রবীন্দ্রনৃত্য ভাবনাঃ প্রেক্ষিত ও চলন – সোমা দত্ত

fail

ষষ্ঠ পর্ব

বিশ্বভারতীঃ

১৯২১ সালে “বিশ্বভারতী পরিষদ গঠিত হয় এবং ১৯২২, ১৬ই মে থেকে ‘বিশ্বভারতী’ রেজিষ্টার্ড সোসাইটি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বইগুলির স্বত্ত্ব দিয়ে দেন বিশ্বভারতীকে, শান্তিনিকেতনের মূল আশ্রমের জমি বাদ দিয়ে বাকি ভূসম্পত্তি দিয়ে দেন সোসাইটিকে। দেশে বিদেশে ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে, ব্যবসায়িক মহল থেকে সাধারন শিক্ষিত মানুষ সবার কাছে ‘বিশ্বভারতী’ গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ও আদর্শ ব্যখ্যা করে অর্থ সংগ্রহ করেন – তাঁর স্বপ্নকে রূপ দেবার জন্য। সেই তালিকায় গুজরাটের অম্বালাল সারাভাই থেকে সেখানকার বণিকসংঘ, অবশিষ্ট রাজা নিজাম প্রায় সকলের দুয়ারে হাজির হয়েছিলেন। একাজে তাঁর বড় সহায় ছিলেন এন্ড্রুজ।
দেখতে দেখতে নানাদেশ থেকে অতিথি অধ্যাপক এলেন বিশ্বভারতীতে। চীনা ও তিব্বতি ভাষাশিক্ষা শুরু হলো, দেশ বিদেশ থেকে বই এল, গ্রন্থাগার সম্প্রসারণ হলো। প্রচুর লোক-লস্কর, নিত্যকাজে বিশ্বভারতী সরগরম আর কবি ছুটে চলেছেন অবিশ্রান্ত এর জন্য অর্থ জোগাড় করতে। সিংহলে বক্তৃতার টিকিট বিক্রির টাকা ছাড়া তেমন বড় অংকের দান পাচ্ছেন না। আবার লিমডির রাজা বিশ্বভারতীর কর্মীদের স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য এককালীন দশহাজার টাকা অনুদান দিচ্ছেন। কিন্তু ট্রাজেডি হল, “রবীন্দ্রনাথ অর্থ সংগ্রহ করিয়া আনিতেন- তাহার ব্যবস্থা, ব্যয় ও অপব্যয় করিতেন বিশ্বভারতীর পরিচালকমন্ডলী বা সংসদ”। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে আছেন, সমস্ত শক্তি দিয়ে গড়ে তুলছেন তাঁর স্বপ্নের বিশ্বভারতী, তখনই যদি এইরকম অব্যবস্থা ও নঞর্থক কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গিয়ে থাকে এর অন্দরে তাহলে এ প্রশ্ন এসেই যায়, ব্যক্তিপূজাই কেবল সার হয়েছে? তাঁর ভাবনা পথের সঙ্গী আদপে কতজন হলেন?

বিশ্বভারতীতে নৃত্যচর্চাঃ (প্রারম্ভিক কাল)

