ফ্রেডারিক এঙ্গেলস এবং আচার্য নাগার্জুনঃ দ্বন্দ্ববাদের দুই পথিকৃৎ – শংকর দাস

fail

দ্বন্দ্ববাদ বা ডায়ালেকটিক্সের সাথে ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। কার্ল মার্কসের সাথে যৌথভাবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। শুরুটা করেছিলেন দুজনে মিলে। ধীরে ধীরে গুটিকয়েক লোক জুটেছিল। আর আজ সারা পৃথিবীতে সম্ভবত এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না (দ্বীপ জাতীয় কোনো দেশের কথা আলাদা) যেখানে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত পার্টি বা আন্দোলনের অস্তিত্ব নেই! এমনই শক্তিশালী চিন্তার জন্ম দিয়েছিলেন তাঁরা। মার্কসবাদের মুখ্য বনিয়াদ হল তার দর্শন, যার নামকরণও করেছিলেন এঙ্গেলস, ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’। এই দর্শনটি গড়ে তোলার পথে তাঁর কতকগুলি মৌলিক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। তার মধ্যে ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’, ‘ড্যুরিং-এর বিরুদ্ধে’, ‘ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ এবং চিরায়ত জার্মান দর্শনের অবসান’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলি বিখ্যাত। এই বছর এঙ্গেলসের জন্মের দ্বিশতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে সারা পৃথিবীতে। দুনিয়ার মেহনতি জনগণ ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন ফ্রেডারিক এঙ্গেলসকে।

অন্যদিকে নাগার্জুন আধুনিক জনজীবনে বিস্মৃত। বর্তমানে খুব কম লোকই তাঁর নাম জানে, বা তাঁর কাজের সাথে পরিচিত। আরও দুঃখের কথা, নাগার্জুন সম্পর্কে যেটুকুও বা লোকে জানে তার বেশিরভাগটাই ভুল এবং বিকৃত। এর কারণ আছে। সুদীর্ঘকাল ধরে ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকশ্রেণী পরিকল্পনা করেই তাদের বিরুদ্ধবাদী বক্তব্য এবং ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে বিকৃতি ঘটিয়ে চলেছে। এই উদ্যোগ এতই বিরাট এবং সর্বব্যাপী যে বর্তমান সময়ে ভারতে এমন জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে যারা নিজেদের ইতিহাসটাই বিস্মৃত হয়েছে। অথচ নাগার্জুন ভারতীয় দর্শন ও চিন্তাচেতনার ইতিহাসে এক বিরাট ব্যক্তিত্ব। সর্বোপরি দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিকাশে তাঁর মহতী অবদান রয়েছে। ফলে এঙ্গেলসের কথায় যেমন চট করে চলে আসা যায়, নাগার্জুনের কথায় অতটা চট করে আসা যাবে না। সামান্য গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন হবে।

নাগার্জুনের জন্ম ১৫০ খ্রিষ্টাব্দের আশেপাশে, বিদর্ভ অঞ্চলের দক্ষিণ-ঘেঁষা কোনো জনপদে। তাঁর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত থেকেছে বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্যজুড়ে। দক্ষিণ ভারতের অন্যত্রও তাঁর গমনাগমন ছিল। বর্তমান বিজয়ওয়াড়ার কাছে ‘নাগার্জুনকোন্ডা পর্বত’কে কেন্দ্র করে তাঁর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তাঁর নামেই উক্ত পাহাড়টির নামকরণ হয়েছিল। নাগার্জুন গৌতম বুদ্ধের অনুসারী ছিলেন। বৌদ্ধ আচার্য হিসাবে এতটাই নামকরা ছিলেন যে, অনেকে তাঁকে ‘দ্বিতীয় বুদ্ধ’ নামেও অভিহিত করেন। যাই হোক, নাগার্জুন গৌতম বুদ্ধের দ্বন্দ্বতত্ত্বকে বিস্তৃত করেছিলেন এবং তাকে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছিলেন। তিনিও অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের প্রণেতা।

