কাশবনের ভাস্কর্য : শুভংকর গুহ

“নিজের কিছু কথা ভোরের পাখির মতো সত্য হয়, এই পড়ে পাওয়া জীবনে অস্বীকার করি কি করে? নিজের স্মৃতিকথার সাথে এক ঝাঁক ছাতারে উড়ে আসার দৃশ্যকে মেলাতে গিয়ে দেখি, সবটাই বাতাসে উড়ে যাওয়া খইয়ের মতো লুটোচ্ছে বসতখানার উঠোন জুড়ে। কিছু কথা তুলে নিলে অনেক কথাই আবার যেন থেকে যায়, বাকি শুধু কল্পনা কৃষিজমি কর্ষণের মতো এক অভ্যাস, আত্মকথাকে ক্রমশ উর্বর করে তোলে।”- কথাসাহিত্যিক শুভংকর গুহের আত্মকথা ‘কাশবনের ভাষ্কর্য’। বাবার কর্মসূত্রে পানাগড়, আগ্রা, লক্ষ্ণৌ, মথুরা, কানপুর, এলাহাবাদ সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেছেন লেখক। সেই যাপনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এক সময়ের দলিল নিঃসন্দেহে।

শিয়ালদহ স্টেশনে সেই প্রথম ট্রেন দেখলাম। পানাগড়ে দেখেছি পরিত্যক্ত মালগাড়ি ট্রেনের ওয়াগন। কিন্তু এমন একটি ইঞ্জিন দেখলাম জীবনে প্রথম, যে আমাদের যাত্রাপথকে নিয়ন্ত্রণ করবে। বাবা বলেছিলেন, ইঞ্জিন দেখে বুঝতে পারবে, গাড়ি কতদূরে যাবে। হ্যাঁ, চোখালো মুখ, দুইদিক দিয়ে বাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে পাখির ডানার মতো। চলতি ভাষায় কি না জানি না, সেই সুদৃশ্য দানবীয় স্টিম ইঞ্জিনকে কানাডা ইঞ্জিন বলা হত। সেই ইঞ্জিনের ট্রেনের যেন আলাদা একটি মর্যাদা ছিল। দানবীয় আকার, বাষ্প উগরে দেওয়ার কি প্রবল শব্দ। তামাটে লাল রঙয়ের ওজনদার বগি।
প্রথম ট্রেনে চেপে দূর দেশে যাওয়ার আনন্দ। তিনজন প্রবীণ কুলি মালপত্তর বগিতে তুলে দিলেন। মায়ের ও বাবার গোটা সংসার তুলে নিয়ে চলেছে আমাদের নিয়তি, সবাই চলেছি ভিন প্রদেশে। আমাদের সবার হাতেই সংসারের টুকিটাকি। বার্ণিশ করা জাল দেওয়া চৌকো কাঠের বাক্সের মতো, আমাদের সবার খাবার রাখা আছে সেই জাল দেওয়া বাক্সে। লুচি হালুয়া কিছু নিমকি আলু ভাজা ও মিষ্টি। মা সেই বাক্সের ওপরে বিশেষ নজর রাখছেন। ট্রেনের কামরার দিকে যেতে যেতে ঘুরে দেখছেন বাক্সটিকে। খাবারের বাক্সের প্রতি মায়ের এই আকুলতার কারণ, মায়ের সেই বিশেষ নজরের অর্থ জেনেছিলাম অনেক পরে, যখন লেখার মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেছি, ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসে জেনেছিলাম সন্তানের ক্ষুধা মায়ের জাতকে কত আক্রান্ত করে। আহা, “মা” মানব জীবনের সবচাইতে শক্তিশালী নরম ও বিনম্র মায়াময় শব্দটি না থাকলে পৃথিবী যে কত মিথ্যা, সেই আদিম কাল থেকে গর্ভধারিণী শব্দটির মাহাত্ম্য শিশিরের বিন্দুর মতো অনন্তকাল ধরে জ্বল জ্বল করছে। এই জীবন্ত মহাগ্রহের একদিন বিনাশ হবে, হয় তো জীবনের কোনও অস্তিত্বই আর থাকবে না, কিন্তু “মা” শব্দটি থেকে যাবে, এই মহাবিশ্বকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্যই।
