ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস, মার্ক্সবাদ গঠন ও আজকের দিনে তাঁর গুরুত্ব : কুণাল চট্টোপাধ্যায়

fail

মার্ক্সবাদ গঠনে এঙ্গেলসের ভূমিকা কী? তিনি কী মার্ক্সের সঙ্গে সহ-প্রতিষ্ঠাতা, নাকি তিনি মার্ক্সের উপরে গোড়ার দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টীকাকার? অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির জন্য কী কৃতিত্ব তাঁরই, নাকি পরের দিকের মার্ক্সবেত্তারা মার্ক্সবাদ থেকে যা তাঁদের অপছন্দ সে সব কিছুর জন্য এঙ্গেলসকে যে দোষী সাব্যস্ত করেন সেটাই ঠিক?
এই প্রবন্ধে আমি তার সামান্য কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমত, আমি একটা কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ দেখতে চাই। সেটা হল, মার্ক্স আর এঙ্গেলসের সার্বিক দিশা কতটা আলাদা ছিল? বিংশ শতাব্দী জুড়ে, বহু লেখক দাবী করেছেন, এঙ্গেলস নাকি নানা দিক থেকে মার্ক্সের চিন্তাকে বিকৃত করেছিলেন। একদিকে দাবী করা হয়েছে, তিনি জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলে সংশোধনবাদের উত্থানের জন্য অনেকটা দায়ী। অন্যদিকে এই দাবীও করা হয়েছে যে তিনি (এবং অনিবার্যভাবে লেনিন) মার্ক্সের গণতান্ত্রিক বিপ্লবী চেতনাকে স্তালিনবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। আবার দর্শনের দিক ধরে অনেকে বলতে চেয়েছেন যে তরুণ মার্ক্সের মানবতাবাদী চিন্তাকে বিকৃত করেই এঙ্গেলস ‘বিজ্ঞানসম্মত’ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কথা তুলেছিলেন।
লুকাচ থেকে অনেকটা এই প্রবণতা শুরু। [১] তারপর আসে খ্রুশ্চেভের ‘গোপন’ বক্তৃতা, ও একদা কমিউনিস্ট পার্টি সদস্যদের মধ্যে যারা বামপন্থী থাকতে চাইলেন, স্তালিনবাদ ছাড়লেন, কিন্তু ট্রটস্কীবাদী হওয়ার শক্ত রাস্তার দিকে তাকাতে পারলেন না, তাদের নিউ লেফট রাজনীতি। তার মধ্যে একটা ঝোঁক ছিল, বলা হল যে মার্ক্স প্রলেতারীয় গণতন্ত্রী বটে, কিন্তু এঙ্গেলস আর লেনিনের দৌলতে ‘মার্ক্সবাদ’ পরিণত হয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক স্তালিনবাদে। লুকাচের সমালোচনাকে আরো এগিয়ে জর্জ লিশটহাইম ১৯৬১ সালে দাবী করেন, মার্ক্স ভাববাদ আর বস্তুবাদের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করেছিলেন, কিন্তু এঙ্গেলস আবার ফিরে গেলেন ‘পসিটিভিস্টিক’ বস্তুবাদে। [২] অ্যালাসডেয়ার ম্যাকইন্টায়ার দাবী করলেন, এঙ্গেলস বিপ্লবকে দেখেছিলেন প্রায় প্রাকৃতিক ঘটনার মত করে,– যেমন সূর্যগ্রহণ স্বাভাবিক ভাবেই হয়, তেমনভাবেই বিপ্লব হবে। [৩] অর্থাৎ শ্রেণী সংগ্রাম কোনো এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তাতে নাকি সচেতন প্রয়োগের স্থান নেই, এই হল এঙ্গেলস-কৃত মার্ক্সবাদের বিকৃতি সাধন। নর্ম্যান লেভাইন আরো এগিয়ে বলেন, স্তালিনবাদ হল একেবারে এঙ্গেলসীয় চিন্তার পরিণতি। [৪]
পল টমাস [৫] এবং টেরেল কার্ভার [৬] বলেন, এঙ্গেলস বিজ্ঞানকে যেভাবে দেখেছিলেন, তা হল, বিজ্ঞান হল বিষয়ীগত দিক বাদ রেখে একটি নৈর্ব্যক্তিক জ্ঞানের ব্যবস্থা (সিস্টেম অফ নলেজ), যেটা মার্ক্সের মত নয়। কার্ভার আরো দাবী করেছেন, এঙ্গেলসের অর্থনির্ভর বলে মার্ক্স মতভেদ থাকা সত্ত্বেও নীরব থেকে গিয়েছিলেন। [৭] অর্থাৎ, এখানে মার্ক্সকে ‘জ্ঞানপাপী’ বলে অভিযোগ তুলে এরা ‘আসল’ মার্ক্সকে উদ্ধার করতে চান। এঙ্গেলস নাকি জার্মান আইডিওলজির বস্তুবাদ ও ভাববাদের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করার প্রয়াসকে অগ্রাহ্য করে বা তাকে ভুলে গিয়ে পুরোনো বস্তুবাদে ফিরে গিয়েছিলেন।

অ্যান্টি ডুয়েরিং:

এখানে সবার কাছে একটা বিরাট সমস্যা আছে। মার্ক্সের জীবদ্দশায় তাঁর ও এঙ্গেলসের সৃষ্ট যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব ও অনুশীলন, তার প্রথম সার্বিক ছবি তুলে ধরেছিলেন এঙ্গেলস, মার্ক্সের সমর্থন নিয়ে। বইটির নাম হের ইউজিন ডুয়েরিং’স রেভল্যুশন ইন সায়েন্স, যা সাধারণত অ্যান্টি ডুয়েরিং নামে খ্যাত। জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলে মার্ক্সের প্রভাব বাড়ে এই বই প্রকাশের ফলে। এই বই, এবং এর পর এঙ্গেলসের আরো কিছু রচনা, যথা ‘লুডউইগ ফয়েরবাখ অ্যান্ড দ্য এন্ড অফ ক্লাসিকাল জার্মান ফিলসফি’, এবং অসমাপ্ত ‘ডায়ালেকটিক্স অফ নেচার’, এদের ঘিরে তর্ক।
গোটা তর্কটা অদ্ভুত, কারণ অ্যান্টি ডুয়েরিং রচনা করার মূল কারণ ছিল বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের প্রাক্সিসের উপর জোর দেওয়া, যেহেতু অধ্যাপক ডুয়েরিং এক নীতিসর্বস্ব সংস্কারবাদের প্রচার করছিলেন এবং জার্মান পার্টিতে তার প্রভাবও ছিল। লেনিন এই বইটিকে বলেছিলেন প্রতিটি শ্রেণী সচেতন শ্রমিকের জন্য এক আকরগ্রন্থ। মার্ক্স যে হেগেলীয় চিন্তার ব্যবহার করেছিলেন, ডুয়েরিং তার সমা্লোচনা করেন। এঙ্গেলস এর জবাবে বলেন, এর সাহায্যেই মার্ক্স পুরোনো বস্তুবাদের সীমাবদ্ধতাকে এবং ভাববাদকে অতিক্রম করে তাদের আংশিক সত্যের ঊর্ধে উঠতে পেরেছিলেন। কার্ভার দাবী করেছেন, মার্ক্স-এঙ্গেলসের ঐকমত্য বাস্তব নয়, মার্ক্সের মৃত্যুর পর এঙ্গেলসের বানানো গল্প। বাস্তবে, যদি এঙ্গেলসকে বেশি গোঁড়া, মার্ক্সের বিকৃতিসাধনকারী বলা হয়, তাহলে দেখা যাবে, মার্ক্সের বেশ কিছু রচনা বড় বেশি ‘এঙ্গেলসীয়’ – যেমন ১৮৫৯এর প্রসিদ্ধ মুখবন্ধ।
অবশ্যই, দুজন স্বতন্ত্র মানুষ ছিলেন, তাই দুজনের চিন্তার ফারাক ছিল। একমাত্র ধর্মীয় ‘সোভিয়েত’ মার্ক্সবাদে দুজনকে একেবারে অভিন্ন বলা হত। বিভিন্ন রাজনৈতিক লেখাতেও জোরের তফাত দেখা সম্ভব। কিন্তু দুজনের রচনার বিষয়বস্তু, চিঠি বিনিময়, দেখায় যে তারা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে সহযোগিতা করে গেছেন, যেখানে এক এক জনের এক এক ক্ষেত্রে বেশী প্রাধান্য ছিল। একাধিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথমে এঙ্গেলসের রচনাই মার্ক্সকে কোনো একটি দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে, পেরী অ্যান্ডারসন দেখিয়েছিলেন, ইতিহাসের বিষয়ে, বিশেষত ইউরোপীয় ইতিহাসের বিষয়ে, এঙ্গেলসের অবস্থান সচরাচর মার্ক্সের চেয়ে শ্রেয় ছিল। [৮] আর, কার্ভার একরকম কাঁচা হাতসাফাই করতে চেয়েছেন। তিনি দাবী করেছেন, তিনটিমাত্র রচনাকে যৌথ কাজ বলা যায় – হোলি ফ্যামিলি, জার্মান আইডিওলজি, যেটা আবার মুদ্রিতই হয় নি, আর কমিউনিস্ট ইস্তাহার, যেটা নামে দুজনের, বাস্তবে মার্ক্সের লেখা। [৯] তিনি অগ্রাহ্য করে গেছেন যৌথভাবে লেখা বহু রাজনৈতিক দলিল, এবং মার্ক্সের নামে লেখা এঙ্গেলসের রচনা। তিনি অগ্রাহ্য করেছেন এঙ্গেলসের লেখা প্রিন্সিপলস অভ কমিউনিজম, যেটা কমিউনিস্ট ইস্তাহারের খসড়া। কতগুলোর উল্লেখ করব? বলা যায় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কমিউনিস্ট লীগের প্রতি অভিভাষণ (Address of the Central Authority to the Communist League) নামে মার্চ ও জুন ১৮৫০-এর দুটি দলিলের কথা। বলা যায় ১৮৭৯ সালের প্রসিদ্ধ চিঠির কথা।

