শিশিরে শিউলি : খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

fail

বীরবিক্রম দেববর্মা কলেজ, হিল রোড, আগরতলা । কো এড কলেজ। দু’হাজারেরও বেশী ছেলেমেয়ে। প্রায় আশি জন অধ্যাপক অধ্যাপিকা । কলেজে নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একাধিক কমিটি হয়েছে। এগুলির অন্যতম হচ্ছে “Prevention of Sexual Harassment Committee” কমিটি। বাংলা বিভাগের প্রবীণা অধ্যাপিকা প্রিয়দর্শিনী ম্যাম -এর সম্পাদিকা। ষাট প্রায় ছুঁই ছুঁই। ক’দিন বাদেই অবসর নেবেন।

ঠিক এই অবস্থাতেই অধ্যক্ষা খতুপর্ণা দাশগুপ্তা। তার কাছে একটি অভিযোগ পত্র পাঠালেন বিচারের জন্য। অভিযোগ তারই বিভাগের সদা জয়েন করা সাড়ে তেইশ বছরের তরুণ অধ্যাপক প্রদীপ্ত সরকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী ঈশিতা সরকার নামে তৃতীয় বর্ষ বাংলা অনার্সের এক ছাত্রীর বাবা। অভিযোগ হল ঈশিতা প্রদীপ্ত স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ত। ফাস্ট ইয়ার থেকেই পড়ছে। এই পড়তে পড়তে এবং পড়াতে পড়াতে দু’জনে প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে গোপনে।

আর্থিক দিক দিয়ে প্রদীপ্তরা খুবই দুর্বল। সার্টিফিকেট কটা ছাড়া অর কোন কিছুই তার নেই। বিলোনিয়ার এক গ্রামে মাটির ঘরে ওদের বাস। বাবা একজন হত দরিদ্র প্রাথমিক শিক্ষক। অন্যদিকে, ঈশিতার বাবা বিমল বাবু একজন কোটিপতি, বিশাল বস্ত্র ব্যবসায়ী। আগরতলা শহরের উপর বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ী। তিনি মনে মনে এক ধনকুবের ছেলেকে মেয়ের জন্য পাত্র ঠিক করে ফেলেছেন। ছেলেটি ভেটেনারি ডাক্তারি করে।

ঠিক এই অবস্থায় বিমল বাবু ঈশিতা-প্রদীপ্তর প্রেম কাহিনী জেনে ফেললেন। মাথায় তার খুন চেপে গেল। ঠিক করলেন, প্রফেসরটাকে মেরে পিঠের চামড়া তুলে দেবেন। কিন্তু সেটা তার হয়ে ওঠেনি স্ত্রী ভারতী দেবীর জন্য। ভারতী দেবী মেয়ের সাথে কথা বলে স্বামীকে বললেন, “দেখো, হাজার হোক কলেজে পড়ায়। জামাই করলে মন্দ হোত না।” তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বিমল বাবু বললেন, “কলেজে পড়ায়! ব্যাটা ভিখিরির বাচ্চা, তোমার মেয়ের ন্যাপকিন কিনে দেওয়ার ক্ষমতা ওর হবে? এই দেখো, আমি সব খোঁজ নিয়েছি ওদের কুঁড়ে ঘরের ছবিটাও এনেছি। দেবে? এখানে মেয়েকে বিয়ে দেবে? আমার মামনি টিকতে পারবে ওখানে?”

ভারতী দেবী সব দেখে শুনে খুবই ভেঙ্গে পড়লেন। মেয়েকে বোঝাতে লাগলেন। প্রথমে একটু আমতা আমতা করলেও পরে বাবার পছন্দ করা পাত্রকেই বিয়ে করতে সম্মতি দিল ঈশিতা। আর বিমল বাবু তাঁর স্ত্রীর অনুরোধে প্রদীপ্তকে মারধরের পথে খেলেন না। তবে তাকে একটা শিক্ষা দিতে চাইলেন। ওর চাকরির ওপরে যাতে আঘাত হানা যায় তার জন্য এক উকিল বন্ধুর পরামর্শে “Sexual Harrasment”-এর অভিযোগ এনে উনি প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছে জমা দিলেন। ঈশিতাও তাতে সই করে দিল।

