গণতন্ত্রের সড়ক বেয়ে অনেক প্রশ্ন, এক উত্তর – চোখ বানধিলি মুখ বানধিলি মন বানধিবি ক্যামনে : দেবাশিস দত্ত

fail

প্রাক কথন

হালফিল শপথের পর, মার্কিন হোয়াইট হাউস একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে: “ভারত ও আমেরিকার সম্পর্কের মূল শক্তি হল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি যৌথ মান্যতা।” মোদীর সংগে প্রথম ফোনালাপে রাষ্ট্রপতি বাইডেন সেকথাই উল্লেখ করে বলেছেন: গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব সর্বাধিক না হলেও অপরিসীম, সেটাই হল ভারত-আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তি।

বাইডেন, দেখেশুনে মনে হয়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে নিজ দেশে গণতান্ত্রিক ‘প্রতিষ্ঠান’-এর গুরুত্ব, যা অনেকখানি ইতিমধ্যেই খর্ব, ক্ষতিগ্রস্ত ও কলঙ্কিত হয়েছে পূর্বসূরি ট্রাম্পের হাতে, তাকে ফিরিয়ে আনতে ও কলঙ্ক মুছে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছেন। নির্বাচনে হারার পরেও, ক্ষমতা না ছাড়ার ঘোষণা এবং ক্যাপিটালে দাঙ্গা বাধিয়ে সবাইকে মারার ব্যবস্থা করার অভিযোগ একজন রাষ্ট্রপতির পক্ষে মারাত্মক অপরাধ। সেই অপরাধের ভিত্তিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনিত ‘ইমপিচমেন্ট’- প্রস্তাব স্বল্প ব্যবধানে পরাস্ত হয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকার গণতান্ত্রিক জলবায়ু ও পরিবেশের মধ্যেই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা সম্ভব, সমগ্র রাষ্ট্রের পক্ষে একনায়কতান্ত্রিক বা সরাসরি ফ্যাসিস্ট তকমা অর্জন সম্ভব। অপরদিকে ট্রাম্পকে পরাস্ত করা, কম ভোটের ব্যবধানে হলেও, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনাও সম্ভব, দেখা গেল। ট্রাম্পের জয় আমেরিকার গণতন্ত্র সম্পর্কে কোন উচ্চ ধারনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন শুনিয়ে রেখেছেন।
বাইডেন প্রথম টেলিফোনালাপে মোদীকে এসব কথা বলতে গেলেন কেন এ প্রশ্নটা উঠছে। উঠছে কারণ ভারত-আমেরিকা পারষ্পরিক বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন ‘হাউ ডি মোদী’ এবং ‘নমস্তে ট্রাম্প’ এই অভিধায় আটকে থাকার কারণে এবং অকারণে এক বন্ধনীতে দায়বদ্ধ। বাইডেনও, সুদূর থেকে, ভারতের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ‘প্রতিষ্ঠান’-এর সামনে একই রকমের বিপদ হয়তো লক্ষ করছেন। ঘটনা হল গণতন্ত্রের নামে মোদী দেশের অভ্যন্তরে কৃষকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে যেভাবে গজাল পুঁতেছেন, বেইজ্জত করার চেষ্টা করেছেন, কৃষি আইনে নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থেকে কুনাট্য প্রযোজনা করে চলেছেন, যেভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন – আর যাই হোক মার্কিন গণতন্ত্রও অনুমোদন করে না, এমন বার্তা দান, দুই দেশের গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হতে পারে না এটা জানিয়ে দিতে বাইডেন নিজেকে গণতন্ত্রের ‘অভিভাবক’-এর আসনে স্থাপন করেই সময়োচিত বার্তা দিয়েছেন, জানিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প এখন নেই, তিনি ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি, এখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাইডেন যা চাইবেন তেমন করেই গড়ে উঠবে। কার্যত: যা দাঁড়ালো তা হল ইহাও গণতন্ত্র, উহাও গণতন্ত্র – ‘নিয়ন্ত্রণ’ যার প্রাণভোমরা। যে যাই বলুন গণতন্ত্রের কদর্য, কুৎসিত, বীভৎস চেহারা, নৃশংসতা ও অমানবিকতা আজ দুনিয়ার সামনে উন্মুক্ত। ঢেকেঢুকে আর রাখা যাচ্ছে না। অতএব ভাবতেই হবে। নির্লিপ্ত থাকা যাবে না।

