বিদ্যমান নয়। এর ফলে গেরিলাযুদ্ধের প্রাণবন্ত বিকাশ ও টিকে থাকা আজ প্রায় অসম্ভব। এই ধরনের আরও একাধিক কারণ রয়েছে যা আমাদের সাবেক রণনীতি ও রণকৌশল থেকে সরে আসতে বিবস করেছে, বেড়েছে জঙ্গল পাহাড় নির্ভরতা।
কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে, তাকে বুঝে নিয়েই বিপ্লবের পথ খুঁজে বার করতে হবে বিপ্লবীদের। অথচ আমাদের দেশের লিবনেখটরা সেই পেইনস্টেকিং কাজটা করতে প্রস্তুত নন। তাঁরা শর্টকাট বেছে নিয়েছেন। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিনের লেখাগুলোকে তাঁদের রাজনৈতিক মর্মবস্তু থেকে পৃথক করে যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও পার্লামেন্টারি বামনত্বের দিকে নিয়ে যেতেই তাঁদের যতো উদ্যোগ। তারা এঙ্গেলসের নাম নিয়ে ভোটে লড়ে আসন জেতাকে ব্যাখ্যা করছেন, কিন্তু তাঁর লেখা পূর্বোল্লিখিত চিঠি দুটোর কথা একবারও বলছেন না। তারা মুখে বলছেন নির্বাচনকে প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে চলছেন বিপরীত পথে। নির্বাচনী জয়লাভ নয়, নির্বাচনী মোহভঙ্গ ঘটিয়ে বিপ্লবের পথে অগ্রসর হওয়াই যে কম্যুনিস্টদের মূল নীতি, এটাই তারা ভুলিয়ে দিতে চাইছেন। তারা ভুলিয়ে দিতে চাইছণ, প্রকৃত গণবিপ্লব না হলে অনেক ‘ভালমানুষ’কে নিয়ে মন্ত্রীসভা গড়লেও সাধারণ মানুষের কোনও উন্নতি হয় না, কেননা আমলাতন্ত্র নানান দৃশ্যমান ও অদৃশ্য গ্রন্থির সাহায্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শোষকদের সাথে যুক্ত থাকে।
মহান এঙ্গেলসের এই দ্বিশততম জন্মদিবসে তাই আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে সমস্ত বিপ্লবভীরুতার বিরুদ্ধে ব্যারিকেড গড়ে তোলার। মার্কস ও এঙ্গেলসের শিক্ষায়, লেনিন ও স্তালিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার বিপ্লবীরা সংগঠিত করেছিলেন অক্টোবর বিপ্লব, চেয়ারম্যান মাওয়ের চিনে হয়েছিল মহান নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। আমরাও লড়াই করেছি তেলেঙ্গানায়, কাকদ্বীপে, গাড়ো পাহাড়ে, নকশালবাড়ি ও ভোজপুরে। তাই লিবনেখট ও তাঁর দেশীয় দালালরা ইতিহাসের আস্তাকুরে নিক্ষিপ্ত হবেই, জয়ী হবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ আর তাঁদের জীবন জয়ের নিশানা ওড়ানো লড়াই।

Facebook Comments

Leave a Reply