সমসাময়িক গণতন্ত্রের চর্চা : ড. অজয় অধিকারী

fail

সোশ্যাল মিডিয়ায় “দামাল বাংলা” নামে একটি সংগঠনের প্রচার দেখলাম। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কোন এক মফস্বল শহরে মাঝ বয়সী কিছু নারী-পুরুষ একটা টোটো রিক্সায় প্রচার করছেন এবং তাদের বয়ান একটাই “১৯৪৮ সালের ১৯ শে জুলাইয়ের আগের জমি বাড়ির নথি না দেখাতে পারলে বাঙালিকে NRC আইনে কর্পোরেটের কৃতদাস, মজুর বানিয়ে রেখে দেবে বিজেপি সরকার।”
কিছুক্ষণ পর কিছু অতি উৎসাহী মানুষ সেই টোটো গাড়িকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভ শুরু করলো। তারা বলছিল “আপনারা রোহিঙ্গাদের দালাল।”
ক্রমশ বাড়ছিলো উত্তেজনা, উত্তাপ ছড়াচ্ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো দু-পক্ষই সম্ভাব্য সত্যের অতিরঞ্জন করে চলছিলো। সাথে এটাও চেতনার কোনায় উঁকি দিচ্ছিলো যে উভয়েই সম্ভাব্য সত্যের উপর নিজেদের অতিরঞ্জিত মতামত চাপিয়ে চলেছেন কোনও সত্যের জন্য নয়; আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে তারা সেটাকে ব্যবহার করেছিলেন। বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে নির্মিত রাজনৈতিক বাইনারিকে সামনে রেখে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলিকে ক্রমাগত এভাবেই নির্মাণ করা হচ্ছে।
যদি এই দু’পক্ষই নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে তাদের প্রচারের হাতিয়ার করতে পারতো যেমন, যারা বিজেপি বিরোধী তারা প্রচারের অংশে বলতে পারতো গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর আঘাত। ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষয় ও বিদেশী বিনিয়োগ। কর্মক্ষেত্রের লাগাতার সংকোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ক্রমাগত রাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রে নূন্যতম মজুরি নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি, ইত্যাদি। যারা তৃণমূলের বিরোধিতা করছে তাদের হাতেও ছিল অসংখ্য জ্বলন্ত ইস্যু। যেমন- গত দশ বছরে সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে ক্রমাগত স্বৈরাচারী আক্রমণ, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যাপক দুর্নীতি, হাসপাতাল, স্কুল কলেজ সর্বত্র নির্লজ্জ তোলাবাজি- ইত্যাদি, ইত্যাদি।
উভয় দলের বিপক্ষে যে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারতো কোন পক্ষই সে সবের ধার ধারছে না। লড়াই চলছে কল্পিত, সম্ভাব্য কিছু আপাত-আতঙ্ক সৃষ্টিকারী প্রকল্পের উপর। যে ইস্যুগুলো মূলত আদিম, অসার এবং অর্ধসত্য।
এর সাথে রয়েছে আধুনিক মিডিয়ার (মিডিয়া হাউসের) উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচার- সেখানে খবর নেই, খবরের বিশ্লেষণ নেই, কিন্তু সর্বত্র খবরের ‘খবর’ তৈরি হচ্ছে। নামকাওয়াস্তে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সামান্য গন্ধ এখনও দেশের রন্ধ্রে যেটুকু বেঁচে আছে তা নিঃশেষ হওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আগামী পাঁচ-দশ বছর যদি মিডিয়ার একই ভূমিকা বজায় থাকে, তবে তা শুধু শাসকের প্রচার যন্ত্রে পরিণত হবে। প্রধানমন্ত্রী পদ প্রার্থীর কেদারনাথ মন্দিরের গর্ভগৃহে কয়েক ঘণ্টায় সন্ন্যাস ধারণের কোটি টাকার চিত্র গ্রহণের প্লট নির্মাণ থেকে শুরু করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ভোট প্রচারে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আহত হওয়ার ঘটনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচার করে মিডিয়া আজ সোপ অপেরা চালু রেখেছে। দেশের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ধর্ম ও জাত-পাতের হানাহানি, জনগণের পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মত প্রশ্নগুলি আজকের মিডিয়ায় পরিত্যক্ত বিষয়।
