এঙ্গেলস! কোন এঙ্গেলস? – সমাজতাত্ত্বিক চোখে ২০০ বছরকে ফিরে দেখা : ড. কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

fail

এক

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, ১৮২০ সালের ২৮ নভেম্বর জার্মান-শিল্পপতি-পরিবারে জন্ম নেওয়া দার্শনিক ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসকে এই প্রবন্ধ ফিরে দেখতে চায়। সেই দেখা কতভাবে হতে পারে তারই সমাজতাত্ত্বিক পারে-আখ্যান হিসেবে পাঠক এই প্রবন্ধটিকে বুঝে নিতে পারেন।
এঙ্গেলস প্রসঙ্গে প্রাথমিক ধারণা গঠনের লক্ষ্যেই এই প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। তাই হয়তো এখানে বলা কথাগুলো বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে কার্ল মার্কসের একজন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে, লেখক পরিচিতিতে, মার্কসবাদের ভাষ্যকার হয়ে, একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে, অথবা প্রকৃতির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ভাববাদ বিরোধী একজন রচনাকার পরিচয়েও পাঠক তার এঙ্গেলসকে এই প্রবন্ধে ফিরে পেতে পারেন।
এখানেই শেষ নয়। শ্রম শোষণ যন্ত্রের চালিকা শক্তির অর্থনৈতিক সমীকরণটিকে, এবং তার বস্তুবাদী ভিতটিকে এখানে পাঠক সচেতনে দেখে নিতে পারেন। সেই সমীকরণের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত এঙ্গেলসের ধারণাগুলিকে এই প্রবন্ধ কোন আঙ্গিকে ব্যবহার করেছে, তাতেও পাঠক একবার চোখ বোলাতে পারেন। মার্কসবাদী ধারণায় ডুব দেওয়ার সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাঠক এখানে বুঝে নিতে পারবেন বিশ্বপরিসরের অতিমারিকালের রাজনীতিকে। সেই ফাঁকেই দেখা হয়ে যাবে এঙ্গেলসের বর্ণময় জীবন। সেখানে আমাদের দেশের কথা থাকবে। সেই কথায় সমাজ গবেষক এঙ্গেলস ভারতীয় সমাজ ও তার রাজনৈতিক শাসন প্রসঙ্গে ঠিক কোন বার্তা দিয়েছিলেন তা সচেতন পাঠক বুঝে নিতে পারবেন। অর্বাচীন পাঠকের দলে থাকারাও বিদেশী কমিউনিস্ট পরিচিতিতে চিহ্নিত এঙ্গেলসকে আড়চোখে পাঠ করে নিতে পারবেন। সেই পাঠে, সমালোচনায় উঠে আসবেন এঙ্গেলস, আজ ২০০ বছর পরে।
এই প্রবন্ধ সকল ধরনের পাঠকের কথা ভেবেই লেখা। যেভাবে দেখবেন, সেভাবেই পাঠক এঙ্গেলসকে খুঁজে পাবেন। তবে এঙ্গেলস গোল-আলু নন, বহুমুখী সক্রিয়তায় শাণিত কমিউনিস্ট চিন্তক। এই দীর্ঘ প্রবন্ধ এঙ্গেলসের সেই পরিচয়ের সঙ্গে অজানা এঙ্গেলসকেও পাঠকের সামনে হাজির করতে চাইছে। এতে সমাজ গবেষণায় এঙ্গেলস যেসব মূল্যবান ধারণা জুগিয়েছেন, বিজ্ঞান চর্চার ভবিষ্যৎ-মুখ খুলে দিতে সেগুলো কীভাবে সফল হয়, তাও একবার দেখে নেওয়া সম্ভব হয়।
বিশেষ অভিমতে পৌঁছানোর আগে পাঠকের মনে এটা যেন এক সলতে পাঁকানোর কাজ। এই প্রবন্ধ সেই কাজটাই করতে চাইছে। প্রাথমিক ধারণা পাঠে এঙ্গেলসকে বুঝে নিতে পারলেই সেই কাজ সফল হয়েছে বলে ধরে নিতে হয়। সেই সফলতার লক্ষ্যে প্রথমেই চলে আসে এঙ্গেলসের জীবনীর এক সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ, এবং দ্বিতীয় অংশ হয় এঙ্গেলসকে নানারূপে সন্মুখে পাওয়ার এক প্রাথমিক সমাজতাত্ত্বিক বর্ণনা।