সেই মধ্য রাত থেকে জেগে মা সব প্রস্তুত করেছেন। আজ ভাবি, সেই সব খাবারের মতো সুস্বাদু খাবার আর কোথায়? আসলে মায়ের হাতে রান্না করা সবকিছুই যেন সেরা সুস্বাদু। কত মানুষ চলেছেন, কত কাজে, জীবনের উদ্দেশে। কেউ চলেছেন কাজের সন্ধানে, কেউ কাজে যোগদানের জন্য, কেউ চলেছেন ভিনদেশে। কেউ আবার নিকটজনের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে, কেউ আবার বিবাহ অভিযানে, কেউ সন্তানের মুখ দেখতে, কেউ বা চিকিৎসার জন্য। একটি ট্রেনের মধ্যে কত মানুষের যাওয়ার কত রকমের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যগুলিই মানুষকে ভাঙ্গে গড়ে। আবার অন্য এক মানুষ নির্মাণ করে। একটি ট্রেনের সঙ্গে একটি গোটা মানবসমাজের অনেক মিল আছে যেন। পরস্পর যাত্রীরা অপরিচিত হলেও, ট্রেনের বগির প্রতি একটি টান থাকে।
ট্রেন চলছিল, ইঞ্জিনের ছুটে চলার কখনও কখনও বাষ্পীয় হুইসল। দুই ধারে ধানক্ষেত, ফসল ভরা মাঠ, পুজো চলে গেল মাত্র, অগ্রহায়ণের মাঠে মাঠে ধানের গুছি রেখে গেছেন মা চিন্ময়ী।
বাবা বললেন,- এই ধান উঠবে, আর কয়েকদিন পরেই।
আমি মাকে বললাম, ওই দেখ পানাগড়ের মতো কাশফুল।
মা বললেন,- যখন উত্তরের বাতাস আর থাকবে না, কাশফুল আর দেখা যাবে না।
বাবা বললেন,- সবে মাত্র অগ্রহায়ণের শুরু, এখনই উত্তরের বাতাসকে বিদায় বোলো না।
কয়লাখনির ট্রলি তারের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। খনি থেকে কয়লা তুলে কয়লার গাদায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম,- কাঁচা কয়লা জ্বালানোর কেমন ধোঁয়া উড়ছে? কেমন গন্ধ। খনির আশেপাশে কয়লা পুড়ছে।
বাবা আমাকে বললেন,- ইঞ্জিনের বয়লারে কয়লা পুড়ছে। সেই ধোঁয়া উড়ছে। দেখ তোমার জামাতে কত কয়লার কুঁচি পড়ে আছে।
সত্যিই তো, জামা ভর্তি কত কয়লার কুঁচি ছড়িয়ে আছে।
এই সময় ধুয়োর মুখে মুখ রেখ না। মুখ কালো হয়ে যাবে। এই ধুয়োর গন্ধ তেমন ভালো নয়। শ্বাস প্রশ্বাসের পক্ষে খারাপ।
আমার কাঁচা কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ খুব ভালো লাগে।
বাবা বললেন,- সে আবার কি?
মা বললেন,- গন্ধ ভালোবাসার জাত থাকে, সে তুমি তা বুঝবে না।
তাই বলে কাঁচা কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ? অন্য কোথাও বোলো না যেন। ভাববে, কি বোকার মতো কথা বলছ।
মা বললেন,- অনেকে কেরোসিন কাঠ পুড়ে যাওয়ার গন্ধ ভালোবাসে। আবার অনেকে কালবৈশাখীর ধুলোর গন্ধ। কালবৈশাখীর ঝড়ের গন্ধ। বৃষ্টি পড়লে শুকনো মাটির গন্ধ। গন্ধের ভালো লাগার মধ্যেও অনেক রকমফের থাকে।
তোমাদের আশ্চর্য বিচিত্র গন্ধ অনুভূতি।
আমার যেমন শব্দ শোনার অনুভূতিও। এ্যাকোরডিয়ানের বেজে ওঠার শব্দ তুমি কি কোনও দিন শুনেছ? বড়ই চমৎকার মসৃণ শ্বেতপাথরের মিনারের মতো সেই শব্দ।
আমি মনে মনে বললাম, শুনেছি… শুনেছি ব্রজেন মিশ্রাজির এ্যাকোরডিয়ান বাজানোর শব্দ।
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে, অবশেষে বললেন,- না শুনিনি।
মা বাবার মুখের দিকে তাকালেন কেটে যাওয়া ঘুড়ি হাতে পাওয়া আনন্দের মতো। বাবার এ্যাকোরডিয়ানের শব্দ না শোনার মধ্য দিয়ে তিনি এক অদ্ভুত নিরাপত্তা অনুভব করলেন।
ট্রেনের দুরন্ত গতি যেন এ্যাকোরডিয়ান বাজিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে ফাঁকা মাঠে ইঞ্জিনের কী বিষণ্ণ বাষ্পীয় হুইসল। ট্রেনের এই হুইসলের শব্দ পৃথিবীকে বড়ই একা করে দেয়। জনমানবহীন ফসলের মাঠ একা কুটিরে এক রমণীর মতো।
আমি চমকে উঠলাম। জানালার বাইরে দেখলাম স্টেশনের ওপরে হুরমুরিয়ে নেমে এসেছে পাহাড়। বাবাকে বললাম,- কি নাম স্টেশনের?
