ধারণশীল নিপীড়নে স্বজনতোষী পুঁজিবাদী-গণতন্ত্র ফ্যাসিবাদের বৈচিত্র্য বজায় রাখার পথে হাঁটে – ড. কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

fail

শুরুর কথা

ইয়োশিহিরো ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার প্রতি নির্মম প্রতিশোধী হয়ে উঠলো ইতিহাস। ইতিহাসের শেষ এবং শেষ মানব সম্পর্কিত ‘দ্যা এন্ড অব হিস্ট্রি এন্ড দ্যা লাস্ট ম্যান’ শীর্ষক গ্রন্থে, ১৯৯২ সালে ফুকুয়ামা দাবি করেন যে পশ্চিমী উদারবাদী গণতন্ত্র, মানবিক সরকারের শেষ রূপ হয়ে মানবতার মতাদর্শগত বিবর্তনের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করবে। পরিবার সূত্রে জাপানি, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক-অর্থনীতিবিদ পরিচয়ে আমেরিকান এই চিন্তাবিদ যে বয়ানে গত শতাব্দীর নয়ের দশকের প্রথমে ইতিহাসের যবনিকা টানলেন তা একদিকে যেমন বিপুল প্রচারের আলোকে আসে, অন্যদিকে তেমনই তা অর্থনীতির নতুন বাঁকে পুঁজিবাদের বিজয়োল্লাসে ধ্বনিত হয়।
মুখ্যত দুটো কারণে সেটা ঘটে। এক, সময়টা ১৯৯২। ঠাণ্ডা যুদ্ধের শেষ, আমেরিকায়নের শুরু। ফ্যাসিবাদ বিরোধী গর্বের সোভিয়েত মতাদর্শ তখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। দুই, এই সময় সমগ্র বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির জাতীয় সীমা ধূসর হতে থাকে, আর অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ক্রমশ জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে। উদ্যোক্তাশ্রয়ী পুঁজিবাদ তখন খুব দ্রুত জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে স্বজনতোষী পুঁজিবাদে বাঁক নিতে থাকে। শুধু ফিলিপিন্স নয়, বিভিন্ন দেশে তখন বণিক শ্রেণীর সঙ্গে রাজনৈতিক শ্রেণীর জোট দ্রুত গড়ে উঠতে শুরু করে।
এই দুই মুখ্য কারণে সর্বজনীন এক ধারণায় উদারবাদী গণতন্ত্রের প্রসার সম্পর্কিত ফুকুয়ামার মত দার্শনিক মতবাদ হয়ে ওঠে। সেই প্রচারের আলোকেই তিনি ইতিহাসের বিরোধমূলক ধাক্কাটাও ধীরে ধীরে টের পেতে থাকেন। আস্থার মাপকাঠিতে তিনি ক্রমশ উদারবাদী গণতন্ত্রের বহুমাত্রিক রূপগুলিকেও দেখতে পান। মেনে নেন যে সংস্কৃতিকে কখনই অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ফলে তিনি যতই “সৃজনশীল পুঁজিবাদের কথা” বলুন না কেন, উদারবাদী গণতন্ত্রের ধারণায় মানবতার সংজ্ঞা তবুও খুঁজে পাওয়া যায় না।
উদারবাদী গণতন্ত্রের সর্বজনীন রূপ ২০১৫ সালেও তিনি খুঁজে পান না। বরং সেই খোঁজাখুঁজিতে তিনি যেটা দেখে ফেলেন সেটা হল দুর্নীতির সর্বজনীন রূপ। ইতিহাসের গহ্বরে মতাদর্শের বহুরূপতায় তিনি ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বৈচিত্র্য টের পান। পরিচিতির রাজনৈতিক লেন্সে চোখ রেখে তিনি পুনরায় যখন বিশ্বায়িত অর্থনীতির অলিন্দে পা রাখেন, ইতিহাস তখন তাঁকে চরম ভয়ার্ত পরিবেশ টের পাওয়ায়।
ইতিহাসের নির্মম প্রতিরোধী রূপের সামনে দাঁড়িয়ে ফুকুয়ামাকে লিখতে হয় যে উদারবাদী গণতন্ত্র ভয়কে জিইয়ে রাখে। আশঙ্কার প্রতিবেশ হল উদারবাদী গণতন্ত্রের জিয়নকাঠি। ২০১৮র ট্রাম্প শাসনে দাঁড়িয়ে, চীন-আমেরিকার রাজনৈতিক-অর্থনীতির টানাপোড়েনকে দেখে বলতে হয়, “সমাজতন্ত্রের ফিরে আসা উচিত।” উদারবাদী গণতন্ত্র সর্বজনীন রূপ হয়ে মানবিক সরকার গঠনে অক্ষম। আইডেন্টিটি: দ্যা ডিম্যান্ড ফর ডিগনিটি এন্ড দ্যা পলিটিক্স অব রিসেন্টমেন্ট-এ ফুকুয়ামা ক্ষমতার সেই পাল্টা ঝাঁকুনিটা স্বীকার করলেন।
উদারবাদী গণতন্ত্রই যে ফ্যাসিবাদী চেহারা নিতে পারে সেই পূর্ব-প্রমাণ ফুকুয়ামাকে মানতে হয়। একমাত্র হয়ে ওঠা, অথবা বিকল্পহীনতার যে উচ্ছ্বাস তিনি দেখিয়েছিলেন, অচিরেই তা ভুল প্রমাণিত হয়। নয়া-রক্ষণশীল ঘরানায় ফুকুয়ামা দেখেন যে গোষ্ঠীতান্ত্রিক পুঁজিবাদ হতে, রাষ্ট্র-পরিচালিত পুঁজিবাদ এবং তারপর বৃহৎ-সংস্থাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদ হয়ে উদ্যোক্তাশ্রয়ী পুঁজিবাদী মতবাদ যে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের পথকে করে প্রশস্ত, তাতে মানবিকতা দুর্নীতিতে ভূলুণ্ঠিত হয়। সামাজিক বাস্তবতায় উদারবাদী গণতন্ত্র পুঁজিবাদী শাসন ও শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর

