টাটকা রোদপিঠের রেসিপি : ফাল্গুনী ঘোষ

fail

কীর্তিপুরের খ্যাতি পিঠে রান্নায়। কয়েকঘর মাত্র তাদের বাস। এই ‘তারা’ যে আসলে কারা সে নিয়ে আশপাশের এলাকায় গল্প ঘুরেফিরে বিস্তর। হোক সে গল্প তবুও তো তা গল্প। আর কে না জানে গল্পের ভিতর আরো কত গল্প থাকে ঝুপ্পুস করে ঘাপটি দিয়ে। এদের লোকগুলো কালো, সিড়িঙ্গে পারা চালচলন। না আছে কোনো ঠাটবাট না আছে কোনো ঠমক ঠামক। আর সাজুগুজুর তো নামই শোনেনি সেই ‘তারা’। ভিনগ্রহ থেকে কেউ ঝাঁ চকচকে সানগ্লাস পরে আভেঞ্জার হাঁকিয়ে ফুত্তিফাত্তা করতে এলে এদের মুখগুলো মশামাছি ঢোকার মত হাঁ হয়ে যায়।

যেন এলিয়েন এল দেশে। সঙ্গে করে নিয়ে আসে নড়াচড়া পুতুল। পুতুলের চকচকে চুল বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কেমন সুবাস তাতে! আবার চোখে ধাঁধা লাগানো বেশবাস। কিছুক্ষণ দেখার পর যেই রাস্তায় লাল ধুলোর সাথে সিগারেটের কড়া ধোঁয়া আর কুড়কুড়ের প্যাকেট বাতাসে উড়ে এসে পরে তাদের দোরগোড়ায়, তখন ‘তারা’ বিরস মুখে প্যাকেটগুলো কুড়িয়ে বাড়ির বাচ্চাকাচ্চার নজর এড়িয়ে ফেলতে চায় দূরে কোথাও। একমাত্র ‘তারা’ই জানে তাদের বাচ্চাকাচ্চাদেরও রোদপিঠে ঘূর্ণিবাতাসের চচ্চড়ি দিয়ে খেয়ে ঢেকুর তুলে মাঠে ঘাটে জোয়াল টানতে হবে। এসব ভিনগ্রহী জিনিসে লোভ বড় ভালো কথা নয়! তাই তারা ফেলে দেয়।

কিন্তু ফেলবেই বা কোথায়! সব যে তাদের রান্নাঘর। এইটাই হল আসল কথা, আর এই কথাই গল্প হয়ে উড়ে বেড়ায় চারদিকে। লোকে জানে না, এরা কি খায়। এদের খাবার না কি চোখে দেখা যায় না! ভারী আশ্চর্যের কথা! বাইরের লোকে বলে সব গালগপ্প। অথচ যতই কালোকেলো চেহারা হোক না কেন এদের গায়ে বেশ জোর রয়েছে। লোকের ভেবে ভেবে রাতের ঘুম নষ্ট হয় তবু উত্তর মেলে না। সমাধানও হয় না রহস্যের।

এইবার চুপি চুপি আপনাদের বলি। আমার কাছে খবর আছে এদের হেঁসেলের। সুলুক আছে সেসব অবাক করা রান্নাবান্নার। কিসব তাদের জমকালো নাম আর কতই না বাহারি রেসিপি। অমনি হ্যাঙলাপনা শুরু করলেন তো! বাঙালি কাকে বলে! খেতে ওস্তাদ একেবারে। রোসুন! কিকরে সেসব রান্না হয় তা বলছি আপনাদের। আগে তো ক’টি রান্নার নাম শুনুন। খর জলের সাথে লাল কড়কড়ে ধূলো মিশিয়ে যে চমৎকার খর-পানা তৈরি হয় সেটি খাবেন, না কি ঘূর্ণিবাতাসের বাটিচচ্চড়ি আর সবুজ বুনো গন্ধের ভাত? আহা কি তার স্বাদ!