দুই

এই কাজের প্রথম আখ্যান তাই সেই গল্প কথা দিয়ে শুরু হয়, যেখানে দেখা যায় ১৮২০ সালের ২৮ নভেম্বর প্রাশিয়ার বার্মেন-এর (বর্তমানে হ্বু‍পারটাল বা Wuppertal নামে পরিচিত) এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত শিল্পপতি পরিবারে এঙ্গেলসের জন্ম হয়। তাঁদের কাপড়ের কল ছিল। তিনি ছিলেন বাড়ির বড় ছেলে। শিশুকাল থেকেই কারখানার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। পারিবারিক জীবন-অভিজ্ঞতায় তৈরি হওয়া সেই ছবির বাস্তব পরিসরটা তাঁর শিশুমনে করুণ প্রকৃতিরই ছিল।
প্রাথমিক সামাজিকীকরণের এই প্রেক্ষিতের পাশাপাশি সেই সময় জার্মানির রাজনীতিতে উদারবাদীদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রাশিয়ার স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়ে আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে পরিবারের লোকজনকে দেখতে পাওয়া, এঙ্গেলসের বাল্যজীবনকে প্রভাবিত করে। ১৮৩০এ ফ্রান্সে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়, তা ছিল ১৭৮৯র ফরাসি বিপ্লবেরই প্রতিচ্ছবি। তবে অতটা উজ্জ্বল নয়। এই সময় (১৮৩৪-৩৭) এঙ্গেলস এল্বারফেল্ড হাইস্কুলের ছাত্র। এই পর্বে ফ্রান্স সহ জার্মানসমাজে দারিদ্র অবসানের পক্ষে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি হয়ে ওঠে। সেই অভিমুখ সম্পর্কিত চিন্তাধারার অস্পষ্ট চালচিত্রে এঙ্গেলসের শিশুমন গড়ে ওঠে।
সেই ভাবনা কিশোর এঙ্গেলসকে কবিতা লেখায় আগ্রহী করে। ১৮৩৮, তিনি তখন পড়ে ফেলেছেন হেগেলের দ্বন্দ্ব তত্ত্ব। তিনি তখন থাকেন ব্রেমেনে। সাংবাদিক হিসেবেও পত্রপত্রিকায় লিখছেন। শিল্পায়নের সামাজিক বিপদ সম্পর্কে সেই সময় তাঁর একটি লেখা বেশ হৈচৈ ফেলে দেয়। ১৮৪১-এ তিনি প্রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হন। সেই কর্মযোগের সুবাদেই ব্রেমেন ছেড়ে বার্লিন শহরে তাঁর আসা। এই পর্বে তিনি স্পিনোজাপন্থী বিশিষ্ট ইহুদিরাষ্ট্রবাদী দার্শনিক মোজেসের অনুগামী হয়ে উঠেন। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আলোচনা সভায় তাঁর যাতায়াত শুরু হয়। ফ্যাক্টরি-শ্রমিকদের দুর্দশা প্রসঙ্গে পরের বছর শীতের শেষে রেইনখে জেইতুঁ পত্রিকায় তিনি বেনামে একটি প্রতিবেদন লেখেন। সেই প্রতিবেদন কমিউনিস্ট চেতনার প্রকাশ।[১] পত্রিকাটির সম্পাদক তখনও কার্ল মার্কস নন। শ্রমিক শ্রেণীর জীবনে প্রচলিত বৈষম্য অবসানের পক্ষে দাঁড়ানো এই ২১ বছর বয়সী এঙ্গেলসকে তখন মার্কস চিনতেন না।
তরুণ এঙ্গেলসের এমন শ্রমিকদরদী ধারণা তাঁর পরিবারের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরের বছর তাঁর পরিবার তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়। ম্যানচেস্টারে তাঁদের সুতো কারখানা পরিচালনার কাজে তিনি সেখানে যুক্ত হন। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকের দৈন্য অবস্থা তাঁকে নাড়া দেয়। শিল্প বিপ্লব যে এক শ্রেণীর মানুষের জীবন যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে তুলছে তা তিনি নিশ্চিত হন। বসবাসের জন্য নির্ধারিত বস্তিগুলোয় শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান, অথবা শিল্পে শিশু শ্রমিকের যথেচ্ছ ব্যবহার সম্পর্কে নির্মম কথাগুলো তিনি তুলে ধরে বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখেন। এই সব লেখাগুলো ছাপার জন্য প্যারিসে যেমন পাঠানো হয়, তেমনি কলোনে তখন প্রতিষ্ঠিত রেইনখে জেইতুঁ পত্রিকা দপ্তরেও তা পাঠানো হয়। প্রসঙ্গত, ১৮৪২র অক্টোবরে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে মার্কস পত্রিকাটির দপ্তর বন থেকে কলোনে সরিয়ে আনেন।
এই পত্রিকার দপ্তরেই নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে ১৮৪২র নভেম্বরের শেষাশেষি তাঁর সঙ্গে মার্কসের পরিচয় ঘটে। মার্কস তাঁকে প্রথম দিকে মোজেসপন্থী ইয়ং হেগেলবাদী হিসেবেই ভাবতেন। কিন্তু যোগাযোগ যত বেড়েছে, সেই ধারণা সরে সরে গ্যাছে। তাঁরা একে অপরের অকৃত্রিম সহযোগীর ভূমিকায় পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। সেই বন্ধুত্ব আমৃত্যু অটুট ছিল। এমনকি ১৮৮৩-তে মার্কসের মৃত্যুর পরও তিনি, তাঁদের শেষ না হওয়া কাজগুলোকে দায়িত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন।[২] যাইহোক সেই সব কথা ধীরে ধীরে উঠে আসবে। এখানে যেটা বলার, তা হল, এঙ্গেলস তাঁর লেখাগুলো নিয়ে ১৮৪৩র প্রথম থেকেই ঐ রাইন-সংক্রান্ত সংবাদপত্রের দপ্তরে এসে ধারাবাহিকভাবে মার্কসের সঙ্গে আলোচনা করতেন।
এই সময়ের চিঠিপত্র এবং কাজের ধারাকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে এঙ্গেলস এই পর্বে জার্মান দর্শনে প্রচলিত বহু তত্ত্ব-ধারার তীব্র সমালোচনা করছেন। সেই সম্পর্কে তিনি তাঁর নিজের যুক্তি মার্কসের কাছে বলছেন। মোজেস হেসকে ‘গাধা’ এবং একজন ‘জার্মান বুর্জোয়া’ বলছেন।[৩] হেগেলের ভাববাদী দর্শনের সঙ্গে সাঁ-সিমোঁ, রবার্ট ওয়েন, অথবা চার্লস ফুরিঁয়ের সমাজতান্ত্রিক কল্পবাদকে তুলনা করছেন। ঈশ্বর বেন্থামের কাছে ব্যক্তির ব্যবহারিক কর্মের অতীত, তার ঊর্ধ্বে, এবং তা যে জার্মান ভাববাদের উৎস হয়েই কাজ করে, এঙ্গেলস সেই কথা, সেই সময় জোরের সঙ্গেই স্বীকার করেন। সেই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণও তিনি রাখেন।
সেই যৌক্তিক পথে শুধু ফয়েরবাখ নন, স্টির্ণেরও যে এক বস্তুবাদী জার্মান দর্শনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন তা এঙ্গেলস মার্কসকে জানান। ম্যাক্স স্টির্ণের তাঁর জার্মান ভাষায় লেখা দ্যা ইগো এন্ড ইটস ওন রচনায় ধর্মের অহংনির্ভরতাকে স্বীকার করছেন।[৪] ১৮৪৪ সালে স্টির্ণের তাঁর এই কাজেও ফয়েরবাখের মতোই সংবেদনগত বিষয়কে চিন্তাগত বিষয় থেকে আলাদা করে দেখেছেন। ফয়েরবাখের তুলনায় স্টির্ণের এগিয়ে থাকেন তাঁর ব্যবহারিক-পরীক্ষামূলক ক্রিয়ার তাৎপর্য বোঝার চেষ্টায়। যেটা ফয়েরবাখ করেননি। সেই ব্যবহারিক কর্মকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনসাধক হাতিয়ার হিসেবে এঙ্গেলস তাঁর নিজস্ব তত্ত্বগত ব্যাখ্যায় হাজির করেন। তিনি সেটা ১৮৪৩-এর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে লিখে ফেলেন। ১৮৪৪ সালে সেই রচনা আউটলাইন্স অব অ্যা ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি শিরোনামে প্রকাশিত হয়।[৫]
ব্যক্তি মালিকানানির্ভর পুঁজিবাদী উৎপাদনে শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতা, হতদরিদ্রকরণ, শোষণ প্রসঙ্গে এঙ্গেলসের স্বচ্ছ ধারণা, তত্ত্বগত দিক থেকে মার্কসের ধারণা সংলগ্ন হয়। তাঁদের বন্ধুত্ব নিবিড় হতে থাকে। একে অপরের পরিপূরক হয়ে রচনায় শুরু হয় হেগেলের সমালোচনা। সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ধারণাকে সামনে রেখে ১৮৪৪-এ কার্ল মার্কস সম্পাদিত ফ্রান্স-জার্মানি ইতিবৃত্ত সম্পর্কিত পত্রিকা ফ্রাঙ্কো-জার্মান অ্যানাল্স-এ তিনি তাঁর মতামত প্রকাশ করেন। তার আগের বছরের মার্চেই অবশ্য রেইনখে জেইতুঁ পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণার ফলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গ্যাছে।
এরই মাঝে ১৮৪৩র শরৎকালে মার্কস প্যারিসে আসেন। ডাচ-ফরাসী ইতিবৃত্ত নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৮৪৪র সেপ্টেম্বর, এঙ্গেলস সেখানে আসেন এবং বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক প্রবণতাকে আবেদনে স্পষ্ট করেন। এই সংযোগে প্রুধোঁ সহ সকল ভাববাদী ধারণার বিকল্প হিসেবে বস্তুবাদী দর্শন নির্মাণের কাজে পরিকল্পিত যৌথদায়িত্ব তাঁরা কাঁধে তুলে নেন। তারই ফলশ্রুতিতে ১৮৪৪র শেষ দিকে সম্পূর্ণ হয় দুটি কাজ। দুটিই ১৮৪৫-এ প্রকাশিত হয়। প্রথমটি মার্কসের সঙ্গে যৌথভাবে করা দ্যা হোলি ফ্যামিলির কাজ, যেখানে হেগেলীয় ভাব ছেড়ে সরাসরি বিপ্লবের কথা বলা হয়। বৈপ্লবিক বস্তুবাদী সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিকোণে সমালোচনায় দীর্ণ করা হয় দার্শনিক বাউয়ের ধারণাকে, এবং বাউয়ের অনুগামীদের ব্যঙ্গ করে বলা হয় ‘পবিত্র পরিবার’। দ্বিতীয়টিতে এঙ্গেলস দ্যা কন্ডিশন অব দ্যা ওয়ারকিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড শিরোনামে নিজের পুরনো লেখাগুলোকে আরও গুছিয়ে ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা বর্ণনায় প্রকাশ করেন। শিল্প বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে বেড়ে চলা শ্রমিকের অবস্থা কেন এতো খারাপ হচ্ছে তার মৌলিক প্রশ্নগুলোকে এখানে তোলা হয়। দাবি করা হয় যে সমাজতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হবে যখন তা হয়ে উঠবে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্য।
পুঁজিবাদের দানবীয় রূপ প্রকাশে ১৮৪৪-৪৫ সালে ছেপে বের হওয়া এঙ্গেলসের ঐ দুই নিজস্ব রচনার জুড়ি মেলা ভার। এঙ্গেলস এই কাজের মধ্যে দিয়ে দ্বন্দ্বের সেই বৈজ্ঞানিক নির্মাণটা করেন, যাকে আজকের তাত্ত্বিকগণ মার্কসবাদের জন্মক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৮৪৪-৪৫ সাল হল বস্তুবাদী সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যখন মানবীয় সারমর্মের মূর্তরূপের বিজ্ঞানসিদ্ধ ভিত্তি হয়ে শুধু জগতের ব্যাখ্যা নয়, সেটাকে যে পরিবর্তন করা যায় তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মার্কস-এঙ্গেলস জুটি পাঠকের সামনে হাজির করেছেন।