সারা দুনিয়ায় যখনই শাসক স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে কিংবা ব্যক্তির নিজের স্বাধীন ও সাংবিধানিক ইচ্ছায় স্বাভাবিক জীবনবোধ ও বিচার ব্যবস্থার গতিপথকে প্রতিরোধ করেছে, তখনও মিডিয়ার ভূমিকা ছিল সবসময় জনগণের পক্ষে, শাসকের পক্ষে নয়। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত মিডিয়া তাদের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শেষ দিকে (নির্বাচন ফলাফল ও গণনার সময়কালে) বয়কট করেছিল। কারণ তিনি মিথ্যা বিবৃতি দিচ্ছিলেন বলে মিডিয়া মনে করেছিল।
এদিকে আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী গত সাত বছরে একটিও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। ১৩০ কোটি মানুষের দেশে তিনি প্রতি সপ্তাহে বেতারে ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠান করেন বটে, তবে তিনি কখনও দেশের মানুষের মনের কথা, তাদের জীবন যন্ত্রণার কথা শোনেন না। বুঝতেও চান না। শুধু বিজ্ঞাপন নির্ভর প্রচার-ফানুস উড়াতে চান। আর আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী গত দশ বছরে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন কিছুটা কিন্তু সরকারি অফিসার নিয়ে বৈঠক করেছেন তার থেকে অনেক বেশি। এই বৈঠকে তিনি একেবারে একজন মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রভুর কায়দায় অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং কদর্য ভাষায় অফিসারদের ধমক দিয়েছেন, তা আমরা দেখেছি। নিজের দলের জন প্রতিনিধিদেরও তীব্র অন্যায্য ভাষায় আক্রমণ করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই – “আমি একাই সকলের ভালো চাই” – এটা প্রমাণ করা। একদম প্রথম থেকেই এই সব তথাকথিত “প্রশাসনিক সভায়” কখনো সেই অঞ্চলের নির্বাচিত বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের তিনি কখনও আমন্ত্রণ করেননি। যে কয়েকটি সাংবাদিক সম্মেলন এখনো পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী করেছেন সেখানে তিনি নিজের পছন্দসই প্রশ্ন না পেলেই সেই সাংবাদিককে এবং তার পত্রিকার মালিককে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন।
খুব ছোটবেলায়, আমার স্কুল জীবনের মাষ্টারমশাই আমায় বলেছিলেন, “যে দেশে সব থেকে বেশী সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহার হয়, সেই দেশ শিল্পক্ষেত্রে ততটাই এগিয়ে।” অনেকদিন সময় লেগেছিল সেই তথ্য বুঝতে। কিন্তু, এটা হয়ত এখন সমাজের নাড়ির উপর হাত রেখে বোঝা যায় যে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্র নেতা বা রাজ্য নেত্রীর এই ছোট ছোট আচরণগুলি প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের কোন স্তরে আজ আমরা অবস্থান করছি!

গত কয়েক বছরে কতকগুলি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

এই পর্বে গত কয়েক বছরে ভারতবর্ষে এবং আমাদের এই রাজ্যে ঘটে যাওয়া কতকগুলি ঘটনার দিকে দৃষ্টি রাখার চেষ্টা করবো। এটা হয়ত আমরা সকলেই স্বীকার করবো যে বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব-রাজনৈতিক সমীকরণে এশিয়া এবং আফ্রিকায় ছোট-বড় যে সমস্ত দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল, আমাদের দেশটি তাদের মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আমাদের সকলের অভিজ্ঞতা সেটাই বলছে।
সেই অভিজ্ঞতা এটাও বলছে যে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্তিলাভ, এই সব দেশে তেমন কোন বড় মৌলিক সামাজিক পরির্তনের মধ্যে দিয়ে আসেনি৷ সুতরাং একথা বলাই যায় যে ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মানুষ তৎকালীন ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ধারণার উপর দাঁড়িয়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলো। ভারতবর্ষের মত দেশে যেখানে ধর্ম-জাতপাত-নারী-পুরুষের বৈষম্য প্রায় প্রাগৈতিহাসিক পর্যায়ে রয়েছে সেখানে এই সামান্য ক্ষমতা হস্তান্তর শাসন ব্যবস্থা ও সমাজ-রাজনৈতিক কাঠামোর কোন মৌলিক পরিবর্তন করতে পারেনা। তবুও একথা বলাই যায় যে সমসাময়িক দেশগুলি (যেমন- পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমার, ইত্যাদি) থেকে গণতন্ত্র চর্চার পরিসরটা ভারতবর্ষ-এর ক্ষেত্রে বহুযোজন পথ এগিয়ে ছিলো। এবং আজও তার রেশ খানিকটা সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে বিদ্যমান।
