হান্স রসলিং-এর আশাবাদ : শুভময় ঘোষাল

fail

প্রায় বছর খানেক আগে, তাবলীগী জামাতের ধর্মগুরুদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়ানোর অভিযোগে যখন সারাদেশ উত্তাল, তখন এক সকালে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তাটি পাই, – ‘দেখেছ? এরা কি করছে? কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে জামা কাপড় খুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নার্সদের থুতু ছেটাচ্ছে । একি অসভ্যতা ?’
বার্তাটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। ‘এদের’- নিয়ে চালু ধারণার যে উপনিবেশ আমাদের মনোজগতে, তার বিরুদ্ধে আজন্ম সঞ্চিত মানসিক প্রতিরোধ উজাড় করে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে কি আমাদের অস্বীকার আসলে আবেগের বশে? একটি ধর্মমতের মানুষদের গোঁড়ামি-সঞ্জাত মনোবিকারের কোন খবরই আমরা রাখি না? সবই কেবল আমাদের বিশ্বাস? বলা বাহুল্য ইন্টারনেটের গ্রামে-গ্রামে – ফেসবুকে আর হোয়াটসঅ্যাপে – সেই বার্তা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল। মাস ছয়েক পরে মুম্বাই হাইকোর্টের রায় তাবলীগী জামাতের সঙ্গে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়ানোর অভিযোগকে নির্মম এবং ভিত্তিহীন বলেছিল। কিন্তু দাবানল নেভানোর জন্য কোনও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা আর ছড়ায় নি। কারণ বেকসুর খালাসের এই রায়, ‘ওরা-তো-এইরকমই’ – আমাদের এই ‘ধারণা’-র সঙ্গে মেলে নি।
এর কিছুদিন পরেই জড়িয়ে পড়তে হয় অন্য এক কর্মকাণ্ডে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত আতঙ্কিত রোগীদের মানসিক সাহায্য, তাদের পারিবারিক দৈনন্দিনের সহায়তা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করার এক নাগরিক উদ্যোগ এর সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। এই সূত্রেই আর এক অভিজ্ঞতা । পরিচিত এক ব্যক্তির বয়স্ক আত্মীয়কে ভর্তি করা হয়েছে জেলার সরকার-অধিগৃহীত এক স্বেচ্ছাব্রতী হাসপাতালে। বাড়ির লোক রোগীর কোন খবরই পাচ্ছে না, যেটা সে সময় এক স্বাভাবিক যন্ত্রণা। নাগরিক উদ্যোগে ওই হাসপাতালের সংগঠকরাও যুক্ত সুতরাং রোগীর খবর পাওয়ার একটু বাড়তি বাতায়ন রয়েছে । কোভিড হাসপাতালে বন্ধু জানান যে ওই বয়স্ক রোগীকে নিয়ে তারা খুবই সমস্যায় পড়েছেন । ভদ্রলোক হাসপাতালে থাকতে চাইছেন না এবং বেশ ঝামেলা করছেন। শুধু তাই নয়, অন্যান্য রোগীদের মারধর করেছেন । এই খবর বাড়ির লোকের কাছে খুবই কুণ্ঠা সঙ্গে এবং অস্বস্তির সঙ্গে জানালে তারাও উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
‘কী বলছ? কাকা বাড়িতেই কারো সঙ্গে গলা তুলে কথা বলে না, একজন নিরীহ মানুষ, সে অন্য রোগীদের মারধর করছে? কি করে বিশ্বাস করি?’
এর পরের ঘটনা আর বিচিত্র । দুদিনের মধ্যে ওই হাসপাতাল থেকে রোগীকে তারা বাড়ি নিয়ে চলে আসেন, সেটা আমার জানা ছিল না। একরাত্রে আবার অসহায় ফোন, ‘কাকাকে তো সামলাতে পারছিনা আমরা। মাস্ক পরবে না ঠিক আছে, কিন্তু গায়ের জামাকাপড়ও রাখতে চাইছে না। এমনকি খাবার দিতে গেলেও থুতু ছেটাচ্ছে, সারা ঘর নোংরা করছে।’
তিন মাস আগে হোয়াটসঅ্যাপের বার্তাকে পুনর্বিচারের সুযোগ পেলাম। হতেও তো পারে এই মানসিক বিকার আসলে কোভিড-১৯ আক্রান্তের এক বিরল রোগ লক্ষণ। যদিও এই উপসর্গ, কোভিড-১৯ সংক্রমণ সংক্রান্ত কোনও চিকিৎসা গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে কি না জানি না, কিন্তু সামাজিক মাধ্যম জানিয়ে রাখলো, শুধুমাত্র ধারণার ভিত্তিতেই একটা সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করে ফেলা যায় তৎক্ষণাৎ।

