বর্নাশ্রম, অপর, সমাজ এবং দুটি রামায়ণ কেন্দ্রিক সংস্কৃত নাটক : রাম চরিত্রের বিবর্তন তথা রামায়ণের বহুপাঠ – শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

প্রথম পর্ব

আমাদের আলোচ্য দুটি নাটকেরই মূল উৎস রামায়ণ। কিন্তু নাটককারেরা গমন করছেন দুই ভিন্ন পথে। এই আলোচনায় আমরা পাশাপাশি রেখে পাঠ করব দুটি নাটককে। প্রথম নাটকটি ‘প্রতিমানাটকম’। দ্বিতীয় নাটকটি ‘মহাবীরচরিত’। এদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই আমরা তুলে আনবো শিরোনামে বর্ণিত বিষয়-আসয়।

প্রতিমানাটকম

প্রতিমানাটকমের নাটককারকে নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। সচরাচর ধরে নেওয়া হয় নাটকটি ভাস রচিত। টি গণপতি শাস্ত্রী যখন প্রাচীন মালয়ালম হরফে লেখা তেরোটি নাটকের পুঁথি আবিষ্কার করে বললেন এ সকল নাটক ভাসের রচনা, তখন থেকেই রয়েছে বিতর্ক। ভাস যে প্রসিদ্ধ নাট্যকার তার সমর্থন প্রখ্যাত অভিনবগুপ্ত থেকে কালিদাস সকলেই করে গিয়েছেন। কিন্তু এই মালয়ালমে লেখা নাটকচক্রম ভাসের লেখা কি না তা নিয়ে তর্ক এখনো অব্যাহত। গণপতি শাস্ত্রী পদ্মনাভপুরের লাগোয়া মনলিক্কর মঠে একটি বৃহৎ তালপাতার পুঁথি পেয়েছিলেন। তার মধ্যেই ছিল ‘দূতবাক্য’ নাটকের ক্ষত-বিক্ষত অংশ সমেত বাকী সব কয়টি নাটক। তারপরে এই গ্রন্থগুলোরই আরো কয়েকটি পুঁথি তিনি ওই কেরালাতেই পেয়েছিলেন।
ভাসের নামে প্রচলিত নাটকগুলির মধ্যে রামায়ণ নির্ভর নাটক দুটি। অভিষেক এবং প্রতিমানাটকম। আর সাতটি নাটক মহাভারত বা তার চরিত্র নির্ভর। দূতবাক্য, কর্ণভার, দূতঘটোৎকচ, ঊরুভঙ্গম, মধ্যমব্যায়োগ, পঞ্চরাত্র – এই সবকটিই মহাভারত নির্ভর। এ ছাড়া কৃষ্ণচরিত্র নির্ভর নাটক বালচরিত, যাতে কৃষ্ণের বীর্যবত্তার যা পরিচিতি তা ভাগবতেও পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ভাসের নামে প্রচলিত এই নাটকচক্রমে আরো অন্য নাটকও আছে।
পন্ডিতদের মধ্যে রচয়িতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ‘প্রতিমানাটকম’ যে লিখিত হয়েছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শুরু করি প্রতিমানাটকম দিয়েই। মহাকবি বাল্মিকীর নামে পরিচিত যে রামায়ণ সে রামায়ণের কাহিনী অংশে রামের বনবাসের কথা কমবেশী সকলেরই জানা। এই নাটকের প্রথম অঙ্কে সেই বনবাসের আয়োজন খুবই কৌতুহলোদ্দীপক। ওদিকে দশরথের পুত্রদের জন্ম পরম্পরাও কম কৌতুহলের নয়। আমাদের পরিচিত রামায়ণ পরম্পরায় জন্ম অনুযায়ী প্রথমে রাম তারপরে ভরত। লক্ষ্মণ-শত্রুঘ্ন তার পরে জন্মেছেন। অথচ এই নাটকে তা নয়। এখানে লক্ষ্মণ ভরতের অগ্রজ। আশ্চর্যের বিষয় হল রামায়ণের কাহিনী পরম্পরার বদল কিন্তু রামকে নিয়ে যত কাহিনী রয়েছে তাতে দুর্লক্ষ্য নয়।
এমনিতেই আমাদের দেশে মহাকাব্যের অজস্র পাঠ থাকে, পাঠান্তর থাকে। অনুবাদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হয়ে যায়। রামকাহিনী নিয়ে সংস্কৃতেই আধ্যাত্ম রামায়ণ, বশিষ্ঠ রামায়ণ বা যোগবাশিষ্ঠ, লঘু যোগবাশিষ্ঠ, আনন্দ রামায়ণ, অদ্ভূত রামায়ণ ইত্যাদি বহুতর আখ্যান আছে। এই সাম্প্রতিক কালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটিতেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছে কমন এরা-র ষষ্ঠ শতকের একটি পুঁথি, যার নাম হল ‘দশগ্রীব রাক্ষস চরিত্রম বধ’। সেখানে বালকান্ড এবং উত্তরাকান্ড নেই। অর্থাৎ সাতকান্ড রামায়ণ বলে যা পরিচিত তার পাঁচ কান্ড আছে। নামটিও পৃথক। এ সবের বাইরে রয়েছে আজকের ভারতবর্ষ বলে যে ভূখণ্ড তার নানা আঞ্চলিক ভাষায় রামকাহিনী রচনা থেকে অনুবাদ। তারও পরে আছে ভারতের বাইরের নানা স্থানে নানা ভাষার রামায়ণ। যত কাহিনী ততই বিচিত্র তার পরিবর্তনসমূহ। কিন্তু পরিবর্তন যখন হচ্ছে তখন কয়েকটি ভাবনা আমাদের বোধগম্য হতে পারে। প্রথম ভাবনা হল আসলে রাম-সীতা-রাবণ এই কাহিনী নানা অঞ্চলে মুখে মুখে ঘুরতে থেকেছে বলে নানা অঞ্চলের কবিরা তাকে নিয়ে নানা কাহিনী বেঁধেছেন। অর্থাৎ শুরুতেই রাম-রাবণে দ্বন্দ্ব এবং রাবণের পতন ব্যতীত একটি মূল কাহিনী গড়ে ওঠেনি। অথবা মূল কাহিনী কোথাও গড়ে উঠলেও যে অঞ্চলেই সেই কাহিনী পৌঁছিয়েছে সেখানকার কবিগণ তাঁদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রেখে আরেক কাহিনী গড়ে নিয়েছেন। যে কোনো ভাবেই হোক, এ কাহিনীর পরিবর্তন জল-বায়ুর পরিবর্তনের মতন স্বাভাবিকই থেকেছে। তাই নাটককার ‘প্রতিমানাটকম’-এর প্রথম অঙ্ক শুরুই করছেন একটি অদ্ভূত চমক দিয়ে।

