সোনালি ক্ষুধা : অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

fail

একটি ভাবনার জন্য একটি গোটা দিন দিতে চেয়েছিল সুমিত। কোনও অর্ধেক দিন কিংবা খণ্ডিত বেলা নয়, একটা গোটা দিন, আস্ত, গোটা ২৪ ঘণ্টা সে একটি ভাবনাকে দিতে চেয়েছিল। আজ, সেই দিন।

একটা চিঠি এসেছে। গতকাল, বিকেলে। সুমিতের কাছে৷

পরদিন, সকাল ন’টায় উঠে সুমিত ক্যান্টনমেন্টের আবাসনের জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রাতের বৃষ্টিতে রাস্তা ভিজে। ভেজা হাওয়া এসে লাগছে জানলার ঝুল ধরা নেটে। রাস্তার ওপারে গাছ, ভেজা রাস্তা, ক্বচিৎ চলা দু-একটা গাড়ি, তাদের প্রায় শব্দহীন চলা, এসবের দিকেই তাকিয়ে থাকে সুমিত। অথবা এদের কোনওটির দিকেই নয়, সে তাকিয়ে থাকে এই বৈশাখের সকালে, দূরের, প্রায় সাতশো কিলোমিটার দূরের, জঙ্গলের রাস্তায় চলে আসা একলা দিশেহারা দাঁতাল হাতিটির দিকে। পিছন থেকে মিতালি এসে ডাকে, ‘আপনি সকালে কী খাবেন সুমিত?’ সুমিত নিজের ঘোর ভাঙতে দেয় না। দাঁতালটাকে পাশে নিয়েই মিতালির দিকে ফেরে সে। মিতালি শুধু সুমিতকেই দেখতে পায়। ঘরের ভেতর সুমিতের পাশে একটা দাঁতালকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকত না। মিতালির জিজ্ঞাসায় সুমিত কিছু বলে না। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে। যেন প্রশ্ন, ‘কী খাওয়া যায় বলুন তো?’ উত্তর না পেয়ে মিতালিই বলে, ‘কুসুম ছাড়া ডিম সেদ্ধ আর দইয়ের ঘোল দিই?’ সুমিত মাথা নাড়ে, ‘বেশ’। মিতালি ফিরে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়, বলে, ‘ডিমের শাদা অংশ কটা খাবেন?’ সুমিত এ প্রশ্নে প্রথমে দিশা পায় না। বলে ফেলে : ‘একটা ডিমে যে কটা শাদা অংশ থাকে, দেবেন।’ মিতালি চলে যায়। সুমিত আবার জানলার দিকে ফেরে। সুমিতের পাশ থেকে সরে দাঁতালটা দোতলার জানলার বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। সুমিতের দিকে তাকিয়ে থাকে। শুঁড় রাখে জানলায়। সুমিত সিলিংয়ের দিকে তাকায়।

গতকাল বিকেলে যে চিঠিটি এসেছে, আমন্ত্রণপত্রই বলা ভালো। অদ্ভুত সেই চিঠি। চাকরি-বাকরির চিঠির অপেক্ষা ছাড়া আর কোনও চিঠির প্রত্যাশা এখন সমাজে নেই। চিঠি, চিরকুট এসবের সঙ্গে অপেক্ষা নামের মহৎ ক্রিয়াপদটিও হারিয়ে গেল। সেরকমই কোনও ইন্টারভিউ বা লিখিত পরীক্ষার চিঠি ভেবেছিল সুমিত৷ খাম খুলে থ। বারান্দায় কখন কে এসে দিয়ে গেছে। এরকম চিঠি তো আয়োজকরা নিজেরা এসে দেন। আমন্ত্রিতর হাতে নিজেরা দিয়ে যান। চুপ করে বারান্দায় ফেলে যাওয়ার চিঠি এ নয়৷ বিয়ের নেমন্তন্ন কার্ড কেউ যেমন বারান্দায় চুপিসাড়ে ফেলে যায় না। বিভিন্ন রকম চিঠির বয়ান, ভাষা যেমন আলাদা, তাদের দেওয়ার প্রথাও আলাদা। সরকারি লোক এসে যদি বিয়েবাড়ির কার্ড দেওয়ার মতো করে ইন্টারভিউয়ের চিঠি দিয়ে যায়, তাতে যেমন সন্দেহ হবে, ব্যাপারটায় জল আছে ভেবে; তেমনিই আমন্ত্রণপত্র কেউ যদি এভাবে বারান্দায় ফেলে যায়, সন্দেহ হবেই; কোনও ফাজিলের ইয়ার্কি নয় তো?