কিন্তু শাসক শ্রেণীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান ১৯৪৭ সালের পর থেকে এখানে খুব একটা বদলায়নি। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তারা হয় উচ্চবর্ণের (Privileged Class) হয়েছে, নতুবা ব্রিটিশ শাসকের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার থেকে জন্ম নেওয়া প্রাক্তন বা বর্তমান সামন্ত প্রভুরা শাসন ব্যবস্থায় ভিড় জমিয়ে রেখেছে। নেহেরুর আধুনিক ভারত নির্মাণের যে মডেল, সেটি ছিলো মূলত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রগঠন চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত। আধুনিক ভারতের দ্বিতীয় ধাপে মধ্যবিত্ত শ্রেণী নির্মাণের সোপান হিসাবে এই সময়টি চিহ্নিত। নেহেরু জামানার মূল সাফল্য কিন্তু ধরা পড়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নির্মাণের প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে। জাতীয় ভারি-শিল্প নির্মাণ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, বিদ্যুৎ, জলসেচ এই জাতীয় মৌলিক পরিকাঠামোতে সরকারের বিশাল বিনিয়োগ ইত্যাদি। নেহেরু পরবর্তী ভারত কিন্তু সমাজ ও অর্থনীতির গতি মুখ নির্মাণে এই ধারা থেকে সরেনি। বিশেষ করে, ১৯৯১ সালের আগে পর্যন্ত খুব একটা সরে যেতে পারেনি।
দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ এখানে না থাকলেও, এটা বলা যায় যে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতি যেটা করতে পারেনি তা হল একটা বিরাট সংখ্যক ভারতীয়কে যারা ঐতিহাসিকভাবে দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া এবং বঞ্চিত শ্রেণী, তাদেরকে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করতে না পারা। তারা হয়ত ভোটার হয়েছেন কিন্তু নাগরিক হননি। রাষ্ট্রের মোটামুটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির পাত্র থেকে চুইয়ে পড়া রস যেটুকু পেরেছে তার উপর ভিত্তি করে উদরপূৰ্ত্তি হয়তো হয়েছে, কিন্তু “ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ” থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উদারীকরণের যে বাধ্যবাধকতা ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হয়েছে সেখানে বারবার করে উঠে এসেছে পরিচিতি সত্ত্বার রাজনীতি এবং তার বাড়াবাড়ি। দুঃখের বিষয় হল এই পরিচিতি সত্ত্বার রাজনৈতিক নেতৃত্বও কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সত্ত্বার প্রতিনিধি নন, কিংবা সেটা হলেও তারা স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় ধাপের মধ্যবিত্তের সাথে মিশে গিয়ে তাদেরই রাজনৈতিক এজেন্ডাকে পুষ্ট করেছেন।
অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যারা নিপীড়িত শ্রেণির প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক পক্ষ-প্রচার শুরু করেও মধ্যবিত্তের চকচকে ভারতের রাজনৈতিক অভ্যাসে হারিয়ে গেছেন। মায়াবতী, শিবু সোরেন, মুলায়ম সিং যাদব, আরও অনেকে আছেন। আর যারা উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিত্ব করেও অবহেলিত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে দাবি করছেন, তাদেরকেও শুধু পরিচিত সত্ত্বা ব্যবহারের কৌশল নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণের জয়ললিতা, আমাদের রাজ্যের মমতার নাম সেই দলে উল্লেখ করা যেতেই পারে।
১৯৪৭ সাল থেকে ৭৩ বছরের যাত্রায় ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ভারতীয়দের ভোটাধিকার খানিকটা নিশ্চিত করলেও, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। সর্বভারতীয় দল থেকে শুরু করে আঞ্চলিক দল হয়ে আন্তর্জাতিক বামপন্থী দলগুলি, সকলেই এই সময়ের মধ্যে স্বাধীন সত্ত্বার নাগরিক ভোটার তৈরি করতে বিফল হয়েছে।