প্রথম অঙ্ক – ক্ষত্রিয় পরিবারে সম্পদের টানাপোড়েন এবং চরিত্ররা

ভাস রচিত বলে পরিচিত নাটকচক্রম-এর নাটকগুলিতে যেমন থাকে এখানেও তেমন ভাবেই প্রথম অঙ্ক শুধু। নান্দ্যন্তে ততঃ প্রবেশতি সূত্রধারঃ। নান্দী শেষে সূত্রধার প্রবেশ করলেন। ভাসের নাটকে নান্দী ‘পূর্বরঙ্গ’-এর অঙ্গ। নাটক নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক এই কামনায় দেবতাদের পূজা হয় এই ‘পূর্বরঙ্গ’ অংশে। এই অংশের পরে সূত্রধার মঞ্চে এসে নান্দী পাঠ করেন। তাই অন্যান্য সংস্কৃত নাটকে নান্দী লেখা থাকে। কালিদাসের ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম’ নাটকে যেমন শিবের নামে নান্দী সমাপ্ত হতে সূত্রধার প্রবেশ করেন। নান্দ্যন্তে সূত্রধারঃ। ভাসের ক্ষেত্রে নান্দী নয়, সূত্রধার মঞ্চে এসে যা বলেন তা কিছুটা মঙ্গলশ্লোকের মতন। এই নাটকে সূত্রধার এখানে প্রবেশ করে নানা উপমা-রূপক-অলঙ্কারে বাক্য সাজিয়ে রামের বন্দনা করলেন। সেই সঙ্গে এ নাটকের মূল চরিত্রদের কথাও বলে দিলেন। রাম-সীতা ছাড়াও লক্ষ্মণ, রাবণ, বিভীষণ সকলের উল্লেখ হল।
তারপরে এই নাটককার আবার ব্যতিক্রমী। তাঁর সম্পর্কে কোনো কথাই থাকে না সূত্রধারের মুখে। কালিদাসের মালবিকাগ্নিমিত্রম-ই যদি ধরি সেখানে তরুণ কালিদাস যে নাটকটির রচয়িতা তা অত্যন্ত সুচতুরভাবে সূত্রধার আর পারিপার্শ্বিক-এর সংলাপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কালিদাসের নাটক করা হবে শুনে পারিপার্শ্বিক মারিষ বলছে ভাস, কবিপুত্র, সৌমিল্ল এই সব তাবড় নাটককারেরা থাকতে সেদিনের কবি কালিদাসের রচনায় বিদ্বৎপরিষদের এত আদর হল কেন! সূত্রধর বলছেন, পুরোনো হলেই উৎকৃষ্ট নতুন হলেই নয় এ বুদ্ধিমানের বিবেচনা নয়। বুদ্ধিমান পরের মুখের ঝাল খান না। এভাবেই আমরা জেনে যাচ্ছি নাটকটির রচয়িতা কালিদাস। ভবভূতি তো নিজ বংশের উচ্চ গৌরবকেও এই অংশে প্রবেশ করিয়ে দিতেন। এ সব কিছুই ভাসের নাটক বলে পরিচিত এই নাটকে পাওয়ার যো নেই।
ওদিকে সূত্রধার মঙ্গলশ্লোক সেরে নটীকে ডাক দিলেন। ডেকে বললেন শরৎকালের উপযুক্ত গান করতে। এই গানের পরেই সূত্রধার ঋতুর বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংলাপ বলছেন। বলছেন কাশফুলের মত শুভ্রবর্ণা আনন্দিতা হংসী নদীতীরে বিচরণ করছে। এই সংলাপ যেন নাটকের আগামী অংশে সীতার উচ্ছলতা ও উজ্জ্বলতার চিহ্ন আগেই এনে দিল। তার মধ্যেই নেপথ্য থেকে আর্য আর্য ডাক আসে। সূত্রধার সে ডাক শুনে তাঁর ব্যবহৃত হংসীর উপমা পরিবর্তন করে বলেন, রাজবাড়িতে আনন্দিতা প্রতিহাররক্ষীর দ্রুতচরণে চলার কথা বলেন।
এ কথার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা দুজনে নিষ্ক্রান্ত হবেন। প্রবেশ করবেন প্রতিহারী এবং তারপরে কাঞ্চুকীয়। আমরা পৌঁছে যাচ্ছি নাটকের ‘স্থাপনা’ অংশে, যেখানে বিষয়বস্তুতে নাটক পৌঁছে গেল। ভরত রচিত নাট্যশাস্ত্রের নিয়ম খাটলে এখানে ‘স্থাপনা’-র বদলে ‘প্রস্তাবনা’ বলতে হত। ভাস, সে সব নিয়ম মানেন না বলে দুটি মত আছে। প্রথম মতে, ভাসের আমলে ভরতের নাট্যশাস্ত্র প্রচলিত ছিল না। অন্য মতে ভাস নিজেই একটি নাট্যশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। তার অবশ্য প্রমাণ মেলে না। এর বাইরে এমনও হতে পারে যে সে সময় ভিন্ন কোনো নাট্যশাস্ত্র প্রচলিত ছিল যা আর পরে পাওয়া যায়নি।
যাই হোক, আমরা জানতে পারছি দশরথ আদেশ করেছেন রামের রাজপ্রভাব প্রকাশের উপযোগী অভিষেকের উপকরণ আনার। অর্থাৎ রামাভিষেক হবে এবারে। অভিষেকের সব আয়োজন সম্পূর্ণ হয়েছে। জানালেন কাঞ্চুকীয়। কাঞ্চুকী বা কাঞ্চুকীয় হলেন নিষ্কাম, সত্যপরায়ণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী রাজকর্মচারী। তিনি জানাচ্ছেন, চামর, রাজছত্র, আনন্দ পটহ সব প্রস্তুত। তীর্থবারিতে পূর্ণ ঘটগুলি কুশ ও কুসুমে আস্তীর্ণ। পুষ্পরঙ্গ বা মঙ্গলরথ প্রস্তুত। মন্ত্রিগণ ও পৌরবর্গ উপস্থিত। উপস্থিত আছেন এ সবের মঙ্গলদায়ক বশিষ্ঠ। এ সব কথা শোনার পর প্রতিহারী দ্রুত মাননীয় পুরোহিতের কাছে সংবাদ পাঠান। সঙ্গে আরেকটি আদেশ যায় সঙ্গীতশালায়, নটনটীদের জন্য। দ্রুত এই অভিষেকের সময়োপযোগী নাটক অভিনয়ের প্রস্তুতি নিতে বলা হয় তাঁদের। দেখার বিষয় নাটককার কিন্তু নাটকের মধ্যেই সমাজে নাট্যকলার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। পুরোহিত এবং নটনটীদের একত্রে আদেশ পাঠিয়ে মর্যাদাও সমানই করে তুললেন। দু’পক্ষই অপরিহার্য এ ভাবনা প্রচ্ছন্নে হলেও থেকে যাচ্ছে। যাই হোক, কাঞ্চুকীয় এবং প্রতিহারী দুজনেই প্রস্থান করলেন একে একে। অবদাতিকা প্রবেশ করলেন।