গতকাল চিঠিটি পাওয়ার পর সেটি পড়েছে সুমিত। দু’বার, তিনবার, চারবার এবং পাঁচবার। লক্ষ্য করে দেখুন, প্রথমবার পড়ার কথাটি উল্লেখই করা হল না। শুরুই হল দু’বার থেকে। যেন দুই থেকেই সংখ্যাক্রম শুরু হয়। প্রথম সবকিছু শুধু প্রথম বলেই গ্রহণীয় হয় তা নয়; কখনও কখনও কোনও প্রথম বর্জনযোগ্যও বটে। কারণ অনেক প্রথমেই থাকে শুধু প্রথম সংক্রান্ত আবেগ। পাঁচবারের পর আর পড়েনি সুমিত। ভাবেওনি বিষয়টি নিয়ে। ইচ্ছে করেই ভাবেনি। পরে, মানে আজ ভাববে বলে স্থগিত করে রেখেছিল। সন্ধে থেকে রাত অবধি যদিও অনেকবারই ভাবনা চলে এসেছিল, তবু সুমিত কিছুতেই তলিয়ে ভাবানোর দিকে নিজের মাথাকে নিয়ে যায়নি। সে এই ভাবনাটির জন্য একটি গোটা দিন দিতে চেয়েছিল। কোনও অর্ধেক দিন কিংবা খণ্ডিত বেলা নয়, একটা গোটা দিন, আস্ত, গোটা ২৪ ঘণ্টা সে এই ভাবনাটিকে দিতে চেয়েছিল। আজ, সেই দিন।

এখান থেকে কাছেই, একটি উদ্যান উদ্বোধন হবে আগামীকাল। বিকেলে। সেখানে প্রধান অতিথি এবং প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সুমিতকে। সুমিত গণ্যমান্য কেউ নয়। বুদ্ধিজীবী নয়। নেতা নয়। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। অধ্যাপক নয়। লেখক নয়। উদ্যানপালক নয়। শিল্পী নয়। বিশুদ্ধ বেকার। সুমিতের বেকারত্ব এতটাই বিশুদ্ধ যে তাতে প্রাইভেট টিউশনের খাদটুকুও নেই। তাহলে তাকে কেন ডাকল? ইয়ার্কি নয় তো? এরপর যে প্রশ্নটি আসে, সেটি চিঠির শুরুর অংশটি পড়লে স্পষ্ট হয়। আয়োজকরা জানিয়েছেন, তাঁরা একজন প্রেমিককে এই উদ্যান উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানাতে চেয়েছিলেন। তাই তাকে আমন্ত্রণ। সুমিত ভাবতেই পারত, স্থানীয় কাউন্সিলর কিংবা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হলে এইক্ষেত্রে ভালো হত। যদি বড় উদ্যান হয় তাহলে বিধায়ককেও ডাকা যায়। কিন্তু এসব কথা সুমিত ভাবছে না। প্রথমে সে ভাবে, এটা ইয়ার্কি, না সিরিয়াস বিষয়? দুটোর মধ্যে সে দ্বিতীয়টিকে ধরেই এগোতে চায়। অর্থাৎ বিষয়টি সিরিয়াস। সুমিত ভাবে। সে কি যাবে? নাকি যাবে না? যদি যায়, তাহলে সুমিত নিজেকে প্রেমিক বলে স্বীকার করে নিচ্ছে। যদি না যায়, তাহলেও প্রেমিক হতে অসুবিধে নেই অবশ্য। যদি যায়, তাহলে কী বলবে সে সেখানে? এসব প্রশ্নের ভেতর থেকে, পাতার আড়াল থেকে যে প্রশ্নটি সুমিতের সামনে বারবার ভেসে ওঠে, সেটি এই, যে, একজন মানুষের অনেকগুলো পরিচয় থাকে। থাকতে পারে। তার মধ্যে কোনওটি মুখ্য পরিচয়, কোনওটি গৌণ। একজন মানুষের সত্ত্বাও অনেকগুলো। একই মানুষ কখনও ভীতু। কখনও সাহসী। কখনও প্রতিবাদী, কোথাও আপোসকামী৷ যে প্রেমিক, সে কি বিরহীও নয়, কখনও? বোনের বিয়ের পর সে যখন অষ্টমঙ্গলায় বাপের বাড়ি এল, সুমিত দেখেছে, বোন তাদের সঙ্গে অত সময় কাটাচ্ছে না। একদিন দেখে, তার বোন, নিজের ফেলে যাওয়া ঘরের দেওয়ালজুড়ে কীসব খুঁজছে। কৌতূহলে সুমিত জিগ্যেস করে ফেলে : কী খুঁজছিস রে? বোন বলে : টিকটিকিগুলো কোথায় গেল রে দাদা?