তথ্য বা পরিসংখ্যানের সঙ্গে ‘ধারণা’র সম্পর্কটা সবসময়ই জটিল। এমন নয় যে ইন্টারনেটের আগে এ সমস্যা ছিল না বরং এটাই চিন্তার যে, ইন্টারনেটের আগে তথ্যের যোগান ছিল কম সুতরাং ধারণা তথ্য নির্ভর ছিল না। বা ধরণা-কে তথ্য দিয়ে যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ ছিল কম । অবশ্য যদি তেমন যাচাই করার হ্যাপা নিতে হয় তবেই না। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো, ইন্টারনেট আসার পর, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তথ্যের এই মহাপ্লাবনের পর আমাদের ধারণাগুলি তথ্য নির্ভর হবে, আমাদের বিশ্লেষণ হবে তথ্যভিত্তিক – এমনটাই আশা ছিল । কিন্তু তা হয়নি বরং তথ্যের অপরিমিত যোগান আমাদের বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে দুর্বল করেছে। আর যদি তথ্যের নির্যাস আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণার সঙ্গে মিলে যায় তাহলে তো কথাই নেই। আর তা থেকেই টের পাই যে, তথ্যের মহাপ্লাবনের এই যুগে আমাদের বিশ্লেষণ-ক্ষমতায় বিপর্যয় ঘটে গেছে ।
তথ্য নির্ভর আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্তের মাঝখানে বসে আছে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণা বা বিশ্বাস । তাই সন্দেহ হয়, তথ্য বা পরিসংখ্যান আমাদের চালু ধারণাকে সত্যিই কি প্রভাবিত করে ? আমরা কি – ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় – গ্রাহ্যই করি না, আমাদের ধারণার বিপরীত বাস্তবতাকে ? নাকি তথ্য বা পরিসংখ্যানের বেয়াড়া এবং ধূর্ত পরিবেশনের কায়দায় আমাদের দীর্ঘদিনের বহন করে চলা ধারণাগুলি আরও শক্ত পোক্ত হচ্ছে ? সামাজিক মাধ্যমে উঠে আসা পোস্ট-ট্রুথ বা ভুয়ো খবরকে বিশ্বাস করার জন্য ‌‌‌‌কী এক ধরনের প্রস্তুতি-ই ছিল আমাদের জনমানসে ?

নিজের কাছে এসব প্রশ্ন প্রথম উঠে আসে বছর তিনেক আগে যখন ইউটিউবে হান্স রসলিং নামে সুইডেনের এক জন-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের একটি বক্তৃতা দেখি । সেখানে তিনি বলছিলেন তাঁর উচ্চশিক্ষিত ছাত্রদের সীমাহীন অজ্ঞতার কথা। ওই বক্তৃতার বিষয় লেখার আগে রসলিং এর সম্বন্ধে একটু বলে নিই।
হান্স রসলিং-এর জন্ম ১৯৪৮-এ সুইডেনের উপসালা-য় । উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা এবং পরিসংখ্যান নিয়ে পড়াশোনা, তারপর জন-স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাঙ্গালোরের সেন্ট জোন্স মেডিক্যাল কলেজ থেকে বিশেষ শিক্ষণ নিয়ে পেশাদার চিকিৎসক। ১৯৭৯ থেকে দুবছর মোজাম্বিকের নাকালা’য় জেলা চিকিৎসকের দায়িত্ব সামলান। সেখানে এক অজানা রোগ নিয়ে গবেষণার ভিত্তিতে ১৯৮৬ সালে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পি এইচ ডি। ১৯৯৭ থেকে স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। রসলিং-এর অধ্যাপনা এবং গবেষণার বিষয় আর্থিক উন্নয়ন, কৃষি, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক। ২০০৫ সালে হান্স প্রতিষ্ঠা করেন Gapminder Foundation, যার উদ্দেশ্য আমাদের সীমাহীন ধারণা প্রসূত-অজ্ঞতাকে দূর করার জন্য এক তথ্য নির্ভর বিশ্বদৃষ্টি – Factful Worldview – গড়ে তোলা । রসলিং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের পরামর্শদাতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং সুইডেনের Médecins Sans Frontières – এর প্রতিষ্ঠাতা । ২০১৭ সালে হান্স প্রয়াত হন।