অবদাতিকা (দাঁত সামান্য চাপা বলে এমন নাম সম্ভবত) এসেছেন নাট্যশালা থেকে বল্কল চুরি করে। পরিহাসছলেই করেছেন এ কাজ। নটনটীদের সাজ-সজ্জার যে নেপথ্যালয় তার দায়িত্বে থাকা পালিকা রেবার কাছে তিনি একটি পল্লব চেয়েছিলেন। রেবা সে পল্লব দেননি বলে অবদাতিকা, যিনি সীতার এক পরিচারিকা, তিনি বল্কল নিয়ে চলে এসেছেন গোপনে। পরিহাস করে পালিকার দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি ঘটাবেন বলে। নিয়ে এসে একা একা হাসছিলেন। আবার একা একা হাসা দেখলে লোক কী বলবে ভেবে হাসি চাপার চেষ্টাও করছিলেন। এই অবস্থায় সীতা বাকী পরিজনদের নিয়ে প্রবেশ করেন।
অবদাতিকার হাতে বল্কল দেখে এবং ঘটনাক্রম জেনে সীতা প্রথমে নাট্যশালায় সে বল্কল ফিরিয়ে দেবার আদেশ দেন। তারপরে বল্কলটি দেখে তাঁর পরিধানের শখ হয়। তাঁর পরিধানে বল্কল যেন সোনা হয়ে ওঠে। অবদাতিকা বলে। চেটী (ইনিও পরিচারিকা) সীতারই নির্দেশে আয়না আনতে গিয়ে শুনে আসে কার অভিষেকের কথা। সীতা সে সব কিছুই জানেন না। তাঁর উৎসাহও নেই। বলছেন, রাজ্যে কার যেন অভিষেক হবে। তখনই আরেক চেটী এসে জানায় কুমার রামের অভিষেক। সীতা আগে দশরথের স্বাস্থ্যের সংবাদ নেন। তারপরে দশরথ সুস্থ অবস্থায় নিজেই রামের অভিষেক করাচ্ছেন শুনে চেটীকে নিজের শরীরের অলংকার দান করেন। এমন সময় একবার আনন্দ পটহ বেজে উঠে থেমে যায়। সেই শুনে বাকীরা উদ্বিগ্ন। সীতা জানতে চাইছেন, অভিষেকের প্রতিবন্ধ ঘটলো কী না! বলেই বলছেন, রাজ্যে কত কীই হয়! আরেক চেটী জানাচ্ছে দশরথ রামাভিষেকের পরে বনে যাবেন। সেই শুনে সীতা দুঃখিত হচ্ছেন অভিষেকে।
এই গোটা অংশটিতেই ভাসের সীতা রাজ্যবিষয়ে প্রায় নিরুদ্বিগ্নমনা। রামের অভিষেক জানেন না তিনি। অভিষেক কার হল তাতে তাঁর এমনিতে কিছু যায় আসে না। রামের অভিষেকের চাইতেও শ্বশুরের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত। অভিষেক হলে শ্বশুর বনবাসে যাবেন বলে দুঃখিত। অর্থাৎ আর পাঁচজন রাণীর মত সীতা যে না, তা শুরুতেই ভাস বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। সুখী, আনন্দময় একটি দৃশ্য রচনা দিয়ে তিনি শুরু করেছেন এই অঙ্ক যাতে পরবর্তী বেদনা যথাসাধ্য গভীর হয়ে ওঠে। তা করতে গিয়ে সীতাকে স্বাভাবিকতার কিছুটা বাইরে নিয়ে চলে এসেছেন ভাস। অবদাতিকার যে স্বাভাবিকতা, চাপল্য, প্রাণময়তা তা সীতাকে বল্কল পরিধানের ইচ্ছেতে সামান্য ছুঁয়েই অদৃশ্য হয়ে গেছে। সীতার এই স্বভাব বৈশিষ্ট্য ভাসের ইচ্ছাকৃত সৃষ্টিই। তার প্রমাণ আমরা খানিক পরেই পাব।
এখানে রাম প্রবেশ করবেন। স্বগতোক্তি এবং সীতা ও পরিচারিকাদের সঙ্গে কথোপকথনে প্রকাশ করবেন অভিষেকের বৃত্তান্ত। সরাসরি অভিষেক দৃশ্য ভাস আনেননি। রাম বলছেন সভাতে তাঁকে সকলের সামনে ডেকে কোলে বসিয়ে দশরথ রাজ্যের ভার গ্রহণ করতে বলেছিলেন। রাম কি করলেন শুনে? সীতাকে জিজ্ঞাসা করতে সীতা বললেন রাম নিশ্চয়ই সে সময় দশরথের পদমূলে লুটিয়ে পরেন। এখানেই ভাস রামের মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন তিনি ও সীতা স্বভাবের দিক দিয়ে একই রকম। এমন দম্পতি বিধাতা খুব বেশী সৃষ্টি করেননি। এই সংলাপের জন্যই ধীরে ধীরে ভাস সীতার চরিত্রকে নির্মাণ করেছেন।
এ নাটকে রাম নির্লিপ্ত। দশরথ তাঁকে রাজ্যের জন্য অভিষিক্ত করতে গিয়েছিলেন। হলেন না অভিষিক্ত। নাটককার লিখছেন রামের জবানীতে, ‘লক্ষ্মণ-শত্রুঘ্ন ঘট ধরে দাঁড়িয়ে আছে, মহারাজ ধরে আছেন রাজছত্র, অভিষেক শুরু হবে হবে, এমন সময় মন্থরা এলেন। রাজা দশরথের কানে কানে কী যেন বললেন। আমিও আর রাজা হলাম না’।
“শত্রুঘ্ন-লক্ষ্মণ-গৃহীত ঘটে(হ)ভিষেকে।
ছত্রে স্বয়ং নৃপতিনা রুদতা গৃহীতে।।
সম্ভ্রান্তায়া কিমপি মন্থরয়া চ কর্ণে।
রাজ্ঞঃ শনৈরভিহিতং চ ন চাস্মি রাজা।।”
রাজ্য পেলেন না। তার জন্য পৃথক কোনো দুঃখ নেই রামের। কিছু বা উদাসীনই যেন। সীতাও বলছেন, যে রাম সে রামই থেকে গেলেন, মহারাজ মহারাজই থেকে গেলেন। পিতা দশরথই তো মহারাজ। সমস্যার কীই বা আছে! বরং ভাল হল। তিনি বাল্যকালের মতই থাকতে পারবেন। দশরথকেও বনবাসে যেতে হবে না।