বাবা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে স্টেশনের ফলক দেখে বললেন,- তিন পাহাড় জংশন। আমরা এখন কলকাতা থেকে অনেকদূরে বিহারে প্রদেশে চলে এসেছি। এ আমাদের কাছে ভিনদেশ। বাঙলা ভাষায় কথা বললে কেউ বুঝতে পারবে না। হিন্দি ভাষা বোঝে। বিহারের আঞ্চলিক ভাষা আছে এখানে। বিহারিরা অধিকাংশ সময়ে ভোজপুরি ভাষায় কথা বলে। আবার মাঘী ভাষাতেও কথা বলে। কিন্তু মাঘী ভাষার কোনও লিপি নেই।
মা বললেন,- তুমি এত কিছু জানলে কি করে?
বাঃ রে, ভুলে গেলে? আমরা রাঁচিতে ছিলাম না যেন?
আমি কি রাঁচিতে ঘর থেকে বের হতাম? বার হলে তো তোমার সাথেই।
বেশ লাগছিল পাহাড়ের নিচে ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। চিত্রকরের পেনসিলের স্কেচের মতো কয়েকটি মানুষ বসে আছে জবুথুবু হয়ে কাঠের বেঞ্চির ওপরে। পাহাড়ের ছায়া পড়েছে স্টেশনের ওপরে। পাহাড়ের উচ্চতা অবলম্বন করে পাহাড়ের গায়ে গায়ে মানুষের পায়ে চলা পথ আকাশ ছুঁয়েছে। পাহাড়ের মধ্যেই আছে পাহাড়ি গ্রাম। সেই গ্রামে ঝর্ণা আছে, ঘন বনস্পতির মধ্যে আছে বিস্তর বন্য পশু। আছে বনদেবীর মন্দির। অধিকাংশ পাহাড়েই না কি শিবের মন্দির থাকে। আর থাকে আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী স্থানীয় পাহাড়ি দেবীর মন্দির।
পাহাড়ের ছায়া অতিক্রম করে ট্রেন ছেড়ে দিল। পাহাড়ের গা বেয়ে পায়ে চলা দাগগুলিকে মনে হল, দেশ ছেড়ে যাওয়ার আত্মীয়স্বজন। যে ট্রেনে যাচ্ছি, সেই ট্রেনের নাম নিজে থেকে মনে মনে না আওড়ালে কি ভালো লাগে? ভুলে গেছিলাম বলে, বাবাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ট্রেনের নামটা কি যেন? কি যেন?
বাবা একটুও বিরক্ত না হয়ে বললেন,- আপার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস।
আপার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, বেশ কয়েক বছর আগে এই ট্রেনের নাম পরিবর্তন হয়ে অধুনা লালকিলা এক্সপ্রেস। তিনদিন দুই রাত্রি অতিক্রম করে আমাদের চলে যেতে হবে মথুরায়। পরের দিন, দুপুরে দেখলাম, মাঠে মাঠে বড় বড় সারস পাখি ডানা মেলে নামছে উড়ে যাচ্ছে, বিচরণ করছে। উট রেললাইনের ধারে বাবলা গাছের কাঁটা সংগ্রহ করে চিবোচ্ছে।
বাবা বললেন,- বাবলা গাছের কাঁটা ভয়ানক হয়। উট চিবোতে ভালোবাসে। উট কাঁটা খায়। সে যে অনেক যন্ত্রণার। চোয়াল দিয়ে রক্ত ঝরে যাবে, তবুও উট কাঁটা চিবিয়ে যাবে।
মা বললেন,- যন্ত্রণার সুস্বাদু বিলাস। জীবনকে ভালোবাসার পদ্ধতি।
বাবা বললেন,- যন্ত্রণা কেন বিলাস হবে?