কিন্তু “ভোট ব্যাঙ্ক” তৈরি করতে তারা সকলেই হয়তো সমর্থ হয়েছেন। দল নির্মিত মতামতের পক্ষে হয়তো অনেক সমর্থক তৈরি হয়েছে, কিন্তু সাধারণের মতামতের উপর ভিত্তি করে দলের নীতি তৈরি হয়েছে খুবই কম। ফলে ক্ষমতাসীন দল বিভিন্ন বৃহৎ স্বার্থ-গোষ্ঠীকে (সামাজিক, ধর্মীয়, জাতি ভিত্তিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত) নিজেদের রাজনৈতিক বৃত্তের মধ্যে ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্বার্থ-গোষ্ঠীর স্বার্থ-রক্ষা করে চলেছে। রাম মন্দির নির্মাণ, মণ্ডল কমিশন প্রবর্তন, জাতি ও ভাষা ভিত্তিক ছোট ছোট রাজ্য নির্মাণ, কিংবা বিভিন্ন কর্পোরেট হাউসের ব্যবসায়ীক স্বার্থ রক্ষার এজেন্ডাই এখন ভারতীয় রাজনীতির নির্ণায়ক শক্তি। গণতন্ত্রের প্রকাশ যন্ত্র।
১৯৯১ সাল থেকে এই প্রবণতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে ভারতের রাষ্ট্রীয় ও প্রাদেশিক স্তরে আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থায় ও বিচার ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে শুরু করে দিয়েছে। কিছু উদাহরণ সমানে রাখলে হয়তো আরও পরিষ্কার করে পরিস্থিতির গভীরতা আন্দাজ করা যাবে। যেমন, দীর্ঘ দিনের জন্য ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বহু চর্চিত বিষয় কাশ্মীরের জন্য প্রযোজ্য সংবিধানের ৩৭০ ধারা সংসদে কোন রকম আলোচনা না করেই অর্ডিন্যান্স জারী করে তুলে দেওয়া হলো। একটি রাজ্যকে তিনটি টুকরো করে যেখানে খুশি নিজেদের মতো করে কাশ্মীর ঘাঁটিতে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে প্রায় বছর খানেক ধরে রাজ্যটিকে অবরুদ্ধ করে রাখা হলো।
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসাবে CITIZENSHIP AMENDMENT BILL-এর কথা বলা যায়। রাজ্য সভায় পাশ করিয়ে নেওয়ার জন্য যে পদ্ধতি সেটার ক্ষেত্রেও অবলম্বন করা হয়েছিল সেটি ভারতীয় সংসদে একটি বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনা।
তৃতীয় উদাহরণ হিসেবে অবশ্যই চলে আসে বাবরি মসজিদের ফৌজদারি মামলার কথা। এই মামলাটাকে দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ায় জিইয়ে রেখে, সমাধান না করেই বিতর্কিত জমির টাইটেল স্যুট যেভাবে নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রে দেশের আইনি প্রক্রিয়ার উপর সাধারণের ভরসার ঘাটতি দেখা দিলে অন্যায় কিছু হবে না হয়তো। মনে রাখার মতো একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে এই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে মাত্র এক বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের চার জন বিচারপতি নজিরবিহীন ভাবে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলন করে রীতিমত বিদ্রোহ করেছিলেন।
ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই তিনটি ঘটনা যা উল্লেখ করা হলো তা কিন্তু নজিরবিহীন। গত ৭০ বছরে আমাদের দেশ একেবারে সর্বোচ্চ স্তরে গণতন্ত্রের চেহারাকে নিম্নগামী করে তুলেছে। ১৯৭৫ সালের জরুরী অবস্থা ঘোষণা, ১৯৯২ সালে সংঘবদ্ধভাবে একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে ধ্বংস করে দেওয়া ও কেন্দ্রের সরকার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে নির্লজ্জভাবে ওই ঘটনাকে ঘটতে দেওয়া – এই দুটো ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছিল সবথেকে ন্যক্কারজনক ঘটনা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় লোকসভা, সুপ্রিম কোর্ট ইত্যাদির ভূমিকাও কিন্তু আজ নিম্নগামী হচ্ছে বলে অনুভূত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্রের যে সব পীঠস্থান ভারতের রাষ্ট্র-কাঠামো মোটামুটি ধর্মনিরপেক্ষভাবে গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল, সেই ধারণা আরও সংকটে পড়ে যায় যখন বাবরি মসজিদের টাইটেল স্যুটের রায় ঘোষণা করা প্রধান বিচারপতি অবসরের কিছুদিনের মধ্যেই শাসকদল দ্বারা রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।