১৮৪৫-এ প্রাশিয়ান সরকারের দাবিতে মার্কসকে ‘বিপজ্জনক বিপ্লবী’ চিহ্নিত করে প্যারিস থেকে বহিষ্কার করা হয়। অগত্যা সেই জানুয়ারিতেই তিনি ও মার্কস বেলজিয়াম সফর করেন। সেখানকার বৈপ্লবিক প্রেক্ষিত পর্যবেক্ষণ করেন। ঐ বছরের জুলাই-এ অবশ্য মার্কসের পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসেন। এঙ্গেলসের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সাহায্য পরিবার প্রতিপালনে মার্কসের শ্বাসরুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশেষ সহায়তা করে।
১৮৪৬ সালে তিনি ও মার্কস বেলজিয়ামের এই ব্রাসেল্স-এ কমিউনিস্ট করস্পনডেন্স কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য হল ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে সংগঠিত করার কাজে গুপ্ত প্রচারের কাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। ইউরোপে দ্রুত মার্কসের চিন্তাধারাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের এই উদ্যোগ সফল হয়। ১৮৪৭র বসন্তে বিপ্লবী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘কমিউনিস্ট লিগ’ গঠিত হয়। সেই বছরই লিগের সদস্যদের কাছে সাম্যবাদের মূলনীতি হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের স্বশাসনের কথা বলে এঙ্গেলস লেখেন দ্যা ড্রাফট অফ অ্যা কমিউনিস্ট কনফেশন অফ ফেথ।
১৮৪৭র নভেম্বরে এঙ্গেলস ইংল্যান্ডে আসেন এবং কমিউনিস্ট লিগের কেন্দ্রীয় কমিটির সেই দ্বিতীয় সভায় বুর্জোয়া সমাজের পতন, সর্বহারার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, শ্রেণী বৈর সমাজের অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানাহীন, উদ্বৃত্ত শ্রমশোষণহীন, শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ করার কাজে যুক্ত হন। ওদিকে তখন সর্বহারার সমাজতন্ত্র প্রসঙ্গে প্রুধোঁর দারিদ্রের দর্শন সম্পর্কিত মতকে নস্যাৎ করে মার্কসের গ্রন্থ, দর্শনের দারিদ্র প্রকাশিত হয়েছে। ফলে শুরু হয় সাম্যবাদের দলিল রচনার কাজ। এঙ্গেলস ‘সাম্যবাদের নীতি’ বা প্রিন্সিপিলস অব কমিউনিজম শিরোনামে এই ধারণার খসড়া রচনা করেন। মার্কস তার কিছুটা সংশোধনে ও সংযোজনে মাত্র ৬-৭ সপ্তাহের চেষ্টায় সর্বহারার সংগ্রামী দলিল হিসাবে গ্রন্থাকারে ১৮৪৮র ২১ ফেব্রুয়ারীতে জার্মান ভাষায় কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার প্রকাশ করেন। ১৮৪৬র এপ্রিল-মে মাসে তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ হওয়া এ ক্রিটিক অব দ্যা জার্মান আইডিওলজি গ্রন্থটির অপ্রকাশিত থেকে যাওয়া দুঃখকে ভুলিয়ে দেয় এই ইস্তাহার-এর চাহিদা। এই ইস্তাহারের সমাজদর্শন স্বীকার করে, ‘এ যাবৎকাল বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাস হল শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’। এই ব্যাখ্যায় বিজ্ঞান ছিল ঐতিহাসিক দিক থেকে বেগবান এক বৈপ্লবিক শক্তি এবং তার উৎস ছিল সর্বহারার সচেতন জোটের অভ্যন্তরে।
১৮৪৮ সালে ফ্রান্সে শুরু হয়ে পরে পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশেও যে বিপ্লবের ধারা ছড়িয়ে পড়ে তার পরিণতিতে মার্কস ও এঙ্গেলস জার্মানিতে ফেরেন। প্রাশিয়ার রাইন প্রদেশের বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক চেষ্টার পক্ষে ঐ রাইন-সংক্রান্ত সংবাদপত্রটিকে আবার নতুন করে কলোন থেকে নেউ রেইনখে জেইতুঁ নামে প্রকাশ করতে শুরু করেন।[৬] মার্কস যেহেতু আগেই প্রাশিয়ান নাগরিকত্ব হারিয়েছিলেন, তাই তাঁকে তখন নির্বাসিত করা হয়। এঙ্গেলস সশস্ত্র গণবিদ্রোহে মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। তিনটি সংঘর্ষে তিনি অংশ নেন। বিদ্রোহীদের পরাজয়ের পর সুইজারল্যান্ড হয়ে তিনি চলে আসেন লন্ডনে। তবে কিছু দিনের মধ্যেই লন্ডন ছেড়ে পাকাপাকিভাবে তিনি চলে যান ম্যানচেস্টারে।[৭]
১৮৭০ সাল পর্যন্ত এঙ্গেলস ম্যানচেস্টারেই থাকতেন, আর মার্কস থাকতেন লন্ডনে। এতে তাঁদের পারস্পরিক সংযোগে কোনো ভাটা পড়েনি। পত্রালাপের বিষয়টিতে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়। ১৮৬৪র সেপ্টেম্বর ২৮, লন্ডনে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষকে এক করে মার্কস যে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ গঠন করেন তা ছিল সর্বহারার প্রথম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। প্যারিস, ব্রাসেলস্ এবং লন্ডনের শ্রমিক সংগঠনগুলোর যৌথ কাজকর্ম চালানোর এই কাজে এঙ্গেলস ছিলেন ম্যানচেস্টারে থাকা সঙ্গী। ১৮৭০ সালে তিনি লন্ডনে ফেরেন।[৮]
মার্কসের মেটল্যান্ড পার্ক রোডের বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথের দূরত্বে এঙ্গেলস থাকতে শুরু করেন। লন্ডনের সেই রিজেন্টস পার্ক রোডের বাড়িতে লিজি, এঙ্গেলস ছাড়াও অনেকে থাকতেন। এঙ্গেলস তখন মার্কসের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মুখোমুখি যোগাযোগে রয়েছেন। ১৮৮৩র ১৪ মার্চে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁদের ছিল কর্মচঞ্চল যৌথজীবন। সেই কাজের পরিণতিতেই বামপন্থী, সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট, নৈরাজ্যবাদী এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে এক করা সম্ভব হয়েছিল। খন্ডিত হয়েছিল মাৎসিনি, প্রুধোঁ, বাকুনিন প্রমুখের অ-প্রলেতারীয় সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণী ধারা। ত্যাজ্য হয়েছিল ইংল্যান্ডের উদারনৈতিক ট্রেড-ইউনিয়নবাদ এবং জার্মানির লাসালপন্থীদের ভাঁড়ামি।
সম্ভব হয়েছিল পুঁজির মতো রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্র রচনার কাজ। আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেসে গ্রন্থটিকে ‘শ্রমিক শ্রেণীর বাইবেল’ বলা হয়েছে। এরপর ১৮৭১র ১৮ মার্চের প্যারিস অভ্যুত্থানের পর, এবং ২৮ মে সেই পারি কমিউনের পরাজয়ের শেষে তাঁদের নাম সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে পড়ে। দ্বান্দ্বিক গতির ধারায় অগ্রসরমান সামাজিক ঘটনাকে পদার্থবিজ্ঞানের ধারায় তখন বুঝে নিতে চান এঙ্গেলস। তিনি খোঁজেন জীবজগতের নৈতিকতা এবং নিয়মবিধির মধ্যে থাকা সাম্য ও শাশ্বত সত্যকে, প্রাকৃতিক দর্শনকে। বিজ্ঞান সম্পর্কে ড্যুরিং সাহেবের দৃষ্টবাদী দর্শনের সরাসরি বিরোধিতা করে এঙ্গেলস ১৮৭৮র জুনে অ্যান্টি-ড্যুরিং প্রকাশ করেন। ১৮৭৭র গোড়া থেকেই ভোরহাতস্ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে যে প্রবন্ধমালা তিনি প্রকাশ করেন তারই সামগ্রিক রূপ হয়ে, এবং বিজ্ঞানের ধারায় হের ইউজেন ড্যুরিং-এর বিকল্প আখ্যান হয়ে অ্যান্টি-ড্যুরিং গ্রন্থটি জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়।
সমাজ গঠনে কমিউনিস্ট সংগঠনের ভূমিকা, শ্রমিক সংগঠনের লক্ষ্য, শোষণ, দ্বন্দ্ব, বিপ্লব, সমাজতন্ত্র, মতাদর্শ, ইত্যাদি ধারণার বস্তুবাদী দর্শন প্রতিষ্ঠায় এঙ্গেলসের অবদান অনস্বীকার্য। বস্তুত, এঙ্গেলস তাঁর দার্শনিক চিন্তা প্রকাশে ইমান্যুয়েল কান্ট, ল্যুদ্ভিগ ফয়েরবাখ, অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো, জ্যাঁ-জ্যাঁক রুশো, চার্লস ফুরিয়েঁ, ল্যুইস হেনরি মর্গ্যান, প্রমুখের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর বাস্তববাদী দর্শন রোজা ল্যুক্সেমবার্গ, ভ্লাদিমির ইলিচ (ইলিয়ানভ) লেনিন, আন্তনিও গ্রামশি এবং পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কফুটের সমালোচনামূলক ও নারীবাদী চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। লিঙ্গবৈষম্য বিষয়টি যে জৈবিক নয়, তা তিনিই প্রথম পিতৃতন্ত্রের সমালোচনায় ব্যাখ্যা করেন এবং পুঁজিবাদী সমাজের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলির প্রসঙ্গে ১৮৮৪ সালে দ্যা অরিজিন অফ দ্যা ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড দ্যা স্টেট শীর্ষক বইটি তিনি প্রকাশ করেন।
১৮৮৩র ১৭ মার্চ কার্ল মার্কসের স্মরণ সভায় এঙ্গেলস বলেন, ‘জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম যেমন আবিষ্কার করেছেন ডারউইন, তেমনই মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানব-ইতিহাসের বিকাশের সূত্র।’ সেই সূত্র ধরেই বন্ধুর মৃত্যুর পর পুঁজি গ্রন্থের খসড়া গুছিয়ে ১৮৮৫ সালে দ্বিতীয় এবং ১৮৯৪ সালে তৃতীয় খন্ড প্রকাশে বন্ধুর স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলেন।[৯] সেই কাজেও তিনি আগের মতোই নিজেকে রেখেছেন মার্কসের পিছনে, মার্কসের ‘দ্বিতীয় সত্তা’র অবস্থানে। আর তাঁর কাছে নিজে হয়েছেন একটা ‘পুরো সভার শ্রোতৃমণ্ডলীর সমতুল্য’ এক ‘পন্ডিত’ ও ‘মিষ্টি স্বভাবের ফ্রেড্’। এই মহান চিন্তাবিদ ৭৪ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে ১৮৯৫র ৫ আগষ্ট মারা যান। রাজনৈতিক সংগঠনের দর্শনে একজন কর্মী-বৈজ্ঞানিক হিসাবে এবং সর্বহারার মহাযোদ্ধা হয়ে এঙ্গেলস চিরস্মরণীয়।