এ সব কথাবার্তার মধ্যেই রাম লক্ষ্য করছেন, সীতার অলঙ্কারহীনতা। সীতা কেন অলঙ্কার খুলে ফেলেছে জানতে চাইছেন! সীতা বলছেন তিনি অলঙ্কারই পরেননি। ছোট্ট অংশ। কিন্তু নিখুঁত নাটককারের খুঁটিনাটি জ্ঞান। সীতা কানের দুল খুলে ফেলেছেন তাড়াতাড়ি। তাই দু’কানের লতিগুলো বাঁকা হয়ে আছে সামান্য। জোর করে হাতের অলঙ্কার খুলেছেন বলে হাতের তালু রাঙা তখনো। অলঙ্কারগুলি শরীরে নানা স্থানে চেপে বসে থাকে। সামান্য ক্ষণ আগে খুলেছেন বলে ত্বক থেকে সেই চাপের চেহারা অপসৃত হয়নি। সীতা, রামের অভিষেক সংবাদে খুশী হয়ে অলঙ্কার দান করেছিলেন। এ সংক্রান্ত লজ্জা এড়াতে রামের কাছে ঘুরিয়ে অস্বীকার করছেন তাঁর গহনা পরার কথা। রাম তখন বলছেন সীতাকে গহনা পরতে, তিনি আয়না ধরছেন। আয়নায় যখন সীতা প্রতিবিম্বিত হলেন তখনই রামের চোখ গেল সীতার বল্কলের দিকে। ঘটনা-পরম্পরায় এমন খুঁটিনাটিতে দেখছেন নাটককার এবং দেখাচ্ছেন।
অর্থাৎ প্রথমে রাম প্রবেশ করছে্ন। তারপরে তাঁর মন যে চিন্তায় ব্যস্ত তা নিয়ে আলোচনা করছেন। অন্যের উপস্থিতি তাকে ক্রমে ক্রমে নিজের বাইরের জগত সম্পর্কেও সজাগ করছে। সজাগ করছে বলে তার চোখ পড়ছে অলঙ্কারের দিকে। যা থাকাটা স্বাভাবিক ছিল, অথচ নেই। এই নেতির-এর বোধ এবং শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেক পরিধান বস্ত্রের প্রতি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টি চলন হচ্ছে তাঁর। অর্থাৎ ভাবজগতের বস্তু থেকে বস্তুজগতের ভাবে সম্পূর্ণ যাত্রা করছেন রাম। নাটককার, মনুষ্যচরিত্র এবং লেখনির নানা স্তর সম্পর্কে এতটাই জ্ঞাত যে কোথাও এ সব কিছুকে আরোপিত মনে হচ্ছে না। সহজ স্বাভাবিকতায় নদীটির মত বয়ে চলেছে। সংলাপ বহুলতা নেই। ঘটনা বহুলতাও নেই। নাটক, এই দুই শক্তির মধ্যে অসামান্য ভারসাম্য রেখে চলেছে।
কিন্তু আয়নায় দেখলেন কেন? আগে কেন দেখলেন না? দৃশ্যত উপস্থিত সীতার বিপরীতে এই আয়নার সীতা। একাধারে দুই সীতাকে তৈরী করছেন রাম। আয়না প্রতিফলিত করে। এখানে সেই প্রতিফলন তাঁর এবং সীতার ভবিষ্যৎ-এর। এ যেন সেই জাদুবিদের মতন যিনি নখের দর্পণে, জলের দর্পণে ভবিষ্যৎ দেখতে সক্ষম। দর্পণ ভবিষ্যৎকে প্রতিফলিত করে এই জাদুবিশ্বাসই যেন নাটকে দৃশ্যের চেহারা নিয়েছে।
জাদুবিশ্বাস মানুষের একেবারেই আদিম ধর্মীয় পদ্ধতি। কালে কালে জাদুবিশ্বাসের স্তর থেকে সে দেব-কল্পনার স্তরে আসবে। আমরা যদি লক্ষ্য করি, এই ভূখণ্ডের প্রাচীন সাহিত্য নিদর্শনের চেহারাকে তথা বেদ-কে তাহলে কিন্তু আরেকটি বিচিত্র যাত্রার চেহারা আমরা পেতে পারব। প্রথম বেদ, ঋগ্‌বেদ, মুখ্যত দেবকল্পনার স্তর থেকেই শুরু হচ্ছে। দেব অগ্নি থেকে ইন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি সেখানে স্পষ্টতই প্রতীয়মান। অর্থাৎ যে সমাজ (মুখ্যত পশুপালক) এই বেদ সৃষ্টি করছে সেই সমাজে জাদুবিশ্বাসের আদিম দশাটি আর নেই। ভিন্নতর এক বিশ্বাস স্পষ্ট হচ্ছে। দেবতা সৃষ্টি করা মানে একদিকে মানুষের সম্পদ এবং শাসন সংক্রান্ত কিছু দর্শন সৃজিত হওয়াও। কেন না দেবসমাজ ও তার নিয়ম-কানুন তখনই মানুষ ভাবতে পারবে, যখন সে নিজের সমাজে সমাজ গঠন ও নিয়ম-কানুন নিয়ে যথেষ্ট ভেবে ফেলেছে। এবং পশুপালক বলে পশুযাগই তার কাছে প্রধান। তাই ঋগ্‌বেদ-এ পশুবলির এত বিস্তার।
এবারে দেবকল্পনার স্তর এসে গেলেই পূজাপদ্ধতি ইত্যাদি এসে যায়। পশুযাগ-এর সঙ্গে সোম এবং ইষ্টি যাগ (সত্র বলে অন্য যজ্ঞ পদ্ধতি এখন বাদ রাখছি) এসে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। সাম, সোম এবং ইষ্টি-র সঙ্গেই যুক্ত। সোম, ইন্দো-ইরাণীয় ‘হওম’-এর ধারাতেই সম্ভবত এ ভূখণ্ডে এসেছে। এখানে সোম একপ্রকার পানীয় – যা উত্তেজক, নেশাপ্রদ এবং বিভ্রম উৎপাদনকারী। আর ইষ্টি-র যজ্ঞগত অর্থ ছাড়াও অভিলাষ বা ইচ্ছা অর্থও বহু ব্যবহৃত। দুটিই পরোক্ষে কৃষিজীবি সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত। পশুযাগে তাই সামের প্রয়োজন না থাকলেও সোম এবং ইষ্টিতে প্রয়োজন ছিল এঁদের।
সামের বৈশিষ্ট্য হল, এ সুর সম্বলিত এবং মুখ্যত ঋগ্‌বেদের নবম মণ্ডল (কয়েকটি অন্যান্য কিছু মণ্ডল থেকেও নেওয়া) বা প্রাচীন অংশ থেকে নেওয়া। সামগান। অর্থাৎ গেয় এটি। শারীরিক ও বাচিক ভাবে সম্পাদন ও প্রয়োগ যোগ্য। ফলে সামবেদ ঋক্‌-এর মন্ত্রের সুর সংযুক্ত অংশ। এবং অবশ্যই সোমযাগের সঙ্গে এর নিকট সম্পর্ক আছে। অবশ্যই নৃত্যের (নাচ) এবং পরবর্তীতে নৃত্তের (অভিনয়) অংশও তাতে প্রভাব ফেলছে। এ কথা বলার কারণ ছান্দোগ্য উপনিষদে ‘শৌব উদ্‌গীথ’, অর্থাৎ কুকুরদের সামগান’। তার অংশটি সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখায় এখানে তুলেই দিই।