ভারত ও আমেরিকা উভয়েই গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গণ্য। তবে দু’টি দেশের গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও অনুশীলনে মিল অমিল দুইই প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন (এক) আমেরিকার নির্বাচকমণ্ডলী যেখানে মাত্র ২০০ মিলিয়ন সেখানে ভারতের নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা ৯১০ মিলিয়নের এর ওপর; (দুই) দুটি দেশেই সরকার, নির্বাচন ব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বিকৃতির অভিযোগ সত্ত্বেও, জনগণের রায়ে নির্বাচিত; নির্বাচিত দল সরকার গঠন করে, আইন প্রণয়ন দেশ পরিচালনা করে; (তিন) দুটি দেশেই সরকার পরিবর্তন সম্ভব। দু’টি দেশেই অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক কমলা হ্যারিস সে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট (হয়তো বা প্রেসিডেন্টও) হতে পারেন, যেমন আফ্রিকান অ্যামেরিকান বারাক ওবামা আগে হয়েছেন। কিন্তু ইতালি বংশোদ্ভূত ভারতীয় নাগরিক সোনিয়া গান্ধী নির্বাচনে জিতেও (বিবেকের টানে!) প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। (চার) দুই দেশেই হয় বর্ণ নয়তো ধর্ম ও জাত-পাত জনিত অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, খুন, হত্যা, নৃশংসতা, অমানবিকতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। (পাঁচ) আমেরিকা একটি ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, তীব্র আর্থিক অসাম্য বৈষম্য, দারিদ্র, দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি বিলোপ দুরের কথা রোখা সম্ভব নয়, বরং বলা যায় তা বাড়বে। অপরদিকে উন্নয়নের বিভিন্ন নিরিখে পশ্চাৎপদ, দারিদ্র, অপুষ্টির শিকার, অপরদিকে সম্পদের দ্রুত কেন্দ্রীভবন হেতু ধনী দরিদ্রের ব্যবধান, বৈষম্য বিস্তর। (ছয়) দুটি দেশেই রাষ্ট্রক্ষমতা পাকাপোক্ত ভাবে একই বর্গ বা শ্রেণি ব্যবস্থার মধ্যেই সুরক্ষিত। ক্ষমতা বিপরীত বর্গ বা শ্রেণিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য বা অদৃশ্য। কারণ এই ব্যবস্থায় শ্রেণিগত বিভাজনের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না; (সাত) আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দসমূহ – একই শ্রেণির মধ্যেই সংরক্ষিত। (আট) জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সম্পদের প্রাচুর্য ও সামরিক আধিপত্যর কারণে প্রভুত্ব না বললেও অবশ্যই আমেরিকার অভিভাবকত্ব ভারতকে, বিকল্প না থাকায়, মেনে চলতে হয়, অবশ্য প্রতিবেশী দেশ চিনের আর্থিক ও সামরিক পরাক্রম ভারতের অবস্থানে দোদুল্যমানতা প্রকট হয়। (নয়) বিশাল বাজার সুবাদে ভারত বিভিন্ন ধনী দেশের দখল তথা নিয়ন্ত্রণের বোড়ে হয়ে দাঁড়ায়।

অতএব গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা – জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক স্তরে যা দৃষ্ট হয়, আব্রাহাম লিঙ্কন সংজ্ঞায়িত – ‘গভর্নমেন্ট ইজ ফর দ্যা পিপল, অব দ্যা পিপল অ্যান্ড বাই দ্যা পিপল’ অর্থাৎ ‘গণ’র (পিপল) গুরুত্ব বা ভূমিকা বা অস্তিত্ব কতটা স্বীকার করে ও প্রাথমিকতা দেয় তা আজও লাখ টাকার প্রশ্ন।

একটি আলোচনা

‘পুঁজিবাদী গণতন্ত্র কোন পথে’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক মনোজ্ঞ আলোচনায় বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী কৌশিক চট্টোপাধ্যায় বলছিলেন: বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে (১৯৪৭) উপনিবেশবাদের অবসান ঘটে, ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সংবিধান প্রণীত (১৯৫০) হয়। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুসারে ভারত একটি ‘সভারেন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে ৪২ তম সংশোধনীর পর সংবিধানের প্রস্তাবনার পাঠ দাঁড়ায়: “উই, দ্যা পিপল অব ইন্ডিয়া, হ্যাভিং সলেমনলি রিজলভড টু কনস্টিটিউট ইন্ডিয়া ইনটু অ্যা সভারেন, সোশালিস্ট, সেকুলার, ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অ্যান্ড টু সিকিওর টু অল ইটস সিটিজেনস ….” (২৬ নভেম্বর, ১৯৪৯)