এটা যে একটা বড় ভয়ংকর সময় – তেমন একটা কথাকেই হয়তো, এই সকল ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের একজন রাজ্যবাসী হিসেবেও এরকম বহু উদাহরণ সামনে আনা যেতে পারে। এগুলি অভূতপূর্ব এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহু কু-নিদর্শনের অতীত থাকলেও, এই ধরনের ঘটনা আগে কখনো যে ঘটেনি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন ক্ষমতাসীন শাসক সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শাসন ও বিচার ব্যবস্থায় একাই শেষ কথা বলার প্রবণতা তৈরি করছেন। শাসকের ভাবনাই যে শাসন প্রণালী, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – প্রথমত, ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন উপলক্ষে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার শ্রীমতী মীরা পাণ্ডের সাথে রাজ্য প্রশাসনের লড়াই আমরা দেখেছি। একজন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার একটি রাজ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়চ্ছেন অথচ তিনি নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে সক্ষম হতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনে এবং ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে৷ রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মাঝপথে পদত্যাগ করে নির্বাচনের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই পালিয়ে বেঁচেছেন। সারা পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া এই সংবাদেরও পুষ্টিকরণ করেছিল যে রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা ব্যক্তিগত বাসভবনে গিয়ে হুমকি পর্যন্ত দিয়ে এসেছিল।
তৃতীয়ত, রাজ্যের মানবাধিকার কমিশনার যিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রাক্তন বিচারপতিও বটে তাকে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তর থেকে আক্রমণ করা এবং ব্যক্তিগত কুৎসা করে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা এবং প্রাক্তন পুলিশ অফিসারকে মানবাধিকার কমিশনের মাথায় বসিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা এ রাজ্যের হাজারো হিংসা ও রাজনৈতিক রেষারেষির মত ন্যক্কারজনক ঘটনাবলিকেও ম্লান করে দেয়।
উদাহরণ অনেক দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নির্যাস বক্তব্য এই যে জাতীয় ও রাজ্যস্তরে, রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের চাহিদা ক্রমাগত কমছে। সেই কমে আসা চাহিদার তালিকায় যেমন রয়েছে অর্থনৈতিক চাহিদা, ঠিক একইভাবে সামাজিক ও প্রশাসনিক ন্যায় বিচারের চাহিদাও সেখানে রয়েছে। দেশের নাগরিক যখন ধীরে ধীরে এই ধারণার সম্পৃক্ত হবেন যে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার যা খুশি করতে পারে, সাথে সে যখন এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে বিচারব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করা যায়, মানবাধিকার কমিশনের কোন শক্তি সামর্থ্য নেই, প্রশাসন নির্বাচন কমিশনকেও হুমকি দিয়ে যা-খুশি করতে পারে, রাষ্ট্র নিজের পক্ষে সকল কিছুকে নিয়ে নিতে পারে, – তখন, ঠিক তখনই শাসক তার সামাজিক চাহিদাকে নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে ফেলে। ক্রমশ নিজেকে সাংবিধানিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নিয়ে একা হতে শুরু করে, এবং রাষ্ট্রের তৈরি চকচকে উপরি-কাঠামোতে নিজেকে নিয়োজিত করে। যদি সে বিত্তশালী হয় তবে আরও অর্থ রোজগারের জন্য উপরি-কাঠামোর বিভিন্ন অংশে জুড়ে থেকে সুবিধা গ্রহণ করে। আর যে বিত্তশালী নয়, সে “দু-টাকা কেজি চাল”, “কৃষক ভাতা”, “বিধবা ভাতা”, – এই রকম অনুদান নির্ভর হয়ে দিন গুজরান করতে বাধ্য হয়।