১৮৭৯-এর চিঠি ও এঙ্গেলসের বিপ্লবী নীতি ও কৌশলঃ

এর সম্পর্কে একটু বিস্তারিতভাবেই বলা দরকার। ১৮৭৮ সালে বিসমার্কের উদ্যোগে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দল বেআইনি ঘোষিত হয়। দলের রাইখস্ট্যাগ সদস্যরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারবেন, কিন্তু আর সব নিষিদ্ধ বা পুলিশী নিয়ন্ত্রণে। এই অবস্থায় বিদেশ থেকে পার্টির পত্রিকা প্রকাশ করে গোপনে দেশে চালান করার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু দেখা গেল, ইতিমধ্যে, সুইজারল্যান্ড থেকে একটি পত্রিকা বেরিয়েছে, এবং তাতে একটি প্রবন্ধ স্বাক্ষর করেছেন হখবের্গ, বার্নস্টাইন এবং শ্র্যাম। এই প্রবন্ধের রাজনৈতিক বক্তব্যকে মার্ক্স ও এঙ্গেলস তাঁদের মৌলিক অবস্থানের বিরোধী বলে মনে করেন। ৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭৯, এঙ্গেলস মার্ক্সকে চিঠিতে লেখেন, ‘আমাদের অবস্থানটা লাইপজীগওয়ালাদের [জার্মান পার্টির সদর দপ্তর] কাছে স্পষ্ট করতে হবে’। তিনি প্রস্তাব করেন, মার্ক্স সহমত হলে এবং তাঁকে (এঙ্গেলসকে) সব কাগজ পত্র পাঠালে তিনি জবাব লিখতে পারেন। পরদিন, ১০ সেপ্টেম্বর, মার্ক্স উত্তরে লেখেন, লাইপজীগের প্রতি খুবই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে, কারণ লিয়েবকনেশটের কোনো বিচারবুদ্ধি নেই। তিনি বলেন, এই প্রবন্ধে যে রকম কথা বলা হয়েছে, পার্টির পত্রিকায় যদি সেই মত প্রকাশ করা হয় তবে নির্মমভাবে তার বিরুদ্ধে লিখতে হবে, ও তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে’। ১৯ সেপ্টেম্বর পুরোনো কমরেড ফ্রিডরিশ সোর্জকে একটি চিঠিতে মার্ক্স লেখেনঃ
এখন যদি সাপ্তাহিকটি, অর্থাৎ পার্টির পত্রিকা, হখবের্গের ইয়ারবুকের দেখানো পথে এগোয়, তাহলে আমরা পার্টি ও তত্ত্বের এই অবমূল্যায়ণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে বাধ্য হব। এঙ্গেলস একটা সার্কুলার (চিঠি) লিখেছে, বেবেল প্রমুখের উদ্দেশ্যে। (অবশ্যই সেটা জার্মান পার্টি নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বিতরণের জন্য), যেখানে আমাদের অবস্থান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা আছে। … ওঁরা যদি নিজেদের আপোষের পথে নিতে চান, ওঁদেরই খারাপ হবে। কিন্তু কোনো অবস্থায় ওদের অনুমতি দেওয়া হবে না, আমাদের আপোষের পথে নিয়ে যেতে। [১০]
এই চিঠিতে এঙ্গেলস তাঁর ও মার্ক্স দুজনের নামে তাঁদের রাজনীতির মূল কিছু কথা বলেন, যেগুলি স্মরণ করা যায়। গোটা চিঠিটা দীর্ঘ। আমি এখানে তার থেকে সামান্য কয়েকটি বক্তব্যের সংক্ষিপ্তসার রাখছি।
পার্টির নীতি হবে পরোক্ষ করের পক্ষে ভোটদান না করা; বিসমার্কের দক্ষিণপন্থী সরকারের পক্ষে কোন ভোট না দেওয়া। মার্ক্স ও এঙ্গেলসের সমর্থন যাঁর প্রতি, সেই হিয়ার্শ (Hirsch) এই রকম এক কাজে নীতিভ্রষ্ট হওয়ার জন্য পার্টির এক রাইখস্ট্যাগ সদস্য ক্যায়সারের সমালোচনা করেছিলেন। এজন্য একদিকে তাঁকে পালটা সমালোচনা করা হয়, ও সেই সঙ্গে তাঁকে জানানো হয়, পার্টির পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য না, যেহেতু তিনি রাইখস্ট্যাগ সদস্যদের এইরকম সমালোচনা করতে প্রস্তুত।
হখবের্গ সম্পাদিত ইয়ারবুকে তিনজনের লেখা প্রবন্ধটি সম্পর্কে এঙ্গেলস লেখেন, এই প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দল একপেশে ভাবে শ্রমিক দল না হয়ে হয় যেন সকল মানবতাপ্রেমীর দল। প্রবন্ধটির বিভিন্ন উক্তি ধরে তিনি বলেন, এককথায় বলা হচ্ছে, শ্রমিক শ্রেণী নিজের মুক্তি আনতে অক্ষম। এজন্য তাদের দরকার শিক্ষিত ও বিত্তবান বুর্জোয়াদের তত্ত্বাবধানে আসার, কারণ তাদেরই কেবল সময় ও সুযোগ আছে, শ্রমিকদের জন্য কোনটা ভাল সেটা বোঝার। উপরন্তু, বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই না করে তাদের মধ্যে প্রচার করে তাদের নিজেদের দিকে টানতে হবে, এই ছিল প্রবন্ধটির বক্তব্য।
আরো কয়েকটি এইরকম মতের উল্লেখ করে এঙ্গেলস লেখেন, (পারী) কমিউনকে যে পার্টি সমর্থন করেছিল, তাতেও নাকি পার্টির বদনাম হয়েছিল। আর যে আইন পাশ করে পার্টিকে বে-আইনি করা হয়েছে তার জন্যও পার্টির কিছুটা দায় আছে, কারণ তারা বুর্জোয়াদের ঘৃণা বড় বেশি বাড়িয়ে তুলেছিল।
এইসবের ভিত্তিতে এঙ্গেলস মন্তব্য করেন, তাঁদের কাছে এ রাজনীতি অপরিচিত নয়, কারণ এ হল ১৮৪৮-এর বিপ্লবের পেটি বুর্জোয়া নেতাদের পরিভাষা। এঙ্গেলস স্বীকার করেন যে এটা এক অনিবার্য প্রবণতা, যা [সমাজ]বিকাশের ঘটনাক্রমের সঙ্গে যুক্ত, যে আগে যারা শাসক শ্রেণীদের সঙ্গে ছিল, এমন ব্যক্তিত্বরাও জঙ্গী প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে যোগ দেবে ও তাতে সাংস্কৃতিক উপাদান আনবে। তিনি বলেন, কমিউনিস্ট ইস্তাহারেই এর স্বীকৃতি ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি বলেন, এখানে দুটি কথা মনে রাখতে হবে। প্রথমত, তাদের প্রকৃতই সাংস্কৃতিক উপাদান আনতে হবে, উপর উপর শেখা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধা হজম জ্ঞান না। দ্বিতীয়ত, অন্য শ্রেণীর মানুষ যখন প্রলেতারীয় আন্দোলনে যোগ দেবে, তখন তাদের সঙ্গে বুর্জোয়া, পেটি-বুর্জোয়া কুসংস্কার সঙ্গে আনলে চলবে না। জার্মানীর মত দেশে, যেখানে এত পেটি-বুর্জোয়া আছে, সেখানে পেটি-বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণা থাকতেই পারে। কিন্তু তার স্থান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভিতরে না, বাইরে।
এর ভিত্তিতে তিনি ও মার্ক্স যৌথভাবে জানানঃ
আমাদের সমগ্র অতীতের আলোকে আমাদের সামনে একটাই পথ খোলা আছে। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে আমরা জোর দিয়ে এসেছি যে ইতিহাসের তাৎক্ষণিক চালিকাশক্তি শ্রেণী সংগ্রাম। আধুনিক সমাজ বিপ্লবের ভারোত্তোলন যন্ত্রের কাজ করে বুর্জোয়া শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে শ্রেণী সংগ্রাম । তাই যারা আন্দোলন থেকে এই শ্রেণী সংগ্রামকে মুছে দিতে চায়, আমাদের পক্ষে তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করা অসম্ভব। যখন [প্রথম] আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আমরা তখন সরাসরি তার রণহুঙ্কার হিসেবে যে কথা বলেছিলাম তা হলঃ শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি শ্রমিক শ্রেণী নিজেই আনবে। তাই যারা বলে, শ্রমিকরা বড় অশিক্ষিত, তাই নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না, এবং প্রথমে তাদের উপর থেকে মুক্ত করবে দানবীর বুর্জোয়া আর পেটি বুর্জোয়ারা, আমরা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারি না।[১১]
এই চিঠিটা বহু কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটা কার্যত একটা বিপ্লবী শ্রমিক দলের কর্মসূচী ও রণকৌশল কী হবে তার উপরে দীর্ঘ আলোচনা। সেই সঙ্গে এতে আছে পার্টির মধ্যে গণতন্ত্র কাকে বলে তা নিয়ে আলোচনা। গোটাচিঠিটা এঙ্গেলসের লেখা—সেটা মার্ক্সের সোর্জকে লেখা চিঠিতে আমরা দেখেছি। অথচ মার্ক্স নির্দ্বিধায় তাতে নিজের নাম যোগ করছেন। আবার চিঠিতে এঙ্গেলস লিখছেন আমরা প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার সময়ে এই উক্তি রচনা করেছি – যেটা মার্ক্স একা করেছিলেন, সেটাও মার্ক্স-এঙ্গেলস পত্রাবলী থেকে জানা যায়। দুজনের রাজনৈতিক মত কতটা কাছে হলে, এবং পরস্পরের উপর কতটা বিশ্বাস থাকলে এই কাজগুলো সম্ভব, পাঠকরা সেটা ভেবে দেখবেন।
সেই সঙ্গে আমরা এই চিঠির একটা এযুগের প্রাসঙ্গিকতা দেখতে পাই। কাকে বলব বিপ্লবী প্রলেতারীয় দল? এঙ্গেলস (ও মার্ক্স) তাহলে বলছেন, এমন একটা দল যে একদিকে বুর্জোয়া শ্রেণীকে চটানোর ভয়ে নিজের কর্মসূচী থেকে পিছিয়ে আসবে না, যে পরোক্ষ করের পক্ষে ভোট দেবে না (কারণ পরোক্ষ কর সাধারণভাবে দরিদ্রের উপর আঘাত হানে– আজকের কথা ভাবতে হলে জি এস টিকে প্রথমেই মনে করতে হয়), যে দল পার্লামেন্ট সর্বস্ব নয় এবং দলের সাংসদদের দলীয় নীতি থেকে ‘স্বাধীনতা’ দেয় না। আবার অন্য দিকে যে দল বাস্তবে প্রলেতারীয়, বুর্জোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান আধা হজম করা ছাত্র পেটি বুর্জোয়ার নেতৃত্বে চলে না। আর যে দল পরোপকারী দানবীর বুর্জোয়াদের তদারকিতে চলে না। এদেশের সংসদীয় বাম, অধিকাংশ ‘বিপ্লবী’ বাম, এবং এন জি ও বাম, সকলকে মনে রেখে যেন এটা লেখা।