কি ছিল সেই ইউটিউব বক্তৃতায়? রসলিং বলেছিলেন ১৯৭২-এ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র যখন আত্মপ্রকাশ করে তখন মহিলাদের গড় আয়ু ছিল ৫২ এবং নারী-পিছু সন্তান সংখ্যা ছিল ৭। আর ২০১৮ তে রসলিং যখন সেই বক্তৃতা দিচ্ছেন তখন সে সংখ্যা যথাক্রমে ৭৩ এবং ২। চার দশকে বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে অবিশ্বাস্য সাফল্য লাভ করেছে তার সম্বন্ধে আমাদের কতজনেরই বা ধারণা আছে? একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিস্ময়কর ভাবে বাড়িয়ে ফেলেছে শিশুদের বেঁচে হার যা এখন ৯৭% আর ১৯৭২ -এ ছিল ৮০%। এই শিশুমৃত্যুর হার কমাই বাংলাদেশের পরিবারের আয়তন কমার মূল কারণ।
একই রকমভাবে ১৯৬০ -এ মিশরের নীল নদের আশেপাশে ৩০% শিশু ৫ বছর বয়সের আগেই মারা যেত। ওই অঞ্চলগুলির শিশুরা ছিল নানা রোগ এবং অপুষ্টির শিকার। কিন্তু আসোয়ান বাঁধ হওয়ার পর, বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ যেতে শুরু করে, চিকিৎসার উন্নতি হয়, ম্যালেরিয়া নির্মূল হয় , পরিস্রুত পানীয় জল সরবরাহ শুরু হয় এবং যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ , সার্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়। আর ২০১৮-১৯ সালের মিশরে, শিশু মৃত্যুর হার ২.৩ %, ফ্রান্স ব্রিটেনে ১৯৬০ সালে যা ছিল, তার থেকেও কম। রসলিং যখন তাঁর ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেন এশিয়া বা আফ্রিকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা জনস্বাস্থ্যের মান সম্পর্কে কী ধারণা, তখন তিনি দেখেন অধিকাংশ ছাত্রই ধরে বসে আছে পঞ্চাশ বছর ধরে ওই দেশগুলি অচল, অনড় এবং পৃথিবীর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সমস্ত দায় তাদের-ই।
রসলিং আমাদের বুঝিয়েছেন সমস্যাটা কিন্তু কেবলমাত্র এই নয় যে গরীব সদ্যস্বাধীন দেশের এই সাফল্য পশ্চিমী দুনিয়ায় প্রচারিত হয়নি। সমস্যাটা, আমাদের ধারণার অপরিবর্তনীয় অচলায়তনে। আমরা মনে করি পৃথিবীর জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতির জন্য দায়ী কিছু জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাস আর সামাজিক গঠন। অথচ দূরপ্রাচ্যের আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার, পিছিয়ে পড়া দেশগুলি- বাংলাদেশ, ইরান, মিশর, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া – আমাদের নজর এড়িয়ে, ধারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনশিক্ষায় আর জনস্বাস্থ্যে বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করেছে। জীবনভর রসলিং বলার চেষ্টা করে গেছেন যে পৃথিবীতে গত পঞ্চাশ বছরে উপনিবেশ মুক্ত দেশগুলির, এশিয়া, আফ্রিকার ইসলামী ও অন্যান্য গরীব রাষ্ট্রগুলির, সার্বজনীন শিক্ষা, জন-স্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্যের কোনও ধারণাই আমাদের নেই। ঠিক বলা হল না, রসলিং বলতে চেয়েছেন, এই দেশগুলির গত পঞ্চাশ বছরের পরিবর্তনের পরিসংখ্যান আমাদের বদ্ধমূল ধারণাকে পাল্টাতে পারে নি।