আয়োজকরা আমন্ত্রণপত্রে জানিয়েছেন, সুমিত যেন উদ্যান উদ্বোধনের দিন তার প্রেমের অভিজ্ঞতা শোনায়৷ যেহেতু তারা এই পার্কের নাম দিয়েছে লাভার্স পার্ক, তাদের ধারণা, প্রেমিক-প্রেমিকার জুটিই এখানে বেশি আসবে। তাই সুমিতকে আমন্ত্রণ। আয়োজকদের বুদ্ধিমান বলতে হবে। কারণ শুধু প্রেমের অভিজ্ঞতা নয়, প্রেম এবং অপ্রেম নিয়ে তার ধারণার কথাও যদি সে বলে, তাহলে বড় ভালো হয়। কারণ এই পার্কে, প্রেম যেমন হবে, তেমনিই, ধরে নেওয়া যায়, বহু বিচ্ছেদও হবে। কোনও মেয়ে হয়ত তার নতুন বন্ধুটির সঙ্গে একদিন পার্কে এসে দেখবে, গাছের আড়ালে অন্য একটি মেয়েকে নিয়ে ঢুকে পড়ছে তার পুরনো প্রেমিক।

সুমিতের এই মুহূর্তে কোনও প্রেমিকা নেই। তবে প্রেম সে বহু করেছে। আরও করবে, এমত প্রত্যাশা সে নিজের কাছে রাখে। বস্তুত, এই একটি কাজই সে মন দিয়ে করে এসেছে। এখন মধ্য তিরিশে এসে প্রেম সম্পর্কে তার ধারণা, অনুভূতি, ব্যাখ্যা ইত্যাদি রূপান্তরিত হলেও, প্রেম বিষয়ে পুরোপুরি আগ্রহ তার হারায়নি। জীবনে এই একটিইমাত্র নদী, যা জীবনজুড়ে বা বলা ভালো, সারা জীবনের পাশে পাশে চলতে থাকে, কখনও ক্ষীণকায়া, কখনও স্রোতস্বিনী। আমরা কখনও সে নদীতে ভেসে যাই। কখনও ওপারে গিয়ে উঠি, সাঁতরে। কখনও ডুবে যাই, মাটি ছুঁই, নীচের। কখনও তার হাঁটুজলে নামি। কখনও মগ নিয়ে সে নদীতে নেমে স্নান করার মতো বোকামি করি। কখনও সে নদীতে বাঁধ দিয়ে নিজেকে শক্তিমান ভাবি। কখনও নদীতে চর পড়ে, আমরা মাটি ভেবে তার ওপর হেঁটে যাই, চাষ করি, ঘর তুলি। নীচে, বহে যায় নদী। সংসারের তলায় কুলুকুলু বহে স্রোত।