তিন

এই স্মরণ পর্যায় পর্যন্ত চলা আলোচনায় আমরা অনেকভাবেই এঙ্গেলসকে পেলাম। একজন অকৃত্রিম শ্বাসদায়ী বন্ধু হিসেবে এঙ্গেলসকে দেখলাম। শ্রমিকদরদী বস্তুবাদী দর্শনের একজন তাত্ত্বিক হিসেবেও তাঁকে বুঝলাম। তবে শুধু একজন তাত্ত্বিক হিসেবে নন, সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া সহযোদ্ধার চরিত্রেও তাঁকে আমরা পেয়েছি। গণবিদ্রোহের একজন লড়াকু সেনার ভূমিকা পালনের বাইরে এঙ্গেলস হলেন বিপ্লবপন্থীদের একজন শিক্ষাগুরু। এখানেই শুরু হতে পারে আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় অংশ।[১০]
সেখানে বহুবিধ বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ী চরিত্রে এঙ্গেলসকে চিনলেও প্রথমেই যেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হল তাঁর জ্ঞানচর্চার ধারা। এই ধারায় তিনি প্রকৃতিবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানকে যাচাই করেই ধারণাকে সংজ্ঞায়িত করেন। তারপর সেই ধারণাকে দর্শনের চর্চা মারফত আরও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এটা হল তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার বড়ো পরিচয়। এই সচেতনতায় প্রখরতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তাঁর কাছের মানুষ রসায়নবিদ শার্লেমার, লরেঁ, গেরহার্ড, এবং আইনজ্ঞ স্যামুয়েল মূরের সঙ্গে অনেকের অবদানের কথাই বলা যায়।
গণিতের সূত্র মেনেই এঙ্গেলস জানতেন যে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস বা অবকলনের নিয়মে বৃহত্তরের ক্ষুদ্রক্ষেত্রিক পরিমাপে সরল আর বক্র রেখার মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকে না। সেই দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার কারণেই কেবলমাত্র কয়েকটি সাধারণ গুণের বিচারেই ঘটনার দ্বান্দ্বিক মর্মার্থ উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। বিজ্ঞানের সাধারণ জ্ঞানে আলো সরল রেখায় চলে, কিন্তু পদার্থবিদ্যার বিশেষ পর্যবেক্ষণে আলোকে বাঁকা পথেও চলতে দেখা যায়। নিবিড় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেই কেবল গতির অনন্য রূপ হিসেবে দ্বন্দ্বকে দেখা যায়। ‘দ্বন্দ্বের ক্রমাগত উদ্ভব ও দ্বন্দ্বের যুগপৎ নিষ্পত্তিই হচ্ছে প্রকৃত গতি।’ সেই নিয়মেই পদার্থ সৃষ্টির আনবিক ফর্মুলাতে দেখা যায় যে পরিমাণগত পরিবর্তনে সবসময়ই গুণগতভাবে ভিন্ন পদার্থ সৃষ্টি হয়। দ্বন্দ্বের এই গতিতত্ত্ব অধিবিদ্যা মানে না। গতির দুর্বোধ্যতায় অধিবিদ্যক তাই সর্বদাই দুর্বল।
অ্যান্টি-ড্যুরিং-এ হয়তো সেই দ্বান্দ্বিকতার নিয়ম মেনেই তিনি লেখেন যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যদি শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয়, তাতেও তিনি আশ্চর্য হবেন না। এটা তাঁকে মানতেই হয়। না হলে যে তাঁকেও ড্যুরিং সাহেবের মতো, অথবা তৃতীয় নেপোলিয়নের মতো, পরাজয় স্বীকার করে নিতে হয়। পরিণামবাদী, নির্ধারণবাদী দৃষ্টিকোণের যান্ত্রিকতায় জড়িয়ে পড়তে হয়। তাই তিনি অশ্বারোহী বাহিনীর রণকৌশলে ধোঁয়াটে হেগেলীয় ধারণাকে প্রয়োগ করার মুর্খামিকে সরিয়ে রেখে মুক্ত চিন্তায় দাবি করেন যে প্রতিদ্বন্দ্বী পুঁজিপতির আয় বলপ্রয়োগে কেড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু উৎপাদন করা যায় না। সম্পদ মালিকানার যদি কোনো বাস্তব তাৎপর্য না থাকে, কেবলমাত্র মুনাফার লোভেই আমরা যদি মনুষ্য-শক্তি শোষণের স্বার্থকে চালিত করি, তবে কীভাবে বিকল্পনির্মাণ সম্ভব? এখানেই তিনি বাস্তববাদী হয়ে বিকল্প সম্ভাবনায় বিপ্লবের পথটিই খুলে রাখতে সক্ষম হন। মার্কসের মতো এঙ্গেলসও হয়ে ওঠেন বিকল্পদ্রষ্টা।
এই বিকল্প সন্ধানী চরিত্রে বহুভাষিক এঙ্গেলস তাঁর চিন্তার বহুমাত্রিকতায় কখনও কখনও ভবিষ্যৎবক্তাও হয়ে উঠেন। যেমন ১৮৭০র ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া সেদানের যুদ্ধ শুরুর আগে লন্ডনে বসেই এঙ্গেলস লিখে দিয়েছিলেন যে এখানে জার্মানদের হাতে তৃতীয় নেপোলিয়ন সহ সমগ্র ফরাসী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ২ সেপ্টেম্বর সেটাই ঘটেছিল। এমন ভবিষ্যৎদ্বাণীগুলোকেই দেখে মার্কসের বড়ো মেয়ে জেনি তাঁকে ‘জেনারেল’ খেতাব দিয়েছিলেন।[১১]
এই জেনারেলের ভূমিকাতেই তিনি দেখিয়েছিলেন যে আধুনিক বুর্জোয়া পরিবার একগামীর একক হিসেবে যে আত্মীয়বিধিতে প্রকাশ পায় তার কাঠামোগত একটা ইতিহাস আছে। মর্গ্যান, বাখোফেন প্রমুখের আলোচনায়, সমালোচনায় তিনি গোত্র সম্পর্ক, কৌম কাঠামো এবং রাষ্ট্রের হাজিরাকে বিশ্লেষণ করেন। সেখানে দেখান যে পিতৃতন্ত্র এসেছে একটি প্রাথমিক শ্রমবিভাগ শুরুর মধ্যে দিয়ে। এই বিভাজনে নারী তার ঘরের তত্ত্বাবধানে, আর কৃষির মাধ্যমে উৎপাদিত খাদ্যের তত্ত্বাবধানে মজুরিহীন শ্রম দান করে। পুঁজিবাদ বিকাশের পথে উৎপাদনের জগৎ মুদ্রায়িত ব্যবস্থায় মজুরির সঙ্গে সংযুক্ত হয়, কিন্তু গৃহশ্রমে নারীর শ্রমদানের বিষয়টি মুদ্রায়িত হয় না। পুঁজিবাদের বিকাশ যত ঘটে সমাজে নারীর অবমূল্যায়িত হওয়ার পরিসরগুলোও তত স্ফীত হতে থাকে।
সুতরাং শ্রমবিভাজনের পন্থা নারী ও পুরুষের সম্পর্ক-রসায়নে পরিবর্তন আনে। লিঙ্গ সম্পর্কিত সামাজিক ধারণাগুলোকে পরিবর্তিত করার মধ্য দিয়ে তা প্রচলিত ক্ষমতা বিন্যাসের পরিবর্তন ঘটায়। পুঁজিবাদে শ্রেণী বৈষম্য ও যৌনপ্রাধান্য দূর করা সম্ভব নয়, কারণ পুঁজিবাদী শ্রমবিভাজন মজুরিমাত্রা নির্ধারণে শ্রমের সংরক্ষিত সেনাদের ব্যবহার করে। শ্রমের এই সংরক্ষিত সেনা ধারণায় এঙ্গেলস নারীকে অবদমিত করে রাখার যে পুঁজিবাদী কৌশলের সন্ধান দেন তা তাঁর আগে কেউ দেননি। শুধু ১৮৮৪র দ্যা অরিজিন অফ দ্যা ফ্যামিলি-তে নয়, তারও চল্লিশ বছর আগে লেখা দ্যা কন্ডিশন অব দ্যা ওয়ারকিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড বইটিতেও একাধিকবার তিনি সেই ‘র’ (রিজার্ভ আর্মি ওয়ার্কারস)-এর কথা বলেছেন, যাকে মার্কস ‘রাল’ (রিজার্ভ আর্মি লেবার) বলছেন।[১২]