কৌশিক আলোচনায় বলেছেন: ‘স্বাধীনতার পর একবিংশ শতাব্দীর (অর্থাৎ ১৯৫০-২০০০) প্রথম পঞ্চাশটা বছরের কালপর্বে ভারতের গণতন্ত্র ছিল ভোটাধিকারে সীমাবদ্ধ।’ অর্থাৎ এর অর্থ হল নির্দিষ্ট সময় অন্তর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচকমণ্ডলীর একটা অংশ ভোট দিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন এবং সেখানেই নির্বাচকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। এমনটা নয় যে নির্বাচিতকে নির্বাচকমণ্ডলীর ৫০% এর বেশি সমর্থন লাভ করতে হয়। যে দল গরিষ্ঠ আসন লাভ করে তারা সরকার গঠন করে। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দুটো সরকার, এক, নির্বাচিত সরকার যারা নীতি প্রণয়ন করে; দুই, আমলাতন্ত্র (অ্যাপ্রোপ্রিয়েট গভর্নমেন্ট যাদের নির্বাচিত হতে হয় না) অর্থাৎ যারা নীতি কার্যকরী করে। নীতি প্রণয়নে ও রূপায়ণে নির্বাচকের কোন ভূমিকা থাকে না। (এখানে উল্লেখ করা যায় যে ১৯৮৮ সালে সংবিধানের একষট্টিতম সংশোধনী অনুযায়ী ভোটাধিকার ২১ বছরের পরিবর্তে ১৮ বছর করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় পরিবর্তন। ইংরেজ আমলে (১৯৩৭ নিয়ম অনুযায়ী) নির্বাচক হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে ভারতীয় পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৫ বছর ও শিক্ষায় স্নাতক ও ট্যাক্স-পেয়ার, মহিলার ক্ষেত্রে বয়েস ২১ বছর প্রয়োজন হত, ইয়োরোপিয়ানের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া বয়স কেবল ২৭ বছর হলেই তালিকাভুক্ত হত।)

সংবিধান নাগরিকদের যেসব গণতান্ত্রিক অধিকার নির্দিষ্ট করেছে তা হল: “… জাস্টিস, সোশ্যাল, ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল; লিবার্টি অব থট, এক্সপ্রেশন, বিলিফ, ফেথ অ্যান্ড ওয়ারশিপ; ইক্যুয়ালিটি অব স্ট্যাটাস অ্যান্ড অব অপরচুনিটি; অ্যান্ড টু প্রমোট এমাঙ্গ দেম অল; ফ্রেটারনিটি অ্যাসিওরিঙ্গ দ্যা ডিগনিটি অব দ্যা ইনডিভিজুয়াল অ্যান্ড দ্যা ইউনিটি অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটি অব দ্যা নেশন; ….(সূত্র: প্রস্তাবনা)

বিংশ শতাব্দীতে অনুসৃত পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক পথ একবিংশ শতাব্দীতে সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপরে কতটা হস্তক্ষেপ করেছে এবং কী ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করেছে তার মর্ম বস্তু হল যে পুঁজিবাদী গণতন্ত্র কখনও বিপ্লবের কথা বলে না। কিন্তু আদতে সাম্যের অধিকার (সংবিধানের ১৪-১৮ অনুচ্ছেদ) দানের পরিবর্তে সামাজিক অসাম্য তৈরি করে, জিইয়ে রাখে শুধু নয়, ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে; স্বাধীনতার অধিকার (অনু: ১৯-২২) সরকারের নীতি দলীয় (সেই সুবাদে কর্পোরেটের) বিষয় হয়ে ওঠে, ভাবাবেগে আঘাতের নামে হয়রানি বাড়ে; শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার (অণু: ২৩-২৪) মূলত: কর্পোরেট ও ক্রোনি ক্যাপিটাল স্বজনতোষী পূঁজিবাদে গণতন্ত্রের ধ্বজা ধরে। ধর্মীয় স্বাধীনতা অধিকার (অণু ২৫-২৮) সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতা হরণ করে; সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার (অণু ২৯-৩০) শিক্ষার সুযোগ পূঁজি কেন্দ্রিক হয়; সংবিধানের প্রতিবিধানের অধিকার (অণু ৩২ এবং ২২৬) কার্যত: ও দৃশ্যত: (৩ এম) মিডিয়া, মাসল ও মানি পাওয়ার [টিকা: উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৩ এম অর্থে ম্যান, মেশিন, মেটেরিয়াল বোঝান হয়] এবং তারই সাথে অধুনা ইভিএম নামক দত্যি অথবা দানবের আবির্ভাব হল স্বাভাবিক উত্তরণ। গত ছয় বছরের শাসনে একের পর এক যে সব পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে তাতে দেশের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অন্তর্জলি ও ‘পরিযায়ী’ হিসেবে দেগে দেওয়া মানুষের জীবনে যাপনে ও মননে ফ্যাসিবাদী লক্ষণ ও তার ধারালো নখ দাঁতের আঁচড়ে, অবিরল রক্তক্ষরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই রক্তক্ষরণ কি বিগত শতকের শেষ দশকে গৃহীত এবং তিন দশক ধরে অনুসৃত নয়া আর্থিক নীতির ‘লেফট রাইট সেন্টার’ পদচারণার অনিবার্য পরিণতি নয় – এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আসছে কী না গবেষণার বিষয় হয়ে থাকলো।

