রাক্ষসের হ্যাংলামি ও তার লোভীভঙ্গিমা : রাণা রায়চৌধুরী

fail

রান্না। আমি গুঁতোয় পড়ে শিখেছিলাম। হঠাৎ মা মারা গেল। আমি রান্না করতে লাগলাম আমার আর বাবার জন্য। খুব মজার। খেতে ভালোবাসি, জিভ ষোলোআনা নয়, আমার জিভের লালসা নিরানব্বই আনা। ফলত শিখলাম নিজের জিভের মতো করে। জিভকে খুশি করার জন্য যে পরিশ্রম করেছি, তা মা হারানোর শোক অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছিল।

রান্না আসলে একটা আর্ট। মনের রুচি আর পেটের রুচি মিশে থাকে।

বাড়ির পাশ দিয়ে ট্রেন যায়। মানুষ যায়। রান্নাঘর থেকে দেখি বালিয়া এক্সপ্রেস তিস্তাতোর্ষা যাচ্ছে। আমি অন্যমনস্ক হতেই দেখতাম আলু ভাজা লেগে গেছে, আর ট্রেন চলে গেছে চোখের আড়ালে। আমি সত্যিই ভেবেছিলাম একটা আস্ত ট্রেন একদিন রান্না করে খাব।

ট্রেনকে আমার মাছ মনে হতো। কিছুটা ভাজা খাব। ঝুরঝুরে ভাতে ট্রেন ভাজা সঙ্গে ঘি, কাঁচা লঙ্কা, একটু গোলমরিচ গুঁড়ো। লঙ্কায় কামড় – ট্রেন ভাজায় কামড় – উফফ জিভের রসনায় জিভেও কামড়। একটু থেমে আবার ট্রেন ভাজার কাঁটা চিবোচ্ছি। আমি যে কোনও জিনিস ভাজার সময় ওপর থেকে একটু আলগা নুন ছড়িয়ে দিই, সাদা নুন। নোনতা নোনতা ট্রেন ভাজা সে এক আশ্চর্য খাওয়ার আহ্লাদ! ভাগ্যিস জন্মেছিলাম মানুষ হয়ে! যদি জল হয়ে আকাশের তারা হয়ে মাটির মেয়ে মাটিবালিকা হয়ে জন্মালে তো আর এই ট্রেন ভাজার স্বাদ কোনোদিনই পেতাম না?
ওই কৃষ্ণনগর লোকাল যাচ্ছে। আপে। ওটা ছোট মাছ। চারাপোনা। কালোজিরে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে একদিন বানাবো কৃষ্ণনগর-লোকাল মাছের ঝোল। ট্রেনটা লেজ নেড়ে চলে গেল জলের অতলে, রেললাইনের অতলে, যাওয়া-আসার অতলে। অতলে লুকোতে আমারও ইচ্ছে করে।

তো আজ এক্সপ্রেস ট্রেন ভাজার (বালিয়া এক্সপ্রেস) সঙ্গে, একটু সর্ষে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে – আর একটু টক দই দিয়ে কালিয়াও করেছি। আমি একাই পুরোটা খাব। রাক্ষস লগ্নে জন্ম। লুকনো নাম রাবণ রায়চৌধুরী। রাশি পেটকুম্ভ। লগ্ন ধনুজিভ। রোব্বারের ঘন পেটুক দুপুরে আর জি কর-এ জন্ম।

অতবড়ো বালিয়া এক্সপ্রেস, কুড়ি পঁচিশ বগির মাছ – ‘তুই একা খাবি?’ বাবা জিগ্যেস করল। আমি উত্তর দিলাম না। আমি ট্রেন রান্নায় মগ্ন। আমার বিপত্নীক (পুরুষ বিধবা) বাবা সামনের ঘরে গণশক্তি আর আজকাল পড়তে বসে গেল। বামপন্থার সব ভালো ভালো কথা – প্রগতিবাদী আশ্বাসের কথা – একদিন সূর্য উঠবে – বাবা মাড়ি দিয়ে চিবোতে চিবোতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমি গ্যাসে রান্না করছি। সর্ষে শিলনোড়ায় (আমাদের বাড়িতে মিক্সি নেই) বেটে নিয়েছি লঙ্কা সমেত। শিলনোড়ার বাটা-মশলা রান্নাকে আরও মহাপুরুষের মতো জ্যোতিষ্মান করে।
সর্ষের তেলে ট্রেনের গাদাটা রান্না করছি। সাদা তেলে সেই ঝাঁঝটা আসবে না। ট্রেন সর্ষে। জিভ দিয়ে লালসার জলের সঙ্গে দেখি অল্প অল্প ভদকা গড়াচ্ছে। আমি জিভ সরু করে জিভের লালসা টেনে নিই মুখের ভিতর। রান্নাটা গ্যাসে রান্না না করে মাটির উনুনে রান্না করলে আরও সুস্বাদু হতো।