গত পাঁচ বছরে এখন এটাকেই একমাত্র অনুশীলন হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলি কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। যেহেতু ভারতবর্ষের অধিকাংশ মানুষই বিত্তহীন, তাই অনুদান বা ভাতার উপর নির্ভর করে তাদের সমর্থন কেনার চেষ্টা হচ্ছে। নিপীড়িত প্রান্তিক মানুষদের অবশ্যই খাদ্যের যোগান রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু তার অধিকারের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সন্তান-সন্ততির সম্মানযোগ্য কাজ পাওয়ার অধিকার আছে। এই সম্মানজনক কাজ ও জীবন প্রতিষ্ঠার কথা এখন অস্বীকার করার প্রবণতা রাষ্ট্র তেরি করেছে। এবং সেই ১৯৯১ সাল থেকেই এই যাত্রা শুরু হয়েছে যেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেশবাসীর আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, আত্মসম্মানের প্রশ্ন, সব থেকে বেশী করে অবহেলিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিসর ছোট হয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও এগুলি সহ্যের সীমার মধ্যে চলে আসছে। পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ এখন তিন ঘণ্টার টি-২০ ম্যাচ দিয়ে সামাল দেওয়া ক্রিকেটে চললেও চলতে পারে কিন্তু দেশের ও রাজ্যের আইনসভা, বিচার সভা, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি ক্রমাগত দুর্বল হলে ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, বার্মা, কিংবা বাংলাদেশ তৈরি হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ও কয়েকটি পর্যবেক্ষণ

বর্তমানে দেশের গণতন্ত্রের যে চেহারার কথা উপরের আলোচনায় বর্ণনা করা হয়েছে তার অ্যাসিড টেস্টের জন্য এই পর্যায়ে একটি ভিত্তিভূমি হিসেবে যদি আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে ধরা হয়, তবে পর্যবেক্ষণের নির্যাস নিয়ে সামান্য পর্যালোচনা করার চেষ্টা এখন করা যেতে পারে। এই অংশের কথা সেটাকেই দেখতে চাইছে।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক কয়েকমাস আগে চারটি রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন নির্ধারিত ছিল। সেই উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব ছিল যে ভারতবর্ষে লোকসভা এবং বিধানসভায় ভোট একই সাথে মিটিয়ে নেবার মত সংবিধান সংশোধন করা যায় কিনা। উদ্দেশ্য কি ছিল সেটা নিয়ে বিতর্ক না করলেও এটা বোঝা যাচ্ছে যে ভোট প্রক্রিয়ার গুরুত্ব কমিয়ে একটা একমুখী শাসনব্যবস্থা কায়েম করার প্রবণতা কিন্তু এই প্রস্তাবে রয়েছে।
লোকসভা কিংবা বিধানসভার নির্বাচন এক বিষয় নয়। এক পাল্লায় মাপার মত বিষয়ও নয়। এখন এই সব মৌলিক প্রশ্ন যদি গুলিয়ে দেওয়া হয়, তবে গণতন্ত্রের প্রশ্ন আরও সংকুচিত হবে। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৮র নভেম্বর থেকে বহু পৌরসভার নির্বাচন বকেয়া পড়ে রয়েছে। এরপর ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে প্রায় ১৫০ পৌরসভার নির্বাচন হয়নি। রাজ্য সরকারও এই বিষয়ে কোন উৎসাহ দেখায়নি। অর্থাৎ দুটি সরকারেই নির্বাচন সংক্রান্ত ধারণা মোটামুটি একইরকম।
যদিও ২০১৮ সালের যে অভূতপূর্ব পঞ্চায়েত নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে সেটাও প্রমাণ করে যে স্বৈরাচার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য শাসনের সর্বত্র প্রবেশ করেছে। সব থেকে অবাক করার বিষয় এই যে বিডিও, এসডিও এবং ডি এমের অফিসগুলো একটি লম্বা সময় ধরে শাসক দলের দখলে চলে গেছিলো। এই প্রথম আমরা সেটা প্রত্যক্ষ করলাম। দেখলাম, রাজ্য সরকারী কর্মচারীর একটা বড় অংশ, পুলিশ প্রশাসন, সবরকম সুশীল-সিভিল অংশ শাসক দলের ডাণ্ডার নিচে আত্মসমর্পণ করেছে। এই ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই তাই বহু বাম বিরোধী মানুষও প্রকাশ্যে “বামপন্থীদের শাসনও এদের থেকে ভালো ছিল”- এই জাতীয় ভাষ্য উচ্চারণ করেছেন।