আগের পর্বগুলিতে নাটকের গানের সাথে কিভাবে রবীন্দ্রনাথ নাচ জুড়ে দিয়েছিলেন তা আলোচনা করেছি। এবার আসব নৃত্যশিক্ষা প্রসঙ্গে। ১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথ সিলেটের কাছে ‘মছিমপুর’ নামে মণিপুরী অধ্যুষিত একটি গ্রাম দেখতে যান। সেখানে তিনি বালকদের রাখালনৃত্য (গোষ্ঠলীলা) ও মণিপুরী বালিকাদের নৃত্যও দেখেন। সেখান থেকে শিক্ষক হিসেবে একজনকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। কিন্তু সেখানকার অধিবাসীরা কেউ রাজী হননি। কারণ সহজেই অনুমান করা যায়, তাঁদের নাচ তাঁদের জীবনের সাথে জুড়ে থাকা যাপনের অংশ। কাংলেইপাক, বৈষ্ণব আগ্রাসনে মণিপুর হয়ে ওঠা যেমন ঐতিহাসিক সত্য তেমনি সেই ধর্মের সাথে পরবর্তীকালে মণিপুরবাসীর একাত্ম হয়ে যাওয়াও সত্য। তাই নিজের জায়গা ছেড়ে নৃত্যশিক্ষা দেওয়ার যে ধারণা তা তাদের বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষক পেলেন ত্রিপুরার রাজার দরবার থেকে। সেখানে বুদ্ধিমন্ত সিংহ ছিলেন রাজার দরবারের একজন শিল্পী। তিনি একজন মৃদঙ্গীকে নিয়ে এলেন শান্তিনিকেতনে।
৮ বছর থেকে ১৫/১৬ বছর পর্যন্ত একদল ছাত্রকে বাছাই করে নৃত্যশিক্ষার ক্লাস শুরু হল। রাখালনৃত্যের কিছু নৃত্যভংগী আয়ত্ত হওয়ার পর কবি “আয় আয় রে পাগল ভুলবিরে চল আপনাকে” গানটি লিখে দিলেন, তার সুর ও ছন্দে নৃত্যপদগুলিকে সাজিয়ে নিতে। শান্তিনিকেতনে এই প্রথম নৃত্যশিক্ষা পর্বের শুরু। কিন্তু বিদ্যালয়ের মাসিকপত্রে নৃত্যশিক্ষা সম্বন্ধে বক্তব্য ছিল এইরূপ- “ত্রিপুরাধিপতি মহারাজ বাহাদুরের দরবার হইতে দুইজন কলাবিদ আসিয়াছে। আশ্রম বালকেরা তাঁহাদিগের নিকট হইতে মৃদঙ্গ সহযোগে সাংগীতিক ব্যায়াম শিক্ষা করিতেছে।“ নাচ বা নৃত্য শব্দটিকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কবি এরপরই বুদ্ধিমন্ত সিংহের স্ত্রীকে শান্তিনিকেতনে আনাবার চেষ্টা করেন মেয়েদের নাচ শেখানোর উদ্দেশ্যে। সে উদ্দেশ্য সফল তো হলই না বরং বুদ্ধিমন্ত সিংহ গরমের ছুটিতে দেশে গিয়ে আর ফিরেও এলেন না। প্রথম পর্যায়ে নৃত্যশিক্ষার এখানেই ইতি পড়ল।
পরের পর্যায়ে ১৯২৩ সাল নাগাদ গুজরাট থেকে একটি পরিবারকে নিয়ে এসেছিলেন সেখানকার মন্দিরার তালে ভজনের সাথে নৃত্যপদ রচনার কায়দাটি শান্তিনিকেতনের মেয়েদের শেখাবেন বলে। মেয়েদের এই দলে ছিলেন নন্দলালের কন্যা গৌরি, ক্ষিতিমোহন সেনের কন্যা অমিতা ও কবির দৌহিত্রী নন্দিতা। এবারে নৃত্যগীত যুগপদ সৃষ্টি “দুইহাতে কালের মন্দিরা যে, সদাই বাজে”। নন্দলাল আঁকলেন আম্রকুঞ্জে বসা দুইহাতে মন্দিরা নিয়ে একটি কিশোরী মেয়ের নৃত্যরতা ছবি। এ পর্বের নৃত্যশিক্ষারও এখানেই ইতি।