যন্ত্রণা হল বিলাস, সে তুমি বুঝবে না।
আমি যন্ত্রণা বুঝি না। কাঁচা কয়লার গন্ধ বুঝি না। কালবৈশাখীর বৃষ্টিতে মাটিতে জলের গন্ধ বুঝি না। ঝড়ের ধুলোর গন্ধ বুঝি না। আমি তোমাদের মতো অনেক কিছুই বুঝি না।
সবাই সব কিছু বুঝবে এমন তো নয়?
বাবা চোয়াল শক্ত করে বললেন,- উট ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রাণী।
এই প্রথম তোমার কাছ থেকেই জানলাম উট প্রতিহিংসাপরায়ণ।
কলকাতার সবুজ প্রকৃতি, জলাশয়, ধানের আলের মাঠ যেমন গতকাল জানালার ওপাশে ছেড়ে এসেছিলাম, এখন ধু ধু ফসলহীন শুকনো মাঠ, কোথাও জলের ছোঁয়া নেই, মাঠে মাঠে জলের আয়না নেই, ট্রেনের গতির সাথে এমন সব চলমান ছবি আমার কাছে তৃষ্ণার্ত এক অভিযাত্রীর দেশ যেন। দূরের মাটির পথের পাশ দিয়ে জংলি ঝোপের পাশ ধরে ধবধবে সাদা বলদ যান, রঙ্গিন ছদরি উড়িয়ে চলেছে নিঃসঙ্গ গ্রাম সভ্যতার দিকে। কয়েক টুকরো গ্রাম যেন ভারতবর্ষের হৃদয়ে বাউল রাগের চিহ্ন। বহুকাল পরে এই দেখা দৃশ্য ফিরে এসেছিল “মাদার ইন্ডিয়া” সিনেমা বা ছবির মধ্য দিয়ে। তখনকার ট্রেন সফরের দৃশ্য এবং অনুভবে ফিরে পেয়েছিলাম, কত বছর পরে খেয়াল নেই, কিন্তু মনে হয়েছিল, সময় ভীষণ দ্রুতগামী ট্রেন। সেই বলদ যানের ছুটে যাওয়া গান,- “মতওয়ালা জিঁয়া ডোলে পিয়া ঝুমে ঘটা ছায়ে রে বাদল… কর না হ্যাঁয় তো কর পিয়ার না ডর বিতি উমর আয়েগি না কল… অরে পাগল…অরে পাগল…
তিনদিন পরে বিকেলের দিকে আমরা পোঁছে গেলাম মথুরা স্টেশনে। জৌলুসহীন লাল সুরকির বিছানা পাতা স্টেশন। দেখে মনে হল, স্টেশন ছোটো হলে কি হবে, স্থান মাহাত্ম্য আছে। এখন সেই মথুরা স্টেশনের আয়তন ও ব্যস্ততা স্থান মাহাত্ম্য রাজনৈতিক কারণে খুবই প্রাসঙ্গিক। পাশেই অযোধ্যা নগর। স্টেশন চত্বরে দুইটি প্রকাণ্ড বকুল ফুলের গাছ। পাশে একটি বাঁধানো পাতকুয়ো।
আজকাল আর স্টেশনে পাতকুয়ো দেখা যায় না। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে অনেক স্টেশনেই পাতকুয়ো দেখা যেত। পাশেই একটি হ্যান্ড পাম্প থাকত। মথুরা স্টেশনে নামলেই দানবিক আকারের গোবিন্দজির মন্দিরে চূড়া ভেসে উঠেছিল। এখন শুনেছি মথুরা খুবই ভারি শহর। ঘরে ঘরে পাথরের মূর্তি ও পাথরের পাত্রের কাজের শিল্পের বিপুল বিস্তার ঘটেছে। ওরা শ্রীকৃষ্ণকে নটখট কানহাইয়া বলে। রাধাকৃষ্ণের মূর্তি ঘরে ঘরে। এখন শুনছি রাজনৈতিক কারণে রামলালার মূর্তিরও প্রচলন বেড়েছে। আমরা ভারতীয়রা সীতারাম বলি। শুধু ‘রাম’ বলে হিংস্র পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক কারবারিরা। মহাত্মা গান্ধিজি নিজেই গাইতেন- পতিত পাবন সীতারাম। এই জীবন্ত গ্রহে জড় পদার্থের ও জীবনের মধ্যে নারী ও পুরুষের সাম্য অবস্থান।