ফুকুয়ামা কোন উদারবাদী গণতন্ত্রের কথা বলছেন? সেই গণতন্ত্র কি পুঁজিবাদী গণতন্ত্রেরই নামান্তর? এই গণতন্ত্র, তা সে উদারবাদীই হোক আর পুঁজিবাদীই হোক তার উৎস কোথায়? কীভাবেই বা গণতন্ত্রের ধারণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে? কেনই বা সমাজবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বিতর্কের গণতান্ত্রিক পরিসর রচনা করছেন? গণতন্ত্রের একটাই রূপ, নাকি গণতন্ত্রেই পরিবর্তনীয়তার ইঙ্গিত থাকে? থাকলে সেটা কোন অভিমুখকে নির্দেশ করে? তেমনটা হলে, গণতন্ত্র কি বহুরূপী?
এমন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরসন্ধানী হতে হলে প্রথমেই যেটা বুঝে নিতে হবে তা হল গণতন্ত্র বলতে আমরা ঠিক কি বুঝি? ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও তার সংজ্ঞা জানাটা সেখানে আবশ্যিক। সেই পথে দেখলে দেখা যাবে যে বাংলায় ব্যবহৃত গণতন্ত্র শব্দটা এসেছে ইংরাজি শব্দ ডেমোক্র্যাসি থেকে। এই ডেমোক্র্যাসি শব্দের উৎস হল গ্রিক শব্দ ডেমোক্র্যাতিয়া। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাতিয়া > ডেমোক্র্যাসি > গণতন্ত্র। আবার এই গ্রিক শব্দ ডেমোক্র্যাতিয়া হল দুটি শব্দের সমাহার – ১. দেমোস, যার আক্ষরিক অর্থ হল জনগণ; আর ২. ক্র্যাতোস, যা ক্ষমতাকে বোঝায়। সুতরাং, ব্যুৎপত্তিগত অর্থে গণতন্ত্র হল জনগণের শাসন।
এই জনশাসনের প্রথম প্রকাশ ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে। এথেন্সে। এথেন্সের নগর-রাষ্ট্র হল গণতন্ত্রের সূতিকাগার। ইউরোপের এই মাটিতেই জনশাসনের প্রথম প্রকাশ ঘটে। পূর্বে ছিল উপজাতি নেতা বা গোষ্ঠী নেতা। সেখান থেকে ভেঙে গঠিত হল দিময় (Demoy) অথবা প্যারিস (Paris), যেখানে মুক্ত নাগরিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনা করার ক্ষেত্রে জনগণ সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়ের তাত্ত্বিক হেরোডোটাস (Herodotus) বলছেন, “গণতন্ত্র একপ্রকার শাসনব্যবস্থা, যেখানে শাসন ক্ষমতা কোনও বিশেষ অংশের হাতে থেকে না; বরং সমাজের সদস্যগণ সুনির্দিষ্ট নিয়মে নিজেরাই নিজেদের পরিচালনা করে।”
ধারণাটি উন্মেষের শতবর্ষ পরে এর গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলেন এরিস্টটল (Aristotle)। তিনি বলেন যে মানুষ মাত্রেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীব। রাজনৈতিক সচেতনতায় মানবজীবন গণতন্ত্রকে সেই উত্তম শাসন ব্যবস্থায় প্রকাশ করে যেখানে কোনও একজন (নির্ধারিত)-কে জনসাধারণ দোষী বলার সুযোগ পায়। অ্যারিস্টটল এখানে সক্রেতিস-এর ছাত্র এবং তাঁর শিক্ষক, প্লেটো-র ধারণার বিরোধিতা করেন। প্লেটো ঐ নির্বাচিত একজন শাসক অর্থে গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রের পূর্বশর্ত বলতেন। সুতরাং প্লেটো যখন গণতন্ত্রের মধ্যে নিহিত থাকা স্বেচ্ছাচারের বীজকে দেখছেন, এরিস্টটল তখন নৈরাজ্য থেকে মুক্তির পথ হিসেবে গণতন্ত্রকে বিচার করছেন। তবে মনে রাখতে হবে যে এই সময় জনশাসনে অংশ নেওয়া ‘মুক্ত নাগরিক’, সমাজের খণ্ডিত অংশ। এই অল্প সংখ্যক মানুষের বাইরে থেকে যায় নিপীড়িত, অধিকারহীন সংখ্যাগুরু জনগণ।