ভারতে বৌদ্ধ আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে সকলের মধ্যেই নানা ধরণের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকেরই ধারণা হল, এটি মূলত একটি ধর্মীয় আন্দোলন। অথচ গৌতমই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম দ্বন্দ্ববাদের উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন এবং তাঁর দ্বন্দ্ববাদ পশ্চিমের (ইউরোপ) মত আপোষ করে এগোয় নি৷ ধর্ম হল ঈশ্বরতত্ত্ব। সর্বশক্তিমান এবং জগত-নির্মাতা ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে বিশ্বাস, দর্শন, চিন্তাচেতনা ও অনুশীলনের সমষ্টি হল ধর্ম। অন্যদিকে গৌতমের দ্বন্দ্বতত্ত্ব ‘প্রতীত্য-সমূৎপাদ’ নামে পরিচিত। এর মূল কথা হল ‘প্রতীত্য’ হইতে ‘সমুৎপন্ন’ অর্থাৎ যে কোনো বস্তুর উৎপত্তি অন্যের উপর নির্ভর করে হয়ে থাকে। বাংলা কথায় প্রতিটি অস্তিত্বেরই কারণ আছে। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই এই তত্ত্ব ঈশ্বরের অস্তিত্বকে খারিজ করে।

গৌতমের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বৌদ্ধ আন্দোলনে বিভাজন ঘটে। এই বিভাজন পরবর্তী দুশো বছরে আরও বিস্তৃত হয় এবং অশোকের সময়ে যে তৃতীয় মহাসম্মেলন হয় সে সময়েই বৌদ্ধরা ১৬টি আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। গৌতমের মূল দর্শনের তুলনায় বিচার করলে এর মধ্যে অনেকগুলিই ছিল বিচ্যুতির শিকার। এই সমস্ত বিচ্যুতির বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ ঘটে ঐ তৃতীয় মহাসম্মেলনেই। এই মহাসম্মেলনে যিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনিও বৌদ্ধ আন্দোলনের একজন বিরাট ব্যক্তিত্ব, মোগলিপুত্ততিস্যা। সম্মেলনের আগেই তিনি এই বিচ্যুতিগুলির বিরুদ্ধে একটি পুস্তক রচনা করেছিলেন যার নাম ‘কথাবত্তু’ (Points of Debate)। তৃতীয় সম্মেলনে তীব্র সংঘাতের পর বেশ কয়েকটি গোষ্ঠীর সদস্যরা সংঘ থেকে বহিষ্কৃত হন। এঁরা পরবর্তীকালে আলাদা সম্মেলন করেছিলেন।

মোগলিপুত্ততিস্যার সংগ্রাম যদি বিচ্যুতির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ হয়, তাহলে এই ঘটনার প্রায় তিনশো বছর পর নাগার্জুনের সংগ্রাম ছিল দ্বিতীয় প্রতিরোধ। সেই সময়কার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী নাগার্জুনের সংগ্রামের অধিকাংশটাই সর্বাস্তবাদী বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং সৌত্রান্তিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। মোগলিপুত্ততিস্যা বা নাগার্জুন কারোর সাথেই সেই অর্থে থেরবাদ (হীনযান) বা মহাযানবাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ, বৌদ্ধ আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে লিখিত না হওয়ার কারণে মোগলিপুত্ততিস্যা হীনযানপন্থী এবং নাগার্জুন মহাযানপন্থার প্রতিষ্ঠাতা বলে পরিচিত হন। প্রকৃতপক্ষে, এঁরা দুজনেই গৌতমের মূল বক্তব্যকেই আরও উন্নত চেহারায় (নতুন নতুন বিষয়গুলিকে তত্ত্বে সংশ্লেষিত করে) হাজির করেছিলেন। সুতরাং, নাগার্জুন গৌতমের দ্বন্দ্বতত্ত্বকেই নতুনভাবে হাজির করেছিলে।