১৯২৩ শে ফেব্রুয়ারী মাসে কলকাতায় ‘বসন্ত’ নাটিকাটি অভিনীত হয়। এখানে অনেকগুলি গান নাচের তালে ছন্দে হাত পা নেড়ে লাফ ঝাঁপ দিয়ে মঞ্চকে ভরাট করে পরিবেশন করা হয়েছিল। পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, “নৃত্যও এই অভিনয় হইতে একেবারে নির্বাসিত হয় নাই। রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ প্রভৃতিও মন্ডলী নৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন।“ এইখানে খটকা লাগে, তৎকালীন বাংলা থিয়েটারে নাচ হত না? সখীর দলের নাচ থাকত না থিয়েটারে? তখন তো ন্যাশনাল থিয়েটার, গিরীশবাবু গত হয়েছেন, দানীবাবুদের যুগ। নটি বিনোদিনী অনেক আগে মঞ্চ কাঁপিয়ে থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছেন। কুসুমকুমারীদের মত অনেক অভিনেত্রী রয়েছেন বাংলা থিয়েটারে, সবাই যদিও বেশ্যাপাড়া থেকে আগত। ভদ্রবাড়ির মেয়েবউরা থিয়েটারের ভক্ত বটেই, নতুন থিয়েটারের হ্যান্ডবিল মেয়ে কর্মচারীদের দিয়েই বিলি করত থিয়েটার কোম্পানীগুলি। কিন্তু ভদ্রবাড়ির মেয়েরা তো থিয়েটার করেন না।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ছেলেমেয়েরা তো বটেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও নেচে গেয়ে অভিনয় করছেন। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনা গান নাটক করার কথা আমরা পাচ্ছি। ব্রাহ্ম পরিবারগুলির সাথে ইংরাজের ঘনিষ্ঠতার কথাও পাওয়া যাচ্ছে। গোরা উপন্যাসে তিনি ইংরাজদের অতিরিক্ত অনুকরণকে সমালোচনাও করছেন। আবার একটু পিছন ফিরে তাকালেই আমরা দেখতে পাব, আই.এ.এস সত্যেন্দ্রনাথ জ্ঞানদানন্দিনীকে নিয়ে হুডখোলা গাড়িতে হাওয়া খেতে যাচ্ছেন গড়ের মাঠে। রবীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে ঘুরে এসেই ‘মানময়ী’ নাটকে বিলিতি নাচের ঢংয়ে নাচ করাচ্ছেন। অর্থাৎ একটা ছক যেমন ভাঙছেন তখন অন্য একটা মডেল অবশ্যই সামনে আছে এবং সেটা ইংরাজেরই।
কিন্তু তবুও খুব সহজেই মেয়েদের নাচের জগতে এনে ফেলতে পারছেন না, বিশ্বভারতীর অধ্যাপকদের বাধায়। শান্তিদেব ঘোষ যেমন বলছেন, গুরুদেবকে প্রায় কুড়ি বছর চেষ্টা করতে হয়েছে, নিজে নেচে বোঝাতে হয়েছে যে নৃত্যকলাও একটি সম্মানীয় বিদ্যা। এইখানে একটা প্রশ্ন আসে, বিলাত যাওয়ার আগে নৃত্যকলা সম্বন্ধে কি তাঁর এই ধারণা ছিল? দেশে তার আগে কোনো নৃত্যের সঙ্গে তিনি পরিচিত ছিলেন না? দেশের থিয়েটারে নাচ ছিল, গ্রামীন সমাজে নাচ ছিল, কিন্তু কোনো নাচের প্রসঙ্গ তাঁর লেখায়ও বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় গড়ে তোলার সময়ে আশেপাশের গ্রামগুলি সম্বন্ধে জানছেন; কিন্তু সান্থালদের নাচ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা হয়নি সেটা ভাবলে খানিক অবাক লাগে। কিন্তু বাংলার সেই সমস্ত নাচের বিষয়ে তাঁর কোনো অভিমত পাওয়া যায় না। বাইজি নাচ সম্বন্ধে তিনি বীতরাগ ছিলেন এবং সৌন্দর্যের নিরীখে তাঁর রুচিসম্মত মনে হত না তা জানা যায়। অন্যদিকে বিলাতে নাচের অভিজ্ঞতা তিনি বিশেষভাবে অনুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন, সে নাচ শিখছেন সেখানে সামাজিকভাবে মেলামেশা করার তাগিদেই।