গণতন্ত্রের প্রসার ও প্রকারভেদ

একটা উন্নততর রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার ধারণা হিসেবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে প্রায় ২০০ বছর অতিবাহিত হয়। চিন্তাবিদদের চর্চা প্রেক্ষিতে জনশাসন অর্থে উদার মানসিকতা গুরুত্ব পেতে থাকে। নৈরাজ্যের বিপরীতে, স্বেচ্ছাচারের অবসানে, গণতন্ত্র সুশাসনের ইঙ্গিতবাহী হয়ে ওঠে। গ্রিস দেশ হতে ইউরোপের অন্যান্য অংশেও সংস্কারমূলক পদক্ষেপে মুক্ত নাগরিকের রায়ে সরকার পরিচালনার প্রেক্ষিত গঠিত হতে থাকে। তারও হাজার বছর পর এই বাংলাতেও গণতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংস্কারমূলক পদক্ষেপে শশাঙ্ক পরবর্তী বাংলা যে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করে তা প্লেটোকে নয়, এরিস্টটলের ধারণাকে প্রয়োগমুখী করে তোলে।
সময়টা ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ। গৌড়-বঙ্গ-মগধ জুড়ে শতবর্ষব্যাপী চলমান অস্থিরতা দূর করে এই অঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেন গোপাল। তিনিই হলেন এই বাংলায় প্রথম নির্বাচিত শাসক। যদিও তাঁকে সমালোচকগণ গোঁড়া, ধর্মভীরু শাসক বলবেন। এবং গোপালের শাসনকালকে প্রথম গণতান্ত্রিক বাংলা বলবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকতেই পারে। তবে তাঁরা এটা মানবেন যে জনগণের রায়ে নির্বাচিত শাসন যদি উদারবাদী গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হয়, গোপাল সেখানে অবশ্যই প্রথম। বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে রাজনীতির নিবিড় যোগ, বাংলায় সংস্কারি উদারবাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে।
শশাঙ্কের পরবর্তীতে যে নৈরাজ্য, সেখান থেকে “শাসক নির্বাচন”, গণতন্ত্রের যে প্রায়োগিক অভিমুখকে নির্দেশ করে তা প্লেটোর ধারণাকে নস্যাৎ (গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্র) করে অ্যারিস্টটলের ধারণাকে বাংলায় প্রতিষ্ঠা (নৈরাজ্য থেকে গণতন্ত্র) করে। এই উদারনৈতিক সংস্কার বাংলার সংস্কৃতিতেও চারিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে ভাষা নির্ভর, অথচ স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত এক ঢিলেঢালা সংস্কারমূলক জনমানস গণতান্ত্রিক শাসনকার্যকে বয়ে নিয়ে যেতে চায়। সহজিয়া, নাথ যোগী, কর্তাভজা, সাহেবধানী, বাউল, মুরশিদী, মাইজভাণ্ডারী, সুফি ইত্যাদি সম্প্রদায় গত গণতান্ত্রিক কাঠামো ভারতের মূল ভূখণ্ডের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি থেকে আলাদা হতে সাহায্য করে।
এই প্রসারকে আমরা তিনটে বৈশিষ্ট্যের নিরিখে দেখতে পারি। মুসলিম শাসনেও শাসনপীঠ দিল্লী থেকে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক দূরত্ব বেশী হওয়ার জন্য সেই বৈশিষ্ট্য মুছে যায় না। এখানে ধর্ম ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি সম্প্রদায় গত সংস্কারমূলক জনমানস, সেই তিন বৈশিষ্ট্যকে প্রত্যাশা করে। ক) জনসাধারণের ইচ্ছায় অথবা সদস্যের ভোটের দ্বারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। খ) জনসাধারণের মঙ্গল এবং তাদের স্বার্থে হিত কর্ম সম্পাদন করবেন শাসক। গ) জনসাধারণের মধ্যে সাম্য এবং স্বাধীনতা প্রাধান্য পাবে। এই তিন গুণের ভিত্তিতে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এক, ব্যক্তি স্বাধীনতা; এবং দুই, প্রশাসনে নাগরিক-অংশগ্রহণ।