এঙ্গেলসের ধারণায় লিঙ্গবৈষম্য কোন জৈবিক বিষয় নয়, এটাকে সমাজ জিইয়ে রাখে। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক, যিনি দেখালেন যে সমাজে লিঙ্গশোষণের পুঁজিবাদী রূপটি কীভাবে সক্রিয় থাকে এবং কীভাবে তার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। লিঙ্গবঞ্চনা যে শ্রেণীনির্ভর, অথবা এটি যে ব্যক্তিগত মালিকানানির্ভর সমাজের অনিবার্য ফলাফল, তাও তিনি প্রমাণ রাখলেন। এই ধারণা শুধুমাত্র আমূলপরিবর্তনকামী নারীবাদীদের প্রভাবিত করেনি, কিম্বা সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের তাত্ত্বিক উৎস হয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটার সংজ্ঞাগত ভিত্তি পরবর্তীতে সামাজিক নারীবাদের অনেক ধারায় তত্ত্বের মূল ভাবনায় পরিণত হয়েছে। তিনি হয়েছেন নারীবাদের প্রাণপুরুষ![১৩]
এঙ্গেলসের আর একটি পরিচয় সমাজবিজ্ঞানে, তথা সমাজতত্ত্বে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হল শ্রমের বিবর্তনী ধারায় ইতিহাসকে দেখে নেওয়ার অভ্যাস। সেই দৃষ্টিকোণে সংগঠনের সমাজতত্ত্বে এঙ্গেলসের গুরুত্ব প্রসঙ্গে আমি আমার সমাজতত্ত্বের ইতিবৃত্তঃ মানব সংগঠনের নানা প্রসঙ্গ গ্রন্থে বিশদে লিখেছি।[১৪] সেই কথার পুনরাবৃত্তে না গিয়েও বলা যায় যে এঙ্গেলস একাধারে ছিলেন সংশয়বাদী, অন্যদিকে ছিলেন প্রবল যুক্তিবাদী।
এঙ্গেলসের নমনীয় চরিত্রের মধ্যে থাকা খুঁতখুঁতে অভ্যাসের কথা মার্কস বহুজায়গায় লিখেছেন। যতক্ষণে তিনি বিষয়টাতে স্পষ্ট হতে না পারতেন, ততক্ষণ সেটাকে নিয়ে খণ্ডনের কাজে নিজেকে যুক্ত রাখতেন। এই সংশয়ী চেতনা তাঁর বাল্যকালেই জন্ম নেয়। খ্রিস্টান ধর্মের সেই অনুরক্তিতে অন দ্যা হিস্ট্রি অব আর্লি খ্রিস্টিয়ানিটি-তে তিনি যীশুর মসিহা হওয়ারও বর্ণনা দেন। কিন্তু ধর্মের সেই কল্যাণকামী ভাবনা ধাক্কা খায় যৌক্তিক একেশ্বরবাদী ধারণায়। যুক্তিগ্রাহ্য খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাসে এঙ্গেলস নিজেকে ‘অতি-প্রকৃতিবাদী’ও ঘোষণা করেন।
সংশয়বাদী কিশোর এঙ্গেলস পরিণত বয়সে একজন যুক্তিবাদী। বৈজ্ঞানিক। এখানে তিনি আর স্ট্রসপন্থী নন। তিনি তখন তাঁর যুক্তিবাদী ধারণায় সকল কিছুর উৎসের হাজিরায় প্রকৃতির পরই শ্রমকে বসান। প্রকৃতির এই মৌলিক উপস্থিতি তাঁকে ভাবায়। প্রকৃতির সেই বাস্তুতান্ত্রিক ভাবনায় অর্থনীতির চলককে বিচার করতে চাইলে তিনিই হয়ে ওঠেন সেই চিন্তাবিদ যিনি মার্কসের সহযোগী ভূমিকায় তাপগতীয় সূত্রের প্রচলক।[১৫] এঙ্গেলসের ধারণায় বাস্তুতান্ত্রিক অর্থনীতির যুক্তিবাদী রূপরেখা তাপগতি সম্পর্কিত প্রকল্পের মধ্যেই নিহিত থাকে। তাপগতি সম্পর্কিত প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির সমালোচনায় তিনি তার প্রমাণ রাখেন। আবিষ্কৃত এবং প্রচলিত তাপগতি সম্পর্কিত জনপ্রিয় তত্ত্বসূত্রগুলির তীব্র সমালোচনা এবং ক্লাসিয়াস, পোডোলিন্সস্কির তাত্ত্বিক প্রমাণ নস্যাৎ করে বাস্তুতান্ত্রিক অর্থনীতির ভিত্তি এঙ্গেলস সেই ১৮৬৭র সময়ই প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতায় তিনি সেই বাস্তুব্যবিদ্যার সমাজতান্ত্রিক সমাধান খোঁজেন।
বাস্তুসমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় এঙ্গেলস যে অবদান জুগিয়েছেন তা আজ বিশেষভাবে সমাদৃত। সমাজতান্ত্রিক বাস্তুসংস্থান এখন এক মতাদর্শ। নমি ক্লেইনের ব্যাখ্যায় সেই ধারা আজ বিশ্ববন্দিত। তবে পরিবেশবাদী চিন্তকের অবস্থানে এঙ্গেলস অবশ্যই তাঁর পরিচিতিতে একজন গবেষক। যেমনটি তিনি সন্তান প্রজননের চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুসন্ধানেও হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মার্কসের আপত্তি মেনে তাঁর সেই গবেষক হয়ে ওঠা আর হয়নি।[১৬] কিন্তু সেই দৃষ্টিকোণেই তিনি খুব সহজে মার্কসের একান্ত সঙ্গী হয়ে উপনিবেশবাদ বিরোধী চেতনায় একজন বিপ্লবী গবেষক হয়েছেন। পেশার পরিচয়ে তিনি অবশ্য তখন একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক।
১৮৫৭র ১৬ নভেম্বর থেকে ২৫ মে পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত হওয়া নিউ-ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন পত্রিকার ৫১৮৮, ৫২৫৩, ৫৩১২ এবং ৫৩৩৩ নং সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর রচনাগুলোয় তিনি ভারতের ব্রিটিশ শাসন এবং তার পাশবিকতার বিরুদ্ধে ঘটা অভ্যুত্থানের সমর্থনে কলম ধরেছেন। সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। নিজের ধারণায় স্পষ্ট থেকে লিখেছেন যে ব্রিটিশদের মতো এতো পাশবিকতা ইউরোপ বা আমেরিকার অন্য কোনো সেনাবাহিনীতে তিনি দেখেননি। লুটপাট, বলাৎকার, হত্যাকাণ্ড করার বৈধতা ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে যেন এখন এক মৌরসি পাট্টা। এটা তাদের ঔপনিবেশিক শাসন-রীতি।
তাঁর কথায়, ভারতবাসী তাদের অস্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে স্থাবর সম্পত্তির অধিকার প্রথম হারান এই ব্রিটিশ শাসনেই। এই প্রবল দমন, পীড়ন ও বিভাজনের বিরুদ্ধে ভারতবাসী গর্জে ওঠে। ১৮৫৭র ভারতীয় অভ্যুত্থান সেই কারণেই ঘটে। ব্রিটিশ প্রশাসন অস্ত্রের ঝলকানিতে দিল্লী অথবা লক্ষৌ দখলে সমর্থ হলেও সেই আগুন নেভেনি। আগামীতে প্রাচ্য জাতির গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াটা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