১৯৯৮ এর শেষ দিকে রসলিং, তাঁর ইন্সটিটিউটে ছাত্রদের, বিশ্ব স্বাস্থ্য নিয়ে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি – বেশিরভাগ-ই ইসলামী রাষ্ট্র – জনস্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা নিয়েছে। বক্তৃতার শেষে এক ছাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলে যে সুইডেনে তার ছাত্রজীবনে এই প্রথম তার দেশ ইরান সম্পর্কে কেউ ভালো কিছু বললেন। রসলিং বোঝেন যে ছাত্রটি বেশ কিছুদিন ধরেই সুইডেনে আছেন কারণ তার সুইডিশ উচ্চারণ পরিষ্কার। তিনি এটাও বুঝতে পারেন রসলিং যা বোঝাতে চেয়েছেন তা নিয়ে তার কিছু বলার নেই, কারণ রসলিং শুধুমাত্র জাতিসংঘের পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝিয়েছিলেন – কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই – যে সারা পৃথিবীতে শিশু মৃত্যুহার এবং নারী পিছু সন্তান প্রজননের সংখ্যায় কোন দেশ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের ক্ষেত্রে, নারী পিছু সন্তানের সংখ্যা ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৮ এই ১৫ বছরে ছয় থেকে তিন-এ নেমে এসেছে, ইতিহাসে এই হ্রাস দ্রুততম ( ২০১৮ তে ইরানের নারী পিছু সন্তানের সংখ্যা ১.৬, যা আমেরিকার থেকেও কম)। কিন্তু ছাত্রটি, সেই পরিসংখ্যানে অবাক হয়নি, রসলিং তো ঠিক-ই বলেছেন এই নারী-পিছু সন্তান সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ তাদের জন-স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি। যেটা ইরানের নারীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে বেশি করে। ইরানের নারীরা যে গর্ভ নিরোধক ব্যবহার করে এবং পরিবারের আয়তন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যে অনেক আধুনিক এবং পরিবার-গ্রাহ্য, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সে সহমত। এগুলি সবই ঠিক, কিন্তু তার ছাত্র জীবনে সে কোনদিন শোনেনি শিক্ষিত সুইডিশরা ইরানের নারীদের এই সামাজিক উন্নতি, এই আধুনিকতা সম্পর্কে একটা কথাও উচ্চারণ করেছে বা ইরানের নারীদের এই উত্তরণ সম্পর্কে আদৌ কোনও ধারণাই তাদের আছে কি না। তার অভিজ্ঞতায়, পশ্চিমী রাষ্ট্রের অধিকাংশ শিক্ষিত নাগরিকদের চোখে ১৯৯৮ সালে ইরান এবং আফগানিস্তান যেন একই সামাজিক অবস্থায় রয়েছে।
রসলিং এই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন ২০১৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বইতে ১। রসলিং লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে, পৃথিবীর ইতিহাসে নারী পিছু সন্তানের জন্মহার সবথেকে দ্রুত হ্রাসের খবর পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমে সম্পূর্ণ অনুল্লেখিত। ১৯৯০ এর দশকে ইরান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জন্মনিরোধকের কারখানাই শুধু বানায় নি, তার সমাজে নারী এবং পুরুষদের প্রাক-বৈবাহিক যৌন শিক্ষা কাঠামো তৈরি করেছিল এবং সেটাই তাদের জন্মহার হ্রাসের কারণ। ১৯৯০ তে তেহরানে থাকার সময়, রসলিং প্রত্যক্ষ করেন ইরানে জন্মনিয়ন্ত্রণের এবং পরিবার পরিকল্পনার এই চমকপ্রদ সাফল্য । দেখেন তরুণ দম্পতিরা গর্ভ নিরোধক ব্যবহার করছেন আবার অন্যদিকে বন্ধ্যত্ব দূরীকরণের জন্য জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছেন। পশ্চিমী ধারণায় ধর্ম-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে যা অবিশ্বাস্য।
সব ধর্মেই যৌনতা সংক্রান্ত বিধি নিষেধ উপস্থিত । কিন্তু কোনও বিশেষ ধর্মে নারীদের অতিরিক্ত সংখ্যায় সন্তান উৎপাদনের এবং পরিবারের আয়তন বৃদ্ধির প্রায় বাধ্যতামূলক নির্দেশ সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই যে একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে, রসলিং দেখিয়েছেন পরিসংখ্যান দিয়ে তাকে মেলানো যাবে না। বরং গত পঞ্চাশ বছরে তার উল্টোটাই ঘটেছে। রসলিঙের পর্যবেক্ষণ দেখিয়েছে, সন্তান ধারণের বা পরিবারের আয়তনের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক খুব শিথিল বা তাকে বাড়িয়ে দেখা হয়, বরঞ্চ উপার্জনের সঙ্গে পরিবারের আয়তনের নির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে।
২০১৭ য় জন্মহার এবং ধর্মের সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল? রসলিং জন্মহারকে তিনটে দলে ভাগ করে দেখেছেন : খ্রিষ্টান, মুসলমান এবং অন্যান্য ধর্ম । প্রত্যেকটি দলের নারী পিছু সন্তানের সংখ্যার তুলনা করেছেন, একই সঙ্গে লক্ষ্য রেখেছেন দল পিছু উপার্জনে । সেখানেই রসলিং দেখিয়েছেন যে ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবে, দারিদ্রসীমার নিচে থাকা নারীরা বেশি সন্তানের জন্ম দেয়। ধর্মের নিরিখে, মুসলমান নারী পিছু সন্তান সংখ্যা ৩.১ , আর খ্রিষ্টান নারী পিছু সন্তান সংখ্যা ২.৭ । বড় কোন ফারাক নেই। যদিও, পৃথিবী-জোড়া বদ্ধমূল ধারণা যে ধর্মীয় গোঁড়ামি এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে টেনে রেখেছে , আধুনিক পরিবার পরিকল্পনার ভাবনা সেখানে পৌঁছায় না, কিন্তু রসলিং দেখিয়ে দিয়েছেন, এই ধারনার উৎস আমাদের মানসিক অচলায়তন।
রসলিং-এর দুঃখ, পশ্চিমি দুনিয়ায় কতজন জানেন এ কথা, যে পরিবারের আয়তন বা সন্তানের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সুইডেনের নারীদের থেকেও বেশি স্বাধীন ইরানের নারীরা। মুক্ত গণতন্ত্র এবং স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম অনুশাসিত পশ্চিমি দুনিয়া কেন একথা মানতে চায় না যে তাদের অপছন্দের রাষ্ট্রব্যবস্থা জন্মহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে এবং নারীদের ক্ষমতায়নে এমন কিছু করে ফেলেছে যা তুলনামূলক হারে, পশ্চিমী গণতন্ত্রও করতে পারে নি? স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, পৃথিবীর এক আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের কথা জানাতে ব্যর্থ অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনও নিরপেক্ষ তথ্য-নির্ভর সংবাদ পরিবেশনের গ্যারান্টি নয়।