গণতন্ত্রের বিশ্বযোগ

আধুনিক রাষ্ট্র হবে গণতান্ত্রিক, ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং উদারবাদী। জনঅংশগ্রহণ সেখানে সংসদীয় নীতি অনুযায়ী হবে। নারীর অংশগ্রহণ থাকবে। নাগরিকের কথা বলার অধিকারে গণতন্ত্রের প্রসার ঘটতে শুরু করবে। নবজাগৃতির পরবর্তী অধ্যায়ে, ইউরোপে শাসন ব্যবস্থার এই পথেই সংস্কার ঘটতে থাকে। ইংল্যান্ডে এমনটি ঘটার ক্ষেত্রে জন লকের অবদান কম নয়। ১৬৬০ পরবর্তী ব্রিটিশ শাসন প্রণালী আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উন্নত করতে চায়। এরও একশো বছর পর ফ্রান্সে এই বিতর্ক ঘনীভূত হতে থাকে। জ্যা জ্যাঁক রুশো যে ‘সামাজিক চুক্তির’ কথা বলেন তা হল একটা সর্বজনীন ভোটাধিকারের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারের কথা। এখানে প্রতিনিধিত্বের কোন সুযোগ নেই। বস্তুত, জনগণের ইচ্ছানুযায়ী রাষ্ট্রগঠন উদারবাদী গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করে যা হল বুর্জোয়া বিপ্লবের ফরাসী ফল। এখানে সাম্য, মৈত্রী ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে শাসিতগণের সক্রিয় সমর্থন থাকে। জনভাসে গণতন্ত্র উদ্ভাসিত হয়।
বিশ্ব ইতিহাসে সামাজিক পরিবর্তনের ধারায় গণতন্ত্র অঞ্চলভেদে ভূলুণ্ঠিত হলেও, সংস্কারী নীতি সার্বিকভাবে উদারবাদী গণতন্ত্রকে সাম্য, মৈত্রী ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জয়গান হিসেবেই ধরে নেয়। বুলিয়নিজম সম্পর্কিত বণিকতন্ত্রী নীতি পরিবর্তিত হয়ে উদারবাদী নীতিতে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়াতে চায় তাতে সহযোগী হয় এই গণতন্ত্র। উদারবাদী গণতন্ত্র। আঠারো ও উনিশ শতকে ঘটা সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও একটা আর্থিক যোগ আছে। যাইহোক, প্রতিনিধিত্বমূলক পরিসর বিস্তারের রাজনৈতিক-অর্থনীতি গণতন্ত্রের প্রসারে সরাসরি সাহায্য করে। এটা ঘটে। উপনিবেশের অভ্যন্তরেও সেটা লক্ষ্য করা যায়।
গণতন্ত্রের এই আধুনিক রূপ অংশগ্রহণের বিচারে দুইভাবে দেখা হয়। প্রথমটি প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র। এখানে শাসিতগণের সক্রিয় এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে শাসক ও তাঁর শাসন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র দেখার সুযোগ হল সুইজারল্যান্ড। আবার এর বিপরীতে জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই বিপরীত রূপ হল পরোক্ষ গণতন্ত্র। আমাদের ভারত এই গণতন্ত্রের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট। আমেরিকাতেও মতামত প্রকাশ করার ধারা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পরিচয় বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতেও এই ধারার প্রভাব বাড়ছে।
উদারবাদী গণতন্ত্রের এই প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো জনগণের দ্বারা, জনগণের কল্যাণের জন্য পরিচালিত হয়। প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় জনসাধারণের সম্মতি ছাড়া তাদেরকে শাসন করার অধিকার কারুর নেই। ১৮৬৩র ১৯ নভেম্বর আব্রাহাম লিঙ্কনের এই ধারণা নেহেরুকেও প্রভাবিত করে। এমন ধারণার প্রেক্ষিতেই আম্বেদকরের নেতৃত্বে এক ‘পরোক্ষ বিপ্লবের’ মধ্যে দিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫০’র ২৬ জানুয়ারি থেকে সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে সংবিধান মেনে চলার অঙ্গীকারে ভারতীয় গণতন্ত্র রক্ষিত হয়।
নেহেরু তখন চার্চিলের সেই খেদোক্তিটা শোনেননি। ১৯৪৩র মন্বন্তরে বাঙালির গণনিধনের পর আইএনএ-এর কীর্তিতে কিছুটা ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি ১৯৪৭ সালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে “গণতন্ত্র হল সরকারের সবচেয়ে খারাপ রূপ যা সময়ে সময়ে চেষ্টা করা হয়েছে এমন সমস্ত রূপগুলি ব্যতীত।” নেহেরু লিঙ্কনের পরিবর্তে চার্চিলের বিলাপটা বুঝলে তাঁকে আইএনএ-এর কীর্তিতে উদ্বুদ্ধ হতে হত, আর ভারতীয় রাজনীতি হয়তো তখন “প্রায় বিপ্লব”-কে পরিপূর্ণ করে সংস্কারবাদী গণতন্ত্রের পরিবর্তে বিপ্লবী গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হত। বিশেষ করে চার্চিল যখন ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কার্ল মার্কসের করা সেই ধারণারই প্রতিধ্বনি শোনাচ্ছেন। যেখানে মার্কস, এই ধরনের সংস্কার নীতিতে ভর করে পুঁজিবাদী শোষণকে অক্ষুণ্ণ রাখার উদারবাদী মায়াজালকে বুর্জোয়া গণতন্ত্র বলছেন। এই গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ব্যবস্থা আছে, আছে তার দমনমূলক রাজনৈতিক হাতিয়ার এবং আর্থিক অসাম্য।