চার

জন্মের দ্বিশতবর্ষে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলসের দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্বিবেচনা আমরা করতেই পারি। এই গতিতেই তো মার্কসবাদ বেঁচে থাকে। আর সেটা করলে তবেই তো আমরা মার্কসের থেকে বয়সে বছর দুয়েকের ছোট এঙ্গেলসকে নতুন করে, তাঁর বহুমুখী প্রতিভায় ও পরিচিতিতে আজ দেখে নিতে পারি। ২১ শতাব্দীর সেই লেন্সে চোখ রাখলে বিগত দিনে খুঁজে পাওয়া তাঁর অজানা, অনাবিষ্কৃত রচনার সংশ্লেষে নতুন অনেক কথাই আজকের আলোচনায় উঠে আসতে পারে। এই কাজ মার্কসের থেকে এঙ্গেলসকে আলাদা না করেও করা যায়। নতুন তথ্যের সংযোগ এবং তার বিশ্লেষণ, আমাদের ধারণায় থাকা এঙ্গেলসকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আরও একবার বুঝে নিতে পারে।
এতে তৃতীয় বিশ্বের মার্কসবাদ, কিম্বা আলাদা করে ধরলে আফ্রিকায়, লাতিন আমেরিকায়, অথবা ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় মার্কসবাদ, তার প্রয়োগের অভিমুখে ঠিক কোন দিকটিকে নির্দেশ করছে তা আমরা নতুন করে দেখে নিতে পারি। আবার অন্য আঙ্গিকে দেখলে, পশ্চিম ইউরোপের মার্কসবাদী ধারণার, অথবা জাপানে প্রচলিত মার্কসীয়-অর্থনীতি সম্পর্কিত মতবাদেরও পুনর্পাঠ তাতে সম্ভব হয়। দেখে নেওয়া যায় পাশ্চাত্য মার্কসবাদের সঙ্গে সোভিয়েত মার্কসবাদের চর্চায় থাকা প্রায়োগিক দুর্বলতার দিকগুলিকে। নির্ধারণবাদী দুর্বলতার ছাঁচে ফেলে মার্কসবাদকে সমালোচনা করার প্রচলিত সুযোগগুলোকে এঙ্গেলস কীভাবে আগেই বন্ধ করে রেখেছেন, সেটাও তাতে স্পষ্ট হয়। খুঁজে পাওয়া যায় বিকৃতির পরিসরগুলোকে। শুধু তাই নয়, এই গভীর পর্যবেক্ষণে ২০০ বছরের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখা যায় যে উদ্বৃত্ত মূল্যকে এখন যুদ্ধ-শিল্পের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি গোগ্রাসে গিলছে। জেনারেল ফ্রেডের চিন্তাধারায় সম্পৃক্ত হলে তাই আগে থেকেই বুঝে নেওয়া যায় যে আমেরিকান মার্কসবাদের সমকালীন চর্চায় ট্রটস্কিপন্থীরা ঠিক কোন আলপথ ধরে সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে যেতে চাইছেন।

পাদটিকা এবং গ্রন্থসূত্র:

[১] এঙ্গেলস সেই সময় (১৮৪১) বার্লিনে ইয়ং হেগেলপন্থী আমূল পরিবর্তনকামীদের বিপ্লবী সংগঠন “দ্যা ফ্রি”-র সঙ্গে অতোপ্রোতভাবে যুক্ত। এই প্রসঙ্গে আরও আলোচনার জন্য দেখা যেতে পারে রবার্ট সি. ট্রাকার, (১৯৭৮)। দ্যা মার্কস-এঙ্গেলস রিডার (দ্বিতীয় সংস্করণ)। লন্ডনঃ ডাব্লু ডাব্লু নটর্ন এন্ড কোম্পানী। এই পর্বে এঙ্গেলস তাঁর সেই গোলন্দাজ বাহিনীর সেনা প্রশিক্ষণের তুলনায় সাংবাদিকতার প্রতি বেশী আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই আলোচনা প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে টেরেল ফস্টার কার্ভার (১৯৮১)। এঙ্গেলসঃ অ্যা ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন। অক্সফোর্ডঃ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

[২] এখানেও গোল বাঁধান আজকের বিশ্লেষকগণ। ২০০৯ সালে মেট্রোপলিটান বুকস, হেনরি হোল্ট এন্ড কোম্পানীর পক্ষে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত মার্কসেস জেনারেলঃ দ্যা রেভোল্যুইশনারী লাইফ অব ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস শীর্ষক গ্রন্থে ট্রিসট্রাম্প হান্ট এঙ্গেলসকে মার্কসের “বুলডগ” আখ্যায়িত করেন। এও এক নতুন পরিচিতি। মার্কসের সঙ্গে এঙ্গেলসের যে বনাম-চিত্র আজ তুলে ধরার চেষ্টা হয় তাতে এমন অবিধা নতুন নয়। হান্ট সেই কাজটাই প্রায় ৪২ পাতা (২৭৪-৩১৬) জুড়ে করেছেন। সেই আলোচনায় এও বলা হয় যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সম্পর্কে মানুষের মনে যে আতঙ্কের ছবি স্তালিনের অফিসিয়াল মতাদর্শের কারণে তৈরী হয় তার দায় এঙ্গেলসকে নিতে হবে। পুঁজিবাদের শ্রমিক সংকোচন নীতি এবং উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তোলার সাফল্য, বাস্তবে উদ্ধৃত্ত মূল্য উত্তোলনের হারকে কমিয়ে দেবে। মার্কস তাঁর পাণ্ডুলিপিতে এই ঘটনাকে পুঁজিবাদের ‘কাঁপন’ হিসাবে উল্লেখ করেন, যাকে এঙ্গেলস সম্পাদনে পুঁজিবাদের ‘বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেন। হান্টের মতে এই পরিবর্তন ক্ষুদ্র, কিন্তু মারাত্মক। তাঁর অভিযোগ, মার্কসের পাণ্ডুলিপিতে হাত দিয়ে “এঙ্গেলস কেবলমাত্র একজন এডিটর হতে চাননি”, তিনি হতে চেয়েছিলেন মার্কসীয় প্রাসঙ্গিকতার “একজন তত্ত্ববধায়ক এবং একমাত্র সম্পাদক।” পাতা, ৩০০-৩০১ দ্রষ্টব্য।