প্রশ্নে জেরবার নির্বাচন

রাষ্ট্র শাসন কে করবে বা কীভাবে করবে এই গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার নির্বাচন। আগে বলা হয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বলবত ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকেই বলছেন একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পণ ও দুই দশকের পর দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্র নামক বিষয়টির যে মর্মবস্তু অর্থাৎ লিঙ্কনের পরিভাষায় “গভর্নমেন্ট ইজ ফর দ্যা পিপল, অব দ্যা পিপল অ্যান্ড বাই দ্যা পিপল” আড়াই শতক হাঁটার পরেও দু’পায়ের হাঁটুর চাপে জর্জ ফ্লয়েডকে বলতে শোনা যায়: ‘আই কান্ট ব্রিদ’ … ।

এবং অসংখ্য ঘটনা

হালফিল বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ এবং সম্পাদকীয় মন্তব্য নজর কাড়ে। যেমন:
(এক) চার মাসেরও আগে থেকে এখনও কারাবন্দী হয়ে আছেন কেরলের একজন সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান যিনি গত অক্টোবরে হাথরসে দলিত তরুণীর ধর্ষণের খবর করতে যাবার পথে ইউপি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ইউপি পুলিশ এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইনে অভিযোগ আনে। দীর্ঘ সময় ধরে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর জামিনের শুনানি ছ’বার মুলতবি করেছে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নতুন নতুন অভিযোগ যেমন জাতপাতের উস্কানি, উত্তেজনা সৃষ্টি, জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলা হয়েছে। তাঁর নবতিপর মা একবার দেখতে চান এই মানবিক যুক্তিতে কেরালার সাংবাদিক ইউনিয়নের আবেদন পর্যন্ত মঞ্জুর হয় নি। একটি প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে: “প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভারতে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা কোন অতলে তলাইয়া যাইতেছে তাহা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। তাহার সার্বিক চিত্রটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশি হিংসা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আক্রমণে পঙ্কিল; ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ (এ) বা ৫০০ ধারা বা ইউএপিএ আইনের মুহুর্মুহু প্রয়োগে জর্জর। খবর করিতে গেলে, অপ্রিয় প্রশ্ন করিতে গেলে দেশদ্রোহী আখ্যা মিলিতেছে। … প্রশাসন যেখানে বিমুখ, আইন যেখানে বিরুদ্ধ, সেখানে বিচার ব্যবস্থার দ্বারা অন্তত: সাংবাদিক তথা নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষিত হইবে, সেই আশা ছিল। কাপ্পান-কাণ্ড সুপ্রিম কোর্টের প্রতিক্রিয়া ও গতিপ্রকৃতিতে সেই আশায় সংশয় ঘনাইতেছে। পুলিশি হেফাজতে কাপ্পানের উপর শারীরিক অত্যাচার হইয়াছে, তাঁহার আইনজীবীকে পর্যন্ত তাঁহার সহিত দেখা করিতে দেওয়া হয় নাই, ফোনে কথা বলিতে দেওয়া হয় নাই। …. এই দীর্ঘসূত্রতা বা অসক্রিয়তার কোন ব্যাখ্যা মিলে না। ভারতের বিচার-প্রথামতে বরং এই ধরণের মামলা বা আবেদন বিচার ব্যবস্থার অগ্রাধিকার প্রদানই দস্তুর, এক সপ্তাহ হইতে পনেরো দিনের মধ্যে তাহা মিটাইবার কথা। কাপ্পানের হইয়া মামলা লড়িতেছে কেরলের সাংবাদিক ইউনিয়ন, তাহাদের নিযুক্ত আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামীর উদাহরণ দিয়াছেন। ২০১৮-র একটি মামলায় অভিযুক্ত অর্ণবকে এক দিনেই অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়াছিল আদালত। অথচ সেই আদালতই কাপ্পানের জামিনের আবেদনে কর্ণপাত করিতেছে না। লোক বুঝিয়া বা তাহার প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা পৃষ্ঠপোষকের চরিত্র দেখিয়া বিচার-ব্যবস্থার অতিসক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তার ন্যায় অবিচার আর নাই। দুর্ভাগ্য, এই ভারতে তাহাই ঘটিতেছে।” (আনন্দবাজার/সম্পাদকীয়/১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১)। অশীতিপর কবি ভারভারা রাও, অনেক কাঠ খড় পোড়াবার পর সদ্য মুক্ত, ছাড়াও উল্লেখ করার মত বহু বহু উদাহরণ রয়েছে।