এই লেখা হান্স রসলিং কে নিয়ে নয়, কিন্তু তাঁর আশ্রয়ে। তথ্য, পরিসংখ্যান এবং ধারণার বিচিত্র সম্পর্ক নিয়ে রসলিং এই লেখাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাই সেই সূত্রে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দু একটা কথা বলে রাখা যায়। পেশার জন্য রসলিং সারা পৃথিবী ঘুরেছেন। উন্নয়নশীল, অনুন্নত এবং গরিব দেশগুলিতে বারবার গেছেন ; টিমটিম করে জ্বলে থাকা সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম, কিউবাতে ; বাজার-নিয়ন্ত্রিত সমাজতন্ত্রে ঝলমল করা চিনে, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী রাজতন্ত্রে, আর গৃহযুদ্ধ, বুভুক্ষা আর উপনিবেশ-মুক্তির টালমাটাল শৈশবে থাকা মধ্য-আফ্রিকার দেশগুলিতে। ২০২০ তে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে ২ রসলিং বলেই দিয়েছেন কমিউনিস্ট দেশগুলিতে বহুমতের অনুপস্থিতি তাকে বরাবরই কমিউনিজমের বিরোধী করে রেখেছে। তবুও, নির্মোহ অন্বেষণে তিনি নিশ্চিত, সার্বজনীন শিক্ষায় আর জনস্বাস্থ্যে, নিষ্ঠা ও সাফল্যের নিরিখে আফ্রিকার সদ্য উপনিবেশ-মুক্ত দেশগুলির, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ এবং সমাজতান্ত্রিক কিউবা, ভিয়েতনামের সাফল্য বিস্ময়কর।
১২ মে ২০১৩, রসলিং আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫০০ জন মহিলা নেত্রীর এক সম্মেলনে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন।বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘আফ্রিকার নবজাগরণ এবং ২০৬৩ -র আলোচ্য-সূচী’ । সেই কনফারেন্সে, রসলিং তাঁর বেশ কয়েক দশক ধরে মহিলা ক্ষুদ্র-চাষিদের উপর গবেষণার ভিত্তিতে বোঝাতে চেয়েছিলেন কুড়ি বছরের মধ্যে আফ্রিকায় চরম দারিদ্র্য নির্মূল করা কিভাবে সম্ভব। আফ্রিকান ইউনিয়নের সভানেত্রী কোসানা লামিনি-জুমা (নির্ভুল উচ্চারণ করা কঠিন) মন দিয়ে রসলিংয়ের বক্তৃতা শুনছিলেন। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর তিনি যখন ধন্যবাদ দেন, রসলিং তাঁকে অনুরোধ করেন কিছু মন্তব্য করার জন্য। রসলিং ভাবতেই পারেননি তিনি কি শুনবেন
“হ্যাঁ, আপনার আলোচনা খুব সুন্দর, গ্রাফগুলিও ভালো, কিন্তু আপনার কোনো দূরদৃষ্টি নেই” বলেছিলেন শ্রীমতী লামিনি-জুমা, “আপনি বলেছেন ২০ বছর বাদে আফ্রিকায় চরম-দারিদ্র্য বলে কিছু থাকবে না। ঠিকই বলেছেন – চরম দারিদ্র্য থাকবে না। কিন্তু সেটা তো শুরুর কথা এবং আপনি সেখানেই থেমে গেছেন। আপনার কি মনে হয়েছে আফ্রিকার মানুষদের লড়াই চরম-দারিদ্র্য দূর করেই থেমে থাকবে? চরম-দারিদ্র্য থাকবে না কিন্তু দারিদ্র থাকবে আর শুধুমাত্র দারিদ্র নিয়েই সুখে থাকবে আফ্রিকার মানুষ ?”।
লামিনি-জুমা খুবই বিনয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। চোখেমুখে বিরক্তিও নেই, কিন্তু তিনি থামেন না, বলে চলেন
“শেষের দিকে আপনি বলেছেন যে, পঞ্চাশ বছর পর আপনাদের দেশ থেকে যে পর্যটকরা আফ্রিকায় আসবেন তাঁরা দেখবেন বদলে যাওয়া আফ্রিকাকে। তখন ইউরোপীয় পর্যটকেরা আফ্রিকাতে উচ্চগতির ট্রেনে চেপে ভ্রমণ করবেন। কিন্তু এ কেমন দূরদৃষ্টি আপনার? কারণ আমরা চাই পঞ্চাশ বছর পর আমার পৌত্র আপনাদের ইউরোপ মহাদেশে যাবেন পর্যটক হয়ে। আপনাদের উচ্চগতির ট্রেনে চাপবে, উত্তর সুইডেনের বরফের হোটেলে থাকবে, আর যা যা ধনাঢ্য আয়োজন শ্বেতাঙ্গ দেশগুলিতেও রয়েছে তার সবকিছু উপভোগ করবে। আমার দূরদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, পঞ্চাশ বছর পর আফ্রিকার লোকেরা ইউরোপে বেড়াতে যাবে পর্যটক হিসেবে, অবাঞ্ছিত উদ্বাস্তু হিসেবে নয়।”
জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য জন্য দায়ী ধর্মীয় গোঁড়ামি বা সামাজিক পশ্চাৎপদতার, এমনকি পুরুষতান্ত্রিকতার যে ধারনা উদার গণতন্ত্র এবং ধনাঢ্য পশ্চিমী দেশগুলির তে বিদ্যমান রসলিং তাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন । ইসলামী রাষ্ট্রের ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, এমনকি পুরুষতান্ত্রিকতাও নয় – চরম দারিদ্র্যই জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ। দারিদ্র মানেই অপুষ্টি এবং শিশু মৃত্যুর হারের ঊর্ধ্বগতি। সোমালিয়া, মালি, নাইজার – আফ্রিকার এইসব দেশে নারী পিছু সন্তান সংখ্যা অনেক বেশি – পাঁচ থেকে আট। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের উন্নতি যখনই শিশু মৃত্যুর হার কমায় তখনই নাগরিকেরা বুঝতে পারে অধিক সন্তানের চাইতে শিক্ষিত এবং নীরোগ সন্তান অনেক বেশি কাম্য। গত পঞ্চাশ বছরে গরিব দেশ গুলি এভাবেই সফল হয়েছে।