[৩। মার্কস-এঙ্গেলস-এর কালেক্টেড ওয়ার্কস, ৩৮ নং খন্ডের ১১ পাতায় চোখ ফেরালে তা দেখা যায়। অন্যান্য খন্ডেও হেস প্রসঙ্গ উঠেছে, তবে এই সংখ্যায় ১৮৪৪ থেকে ৫১ সালের মধ্যে লেখা চিঠিগুলির প্রসঙ্গ বেশ মজার। খন্ডটির প্রথমেই সেই সব চিঠির উল্লেখ আছে। ১৮৪৪র অক্টোবরে এবং ১৯ নভেম্বরে লেখা চিঠিতে হেস প্রসঙ্গে এঙ্গেলস তাঁর মত মার্কসকে ব্যক্ত করেছেন। প্রসঙ্গত, ১৮৪৬র ২৭ জুলাই, এবং সম্ভবত ২৯ জুলাই হেসকে লেখা চিঠিতে যথাক্রমে এঙ্গেলস ও মার্কস তাঁর স্ত্রীর কথাও উল্লেখ করেন। সেই কথার নেপথ্যে থাকা কটাক্ষ বড় তীক্ষ্ণ। কারণ সেই একই দিনে (২৭ জুলাই) এঙ্গেলসের লেখা মার্কসকে পাঠানো চিঠিটিতে মিসেস হেস প্রসঙ্গ উল্লেখ্য।

[৪] অক্টোবর ১৮৪৪ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে স্টির্ণের একগামি ব্যবস্থার পবিত্রতা প্রসঙ্গে সামাজিক ধারণার বাস্তবতাও খুঁজেছেন। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে ‘বিশ্বাসে বন্দি’ অংশকে দেখে নিতে চেয়েছেন। এই দৃষ্টিকোণে বিশ্বাস, ধর্ম এবং ঈশ্বরের ধারণায় স্টির্ণের ফয়েরবাখকে মেনে নিচ্ছেন, কিন্তু যুক্তির বিন্যাসে তাঁর ঊর্ধ্বে উঠছেন। দর্শনের সংস্কারে ফয়েরবাখের বক্তব্যকে মাথায় রেখে স্টির্ণের লিখছেন, “অনুমাননির্ভর দর্শনের পরিবর্তন যে সম্ভব সেটা ফয়েরবাখ আমাদের দেখিয়েছেন। এর ফলে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতাটাকেও একবার উল্টে দেখে নিতে পারি। তাতে বক্তব্যের বিধেয় অংশ উদ্দেশ্য হয়ে উঠতে পারে, অথবা তার উল্টোটা ঘটে। এই পরিবর্তনে অনেক সময় আমরা নগ্ন সত্যটাকে দেখে ফেলতে পারি। এই অনুসন্ধানে একদিন ঈশ্বরকে যেমন ধর্মের ভিত্তি হিসেবে আমরা মেনে নিয়েছিলাম, তাঁকে এখন নৈতিক ভিত্তি হিসেবে এই উল্টো দর্শনে খুঁজে পেতে পারি। ভগবানই হলেন ভালোবাসা– এটা আর আমরা আজ বলি না, বরং বলি, ভালোবাসা হল ঐশ্বরিক।” এমন আলোচনা প্রসঙ্গে গ্রন্থটির নতুন সংস্করণের ৪৭ পাতা দ্রষ্টব্য। দেখুন, ম্যাক্স স্টির্ণের, (১৯৯৫)। দ্যা ইগো এন্ড ইটস ওন (ডেভিড লিওপোল্ড সম্পাদিত)। কেমব্রিজঃ কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস।

[৫] এই উল্টো চলার দর্শনে এঙ্গেলস ইতিহাসের চালিকাশক্তি হিসেবে ফ্যাক্টরি সিস্টেমে চলা রাজনৈতিক অর্থনীতির নগ্নসত্য রূপটাকে দেখে নিয়েছিলেন। শ্রমের সঙ্গে পুঁজির এবং পুঁজির সঙ্গে জমির বিভাজন কেন করা হয়েছে তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে রাজনৈতিক অর্থনীতির ব্যাখ্যায় এঙ্গেলস রেখেছেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর আউটলাইন্স অব অ্যা ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি রচনাটি দ্রষ্টব্য। এঙ্গেলসের এই কাজকে একটু অন্যভাবে দেখতে দেখুন, গ্রেগরি ক্লায়েস, (১৯৮৪)। ‘এঙ্গেলস্ আউটলাইন্স অব অ্যা ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি (১৮৪৩) এন্ড দ্যা অরিজিন্স অব দ্যা মার্কসিস্ট ক্রিটিক অব ক্যাপিটালিজম’, হিস্ট্রি অব পলিটিক্যাল ইকোনোমি (১৬: ২), ডিউক ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাতা, ২০৭-২৩২।

[৬] ১৮৪৯ সালের মে মাসের শেষে নেউ রেইনখে জেইতুঁ-এর শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সংখ্যাটি ছাপা হয়েছিল লাল হরফে। বিপ্লবের জ্বলন্ত মশালতুল্য সেই সংখ্যাটি “লাল-সংখ্যা” নামে বিখ্যাত।

[৭] টেরেল ফস্টার কার্ভার তাঁর ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলসঃ হিজ লাইফ এন্ড থট (১৯৯০) গ্রন্থে এঙ্গেলসের ম্যানচেস্টারে থাকা জীবনে সঙ্গী খুঁজেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি লিডি ওরফে লিজির কথা বলেন। লিজি বার্ণস। লন্ডন, পালগ্রেভ ম্যাকমিলান থেকে প্রকাশিত সেই গ্রন্থে লেখক ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে এঙ্গেলসের জীবনে ভালোবাসাকে খুঁজে দেখেন। সেই আলোচনা প্রসঙ্গে গ্রন্থটির ১৪৫-১৬০ পাতা দ্রষ্টব্য। লিজির তাত্ত্বিক অবদান প্রসঙ্গে কার্ভার একটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন যে ১৮৬৮ সালে লিজি ইংল্যান্ডের লিঙ্কনশায়ারে তাঁর আত্মীয়ের কাছে যান, যিনি ছিলেন পেশায় একজন ফার্ম-লেবার। সেখানে লিজ্জি ‘গ্যাং-লেবার সিষ্টেম’ লক্ষ্য করেন, যা তিনি এঙ্গেলসকে জানান। এই ধারণা পরবর্তীতে মার্কস-এঙ্গেলস-এর রচনায় ব্যবহৃত হয়। লিজির এই অবদান প্রসঙ্গে গ্রন্থটির ১৫৬ পাতা দ্রষ্টব্য। প্রসঙ্গত, ১৮৭৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এঙ্গেলসের স্ত্রী লিজি বার্ণস (জন্মঃ ৬ আগষ্ট ১৮২৭) মারা যান।

[৮] তবে একা নন। সেখানে লিজিও ছিলেন। লিজি ছিলেন জাতিতে আইরিশ, এবং শিন-ফেইন আন্দোলনের একজন অন্যতম পরিচালক। এঙ্গেলসের স্ত্রী। তবে তাঁদের কোনো সন্তানাদি ছিল না। তাঁদের সম্পর্কের রসায়ন সেই অর্থে কোনো পরিবার প্রতিষ্ঠানের রূপও প্রকাশ করে না। মার্কসের কন্যাদের লিজি নিজের সন্তানের মতোই লালন করতেন, যারা তাঁকে “আন্টি” ডাকতো। কিন্তু পরিচিতদের মধ্যে কেউই তাঁকে ‘মিসেস এঙ্গেলস’ সম্বোধন করেন না। তবে ২০১৫র মিসেস এঙ্গেলস নামের উপন্যাসে গাভিন মেক্রিয়ে সেই রসায়নের অন্দরমহলে গল্পগাথায় যেতে চেয়েছেন। দেখা যায়, ১৮৬৯ সালে এঙ্গেলস তাঁর ব্যবসা থেকে অবসর নেন এবং ম্যানচেস্টারে লিজির সঙ্গে পূর্ণ সময় কাটানোর সুযোগ পান। ১৮৭০য় তারা লন্ডনে পাড়ি দেন।