মার্ক্সের চোখে এঙ্গেলসঃ

এবার মার্ক্সের একটা লেখার উল্লেখ করব। সেটা হল ১৮৫৯ সালে লেখা আ কন্ট্রিবিউশন টু দ্য ক্রিটিক অফ পলিটিক্যাল ইকনমি-র মুখবন্ধ। মার্ক্স লেখেনঃ
Frederick Engels, with whom I maintained a constant exchange of ideas by correspondence since the publication of his brilliant essay on the critique of economic categories…arrived by another road (compare his Condition of the Working-Class in England) at the same result as I, and when in the spring of 1845 he too came to live in Brussels, we decided to set forth together our conception as opposed to the ideological one of German philosophy, in fact to settle accounts with our former philosophical conscience. [১২]
অর্থাৎ — এঙ্গেলস আমার থেকে ভিন্ন পথে একই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, তিনি অর্থনীতি বিষয়ক একটি অসাধারণ প্রবন্ধ লেখার পর থেকে দুজনের মধ্যে ক্রমাগত মত বিনিময় হয়েছিল (পাঠক মনে রাখবেন, এই কথা লিখছেন সেই ব্যক্তি, যিনি ইতিমধ্যে গ্রুন্ড্রিসে রচনা করেছেন এবং ক্যাপিটাল নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন), এবং ১৮৪৫ সালে তাঁরা একত্রে নিজেদের পূর্বতন দার্শনিক অবস্থানের সঙ্গে হিসেবনিকেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাহলে, মার্ক্স, এঙ্গেলস, দুজনেই মনে করতেন, তাঁদের মৌলিক চিন্তা অভিন্ন, কিন্তু কার্ভার ভালো জানেন। আর, এঙ্গেলসের বৌদ্ধিক ক্ষমতা সম্পর্কে ১৮৫৩ সালে একটি চিঠিতে মার্ক্স বলেন, তিনি এক চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া, এবং ঠান্ডা মাথা বা মত্ত, যে কোনো অবস্থায়, দিনে রাতে যে কোনো সময়ে, কাজ করতে পারেন, দ্রুত লিখতে পারেন এবং দ্রুত বুঝতে পারেন।[১৩]
মার্ক্স টাকার দরকার বলে নিজের নীতির প্রতি অসৎ হয়েছিলেন, এই কথা বলার অর্থ, এঙ্গেলসের চেয়ে মার্ক্সের প্রতি অনেক বড় আক্রমণ করা। আর কার্ভার কিন্তু তার কোনো প্রমাণ দেন নি। তাঁর একটা অপ্রমাণিত অনুমানের সমর্থনে আর একটা অপ্রমাণিত অনুমান শুধু খাড়া করেছেন। সোমা মারিক মার্ক্সের যে অকাট্য উক্তি তুলে ধরেছেন, তা হল, তিনি এবং এঙ্গেলস একটি সাধারণ পরিকল্পনা মাফিক, এবং আগাম আলোচনার ভিত্তিতে কাজ করেন। [১৪]

মার্ক্সের ক্যাপিটাল ও এঙ্গেলসের প্রভাবঃ

মার্ক্স ও এঙ্গেলসের মধ্যে তফাৎ নিশ্চয়ই ছিল। ১৮৪৫ থেকে ১৮৮৩ অবধি একত্রে কাজের মধ্যে কোনো মতভেদ, কোনো ক্ষেত্রে জোর বেশি–কম পড়া, কিছু হয় নি, একথা বলা অবাস্তব। একটা অন্য ধরনের তফাৎ হল, এঙ্গেলস দ্রুত ভাবতেন ও লিখতেন। মার্ক্স নিজে এঙ্গেলসকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে বহু ক্ষেত্রেই তিনি এঙ্গেলসের অনুগামী। অন্যদিকে মার্ক্স অনেক গভীরে চিন্তা করতেন। অ্যারিস্ততল-সম যাঁর জ্ঞানচর্চা, তিনি যে বহু বিষয়ে শেষ অবধি এঙ্গেলসের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, সেটা কষ্ট করে প্রমাণ করতে হয় না। কিন্তু এঙ্গেলসের ভূমিকাকে খাটো করে দেখা যায় না। মার্ক্সের ধনতন্ত্র বিষয়ক গবেষণার উপর তাঁর প্রভাব তাই আমাদের আলোচনা করতে হবে।
১৮৪৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে এঙ্গেলস একটি প্রবন্ধ লেখেন – ‘পলিটক্যাল ইকনমির সমালোচনার একটি রূপরেখা’ (‘Outlines of a Critique of Political Economy’)। [১৫] মার্ক্স ও আর্নল্ড রুগে সম্পাদিত ডয়েটশ-ফ্রাঞ্জোয়েসিশ ইয়ারবুকা্র-এর দপ্তরে সেটা আসে ১৮৪৩ সালের নভেম্বরে। এই প্রবন্ধে এঙ্গেলসের লক্ষ্য ছিল অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো, ম্যালথাস ও অন্যান্য অর্থনীতিবিদের রচনায় যেটা রহস্যের মোড়কে ঘেরা, তার সমালোচনা করে বিপ্লবীদের কাছে বাস্তব জগত ও তার সংগ্রামকে তুলে ধরা। ব্রিটেনে থাকার ফলে এঙ্গেলস রবার্ট আওয়েনের অনুগামী সমাজতন্ত্রী সমালোচকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। বুর্জোয়া অর্থনীতি (সে সময়ে পলিটিক্যাল ইকনমি নামে পরিচিত) শ্রেণী সংগ্রামের বাস্তবতাকে আড়াল করে রেখেছিল। এঙ্গেলসের রচনা অবশ্যই মার্ক্সের ক্যাপিটালের স্তরে ছিল না। কিন্তু তিনি এমন কিছু প্রসঙ্গ আনেন, যা মার্ক্সকে প্রভাবিত করে। প্রবন্ধটির উপর মার্ক্সের নিজের নোট দেখায়, তিনি ব্যক্তি-মালিকানা, ও তার বিপরীতে এবং তাকে দমন করে সমষ্টিগত মালিকানার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের কথা ভাবেন। এঙ্গেলসের রচনার নোট নিতে গিয়ে মার্ক্স জোর আরোপ করেন মূল্য (vale)-র উপর। বলা যায়, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ক্রিটিকের পদ্ধতি প্রয়োগ, আজীবন পলিটিক্যাল ইকনমিকে কেন্দ্রে রেখে চর্চা, মূল্যের উপর জোর আরোপ করা, এ সবের জন্যই মার্ক্স এঙ্গেলসের কাছে ঋণী।[১৬]
এঙ্গেলসের বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি বাণিজ্যকে দেখেছিলেন দৈনন্দিন অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে— স্বাভাবিক, কারণ এরমেন অ্যান্ড এঙ্গেলস কোম্পানীর অন্যতম মালিকের ছেলে হিসেবে তিনি তখন ম্যাঞ্চেস্টারে হাতে কাজ শিখছেন। মূল্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও তিনি বাজার দর বা price-এর দিকে অনেক বেশী তাকিয়েছিলেন। মার্ক্স পরে যেভাবে শ্রম ও মূল্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছিলেন এঙ্গেলসের এই প্রবন্ধে তা নেই। তিনি সংক্ষেপে এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে চলে গেছেন। কিন্তু এঙ্গেলসের প্রবন্ধ, তার উপর মার্ক্সের নোট, তা থেকে ‘ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিক ম্যানুস্ক্রিপ্টস’ হয়ে থিসেস অন ফয়েরবাখ ও জার্মান ইডিওলজি অবধি একটা বিকাশ দেখা যায়। ‘ইকনমিক অ্যান্ড ফিলসফিক ম্যানুস্ক্রিপ্টস’-এ মার্ক্স লেখেনঃ
“The life of the species, both in man and in animals, consists physically in the fact that man (like the animal) lives on inorganic nature; and the more universal man (or the animal) is, the more universal is the sphere of inorganic nature on which he lives. …The universality of man appears in practice precisely in the universality which makes all nature his inorganic body – both inasmuch as nature is (1) his direct means of life, and (2) the material, the object, and the instrument of his life activity. Nature is man’s inorganic body – nature, that is, insofar as it is not itself human body. Man lives on nature – means that nature is his body, with which he must remain in continuous interchange if he is not to die. That man’s physical and spiritual life is linked to nature means simply that nature is linked to itself, for man is a part of nature”. [১৭]
অর্থাৎ মানুষ প্রকৃতির অঙ্গ । মানুষ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে আদান-প্রদান চালিয়ে বাঁচে। বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, এবত কেন সেটা পরে দেখা যাবে। আপাতত বুঝতে হবে, এরও সূচনা এঙ্গেলসের ওই প্রবন্ধ থেকে।
এঙ্গেলস এর আগে লিখেছিলেনঃ
According to the economists, the production costs of a commodity consist of three elements: the rent for the piece of land required to produce the raw material; the capital with its profit, and the wages for the labour required for production and manufacture. But it becomes immediately evident that capital and labour are identical, since the economists themselves confess that capital is “stored-up labour.” We are therefore left with only two sides – the natural, objective side, land; and the human, subjective side, labour, which includes capital and, besides capital, a third factor which the economist does not think about – I mean the mental element of invention, of thought, alongside the physical element of sheer labour. What has the economist to do with inventiveness? Have not all inventions fallen into his lap without any effort on his part? Has one of them cost him anything? Why then should he bother about them in the calculation of production costs? Land, capital and labour are for him the conditions of wealth, and he requires nothing else. Science is no concern of his.
…But in a rational order which has gone beyond the division of interests as it is found with the economist, the mental element certainly belongs among the elements of production and will find its place, too, in economics among the costs of production. …We have, then, two elements of production in operation – nature and man, with man again active physically and mentally, and can now return to the economist and his production costs.
জার্মান ইডিওলজিতে গিয়ে আমরা পাইঃ
The first premise of all human history is, of course, the existence of living human individuals. Thus the first fact to be established is the physical organisation of these individuals and their consequent relation to the rest of nature….Men can be distinguished from animals by consciousness, by religion or anything else you like. They themselves begin to distinguish themselves from animals as soon as they begin to produce their means of subsistence, a step which is conditioned by their physical organisation. By producing their means of subsistence men are indirectly producing their actual material life.
ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা, এবং একই সঙ্গে মানব ইতিহাস ও প্রকৃতির ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক, এখান থেকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করল। এই কারণেই, বুর্জোয়া অর্থনীতি তার সংকীর্ণ সংজ্ঞার বাইরে যে, সেই সব বাহ্যিক হাজিরা বা externality-কে হিসেবে ধরে না, কিন্তু বিপ্লবী সমাজতন্ত্রকে তা ধরতে হবে।
এই প্রবন্ধে এঙ্গেলসের আর একটি কাজ হল ম্যালথাসের জনসংখ্যাবৃদ্ধির তত্ত্বকে পর্যবেক্ষণ করা ও তাকে চ্যালেঞ্জ করা। ক্যাপিটাল-এ মার্ক্স এই বিষয়ে এঙ্গেলসকে পাদটীকায় স্বীকার করেছেন।[১৮] আর, এঙ্গেলস এই প্রবন্ধে উল্লেখ করলেন, ধনতন্ত্রে যে বারে বারে সংকট আসে, তা অতিক্রম করার জন্য চাই সচেতন, যৌথ ও পরিকল্পিত উৎপাদন।[১৯]
এর দ্বারা, এঙ্গেলস ইতিপূর্বে কমিউনিজমকে যে রকম দার্শনিক-নৈতিক দিশা হিসেবে দেখা হত, তা থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে এলেন, এবং চলে গেলেন আধুনিক শিল্পের ভিত্তিতে যে আধুনিক শ্রেণী সংগ্রাম, এবং তার নিষ্পত্তিহিসেবে সাম্যবাদের ধারণায়। মার্ক্স ও এঙ্গেলস দুজনেই ছিলেন হেগেলীয় বামপন্থীদের অংশ। এঙ্গেলসের এই প্রবন্ধ, এবং এর পর তাঁর লেখা Condition of the Working-Class in England ওই দার্শনিক বাম অবস্থান থেকে প্রলেতারীয় বিপ্লবের দিকে সরার প্রথম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল। এই কারণেই, মার্ক্স ১৮৫৯ সালের ভূমিকাতেও পরের বইটির উল্লেখ করেন।