দ্বন্দ্বতত্ত্বের প্রথম কথাই হল পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থির নয়, সবই রয়েছে গতির মধ্যে৷ অর্থাৎ স্থায়ী কিছুই নেই। হেরাক্লিটাস গ্রিসে এই মতবাদের প্রবক্তা। তিনি গৌতমের চল্লিশ বছর পরেকার। তাঁর বক্তব্য বিস্তৃত আকারে পাওয়া যায় না। এরপর পশ্চিমের দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ববাদ চাপা পড়ে ছিল। আধুনিককালেই সেখানকার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এবং তত্ত্বগত আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তা আবার আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু পশ্চিমে দর্শনের সংজ্ঞা যেহেতু ভারতের থেকে আলাদা তাই পশ্চিমী দ্বন্দ্ববাদ এবং ভারতীয় দ্বন্দ্ববাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য এঙ্গেলস এবং নাগার্জুনের দ্বন্দ্ববাদের মধ্যে ছায়াপাত যেমন ঘটিয়েছে, তেমনি উভয়ই দ্বন্দ্ববাদ হবার কারণে একই বক্তব্য নিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেছে।

পশ্চিমে দর্শনকে বোঝা হয়েছে জ্ঞানের একটি শাখা হিসাবে। ‘ফিলোসফি’ কথাটির মধ্যেই তার ইঙ্গিত আছে। অন্যদিকে ভারতে দর্শনকে বোঝা হয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি অর্থে। ‘দর্শন’ কথাটির মধ্যে তারও আভাষ পরিস্ফুট। সুতরাং, পশ্চিমে প্রাধান্য পেয়েছে সত্ত্বাতত্ত্ব, আর ভারতে জ্ঞানতত্ত্ব। এখন দেখা যাবে দর্শন বলতে আমরা যা বুঝি, সত্ত্বাতত্ত্ব নির্ভর সেই শাস্ত্রটি সর্বদাই কোনো না কোনো চির সত্যের সাথে যুক্ত। কিন্তু যেহেতু দ্বন্দ্বতত্ত্ব কোনো ধরণেরই চরম সত্যকে স্বীকার করে না (যেহেতু কিছুই স্থায়ী নয়) তাই পশ্চিমে দ্বন্দ্বতত্ত্বকে পূর্ণাঙ্গ দর্শনের মর্যাদা দেওয়া হয় নি৷ কিন্তু ভারতে দর্শন বিষয়টিই যেহেতু দৃষ্টিভঙ্গি অর্থে ব্যবহৃত তাই এখানে দ্বন্দ্বতত্ত্ব একটি পুরোদস্তুর দর্শন। তাই গৌতম যত সহজে বলতে পারেন, ‘আমার ধম্ম (দর্শন) অনাত্মাবাদী এবং অজড়বাদী’ অর্থাৎ ভাববাদও নয়, বস্তুবাদও নয়, তা একটি স্বতন্ত্র ধারা, একটি তৃতীয় মঞ্চ, পশ্চিমের দার্শনিকদের পক্ষে রা বলা সম্ভব হয় নি৷ এঙ্গেলস বলেছেন, সমস্ত দর্শনকেই মোটা দাগে দুটি বৃহৎ শিবিরে বিভক্ত করা হয়, ভাববাদ ও বস্তুবাদ। তাহলে একজন দ্বন্দ্ববাদী কী করবে? পশ্চিমে তাকে অবশ্যই হয় বস্তুবাদ নয় ভাববাদের লেজুড়বৃত্তি করতে হবে। এঙ্গেলসের কথায় পশ্চিমা দার্শনিক পরিমণ্ডলের এই সীমাবদ্ধতা প্রকটিত।