কিন্তু এতসব থাকলেও, প্রেমিককে কেউ ডাকে না। কোনও কমিউনিটি হল কিংবা শৌচাগার উদ্বোধন হবে, রাস্তা নির্মাণকাজের শিলান্যাস, কোথাও উৎসবের সূচনা হবে, শুরু হবে কোনও প্রকল্প, দুঃস্থদের মধ্যে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিলি হবে, এসব কাজে ডাকা হবে নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ, স্থানীয় কাউন্সিলর, জেলা পরিষদের সভাধিপতি, পঞ্চায়েত প্রধান, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, শাসকদলের জেলা কিংবা ব্লক সভাপতি, এঁদের। কিংবা কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, খেলোয়াড়, সমাজসেবী, চিকিৎসক, এরকম কাউকে। প্রেমিককে কেউ ডাকে না৷ প্রেমিককে নিয়ে কথা বলবে শুধু কবিরা তাদের কবিতায়। অথচ দ্যাখো, হে অনেক রাধাকৃষ্ণের দেশ। তবু ফিতে কাটতে, সংবর্ধনা দিতে, উদ্বোধনে, বই প্রকাশে, বক্তৃতায়, ভাষণে, মিছিলে, কেউ কক্ষনও প্রেমিককে ডাকেনি। প্রেমিকের কথা কেউ শোনে না। কেউ যদি পথেঘাটে জিগ্যেস করে, কী করছ ভাই আজকাল? যে যেটাই বলুক না কেন, বুক চিতিয়ে কেউ বলে না, প্রেম করছি। পৃথিবীর সব প্রেমিক ও প্রেমিকারা কবে আন্দোলনে নামবে? মার খেতে খেতে, লুকিয়ে চুরিয়ে বাঁচতে বাঁচতে তারা কি নিজেদের জন্য একটা কলোনিও দাবি করতে পারে না? প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য এখনও কোনও ঘর দিতে পারেনি রাষ্ট্র। এরা তো তবু পার্কের ব্যবস্থা করেছে।

প্রেমের জন্য মানুষ কত কিছু করে। কিন্তু প্রেমের জন্যেই কি করে? প্রেমের জন্য কী করে? আসলে সবাই ভাবে, সম্পর্ক বা প্রেমটা এমনিই এমনিই ঠিক থাকে যদি আমরা নিজেরা নিজেদের প্রয়োজনীয় ও ভালোলাগার কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারি। তাই বেশিরভাগ সময়েই আমরা আমাদের জন্য, বাড়ির জন্য, সংসারের জন্য, সন্তানের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য অনেক কিছু করি। কিন্তু প্রেমের জন্য সেভাবে কিছু করি না। যখন মানুষ ‘সম্পর্ক’টাকে একটা আলাদা এনটিটি বলে বুঝতে পারে, তখনই এর সলিউশন সম্ভব। প্রেমে তিনটে মূল এনটিটি থাকে। দুজন মানুষ এবং প্রেমটা নিজে। এর কিছু সাব এনটিটি আছে। ইন্ডিভিজুয়াল দুই মানুষের ইন্ডিভিজুয়ালিটি। প্রেমে থাকা দুই মানুষের কম্পানি। প্রেম, সে নিজেও একটি এনটিটি। সংশ্লিষ্ট দুই মানুষের কাছে প্রেম দুরকম এনটিটি নিয়ে থাকে। ক ব্যক্তি প্রেমকে যেভাবে জানে, খ ব্যক্তি হয়ত অন্যভাবে জানে। এই দুজনের মাঝখানে এসে প্রেম নিজের এনটিটি ও আইডেন্টিটির কিছু রদবদল করে। দুই আলাদা ব্যক্তিও দুজনের জন্য তাদের প্রেমের ধারণায় কিছু পরিবর্তন আনে। এতগুলো দিক থাকে প্রেমের সম্পর্কে। সহজ নয় একে ম্যানেজ করা। দুজনকে সময় দেওয়ার থেকেও জরুরি তাদের প্রেমটাকে সময় দেওয়া। দুজন যদি একসঙ্গে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সংসারের হিসেব নিকেশ করে যায় তাহলে দুজনকে সময় দেওয়া বলে না। সেটা সংসারকে সময় দেওয়া। দুজনকে সময় দেওয়া মানে দুজনের যৌথ প্রেমকে সময় দেওয়া।

