কার্ল ইয়ুং – কুণ্ডলিনী যোগের মনস্তত্ত্ব : অনুবাদ – অর্ঘ্য দত্ত বক্‌সী

fail

[১৯৩২ সালের সেমিনারে প্রদেয় এ বক্তৃতার মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরিচিত ভারতবর্ষকে জানা চেনার জন্য পাশ্চাত্যের অপরিসীম কৌতুহলকে কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা। এখানে কুণ্ডলিনী সাধনাকে পাশ্চাত্যের মনোবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে; এমনভাবে যা কিনা হয়তো সিদ্ধ তান্ত্রিকরাও করেন না। ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত যেমন ভারতেরই সাধারণ মানুষের কাছে শুধু সেই “আ আ আ আ …” তেমনই কুণ্ডলিনী বা তান্ত্রিক সাধনা বিষয়ে জ্ঞান আপামর ভারতবাসীর কাছেও প্রায় শূন্য, কিছুটা ভয়-ভীতি-ভক্তির ব্যাপার! সেই ধারণাগুলি প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের আপামর জনতার কাছেই আজও ৮০% অধরা। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে ধর্ম-সাধনা-যোগ বা দেবদেবী বলে যদি কিছু আসলে থেকে থাকে তার মূল আকর হল কুণ্ডলিনী যোগ। তার থেকেই প্রতীকায়নে দেবমূর্তি, পুজোয় শঙ্খ কাসর ঘণ্টা, তার থেকেই প্রতীকে বলা পুরাণ কী সৃষ্টিরহস্য (সমুদ্র মন্থন)। ব্রাহ্মণ্যবাদের নিপীড়নে বিকারগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার আগে ধর্ম বলতে শুধু এটাই বোঝাতো। এগুলি দেহগত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আবার এই অভিজ্ঞতা এক একজনের কাছে এক একরকম, তবে দেহগত বলে ( কোন আইডিয়া নয় ) সব ধর্মেই তাই এর প্রভাব কমবেশি আছে। তাই প্রাচীন ধর্মগুলির ‘গল্প’গুলো খানিকটা একরকম।
ব্যস এটাই, এখানে শুধু শরীরী-সংস্থানগতভাবেই নয়, প্রতিটি চক্রের চিত্রিত প্রতীকগুলিকে মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে যে এই শরীরী চক্রস্থানে বীর্য উঠে এলে যা অনুভূতি হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে মনেও এক আলাদারকমের ভাব জেগে ওঠে। সেই ভাবগুলিকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন ইয়ুং। তিনি নিজে যোগাসন প্রাণায়াম সবই করতেন। এছাড়াও এই বক্তৃতাগুলো গ্রন্থরূপে ও ইংরেজিতে আমেরিকায় প্রকাশিত হচ্ছে নব্বইয়ের দশকে। এবং বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা। এইসব চর্বণগুলি তাই প্রাসঙ্গিক থেকে যায়। কারণ কুণ্ডলিনী এক শাশ্বত জিনিষ ও যা যা শাশ্বত তাতেই অনুবাদকের আগ্রহ।

গত সংখ্যায় কার্ল ইয়ুং প্রদেয় প্রথম বক্তৃতার অনুবাদের ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যার অনুবাদ, তৃতীয় পর্ব]


[ছবি ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত]

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, আমরা এই ত্রিমাত্রিক জগতে যুক্তিপূর্ণ কথা বলি বা বাহ্যিকভাবে অর্থপূর্ণ কাজ করে চলেছি, কিন্তু আমরা যেন অব্যক্তি- শুধুমাত্র সমুদ্রের মধ্যে মাছের মতো। এখান থেকেই দ্বিতীয় চক্রে যাওয়ার তাগিদ তৈরি হয়। যেমন বছরের মধ্যে কোন রবিবারে বা গুড ফ্রাইডেতে গীর্জায় যেতে ইচ্ছা হয়। অথবা পাহাড়ে প্রকৃতির মধ্যে যেতেও কারো কারো ইচ্ছা হয়। এটাই হল সেই ঘুমন্ত পরিকে জাগানোর ন্যূনতম প্রচেষ্টা। ভিতর থেকে আশ্চর্য এক ইচ্ছা তাদের কিছু করাতে বাধ্য করে যা দৈনন্দিনতা নয়। সুতরাং আমরা ভাবতে পারি যে যেখানে আত্মন, মনস্তাত্ত্বিক না-অহং ঘুমিয়ে আছে- সেই রেলস্টেশনে, থিয়েটারে, কর্মক্ষেত্রে… সেখানে ঈশ্বর বা দেবতারাও ঘুমিয়ে আছে; সেই জায়গাগুলো যেখানে আমরা যুক্তিপূর্ণ এবং ততটাই যুক্তিহীন, একটি অচেতন জন্তুর মতো দশায়। এবং তাই হল মূলাধার।
তাহলে দ্বিতীয় চক্র স্বাধিষ্ঠান অবশ্যই অচেতন, সমুদ্রের প্রতীক, যেখানে বিপুলাকার জলজন্তুরা মানুষকে গ্রাস করে নেওয়ার জন্য ভয় প্রদর্শন করে। এবং আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই প্রতীকগুলো মানুষেরই সৃষ্টি। তান্ত্রিক যোগের মতো পুরাতন পদ্ধতি নিশ্চিতভাবেই পুরুষদের দ্বারা নির্মিত। তাই এতে বহুলাংশে পুরুষ মনস্তত্ত্বের প্রভাব প্রত্যাশা করা যায়। সুতরাং এই দ্বিতীয় চক্রটি যে মহান অর্ধচন্দ্র যা আসলে একটি নারী প্রতীক তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পুরো চক্রটিই পদ্মাকারে রয়েছে এবং পদ্ম যোনির প্রতীক।