বিকল্প বিপ্লবী গণতন্ত্র

মার্কস তবে কি গণতন্ত্রের আদর্শ রূপ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন? উদারবাদী নীতি পুষ্ট বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিপরীতেই কি অবস্থান করে সর্বহারার সেই বিপ্লবী গণতন্ত্র? এও কি একধরনের গণতান্ত্রিক প্রকারতা?
এই তিন প্রশ্নেরই উত্তর হ্যাঁ-বাচক হতে পারে। সংস্কারের পথ ছেড়ে মার্কস ও এঙ্গেলস খুব জোরের সঙ্গে বিপ্লবের কথা বলছেন। কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহারে তাঁরা লিখছেন, “শ্রমজীবীদের বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ হল গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম।” সেই গণতন্ত্র বুর্জোয়া বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। বুর্জোয়া গণতন্ত্রে নির্বাচন হল গণতন্ত্রের প্রাণ ভোমর। কিন্তু সেখানে ব্যক্তির কাছে গণতন্ত্রের স্বাদ ছিল নোনতা। রাজনৈতিক মুক্তি হল ব্যক্তির কাছে গণতন্ত্রের প্রকৃত আস্বাদ, যা সর্বহারার বিপ্লবী গণতন্ত্রে লাভ করা যায়।
বুর্জোয়া গণতন্ত্রে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তন করে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র তার দমনমূলক হাতিয়ার এবং মতাদর্শগত হাতিয়ার ব্যবহার করে। রাষ্ট্রহীন সমাজব্যবস্থা সর্বহারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে যেখানে চেতনায় রাজনৈতিক মুক্তি লাভ করা যায়। স্তরীক্রমী সামাজিক ব্যবস্থায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের স্বার্থরক্ষার সুবন্দোবস্ত এবং সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতায় ব্যক্তির কল্যাণসাধন বুর্জোয়া গণতন্ত্রে সম্ভব। কিন্তু সেখানে এখন অত্যাচারের মাত্রা ধারণশীল হয়। এবং শোষণ ও দমন প্রক্রিয়া জারি থাকে। অপরদিকে শ্রেণীহীন সমাজে রাজনৈতিক–অর্থনীতির সাম্যে সর্বহারা শ্রেণী গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দায়িত্বহীন শাসনব্যবস্থা দেশপ্রেমে জাগরিত হয়। পুঁজিবাদী আগ্রাসন এখানে গুরুত্ব পায়। কিন্তু সর্বহারার বিপ্লবী গণতন্ত্রে দেশপ্রেম, জাতিপ্রেমে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা সেখানে থাকে না, বরং মানব মুক্তি এখানে প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। সর্বজনীন মানব মুক্তি, বেঁচে থাকার নিশ্চয়তায়, প্রকৃত সুশৃঙ্খল জোট গঠনে গণতন্ত্রকে নিশ্চিত করে।
এর বিপরীতে বুর্জোয়া গণতন্ত্রে গোষ্ঠী শাসনের জন্য (যা রবার্ট মিচেল খুব জোরের সঙ্গে বলেছেন) ব্যক্তিজীবনে আমরা বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পাই না। নাগরিক জীবনের সকল অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবনায় শাসন প্রণালী রচনা করে যার স্থবিরতা স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। প্রয়োজনে এই উদারবাদী গণতন্ত্রের গর্ভে ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয়। নির্বাচিত সরকার সহজেই পিটিয়ে মানুষ মারে, অথবা জ্যান্ত-লাশ হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়। কিন্তু সর্বহারার বিপ্লবী গণতন্ত্রে নাগরিক জীবনের সকল অধিকার-প্রাপ্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা হয়। শাসন প্রণালীর সকল মাত্রা সচেতন প্রশ্নবাণে ঋদ্ধ হয়। জন্ম নেয় স্তরহীন, শ্রেণীহীন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
সমালোচকগণ এখানে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার প্রশ্ন তুলবেন। সেটা তোলাটাও গণতন্ত্রের হাজিরাকে প্রকাশ করে। তবে উদারবাদী বুর্জোয়া গণতন্ত্র যখন ইতালির বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে জার্মানির শাসক হিটলারের রাজনীতিতে উদাহরণ হয়, তখন বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উত্তরণ ফ্যাসিবাদেই ঘটে। ১৯৩৬ পরবর্তী ইউরোপ তার সাক্ষী। নৈরাজ্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা। বিষয় আলোচনায় পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রেখে গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার ক্ষেত্রে সামগ্রিক ঐক্য চেতনায় এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবী গণতন্ত্রকে সচল রাখে। ত্রিশ বছর পর, বিংশ শতাব্দীর মাঝে এসে সেই বিপ্লবী গণতন্ত্র, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উন্নততর ফ্যাসিবাদী রূপের দর্পকে করে চূর্ণ।

গণতন্ত্রের অভিমুখ সম্পর্কে তাহলে আমরা কি পেলাম?

