সম্পাদকীয়

fail

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা কেন এই সময়ে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলসকে স্মরণ করবো? কেন এঙ্গেলস আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক? মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠায় এঙ্গেলসের অবদানটাই বা ঠিক কোথায়? ভারতীয় সমাজব্যবস্থা সহ এশিয়ায় উপনিবেশবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ঘটা অভ্যুত্থানগুলি প্রসঙ্গে তিনি সেই সময় কোন ধরনের সমর্থন জুগিয়ে ছিলেন? ভাষাতত্ত্ব প্রসঙ্গে, নারীবাদী দর্শনের প্রণেতা হিসেবে এঙ্গেলস ঠিক কি অবদান রেখেছেন? বাস্তুতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রসঙ্গে আলোকপাত করে পরিবেশবাদী আন্দোলনের অভিমুখকে তিনি কোন বস্তুবাদী দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যায় হাজির করেছিলেন? তাঁর সমকালীন বিপ্লবী সংগ্রামে, একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে তিনি রণনীতি ও রণকৌশল সম্পর্কে কোন উদাহরণ আমাদের সামনে রেখেছেন?
এমন নানা প্রশ্নকে মাথায় নিয়ে এঙ্গেলসকে আমরা যত খুঁটিয়ে পড়বো, তাঁর প্রতিভার বহুমুখী পরিচয় তত আমরা দেখতে পাবো। কার্ল মার্কসের সুহৃদ বন্ধু হিসেবে তিনি যে কি করতে পারেন, তাও আমরা জানতে পারবো। আজকের মহামারী পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সেই দ্বি-শতবর্ষের স্মরণভাষ্যে এঙ্গেলস আমাদের কাছে হয়ে ওঠেন এক সর্বত্যাগী চরিত্রের লড়াকু সৈনিক, যিনি রাজনৈতিক পরিচালকের ভূমিকায় একজন কমিউনিস্ট নেতা, আবার কর্ম-পরিকল্পনায় তিনিই হয়ে ওঠেন একজন শিল্পী।
ভাষার জ্ঞানে, কমিউনিস্ট চেতনায় তিনি শব্দের ব্যবহারকে হাতিয়ার করেন এবং সেই আঙ্গিকেই একটা জাতির ইতিহাস, উৎপত্তি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক অধিকার সমেত সকল খুঁটিনাটি বিষয়কে বুঝতে চান। ইতিহাসবেত্তা সাংবাদিক সত্তায় তিনি ধাক্কা দিয়ে বোঝাতে চান যে ব্যবহৃত শব্দবন্ধ তার অর্থবোধক উপলব্ধিতে হাস্যরসের স্বাদ বহন করতে পারে, বলা কথায় রসবোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা নিছক আনন্দ দিতে বলা কোন কথা নয়। সেই বক্তব্যের মধ্যে মিশে থাকে রূপক, যা শ্রোতার অনুভূতিতে হাতুরির আঘাত হানে। বক্তব্য, বয়ান হয়ে ওঠে।
তিনি চান রাজনৈতিক বয়ান অনুধাবনে মজুর তার অনুভূতিতে ঘটনার পার্থিব-সংযোগ কাঠামোকে সেই ভাবেই গড়ে তুলতে সফল হবেন যাতে সামাজিক পরিসরে ঘটা দলীয় কর্মকান্ডে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, শোষণমূলক আর্থিক বুনিয়াদ পরিবর্তনের পক্ষেই জ্ঞানচর্চাকে প্রতিনিয়ত হাজির করে। এখানেই তিনি মার্কসের সঙ্গে প্র্যাক্সিসের দর্শনের একজন রূপকার হয়ে ওঠেন। মানব সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ারটা তাঁরাই প্রথম বলে দেন।
এই সংযোগ অনুধাবনেই যান্ত্রিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যার বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতাকে বুঝতে পারি। প্রলেতারীয় মতাদর্শে সম্পৃক্ত পার্টির আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতির প্রতি অটল থেকে তখনই আমরা জাতীয় সীমাবদ্ধতাকে কাটাতে সক্ষম হই। বুঝতে পারি যে পুরুষতন্ত্র হল ধনতন্ত্রের অনিবার্য পরিণাম এবং তারা একে অপরের পরিপূরক। সেই দার্শনিক জ্ঞানেই মেহনতি মানুষকে খুঁজে পাই, যার কিছু না থেকেও শুধু শ্রমদাতার গুণে সে হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা সকল সম্পদের মধ্যে সেরা।
মেকি গণতন্ত্রের নামে শ্রম-শোষণের সেই শেকল সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে ভাঙতে হয়। নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান স্পষ্ট করতে হয়। শ্রমিক-কৃষক ঐক্যে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগ্রামে কমিউনিস্ট দূরদর্শিতা আন্দোলনের বহর বাড়িয়ে দেয়। যৌথ প্রতিরোধ, দুনিয়ার নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ঐক্যে মুক্তির পথ হয়।
ব্যারিকেডের লড়াই জারি রাখাটা তখন আশু প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কৃষি, বিদ্যুৎ, শিল্প, শিক্ষা সহ সকল জনবিরোধী এবং কর্পোরেট স্বার্থবাহী আইন ও বিল বাতিলের দাবিতে অদম্য তেজে লড়াই জারি থাকে। নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে এঙ্গেলস প্রাসঙ্গিক হন।

অপরজন

ডিসেম্বর, ২০২০

Facebook Comments

Leave a Reply