কিন্তু, অন্তত কোনও প্রেম ঠিক প্রেমের গল্পের মতো নয়৷ জলের গভীরে যখন নীল তিমি ডুবে যায়, তখন তার হৃদস্পন্দন হয় মিনিটে মাত্র দুবার। আর যখন সে জল থেকে উঠে আসে, তখন মিনিটে ৩৭ বার। যত গভীরে যাবে, শ্বাসও পড়বে না। জলের কণাও টের পাবে না তুমি এলে। অত বড়ো শরীরটা নিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাণী নিঃশব্দে জলে ডুবে যায়। সে তার শ্বাসও রুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু, সুমিত ভাবে, এ সে কেমন মানুষ? যে মুহূর্তে সে তার একদা প্রেমিকার সদ্য প্রাক্তন হওয়ার শোকে, বিষাদে, অবসাদে মুহ্যমান; সেই একই সময়ে শোকে কাঁদতে কাঁদতে সে মাস্টারবেট করেছে, এরও প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে শয্যাদৃশ্য ভেবে। এ সে কেমন মানুষ? তবে কার জন্য বিচ্ছেদ-শোক? আর কার জন্য কামনার শোক? মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠে কি এইভাবে বিভিন্নরকম শোক আলাদা করা থাকে? এর জন্য এই কান্না, ওর জন্য ওই কান্না, এরকম? ভাগ করা? নাকি তার এই শোক, অবসাদ, বিষাদ সবই মিথ্যে? আর এ কেমন মিথ্যে যে মিথ্যের কথা সে নিজেই জানে না? এ তো সুমিতের দ্বারা সুমিতেরই অস্তিত্বের অস্বীকার করা। এ হয় নাকি! আর সুমিতই যদি সুমিতের দ্বারা সুমিতের কাছে অস্বীকৃত হয়; মানে সুমিত নেই; আর সুমিতই যদি নেই তবে সুমিতের বিচ্ছেদজনিত বিষাদ, শোক, অবসাদও নেই।

খুব ছেলেবেলায় সুমিতের পরিপার্শ্ব তাকে শিখিয়েছিল তাল গাছের মতো ঢ্যাঙা হয়ো না। বরং একটু বেঁটে হও, ক্ষতি নেই। লম্বা হলেই আকাশ ছোঁয়া যায়, এ বড়ো ভুল ধারণা। আকাশ, একটা কল্পনার নাম। লম্বা হওয়ার সঙ্গে তাকে পাওয়ার সম্পর্ক নেই। তাই এক কাণ্ড বিশিষ্ট ঢ্যাঙা গাছ হয়ো না। একটু বেঁটেই হও নাহয়, কিন্তু শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে দাও। জীবনে সব রাস্তাই পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা। একটা রাস্তা বন্ধ হলে আরেকটা রাস্তা দিয়ে পালাবার দরজা খোলা রেখো। শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে রাখো। দেখবে, নিজেকেই নিজে অবাক করে দিচ্ছ। খুব ছেলেবেলায়, সুমিতের পরিপার্শ্ব, তাকে এসব শিখিয়েছিল। আর সুমিত তো বড়ো হয়ে অবাকই হতে চেয়েছে। এখন যেমন লাভার্স পার্ক উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্রটি নিয়ে সে অবাক।

মাধ্যমিকস্তরে সাধারণ অঙ্ক করে এলে আমরা দেখি, দুটো অক্ষ হয়, মূলতঃ। x অক্ষ এবং y অক্ষ। x অক্ষ আনুভূমিক। y অক্ষ উলম্ব। প্রথমটিতে আছে পার্থিব পথের প্রাপ্তি ও ধুলো। দ্বিতীয়টিতে গভীরতা। সামাজিকভাবে আমাদের সম্পর্কের ঘনত্ব মাপতে শেখানো হয় x অক্ষ দিয়ে।

‘তুমি ওকে কতদিন ধরে চেনো?’ ‘কতদিনের সম্পর্ক তোমাদের?’ সমাজের সাধারণ ধারণা হল, দীর্ঘদিন ধরে মিশলে তবেই একটি মানুষকে চেনা যায়। x অক্ষ হল যাত্রাপথের একটি পথ। একমাত্র পথ কিন্তু নয়। ধরুন, আপনি ৫ কিলোমিটার চওড়া একটি নদী সাঁতরে পার হলেন। আপনার ৩০ মিনিট সময় লাগল। আরেকজন ডুব দে রে মন কালী বলে সোজা ডুবে গেল। নদীটা ছিল ১০ কিলোমিটার গভীর। সে ২০ মিনিটে নীচের মাটি ছুঁল। আপনি ৩০ মিনিটে ওপারের মাটি ছুঁয়েছিলেন। তাহলে কতটা পথ পেরোলাম এটা সবসময় শুধু x অক্ষ দিয়ে বিচার করা না-ও যেতে পারে। x অক্ষ দিয়ে y অক্ষের অতিক্রান্ত গভীরতা মাপা যায় না।

অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও দেখবেন অনেক সময়েই, একটা রেডিওর নব ঘুরিয়েও কাঙ্ক্ষিত স্টেশন পাওয়া যায় না। আবার কখনও নবে আঙুল আলতো ছোঁয়াতেই রেডিও তার স্টেশন পেয়ে যায়। দু বছর, চারবছর, সাতবছর, একটা সম্পর্ক আছে বা ছিল মানেই, সেখানে গভীরে চেনা ছিল, সুরসাম্য মিলে যাওয়া ছিল বা আছে, এমত না-ও হতে পারে। আবার ১৫-১৬ দিন বা মাসখানেকের সম্পর্কে মোটেই অনেকটা যাওয়া হল না, তা-ও নয়। যদি y অক্ষ ধরে তারা চলে, তাহলে তারা নদী পারাপার করছে না; তারা গভীরতা পেরোচ্ছে। কোনও সম্পর্ককে বুঝতে হলে, সবচেয়ে সহজ উপায়, আগে এটা বোঝা যে, সেটা কোন অক্ষের ওপর অবস্থিত। সেই অনুযায়ী তার যাত্রাপথ ও অভীষ্ট গন্তব্য আলাদা হবে। প্রতিটি সম্পর্কের যাত্রাপথ ও অভীষ্ট গন্তব্য পৃথক। আর অন্তত প্রত্যেকে জানি, সম্পর্কের, কোনও সম্পর্কের কখনও ধ্বংস হয় না। সম্পর্ক রূপান্তরিত হয়।

তবু সব প্রেম বারবার শত্রুশিবির আক্রমণ করবে; আর প্রত্যেকবার এ এক স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডের মতো শরীর। এই শরীরের সব প্রেম তাই যুদ্ধকালীন প্রেম। সব বিরহ যুদ্ধকালীন। এর চেয়ে অধিক রাজনৈতিক আর কী? এর চেয়ে ব্যক্তিগতও কিছু নেই।

প্রেমিক হাতের শিরা খুলে দেখে, রক্ত নয়, গলগল করে বেরিয়ে আসছে শূন্যতা। সে জলের নীচে যায়, অনেক নীচে, শ্যাওলারা পা জড়িয়ে বলে, তোমার কথা। সে তোমার কথার নীচে শুয়ে পড়ে। ওপরে তোমার কথার চাঁদোয়া। শব্দ থেকে শব্দের মাঝে যে ফাঁক, সেখান দিয়ে প্রেমিক দেখতে পায় তুমি বসে আছ। প্রেমিক রোদে হারিয়ে যায়। তুমি তাও বসেই আছ। পিঁপড়ের মতো লাইন করে তার পিছু পিছু আসছে তোমার কথারা। বৃষ্টি নামল দেখে প্রেমিক বাইরে আসে। দেখে, জল নয়, তোমার বাক্য নামছে আকাশ থেকে। শিল নয়, তোমার জমাট দুঃখ নামছে আকাশ থেকে। মইয়ের মতো তোমার বাক্য বেয়ে বেয়ে প্রেমিক আকাশে উঠে যায়। প্রেমিকের ক্ষতবিক্ষত দুই পা দিয়ে রক্ত নয়, তোমার কথা গড়িয়ে পড়ছে টসটস করে। অথচ প্রেমিক তার ধমনী ফাঁক করে দেখেছিল, তাতে শূন্যতা ভরাট। কাঁধ খুঁজতে খুঁজতে তার কাঁধ নুয়ে পড়েছে। ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। তার জ্যা নেই। তূণ নেই। কোনও একলব্য, অর্জুন, সূতপুত্র কর্ণ নেই। অর্ধচন্দ্রের মতো নুয়ে পড়া কাঁধ নিয়ে সে শুধু তোমার কাঁধ খুঁজছে।

