মহাজাগতিক রেসিপি : তন্ময় ধর

fail

“মাসতুর্দর্বী পরিঘট্টনেন সূর্যাগ্নিনা রাত্রিদিবেন্ধনেন
অস্মিন মহামোহময়েকটাহে ভূতানি কালঃ পচতীতি বার্তা”
মহামোহময় এই সুবিশাল জগৎ যেন এক কড়াই। তাতে কালরূপ কর্তা সূর্যরূপ আগুনে দিনরাত্রি স্বরূপ কাঠ জ্বালিয়ে ঋতু ও মাস স্বরূপ হাতা দিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে প্রাণীদের পাক করছে , এটাই নাকি প্রকৃত বার্তা। যক্ষের প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির এমন বলেছিলেন।
সেই রেসিপির তদারক করতে আন্দাজ মত তেল-নুন-চিনি-মশলা দিতে দিতে আন্দাজ মত তাকিয়ে থাকতাম একটা শূন্যতার দিকে। তখন মাত্র আড়াই মাসে মাতৃগর্ভে মৃত্যু হয়েছে আমাদের সন্তানের। সন্তানের মা সে ধকল সামলাতে ফিরে গেছে পিত্রালয়ে। হিমালয়ের অতল শীতলতার সামনে, ধ্যানমগ্ন মহাকালের সামনে আমি তখন আমার অস্তিত্বহীন সন্তানকে নিয়ে সেইসব অদ্ভুত রেসিপিতে হাত পাকাতাম।
‘পাপা, এটা কিন্তু ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান অ্যাপ্রোচে করা যাবে না, আজ ইউলেরিয়ান অ্যাপ্রোচ’ হাতা-খুন্তির ভিতর থেকে টুংটাং শব্দ ওঠে।
শব্দের মধ্যে কি আমার অতীতের মৃতদেহ শুয়ে আছে? এক অসীম মৃত্যু অতিক্রমের রেসিপি?
যিনি শব্দের শবকে বহন করেন, তার প্রাণই শব্দকে প্রাণ দান করে। যিনি ওই প্রাণবন্ত শব্দকে গ্রহণ করেন তার প্রাণের সঙ্গে শব্দের ওই প্রাণটি মেশে। আরেকটি প্রাণের সৃষ্টি হয়। এভাবেই শব্দ মৃত্যুকে অতিক্রম করে। এক মাইক্রোরেসিপি মিশে যায় নতুন ম্যাক্রোরেসিপিতে।
পৃথিবীর প্রতীক গন্ধ। তা আমাদের অস্তিত্বকে পৃথক করে। আর আকাশের প্রতীক শব্দ। তা আমাদের দৃশ্যমানতার শবকে জীবিত করে রাখে। এই দুইয়ের মাঝখানে এক অনন্ত সৃষ্টির স্বাদ নিয়ে কথা বলি আমি আর আমার মৃত সন্তান।
জল-স্নেহ-চিনি-লবণ-মশলা –এক এক করে জন্মমৃত্যুর স্বাদ নিয়ে খেলা করতে থাকে আমাদের সামনে। হিমেনেথের মত অস্পষ্ট এক স্বর ‘জল কি কেউ না?’ বুদবুদ তৈরি হতে থাকে। মহাসৃষ্টির এক সুবিপুল বুদবুদ যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে ‘দেখো, আমি অতিবৃহৎ হয়েছি। আমার এই বাসভূমি আমাকে ধারণ করতে পারছে না। আমাকে আরো আরো বৃহতে নিয়ে চলো’।
এক দাহগন্ধ আমাদের পিছুধাওয়া করে। কুহকের আঙুলে শূন্য হয়ে যায় অন্নপাত্র। মস্ত এক হাঁ-এর সামনে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। কেউ অন্নপাত্র ফিরিয়ে দিতে এসেছে। দরজায় ঠক ঠক শব্দ। খুলে দেখছি। কেউ নেই। শব্দটা সরে গিয়েছে রান্নাঘরের জানালায়। খুললাম। কেউ নেই।
তেল-মৌরি-এলাচ-তিল-তেজপাতা –সব গন্ধ স্থির হয়ে গিয়েছে আমাদের রক্তে, অস্থিমজ্জায়, কোষদেহে, আনুবীক্ষণিক প্রতিবিম্বে। এক অস্মিত আঁচ লেগে স্মৃতিভ্রষ্ট হচ্ছে কেউ ‘পাপা, বড্ড বেশী মিষ্টি হয়ে গিয়েছে…’
দরজায় ঠক ঠক শব্দ আবার ‘একটু চিনি পাওয়া যাবে?’ খুলতেই একটা হাওয়া এসে থেমে গেল আমার আর মৃত সন্তানের মাঝখানে। খইপথ বেয়ে একটু আলোর দাগ। হু-হু করে বয়ে চলেছে সময়। কেউ কি ফিরে গেল? কোথাও?
বাইরে হিমেল হাওয়া কি ক্লান্ত হয়ে এল? কোন এক লীনতাপ বিক্রিয়াকে ধাক্কা দিল বাতাস। রান্নাঘর যেন সামান্য অন্ধকার হয়ে গেল। আবছা হয়ে গেল তেল-মশলা ও অন্যান্য উপাদানের খুঁটিনাটি। আগুনে-জড়ানো একটা সময় কেবল ঢুকে যাচ্ছে প্রাগিতিহাসের ভেতর।
কিছু কি রান্না হল আদৌ? স্বাদের দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেউ জিজ্ঞাসা করল না।