দ্বন্দ্বতত্ত্ব—সামাজিক, প্রাকৃতিকঃ একটি অতি প্রাথমিক আলোচনা

এই বিষয়টি নিয়েই পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ, এমনকি বইয়ের দরকার আছে। আপাতত আমি প্রসঙ্গটা তুলছি, কারণ মার্ক্সবাদ নিছক এক সামাজিক তত্ত্ব, এবং তাকে বিজ্ঞানের দিকে ঠেলে দিয়ে এঙ্গেলস তার ক্ষতি করেছেন, এই ধারণা বারে বারে এসেছে। লুকাচ হিস্ট্রি অ্যান্ড ক্লাস কনশাসনেস বইতে বলেন, এই কাজ করে এঙ্গেলস ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াতে বিষয় ও বিষয়ীর যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, তাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। সেটা না থাকলে দ্বন্দ্বতত্ত্ব আর বিপ্লবী থাকে না। এর উল্লেখ আগেই করেছি। সোশ্যালিস্ট রেজিস্টার ১৯৭১–এ এঙ্গেলসের Dialectics of Nature কে কেন বর্জন করা উচিত তার উপর জেফ কোল্টার একটি প্রসিদ্ধ ও প্রভাবশালী প্রবন্ধ লেখেন। [২০] লুকাচের উপর জোর দেওয়া কঠিন, কারণ তিনি একই বইয়ে অন্যত্র এঙ্গেলসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। পরে তিনি প্রকৃতিতে দ্বান্দ্বিকতার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। [২১]
দ্বান্দ্বিকতা যদি সমাজ বিকাশের বস্তুগত নীতি হয়, তা হলে তাকে ইতিমধ্যেই সমাজ নির্মিত হওয়ার আগে থেকেই প্রকৃতির বিকাশের নীতি হতে হবে। তার মানে এমন না যে সমাজ বিকাশের দ্বান্দ্বিকতা আর প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা অভিন্ন হবে। উপরন্তু, বলা যায় যে সামাজিক দ্বান্দ্বিকতার জ্ঞান ছাড়া ও তার মধ্যস্থতা ছাড়া প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতাকে জানা যাবে না। [২২] সুতরাং লুকাচ শেষ অবধি গ্রামসি ও করশ্চের মতোই, বা অন্তত আংশিকভাবে, প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতার অস্তিত্ব মেনে নিয়েছিলেন, এবং এঙ্গেলসের বক্তব্য, যে প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা আছে, তাকে অতিসরলীকরণ না করে গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। কোল্টারের মতো সমালোচকরা অনেক বেশী একপেশে। তিনি একেবারেই এঙ্গেলসের এই চিন্তাকে দূর করে দিতে চান। তাই তার প্রবন্ধের শেষ কথা হলঃ
In our expunction of his schema from Marxist philosophy, I submit that we render both that philosophy and its associated revolutionary practice some service. [২৩]
বস্তুত, একদিকে স্তালিনবাদী ডায়াম্যাট আর অন্যদিকে এই অবস্থান, এই ছিল দীর্ঘকাল দুটি তত্ত্বগত কেন্দ্রীয় ভাষ্য। পরিবেশ চিন্তায় মার্ক্সবাদীদের আগমনের পর, বিশেষ করে পল বার্কেট বা জন বেলামি ফস্টারের লেখাপত্রের পর, ছবিটা পালটাতে শুরু করেছে। ফস্টার বলেন, লুকাচের বইয়ে ছিল একরকম অসংলগ্নতা। তিনি একদিকে বলেন প্রকৃতিতে দ্বান্দ্বিকতা নেই কারণ বিষয়ীগত মাত্রাটা নেই। আবার অন্যদিকে তিনি বলেন যে প্রকৃতিতে এক স্বতন্ত্র দ্বান্দ্বিকতা থাকতে পারে। ওয়েস্টার্ন মার্ক্সিজম নামে পরিচিত যে ধারা [২৪] তার প্রবণতা হল স্রেফ আগাগোড়া প্রকৃতিতে দ্বান্দ্বিকতা্কে অস্বীকার করা। [২৫] প্রথমত, এটা অস্বীকার করে যে মার্ক্স সাধারণভাবে এঙ্গেলসের এই বিষয়ে গবেষণাকে সমর্থন করেই কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয়ত, এর ফলে ঝোঁকটা যায় দার্শনিক ক্ষেত্রে ভাববাদের দিকে। ওয়েস্টার্ন মার্ক্সিজম সাধারণভাবে একটা রেখা টেনে মার্ক্সের চিন্তার এক ভাববাদী ব্যাখ্যাকে মদত দিয়ে এঙ্গেলসের রচনার, বিশেষত দর্শনের প্রসঙ্গে তাঁর রচনার যান্ত্রিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে।
এর বিপরীতে ফস্টার ও অন্যান্যরা দেখিয়েছেন, মার্ক্সের ‘ইন্দ্রিয়গত মানবিক ক্রিয়াকলাপের’ ধারণা ব্যবহার করে কীভাবে প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক দেখা যায়। ফস্টারের মতে, মার্ক্সের বস্তুবাদ ধরে নিচ্ছে, একরকম ‘স্বাভাবিক প্রাক্সিস’ আছে, যার মাধ্যমে বোঝা যায়, ইন্দ্রিয়গত মানবিক ক্রিয়াকলাপ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতেই গেঁথে আছে। আমরা জগতকে অনুভব করি আমাদের ইন্দ্রিয়ের দ্বারাই, কিন্তু অভিজ্ঞতাবাদীরা যেমন ভাবেন্ তা নয়। যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রকৃতি নিজের সম্পর্কে সচেতন হয় সেগুলি জীবের জগত থেকে নিষ্ক্রিয়ভাবে তথ্য পায় না, বরং তারা সক্রিয়। মানবতার সঙ্গে প্রকৃতির যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সেটা বিকশিত হয়, গভীরতর হয়। ফস্টারের মতে ‘স্বাভাবিক প্রাক্সিস’-এর ধারণার সঙ্গে এঙ্গেলসের চিন্তার সামঞ্জস্য আছে, যদি না এঙ্গেলসকে সরলীকরণ করা হয়। [২৬]
ফস্টারের আরো বক্তব্য যে আজকের যুগের পরিবেশবাদী চিন্তার সঙ্গে মার্ক্স-এঙ্গেলসের এই চিন্তার মিল আছে। ধনতন্ত্রে সামাজিক সম্পর্কের যে বিচ্ছিন্নতাপ্রাপ্ত রূপ, তার সঙ্গে পরিবেশের সংকটকে মিলিয়ে বোঝার জন্য এঙ্গেলসের প্রাকৃতিক দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্ব একটা ক্ষেত্র তৈরী করে দেয়। উৎপাদন সবার আগে প্রকৃতির সঙ্গে বিপাকীয় আদান-প্রদান (metabolic exchange)। তাই উৎপাদন সম্পর্ক যখন বিচ্ছিন্নতাবোধযুক্ত, তখন তার মধ্যে একটা অংশ হবে প্রকৃতির সঙ্গেই বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। তাই যে শক্তিগুলি ধনতন্ত্রের অর্থনৈতিক সংকট ঘটায়, তারাই পরিবেশের সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। মার্ক্স ও এঙ্গেলস যে প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে ঐক্য দেখেছিলেন, সেটা তাহলে এমন এক বিপ্লবী দিশা দেখায়, যা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত। তাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বদলাবে না, বদলাবে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও। অতএব, এঙ্গেলসের এই অবদানকে বাতিল করলে মার্ক্সবাদ আজকের যুগের অন্যতম কেন্দ্রীয় সমস্যার কোনো জবাব দিতে পারবে না, বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া পরিবেশবাদের সঙ্গে এক জায়গাতে পড়তে হবে, অথবা পরিবেশের সংকট যে এক প্রচন্ড সংকট সেটাকে খাটো করে দেখাতে হবে। মার্ক্সবাদকে নিছক সামাজিক তত্ত্ব বলার পিছনে একটা লুকোনো প্রয়াস ছিল, যা হল মার্ক্সবাদকে বুর্জোয়া সামাজিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। বিপ্লবী, ধনতন্ত্রবিরোধী পরিবেশবাদ গড়তে হলে এঙ্গেলসকে বাতিল করা একেবারেই চলে না।