‘বকদলভ্য-দলভ্য ও মিত্রার ছেলে বক, ওরফে গ্লাব নামে এক ঋষি, বেদ অধ্যয়নের জন্যে গ্রাম থেকে নিৰ্গত হলেন। তাঁর সামনে একটি সাদা কুকুর দেখা দিল। তার কাছে অন্য কুকুররা এসে বলল, ‘মহাশয়, আপনি গান করে অন্নের সংস্থান করুন, আমরা ক্ষুধার্ত’। সেই শাদা কুকুরটি তাদের বলল, ‘কাল সকালে তোমরা এই জায়গাতেই আমার কাছে এস’। পরদিন বকদলভ্য (মিত্রার পুত্র) গ্লাবও সেইখানে তাদের জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন। তখন (যজ্ঞে) বহিস্পবিমান স্তোত্র গানের সময়ে যেমন (সামবেদের স্তোতারা) পরস্পরের সংলগ্ন হয়ে (যজ্ঞভূমিতে) পরিক্রম করেন, সেই রকম কুকুরগুলি (পরস্পরের লেজ ধরে?) প্রদক্ষিণ করল। তার পর বসে পড়ে হিংকার উচ্চারণ করল। ওমা খাব, ওম পান করব, ওম দেবতা বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা এখানে অন্ন আনুন, অন্নপতি!! এখানে অন্ন আনুন।’
আমরা অন্নের কথায় এখন থাকছি না। বরং খেয়াল করে দেখি শাদা কুকুর (অর্থাৎ শ্বেত চামড়ার আর্য) নেতৃত্বে। অন্য কুকুরেরা, ঋগ্‌বেদের ধারা ধরলে এখানে সম্ভবত কৃষ্ণাঙ্গই। অশ্বেত বা কৃষ্ণ ও বাদামীদের জন্য ঋগ্‌বেদে ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য সহকারে কৃষ্ণাঙ্গ আখ্যাটি রয়েছে। প্রাগার্যদের সঙ্গে তথাকথিত আর্য সম্পর্ক এখানে প্রতিফলিত হচ্ছে। আর যা হচ্ছে তা হল নৃত্য-নৃত্ত বা নাট্যক্রীড়ার আদি যাজ্ঞিক রূপ। বহিস্পবিমান’ স্তোত্র গাইবার সময়ে পুরোহিতরা ঝুঁকে নীচু হয়ে যজ্ঞস্থলে প্রবেশ করে, এবং পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকে। প্রদক্ষিণ করার কথাও আছে। অর্থাৎ গীত ও নৃত্য ভঙ্গীমা ও অভিনয় সংযুক্ত নাট্যক্রীড়ার একটি প্রাচীন ছাপ এখানে আমরা পাচ্ছি। সোম, বেদাদি ও যজ্ঞের মধ্যে এই উপাদানকে নিয়ে আসছে।
যজুর্বেদ এবং অথর্ব দুটিই মন্ত্রের গোপনীয়তা, নানা প্রাচীন জাদুবিশ্বাসকে আবার ফিরিয়ে আনা ইত্যাদির কাজ করছে। যজুর্বেদের সময়কালে কৃষি প্রযুক্তির অনুন্নত অবস্থা, আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীলতা ইত্যাদি যদি মন্ত্র গোপনীয়তার একটি কারণ হয়, অন্যটি হল সমাজে সম্পদ বিভাজন খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদা পশুপালকদের ভ্রাম্যমাণ গোষ্ঠীকে গ্রাম দিয়ে চিহ্নিত করা হলেও। যজুর্বেদ পর্যায়ে সে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনবসতি, যার মাথায় রাজা বা গোষ্ঠীপতি। আর জাতিভেদ সুস্পষ্ট।
অথর্ব প্রথম পর্যায়ে বেদ বলে স্বীকৃত না থাকলেও কালে কালে সোমযাগের কিছুটা প্রতিস্পর্ধী অগ্নিযাজী, প্রাচীন চিকিৎসক (দেব অশ্বিনরাও শূদ্র বলে বিবেচিত হতেন মনে রাখলে সুবিধে হবে এখানে) ইত্যাদিদের প্রতিনিধি হয়ে এই বেদ জায়গা করে নিল। শুধু তাই নয় – ভার্গব, আঙ্গিরস, অথর্ব (বৃদ্ধই শুধু নয়, অগ্নিবাচক প্রাচীন পারসিক শব্দ অত্‌র-এর সঙ্গে এর ঘোর সম্পর্ক) ইত্যাদিরা এই বেদটিকে নিজেদের দাপট ক্ষেত্র করে তুললেন। সুকুমারী ভট্টাচার্য থেকেই সামান্য উদ্ধৃতি দিই।
“খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শেষদিকে যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উত্থান হচ্ছিল, নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরণের জন্য অলৌকিক সহায়তা লাভের আশায় রাজারা কোনও জাদুকরকে রাজসভা ও রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরোহিতরূপে নিয়োগ করতে বিশেষ উৎসুক ছিলেন। গ্রামের ‘শামান’ বা জাদু-পুরোহিতই এই মহিমান্বিত শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছিলেন, এমন মনে করার কারণ নেই। তাদের মধ্যে যে সমস্ত পুরোহিতেরা আধ্যাত্মিক ও ঐন্দ্ৰজালিক রহস্য বিদ্যায় পারঙ্গম হয়ে উঠতেন, কেবলমাত্র তাদেরই রাজ-পুরোহিতরূপে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হ’ত, কিন্তু শামান পুরোহিত তার গ্রামবাসী যজমানদের মধ্যেই রয়ে যেতেন অনেকটা বর্তমান ওঝার ভূমিকাতে।” অর্থাৎ জাদুবিশ্বাস থেকে দেবকল্পনায় এসে আবার ফিরে যাওয়া হল জাদুবিশ্বাসেই।