(দুই) সংসদে মোদী সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ প্রস্তাব পাশ করল ৫ আগস্ট ২০১৯। তার ঠিক আগে ‘ভূস্বর্গ’ জম্মু কাশ্মীরকে সেনা পাহারায় মুড়ে দিয়ে সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী করা হয়েছিল। এমারজেন্সি ঘোষণা ছাড়াই সমস্ত ধরণের যোগাযোগ সড়ক পরিবহণ, ইন্টারনেট, সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়ার সাথে সাথে জম্মু-কাশ্মীরকে দুটো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হল। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন উপত্যকার বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত এবং জম্মু-কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পর কিছু সময় কাটতে না কাটতেই জম্মু-কাশ্মীরের তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি, ফারুক আবদুল্লা, ওমর আবদুল্লাকে ফের গৃহবন্দী করা হয়।

(তিন) আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনিত ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে খারিজ হয়ে গেল। অর্থাৎ চাইলে বা দলের অনুমোদন পেলে আগামী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প লড়তে পারবেন। ট্রাম্প রায় শোনার পর বার্তা দিয়েছেন: “তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই সবে শুরু … আমেরিকার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আগামী মাসগুলোতে অনেক কিছু করার আছে। আমাদের ঐতিহাসিক, দেশপ্রেমী রাজনৈতিক লড়াইয়ের এটাই প্রথম ধাপ” — বললেন ইমপিচমেন্ট লড়াইয়ের জয়ে প্রাণিত ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প এখানে কোন ব্যক্তি নন …তিনি গণতন্ত্র’র একটা ধারা ও ধারণা, কেবল আমেরিকায় নয়, আবিশ্বে ছড়িয়ে আছে তার শেকড় ….

(চার) অতি সম্প্রতি “কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে গ্রেটা থুনবার্গের শেয়ার করা ‘টুলকিট’ ছড়িয়ে দেওয়ায় দিশা রবি নামে এক পরিবেশকর্মীকে বেঙ্গালুরু থেকে গ্রেফতার করল দিল্লি পুলিশ। তাঁর পাঁচ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।” পুলিশ বলছে যে দিশা যে টুলকিট ব্যবহার করেছে সেটি নাকি খালিস্তানপন্থীদের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্রদ্রোহ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ছক ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে দিশার নামে যাঁর বয়েস মাত্র একুশ। আসলে সুইডেন এর পরিবেশকর্মী গ্রেটা ব্যবহৃত টুলকিটটি কৃষক আন্দোলনের খবর এবং তার সাথে ইচ্ছুকদের যুক্ত হবার উপায় সম্পর্কে একটি নির্দেশিকা বলা হয়েছে। সেই জেএনইউ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহর’ অভিযোগ বেমালুম সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। পরাধীনতার স্বাভাবিক জন্মদাগ ইংরেজ আমলে (১৮৭০ সালে) প্রণীত আইন ১২৪ এ যাতে বলা হয়েছে “হুয়েভার, ওয়ার্ডস, আইদার স্পোকেন অর রিটন, অর বাই সাইনস, অর বাই ভিজিবল রিপ্রেজেন্টেশন, অর আদারওয়াইজ, ব্রিংগস অর অ্যটেম্পটস টু ব্রিংগ ইনটু হেট্রেড অর কনটেম্পট, অর এক্সাইটস অর অ্যাটেম্টস টু এক্সাইট ডিসঅ্যাফেকশন টুওয়ার্ডস দ্যা গভর্নমেন্ট এসটাব্লিশড বাই ল ইন ইন্ডিয়া শ্যাল বি পানিশড উইথ ইমপ্রিজনমেন্ট ফর লাইফ, টু হুইচ ফাইন মে বি অ্যাডেড, অর উইথ ইমপ্রিজনমেন্ট হুইচ মে এক্সটেন্ড টু থ্রি ইয়ারস, টু হুইচ ফাইন মে বি অ্যডেড, অর উইথ ফাইন” — এখনও ভারতেও শাসকদের মনপসন্দ।