এঙ্গেলস ও সংশোধনবাদঃ

এঙ্গেলসের বিরুদ্ধে আরেকটা অভিযোগ, তিনি সংশোধনবাদ উদ্ভবের জন্য কিছুটা অন্তত দায়ী। লুসিও কোলেত্তি ১৯৭২ সালে ‘বার্নস্টাইন অ্যান্ড দ্য মার্ক্সিজম অফ দ্য সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল’ প্রবন্ধে সবচেয়ে কৌশলীভাবে প্রশ্নটা তোলেন। [২৭] তিনি এঙ্গেলসকে সংশোধনবাদের জনক বলেন নি। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, এঙ্গেলসের মার্ক্সবাদের দুর্বলতার ফলে সংশোধনবাদের উত্থান হতে সুবিধা হয়েছিল। কোলেত্তির কথা হল, ‘যান্ত্রিক’ মার্ক্সবাদ থেকে মুক্তি না পেলে এই সমস্যা থেকেই যাবে। আমি এখানে দেখাতে চাই, এঙ্গেলসের মার্ক্সবাদ বার্নস্টাইন কেন, কাউটস্কির মার্ক্সবাদ থেকেও ভিন্ন। এটা ব্যক্তিপূজা করার জন্য করছি না। করার দরকার, কারণ নানা মার্ক্সবাদী মোড়ক নিয়ে ঐ সংশোধনবাদ ফিরে আসে বারে বারে। স্তালিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টিদের অবক্ষয়ের পর, ইদানীং আবার কাউটস্কির মাহাত্ম্য বাড়িয়ে দেখা শুরু হয়েছে, আর লেনিন যেহেতু স্তালিনের উৎস না, তাই তিনিও কাউটস্কির ছায়া, এই প্রচার শুরু হয়েছে। লারস লি, এরিক ব্ল্যাঙ্ক এই প্রবণতা চালু করেছেন। এর জের টেনে এরিক ব্ল্যাঙ্ক, ভাস্কর সুঙ্কারা-রা কাউটস্কীয় ধাঁচে নির্বাচন আর ট্রেড ইউনিয়ন সর্বস্ব রাজনীতিতে ঠেলতে চাইছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাম আন্দোলনকে। তাই এঙ্গেলসের পুনর্বিবেচনা অতি প্রাসঙ্গিক ও আবশ্যক।
১৯৬৮ সালে বার্নস্টাইনের বই সমাজতন্ত্র ও সোশ্যাল ডেমোক্রেসী পুনর্মুদ্রিত হলে কোলেত্তি এই প্রবন্ধটি ভূমিকা হিসেবে লেখেন। তিনি বলেন, কাউটস্কি ও প্লেখানভের মত মার্ক্সবাদীরা বার্নস্টাইনের সঙ্গে তর্কে অবতীর্ণ হলেও, তাঁদের মার্ক্সবাদের মধ্যে যে ত্রুটি ছিল, সেটাই বার্নস্টাইনের সুযোগ এনে দিয়েছিল। কোলেত্তি দেখিয়েছেন, এই যুগের মার্ক্সবাদীরা মার্ক্সের ক্যাপিটালের ভ্রান্ত পাঠের ফলে, ধনতন্ত্রের অনিবার্য পতনের কথা বলতেন। বাস্তবে, মার্ক্স কেবল বলেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অতি-উৎপাদন, মুনাফার হার কমার প্রবণতা, এবং তা থেকে সংকট, বহু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যাওয়া, এগুলো অনিবার্য। কিন্তু তার ফলে পুঁজির ঘনীভবন হবে, নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আসবে, ইত্যাদি। সংকট অনিবার্য, কিন্তু পতন অনিবার্য নয়, তা্র জন্য চাই শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী রাজনীতি।
কোলেত্তি সঠিকভাবে বলেছেন, মার্ক্সের ‘ক্রিটিক’ অফ পলিটিক্যাল ইকনমির তাৎপর্য মার্ক্সবাদীরা সকলে বোঝেন নি। বুর্জোয়া চিন্তায় ‘অর্থনীতি’ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সবচেয়ে জরুরী অংশ। মার্ক্সের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী চিন্তা তাকে অনুসরণ করে না। তিনি ‘অর্থনৈতিক’ ক্ষেত্রকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেন নি। আপাতভাবে যা নৈর্ব্যক্তিক, যেটা দেখলে মনে হয় শুধু বাজারে সমানে সমানে কেনা বেচা, তার পিছনে আছে রাজনীতি, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব। জ্ঞানকে খন্ডিত করে, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মার্ক্সবাদীরা যে তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন তা ক্রমেই বুর্জোয়া দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছিল, যদিও তার রণনীতি ঘোষিতভাবে ছিল বিপ্লবী।
এ পর্যন্ত কোলেত্তির বক্তব্যকে আবার স্মরণ করা ভাল, কারণ ঐ একই পথে নতুন করে অনেকে হাঁটছেন, যেখানে বিপ্লবী ঘোষিত রণনীতির সঙ্গে এমন তত্ত্ব আসে যা প্রলেতারীয় বিপ্লবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে না। কিন্তু সমস্যা হল, কোলেত্তি এঙ্গেলসের একটি রচনাকে এই তত্ত্বগত দুর্বলতার উৎস বলে মনে করছেন। মার্ক্সের দ্য ক্লাস স্ট্রাগলস ইনফ্রান্স-এর যে ভূমিকা ১৮৯৫ সালে এঙ্গেলস লিখেছিলেন তা থেকেই নাকি গোলযোগের সূচনা। [২৮]
কোলেত্তি বারেবারে বলে রেখেছেন, তিনি এঙ্গেলসকে সরাসরি সংশোধনবাদের জন্য দায়ী করছেন না। কিন্ত তিনি ১৮৯৫-এর এই রচনাটির মধ্যে বিপদ দেখেছেন। এঙ্গেলসের লেখা ভূমিকাতে বলা আছে, ১৮৪৮ সালে তিনি ও মার্ক্স মনে করেছিলেন, ইউরোপ প্রলেতারীয় বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত। তারা ভুল ভেবেছিলেন। পরবর্তী অর্ধশতকে ধনতন্ত্র প্রবল তেজ দেখিয়ে শিল্পায়ন এগিয়ে নিয়ে গেছে। এঙ্গেলসের মতে, শুধু তাঁদের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেই ত্রুটি ছিল না, ত্রুটি ছিল বিপ্লবের পন্থা সম্পর্কে চিন্তা নিয়েও। তিনি বলেন, ১৭৮৯ এবং ১৮৩০-এর বিপ্লবের ইতিহাসের মোহে পড়ে তাঁরা মনে করেছিলেন, বিপ্লব সংখ্যালঘুর বিপ্লব হতে পারে। এঙ্গেলস বলেন, একথা প্রলেতারীয় বিপ্লবের আগের বিপ্লবদের সম্পর্কে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু প্রলেতারীয় বিপ্লব সম্পর্কে না। আমরা আগেই দেখেছি, মার্ক্স-এঙ্গেলস যে নীতির উপর জোর দিয়েছিলেন, তা হল ‘শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি শ্রমিক শ্রেণীর নিজের কাজ’। কিন্তু এর পূর্ণ তাৎপর্য যদি তাঁরা নিজেরাও রাতারাতি না বুঝে থাকেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১৮৯৫ সালে গিয়ে এঙ্গেলস বলেন, ১৮৪৮-এর লড়াইয়ের পন্থা পুরো অকেজো হয়ে পড়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠকে বিপ্লবের দিকে টেনে আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এঙ্গেলস জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই কাজে দুটো বিপদ আসতে পারে। একটা হল ১৮৪৮-এর মতো সংখ্যালঘু বিপ্লবের দিকে ঝোঁক, আর অন্যটা হল একটা এলাকায় অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল, যেমন করেছিল পারী কমিউন। উপরন্তু, এঙ্গেলস বলেন, বুর্জোয়া শ্রেণী ভোটের অধিকার দিয়েছিল স্রেফ ঠকানোর জন্য, কিন্তু সেটাও শ্রমিক শ্রেণী মুক্তির হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছে।
এ পর্যন্ত আমি মোটামুটি কোলেত্তির সংক্ষেপ করে দেখালাম, তিনি কীভাবে এঙ্গেলসের উপস্থাপনা করেছেন। এবার আমাদের দেখতে হবে, সেই উপস্থাপনা কতটা সঠিক। কোলেত্তির এঙ্গেলস-সমালোচনার কেন্দ্রে আছে তাঁর বিশ্বাস যে এঙ্গেলস মনে করেছিলেন ভোটের অধিকার শ্রমিক শ্রেণীকে অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষমতার দোরগোড়ায় নিয়ে যাবে। বাস্তবে, যে লেখাটা ১৮৯৫ সালে ছেপে বেরিয়েছিল, তাতেও এঙ্গেলস এরকম কথা বলেন নি। কোলেত্তি তাঁর লেখা থেকে ঐটা অনুমান করতে চাইছেন। এঙ্গেলস যা বলেছিলেন তা হলঃ