২০১৮ সালের নির্বাচন আরও একটি বিষয় রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেটি হলো শাসক দল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের এই মিলিত সন্ত্রাসের মোকাবিলায় বামপন্থীরা নয় বিজেপি কিছুটা হলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এবং সম্ভবত সেই কারণেই ২০১৯ সালের লোকসভার নির্বাচনে সেটার রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড তারা ঘরে তুলতে সমর্থ হয়েছিল।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি আসন্ন নির্বাচনে খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে তা হলো রাজ্যের শাসক দলের তৈরি করা একটি অত্যন্ত দুর্বল কিন্তু বিপজ্জনক ভাষ্য। এটি হল “বহিরাগত” তত্ত্ব এবং একই সাথে অহেতুক একধরণের বাঙালি অস্মিতা তৈরির চেষ্টা। এমনভাবে এই ভাষ্য নির্মাণের চেষ্টা হচ্ছে যেন বাঙালির কোনকালে কোন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চরিত্র ছিল না। এমনকি আজ আমরা দেখছি যে “বাংলা পক্ষ” বা এই জাতীয় কিছু সংগঠন সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন অবাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে গিয়ে তাদের হেনস্থা করা থেকে শুরু করে “গুটকাখোর” ইত্যাদি অশালীন ভাষায় গালাগাল করছে। মনে পড়ে যায় যে ২০১৯ সালে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রে হেরে যাওয়ার পর, ভাটপাড়া এলাকায় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান শুনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাদের বহিরাগত বলে অশালীন ভাষায় তেড়ে যাওয়ার ঘটনা। আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বহুরাজ্যে বহুদিন যাবত বাঙালিকে বহিরাগত হিসাবে সেখানকার মূলনিবাসী মানুষেরা চিহ্নিত করে এসেছে এবং মাঝে মধ্যেই সেখানে বাঙালিরা গোষ্ঠী আক্রমণের শিকার হন। স্থানীয় মূলনিবাসীদের এই ধরনের আলোচনাকে প্রগতিশীল মানুষ সংকীর্ণ রাজনীতি বলেই চিহ্নিত করে থাকেন। তৃণমূল শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই ধরনের সংকীর্ণ রাজনীতির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নামটাকে জুড়ে দেওয়ার কৃতিত্ব নিশ্চয়ই দাবি করতে পারে। খুব আশ্চর্য হবো না যদি কোনদিন জানতে পারি যে পি কে (যিনি পাশের রাজ্য বিহারের একজন মানুষ) তার মাথায় এই বাঙালি ‘অস্মিতা’ নির্মাণের দায় না চেপে যায়।
আজ গণতন্ত্র ও তার বাহ্যিক চেহারার খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। নেতারা জামা-কাপড়ের থেকেও দ্রুত দল পরিবর্তন করছেন। সংবাদ মাধ্যমে এই সব খবর দেখা যাচ্ছে। যেটা দেখা যাচ্ছে না তা হল জনগণের দল – পরিবর্তন। গত দশ বছরে সিপিএমের মত দল (মজবুত সংগঠন) তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়েছে। প্রতিষ্ঠিত নেতারা তৃণমূল থেকে বিজেপি, অনায়াসে যাতায়াত করছেন। কিন্তু ভোটারদের যাতায়াতটা ঠিক সেভাবে খালি চোখে ধরা পড়ছে না হয়তো! রাজ্যের শাসক দল সেভাবেই ভোট করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন যেখানে সে তার দলের জনসমর্থনের সঠিক অনুমান আজ করতে পারছেন না।
তৃণমূল ও বিজেপি যেভাবে গত দু’মাসে নেতাদের ঘর বদল করলো সে ক্ষেত্রে বলাই যায় যে অনিবার্য ভাবেই এবার তারা নিজেদের ভোট শতাংশের অনুমান করতে পারছেন না।
২০১৯ সালের ভোটে বাম ও কংগ্রেসের ভোট শতাংশ যে পর্যায়ে ছিল, তার থেকে খুব বেশি নিচে নামার কথা নয়। কিন্তু তাদের নতুন জোটসঙ্গীর রাজনৈতিক চরিত্র নাক-উঁচু বাঙালি ভোটারদের কাছে নিশ্চিত নয়।
বিজেপি, তৃণমূল প্রকাশ্যে দুই ভিন্ন ধর্মের তোষণ করলে কিছুই সংবিধান বিরোধী হয় না, কিন্তু আব্বাস সিদ্দিকির টুপি-দাড়ি আর সস্তা-আতরের গন্ধ, হিন্দু-মুসলিম উভয় ভদ্রবিত্তের কাছে ভীষণ সন্দেহজনক হয়ে দাঁড়ায়। খবরে প্রকাশ তৃণমূল দল লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে তাদেরই সাংসদ শিশির অধিকারীর সাংসদ পদ খারিজের আবেদন করেছে। কিন্তু ২০১৬ সালে ২১১ আসনে জিতেও বিরোধী দলের ডজন ডজন বিধায়ককে নিজের দলে যখন এই শাসক দলই যুক্ত করেছিল তখন বিধানসভায় বিরোধীদের এই ধরণের অভিযোগ অধ্যক্ষ মহাশয় কতটা স্বীকার করেছিলেন?