আমেরিকা বা ইয়োরোপে বিষয়টি কেমন দেখা যেতে পারে। আমেরিকায় ‘দেশদ্রোহ’ বলতে বোঝায়: “টু অপোজ বাই ফোর্স দ্যা অথরিটি অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস গভর্ণমেন্ট, টু প্রিভেন্ট, হিন্ডার, অর ডিলে বাই ফোর্স দ্যা এক্সিকিউশন অব অ্যানি ল অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস; অর টু টেক, সীজ, অর পজেস বাই ফোর্স অ্যানি প্রপার্টি অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস কনট্রারি টু দ্যা অথরিটি দেয়ারঅফ”।

গ্রেট ব্রিটেন তার অধিকৃত আমেরিকা থেকে ভারত সমস্ত উপনিবেশে “দেশদ্রোহ” আইন পাশ করেছিল। কিন্তু গ্রেট ব্রিটেনে এই আইন এখন বাতিল করা হয়েছে। “অ্যা কলোনিয়াল এরা ল ইন্টেন্ডেড টু সাপ্রেস দ্য ভয়েস অব ফ্রিডম কনটিনিউজ ইন ফোর্স ইন ইন্ডিয়া, বাট ব্রিটেন ইটসেলফ অ্যাবলিশড সিডিশন অ্যাজ অ্যা ক্রিমিনাল অফেন্স ইন 2009 অ্যাজ ইট ওয়াজ কনসিডার্ড টু বি অ্যা রেলিক অব অ্যান এরা হোয়্যার ফ্রীডম অব এক্সপ্রেশন ওয়াজ নট কনসিডার্ড অ্যা রাইট অ্যজ ইজ নাউ।” (হিন্দুস্থান টাইমস/ ই-পেপার/ আপডেটেড অন ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৬)। ‘অধিকৃত’ এই শব্দটার মধ্যেই রয়েছে জবরদস্তি, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ,

অপরদিকও আছে …

যেমন রাষ্ট্রপতি বাইডেন বলেছেন: “ইমপিচমেন্ট থেকে মুক্ত হলেও কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের যাবতীয় কাজ বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। …ক্যাপিটাল হিলে উন্মত্ত তাণ্ডবের মতো ঘটনাই প্রমাণ করে যে, দেশের গণতন্ত্র এখনও খুবই ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। তবে যে কোন মূল্যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে যে হিংসা আর হানাহানির কোনও স্থান আমেরিকায় নেই। তার জন্য এ দেশের প্রত্যেক নাগরিককেই দায়িত্ববানের ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষত আমাদের মতো নেতাদের সব সময়ই সত্যের জয় আর মিথ্যার পরাজয়ের জন্য লড়তে হবে।” বাইডেন কি কোথাও সমঝোতা করলেন? ডেমোক্র্যাট নেতা জো নেগেউস বলেছেন: “এই ফলাফল এই বার্তাই দেবে যে গত ৬ জানুয়ারির মতো ঘটনা এ দেশে আবারও ঘটতে পারে”।

সত্য কোনটা মিথ্যাই বা কী, এই দুইয়ের বিবাদ দীর্ঘ, সংজ্ঞা আজও, সম্ভবত:, (অ)সম্পূর্ণ, আজানু ছাড়িয়ে প্রসারিত, পরিণতিতে কখনও বাইডেন সত্য কখনও ট্রাম্প সত্য! ফলে এই পর্বে কোথায় থামতে হবে অর্থাৎ আপাত সমাধান বা কোথায় সবাই এসে থেমে যান, সবাই যেখানে নতশির সেটা হল ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ – হারলেও ‘ক্ষমতা’ ছাড়বো না এমন ধমকি হুমকি সত্ত্বেও। অর্থাৎ ভাঙাগড়া চলছে এটাই আপাত সত্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যকে যেমন প্রতিষ্ঠা দেয় অসত্যকেও একই রকম মান্যতা দেয়।

