ভজহরিণী কথা : তুষ্টি ভট্টাচার্য

fail

আমি শ্রীমতী ভজহরিণী মান্না। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, ভজহরিণী। শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না আমার পূর্বপুরুষ। ওঁর নামানুসারে আমাদের বংশের সবাই ভজহরি ও ভজহরিণী। ব্র্যাকেটে নম্বর দেওয়া থাকে অবশ্য। সে নম্বরের হিসেব, মানে কাকে ডাকলে কে সাড়া দেবে, এসব আমাদের নিজস্ব সেট আপ। ও নিয়ে ভাববেন না। তবে আমাদের নামের ব্যুৎপত্তি জেনে রাখা ভাল। ভজহরি, অর্থাৎ কিনা হরিকে ভজনা করি আমরা, অর্থাৎ বিশুদ্ধ শাকাহারী একদিকে। পিঁয়াজ, রসুনও বাদ। আরেকদিকে ভজহরিণী, মানে সেই যে বলে না, আপনা মাসে বৈরী হরিণী। অর্থাৎ কিনা মাছমাংসেও আছি আমরা। এবার একে একে আমাদের বংশের ঐতিহ্য মণ্ডিত রেসিপি, তার উৎপত্তি স্থল থেকে, অন্দরের বাত, সবই খোলসা করব আপনাদের কাছে।
প্রথম পুরুষের পছন্দ অনুযায়ী আমাদের সমস্ত মশলাই আসে ইস্তাম্বুল থেকে। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত মশলা বাজারে গিয়ে নিজের হাতে, রীতিমতো দরদস্তুর করে কোনো না কোনো ভজহরি বা ভজহরিণী মান্না এই মশলা কেনার কাজটা সম্পন্ন করে। এর জন্য আমাদের মান্থলি করা আছে, হাওড়া টু ইস্তাম্বুল, মাত্র ৭৬৩ টাকায়। সে যাই হোক, এবারে আসি আমাদের আদি পুরুষ শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না জাপান আর কাবুল গিয়ে কি কি রান্না শিখে এসেছিলেন, সেই প্রসঙ্গে। তিনি জাপানের ওয়াশোকু আর সুসির নাম শুনেছিলেন। লোকমুখে ঝাল খেয়ে নয়, একেবারে চেখে দেখে আসতে চেয়েছিলেন ওই পদ দুটি। দুগগা, দুগগা করে জাপানে তো পৌঁছে গেলেন তিনি। ওয়াশোকু চেখে দেখে তিনি তো অবাক। আরে এ যে যাউ ভাত টাইপের। তাঁর মনে পড়ে গেলে ঠাকুমার কথা। বিধবা, শুদ্ধাচারী, স্বপাকে এক বেলা এটাই খেতেন তাঁর ঠাকুমা। একটা পিতলের মালসায় গোবিন্দ ভোগ চালের সঙ্গে যা যা সবজি হাতের কাছে থাকত, দিয়ে দিতেন ভাতে। তারপর ফ্যান শুদ্ধু ওই ভাতের ওপর ঘি ছড়িয়ে খেয়ে নিতেন। এই ওয়াশোকুও তো প্রায় তাইই। ‘এই জন্য এদ্দূর এলাম!’ হতাশা ছেয়ে যাচ্ছিল তাঁর মনে। তারপর ভাবলেন ‘আচ্ছা, তবে সুসি খেয়ে দেখি একবার’। সেই সুসি খেয়ে তো আদিপুরুষ প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। খুব জোর সামলেছিলেন দেওয়াল ধরে। আর ক্রমাগত আঁশটানি গন্ধের চোটে ওয়াক ওয়াক করতে করতে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করে ফেললেন।
সুসি, সেশেমি যাই হোক, তাতে চাল রয়েছে, রাইস ভিনিগার আর কাঁচা সামুদ্রিক মাছ মিশিয়ে একটা দারুণ আকার দেওয়া হচ্ছে। রোল বানানো হচ্ছে। অর্থাৎ বাঙালির প্রিয় মাছ, ভাত রইল আবার সুসির মতো কাঁচা মাছও খেতে হবে না, টকের জন্য আমাদের বিশুদ্ধ তেঁতুল গোলা তো আছেই—এমন কিছু একটা পদ বানাতে হবে তাঁকে। আর বাইরের রূপটা খোলতাই করার জন্য অন্য কিছু ভাবতে হবে। তো সাত রাত, সাতদিন ভেবে, পরীক্ষা, নিরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আমাদের