রামেয় আয়না ধরার মধ্যে দুটির সম্পর্ক কেমন? শিবপুরাণ বলছে, সতী শিবের সঙ্গে তুমুল কামক্রীড়ার পরে নিজের মুখ দেখছেন দর্পণে। শিব, উঁকি মেরে সতীর পাশে নিজের মুখ দেখছেন। ব্রহ্মা এ কাহিনী বলছেন নারদকে। এ দর্পণ কাচের হতে হবে তার মানে নেই। আগের কালে কাচ বানানোর পদ্ধতি যখন ছিল না বা করা যেত না, তখন নানা ধাতু থেকে অসামান্য দর্পণ তৈরী হত। এখনো হয় ত্রিবাঙ্কুরের কাছে আরামুলায়। শিল্পশাস্ত্র বলছে দর্পণ, দেব-দেবীর হাতের অন্যতম আয়ুধ। আবার ব্যাকরণ (যা বিশ্লেষণ মূলক) তার টীকাকেও দর্পণ বলা হচ্ছে অনেক সময়। যেমন হরিবল্লভ বা মন্নুদেবের ‘দর্পণ’। আবার ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম কীর্তি বিশ্বনাথ কবিরাজের ‘সাহিত্য দর্পণ’-ও পূর্বাচার্যদের মত ‘প্রস্থান’ নয়, দর্পণ শব্দটিই গ্রহণ করেছে।
আত্মজ্ঞানের জন্য বিশ্লেষণ এবং তার ব্যাখ্যা দুই-ই প্রয়োজন। রাম-সীতা, শিব-সতী প্রকল্পেও যেমন এই নাটককারের কল্পনায় যথোপযুক্ত তেমনই ভবিষ্যৎ-এর বাস্তবতা নির্মাণেও প্রয়োজনীয়। সুখের সময় দর্পণে দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ অতিক্রান্ত। সীতার বাস্তবিক বল্কল পরিধানে চোখ পড়েছে রামের। সেই ক্ষণের জন্য তা যেমন বাস্তবিক, তেমনই ভবিষ্যৎ-এর সুষ্পষ্ট আগমন চিহ্নও। দৈবী মহিমার জন্য আনা দর্পণ এখানে জাদুবিশ্বাসের মহিমা থেকে কঠোর বাস্তবতায় নিয়ে এসেছে আমাদের। ভার্গবাঙ্গিরসদের জাদুবিশ্বাস মূলক প্রকল্পটিকে নাটককার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে চললেন ভিন্ন পথে। সে পথ কোথায় যাচ্ছে তা আমরা জানবো ধীরে ধীরে।
অবদাতিকার কাছে শুনছেন যে কৌতুহলের বশে এবং কৌতুক করেই পরেছেন বল্কল সীতা। ইক্ষ্বাকু বংশের বার্ধক্যের পোষাক সীতা যৌবনেই পরেছেন বলে, রাম নিজেও পরতে চাইলেন। সীতা, ততক্ষণে, অভিষেক না হওয়াকে অমঙ্গলের চিহ্ন ভাবতে শুরু করেছেন। তার সঙ্গে এই বল্কল পরায় রামের সাধ মানতে পারলেন না। তিনি বারণ করছেন। তার মধ্যেই জানা যাচ্ছে একে একে আরো দুঃসংবাদ। কাঞ্চুকীয় এসে একে একে জানাচ্ছেন। কৈকেয়ীর কথাতেই রামের রাজ্যাভিষেক হল না। রাম বলছেন, ভায়েদের ভোগসুখও রইল, দশরথকে বনেও যেতে হল না। এতো ভালই। কাঞ্চুকীয় জানাচ্ছেন ভরতকে চেয়েছেন কৈকেয়ী, সিংহাসনে। রাম এতেও অন্যায় কিছু দেখছেন না। পুত্রের জন্য পণে প্রতিশ্রুত রাজ্য চাওয়া কৈকেয়ীর অন্যায় নয়। কিন্তু এখানে নাটককার খানিক গাফিলতিই করেছেন। কৈকেয়ী পণের প্রতিশ্রুতিতে রাজ্য চেয়েছেন, এ সংবাদ তার আগে কোথাও নেই। সুতরাং, রাম এ সিদ্ধান্তে যুক্তিসম্মত পথে উপনীত হলেন না। এমনও হতে পারে, যে পুঁথি পাওয়া গিয়েছে তাতে এই অংশের মধ্যে কিছু প্রক্ষেপ ও পরিবর্তন হওয়াতে এমন গুরুতর তথ্য বিভ্রাট হয়েছে। নতুবা এতদ্‌ অংশ অবধি কোনো ইঙ্গিত ছিল না, নাটককার এমন একটি কাঁচা ভুল করতে পারেন।
যাই হোক, পরের সংবাদ হল দশরথ মূর্চ্ছিত। এই শুনতে শুনতেই লক্ষ্মণের আগমন। তিনি অতি ক্রুদ্ধ। স্বজনদের অত্যাচার সইবেন না। ধনুর্ধারণের কথা বলছেন। যেহেতু যুবতী (কৈকেয়ী) তাঁদের বঞ্চনার কারণ তাই তিনি পৃথিবীকে যুবতীহীন করবেন বলেও ঘোষণা করছেন। এ অংশটিও বেশ দুর্বল। নাটককার নিজেই হোন, কী পরবর্তী কালের প্রক্ষেপকারীরা, এখানে নিতান্তই দুর্বল প্রকল্প ফেঁদেছেন। প্রথমত রাজ্য গিয়েছে রামের, তাতে লক্ষ্মণের বঞ্চনা কিসে? তিনি স্বয়ং পরে রামের সঙ্গে বনে যেতে চাইবেন ইত্যাদি সে অন্য কথা! কিন্তু এর আগে নাটককার কোথাও রাম-লক্ষ্মণ এবং ভরত-শত্রুঘ্ন দুই পৃথক জোট, এমন উল্লেখ করেননি। রামায়ণের প্রচলিত পাঠ থেকে আমরা জানি এমন জোট দশরথের সংসারে হয়ে আছে। সে জানা নাটকে তখনো প্রতিফলিত নয়। দ্বিতীয় অঙ্কে তার বিস্তার কিছু আমরা পাব। দ্বিতীয়ত, যুবতী শূন্য করতে হলে সীতা-ঊর্মিলা ইত্যাদিরা বাদ যাবেন কেন? তৃতীয়ত, কৈকেয়ী যুবতী, অর্থাৎ কৌশল্যা-সুমিত্রার তুলনায় কম বয়সী, এ তথ্যের মাধ্যমে দশরথের তাঁর প্রতি কামের আকর্ষণের ইঙ্গিত যদি দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে সে ইঙ্গিতেরও পূর্বাপর নেই। তাই অযৌক্তিক উল্লেখ হয়ে রইলো। চতুর্থত, প্রচলিত রামায়ণে লক্ষ্মণ শূর্পণখা এবং অয়োমুখীর নাক-কান-স্তন ইত্যাদি ছেদন করেছেন। নারীর উপর হওয়া আচরণ হিসেবে সর্বত্র এ ভাল ভাবে গৃহীত হয়নি।