চলে আসি ১৯২৫ শে,”শেষ বর্ষণ” নাম দিয়ে নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান হয় জোড়াসাঁকোতে। এই পর্যন্ত যে নাচ হত তা প্রতিমা দেবীর তত্ত্বাবধানে, পূর্বে শেখা গরবা নাচ ও কথার সাথে মূকাভিনয় সহযোগে রচিত হয়েছিল। এরপরই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে মেয়েদের নৃত্যশিক্ষার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা গড়লেন। আগরতলার মহারাজা নবকুমার সিংহ এবং বৈকুণ্ঠনাথ সিংহকে পাঠালেন শান্তিনিকেতনে।
গৌরি দেবী, শ্রীমতি দেবী, নন্দিতা দেবী, অমিতা দেবী, যমুনা দেবী সহ একদল মেয়েকে নাচ শেখাতে শুরু করলেন তাঁরা। মণিপুরী রাসলীলা শিখেছিলেন এই দলটি। শান্তিদেব ঘোষের বর্ণনা থেকে জানতে পারি বাংলা প্রদেশের গভর্নর লর্ড লিটন এসেছিলেন এইসময় শান্তিনিকেতনে। তখন তাঁকে এই রাসলীলা নৃত্যটি দেখানো হয় এবং তার কিছুদিন আগে গোপনে এই নাচটি দেখানো হয় বিশ্বভারতীর বয়ষ্ক অধ্যাপকদের। শান্তিবাবু লিখছেন তাঁরা কয়েকজন ছাত্র দূর থেকে লুকিয়ে দেখেছিলেন সে নাচ। বাইরের মানুষদের কাছে মেয়েদের নাচ দেখানোর আগে বাড়ির বয়ষ্ক অভিভাবকদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার মত একরকম ব্যবস্থা। ভক্তিমূলক রাসনৃত্য সে অনুমতি পেল এবং শান্তিনিকেতনে মেয়েরা নাচ শিখতে ও চর্চা করতে শুরু করল। এরপর অনুষ্ঠিত হল “নটির পূজা” প্রতিমা দেবীর তত্ত্বাবধানে।
‘নটির পূজা’ থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে মূকাভিনয় এবং মণিপুরী নাচের নৃত্যভঙ্গি মিলিয়ে নতুন এক প্রকার নৃত্যাভিনয়ের প্রবর্তন হয়। এরপর বসন্তোৎসবে নৃত্যগীতানুষ্ঠানে প্রথম দু’টি গানে নটরাজের বন্দনা করলেন, পরে ছয় ঋতুর গান ও নাচ হয় পর্যায়ক্রমে। এরপর একপ্রকার গতি পায় শান্তিনিকেতনের নৃত্যশিক্ষা ও নৃত্যচর্চা। নৃত্যশিক্ষায় অগ্রগণ্য ছিল ধ্রুপদী নৃত্য, বিশেষত মণিপুরী ও পরে আসে কথাকলি। কেরালা কলামন্ডলম থেকে অল্প কয়েকমাসের জন্য এসেছিলেন কল্যাণী আম্মা। শান্তিদেব ঘোষের কথা অনুযায়ী তিনি কেরালার সামাজিক দলবদ্ধনৃত্য কুম্মী কোইকোট্টিকলি শিখিয়েছিলেন। ১৯৩০ শে কেরালা কলামন্ডলম স্থাপনের কয়েক বছর পর থেকে মোহিনীয়াট্টম নৃত্যের পুনর্নবিকরণের কাজ শুরু হয়েছিল। ১৯৩২ শে যা ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। সেদিক থেকে শান্তিবাবুর ভাষ্যই অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।