‘খেয়ে নিন, সুমিত’, মিতালির আওয়াজে ঘুরে তাকায় সে। হাতল দেওয়া কাচের চওড়া গ্লাসে দইয়ের ঘোল আর স্টিলের ছোট প্লেটে কুসুম ছাড়া একটা ডিমের দু ফালি করা শাদা অংশ। গত বছরের লকডাউনের পর প্রায় এক বছর বাদে এই শহরে এসেছে সুমিত। এ বাড়িতে কয়েকদিনের অতিথি সে। গতকাল আসা আমন্ত্রণপত্রের কথা এখনও কাউকে বলেনি। সত্যিই সে আগামীকাল সেখানে যাবে কিনা, ঠিক করেনি এখনও। হয়ত চলেই যাবে। ওখানে কেউ তাকে চিনতে না-ও পারে। পরিচয় না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে হয়ত ভিড়ের পিছন দিকে। গত বছর, লকডাউনের সময় এই শহর তাকে দুটো প্রেমের গল্প শুনিয়েছিল। সারা দেশের রাস্তাঘাট তখন শুনশান। সকালে কিছুক্ষণের জন্য দোকান বাজার খুলছে৷ যাদের জমানো টাকা আছে অনেক, হুড়োহুড়ি করে দেদারে যা পারছে কিনে রাখছে। বাকিরা কী খাবে, ভাবছেই না কেউ তাদের কথা।

সুমিত ভেবেছিল, লিখে রাখবে সেই সময়টার কথা। লেখেনি৷ ভেবেছে, সে না লিখলে কি খুব খারাপ হবে সেটা? এই জমাট শোক, মৃত্যু আর বিপন্নতার সামনে তার চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে হয়েছিল। কোনও কথা না বলে শুধু নীরবতার কাঁধ রাখতে ইচ্ছে হয়েছিল নীরবতার কাঁধে। যদি কিছু বলতেই হয়, বলতেই যদি হয় কিছু, খুব ধীরে, চুপ থাকুক সে, এই-ই চেয়েছিল। এই কান্নার পাশে আর তো কিছু বসতে পারে না, সব ভাষা ভেসে যায়। শ্রমিকরা বাড়ি ফিরছে হাজার মাইল হেঁটে। রেললাইনে পড়ে আছে পোড়া রুটি আর শ্রমিকের লাশ। রাস্তায় বসিয়ে কীটনাশক আর ব্লিচিং স্প্রে করা হচ্ছে তাদের গায়ে। প্লেনে করে বিদেশ থেকে ফিরছে বড়লোকরা৷ ফিরে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। পার্টি করছে। এই দিশেহারা সময়ে দুই যুগলকে দেখেছিল সুমিত। সবাই যখন দিশেহারা, উত্তরহীন, তখন তারা জানত তারা কী চায়। একটি মেয়ে থাকত রায়পুরে। ছত্তিশগড়। ছেলেটি হরিয়ানার এক গ্রামে৷ দুজনের তখনও দেখা হয়নি। প্রেমে পড়তেই শুরু হয়ে যায় লকডাউন৷ রোজ তারা প্রার্থনা করছে, কবে উঠবে লকডাউন। রোজ তারা পরিকল্পনা করছে, লকডাউন উঠলে প্রথমেই কী করবে৷ রোজ খবরের কাগজ আর টিভির ব্রেকিং দেখে দেখে আর লোকজনের মুখ ঘুরে আসা নানান গুজব, সত্য, মিথ্যা ও অর্ধ সত্য মিশে থাকা তথ্য ও কথাবার্তা শুনে, পড়ে, দেখে, তারা প্রতিদিন অন্য এক বিকল্প সত্যে উপনীত হওয়ার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তখন৷ নানাভাবে তথ্য আর অঙ্ক কষে ভাবছে, আগামী সপ্তাহে লকডাউন উঠে যাবে। আগামী সপ্তাহ এলে ভাবছে, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে উঠবে। সেসব কিছুই হচ্ছে না। তারা শুধু শেকলবাঁধা হয়ে দু জায়গায় পড়ে আছে মিলনপ্রত্যাশী হয়ে। কোথাকার কোন ভাইরাস এসে তাদের প্রেমের পথে বিপুল পাহাড় পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তারা দুই প্রান্তে বসে রোজ সেই পাহাড়ে ফুটো করার রাস্তা খুঁজছে, যদি কোনওভাবে কাছাকাছি আসা যায়৷ যেভাবেই হোক, এই লকডাউন উঠে যাক, প্রেমে পড়ে তারা শুধু এই চেয়েছে।