(১) – নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর দল নিজের সমর্থন মাপতে পারে। [প্রসঙ্গত বলে রাখা জরুরী, তা হলে, বুর্জোয়া দলেদের সঙ্গে আঁতাতের কথা কিন্তু ওঠে না। এঙ্গেলস তো একেবারেই তোলেন নি—তাই এই প্রবন্ধ থেকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট, বা আমেরিকাতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে ঢুকে ‘বাম’ রাজনীতি করার স্বপ্ন ফেরি করা, এ সবের রশদ মিলবে না] (২) শ্রমিক দলের প্রচারের মাধ্যমে অন্য দলেদের নানা বিষয়ে তাদের প্রকৃত অবস্থান খুলে বলতে বাধ্য করা যায়। [তার প্রথম শর্ত অবশ্যই, শ্রমিক দল নিজের মত সততার সঙ্গে বলবে।] (৩) নির্বাচিত হলে সংসদ থেকে, বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে, বিপ্লবী নীতি প্রচার করা হবে। [কোথাও এঙ্গেলস বলছেন না, যে আরো আসন পাওয়ার জন্য, বা ভোট বাড়াবার জন্য, বা সরকারে যাওয়ার জন্য, দলের বিপ্লবী নীতি লুকিয়ে রাখা হোক।] তিনি বেবেলের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর পাঠকরা জানতেন, বিসমার্কের যুদ্ধনীতির সমালোচনা করে বেবেল সাংসদ হয়েও জেলে গিয়েছিলেন। পাঠক আরো দেখবেন, ১৮৭৯-এর চিঠির সঙ্গে কিন্তু এঙ্গেলস ১৬ বছর পরেও মোটামুটি সামঞ্জস্য রেখে চলেছেন।
অর্থাৎ এঙ্গেলস কোথাও শ্রমিক শ্রেণী ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে পারে এই কথা বলেন নি। তিনি বলেছিলেন, ভোটের দক্ষ ব্যবহার করতে পারলে শ্রমিক শ্রেণীর দল ক্রমেই নিজের শক্তিবৃদ্ধি করতে পারবে। আর এর পাশাপাশি, তিনি কিন্তু বিপ্লবের কথা বলতে ছাড়েন নি। তিনি লিখেছিলেন, ‘অবশ্যই আমাদের ভিনদেশী কমরেডরা তাদের বিপ্লবের অধিকার ত্যাগ করছেন না। বিপ্লবের অধিকার একমাত্র ‘ঐতিহাসিক অধিকার’, সব আধুনিক রাষ্ট্র যার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৪৮-এর বিপ্লব আলোচনা করতে গিয়ে তিনি যেন লালকালির দাগ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন কি বলতে চান। তিনি লেখেন, The period of revolutions from below was concluded for the time being, (তলা থেকে বিপ্লবের যুগ তখনকার মত শেষ হল) [জোর আমার – লেখক]। এটা কোনোভাবেই চিরতরে শেষ হল বলা নয়। বরং এর পরেই তিনি লেখেন, ধনতন্ত্র স্বয়ং সেই শর্ত গড়ে তুলছিল, যার ফলে বিপ্লবের পরিস্থিতি পরিপক্ক হবে।
পারী কমিউনের পরাজয় সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেননি, অভ্যুত্থান করা চলবে না। তিনি পরাজয়ের দুটি কারণ উল্লেখ করেন। প্রথমত, পারী একা লড়েছিল, বাকি ফ্রান্স তার সঙ্গে ছিল না। উপরন্তু নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু তিনি একথাও লিখেছিলেন যে পারী কমিউন দেখিয়ে দিল যে পারীতে প্রলেতারীয় বিপ্লব ছাড়া কিছু সম্ভব না। এই যুক্তি ধরে এগোলে যে সিদ্ধান্ত হয়, তা বিপ্লব ছেড়ে সংস্কারবাদ না, বরং, বিপ্লবীরা যেন সংখ্যালঘু না থাকেন সেটা নিশ্চিত করার পথ ধরতে হবে। আর নিশ্চিত করতে হবে নেতৃত্বের মধ্যে ঐক্য এবং উন্নত রাজনৈতিক দিশা।
১৮৪৮ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়েও, তিনি যে কথা লিখেছিলেন সেটা আর একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। তিনি লেখেন, একটা সোজা চমক দেওয়া আক্রমণ করে সমাজ পুনর্গঠন করা যায় না। অর্থাৎ, অভ্যুত্থান না, পার্লামেন্টের পথ ধর, এমন কোনো কথা তিনি বলেন নি। তিনি বলছেন, এক ঝটকায় ক্ষমতা দখল হবে না। শ্রমিক শ্রেণী নিষ্ক্রিয় থাকবে, এক সংখ্যালঘু ‘নেতৃত্ব’ তাদের হয়ে লড়াই করে ক্ষমতা দখল করবে, সেটা হবে না। বিপ্লবীদের প্রথমে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে আসতে হবে, শ্রেণীর ব্যাপক অংশকে পথে নামাতে হবে। তবেই সম্ভব হবে পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙ্গে ফেলার।
অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গে বলা হয়, তিনি অভ্যুত্থানের বিরোধী ছিলেন। ভাল করে পড়লে দেখা যায়, তিনি অভ্যুত্থান কোন শর্তে হবে তা নতুন করে ভাবতে বলেছেন। তিনি দেখান, ব্যারিকেডের লড়াইয়ের প্রধান মূল্য নৈতিক। ব্যারিকেডের ওপার থেকে ফৌজীদের নিজেদের দিকে টানা যায় কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। ব্যারিকেডের লড়াই থেকে সেনাবাহিনীকে বিপ্লবী জনতা হারিয়ে দেবেন, এটা দুঃসাধ্য। তিনি আরো দেখান, সামরিক কৌশল পাল্টানোর ফলে ১৮৯৫ সালে বিপ্লবের গোড়ায় অভ্যুত্থান অকেজো। কিন্তু তারপর তিনি লেখেনঃ
Does that mean that in the future street fighting will no longer play any role? Certainly not. It only means that the conditions since 1848 have become far more unfavourable for civilian fighters and far more favourable for the military. In future, street fighting can, therefore, be victorious only if this disadvantageous situation is compensated by other factors.
১৯১৭র রুশ বিপ্লব বা ১৯১৮র জার্মান বিপ্লব সেই অন্য উপাদানদের দেখাল। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে সৈন্যদের মধ্যে সরকার, রাষ্ট্র ও সেনাপতিদের প্রতি ঘৃণা সেনাবাহিনীতে ফাটল ধরাল। সেটা না হলে ফেব্রুয়ারী বিপ্লব সম্ভব হত না, অক্টোবরেও কয়েক হাজার সশস্ত্র রেড গার্ড কামান, সাঁজোয়া গাড়ি, ইত্যাদিতে সজ্জিত বিরাট সেনাবাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত না।