মার্কস তাঁর ‘ফয়েরবাখ সম্পর্কে এগারো থিসিসে’ কিন্তু ভাববাদ ও বস্তুবাদ উভয়কেই খারিজ করে দেন৷ বস্তুবাদ সম্পর্কে তিনি পরিষ্কার করেই বলে দেন যে, ‘ফয়েরবাখের বস্তুবাদসহ এযাবৎকালের সকল বস্তুবাদই’ দোষযুক্ত। মার্কসের এই বক্তব্যের সঙ্গে এঙ্গেলসের কোনো মতপার্থক্য ছিল না৷ তাহলে কেন মার্কস তাঁদের দর্শনকে ‘নতুন ধরণের বস্তুবাদ’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, এঙ্গেলস পরবর্তীকালে যার নামকরণ করেন ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ বলে? এর কারণ হল উক্ত ভাবনা: সমস্ত দর্শনই মোটের ওপর দুটি বৃহৎ শিবিরে বিভক্ত — বস্তুবাদ আর ভাববাদ। ভাববাদকে গ্রহণ করার তো প্রশ্নই ছিল না। হেগেলের দ্বন্দ্ববাদের ভাববাদী আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে লড়াই করেই মার্কস-এঙ্গেলস তাঁদের স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু বস্তুবাদকেও তাঁরা চরম সত্যের ওপর আধারিত পূর্ণাঙ্গ দর্শন হিসাবে গ্রহণ করেন নি। এঙ্গেলস বিষয়টিকে তাঁর অসাধারণ মাষ্টারির সাথে বুঝিয়েছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ’ পুস্তিকাটিতে৷ তিনি বলেন, ‘বস্তুবাদ’ কথাটিকে তাঁরা নিয়েছিলেন শুধুমাত্র এটা বোঝাতে যে, প্রকৃতি এবং চিন্তার মধ্যে প্রকৃতি হল প্রাথমিক। বস্তুবাদ বলতে এর থেকে বেশি কিছু বুঝতে গেলেই বিরাট সমস্যা তৈরি হবে, যা হয়েছিল ফয়েরবাখের ক্ষেত্রে।

কিন্তু বস্তুবাদ বলতে তো শুধু এইটুকু বোঝায় না। বস্তুবাদ মানুষের চিন্তাচেতনা, ফলত সচেতন অনুশীলনকে বস্তুর পরিবর্তনের পিছলাগু করে তোলে। কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই দার্শনিক প্রতিজ্ঞার রাজনৈতিক অভিব্যক্তিই হল সংশোধনবাদ। এঙ্গেলস এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। তাই তিনি বলতে চান যে, তাঁরা শুধু জগত সৃষ্টি হয়েছে কোনো মহান স্পিরিটের দ্বারা, অর্থাৎ জগত-নির্মাতা ঈশ্বরের ধারণাকে খারিজ করার স্বার্থেই, এবং শুধু এই অর্থেই বস্তুবাদকে গ্রহণ করেছেন, এর থেকে এতটুকু বেশি নয়। কারণ কী করা যাবে? বস্তুবাদ আর ভাববাদ ছাড়া তো আর কিছু নেই৷ বুঝতে অসুবিধা হয় না, এঙ্গেলস বস্তুবাদকে দ্বন্দ্ববাদের শৃঙ্খলে বেঁধে তাকে বামন অবতারে নামাতে চান। আমাদের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এঙ্গেলসের এই প্রচেষ্টা বৃথা গেছে। কমিউনিস্ট মহলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে বস্তুবাদেরই একটি শাখা যেখানে বস্তুবাদই প্রধান, দ্বন্দ্বতত্ত্ব আলংকারিক কিছু কথামাত্র। অর্থাৎ বস্তুবাদের শৃঙ্খলে আটকা পড়ে দ্বন্দ্বতত্ত্ব নিজেই বামনাকৃতিতে পর্যবসিত হয়েছে। দুনিয়াজুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সংশোধনবাদের মারাত্মক আধিপত্য এটাই প্রমাণ করে।