তৎকালীন দেশীয় নৃত্যের প্রেক্ষাপটঃ

দেশের ও সমাজে কোনো পরিবর্তনই যেহেতু হঠাৎ কোনো কারন ছাড়াই ঘটে যায় না তাই তথাকতথিত উচ্চবিত্ত শিক্ষিত (ইংরাজি শিক্ষায়) ও ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়েদের নৃত্যশিক্ষায় উৎসাহ দেওয়া হল এবং দেশে বিদেশে তাদের নাচের অনুষ্ঠান হতে লাগল এর পিছনের কারণও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ মাদ্রাজ প্রভিন্সে “এন্টি নাচ মুভমেন্ট” শুরু হয় যার ফলে দাক্ষিণাত্যের মন্দিরগুলিতে বহুল প্রচলিত দেবদাসী প্রথা বড় সংকটে পড়ে। ডক্টর মুত্থুলক্সমী রেড্ডি ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম হোতা এবং ব্রিটিশ সরকারের মদতও ছিল এই আন্দোলনের সাথে। এর আগেও ছোট বড় বিক্ষোভ আন্দোলন হয়েছে দেবদাসী প্রথা নিয়ে, কখনো মন্দিরের প্রবেশপথে সামনের রাস্তায় সব বর্ণের মানুষের চলাচলের অধিকার নিয়ে। মোদ্দা কথা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতাপ ও অন্যান্য বর্ণের মানুষের ওপর তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছিলেন সাধারণ মানুষ।
দেবদাসী প্রথার উপভোক্তা ছিলেন কারা? অবশ্যই ব্রাহ্মণরা। দাক্ষিণাত্য জুড়ে যখন সরাসরি দেবদাসীপ্রথা অবলুপ্তির পথে তখনই শিল্প ও নান্দনিক তত্ত্বের আধারে দেবদাসীনৃত্য সাদির, ধ্রুপদী ভরতনাট্যম নৃত্যের পথে যাত্রা শুরু করবে। এ যাত্রায় যাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন ই.কৃষ্ণ.আইয়ার এবং রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল। ই.কৃষ্ণ.আইয়ার, তামিল ব্রাহ্মণ, একজন প্রসিদ্ধ উকিল এবনং জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য। তিনি আবার শাস্ত্রীয় সংগীতানুরাগী এবং সাদির নৃত্যের ভরতনাট্যমে যাত্রাপথের বিশেষ উদ্যোগী। রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল, তামিল ব্রাহ্মন পরিবারের সন্তান এবং তার বাবা ছিলেন ‘থিওসফিক্যাল সোসাইটির’ একজন বিশেষ সদস্য। এই সোসাইটির একজন ব্রিটিশ নাগরীক জর্জ অরুন্ডেলকে বিবাহ করেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে এই ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের লোকজন যারা তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত ও ধনশালী এবং জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য,তারাই মূলত এই ধ্রুপদীনৃত্য গড়ে তোলার পিছনে মূল সংগঠক এবং বিত্তশালী ব্যবসায়িক পরিবারগুলি মূল পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠবেন। সূক্ষ ও সুচারু উপায়ে মায়াবাদ ও নিয়তিবাদ ঢুকে পড়বে নৃত্যের বিষয় হিসেবে।দেবদেবীদের মহিমাকীর্তন এবং সর্বময় দেবতার উদ্দেশ্যে আত্মনিবেদনের সংস্কৃতির পরিচায়ক হবে এই শাস্ত্রীয়নৃত্যগুলি। দক্ষিণ থেকে পূর্বে নৃত্যগুলিকে আবার একই প্রাচীন নাট্যশাস্ত্রের নিয়মের সুতোয় বাঁধা হবে তাতে এক ভারত এক সংস্কৃতির নীতির রূপায়নও করা যাবে। এবার এই শিল্প ও সংস্কৃতি বিশ্বের দরবারে ভারতবর্ষের সংস্কৃতির পরিচায়ক হবে, যা নিতান্তই হিন্দু ভারতের নিবেদনের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি কে বহন করবে? অবশ্যই মেয়েরা,নিবেদনের সংস্কৃতি মেয়েদের না শেখালে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামো রক্ষা সম্ভব হবে না। অতএব…