একটু বিশ্রাম নিয়ে, একটা বিড়ি ধরিয়ে, সাদা তেলে গরম মশলা অল্প থেঁতো করে সাঁতলে নিচ্ছি। সঙ্গে টক দই। তারপর অল্প সাঁৎলানো ট্রেনের পেটি ছাড়ব। দই গরমমশলায় ট্রেনপেটি মিশে যাবে। সঙ্গে গোলমরিচ গুঁড়ো একটু আদাবাটা। একটা বিড়ি শেষ করে আরেকটা ধরালাম। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখছি মালগাড়ি যাচ্ছে। মালগাড়িকে আমার তিমি মাছ মনে হয়। খাওয়া যায় না।
তিমি মাছ রবীন্দ্রনাথ পড়েনি। ফলত সুস্বাদু হবে না। তিমি মাছ বড়জোর লোকসভায় হেরে রাজ্যসভার সাংসদ হতে পারে, কোটার সাংসদ। এগুলো রান্না করতে করতে মাথায় আসছে। সত্যিই রাক্ষসরা কতো কিছু ভাবে।

রান্না শেষ। এবার খাবো। সামনের ঘরে গিয়ে দেখি বাবা ঘুমোচ্ছে। বাবা পেপার পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। পেপার পড়াও একটা খাওয়া। পুষ্টিকর খাওয়া। বাবার মুখের ওপর উবুড় হয়ে আছে পেপারের ফ্রন্ট পেজে নাম্বুদ্রিপাদের ছবি। বাবার নিঃশ্বাসে কমরেড-এর চুল উড়ছে।

ট্রেন মাছ (বালিয়া এক্সপ্রেস) আদ্ধেকটা শেষ করলাম। বাকিটা রাতে।

খেয়ে বিড়ি ধরাতেই পেটটা চিনচিন করছে। গ্যাস হয়ে গেল। একটা জেলুসিল খেলাম। পেটব্যথা। পেটে বালিয়া-এক্সপ্রেস-মাছ দুরন্ত গতিতে ছুটছে। পেটব্যথা একটু কমল। বালিয়াএক্সপ্রেসমাছ সিগন্যালে দাঁড়িয়ে।

আজ ট্রেন মাছ খেয়ে – কাল কি খাব ভাবছি। কাল দরজা-জানলার পায়েস করব। আমার সুগার নেই। লাল বাতাসা দিয়ে – মাদার ডেয়ারির সাদা অল্পবয়সী দুধ দিয়ে – বেশ ঘন করে খাব। সঙ্গে লুচি। দেয়ালের যে চুনবালি খসে পড়ছে। ওগুলো জমানো আছে। সেই চুনবালিতে ভালো করে ঘি দিয়ে মেখে ফুল্কো লুচি আর দরজা জানালার পায়েস।

সন্ধে হয়ে এলো।

সন্ধেবেলা আমি টিউব লাইটের আলো দিয়ে চা বানাই। সাদা চা। সঙ্গে প্রচুর মিষ্টি। সঙ্গে এলাচ। সঙ্গে জোনাকি গুঁড়ো। জোনাকি গুঁড়োয় তেজপাতার থেকেও ভালো গন্ধ পাওয়া যায় চা-এ।

এইভাবে এক পেটুক রাক্ষসের দিন কাটে। সামনে দোল। দোলে এই রাক্ষস মরক্কোর আকাশ দিয়ে বানানো মদ খাবে। মরক্কো-আকাশ দিয়ে তৈরি মদে অল্প অল্প প্রথমে ঝিমুনি, পরে ফেলে দেবে একদম। মরক্কোর আকাশ দিয়ে তৈরি মদ খেলে আমার আবার কবিতা আসে। ভাবা যায়? রাক্ষসের আবার কবিতা প্রেম! কেলো করেছে মাইরি! চারিদিকে একশো আটটা করে পদ্মফুল পানাপুকুরে না ফুটে দেয়ালে দেয়ালে এমনি ফুটছে?

Facebook Comments

Leave a Reply