মথুরা শহরের পাশেই অযোধ্যা শহর। মথুরা ও অযোধ্যা শহরের পাশাপাশি সহবাস আমার মনে যে গভীর প্রশ্ন স্থাপন করেছিল তার ব্যাখ্যা আমি আজও পাইনি। মানুষ তার ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতা অনুযায়ী ইতিহাসকে নিজের মতো করে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এবং সেই ভাবনাকে দূষিত করে রাজনৈতিক স্বার্থপরতা। ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রেও মানুষ তার ক্ষুদ্র স্বার্থবৃত্তকেই প্রশ্রয় দেয়। কাজেই ইতিহাস সত্য কথা বললেও তার আসল সত্যটি চাপা পড়ে যায়।
ইতিহাসের সবচাইতে সত্য দিকটি আমাদের অন্তরালে থেকে যায়। রামায়ণ ও মহাভারত দুই মহাকাব্যের গুণগত ও উৎকর্ষ দিককে বর্জন করে, গোপন হিংসা প্রবাহকে আমরা গ্রহণ করেছি। এই প্রসঙ্গে মহাভারতে বকরাক্ষসের অধ্যায়টিকে আমার কাছে খুবই প্রতীকী মনে হয়েছে। কারণ জ্ঞানই আমাদের প্রকৃত মুক্তির পথ। ধর্মীয় মাহাত্ম্য প্রচার নয়। এই কথাগুলি এই জন্যই বললাম, মথুরা এবং অযোধ্যা এই দুইটি শহর আমার স্মৃতিকে আজও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। উত্তরপ্রদেশের এই দুইটি শহরই ধর্মীয় উন্মাদনায় আক্রান্ত। মহাকাব্যের চরিত্র কাব্যে যতটা না বড়, মন্দিরে তিনি পাহাড় প্রমাণ।
গোটা সংসার দ্রুত নেমে এলো। স্টেশনে দাঁড়িয়েছিলেন, খাটো মতো অতি উজ্জ্বল চেহারার একজন। স্মৃতি খুব ভুল না করলে, তিনি স্যান্যালবাবু। কত শহরে বাবা এমন পরিচিতের খুঁটি বেঁধে রেখেছেন, আমরা জানি না। আসলে, প্রবাসে বাঙ্গালিরা নিজেদের কতটা আত্ম করে নেয়, তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বাজারে বা খেলার মাঠে ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক জমায়েতে বাঙ্গালিরা যখন হিন্দিতে কথা বলতেন, তা থেকেই চেনা যেত তিনি বাঙালি। সেই হিন্দি বলার মধ্য দিয়ে বাঙলা ভাষার টানের সহমিশ্রণ মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ।
আমি যখন লখনউ শহরের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের ছাত্র, বিদ্যালয়ে জল পান করার জন্য অভূতপূর্ব একটি কলপাড় ছিল। তখন ছাত্রছাত্রী ও আমি বলেছিলাম,- পাস দোঁ, পানি খানে দোঁ (জায়গা দাও, জল খেতে দাও)। এই কথা বলার পরে ছাত্রছাত্রী ও সহসাথীদের মধ্যে হাসির রোল উঠল। কেন বুঝতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, আমারই ক্লাসের ছাত্রী সীমা জয়সোয়াল আমাকে হাত ধরে টেনে কলপাড় থেকে সরিয়ে নিয়ে, ওর ধূসর কম্বলে মোড়ানো জলের ক্যানটি আমার হাতে দিয়ে বলল,- পি লো… পি লো। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অধিকাংশ পরিবারেই এমন কম্বলে মোড়ানো জলের ক্যান থাকে। এটি ডিপার্টমেন্টের উপহার।
আমি বললাম,- ওরা এমন হাসছে কেন?
সীমা বলল, তুমি ভুল ভাষা বলছ, তাই হাসছে।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
সীমা বুঝতে পারল, বলল,- পানি কভি খায়া নহি যা তা, পিয়া যা তা হ্যাঁয় ( জল কখনও খাওয়া যায় না, পান করতে হয়)।
তখন আমি বললাম, আমরা তো জল খাই বা খাবো বলি?