কেরালায় কথাকলি ও মোহিনীয়াট্টম (প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় নৃত্য না হয়েও) -এর যাত্রা শুরু হবে ধ্রুপদী হওয়ার লক্ষ্যে। মণিপুরে বৈষ্ণবরা যেহেতু অনেক আগেই প্রাচীন সংস্কৃতি ধ্বংস করে বৈষ্ণবধর্মের আধারে সুচারুরূপে সাজিয়ে নিয়েছিল এই নৃত্যকে তাই এই সময় সর্বত্র মণিপুরী নাচ শেখানোর একরকম উদ্যোগও শুরু হয়েছিল আগরতলার রাজা, শিলচরের বিত্তশালী মানুষদের উদ্যোগে। কেরালা, গুজরাট ও বাংলা তার মধ্যে অন্যতম।কেরালা কলামন্ডলমেও কিছু সময় মণিপুরী নাচ শেখান হয়েছিল,নতুন নাচের কাঠামো বানাতে এই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল।
মাদ্রাজে রক্ষণশীল হিন্দুত্বের আবহে ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ কোনোদিনই সমাদর পাননি। রবীন্দ্রনাথ বর্ণবাদের সমর্থক হলেও জাতিভেদের বিরোধী ছিলেন যেমন ছিলেন আর এক কবি কেরালার ভাল্লাথোল নারায়ন মেনন। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বহুযুগ লালিত কাঠামোকে এঁরা সর্বান্তকরণে মানতে পারছেননা আবার তাকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে ফেলার সাহসও দেখাতে পারছেন না। ফলে এক মধ্যবর্তী অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁরা।
শান্তিদেব ঘোষ জোড়ালো পুরুষালী নাচ শেখার তাগিদে কেরালা যাচ্ছেন। তার আগে শান্তিনিকেতনে ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়’ গানের সাথে তিনি বাউলদের ঢংয়ে নাচছেন, ‘এবেলা ডাক পরেছে’ গানটির সাথে রায়বেঁশে ও জারিনৃত্য মিশিয়ে নাচ তৈরি করছেন। এখন প্রশ্ন হল,রায়বেঁশে কি কম পুরুষালি? অবশ্যই নয়। তাহলে পুরুষালি নাচ শিখতে কেরালায় যেতে হচ্ছে কেন? কারণ রায়বেঁশে নাচেন বাগদী সম্প্রদায়ের মানুষরা এবং এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। জমিদারদের দেহরক্ষী তথা সেপাই হিসেবে নিযুক্ত হত এই নিম্নবর্গের মানুষজন, যারা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। ততদিনে ব্রিটিশ সরকার বেঙলি রেজিমেন্টও ভেঙে দিয়েছে,নজরুল ফিরে এসেছেন।সেই বাঙালির যুদ্ধনৃত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ বাঙালির শক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া, তা নিশ্চিত সরকারের নেকদৃষ্টিতে থাকবেনা। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী গড়ে তুলতে যত পরিশ্রম করেছেন তা শ্রদ্ধার সাথে মনে রেখেও বলতেই হয় যে এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারেননি। জাতীয় বিদ্যালয়ের স্বপ্ন বিশ্বভারতীতেও সর্বঅর্থে সার্থক হয়নি।
নিম্ন বর্গের মানুষের নাচ উচ্চবর্ণ তথা উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেরা কেন নাচবেন? তার থেকে সহজ সমাধান কথাকলি,যা ব্রাহ্মণ্যবাদীতার কাঠামোয় ঢেলে সাজিয়ে ধ্রুপদী হয়ে উঠবে অচিরেই। প্রতিমা দেবী, ১৯৩০ শে ইউরোপ যাত্রার সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হলেন এবং ডারটীংটনহল বিদ্যালয়ে ব্যালে নাচের প্রশিক্ষণ নিলেন। গুজরাতের ছাত্রী শ্রীমতি দেবীও জার্মানি গিয়ে ইউরোপিয় মর্ডান ডান্সের প্রশিক্ষণ নেন।
নাচের আদর্শ হিসেবে তাহলে সামনের সারিতে থাকছে তথাকথিত নতুনভাবে গড়ে ওঠা ধ্রুপদীনৃত্য এবং ইউরোপীয় নাচ।বাংলার নিজস্ব নৃত্যধারা নূন্যতম জায়গা পাচ্ছেনা। তাহলে কি তা সত্যি সত্যি বাঙালির নাচ, বাঙলার নাচ হয়ে উঠতে সক্ষম হবে? বাঙালির নিজস্বতা, নৃতাত্ত্বিকভাবে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতির যে যে বৈশিষ্ট তা ছেঁটে ফেলার প্রক্রিয়া কি শুরু হয়ে গেল তখন থেকেই?

ক্রমশঃ

Facebook Comments

Leave a Reply