প্রথা মাফিক অভিযোগ পত্রটি প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছ থেকে প্রিয়দর্শিনী ম্যাডামের কাছে গেল। যৌন হয়রানি কমিটির সম্পাদিকা হিসাবে তিনি প্রদীপ্তকে শোকজ করে সাত দিনের মধ্যে উত্তর দিতে বললেন। ঈশিতা ও তার বাবার সই করা অভিযোগ পত্রের মূল বিষয়বস্তু ছিল যে প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগে প্রদীপ্ত ঈশিতাকে উত্যক্ত করে আসছে, বিয়ে করার জন্য। জোর জবরদস্তি করছে ও সর্বোপরি যৌন উত্তেজক কথাবার্তা বারে বারে তাকে বলেছে ও বলছে।

শোকজের নোটিশ ও অভিযোগ পত্র পেয়ে প্রদীপ্ত হতভম্ব হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারছিল না যে ঈশিতা এই অভিযোগ করতে পারে। ওরা যে দু’জনে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল। প্রদীপ্ত তো ওর বাড়ীর কোনো কথাই ওকে লুকাইনি। সব জেনেই শুনেই তো ঈশিতা ওকে আপন করে নিয়েছিল। আজ তো ওর কাছে কোনো প্রমাণ নেই যা দিয়ে ও প্রমাণ করতে পারে যে অনেক রঙিন স্বপ্ন দু’জনে দু’জনকে নিয়ে দেখেছিল।

এদিকে সময় অতিক্রান্ত প্রায়। একেবারে শেষ দিন বিকালে স্টাফ রুমে একাকী গিয়ে পরম স্নেহে প্রদীপ্তকে কাছে ডেকে প্রিয়দর্শিনীদি বললেন, ভাইটি, আজতো শেষ দিন। কিছুতো লিখে দিলে না! এতো এক তরফা সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে তোমার বিরুদ্ধে। দু’মাস বাদেই আমার অবসর। যাবার আগে আমায় দিয়ে জহ্লাদের কাজটা তুমি করাবে?

এবারে অসহায় শিশুর মতো হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল বাচ্চা অধ্যাপকটি – আমি কি করৰ দিদি? আমি তো কোনো দোষ করিনি। আমিতো ওকে প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছি ওর ভালোবাসা পেয়ে। আর আজ ও চলে যাচ্ছে সব অস্বীকার করে ও আমায় কলঙ্ক দিয়ে? প্রিয়দর্শিনী ম্যামের চোখের কোনায় জল। রুমাল দিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ দুটি মুছে ফেললেন। মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ঠিক আছে ভাইটি;
চিন্তা করো না। আমি আছি তোমার পাশে। এখন চলো তো প্রিন্সিপাল ম্যাডামের ঘরে।

ঘড়িতে বিকেল সাড়ে চারটে বাজে। ঘরে ম্যাডাম একা। চেয়ারে বসেই প্রিয়দর্শিনীদি তার সমবয়স্কা প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে প্রদীপ্তকে দেখিয়ে বললেন, দেখুন তো দিদি; এই বাচ্চা ছেলেটার মুখের দিকে
ভালো করে? আপনারকি মনে হয়, এ কোনো অন্যায় করতে পারে? ম্যাডাম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। কি বলবেন ভেবে পেলেন না।

প্রিয়দর্শিনীদি উত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন, দিদি, আপনার অনুমতি নিয়েই প্রদীপ্তকে চলে যেতে বলছি। আমি কিছু কথা বলবো আপনাকে।

“ঠিক আছে।”

প্রদীপ্ত চলে গেলে প্রিয়দর্শিনীদি বললেন, পঞ্চাশ বছর আগেও উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েদের আবেগের শিকার হত ছেলেরা, আজও হচ্ছে তাই। ভালোবাসা কোন পাপ নয় দিদি। প্রদীপ্ত ও ঈশিতা পরম্পরকে ভালোবাসতো; বাড়ির চাপে হোক বা প্রদীপ্তর আর্থিক অবস্থার কারণে হোক ঈশিতা এখন পা টেনে নিয়ে ওকে কাঁদাচ্ছে, যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলছে। এসব মিথ্যা, পাপ, এ মানবো না। শেষ জীবনে তারুণ্যের একটি ভুলের সংশোধনের সুযোগ এসেছে; সেই সুযোগকে দিদি আজ হাত ছাড়া করবো না। গলাটা ওর জড়িয়ে আসছিলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অস্ফুটে। ঘরের সাময়িক নিস্তব্ধতা কাটিয়ে প্রিন্সিপাল ম্যাম জিজ্ঞাসা করলেন – প্রিয়াদি তারুণ্যের ভুল সংশোধন মানে?