ফলিত গণতন্ত্র যা সর্বত্র অনুশীলন করা হচ্ছে, যা হল প্রধানত: নির্বাচন, তাতে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা’র প্রতিপাদ্য – কোনটা সত্য কোনটা নয়, নিরূপণ বা প্রমাণ করা নয়, সমগ্র বিষয়টা হল কেবলমাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন সংক্রান্ত। এর উৎস হল কোন দল শাসন ক্ষমতা লাভ করবে অর্থাৎ যে দলের প্রতিনিধি সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে সেই দল সরকার গঠন করবে সম্পর্কিত বিষয়। আবার যিনি প্রতিনিধি হবেন তিনি মোট নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থন না পেয়েও নির্বাচিত হতে পারেন। অর্থাৎ গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলা হয় ঠিকই কিন্তু প্রতিনিধিত্বের মূল ভিত্তি এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠতা যে নয় এবং তা সর্বত্র চলছে খালি চোখে দেখা গেলেও, এর বিকল্প এখনও নেই তাই, শাসক, ক্ষমতায় যিনিই আসুন, কমবেশি এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছন্দ। দেখা যাবে যে আমাদের দেশে যত সরকার, কেন্দ্রে বা রাজ্যগুলোতে আজ পর্যন্ত গঠিত হয়েছে, খুবই খুবই কদাচিৎ, পঞ্চাশ শতাংশের বেশি নির্বাচকমণ্ডলীর সমর্থন লাভ করে শাসন ক্ষমতা লাভ করেছে। অনেকেই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা পছন্দ করেন। তাতে ঝুঁকি অনেকটাই কমে। তাই বলা যায় যে বর্তমান গণতন্ত্র এমন একটা ধাঁধা, গোলক অথবা চতুষ্কোণ, অথবা পঙ্গু, কোনটাই নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। আকার প্রকার যাই হোক, এমনকি পঙ্গু হলেও, কার্যত এটা গরিষ্ঠর ওপরে লঘিষ্ঠর প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রর দস্তুর। গণপরিষদ সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি ও যুক্তি খারিজ করে “ফার্স্ট-পাস্ট-দ্যা-পোস্ট” ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে (আর্টিকেল ৮১)। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় অধিকাংশ সময়েই জয়ী পার্টি 20-26% পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করতে পারে অপরদিকে ৭৪% ভোট পেয়েও কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ নাও করতে পারে। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নটি বিবেচনার জন্য উত্থাপিত হলেও নানা অজুহাতে তা খারিজ হয়ে গেছে।