তোমরা ভুল বলো।
পরে বুঝতে পেরেছিলাম, সত্যিই আমরা ভুল বলি। জল ঢোঁক ঢোঁক করে গেলা যায়। খাওয়া যায় না, চিবানো যায় না। তবুও জল খাওয়ার মধ্য দিয়ে জলকে শরীরে ধারণ করার অদ্ভুত এক আহ্বান আছে। হোক না তা পান করার বদলে খাওয়া।
এই প্রবীণ বয়সে এসে, আজও বুঝতে পারি, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের সপ্তম ক্লাসের ছাত্রী সীমা জয়সোয়াল আমার ফেলে আসা সেই জীবনের জানালার কপাট খুলে সম্ভবত আজও উঁকি দিয়ে যায়। অভূতপূর্ব সুন্দরী ছিল সীমা। একেবারে পাটিওয়ালা ফর্সা। ঠোঁট দুইটি ছিল কাশ্মীরী গোলাপি, বুকের ওপরে চুলের বেণী ছিল রাশিয়ান স্তেপভূমির মতো তামাটে হলুদ।
একবার হোমসাইন্সের ক্লাসে মেয়েরা রান্না করল। ম্যাডাম ছাত্রীদের বেছে দিলেন কে কি রান্না করবে। বলে দিলেন, নিজেদের ছাত্র বন্ধুদের বেছে নিতে। ম্যাডামও ছাত্রীদের রান্না টেস্ট করে নম্বর দেবেন। মেয়েদের নির্বাচিত ছাত্র বন্ধুরাও টেস্ট করে নম্বর দেবে। সীমা আমাকে বেছে নিয়েছিল।
ম্যাডাম সীমাকে বলেছিল, আরও একজন কেউ? সীমা বলেছিল, শুধু ওকেই। এই বয়সে এসে স্মৃতি যদি খুব প্রতারণা না করে, সীমা মেথি দিয়ে পালং শাক প্রস্তুত করেছিল। স্বাদ মনে নিই। যখন কাঁচের ডিশে সে তার নিজের প্রস্তুত আমাকে দিল, তার চোখের মধ্যে কেমন জানি, এক ভাষা ছিল। কাঁচের ডিশ ধরে থাকা তার চোখের চাহনি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সংগ্রহের মধ্যে অন্যতম। আমি সেই কথা ভাবলে এখনও যেন আন্তর্জাতিক শহরের কোনও এক সংগ্রহশালার সিঁড়ি টপকে যাই। মিশরের লেখক নাগিব মাহফুজের একটি প্রেমের গল্প পড়েছিলাম। কেন জানি না, সেই গল্পটি পড়লেই আমার সীমা জয়সোয়ালের কথা খুব মনে পড়ে যায়। সীমার কথা মনে পড়বে বলেই সেই গল্পটি তাই বারে বারে পড়ি। একটি চমৎকার প্রেমের আখ্যানের মতো।
আমি ড্রয়িঙের খাতায় খুব ভালো নক্সার কাজ করতে পারতাম। কে জানে, শিক্ষার গোড়া থেকেই আমার ছবি আঁকতে খুবই ভালো লাগত, সীমা আমার সামনে প্রায়ই তার ড্রয়িঙের খাতা মেলে দিত। আমি বাংলার মাটির কুঁড়েঘর এঁকে দিতাম। ও বলত আমাদের পাটিওয়ালার গ্রামের ওইদিকে গ্রামের বাড়িগুলি অন্যরকম দেখতে। আমি অবাক হয়ে সীমাকে বলতাম, তুমি গ্রামে যাও? সীমা আরও অবাক হয়ে বলত, কেন তুমি যাওনি? আমি বোকার মতো বলতাম আমাদের গ্রাম নেই। সীমা খুব গর্বে বলে উঠত আমাদের আসল বাড়ি গ্রামেই। সীমার এই কথাটি যখন মনে পড়ে, তখন মনে হয়, প্রায় সবারই মাথার ওপরে ছাদ থাকলেও দেশ বা বাড়িঘর খুব কম জনেরই থাকে। আমি বাবার দেশ দেখি নি। মায়ের বাড়ি ছিল টাঙ্গাইল শহরের উকিল পাড়ায়। মায়ের মুখে মায়ের বাড়ির অনেক গল্প শুনেছি। মায়ের বাবা আমার দাদাভাই ছিলেন পেশায় উকিল। বাবাকে তাই মা ঝগড়ার সময় রসিকতা করে নাকে দড়ি দিয়ে বহুবার ঘুরিয়েছেন আদালতে ঘুরিয়েছেন। বাবা হাসতে হাসতে বলতেন, এই দেশ আলাদা, আইন কাছারিখানাও আলাদা। দেশভাগ হওয়ার পরে আমাদের বাড়িঘর আর কোথায়? দড়ি তুমি ওপারে ফেলে এসেছ।

Facebook Comments

1 thought on “কাশবনের ভাস্কর্য : শুভংকর গুহ Leave a comment

Leave a Reply