লিয়েবকনেশটের কৌশলঃ

জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলের অন্যতম নেতা ছিলেন ভিলহেলম লিয়েবকনেশট। মার্ক্স-এঙ্গেলস পত্রাবলী পড়লে মাঝে মাঝেই দেখা যায়, তিনি নিজেকে মার্ক্সের একনিষ্ঠ অনুগামী বলে দাবী করলেও, মার্ক্সের এ নিয়ে সংশয় ছিল। মার্ক্স ও এঙ্গেলস যে বহুদিন লাসালের প্রতি তাঁদের নানা আপত্তি সত্ত্বেও লাসালপন্থী শ্রমিকদলকেই সমর্থন করেছিলেন, তার কারণ লিয়েবকনেশট বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেধে চলছিলেন। ১৮৯৫ সালেও গন্ডগোল পাকিয়েছিলেন তিনিই। সেই ইতিহাস একটু দেখা দরকার। কিন্তু তার আগে বলা দরকার, শুধু কোলেত্তি না, ডেভিড ম্যাকলেলানের মতো পন্ডিত লেখকও দাবি করেছেন, এঙ্গেলসের শেষ জীবনের এই লেখা সোশ্যাল ডেমোক্রেসীর নেতাদের প্রভাবিত করেছিল। অথচ ম্যাকলেলান একথাও লিখেছেন, যে এঙ্গেলস গভীর আপত্তির সঙ্গে কিছু বৈপ্লবিক অংশ বাদ দিতে রাজি হয়েছিলেন। [২৯] তাহলে বোঝা গেল না, এঙ্গেলস প্রভাবিত করলেন কীভাবে? নাকি, যারা ইতিমধ্যেই বিপ্লবকে ভোট আর ট্রেড ইউনিয়নের রাজনীতির খোপে ঠেলে দিতে চাইছিলেন, তারা চাপ দিয়েছিলেন?
বস্তুত, চাপ দিয়ে কাটানো হয় নি। না বলে কেটে দেওয়া হয়েছিল। এঙ্গেলস সচেতন ছিলেন, যেভাবে কেটে দেওয়া হল, তাতে সুবিধাবাদী রাজনীতির হাত শক্ত করা হল। তিনি ১ এপ্রিল ১৮৯৫ ক্ষোভের সঙ্গে কাউটস্কিকে চিঠি লিখলেনঃ
“বিস্ময়ের সঙ্গে আমি দেখলাম আজকের ভোরওয়ার্টস-এ [লিয়েবনেশট সম্পাদিত পার্টি দৈনিক] আমাকে আগে না জানিয়ে আমার লেখা ভূমিকা থেকে একটা অংশ ছাপা হয়েছে, এবং সেটা এমন কাটছাঁট করে, যাতে আমাকে দেখানো হচ্ছে যে কোনো মূল্যে আইনী পথের শান্তিপূর্ণ উপাসক বলে। পুরোটা যে নয়ে জাইট-এ [কাউটস্কি সম্পাদিত তাত্ত্বিক পত্রিকা] বেরোবে, সেটা ভালো, কারণ তাতে এই লজ্জাকর ধারণাটা মুছে দেওয়া যাবে।” বাস্তবে কাউটস্কির মেরুদন্ড এঙ্গেলসের মতো শক্ত ছিল না। ফলে তিনি লিয়েবকনেশট-এর চাপে কিছু বাদ দিয়েই ভূমিকাটা ছাপলেন।
এঙ্গেলসের আপত্তি কোথায় ছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ফ্রান্সে পল লাফার্গকে তিনি চিঠি লেখেনঃ
“লিয়েবকনেশট আমার উপর এক চমৎকার চাল চেলেছে। মার্ক্সের ১৮৪৮-৫০ এর ফ্রান্স বিষয়ক প্রবন্ধগুলির জন্য আমার লেখা ভূমিকা থেকে সে নিয়েছে সেই সব, যা থেকে যে কোনো মূল্যে শান্তির রণকৌশল আর বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করা যায়, কারণ সে হালে কিছুদিন ধরে ঐ রাজনীতিই প্রচার করছে, বিশেষত বার্লিনে নতুন যে আইন বানানো হচ্ছে তাকে দেখে। কিন্তু আমি এই কথাগুলি বলছি শুধু আজকের জার্মানী সম্পর্কে, এবং তাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ছাড় মাথায় রেখে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালী ও অস্ট্রিয়াতে এই রণকৌশল পুরোপুরি অনুসরণ করা যাবে না, এবং কাল জার্মানীতে এরা অচল হয়ে যেতে পারে।”
১৮৯৯ সালে কাউটস্কি বার্নস্টাইনের জবাবে লেখেন, দোষ এঙ্গেলসের না, সেই সব জার্মান বন্ধুদের, যারা এঙ্গেলসের সিদ্ধান্তগুলি বেশি বিপ্লবী বলে বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনও কাউটস্কি দায়িত্ব নিয়ে গোটা লেখাটা ছাপলেন না। তিনি বলেন, একমাত্র কপি আছে বার্নস্টাইনের কাছে। ১৯২৪ সালে রুশ বলশেভিক ডেভিড রিয়াজানভ ওই কপির ছবি সংগ্রহ করলেন।

ঠিক কি করেছিলেন লিয়েবকনেশট? সেটা দেখার আগে কোলেত্তি সম্পর্কে শেষ কথা বলব। ১৯৩০ সালে ইংরেজিতে গোটা লেখাটা অনুবাদ হয়ে বেরোয়। তার আগে কেউ বলতে পারতেন, তিনি জানেন না এঙ্গেলস ঠিক কী বলেছিলেন। যদিও আমি দেখাতে চেয়েছি, তা হলেও, যেটা মুদ্রিত ছিল তাতেই কোলেত্তির ব্যাখ্যা প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু এখন ওই যুক্তিও খাটে না। অর্থাৎ, এঙ্গেলসকে বেত মারার সেই প্রবণতা থেকেই গেল।
এঙ্গেলসের প্রথম যে বক্তব্য নিয়ে ভোরওয়ার্টসের সম্পাদকের অস্বস্তি ছিল, তা হল ব্যারিকেডের লড়াই। এঙ্গেলস বলেছিলেন, ব্যারিকেডের লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য সেনাবাহিনীর মধ্যে ফাটল ধরানো। লিয়েবকনেশট কাঁচি দিয়ে কাটলেন যে জায়গাটা, সেখানে বলা ছিলঃ “এটাই মূল কথা, যা মনে রাখতে হবে, যখন আমরা ভবিষ্যতেও রাস্তায় লড়াইয়ের কথা ভাবব”। অর্থাৎ, এঙ্গেলস একেবারেই বলেন নি যে ভবিষ্যতে আর রাস্তায় নেমে লড়াই হবে না। তাঁর কাছে প্রশ্নটা ছিল – কীভাবে সেই লড়াইকে সবচেয়ে ফলপ্রসূ করা যায়?
এক পৃষ্ঠা পরে আবার কাঁচির দরকার হল। এঙ্গেলস লিখেছিলেন, শুধু সামরিক দিক থেকে বিপ্লবী জনতার অবস্থা খারাপ হয় নি। বরং, প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলির পিছনে জনসমর্থন বেড়েছে। এর পর তিনি লেখেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তর ও পূর্ব বার্লিনের এলাকাগুলিতে ব্যারিকেডের যুদ্ধ করা হবে পাগলামি। যদি এইখানে তিনি থেমে যেতেন, তা হলে মনে করা স্বাভাবিক হত, যে তিনি শান্তিপূর্ণ পথের প্রবক্তা। কিন্তু তিনি তারপর বললেন, ভবিষ্যতে রাস্তার লড়াই জয়যুক্ত হবে বিপ্লবের গোড়ায় না, বরং বিপ্লব অনেকদুর এগোবার পর, এবং তাতে অনেক বেশী শক্তি থাকতে হবে। তারপর তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে হয়তো ব্যারিকেডের লড়াই না, বিপ্লবীরা চাইবে সরাসরি আক্রমণ করতে। এই গোটা প্যারাগ্রাফটা আবার কাঁচির হাতে পড়ল।
আরো একাধিক জায়গায় লিয়েবকনেশট কাঁচি চালিয়েছিলেন। একটার কথা বলা দরকার। এঙ্গেলস সাবধান করে দেন যে আইনী অধিকার সবসময়ে থাকবে না। তিনি বলেন, তখন বিপ্লবী দলেরও হাত খোলা থাকবে। কিন্তু তারা আগাম বলে দেবে না, তখন তারা কী করবে বা করবে না। অবশ্যই। মূর্খ ছাড়া কেউ শত্রুর কাছে রণনীতি বলে দেবে না।
সুতরাং কোলেত্তি যদি সততার সঙ্গে এঙ্গেলসের আসল লেখাটা পড়তেন, তাহলে তিনি বুঝতেন, এঙ্গেলস ১৮৯৫ সালে, মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও, ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিককে একজোট করে বিপ্লবের পথে ক্ষমতা দখলের প্রবক্তা। তার এই রচনা থেকে এগোনো যায় লেনিন এবং গ্রামশি, দুজনের দিকেই। কোনো অবস্থাতেই তাঁকে সংস্কারবাদ-সংশোধনবাদের জনক হিসেবে দেখা যায় না। সংস্কারবাদের উত্থান এঙ্গেলসের, বা কারো, চিন্তা থেকে নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতা থেকে। একটা বিরাট দল, তার নিজের আমলাতন্ত্র। সীমিত বুর্জোয়া (এবং আধা সামন্ততান্ত্রিক) ব্যবস্থার মধ্যেও কিছু সুযোগ সুবিধা। এগুলি ক্রমে পার্টির ও ট্রেড ইউনিয়নের উপরমহলে পরিবর্তন আনছিল। এই বাস্তব পরিস্থিতি চিন্তাকে পালটে দিচ্ছিল। তাই শুধু বার্নস্টাইন না, তাঁকে যাঁরা সমালোচনা করলেন, সেই কাউটস্কি ও প্লেখানভও বিপ্লবের বাস্তবতার সময়ে বিপ্লবের বিরোধী হয়ে পড়লেন। এর দায় এঙ্গেলসের না।

এঙ্গেলস ও স্তালিন/স্তালিনবাদঃ

শেষ করব অল্প কথায় স্তালিনবাদের সঙ্গে এঙ্গেলসের সম্পর্ক কী, স্তালিনের নিজের চোখ দিয়ে সেটা দেখে। অনেক সময়েই বলা হয়, স্তালিনের সরল ও যান্ত্রিক ডায়াম্যাট এঙ্গেলসের থেকে নেওয়া। এইভাবে বলার চেষ্টা করা হয়, যেন স্তালিনবাদের জন্য এঙ্গেলস অনেকটা দায়ী। বাস্তবে দেখানো যায়, স্তালিনবাদী আমলাতান্ত্রিক প্রতিবিপ্লব নিজেকে মার্ক্সবাদের নামে চালানোর জন্য মার্ক্সবাদের বিপ্লবী মর্মবস্তুকে কেটে বাদ দিয়েছিল। এঙ্গেলসের ক্ষেত্রে স্তালিন খোলাখুলি তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগত অবদান খারিজ করেন। ১৮৪৭ সালেই, কমিউনিস্ট ইস্তাহারের খসড়া, ‘কমিউনিজমের নীতি’ লিখতে গিয়ে এঙ্গেলস লিখেছিলেনঃ

“এই বিপ্লব কী একটিমাত্র দেশের মধ্যে হতে পারে?