উপকরণ-
ক) একটি জীবন কিম্বা ব্রহ্মাণ্ড
খ) জীবনের কয়েকটি প্রতিবিম্ব
গ) প্রতিবিম্বের কয়েকটি কুহক
ঘ) অতিগার্হস্থ্য আগুন
ঙ) রূপ ও গন্ধ

রন্ধনপ্রণালী-
এই যে দেহ যা হয়ত (১০১০) ২৮ মিলিমিটার দূরে থাকা এক প্রতিরূপের প্রতিবিম্ব, ১০৫০০ ভ্যাকুয়াম স্তরের দীর্ঘশ্বাস, তা মহাসময় সৃষ্টির আগেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে সেই আদিম অতিগার্হস্থ্য আগুনের রেশ নিয়ে। তার তাতে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে আদিম স্মৃতিরই স্বাদ। সৃষ্টির আদিকল্পে সুষম এবং সমতাপীয় রূপে একটিই অতি উচ্চ তাপ ও চাপে পূর্ণ ছিল অস্তিত্ব। সৃষ্টির ১০−৪৩ সেকেন্ড পর পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কার্যকারিতা লাভ করে। এই সময়ের প্রায় ১০−৩৫ সেকেন্ড পর মহাবিশ্ব হঠাৎই বহুগুণ সম্প্রসারিত হতে শুরু করে, যার নাম মহাস্ফীতি। এই মহাজাগতিক স্ফীতি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মহাবিশ্বে কোয়ার্ক-গ্লুওন প্লাসমা নামক পদার্থ ছিল। এই তরলের মধ্যস্থিত সমস্ত উপাদান একে অপরের সাপেক্ষে চলমান — এ তরলের মধ্যে থাকা সমস্ত মৌলিক কণিকাও এভাবে তরলের মধ্যে চলমান থাকে। দেশকালের কোন এক বিন্দুতে এরই মধ্যে এক বিক্রিয়া ঘটে যার স্বরূপ এখন পর্যন্ত মানুষের অধরা। এই বিক্রিয়াই ব্যারিয়ন সংখ্যার সংরক্ষণ নীতি লঙ্ঘন করে, কোয়ার্ক-লেপ্টন কণিকার পরিমাণ এদের প্রতিকণিকার চেয়ে সামান্য বেড়ে যায়। অর্থাৎ প্রতি-কোয়ার্ক এবং প্রতি-লেপ্টনের চেয়ে কোয়ার্ক এবং লেপ্টনের পরিমাণ সামান্য বৃদ্ধি পায়। এই প্রক্রিয়াকে ব্যারিওজেনেসিস বলা হয়।
মহাবিশ্বের আয়তন যত বৃদ্ধি পেতে থাকে ততই এর তাপমাত্রা কমতে থাকে। তাপমাত্রা হ্রাসের সময়ই কোন এক পর্যায়ে দশার অবস্থান্তর সৃষ্টি হয় যার ফলে শুরু হয় প্রতিসাম্য ভাঙন। এই ভাঙনের কারণে পদার্থবিজ্ঞানের আলোচ্য মৌলিক বলসমূহ (মহাকর্ষ বল, নিউক্লিও বল, সবল বল এবং দুর্বল বল) পৃথক পৃথক স্বাধীন অস্তিত্ব লাভ করে। এ সময়ই মৌলিক কণিকাসমূহ সৃষ্টি হয় যা এখনও সেই আদি অবস্থাতেই রয়েছে। কোয়ার্ক এবং গ্লুওন একত্রিত হয়ে ব্যারিয়ন, যেমন প্রোটন এবং নিউট্রন তৈরি করে। কোয়ার্কের পরিমাণ প্রতি-কোয়ার্কের চেয়ে সামান্য বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যারিয়নের পরিমাণও প্রতি-ব্যারিয়নের চেয়ে সামান্য বেড়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার নিচে কোন নতুন প্রোটন-প্রতিপ্রোটন জোড়া তৈরি হতে পারেনা। এরই সাথে অবশিষ্ট প্রোটন এবং প্রতিপ্রোটনের মধ্যে শুরু হয় ভরের পূর্ণবিলয় (annihilation)। ফলে