প্রশ্নটাকে আর একটু সহজ করে বললে বলতে হয় যে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্র কোন অবস্থানে স্পষ্ট হয়?
আলেক্সিস দ্য তকভিল বলেছেন যে এই সময়ে অভিজাততন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঘটে। এই উন্নয়ন আঠারো শতকে অন্তর্বর্তী কমিটির স্বাধীনতায় সার্বিক ঐক্যের দিশারী হয়। উনিশ শতক তা গণতন্ত্রীয় কাঠামোয় “সমিতি” গঠনের কথা বলে, গণতন্ত্রে “রাজনৈতিক নাগরিক সমিতি” প্রতিষ্ঠা পায়। গৌণ অন্তর্বর্তী কমিটি মুখ্য নাগরিক সমিতির কথা বলে। বস্তুত, আঠারো শতক অভিজাততন্ত্রী প্রজাতন্ত্র এবং রাজবংশীয় স্বৈরাচার – এই দুই বিকল্পে মূর্ত হয়, যার ফলে অভিজাততন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ সহজ হয়। উনিশ শতকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র – এই দুই বিকল্পে সেই উদারবাদী গণতন্ত্রের শুদ্ধতা দাবি করা হয়। উভয়ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাচারের বিপরীতে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও অভিজাততন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের তুলনায় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কিছুটা স্বাধীন কারণ সেখানে বিষয়টা কোন সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।
তাহলে উনিশ শতক থেকে বিশ শতকে গণতন্ত্র কোন পথে?
বুর্জোয়া গণতন্ত্র হল পুঁজিবাদী গণতন্ত্রেরই নামান্তর। পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে সরকার জনগণের এজেন্ট হয় এবং সরকার জবাবদিহি করতে খাতায় কলমে বাধ্য থাকে। সেই সঙ্গে সরকার আর একটা কাজও করে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে সাংবিধানিক নিয়মের ফাঁক গলে অথবা প্রয়োজনে সেটার পরিবর্তন ঘটিয়ে গোষ্ঠী শাসন বলবত রাখে।
এই গোষ্ঠী শাসনের কথা রবার্ট মিচেল খুব জোর দিয়েই বলছেন। সরকারে থাকা আমলাতন্ত্র কখনই জনশাসনের পূর্ণতাকে প্রকাশ করে না। এই আমলাতন্ত্র হল বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রধান অংশ। নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোয় অসাম্যকে শাসনব্যবস্থায় সরকারের রাজনৈতিক অংশ হিসেবে কাজ করতে সাহায্য করে। এই আমলাতান্ত্রিক শ্রেণী যারা প্রান্তিক ও নিম্ন-মাঝারি কৃষকসহ শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি তীব্র বৈর অবস্থানকে স্পষ্ট করে। তাই বুর্জোয়া গণতন্ত্র বিপ্লবের পরিসর রচনা করে না, বরং গণতন্ত্রের নামে আগ্রাসনকে সুতীব্র করে। বিপ্লবের মধ্যে দিয়েই সাম্য, মৈত্রী এবং রাজনৈতিক মুক্তিতে স্বাধীনতা নাগরিক অধিকারের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে [যদি না তাকে নেতৃত্বের জয়গানে সীমাবদ্ধ রাখা হয়]।
মার্কসীয় ধারা বলছে যে ১৯ শতকের রাজনৈতিক সমিতিগুলো, নাগরিক সমিতিগুলো, ২০ শতকে রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে, আর্থিক সাম্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে, শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা গড়ার কাজে সামিল হয়। বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের পথে উন্নয়ন ঘটে। বিশ্বনাগরিক চোখের সামনে চন্দ্র বিজয় দেখে। মানব অধিকার প্রতিষ্ঠায় সার্বিক ঐক্য দিশারী হয়। কিন্তু নেতৃত্বের জয়গানের দুর্বলতা, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, সেই গণতন্ত্রেও বিকল্প নির্মাণের সহযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে, যার একদিকে যদি সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে ধরা হয় তবে অন্যদিকে থাকে গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের গুলাবী গণতন্ত্র।
বিশ শতক থেকে একুশ শতকে গণতন্ত্র কোন পথে?
তত্ত্বধারার এই আঙ্গিকে সমাজবিজ্ঞানীগণ কোন নির্দিষ্ট পথের কথা বলেননি। তবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে বিষয়টাকে দেখা যেতে পারে। গণতন্ত্রের বহুরূপতায় নির্যাতনকে তার প্রতিকল্পীয় সরণের নিরিখে দেখলে ধারণশীল নিপীড়নের ছবিটা স্পষ্ট হয়। দেখা যায় যে বিশ্বব্যবস্থার অভ্যন্তরে ক্ষমতা কাঠামো প্রতিনিয়ত সরে সরে যাচ্ছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ততটাই করা হচ্ছে, যতটা সেই সুনির্দিষ্ট জনসমাজ সইতে পারে। ভারতীয় সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষিতে বিষয়টাকে ডেমোক্র্যাসি উইথ ওরিয়েন্টাল ডেস্পোটিজম টু ডেমোক্র্যাসি উইথ গ্লোবাল নেপোটিজম হিসেবে বিচার করাটাই আমার মনে হয় সহজ ও সমীচীন হবে। বিশেষ করে যখন জাতিসংঘের নির্দেশে ২০০৭ সাল থেকে সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশ বা সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিবছর ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক দিবস পালন করে আসছে।
পুঁজিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী সংযোগের ফলে উদার গণতন্ত্রের মধ্যে একটা আধা-ম্যানেজারীয় ব্যবস্থার চরম-কর্তৃত্ববাদী প্রাচ্য ক্ষমতা, অথবা সামগ্রিক ম্যানেজারীয় ব্যবস্থার চরম-কর্তৃত্ববাদী সর্বাধিকারবাদ বিংশ শতাব্দীর সমাজচিত্র হলে, একবিংশ শতাব্দীর ঝুঁকিরোধক ক্ষমতা অথবা দখলদারির বিশ্ব-স্বজনপ্রীতির গালভরা পারে-আখ্যান (গণমাধ্যমের সহায়তায়) মানুষের দৈনন্দিন জীবন-সংকটে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হয় প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে।
কিন্তু কীভাবে?
এখানেই মিডিয়ার রাজনৈতিক-অর্থনীতির কথা উঠে আসে। আজকের ভারতে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞানে বিচার করলে সেই ছবির নগ্নতা স্পষ্ট হয়। সামাজিক বাস্তবতার করুণ ছবিটাকেও চিনে নেওয়া যায়। গোয়েবলসীয় প্রচার কায়দার কথাই বলুন, আর অধুনা বহুপ্রচলিত উত্তর-সত্য যুগ সংক্রান্ত অধ্যায়ের কথা ধরুন, উভয়ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র হয়ে ওঠে শাসকের ঢাল। শাসন ও শোষণ প্রণালীকে মসৃণ করার হাতিয়ার। কিন্তু একুশ শতকের এই একুশ সালে দাঁড়িয়ে দেখলে সেখানে একটা পন্থাগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণে বিচার করলে দেখা যাবে যে বিশ শতকে সেটা ছিল মিথ্যাকে জুড়ে জুড়ে নিবিড় প্রচারমূলক গণতান্ত্রিক অধিকার-বোধে ভ্রান্তকে প্রতিষ্ঠা করার কৌশল, আর একুশ শতকে সেটাই সত্যকে মিথ্যার সংলগ্ন করে তুলে জনমানসকে বিভ্রান্তির দরজায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। গণতন্ত্রের স্তম্ভ হয়ে, নাগরিক সমাজের অংশকে সঙ্গে নিয়ে, গণমাধ্যম আজ সেই কাজটা নিবিড়ভাবে করে চলেছে। শুধু ভারতীয় গণমাধ্যম নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক গণমাধ্যমের অভিমুখটা প্রায় এক। এটা পুঁজিবাদী মতাদর্শের অভিপ্রায়। গণতন্ত্রের ভড়ং।
উত্তর-সত্য যুগের এই মতাদর্শের নাম বিভ্রান্তিবাদ, যাকে জেমস কেনেত গ্লাসম্যান ‘জোহনেরিজম’ বলছেন। এই বিভ্রান্তিবাদ হল উত্তর-সত্য যুগের স্বজনতোষী পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের প্রাণ ভ্রমরা। এটাই ট্রাম্পকে ভোটে হেরেও গদি না ছাড়ার সাহস যোগায়, বাস্তব তথ্যকে ব্যবহার করে বিজ্ঞান-অজ্ঞ জনতাকে ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার কাজে গলা তোলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কালো টাকা উদ্ধারের পন্থা হয় বিমুদ্রায়ন! চুক্তি চাষের বিল হয়ে উঠে কৃষক বন্ধু সরকারী পদক্ষেপ! বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বর পায় ‘দেশদ্রোহীর’ তকমা! ফলে ভারতীয় গণতন্ত্র বিংশ শতাব্দীতে “শ্বেতাঙ্গ-ছাড়পত্রে গণতন্ত্র” থেকে “ভোটাধিকারেই-সীমায়িত গণতন্ত্র” ধারণার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। একবিংশ শতাব্দীতে সেই পন্থার পরিবর্তিত অভিমুখ “সংঘাতের গণতন্ত্রায়ন”কে নির্দেশ করে।
এই অবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
প্রথমত, জাতিগত সংঘাত, হতদরিদ্রকরণ ও পরিযায়ী শ্রমিক বা অভিবাসী শ্রমিকের স্রোত, ধর্মীয় উন্মাদনা ও সম্প্রদায়গত অত্যাচার। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ অথবা সেই ভয়ের পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, উন্মত্ত মুষ্টিমেয় ব্যক্তির শাসন হয়ে ওঠা যা অর্থনীতিকে পরিকল্পনাহীন করে। চতুর্থত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে অগণতান্ত্রিক নীতির মৌরসিপাট্টা। দুর্নীতি। পঞ্চমত, কর্পোরেট সংস্থার শোষণ এবং মিডিয়ার পুঁজি বিনিয়োগ। শেষ না হলেও আপাত শেষ বৈশিষ্ট্য হল, নাগরিকের মৌলিক অধিকারের হরণ এবং গণতন্ত্রের ভড়ং। গণআন্দোলন এখানে তার নৈতিক অধিকার হারায়।