কৃষক আন্দোলন ও গণতন্ত্র

অতি সম্প্রতি ‘ফ্রিডম হাউস’ – আমেরিকার একটি অলাভজনক সংস্থা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ‘গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা’র অবস্থা বিষয়ক পর্যালোচনা করেছে। সম্প্রতি এই সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে: ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের ক্রমাবনতি ঘটেছে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকে অবনতির হার আরও দ্রুত হয়েছে। রিপোর্টে অবনতির ক্ষেত্র হিসেবে ক) শিক্ষাক্ষেত্র, খ) সংবাদপত্রের ওপরে ক্রমবর্ধমান হুমকি, গ) সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষ, ঘ) মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ওপরে অন্যায় অন্যায্য চাপ তৈরি, ঙ) বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে ধর্মান্তর আইন প্রণয়ন ইত্যাদি – চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে ভারত এখন ‘আংশিক গণতন্ত্রের দেশ’। এসব ছাড়াও আরও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেমন ক) নাগরিকত্ব খ) নাগরিক অধিকার হরণ/হস্তক্ষেপ গ) ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পছন্দে আঘাত ঙ) অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি, অপরাধীকে আড়াল করা তথা সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতদান চ) প্রতিবাদীকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনা গণতন্ত্রের ওপরে সরাসরি আঘাত বলে ‘ফ্রিডম হাউস’ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবিধান অনুসারে কৃষি – উৎপাদন বিপণন কৃষি বিষয়ক শিক্ষা গবেষণা ইত্যাদি সবটাই ছিল রাজ্যের এক্তিয়ারভূক্ত বিষয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার কোন রাজ্যের সাথে কোন আলোচনা না করে তিনটি আইন সংখ্যার জোরে পাশ করিয়েছে। আইন তিনটি হল: ক) দ্যা ফারমারস প্রডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রমোশন অ্যান্ড ফ্যাসিলিটেশন) অ্যাক্ট; খ) দ্যা ফারমারস (এম্পাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরেনস অ্যান্ড ফারম সার্ভিসেস অ্যাক্ট; গ) দ্যা এসেনশিয়াল কমডিটিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট। এই আইন সংবিধানে স্বীকৃত ফেডারেল স্ট্রাকচার এর ওপর হস্তক্ষেপ। এই আইন বাতিলের দাবিতে পাঞ্জাব হরিয়ানার লক্ষ লক্ষ কৃষক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে গত ২৭ নভেম্বর ’২০ থেকে লাগাতার অবরোধ আন্দোলন করে আসছে। এই আন্দোলনকে ভাঙ্গার জন্য সরকার রাস্তায় কংক্রিটের বাধা, লোহার গজাল পুঁতে দেওয়া, জল বিদ্যুৎ সরবরাহ, নেট পরিষেবা পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়ার মত অমানবিক পদক্ষেপ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন এই ধরনের অমানবিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়েছে। মোদী সরকার আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে গেছে, উপেক্ষা করেছে। শুধু তাই নয় দেশের মধ্যে সমর্থনকারীদের সন্ত্রাসবাদী চক্রের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে গ্রেপ্তার (দিশা রভি মামলা) নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এমন অনেক ঘটনাই ইতিপূর্বে ঘটেছে। শুধু তাই নয় খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদী সংসদে দাঁড়িয়ে আন্দোলন সমর্থনকারীদের ‘আন্দোলনজীবী’ বলে পরিহাস করেছেন। বিভিন্ন ঘটনায় বিচার ব্যবস্থার প্রতি উচ্চ ধারণা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হলেও, কমিশন নির্বাচনী প্রচারে ‘সাম্য’ রক্ষার আবেদন জানালেও নির্বাচনী খরচের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন যে সীমা নির্ধারণ করেছে তা কোনমতেই ‘সাম্য’ রক্ষা করে না। সামনে পাঁচ রাজ্যের, কেরালা, তামিলনাডু, পন্ডিচেরি, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচন প্রস্তুতির মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের ‘নিরপেক্ষতা’ সম্পর্কে ভারতের অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসারদের তৈরি সংগঠন ‘সিটিজেন’স কমিশন অন ইলেকশন’ এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সিটিজেন’স কমিশন তার রিপোর্টে বলেছে: “দ্যা ইলেকশন কমিশন অব ইন্ডিয়া হ্যাজ ফেইল্ড টু পারফর্ম ইটস ডিউটিজ, হোয়াইল অলসো ফ্ল্যাগিং দ্যা এক্সক্লুশান অব মারজিনালাইজড গ্রুপস ফ্রম দ্যা ভোটারস’ লিস্টস, দ্যা ওপেসিটি অব ইলেক্টোরাল বন্ডস অ্যান্ড দ্যা পাওয়ার অব বিগ মানি ইন উইনিং ইলেকশনস … দ্যা রিপোর্ট সেইড সিন্স দ্যা টু থাউজ্যান্ড নাইন্টিন লোকসভা ইলেকশনস, “গ্রেভ ডাউটস” হ্যাভ বিন রেইজড এরাউন্ড দ্যা ফেয়ারনেস অব দ্যা পোলস অ্যান্ড ওয়ান্ডারড ইফ ইন্ডিয়া ওয়াজ বিকামিং অ্যান ‘ইলেক্টোরাল অটোক্র্যাসি’… [সুত্রঃ WIRE]

লিঙ্কন ভাষ্য: ‘ফর দ্যা পিপল অব দ্যা পিপল অ্যান্ড বাই দ্যা পিপল’ – দীর্ঘ পরিক্রমার পরে আজও চোখ বানধিলি মুখ বানধিলি মন বানধিবি ক্যামনে জিজ্ঞাসা নিয়ে দাঁড়িয়ে।

[লেখক – পত্রিকা সম্পাদক ও ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী।]

Facebook Comments

Leave a Reply