না। বিশ্ব বাজার তৈরী করে বড় শিল্প ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সব মানুষকে, বিশেষত সভ্য দেশের মানুষকে, এমন নিবিড় সম্পর্কে এনেছে, যে কেউই অপরের কী হল তা থেকে স্বাধীন না। উপরন্তু তারা সবকটি সভ্য দেশের বিকাশের এমন সমন্বয় সাধন করেছে, যে সবকটিতেই বুর্জোয়া শ্রেণী ও প্রলেতারিয়েত নির্ণায়ক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে, এবং তাদের মধ্যে সংগ্রাম আজকের প্রধান সংগ্রাম হয়ে পড়েছে। … এই বিপ্লব এক বিশ্ব বিপ্লব, তাই এর পরিধি বিশ্ব জোড়া”। [৩০] ক্লান্ত, গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সোভিয়েত শ্রমিক শ্রেণীর উপরে চেপে বসা আমলাতন্ত্রের শাসনই সমাজতন্ত্র, একথা বলার জন্য স্তালিনকে সরাসরি বলতে হল, একটি দেশেই সমাজতন্ত্র গড়া সম্পূর্ণ হতে পারে।

এঙ্গেলসের আর একটি তত্ত্বগত অবদান হল‘the withering away of the state’। যে অ্যান্টি ডুয়েরিং-এর আলোচনা দিয়ে শুরু করেছিলাম, তাতেই তিনি লেখেন,The first act by virtue of which the state really constitutes itself the representative of the whole of society — the taking possession of the means of production in the name of society — this is, at the same time, its last independent act as a state. State interference in social relations becomes, in one domain after another, superfluous, and then dies out of itself; the government of persons is replaced by the administration of things, and by the conduct of processes of production. The state is not “abolished”. It dies out. [৩১] হালের অনুবাদে যেটা লেখা আছে It dies out, পুরোনো অনুবাদে তাকেই লেখা হয়েছে it withers away। মূল কথা হল, সমাজতন্ত্র মানে সর্বশক্তিমান আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও তার পুলিশ, আদালত, ‘গুলাগ’ নয়, বরং একের পর এক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রশক্তির অবক্ষয়।

তৃতীয়ত, এঙ্গেলস বলেছিলেন, সমাজতন্ত্রে মূল্যের নিয়ম (law of value) চালু থাকবে না। স্তালিন ১৯৫২ সালে জানালেন, চালু থাকবে। এর কারণ হল, আমলাতান্ত্রিক অর্থনীতি বাস্তবে সমাজতান্ত্রিক ছিল না। ১৯২৫-২৬ এ সোভিয়েত অর্থনীতি বিষয়ক বিতর্কের সময়ে এভগেনি প্রিয়ব্রাজেনস্কি বলেছিলেন, ল অভ ভ্যালু আর পরিকল্পনার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে কারণ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি। অর্থাৎ একদেশে যে কারণে সমাজতন্ত্র হবেনা, সেই কারণেই ল অভ ভ্যালু আংশিকভাবে চালু থাকবেই, সেটা আমলাশাসিত না হয়ে সুস্থ প্রলেতারীয় নেতৃত্বে থাকলেও, কারণ শ্রেণী সংগ্রামটাই বিশ্বজোড়া। স্তালিনের পক্ষে একথা বলা অসম্ভব ছিল। দর্শনের ক্ষেত্রে স্তালিন ও স্তালিনবাদ বিচ্ছিন্নতাবোধ আর নেতির নেতি, দুটোকেই যত পারে সরিয়ে রেখেছিল, কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রমিকরা উৎপাদনে বিচ্ছিন্নতা মুক্ত ছিলেন না, আর কারণ এসব থাকলে মার্ক্সবাদ যে বিপ্লবী চেহারা নেয় আমলাতন্ত্র সেটা চায় নি। [৩২]

স্তালিন আমলাতান্ত্রিক প্রতিবিপ্লবের নেতা হওয়ার আগে একদা মার্ক্সবাদী দলের কর্মী ও পরে নেতা ছিলেন। তাই তিনি যথার্থ বুঝেছিলেন, এঙ্গেলস বিপ্লবী, এঙ্গেলস আমলাতান্ত্রিক একনায়কত্বের এক বড় শত্রু। এঙ্গেলসের রচনার স্তালিনবাদ ও সংশোধনবাদ বিরোধী ধার মনে রেখে, আজকের যুগের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীদের তাঁকেবুঝতে হবে, নতুন করে পাঠ করতে হবে।

______________________________________________

[১] Georg Lukács, History and Class Consciousness, Merlin, London, 1971, pp. 3, 24n6.
[২] George Lichtheim, Marxism, Routledge and Kegan Paul, London, 1964, pp. 234–43.
[৩] Alasdair MacIntyre, Marxism and Christianity, Duckworth, London, 1995, p. 95.
[৪] Norman Levine, The Tragic Deception: Marx Contra Engels, Clio, Oxford, 1975, pp. xv-xvi.
[৫] Paul Thomas, Marxism and Scientific Socialism, Routledge, London, 2008, pp. 9,39,43.
[৬] Terrell Carver, Marx and Engels: The Intellectual Relationship, Indiana Universiy Press, Bloomington, 1983, p. 157.
[৭] Terrell Carver, Friedrich Engels: His Life and Thought , MacMillan, London, 1989, p. 76.
[৮] Perry Anderson, Lineages of the Absolutist State ,Verson, London, 1974, p.23.
[৯] Terrell Carver, The Postmodern Marx, Manchester Unversity Press, Manchester, 1998, pp. 161–72; Terrell Carver and Daniel Blank, eds., Marx and Engels’s “German Ideology” Manuscripts, Palgrave, London, 2014, p.2.
[১০] Karl Marx to Friedrich Adolph Sorge in Hoboken, 19 September 1879, https://www.marxists.org/archive/marx/works/1879/letters/79_09_19.htm#n6
[১১] Marx and Engels to August Bebel, Wilhelm Liebknecht, Wilhelm Bracke and others, https://www.marxists.org/archive/marx/works/1879/letters/79_09_15.htm
[১২] Karl Marx, A Contribution to the Critique of Political Economy, Preface, https://marxists.architexturez.net/archive/marx/works/1859/critique-pol-economy/preface.htm
[১৩] ‘Engels really has too much work, but being a veritable walking encyclopaedia, he’s capable, drunk or sober, of working at any hour of the day or night, is a fast writer and devilish quick in the uptake, so he at least can be expected to do something in this respect.’ Marx to Adolf Cluss in Washington, 18 October 1853, https://marxists.catbull.com/archive/marx/works/1853/letters/53_10_18.htm
[১৪] Karl Marx, Herr Vogt, in K. Marx and F. Engels, Collected Works, Vol17, Progress Publishers, Moscow 1981, p. 114. Cited in Soma Marik, Revolutionary Democracy: Emancipation in Classical Marxism, Haymarket Books, Chicago, 2018, p. 4.
[১৫] F. Engels, ‘Outlines of a Critique of Political Economy’, in K. Marx and F. Engels, Collected Works, vol3, Progress Publishers, Moscow, 1975, pp. 418-443.
[১৬] ‘Summary of Frederick Engels’ article ‘Outlines of a Critique of Political Economy’, in Ibid., pp. 375-76.
[১৭] ‘Economic and Philosophic Manuscripts of 1844’, in Ibid., pp. 275-76.
[১৮] K. Marx, Capital, vol1, https://www.marxists.org/archive/marx/works/1867-c1/ch25.htm
[১৯] K. Marx and F. Engels, Collected Works, vol3, pp. 433-4.
[২০] Jeff Coulter, ‘Marxism and the Engels Paradox’, in Socialist Register 1971, Ralph Miliband and John Saville (Eds), pp. 129-156.
[২১] Lukács, History and Class Consciousness, 207; এছাড়া দ্রষ্টব্য John Rees, John Rees, introduction to A Defence of History and Class Consciousness: Tailism and the Dialectic, by Georg Lukács, London, Verso, 2000, pp. 19-21.
[২২] Georg Lukács, A Defence of History and Class Consciousness: Tailism and the Dialectic, p.102.
[২৩] Jeff Coulter, ‘Marxism and the Engels Paradox’, p.152.
[২৪] Perry Anderson, Considerations on Western Marxism, London, Verso, 1976.
[২৫] John Bellamy Foster, Brett Clark, and Richard York, The Ecological Rift , New York, Monthly Review Press, 2010,p.226
[২৬] Ibid, pp.215-247.
[২৭] LucioColletti, ‘Bernstein and the Marxism of the Second International’, in LucioColletti, From Rousseau to Lenin: Studies in Ideology and Society, New Left Books, London, 1972, pp. 45-108.
[২৮] F. Engels, Introduction to Karl Marx’s The Class Struggles in France 1848 to 1850, https://marxists.catbull.com/archive/marx/works/1895/03/06.htm#n449
[২৯] D. McLellan, Marxism After Marx,Boston, Houghton Miffin Company, 1979, p.17.
[৩০] https://www.marxists.org/archive/marx/works/1847/11/prin-com.htm
[৩১] https://www.marxists.org/archive/marx/works/1877/anti-duhring/ch24.htm
[৩২] Andrew Evans, Soviet Marxism-Leninism,Westport,Praeger, 1993, pp. 32, 39–40, 48, 52; Mark Sandle, A Short History of Soviet Socialism ,London, UCL Press, 1999, pp. 198–199, Herbert Marcuse, Soviet Marxism , London, Penguin, 1958.

Facebook Comments

Leave a Reply