প্রতিপ্রোটন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়; আর প্রোটন প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। তবে কিছু প্রোটন থেকে যায়। নিউট্রন-প্রতিনিউট্রন জোড়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এই সামান্য অবশেষই গড়ে তোলে আমাদের এই দৃশ্যমান মহাজগৎ। প্রোটন ও নিউট্রন একত্রিত হয়ে মহাবিশ্বের একেবারে প্রথমদিককার উপাদান ডিউটেরিয়াম ও হিলিয়াম কেন্দ্রীন তৈরি করল। সৃষ্টির এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মহাবিস্ফোরণ কেন্দ্রীন সংশ্লেষ। মহাবিশ্বের শীতলায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রইল। এক সময় এই প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ পদার্থের কণাসমূহের মধ্যে যে আপেক্ষিক গতিবেগ ছিল তার পরিমাণ হ্রাস পেল। এই কণাসমূহের মাঝে দুই ধরনের শক্তি ঘনত্ব ছিল: নিশ্চল ভর শক্তি ঘনত্ব এবং বিকিরণ শক্তি ঘনত্ব। আপেক্ষিক বেগ কমে যাওয়ার ফলে নিশ্চল ভরজনিত শক্তি ঘনত্ব মহাকর্ষীয়ভাবে বিকিরণজনিত শক্তি ঘনত্বের উপর আধিপত্য বিস্তার করল। মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩৮০,০০০ বছর পর ইলেকট্রন এবং নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে পরমাণু তৈরি করল। প্রথমে মূলত হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হল। এর সূত্র ধরেই পদার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শক্তি বিকিরণ আকারে সমগ্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। এই সুপ্রাচীন বিকিরণের নাম মহাজাগতিক ক্ষুদ্রতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ।
সম্প্রসারণের সাথে সাথে মহাবিশ্বের বণ্টন প্রায় সুষম হয়েছিলো। কিন্তু এর মাঝেও কিছু অসামঞ্জস্যতা ছিল। ফলে যে অঞ্চলগুলো অন্যান্য অঞ্চল থেকে খানিকটা ঘন সেখানের পদার্থগুলো আশেপাশের অন্যান্য বস্তুকে মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে আকর্ষণ করল। এর মাধ্যমেই তারা, ছায়াপথ এবং অন্যান্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুর সৃষ্টি হয়, যা আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আর সেইসব নক্ষত্রে থার্মোনিউক্লিও দহনেই সৃষ্টির আদিম যুগে তৈরি একে একে তৈরি হয়েছে প্রতিটি রাসায়নিক মৌল। পরে নক্ষত্রের মৃত্যুতে ছড়িয়ে পড়েছে অনন্ত মহাকাশে। তারপর কখন যেন আশ্রয় পেয়েছে কবোষ্ণ এক গ্রহের জীবমন্ডলে। গড়ে তুলেছে জীবকোষ। সে জীবকোষের অনন্ত বিবর্তনের মাঝে অচিন এক বন্ধনে বেঁধে ফেলেছে স্মৃতি, আবেগ, স্বাদ ও ক্ষুধার এক অত্যাশ্চর্য রন্ধনপ্রণালীকে।

Facebook Comments

Leave a Reply