ভারতে কিন্তু এই অসুবিধা হয় নি। জগত-নির্মাতা ঈশ্বরের ধারণাকে খারিজ করার জন্য বস্তুবাদের দরকার পড়ে নি। দ্বন্দ্বতত্ত্ব নিজেই স্বাধীনভাবে অনেক বেশি যোগ্যতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেছে। নাগার্জুন প্রশ্ন তোলেন, ঈশ্বর উৎপন্ন নাকি অনুৎপন্ন? যদি অনুৎপন্ন হন তাহলে তাঁর পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়, কারণ তাঁর অস্তিত্বই নেই। আর যদি উৎপন্ন হন তাহলে প্রশ্ন উঠবে তিনি কি স্বতঃ উৎপন্ন নাকি পরতঃ উৎপন্ন? স্বতঃ উৎপন্ন বা স্বয়ম্ভু বলে কিছু হতে পারে না। কেন? নাগার্জুন দুভাবে স্বয়ম্ভুর ধারণাকে খণ্ডন করেছেন। প্রথমত বলেছেন, এরকম কোনো কিছু দেখা যায় না। ন বিদ্যতে। উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, “ন হি খরতরকরবালধারা স্বয়ম্ আত্নানাম্ অভিছেত্তুং সমর্থা ভবতি। ন হি সুশিক্ষিতঃ অপি নটবটুঃ স্কন্ধম্ আরুহ্য নর্তিতুং শক্লোতি।” (নাগার্জুনঃ ঈশ্বরকর্তৃকত্ব নিরাকৃতি)। অর্থাৎ অসি যতই ধারালো হোক না কেন, তা নিজেকে ছেদন করতে পারে না। এমনকি দক্ষতম নৃত্যশিল্পীও নিজের কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করতে পারে না। একে বলা হয় “নিজসত্ত্বায় ক্রিয়াবিরোধ”। দ্বিতীয়ত, নাগার্জুন তত্ত্বগতভাবে স্বয়ম্ভুর ধারণাকে খণ্ডন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, স্বয়ম্ভু মানে কি? নিজের থেকেই নিজের সৃষ্টি। একই জিনিস একাধিকবার উৎপন্ন হওয়া তো হাস্যকর ব্যাপার। আর আলোচনা তো হচ্ছে ঐ ” নিজে”টি সৃষ্টি হল কীরুপে? সুতরাং, নিজের থেকে নিজের সৃষ্টি — কথাটিই দোষযুক্ত বাক্য। আর অন্যদিকে ঈশ্বর যদি পরতঃ উৎপন্ন হন তাহলে ঈশ্বর আর ঈশ্বরই থাকেন না। কারণ যা থেকে তিনি সৃষ্ট তা তিনি উৎপন্ন করেন নি। দ্বন্দ্বতত্ত্ব নিজেই ঈশ্বরের ধারণাকে চৌপাট করে দিল ভারতে।

দ্বন্দ্ববাদ ইতিহাসকে দেখে ছেদ ও ধারাবাহিকতার এক অন্তহীন ও যুগপৎ প্রবাহ হিসাবে৷ এঙ্গেলসের অপূর্ব কথাগুলির সৌন্দর্য ইংরাজি অনুবাদে যতটা বা রক্ষিত হয়েছে বাংলা অনুবাদে তা যেহেতু খুঁজে পাওয়া যায় না, তাই ইংরাজিতেই রাখছি:
“All that is real in the sphere of human history becomes irrational in the process of time, is therefore irrational by its very destination, is tainted beforehand with irrationality, and everything which is rational in the minds of men is destined to become real, however much it may contradict existing apparent reality.” (এঙ্গেলস/ ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ)।
এই একই কথা নাগার্জুন হাজির করেন রিয়ালিস্টদের বিরুদ্ধে বিতর্কে, তাঁর প্রবল ধ্বংসাত্মক পথে:
ন স্বতঃ নাপি পরতঃ না দ্বৈভ্যম নাপি অহেতুতাঃ
উৎপন্ন জাতু বিদ্যন্তে ভব ক্বাচনা কেচনা।।
(মূলমাধ্যামাকাকারিকা)
অর্থাৎ, জগতে অস্তিত্বশীল কোনো পদার্থই দেখা যায় না যা নিজের থেকে উৎপন্ন, অন্য থেকে উৎপন্ন, উভয় থেকেই উৎপন্ন, অথবা শূন্য থেকে উৎপন্ন। নাগার্জুনের এই কথাটি নিয়ে বৌদ্ধ তাত্ত্বিক ও বৌদ্ধ বিশারদদের মধ্যে প্রবল বিতর্ক হয়েছে। অধিকাংশ পণ্ডিতই বুঝে উঠতে পারেন নি, এই চার প্রকার উৎপন্নের বাইরে আর আছেটা কী? সুতরাং, একটা সহজ সিদ্ধান্ত করা হয়েছে, নাগার্জুন বোধহয় বস্তুজগতের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেছেন। মার্কসবাদীরাও এই মারাত্মক ভুল করেছেন। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের “What is Living and What is Dead in Indian Philosophy” দ্রষ্টব্য।