বহু মানুষ, বাম-দক্ষিনপন্থী নির্বিশেষে, বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে রুখে দেবার জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে, তৃণমূলকে সমর্থনের বিষয়ে বাম-কংগ্রেসের মত ১১ শতাংশের দলকে উৎসাহ দিচ্ছেন। No Vote to BJP-র মতো সামাজিক আন্দোলনের বাস্তব প্রেক্ষিত তৈরি করে তারা এটা বলার চেষ্টা করছেন যে তৃণমূল একটি সামান্য দুর্নীতিবাজ দল, কিন্তু বিজেপি-র মত বিপজ্জনক নয়। আসলে কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাকেই সরল ও অগভীর বিশ্লেষণে গোড়া পর্যন্ত নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। গত দশ বছরে যেভাবে রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ আক্রান্ত হয়েছে ও পঞ্চায়েত স্তর থেকে লোকসভার সদস্য পর্যন্ত অনায়াসে দল ও বিশ্বাস বদল করেছে, যেভাবে পুলিশ প্রশাসনকে রাজ্যের শাসকদল দল-ভাঙানোর অনৈতিক ‘খেলার’ কাজে লাগিয়েছে, সেখানে তৃণমূলকে শুধুমাত্র একটি দুর্নীতিবাজ দল বলে কম বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করার কোন বাস্তব ভিত্তি আজ আর নেই।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের বাম আমলের রাজনৈতিক কলুষতা অবশ্য গণনার মধ্যে রেখেও বলা যায় যে সমাজের লুম্পেন শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণ না করে সেই মানুষগুলিকে উন্মুক্ত করে দিয়ে এবং দলের নেতৃত্বে বসিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের লুম্পেন মতবাদগুলোকেও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার দায় তৃণমূলকে আগামী দিনে বয়ে চলতে হবে। পশ্চিবঙ্গের বিজেপি দলও সেই প্রাক্তন তৃণমূল নেতাদের দলে নিয়ে এবং তাদের ভ্রষ্ট নীতিগুলির রাজনৈতিক পরিসরকে গ্রহণ করে, পশ্চিমবঙ্গকে সম্ভবত এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বাম ও কংগ্রেসের মত দলগুলি দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দম্ভ ও রাজনৈতিক আলস্যে রাজ্য রাজনীতির মূল ধারা থেকে ক্রমশ বিযুক্ত হয়ে পড়েছে।

শেষের কথা

উপসংহারে এটাই বলব যে ভারতের গণতন্ত্র এখন অর্থনীতির মতই উন্নত নয়। এমনকি এটাকে উন্নয়নশীলও বলা যায় না। ক্রমাগত এক নিম্নগামী গণতন্ত্রের শরিক হয়ে উঠেছি আমরা। একটি উদাহরণ এখানে আনতেই হয় সেটি হল লালুপ্রসাদ যাদবের প্রসঙ্গ। দেখুন, মায়াবতী থেকে শিবু সোরেন, ওদিকে জয়ললিতা, এমনকি আমাদের রাজ্যে জন্ম নেওয়া তৃণমূল দলের অসংখ্য নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও আজ পর্যন্ত কেউই ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার দ্বারা স্থায়ীভাবে শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হননি। একমাত্র ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে শুধু রয়েছেন লালু প্রসাদ যাদব। পরিচিতি স্বত্বার রাজনীতিতে অন্যতম সফল এই রাজনীতিবিদ যে কিনা সমসাময়িক অন্য নেতাদের মতই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। কিন্তু তিনিই একমাত্র অন্ধকার কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। দোষীদের শাস্তি হওয়া সংবিধান মান্যতার অন্তর্গত, কিন্তু শুধু কি সেই সাজাপ্রাপ্ত হবেন তিনি, যিনি বৃহত্তর ভারতের রাজনৈতিক বিপদ সবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তদুপরি ব্যবস্থাও তিনি নিয়েছিলেন। এটাই কি ছিল তাঁর অনন্য অপরাধ?

[লেখক – অধ্যক্ষ, রানী ধন্যাকুমারী কলেজ, জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ।]

Facebook Comments

Leave a Reply