বুয়া গল্পের শেষ পরিণতি! – রোমেল রহমান

fail

গেছে ১৫ বছরে একবারও তার নামের জরুরত আমাদের পরে নাই! কিংবা তার নাম না জানার ব্যর্থতা আমরা আবিষ্কার করি যেদিন তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হবে সেইদিন! করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বাসায় যেসব স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নেয়া হয় তার মধ্যে প্রথমেই প্রস্তাব ওঠে কাজের বুয়াকে ছাড়িয়ে দেয়া হবে! বাসার সবাই প্রস্তাবে রাজি শুধুমাত্র আম্মা ছাড়া! তার আমদানি করা লোক! টানা ১৫ বছর কাজ করায় আমরা অনেকটা তার হাতে মানুষ! কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য এই নির্মমতা আমাদের নিতেই হচ্ছে! বুয়াকে ডাকা হয় যখন তখন সে কিছুই জানতো না! তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বলে মুনা! কিন্তু মুহূর্তে যেন আকাশ ভেঙে পরে বুয়ার মাথায়! চোখ ভরে ওঠে জলে! কুঁকড়ে আসে বয়সী মহিলাটি! বিহ্বল চোখে আমাদের সকলের মুখে একটু আশ্বাস খুঁজতে থাকে! কিন্তু সবাই নির্বিকার! শুধুমাত্র আম্মা মাথা নিচু করে মন মরা হয়ে আছে! বুয়া নিজেই অবিশ্বাস মেশানো ভয়ার্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে, আম্মা গো ভাবি কি বলতেছে এইসব? এই আকালের দিনে আমারে কাজের থিকা বাদ দিয়া দিবেন? খামু কি আম্মা? সবাই বোবা হয়ে থাকে! আব্বা অস্ফুটে বলে, দেখো অবস্থা তো বুঝতেছই! তুমি বস্তি থিকা কাজে আসো কখন অসুখটা তোমার সাথে…! আব্বা কথা শেষ করতে পারলেন না! উনি বুঝতে পেরেছেন বুয়ার মাথায় এসব ঢুকছে না! আম্মা বললেন, শোন্‌ আমার জামানা তো নাই আমি আর কি করবো! কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে দিচ্ছি, বিপদের দিন কটা পার কর তারপর আবার আয়! বুয়া আম্মার পা জড়িয়ে ধরে! মুনার নাক কুঁচকে আসে! সে শক্ত স্বরে বলে, আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছেন! ওঠেন! বুয়া অবিশ্বাসের চোখে মুনার দিকে তাকিয়ে বলে, ভাবি গো আপনাগোর সংসারে এতো বচ্ছর… কোনদিন পর ভাবি নাই কাউরে…! মুনা আরও বিরক্ত হয়ে বলে, এতো কথা শুনতে চাচ্ছি না, বেতন কড়ি দিয়ে দিচ্ছি বিদেয় হন!

বুয়াকে বের করে দেবার পরদিন থেকে আমরা টের পেলাম পাহাড় সমান কাজ বাড়িতে! তার থেকে জটিল সমস্যা দাঁড়ালো আমরা কেউই কিচ্ছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না! মশলা থেকে ঝাঁটা সব ছিল বুয়ার নখদর্পণে! কার কি প্রয়োজন আর কে কি খায় সব তার মুখস্থ! আমরা টের পেলাম এক টেবিলে বসলেও আমরা কেউ কাউকে জানি না ঠিকঠাক! আম্মা অবশ্য জানেন! তবে বুয়া চলে যাবার পর থেকে তিনি যেন গা ছেড়ে দিলেন! একটা নরম অপরাধ বোধ আম্মাকে ঘিরে ধরল! চতুর্থ দিন থেকে শুরু হল আমাদের সিস্টেম এলোমেলো হয়ে পড়া! গত তিনদিন অন্তত আমরা উদ্দীপনা নিয়ে ঘরের কাজ করছিলাম কিন্তু সেটা হারিয়ে গেলো ৩ দিনেই! ঘর নোংরা হয়ে উঠতে লাগলো! চারদিকে জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে থাকতে লাগলো! কাপড় ধোয়া হয়ে উঠলো সব থেকে জটিল একটা সমস্যা! ফলে গৃহবিবাদের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠলো! আব্বা তার জিনিসপত্র কিছুই খুঁজে পাচ্ছিল না, আম্মার কাজ গুলো কেউ গুছিয়ে দিচ্ছিল না! মুনা বিরক্তে অস্থির হয়ে উঠতে লাগলো! আমি চেপে গেলাম আমার সমস্যা গুলো! মহামারীর দিনগুলোতে ব্যক্তিগত সুবিধা অসুবিধা নিয়ে ভাববার সুযোগ নেই। মুনার সঙ্গে আম্মার খুঁটিনাটি লেগে যেতে শুরু হল, মুনাও আম্মাকে দেখতে পারছিল না আর! ফলে আমাদের ঘর গুলো হয়ে উঠলো স্বায়ত্তশাসিত একেকটা প্রদেশের মতন! মুনা শুধুমাত্র নিজের ঘরটা পরিষ্কার রাখার ঘোষণা দিয়ে দিলো! ফলে আমাকে ঘর মুছতে হবে অথবা কাপড় কাচতে হবে! কিন্তু আব্বা আম্মারটা কে করবে? আম্মা রেগে গিয়ে ঘোষণা দিলেন তিনি মুনার হাতের রান্না খাবেন না! ফলে আব্বা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন! আমার কেবল মনে হল, সপ্তাহ খানেক আগে পর্যন্ত আমাদের যে সুসম্পর্ক জ্যান্ত ছিল সেটার যোগসূত্র কি তবে বুয়া?