মনস্ত্বাত্বিক ভাবে কৈকেয়ীর তাঁদের প্রতি আচরণ, দশরথকে কাম দ্বারা নিয়ন্ত্রণ – এ সকল লক্ষ্মণকে পরবর্তী রাক্ষসী নারীদের ক্ষেত্রে প্রতিহিংসার জন্য পরিচালিত করেছে এমন সূত্র টানা চলতো হয়তো বা। কিন্তু এ নাটকে শূর্পণখা বা অয়োমুখী বধের প্রসঙ্গই তো নেই। সুতরাং, এও এখানে বাহুল্য মাত্র। আর নারীর অঙ্গচ্ছেদন না হলেও নারী হত্যা তো রামও করেছেন। তাটকা রাক্ষসী বধ করেছেন, কৈকেয়ী-মন্থরার ষড়যন্ত্রের আগেই। নাটককারের বা প্রক্ষেপকারীদের যদি লক্ষ্মণের নারীর প্রতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৈকেয়ীর অভিজ্ঞতাকে দায়ী করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে রামের তাটকা বধের ক্ষেত্রে গুরুর আদেশই বা যথেষ্ট হয় কেমন করে? এ কারণেও এ খানিক অত্যুক্তি হয়ে থেকেছে।
যাই হোক, লক্ষ্মণের এই ক্রোধকে ধীরে ধীরে শান্ত করেন রাম। যুক্তি দিয়ে তাঁকে বোঝান যে দশরথ, ভরত বা কৈকেয়ী কাউকে হত্যার পাপই লক্ষ্মণ যখন করতে পারবেন না, তখন এ ক্রোধ পরিত্যাগ করাই উচিত। লক্ষ্মণ অভিমান করে বলেন এ সব কোনোটাই নয়, রাম যে নির্বাসিত হয়েছেন, সেই-ই তাঁর ক্রোধের কারণ। এতক্ষণে রাম এবং দর্শকেরা সকলেই জানলেন অভিষেক বন্ধের কারণ ও ফলাফল। রাম বনে যাবার জন্য বল্কল চাইলেন। যে বল্কল এ অঙ্কে লঘু কৌতুকের সূচনা করেছিল, সেই বল্কলই অবশেষে বিষাদের চিহ্ন হয়ে দাঁড়ালো। নাটককারে মুন্সীয়ানা এ ক্ষেত্রে চমৎকার! একে একে সীতা ও লক্ষ্মণকে নিবারণ করে ব্যর্থ হলেন রাম। তাঁরা দুজনেই তাঁর অনুগামি হবেন।
তাঁরা বেরোলেন রাস্তায়। অযোধ্যার রাস্তা অবরুদ্ধ। লক্ষ্মণকে দায়িত্ব নিতে হল সেই অবরোধ ঠেলে পথ করার। সীতাকে রাম আদেশ করলেন অবগুন্ঠন উন্মোচন করার। তাঁরা বনগমন করছেন। অযোধ্যাবাসীরা, সীতাকে দেখতেই পারেন। কারণ যজ্ঞানুষ্ঠানে, বিবাহে, বিপদে এবং বনগমনে নারীদর্শন দূষণীয় নয়। কিন্তু সীতার এই ঘোমটা খোলানোর কারণ এই অঙ্কে আমাদের কাছে একেবারেই পরিস্কার হল না। সমাজাচরণের এই নির্দেশ রামের মুখ দিয়ে দর্শকদের জানালেন নাটককার, এই মাত্র আমরা বুঝলাম। নাটকীয় কিছু সিদ্ধ হল বলে মনে হল না। কাঞ্চুকীয়, তার মধ্যে প্রবেশ করে দশরথের রাম-সন্দর্শনে আসার কথা জানালেন। কিন্তু রাম-লক্ষ্মণাদি বনের পথেই চললেন। এখানে প্রথম অঙ্ক সমাপ্ত হল।
প্রচলিত রামায়ণ ভাষ্য থেকে এ অঙ্ক অনেক দূরের। সেখানে ব্যক্তির চিত্ত-বিচলন সূত্রে এতবড় কাহিনী বয়ানের প্রয়াস নেই। কারণ সে নাটকের তুলনায় গম্ভীর, বিস্তৃত তার পরিসর। দশরথ, জনকের রাজ্য থেকে পুত্রদের বধুগণসহ নিয়ে অযোধ্যা এসেছেন। পথে রাম, জামদগ্ন রামকে পরাভূত করেছেন। রাম মহিমা, দশরথ, পুত্রগণ এবং স্ত্রী-গণ সকলেই দেখেছেন আবার। রাজ্যে এসে কিছুকালের মধ্যেই দশরথ প্রথমে ভরত-শত্রুঘ্নকে পাঠাচ্ছেন তাঁদের মাতুলালয়ে। ভরতকে, বলছেন মাতুল কেকয়-রাজপুত্র যুধাজিৎ-এর সঙ্গে যেতে। ভরত নিয়ে যাচ্ছেন শত্রুঘ্নকে। তারপরে মন্ত্রীদের জানালেন তাঁর বয়স হচ্ছে, অতএব সর্বগুণসম্পন্ন রামের যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হওয়ার প্রয়োজন। মন্ত্রীরা নানা নগর ও জনপদের প্রধান প্রধান লোকেদের ডেকে আনালেন। কিন্তু দশরথ কেকয়রাজ এবং মিথিলারাজকে সংবাদ দেওয়া যুক্তিসিদ্ধ মনে করলেন না। রামাভিষেকের পরে সে সংবাদ তাঁরা জানবেন।
কেন? এত বড় অনুষ্ঠানে সদ্য কুটুম্ব এবং দীর্ঘকালের কুটুম্ব আমন্ত্রণ পাবেন না? এখানেই মহাকাব্য তার পরিণতির দিকে সযৌক্তিক পথে এগোচ্ছে। কারণ এখনি না লিখে আমরা আরেকটু কাহিনীকে ধরে থাকি। সভা ডেকে, দশরথ তাঁর মনোবাসনা জানালেন। কিন্তু আদেশ করলেন না। বরং এ ভাবনা ছাড়াও অন্য কারো কোনো ভাবনা আছে কী না জানতে চাইলেন! রাজনীতির ক্ষেত্রে এও এক দেখার বিষয়। দশরথ, রাজা হলেও, রাজ্যের গুরুতর সিদ্ধান্ত একা নিয়ে অন্যের উপরে সরাসরি চাপিয়ে দিচ্ছেন না। বরং শাসিত প্রজাগণও যে অত্যন্ত গুরুত্বের তা তাঁদের মতামত চাওয়ার মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। অর্থাৎ যে সময় এ কাহিনী রচিত, তখনো রাজার ভূমিকা সম্পূর্ণ স্বৈরাচারী একনায়কে পরিণত হবার জায়গায় পৌঁছোয়নি। অন্য আরেকটি কারণের কথাও আমরা কিছু পরে আলোচনা করব।
মতামত চাইতে সকলেই রামের পক্ষে যখন মত দিলেন, দশরথ এক কথায় মেনে নিলেন না। তাঁরই মনোগত ইচ্ছা সম্পর্কেও তিনি ভাণ করলেন সংশয়িত হবার। জানতে চাইলেন, তিনি নিজে জীবিত। ধর্মানুসারে শাসন করছেন। তাহলে রামকে রাজপদে অধিষ্ঠিত হতে দেখতে চাইছেন কেন সকলে? এর উত্তরে উপস্থিত সকলে রামের বীরত্ব থেকে তাঁর তৎকালেই প্রজানুরঞ্জন ভাব ইত্যাদির প্রবল প্রশংসা করে দশরথের কাছে রামকেই যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করার দাবীই জানালেন প্রায়। দশরথ আনন্দিত হয়ে যৌবরাজ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের আদেশ দিলেন। মুনি বশিষ্ঠ, বামদেব এঁদের উপস্থিতিতেই এ সব হল।