দেখেছেন! এখন এই ঘুনঘুনে শীতের মরসুমে আমি কিনা শরীর ঠান্ডা করার রেসিপি বলছি। সে আপনাদের শহর বাজার রাজনীতির আঁচে যতই গরম থাকুক না কেন আমাদের কীর্তিপুরে সেই ফাগুনের শেষ বেলাতেও সকাল সন্ধ্যে হাত পা সেঁকে নিতে হয় একবার করে। তাই পিঠেপুলির ভাপ চলতেই থাকে। অনেক কথা হলো। এবার চলুন রোদপিঠের রেসিপিটা একবার দেখে নিই।

রোদপিঠে বানাতে গেলে প্রথমেই আপনাকে চলে যেতে হবে একটি বড়সড় মাঠের মধ্যে। সে মাঠটি আর যারই হোক না কেন, তার মালিকানা নিয়ে কোনো শরিকী বিবাদ থাকলে রোদপিঠের স্বাদ তিতকুটে হয়ে যায়, সুতরাং অবশ্যই এটি খেয়াল রাখতে হবে। মাঠটির ঠিক মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায় যেন কোনো ঘরবাড়ি না থাকে। অনেক দূরে থাকবে ঘন সবুজ বনের নকশাকাটা। ঐ বনের সবুজ নকশা রঙ দিয়ে চাইলে পিঠের চারপাশে গার্নিশ করে দিতে পারবেন। মোটকথা যেন মাঠজুড়ে নরম রোদ বিছিয়ে রাখা যায় টানটান করে। এর সাথে চাই এক মুঠো মধুর মত ধূলোগুড়।

এবার আসুন দেখি রোদপিঠে তৈরির পদ্ধতি কিরকম হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই অন্ধকারের হাঁড়ি থেকে প্রয়োজনমত রোদ নিয়ে নিন মাঠের পাত্রে। তার সাথে মেশান মধুর মত ধূলোগুড়। এবার বেশ কিছুক্ষণ ধরে দুহাতে ঠাসতে থাকুন। প্রথম অবস্থায় এ নরম তলতলে কমলা আভার মত থাকে। যত ঠাসবেন তত দেখবেন ধূলোগুড় আর নরম রোদ মিশে বেশ একটা চিড়বিড়ে হলুদ না তরল না অতি গাঢ় বস্তু তৈরি হবে। এই বস্তুটিকে হাত দিয়ে টেনে টেনে যত বড় করে সম্ভব বিছিয়ে দিন। পড়ে থাকুক সে মাঠ জুড়ে, সবুজ নকশা পাড় জুড়ে। ছেলেপিলের দল হুটোপুটি করুক। লুটোপুটি খাক। তাহলেই রেডি আমাদের রোদপিঠে।

ধীরে ধীরে যত সময় যাবে দেখবেন কেমন ফুলকো হয়ে ফুলে ফুলে উঠছে সে পিঠে। খরখরে হাওয়ারা পালিশ করে নরম মুচমুচে করে দিচ্ছে পিঠের হৃদয়কে। রোদপিঠের মুচমুচে খোলের ভিতর মিঠে ধুলোগুড়ের আয়েস। ও এমনিই খাওয়া যায়। তবে নতুন ওঠা পয়রা জলে যদি রোদপিঠে ডুবিয়ে মুখে দেন, সে স্বাদ আর কখনও ভোলা যায় না। এই রোদপিঠে খেলেই কাজে মন বসে। দিনরাত ফূর্তিরা পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করে। আপনার অন্তর হয়ে ওঠে দশভরি সোনায় মোড়া গয়না। আর সোনার গয়নাতে কার না প্রয়োজন নেই!

তাহলে বন্ধুরা, আপনারা রোদপিঠে বানান, না পারলে কোথায় রোদপিঠে বানানো হয় জেনে অন্তত একবার চেখে আসুন। কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না যেন! আরে কীর্তিপুরে রোদপিঠে পাওয়া যায় সে ভেবে হাতপা গুটিয়ে বসে থাকলে কিন্তু ভুল হবে। কীর্তিপুরে রোদপিঠে আমি খেয়েছি ঠিকই, কিন্তু যাওয়া আসার রাস্তাটি যেন কিভাবে ভুলে গেছি!

Facebook Comments

Leave a Reply