পরিস্থিতি আরও দুর্যোগের হবে এটা টের পেয়ে ব্যাপারটা সামলানোর জন্য আমি খুঁজেটুজে পেয়ে গেলাম হোম ডেলিভারি সেবা দেয়া একটা রেস্টুরেন্টের! মনে হল বাঁচা গেলো! কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে সেটাকে আর ব্যাবহার করা গেলো না! এতো দূরে মাত্র একটা বাসায় খাবার পোঁছে দেবার ব্যাপারে ওরা আগ্রহী না, যেহেতু এখন কর্মচারীর সংকট! বাড়তি মাশুল দিয়েও বোঝানো গেলো না! ফলে পরেরদিন ভোরে দেখা গেলো বহু বছর আগের চেনা একটা দৃশ্য! আম্মা রান্নাঘরে খুঁট খাট শব্দ করে কাজ করছেন খুব ধীরে! আব্বা দরজার পাশে একটা চেয়ারে বিমর্ষ চেহারায় বসে আছেন! আমি বারান্দায় গিয়ে বসলাম! মুনার গলা শোনা যাচ্ছে, সম্ভবত অফিসের কোন কলিগ ফোন দিয়েছে! লকডাউনের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় অল্প সময়ের জন্য ওদের অফিস খুলবে আগামী সপ্তাহ থেকে! এইসব গল্পের জড়তা এভাবেই চলতে পারতো কিন্তু একটু অন্য রকম হয়ে উঠলো যখন দুপুরবেলা আব্বা একটা বাটিতে করে আম্মার রান্নাকরা তরকারী দিয়ে গেলেন আমার হাতে তখন আমার মনে হল, ভালো রান্না হলে পাশের বাসায় তরকারী পাঠানো আমাদের সেই সময়কে! ফলে পরদিন মুনা বেশি করে মুর্গির মাংস রান্না করে পাঠাল আম্মার ঘরে! এভাবে একটা নতুন জীবনযাপনের পায়ের শব্দ অনুভব করতে লাগলাম আমরা!

কিন্তু আমাদের বুয়ার কি হয়? তার শেষ পরিণতি বা আমাদের সঙ্গে তার সর্বশেষ পরিণতি কি দাঁড়াতে পারে? কয়েকটা সমাপ্তি দিয়ে এই গল্পের বুয়া চরিত্রের শেষ হতে পারে…

১। বুয়া যেদিন বিদেয় হয়েছেন সেদিনই তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেষ! হয়তো কিছুদিন বস্তিতে ছিলেন তারপর গ্রামে ফিরে গেছেন! কিছুদিন আমাদের জন্য চরম দুঃখ জমা করে একসময় খাবারে খোঁজে হারিয়ে গেছেন!
২। মহামারীর দিন শেষ হলে একদিন বুয়া ফিরে আসেন! আর এসে জানতে পারেন আমাদের বাসার সবাই মহামারীতে মরে ভুত হয়ে গেছেন! ফলে তিন চরম শোকের মধ্যেও বেঁচে যাওয়ার আনন্দে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে যাবেন!
৩। তিনি নিজেই মারা গেছেন: (ক) খাবারে অভাবে, (খ) ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে, (গ) খুন হয়েছেন (যেহেতু তার কাছে বেশ কিছু টাকা ছিল!)
৪। সব থেকে ভালো সমাপ্তি হয় যদি মহামারী শেষে একদিন তিনি ফিরে আসেন আর তাকে দেখে আমরা সবাই গিয়ে জড়িয়ে ধরি! মুনা হয়তো বলবে, আমাদের ভীষণ কষ্ট হয়েছে তোমাকে ছাড়া বুয়া! তিনি দ্বিধায় টালমাটাল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলবেন, আমার কি কম কষ্ট হইসে আপনেগো রাইখা থাকতে এই কয়দিন!

তারপর হয়তো আমরা মিলিয়ে দেখবো আমাদের পুরাতন-নতুন কিংবা পুনরায় পুরাতন জীবনটা মূলত মানুষে ঘেরা, একজন অন্যজনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘেরা!

Facebook Comments

Posted in: March 2021, STORY

Tagged as: ,

Leave a Reply