অথচ, নাগার্জুন ঐ ছেদ ও ধারাবাহিকতার তত্ত্বই কিন্তু বিবৃত করেছেন উক্ত বক্তব্যে। এবং ফালাফালা করে দিয়েছেন তাঁর প্রতিপক্ষ নৈয়ায়িকদের এবং সৌত্রান্তিক বৌদ্ধ মতামতকে। কোনো কিছুই নিজের থেকে উৎপন্ন তা তো বোঝা গেল। কিন্তু অন্যের থেকেও উৎপন্ন নয়? সে আবার কী? নাগার্জুন “ঈশ্বরকর্তৃকত্ব”-তে বলেছেন, কোনো জিনিস যদি ” অন্য” থেকে উৎপন্ন হয় তাহলে তো যে কোনো কিছু থেকে যে কোনো কিছু উৎপন্ন হতে পারে। বালুকা থেকে তেল উৎপন্ন হতে পারে, কূর্ম থেকে লোম উৎপন্ন হতে পারে। বিজেপিও সুশাসন দিতে পারে! অর্থাৎ নাগার্জুন বলতে চান যা উৎপন্ন হয় তা কারণের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। তাই আমের আঁটি থেকে আমগাছই হয়, জামগাছ নয়। ছেদ ব্যাখ্যা করে স্বয়ম্ভুর ধারণাকে খারিজ করেছেন, আবার ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করে পরতঃ উৎপন্নের ধারণাকে খারিজ করেছেন। তাই এঙ্গেলস বলছেন “which is rational in the minds of men is destined to become real…” বাস্তবে নাই। কিন্তু নেই কি? আছে। মানুষের মনে আছে, হৃদয়ে আছে, কারণের মধ্যে লুকিয়ে আছে। নেইও বটে আবার আছেও বটে। “না স্বতঃ নাপি পরতঃ”—এই হলো তাৎপর্য!

এইভাবে দ্বন্দ্বতত্ত্বের এই মহান চিন্তকরা মিল ও অমিলের মধ্যে তাঁদের বক্তব্যকে হাজির করেছেন। তাঁদের মধ্যে যুগের বিরাট ফারাক হেতু অনেক পার্থক্যও ঘটেছে যা অন্য সময়ে আলোচনা করা যাবে। এঁদের নিয়ে আলোচনার পরিধি এত বিস্তৃত যে তার জন্য একটি ছোট লেখা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক আকারে এই কাজ করার চেষ্টা রাখার অঙ্গীকার করে এঙ্গেলসের দুশো এবং নাগার্জুনের তিরিশ কম দুহাজার দুশো বছরে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আপাতত এখানেই শেষ করলাম।

সমাজ নামক জেলখানা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে দুই বন্ধু টানেল কাটছিলেন। নিজেদের পুঁজি কবরে পাঠিয়ে তাঁরা গতর-খাটিয়ে জনতাকে চেনাচ্ছিলেন পুঁজির জোয়াল, আর তাই তো পতাকাটার রং শুষে নিচ্ছিল লোহিত কণিকা। তারপর পেরিয়ে গেল অনেকগুলো বছর। টানেল কেটে বেরিয়েও জেলখানার শেষ নেই যেন। দুই শতক পরেও তাই গাঁইতি-শবল ফুঁড়ে দিচ্ছে কারাকক্ষের বুক। তুমি বলবে, এ তো ইউটোপিয়া! আমি বলব, এটাই বিজ্ঞান! শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই যে!

Facebook Comments

Leave a Reply