এরপরে পরপর দুটি ঘটনা ঘটবে যা বেশ কৌতুহলজনক। একবার রামকে ডেকে দশরথ তাঁর প্রধান মহিষী কৌশল্যার পুত্র এবং রাজ্যশাসনযোগ্য গুণবান বলে তাঁকে যৌবরাজ্য গ্রহণ করতে বলবেন। রাম সে সব শুনে চলেও যাবেন। কৌশল্যা, সে সংবাদে ধনদান করবেন। তারপরেই দশরথ মন্ত্রীদের ডেকে দ্রুত বলবেন পরের দিনই অভিষেক হবে রামের। আয়োজন করতে বলে সারথী সুমন্ত্রকে দিয়ে আবারও রামকে ডাকবেন। রাম এলে তাঁকে যা বলবেন, তার মধ্যে অন্যতম গুরুতর কথা হল, ভরত-শত্রুঘ্ন এখন নেই। এই সময়েই তাঁর অভিষেক হোক তিনি চাইছেন। শুধু তাই নয়, ভরত যে অতিসজ্জন, রামানুগত, ধর্মাচারী সে সব বলেও জানাচ্ছেন কারণ উপস্থিত হলে সাধু ব্যক্তিরাও রাগ-দ্বেষ ইত্যাদিতে আকুল হয়ে ওঠেন। অতএব দেরী নয়, পরের দিনই রামের অভিষেক।
রাজনীতিটা কি? দশরথ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আগেই। তিনি কি তখনই গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন? তাই সভা ডেকে আগে তাঁর শাসনাধীনেরা কে কার পক্ষে আগে বুঝে নিলেন? ভরত-শত্রুঘ্নকে আগেই পাঠিয়ে দিলেন মাতুলালয়ে, যাতে তারা এ সময় থেকে বিঘ্ন ঘটাতে না পারেন? একই কারণে কেকয়রাজ, যিনি কৈকেয়ীর পিতা এবং ভরতাদির মাতুল, তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন না? বাহিনী সমেত তিনি উপস্থিত থাকলে ভরতের পক্ষে জোর বাড়তো। আবার জনকরাজ স-বাহিনী এলে রাম-লক্ষ্মণের পক্ষেও জোর বাড়তো। কিন্তু জনকের প্রিয় ভ্রাতা কুশধ্বজ যে আবার ভরতের শ্বশ্রুপিতা? সেক্ষেত্রে জনকের রাজ্যেও কি আন্দোলন লেগে যেত দুই ভায়ের দ্বন্দ্বে? এই সব ভেবেই যে দশরথ এ সব করলেন তার স্পষ্ট ইঙ্গিত তা প্রচলিত মহাকাব্যে নেই। কিন্তু ভরতাদির থেকে তিনি সমস্যা হতে পারে অনুমান করছেন তা স্পষ্ট। দেখার বিষয়, রামও সে বক্তব্যের কোনো বিরোধিতা করছেন না। ভাসের রামের মত, মহাকাব্যের রাম, ভাই- ভায়ের অধিকার এ সব নিয়ে বক্তব্য রাখেন না। তিনি পিতার আদেশ শোনেন, বোঝেন এবং পালন করেন।
এরপরের এক দীর্ঘ অংশ আছে মন্থরার সঙ্গে সংলাপে সংলাপে কৈকেয়ীর মন পরিবর্তনের। কৈকেয়ী শুরু থেকেই ভরতের জন্য রাজত্ব চাইছেন এমনটা একদমই নয়। রামের রাজ্যপ্রাপ্তিতে আনন্দিতই তিনি। মন্থরা, তাঁকে ধীরে ধীরে বোঝাচ্ছেন, যে রাজার সব পুত্র রাজ্য পায় না এ কথা ঠিক। জ্যেষ্ঠ অথবা অধীক গুণবান রাজ্য পেয়ে থাকে। এখানে আমরা মহাভারতের কৌরব বংশের দ্বন্দ্বের কথাও মনে করে নিতে পারি। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ বলে, জ্যেষ্ঠ হলেও রাজ্য পেলেন না। পাণ্ডু পেলেন। সে বিরোধের বিষগাছ কুরুক্ষেত্রে ভয়ানক ধ্বংসের জন্ম দিয়েছিল। এখানেও মন্থরা জানাচ্ছেন, রাম রাজত্ব পেলে ভরত-শত্রুঘ্নকে তাড়াবেনই। মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কৌশল্যার সঙ্গে তাঁর বিরোধের কথা। দশরথ, কৈকেয়ীর অতি অনুরক্ত বলে, কৌশল্যাকে কৈকেয়ী অবহেলা দেখিয়েছেন। তার শোধ হবে না?
এ সব শুনে কৈকেয়ী ক্রোধান্বিতা হলেন। তার আগে অবধি মহাকাব্যের প্রচলিত কাহিনী তাঁর ষড়যন্ত্রের সূচনা করেনি। এখানেও কাহিনীর বাঁক আছে। মন্থরাই মনে করাবেন, দশরথের থেকে বর লাভের পুরাতন প্রসঙ্গ। শম্বরের সঙ্গে যুদ্ধে দশরথ আহত হলে কৈকেয়ী তাঁকে অপসারিত করেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। প্রাণরক্ষা করেন। সেই সময় দশরথ বর দিতে চেয়েছিলেন। এবারে মন্থরা মনে করিয়ে দিতে তিনি সেই বরের সদ্ব্যবহার করার কথা ভাবলেন। এইখানে আমাদের প্রশ্ন জাগে, দশরথ কি এ সব ভাবেননি? রামের অভিষেকের জন্য এত সতর্কতা নিলেন, এই ক্ষেত্রে নিলেন না? সে প্রশ্নের উত্তর মহাকাব্যের প্রচলিত কাহিনী তেমন ভাবে আমাদের দেয় না।
এই যে রামের বনবাসের নেপথ্য রাজনীতি, এ সব কিছুই ভাসের রচনাতে স্থান পায়নি। আরো পরবর্তী নানা ঘটনাও বাদ থেকে গেছে। বরং তাঁর নাটক, ব্যক্তির চাপল্য থেকে শুরু হয়ে ক্রমে ক্রমে তার সুর গম্ভীর হয়েছে। কিন্তু সে গাম্ভীর্য্যে একপ্রকার ঔদাসীন্যই তিনি রামের চরিত্রে আরোপ করেছেন। সীতার চরিত্রেও। প্রশ্ন হচ্ছে শুরু থেকেই এমন সুরটি নাটককার আমাদের মনে লাগিয়ে দিলেন কেন? পরবর্তী অঙ্কগুলিতে আমরা তার উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করব।

[ক্রমশঃ]

Facebook Comments

Leave a Reply