শেষের কথা

সংঘাতের গণতন্ত্রায়ন নাগরিক জীবনে অনুভূত হয়। এই সংঘাত কেবল টুইট-পাল্টাটুইটে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সমাজ জীবনেও টের পাওয়া যায়। একজন ভারতবাসী হিসেবে আমি যেমন সেই সংঘাতের মুখোমুখি, ফুকুয়ামা নিজেও তার টের পাচ্ছেন। তাই তিনি বিকল্পের উন্মেষ সম্ভাবনাকে একদিন অস্বীকার করেও আজ মেনে নিচ্ছেন। অতিমারির বছর পূর্তিতে সারা বিশ্ববাসীর সঙ্গে আমরা সকলেই সেটা কমবেশি বুঝছি। সংবিধান আমাদের যে নাগরিক অধিকার দিয়েছে তাও আজ কোথাও ভূলুণ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। ভোটের অধিকার প্রয়োগে শাসক ছাঁকনি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভোট লুঠ করাটাই এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিবস পালনে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, সংবিধানের ১৪ থেকে ১৮ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে আপনি যে সাম্যের অধিকার পেয়েছিলেন, পুঁজিবাদী গণতন্ত্র যেহেতু বিপ্লবের কথা বলে না, তাই প্রচলিত সকল সামাজিক অসাম্য জিইয়ে থাকার মধ্যেই আমরা এখন জনতার ভিড়ে সাম্যকে খুঁজতে অভ্যস্ত হচ্ছি। সংবিধানের ১৯ থেকে ২২ নং অনুচ্ছেদ আমাদের যে স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল, সেখানেও আজ সরকারের নীতি নির্ভর প্রকল্প দলীয় সুযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভাবাবেগ-এ আঘাত বলে বিচারের হয়রানি আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। তাই স্বাধীনতাকে আমরা সামর্থ্যের পর্যায়ে উন্নীত করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
সংবিধানের ২৩ থেকে ২৪ নং অনুচ্ছেদ আমাদের যে শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেছিল, সেটাও এখন স্বজনতোষী পুঁজিবাদের ধ্বজা ধরে গণতন্ত্রকে প্রকাশ করছে। কর্পোরেট ও ক্রনি ক্যাপিটাল নিপীড়নকে ধারণশীল করে তুলছে। সেই নিপীড়ন পরিবেশ থেকে স্বাস্থ্য – সকল বিষয়কে করছে সীমায়িত। এমনকি ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার সেই প্রভিডেন্ট ফান্ডও এখন কয়েকটি সংস্থার বন্ডে ডুবে যাচ্ছে। গায়েব হয়ে যাচ্ছে মানুষের সঞ্চয়। অনিশ্চয়তায় ভরে যাচ্ছে জনজীবন।
সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নং অনুচ্ছেদ আমাদের যে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার ঘোষণা করেছিল, সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ গণতন্ত্রের নামে সেই স্বাধীনতাকেও আজ হরণ করে। সংবিধানের ২৯ থেকে ৩০ নং অনুচ্ছেদ আমাদের যে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা-বিষয়ক অধিকার দিয়েছিল, সেই শিক্ষার সুযোগ এখন পুঁজিকেন্দ্রিক হয়েছে। কৃষি থেকে শিল্প, শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি চর্চা, সবই এখন ঐ কর্পোরেট শ্রেণীর সঙ্গে রাজনৈতিক শ্রেণীর সংযোগ সুতোয় বাঁধা। সংবিধানের প্রতিবিধানের অধিকার ৩২ ও ২২৬ নং অনুচ্ছেদে বলা থাকলেও তা রাজ্য-কেন্দ্র উভয় স্তরেই ভূলুণ্ঠিত। ভূলুণ্ঠিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।
শাসন ক্ষমতা এখন স্বজনতোষী পুঁজিবাদের হাতে খেলনা। ফলে আজ গণতন্ত্রের নামে রাস্তা খোঁড়া হয়, পেরেক পোতা হয়, প্রতিবাদীকে পিটিয়ে মারা হয়। খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এখন সহজেই জুলুম করা যায়। গণতন্ত্রের এই কাঠামোয় কৃষক-শ্রমিকদের জীবন যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। জম্মু-কাশ্মীরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়া হয়। ধর্মীয় অধিকার খর্ব ও বিভাজনের রাজনীতি প্রবল হয়ে ওঠে। খাদ্য-খাবার গ্রহণে নাগরিকের অধিকার খর্ব হয়। জাতভিত্তির দমন পীড়ন ও NRCর নামে ভয়ের সঞ্চার নিয়ন্ত্রণের সহজ মাধ্যম হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার রক্ষার লড়াইকে দমিয়ে রাখতে, প্রতিবাদের স্বরকে বিচ্ছিন্ন করতে তাই এখন ৪ বছরে ৪০০ বার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়।
এই সব অগণতান্ত্রিক, মানবতা বিরোধী কাজ গণতন্ত্রের বাহ্যাড়ম্বরে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনিকেই নিশ্চিত করে। তবে তা গ্যাস চেম্বারের যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত নয়, এখানে এখন ধারণশীল নিপীড়নে স্বজনতোষী পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ফ্যাসিবাদের বৈচিত্র্য বজায় রাখার পথে হাঁটে।

[লেখক – এম. এ, পি এইচ. ডি, সহকারী অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ববিভাগ, প্রফেসর নুরুল হাসান কলেজ, ফারাক্কা, মুর্শিদাবাদ]

Facebook Comments

Leave a Reply