এক্সক্লুসিভ আইটেম, সুষমা। সুষমার নামের মতোই তার রূপ সুষমামণ্ডিত। স্বাদেও আহা রে, বাহা রে! ভেটকি মাছের র্যা পারের ভেতর ভাতের পেস্ট আর তেঁতুল গোলা, এবং কিছু সব্জির মিশ্রণ দেওয়া রইল। মাছের রোলটিকে এবার গাঢ়(কনসেন্ট্রেট) কমলার রসে ভিজিয়ে রাখতে হবে সারা রাত। এরপর সেই কমলা রঙা, রোলটিকে হাল্কা হাতে ভেজে নিতে হবে। একেকটা রোলের সাইজ কিন্তু তিন ফুটিয়া। ভাজার জন্য বিশাল চাটু বানালেন তিনি। গাঢ় কমলা রঙের সেই সুষমার গায়ে ব্রাউন কোটিং পড়েছে। এদিকে ভাঙলে ভেতরে কমলা রঙা মাছের লেয়ার, তার ভেতরে হাল্কা বাদামী তেঁতুল গোলা আর ভাতের মিশ্রণ। এইবার হল আসল কাজ। টপিং! সুষমার ব্রাউন কোটিং-এর ওপর চাপল এবার সাদা ধবধবে সরের তৈরি সুতো দিয়ে নকসা। সেই নকসা তৈরি করতে মেদিনীপুরের গয়না বড়ির কারিগরদের নিয়ে আসা হয়েছিল। সে যাই হোক, এই সুষমা আপনি একা খেতে পারলে ভাল, নইলে পিস হিসেবে বিক্রি করার ব্যবস্থা রয়েছে।
সুষমার সাফল্যের পরে এবার তিনি পারি দিলেন কাবুলে। সেখানে গিয়ে দেখলেন, চারিদিকে শুধু কাবাব আর কাবাব। পোড়া মাংস দেখতে দেখতে ‘ধ্যাত্তেরিকা’ বলে তিনি ফিরে আসতে মনস্থির করে ফেলেছিলেন প্রায়। সেই সময়ে রাস্তার ধারে কী একটা ভাজা হচ্ছে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। সেদিকে তাকিয়ে তাঁর তো চক্ষুস্থির। কারিগর একটা কড়ায় গরম তেলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে গ্লাসের ফুটো দিয়ে গোলা ফেলছে অদ্ভুত কায়দায়। এক রিদমে সে গোলা ছেড়ে চলেছে তেলে। আর সেই ভাজা গুলো তারপর রসে ফেলে তৈরি হচ্ছে এক আশ্চর্য মিঠাই। এই দেখে তিনি সেই খানেই স্থির হয়ে গেলেন। খেয়ে যা বুঝলেন, খুব শক্ত, ডালের তৈরি মিষ্টি। বাইরের খোলস শক্ত হওয়ায় মিষ্টির রস ভেতরে ভাল ভাবে ঢোকেনি। এরপর আবার ভাবতে বসলেন পাঁচদিন ধরে। আবারও পরীক্ষা, নিরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত তৈরি হল লিপিকা। এই লিপিকা দেখতে জিলিপির মতো হলেও পুরোপুরি জিলিপি নয় কিন্তু! স্বাদে, গন্ধে ভজহরির টাচ রয়েছে। কলাই ডাল না, ময়দাও না, তিনি এমন একটি মিশ্রণ বানালেন, যাতে চালের গুঁড়ো, ময়দা, সবরকম ডালের গুঁড়োর সঙ্গে মেশালেন বেল ফুলের পাপড়ির গুঁড়ো। গন্ধরাজ, টগর বা রজনীগন্ধা হলেও চলবে। মোট কথা সাদা আর সুগন্ধি ফুলের পাপড়ি চাই এই লিপিকা বানাতে। এবার চোখ বুজে ভাবুন একবার। আপনার হাতে একটি রসে টইটম্বুর জিলিপি, এক কামড় দিলেই মুচমুচে সেই জিলিপি আপনার জিভে লেপটে গেল, আর আপনার মুখ ভরে উঠল বেল, জুঁইয়ের সুবাসে! এই হল লিপিকার আসল বৈশিষ্ট্য। এর জন্য জিলিপি ভাজার অন্য কৌশল আছে, আঁচ বাড়িয়ে ভাজলে চলবে না হুহু করে। সবটা কি আর আপনাকে জানিয়ে দেব, ভেবেছেন? তাহলে আর আমাদের নিজস্ব কি রইল? তবে কাবুলি পোলাও নিয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখাননি আমাদের আদি পুরুষ। ভাতের সঙ্গে ভুট্টা, যব, গম আর সবজি, এমনকি মাংসও থাকতে পারে, এমন একটা মিশ্রণকে তিনি কেন জানি ভাল চোখে দেখেননি। এরকম এক হচপচ, আমাদের খিচুড়ির সঙ্গে তুলনা করলে, যা নাকি ধোপেই টেঁকে না, তাকে তিনি আমাদের মেনুতে রাখেননি। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা কাবুলি পোলাওকে আমাদের খাদ্য তালিকায় রেখেছি বটে, তবে আমাদের বিশেষত্ব জুড়তে ভুলিনি। যেমন কাবুলি পোলাওকে আমাদের খিচুড়ির সঙ্গে ফিউশন ফুডের স্থান দিয়েছি। গোবিন্দ ভোগ চালের সঙ্গে পাঁচমিশেলি ডাল, সঙ্গে ভুট্টা, যবও রেখেছি। ভেজ, নন ভেজ দুরকমই পাওয়া যায় এই কাবুলিওলা-খোঁকি পোলাও।
আর প্যারিসের ছেঁচকির কথা তো না বললেই নয়। এই ডিশ আমাদের সবথেকে বেশি বিক্রিত। ফ্রান্সের ক্যাসুলের নাম নিশ্চই খাদ্য রসিকরা শুনেছেন। বিশেষ ধরণের সাদা বিন, হাঁসের মাংস বা ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি প্রচণ্ড চর্বি যুক্ত খাদ্য এই ক্যাসুলে। ক্যাসারোলের মধ্যে কম আঁচে, অনেক সময় নিয়ে তৈরি হয় এই ক্যাসুলে – ক্যাসারোলের মধ্যে তৈরি হয় বলেই এই পদের নাম ক্যাসুলে। ক্যাসুলের স্বাদ ও গন্ধ বদলে যায় স্থান ও রান্নার ধরনে। প্রচণ্ড চর্বি যুক্ত এক বাটি ক্যাসুলে খেলে নিমেষে ডিসেম্বরের হাড় হিম ঠাণ্ডা দূর হয়ে যায়। এখন আমাদের দেশে তো আর প্যারিসের মতো শীত নেই। তাই ক্যাসুলের ধরন পরিবর্তন করা হল। যেমন হাঁস বা ভেড়ার মাংসের বদলে এলো চিকেন বা মাটন। সঙ্গে বিনস রইল, আর চর্বি বাদ পড়ল। ক্যাসারোলের বদলে হাঁড়িতে দমপুক্ত বিরিয়ানির মতো মাংস রান্না করা হল। এবার বিনস, লাউয়ের খোলা আর মুলো ঝিরিঝিরি করে কেটে ভেজে মাখোমাখো চিকেন কোর্মার সঙ্গে মেশানো হল। এবার এই মিশ্রণটা দমপুক্ত মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে কাঁচালঙ্কা আর ঘি, গরম মশলার টাচে তৈরি হল এই প্যারিসের ছেঁচকি। একবার খেলে বারবার খেতে হবে এই ডিশ।
সুইস চকোলেট আমরা এখনও নিয়ে আসি ফিউশন সন্দেশ বানানোর জন্য। এছাড়া র্যাকক্লেটে বা ফন্ডু’র মতো কিছু স্পেশাল চীজও আনি। এই দিয়ে আলুভাজা বা পরোটা বানাই। এই পরোটা আবার ক্ষেত্রবিশেষে বানানো হয় ডাচ প্যান কেকের মতো করে। পাতলা ফিনফিনে, কিন্তু সাধারণ ফ্রায়েড পরোটার মতো ভাজা না, আবার ধোসার মতোও না। সে এক অভিজ্ঞতা বলতে পারেন। এই প্যান কেকের স্টাইলের পরোটার মধ্যে র্যাকক্লেটে বা ফন্ডুর মতো চীজ দিয়ে খাওয়া যেতে পারে, আবার আমাদের ঝুরি আলুভাজার ভায়রা ভাই রোস্টি’র পুর দিয়েও খাওয়া যেতে পারে। এই পুরভরা পরোটার নাম সঞ্চয়িতা, আর শুধু চীজ দেওয়া হলে সেটা সঞ্চারী। ইজিপ্টে গিয়ে তো তিনি অবাক। এরা এত এত খিচুড়ি খায়! খিচুড়ির নাম আবার কুশারি। সেটাই আবার এদের জাতীয় খাদ্য। যদিও চাল, ডালের সঙ্গে ম্যাকারোনি থাকে এদের কুশারিতে। এই কুশারি রান্না শিখে আমাদের আদি ভজহরি মান্না এদেশে এর নাম দিলেন কেতকী। এরপর ডাইসনের খোঁজ আপনারা করবেন কিনা সে আপনাদের মর্জি!