– হ্যাঁ, একটা বড় ভুল, বড় অনায়। প্রায় চল্লিশ বছর আগে ঈশিতা-প্রদীপ্তর মত আমিও এক গৃহশিক্ষক অধ্যাপকের সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। তিনিও আমাকে নিয়ে একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। কোটিপতির মেয়ে আমি। তিনি হত দরিদ্র ঘরের এক মেধাবী সম্তান। খুব ভালো গল্প, কবিতা লিখতেন। নাম ছিল দীপেন সেন। দিপুদা বলে ডাকতাম। কিন্তু এ যে অভাবী ঘর। রাজী হল না আমার বাড়ির লোকজন। তাছাড়া উনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। শ্রমিক কৃষকদের সংগঠিত করতেন। আমার বাড়ীর কেউ এসব পছন্দই করতেন না। ওকে শক্র ভাবতেন। আমি কিন্তু এসব শ্রদ্ধা করতাম। হয়তো অতশত বুঝতাম না। কিন্তু অসহায় আমি। কোথায় এক সীমান্ত শহর বসিরহাট আর কোথায় আগরতলার এক জমিদার পরিবার। বাড়ীর সবার কথায় বিয়েতে মত দিলাম। বউ হয়ে চলে এলাম ত্রিপুরায়। সে বহুবার আমার খোঁজ নিয়েছে। কিন্তু আমি নিরুত্তর, নিরুত্তাপ।

সেদিনের সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চেষ্টা করছি আজ অনুজ সহকর্মীটিকে বাঁচিয়ে, নইলে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে যে এই কো এড কলেজ থেকে ওকে চলে যেতে হবে চাকুরী খুইয়ে। ওকে নির্দোষ ঘোষণা করছি আমি।

শীতকালের বেলা। জানুয়ারির শেষ। গোধূলি নেমেছে। প্রিয়দর্শিনীদি রওনা দিলেন বাড়ীর উদ্দেশ্যে। সিতাই এর গা ঘেঁষে বাঁধানো রাস্তায় তার গাড়ী এগিয়ে চলেছে। দূরে টিলা গুলোর ঘরে ঘরে দীপ জ্বলে উঠেছে। যেন মা ত্রিপুরেশ্বরীর আরতির আয়োজন চলেছে। সেই আবছা আলোয় পেছনের সিটে বসে তিনি ভাবছেন শিশিরে শিউলির কথা দিনের এই শেষেতে। ভাবছেন সেসব কলিরা তো সব ঝরে গেছে বহু আগে। রোদন ভরা এই পৌষের সাঁঝে একান্তে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিইবা তার করার আছে। বাম হাতের কড়ি আঙ্গুল সহ শ্বেত রঞ্জনী মাখা তিনটি আঙ্গুলের নখ খুঁড়তে খুঁড়তে প্রিয়দর্শিনীদি আকাশের সন্ধ্যা তারা খোঁজেন যদি দেখা পান দীপুদার চোখ দুটিকে। বালুচরির আঁচলটা যেন আজ গায়ে বড় ফুটছে। দীপুদা বলত পারবে তো তাঁতের কম দামী শাড়ী পরে পিচ গলা রাজপথে মিছিলে মিছিলে পায়ে পায়ে সামনে আগাতে? কথা দিয়েও পারলাম কই রাখতে?

গাড়ী ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে। পাশের বীরবিক্রম উদ্যানের বিচিত্রানুষ্ঠান থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সুর –

তুই ফেলে এসেছিস কারে
মনরে মন আমার।

আসতে আসতে গাড়ী এসে থামল ওঁর কটেজের গেটে। ফ্রেস হয়ে একবার আয়নায় নিজেকে দেখলেন ভালো করে। ওঁর গলার সোনার মটরমালা, হাতের কাঁকন সবই যেন ভারী ভারী লাগছে। খুবই অস্থির লাগছে নিজেকে । কতকাল পরে যেন আবার দেখলেন সেই বুকের উপর দিকে, দু’কাঁধের মাঝখানে গলার একটু নীচে ছোট্ট কালো তিলকে। কতদিন দীপুদা ঠাট্টা করে বলেছে, রক্ত মাংসের দেবী তুমি। তোমার ওই তিলটা আসলে হৃদয় সরোবরে যে পদ্মটি ফুটে আছে, তারই আভাষ দিচ্ছে। উত্তর এসেছে তাই বলে ভ্রমরের ঠাঁই নেই ওখানে, আছে শুধু এক দেবতার অধিকার এ ফুল পেতে।

তন্ময় হয়ে ভাবছেন প্রিয়দর্শিনীদি । হঠাৎ কলিং বেল। মেয়ে জামাই এসেছে। দরজা খুলে দিলেন।

Facebook Comments

Leave a Reply