[৯] বস্তুবাদী দর্শন নির্মাণের কাজে তিনি ছিলেন “দোহার”, এবার তাঁকে “মূল গায়েন”-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হল। তিনি তা করেও দেখালেন।

[১০] এই আলোচনায় এঙ্গেলসকে সর্বত্যাগী যোদ্ধা চরিত্রেও দেখা যায়। ১৮৬০ সালের বসন্তে এঙ্গেলসের বাবা মারা যাওয়ার পর কিছুটা এবং তার চার বছর পরে, ১৮৬৪ সালে ইয়েরমেনের সঙ্গে প্রতিকূল বাণিজ্যিক চুক্তি শেষ হওয়ার পর, ম্যানচেস্টারে থাকা সওদাগরি হৌসটির মালিকানা পুরোপুরিভাবে এঙ্গেলসের হাতে আসে। এতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অর্থের যোগান রাখার সকল প্রতিবন্ধকতার অবসান হয়। সম্পদের অসম বন্টনে ছেদ ঘটে। ব্যক্তিজীবনে এঙ্গেলস মুক্তির স্বাদ পান।

[১১] মার্কসের প্রাণের বন্ধু এঙ্গেলস শারীরিক গঠনে ছিলেন অনেক বেশী খোদ জার্মান ধাঁচের। পাতলা একহারা চেহারা, ছটফটে, সোনালীরঙের চুল আর গোঁফদাড়ি সহ তাঁকে জ্ঞানী পন্ডিতের চেয়ে অনেক বেশী রক্ষীবাহিনীর তুখোড় তরুণ লেফটেন্যান্ট বলেই মনে হোত। হয়তো সেই চরিত্র থেকেই ১৮৭০ সালে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধের গতিবিধি অনুধাবনে পল মল গেজেট পত্রিকায় যুদ্ধ শুরুর সপ্তাহ দুই আগেই এঙ্গেলস ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন যে ম্যাকমেহন যদি শত্রুব্যূহ ভেদ করে সসৈন্য বেলজিয়ামে চলে যেতে না পারেন তাহলে সেদানের নিম্নভূমিতে দৃঢ়বদ্ধ জার্মান-বাহিনীর লৌহ-বেষ্টনী তাঁকে আত্মসমর্থনে বাধ্য করবে। সামরিক ব্যাপারে তাঁর এই জ্ঞানের প্রমাণে তিনি ডাকনামে “জেনারেল” হয়ে ওঠেন। এই প্রসঙ্গে দেখুন, ফ্রিড্রিক লেসনার, (১৯০১)। “ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বিষয়ে জনৈক শ্রমিক,” মার্কস-এঙ্গেলস স্মৃতি। মস্কোঃ প্রগতি প্রকাশন। বাংলা অনুবাদ ১৯৭৬: ১৬৩-১৭৪। আলোচ্য অংশের জন্য ১৬৯ নং পাতা দ্রষ্টব্য।

[১২] দেখুন, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, (২০১৮)। “দ্যা সোশিয়লজি অব জেন্ডারঃ অ্যা মার্কসিস্ট ইন্টারপ্রিটেশন,” গার্গী সেনগুপ্ত সম্পাদিত, কার্ল মার্কসঃ অ্যা বাইসেন্টিনারি ট্রিবিউট। কলিকাতাঃ প্রোগ্রেসিভ পাবলিশার্স।

[১৩] লিঙ্গের সামাজিক নির্মাণে পরিবার নামক প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রসঙ্গে এঙ্গেলসের দৃষ্টিভঙ্গিতে আর একটু বিশদে দেখা যেতে পারে, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, (২০১৪)। দ্যা সোশিয়লজি অব ফ্যামিলি লাইফ। কলিকাতাঃ বুকস ওয়ে।

[১৪] প্রাণী হয়েও মানুষ কোথাও অন্য প্রাণীর তুলনায় অনন্য। মানব প্রকৃতির অভ্যন্তরে সেই দ্বান্দ্বিক বৈশিষ্ট্য রোপণ করে সংস্কৃতি। পুঁজিবাদে সেই সংস্কৃতিই মানুষকে বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসকারী সংগঠনের একজন করে তোলে। এমনই নানা আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কসবাদের তত্ত্বধারায় দেখুন, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, (২০১৩)।সমাজতত্ত্বের ইতিবৃত্তঃ মানব সংগঠনের নানা প্রসঙ্গ। কলিকাতাঃ বুকস ওয়ে।

[১৫] মার্কস-এঙ্গেলসের বাস্তুসংস্থানবিদ্যা সম্পর্কিত চর্চাধারা সম্পর্কে আজ বহু গবেষণার কথা উল্লেখ করা যায়। বাস্তুনারীবাদ এবং যত্নের নীতিনিষ্ঠতার আলোচনায় এঙ্গেলস প্রসঙ্গে দুটি ছোট নিবন্ধের কথা এখানে বলতেই হয়। এই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কাজের প্রথমটি করেছেন জন বি. ফস্টার এবং পল বার্কেট। সেই যৌথ কাজটি “ক্লাসিক্যাল মার্কসিজম এন্ড দ্যা সেকেন্ড ল অব থার্মোডিনামিক্স” শিরোনামে ২০০৮ সালে অর্গানাইজেনশন এনভাইরনমেন্ট (২১: ৩) পত্রিকায়, সেজ থেকে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির ৩-৩৭ পাতা দ্রষ্টব্য। দ্বিতীয় নিবন্ধটি ক্যাপিটালিজম, নেচার, সোস্যালিজম (২৪: ২) পত্রিকায় ২০১৭ সালে “মার্কস, এঙ্গেলস, এন্ড ইকোলজি” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ১০-২১ পাতার এই প্রবন্ধটি লেখেন মাইকেল লোয়ি। এখানে ‘মেটাবলিক রিফ্ট’ ধারণায় এঙ্গেলস প্রাসঙ্গিক হন।

[১৬] মার্কসের কথা এঙ্গেলস যেমন শুনতেন, তেমনি এঙ্গেলসের বন্ধুত্বের হাত সমগ্র মার্কস-পরিবারের প্রতিই প্রসারিত ছিল। মার্কসের মেয়েরা ছিলেন এঙ্গেলসের মেয়ের মতো। তাঁরাও এঙ্গেলসকে পিতৃপ্রতিম জ্ঞান করতেন। এই বন্ধুত্ব, সখ্যতা মার্কেসের মৃত্যুর পরেও অক্ষুন্ন ছিল। পয়সাকড়ি আর জ্ঞান-সবকিছুই ছিল দুই বন্ধুর যৌথ সম্পত্তি। ১৮৬৭ সালে থেকে এঙ্গেলসের সঙ্গে পরিচিত পোল লাফার্গ ১৯০৫ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা “এঙ্গেলস-স্মৃতি”-তে লিখেছেন, “মার্কসকে যখন নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনের জন্যে প্রবন্ধ লিখতে অনুরোধ করা হল তখনও তিনি ইংরাজী ভাষাটা সবে শিখছেন। ফলে এঙ্গেলস তাঁর প্রবন্ধগুলি জার্মান ভাষা থেকে ইংরাজিতে তর্জমা করে দিতেন, আবার দরকার পড়লে আলোচনা করে গোটা প্রবন্ধ ইংরাজিতে লিখেও দিতেন। আবার এঙ্গেলস যখন তাঁর অ্যান্টি-ড্যুরিং বইটা লিখছেন মার্কস তখন যে কাজ করছিলেন তা বন্ধ রেখে তাঁকে অর্থনীতি সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ লিখে দেন যার অংশবিশেষ এঙ্গেলস ঐ গ্রন্থে ব্যবহার করেন।” এই আলোচনায় লাফার্গের ঐ স্মৃতিকথা প্রসঙ্গে দেখুন, মার্কস-এঙ্গেলস স্মৃতি, মস্কোঃ প্রগতি প্রকাশন। পাতা, ৫১-৬২। আলোচ্য অংশের জন্য ৫৭ পাতা দ্রষ্টব্য।

Facebook Comments

Leave a Reply