আরেক যুগলকে দেখেছে সুমিত, এই শহরেই। সেটাও করোনার দিনগুলিতেই। বিবাহিত দুই নারী-পুরুষ, অসমবয়সী দুজনেই তাদের সংসারের বাইরে, সংসার পেতেছে তখন এই শহরে৷ মধ্য পঞ্চাশের পুরুষটির স্ত্রী তখন অন্য শহরে। প্রায় তিরিশের কোঠায় নারীটির স্বামীও অন্যত্র। নিজেদের সামাজিক সংসারকে যে-যার ঘরে রেখে এই ত্রাসের শহরে সংসার পেতেছে দুজন, লুকিয়ে। দুজনেই রোজ বলে, এই লকডাউন যেন কখনও না ওঠে। চিরস্থায়ী হোক এই বন্দিদশা। অন্তত চিরকাল স্তব্ধ হয়ে থাক গোটা দেশ। নইলে যে তাদের খেলনাবাটির সংসার ভেঙে যাবে৷ রোজ খবরের কাগজ আর টিভির ব্রেকিং দেখে দেখে আর লোকজনের মুখ ঘুরে আসা নানান গুজব, সত্য, মিথ্যা ও অর্ধ সত্য মিশে থাকা তথ্য ও কথাবার্তা শুনে, পড়ে, দেখে, তারাও প্রতিদিন অন্য এক বিকল্প সত্যে উপনীত হওয়ার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ তথ্য ঘেঁটে আর অঙ্ক কষে ভাবছে, আগামী সপ্তাহেও কিছুতেই লকডাউন উঠবে না। আগামী সপ্তাহ এলে ভাবছে, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেও থেকে যাবে লকডাউন। সমস্ত সংবাদ তাদের কাছে আনলকের আতঙ্ক হয়ে আসে। তারা শুধু এই ঘরে থেকে যেতে চায় ভাইরাসের আশীর্বাদ নিয়ে। এই ভাইরাসই তো তাদের প্রেম ও সমাজ, এই দুয়ের মাঝখানে বিপুল পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা দুজন রোজ সেই পাঁচিলের ফুটোগুলো ঢেকে দেয়৷ যেভাবেই হোক, এই লকডাউন থেকে যাক, প্রেমে পড়ে তারা শুধু এই চেয়েছে।

এক প্রান্তে এক যুগল চাইছে ভেঙে যাক, যেভাবে হোক ভেঙে যাক, এই অদৃশ্য তালা। আরেক যুগল, তারা চাইছে, থাকুক তালা। অনন্তকাল। হারিয়ে যাক চাবি। রাষ্ট্রীয় ঘোষণাতেই গৃহবন্দি থাক তারা দুজন দুজনকে জড়িয়ে। যেভাবে রেললাইনে পড়ে থাকে ছেঁড়া ও পোড়া রুটি; পাশে, অল্প দূরে, শ্রমিকের কাটা হাত, মাঝখানে চলাচল করে সোনালি ক্ষুধা। রেললাইন ধরে হেঁটে যায়, সোজা, ফিরে আসে ফের, কাটা হাতের চারপাশে ঘোরে, রুটির পাশে বসে; আঙুলের ফাঁক দিয়ে পতিত পারদের মতো নেমে যায়, রেললাইনের ধারে সার বেঁধে বসে অভিশপ্ত যুগলেরা। তাদের মাথা নীচু। ঘাড়ের কাছে কাটা দাগ। প্রেমিকের শ্রম, শ্রমিকের প্রেম, দুজনে শ্বাস আটকে রেললাইন ধরে আড়াআড়িভাবে ভারতবর্ষের মানচিত্র পেরুচ্ছে। নীচু হয়ে উড়ছে তাদের যাত্রাপথের ধুলো। কোনও নবনির্মিত উদ্যানে তাদের জায়গা নেই। তাদের কাছে কোনও আমন্ত্রণপত্র আসেনি।

Facebook Comments

Leave a Reply