আমাদের রেস্তোরায় খেতে এলে প্রথমেই খাইবার পাস সংগ্রহ করতে হয়। এই পাসের সংকীর্ণ, দুর্গম অলিগলির মধ্যে একবার পা দিলে, আপনার আর নিস্তার নেই। কখন যে আপনি একবার খাদে আর একবার চড়াইয়ে নামবেন আর উঠবেন, টেরই পাবেন না। যখন এই পাস পেরিয়ে একেবারে মেন কোর্সে এসে পড়বেন, তখন হয়ত আপনার পেটের ভেতর খাসী ডাকছে ব্যা ব্যা করে। সে আপনি তার কষা খান বা ঝোলঝাল অথবা মেটে। খাসী ছাড়া বাঙালির গতি নেই—একথা শিখিয়ে গেছিলেন আদিপুরুষ। আমরা অক্ষরে অক্ষরে তাঁর নির্দেশ অনুসারে খাসী কিনি। তার চেহারা দেখেই বলে দিতে পারি, এর স্বাদ। এর জন্য আমাদের বিশেষ ট্রেনিং নিতে হয় অবশ্য। এও এক মন্ত্রগুপ্তি। কাউকে এ বিদ্যা শেখালে আমাদের নিজের মুখের ভাষা বদলে গিয়ে, ‘ব্যা’ ছাড়া আর কিছু বেরোবে না। তবে একটা গোপন তথ্য আপনাদের দিয়ে যাই। কুন্তী আর খুন্তি’র এই অন্ত্যমিল কিন্তু নেহাতই কাকতালীয় নয়। আর বীর হাজরা এবং হাড় পাঁজরারও মিলের পিছনে কিছু ঘটনা রয়েছে। চুপিচুপি বলি। কুন্তী ছিলেন সেই মহাভারতে। হঠাতই আমাদের আদি ভজহরির সুনাম শুনে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। কাশী দাসী ছেড়ে দুচ্ছাই বলে চলে এলেন। আর ভজহরি মান্না তখন সবে দোকান খুলেছেন। কুন্তী ঠাকুরুণকে দেখে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে তাঁর হাতে খুন্তি ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এবার একটু নাড়া দিন, তলা ধরে যাবে যে মা ঠাগরুণ!’ থতমত কুন্তী হেব্বি জোরে খুন্তি বাগিয়ে খাসীর কষা নাড়তে থাকলেন। সেই যে কুন্তী ঠাগরুণের ছোঁয়া পেল খাসী, সেই থেকে তার হাড় আর পাঁজরা পেটে গিয়েও ব্যা ব্যা করে ডেকে ওঠে। আসলে বলতে চায়—কখন কষালো, কখন রসালো, কখন সেদ্ধ করল, টেরই পেলুম না মা গো! পেটে চলে যাবার পর বুজলুম!
আর সেদিনের সেই খাসীর নাম ছিল বীর হাজরা। তার বীরত্ব সম্বন্ধে সে এতটাই নিশ্চিত ছিল যে, মানুষের, থুড়ি কুন্তী এবং খুন্তির এহেন কারসাজি তার নজর আন্দাজ হয়ে গেছিল। এবার কাজের কথায় আসি। আমি বর্তমান ভজহরিণী, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। দলে দলে চলে আসুন আমাদের রেস্তোরায়, আর নির্বিঘ্নে খাইবার পাস সংগ্রহ করুন।

Facebook Comments

Leave a Reply