রসলিং-এর কিউবা-অভিজ্ঞতাও ধারণা আর প্রত্যক্ষের সংঘাত, তবে অন্য পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৯১ থেকে প্রায় তিন বছর কিউবায় এক রহস্যজনক সংক্রামক রোগের কারণ অনুসন্ধান করার জন্য রসলিং ব্যস্ত ছিলেন। এরপর ১৯৯৩ তে হাভানায় স্বাস্থ্য দপ্তরের আমন্ত্রণে ‘কিউবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত’ নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পান। রসলিং বরাবরই কিউবার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্যে উৎসাহিত যা তিনি নিজেও প্রত্যক্ষ করেছেন । তাঁর বক্তৃতায় রসলিং আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে কিউবার জনস্বাস্থ্যের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন এবং বলেন যে কিউবার শিশু মৃত্যুর হার বিস্ময়কর রকম কম যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমান। অথচ কিউবার নাগরিকের গড় উপার্জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫%। এই বৈষম্য সত্ত্বেও কিউবার জনস্বাস্থ্যের সাফল্য অবিশ্বাস্য। এই বক্তৃতার পর কিউবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রবল উৎসাহের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে দেখা যাচ্ছে কিউবা গরিব দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। বলাবাহুল্য উপস্থিত কিউবার জনস্বাস্থ্য কর্মীরা দৃশ্যত খুশিতে ফেটে পড়েন।
এর কিছু পর যখন পানভোজন চলছিল, তখন উপস্থিত এক যুবক রসলিং-এর কাছে এসে বলেন তার কিছু বলার আছে, যা তিনি একান্তে বলতে চান। সকলের নজর এড়িয়ে তারা দুজনে একপাশে সরে যান, নিচুস্বরে সেই যুবক বলেন, ‘আপনি যা বলেছেন সবই ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা বলেছেন সেটা ভুল। আমরা গরিব দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল তা নই, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে গরীব।’

রসলিং সম্বন্ধে কিন্তু অনেক বিরূপ সমালোচনাও আছে। তার আশাবাদকে অতিকথন বলেন কেউ। কেউ বলেন তাঁর মতামত বেশিরভাগ সময়ে দুনিয়ার জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে অনেক ছোট করে দেখায় । এই অভিযোগ অনেকেই করেন যে, বিশেষ করে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার অবস্থান বিশ্ব ব্যাংক বা বৃহৎ পুঁজির প্রচারের কাজে লাগে । দাভোসে বিশ্ববাণিজ্য সম্মেলনে অতিকায় কর্পোরেটগুলির কাছে তাঁর আফ্রিকায় বা অন্যত্র লগ্নি করা সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলিতে বিশ্ব ব্যাংক বা বৃহৎ পুঁজির প্রতিপক্ষপাতিত্ব বলেও মনে করা হয়। একইসঙ্গে দরিদ্র দেশগুলিতে বৃহৎ পুঁজির প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন বা অপহরণ সম্পর্কে তিনি তত সোচ্চার নন, এই অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসব জেনেও, মনে রাখা দরকার, রসলিং তাঁর বইয়ে বলেছেন এক তথ্য নির্ভর, ধারণা-বর্জিত বিশ্বদৃষ্টি তৈরির কথা । কারণ, তথ্যের এই মহাপ্লাবনের যুগেও, ধারণা-ভিত্তিক বিশ্ব-দৃষ্টির যে রমরমা তিনি দেখেছেন তার বিরুদ্ধে তিনি এটাই বলতে চেয়েছেন যে, পৃথিবীটা সত্যিই কেমন তা বুঝতে গেলে আমাদের এতদিনের ধারণাকে বর্জন করতে হবে। আর সেই নির্মোহ অন্বেষণে সাহায্য করার জন্য হান্স রসলিং তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

[লেখক – অবসরপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদ। মুক্ত-স্বত্ব সফটওয়্যারে উৎসাহী। ষাট দশকের জোয়ার-ভাঁটার সন্তান। ইতিহাস, প্রযুক্তি আর রাজনীতির জটিল সমকালীন সমীকরণের অনুসন্ধিৎসু পাঠক।]

___________________________________________

তথ্যসূত্র:-

১। Hans Rosling / Factfulness : 10 reasons we are wrong about the world and why things are better than you think/ Sceptre
২। Hans Rosling /How I learned to Understand the World/ Sceptre

Facebook Comments

Leave a Reply