জনৈকা: কিন্তু প্রফেসর হেয়ার বলেছেন যে অর্ধচন্দ্র নারী যৌনতার প্রতীক নয়, বরং এটি শিবের সঙ্গে সংযুক্ত।

ইয়ুং: সেটি প্রাচ্যের মানুষদের জন্য এবং একজন হিন্দুকে যদি বলা হয় যে, মূলাধার স্বাধিষ্ঠানের উপরে তবে তা সে মানবেই না। আবার এর সঙ্গে সূর্য বিষয়ক পুরাকথার সাযুজ্য রয়েছে বললেও সে মানবে না, যদিও সূর্য পুরাকথার প্রতীক এখানে স্পষ্ট।

জনৈকা: তাদের প্রতীকগুলো আমাদের মতো না, ওদের ঈশ্বর পৃথিবীতেই অবস্থান করেন।

ইয়ুং: স্বাভাবিক, একজন হিন্দুর তখনই স্বাভাবিক অবস্থা যখন সে আর এই স্থূল জগতে নেই। এই প্রতীকগুলি আমরা হিন্দুদের মানসিকতা নিয়ে দেখতে গেলে পুরো উলটো ফল পাব। তাদের কাছে অচেতন উচ্চস্তর, আমাদের কাছে তা নিচে। সবকিছুই আমাদের সঙ্গে একেবারে বিপরীত।
এই দ্বিতীয় চক্রের সবধরনের গুণই রয়েছে যাতে তাকে অবচেতন বলা যায়। তাহলে আমরা দেখছি যে আমাদের মূলাধার অস্তিত্ব থেকে উচ্চে ওঠা আমাদের ‘অপ’তে নিয়ে যাচ্ছে। আমি মনসমীক্ষণ করতে আসা একজন মানুষকে চিনি যিনি বারবার এবং প্রায়ই একইধরনের একটি স্বপ্ন দেখতেন। তিনি দেখতেন যে রাস্তা বা গলি দিয়ে হেঁটে বা গাড়ি করে যাচ্ছেন আর প্রতিবারই তার এই গতি বা চলাচলের অনুভূতির আনন্দদায়ক পরিসমাপ্তি ঘটছে জলের আধারের কাছে, এবং এটিই হল দ্বিতীয় চক্র।
সুতরাং রহস্যময় গোষ্ঠীগুলিতে ব্যক্তির কাছে প্রাথমিক চাহিদাই হল যে তাকে জলের মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে হবে। যে কোন উচ্চতর বিকাশের পন্থাই হল জলের মধ্য দিয়ে যাত্রা যেখানে বিপুলাকার জলদানবদের দ্বারা গ্রাস হওয়ার ভয় রয়েছে। বর্তমানে খ্রিস্টীয় দীক্ষাকরণে এই জলের ভয় নেই। কিন্তু পুরাতনপন্থী রাভেন্নায় দীক্ষাকরণ বিষয়ক মোজাইক চিত্রগুলি দেখলে (যেগুলি তৃতীয় বা চতুর্থ শতাব্দীতে নির্মিত, যখন খ্রিস্টীয় ধর্ম ও দীক্ষাকরণ রহস্যময়ই ছিল) চারটি চিত্র দেওয়ালে দেখা যাবেঃ দুটি খ্রিস্টকে জর্ডনে দীক্ষাকরণ বিষয়ক, এবং চতুর্থটি সন্ত পিটার যখন ঝড়ের মধ্যে জলে ডুবে যাচ্ছেন এবং ‘রক্ষাকর্তা’ তাকে উদ্ধার করছেন। খ্রিস্টীয় দীক্ষাকরণ একটি প্রতীকী জলে নিমজ্জন ক্রিয়া। রাশিয়ায় এখনও একে সত্যিকারের মতো করে তুলতে দীক্ষাগ্রহণকারীকে জলে ততক্ষণ পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা হয় যতক্ষণ না সে প্রায় সত্যিই মরে যাচ্ছে। এটি প্রতীকী মৃত্যু, যার থেকে নবজন্ম হয়, এক নবজাতকরূপে প্রকাশিত হয়। তারপর তাকে দুধ খাওয়ানো হয়, যেমন কীনা আটিস ধর্মবিশ্বাসে দীক্ষাকরণের পর আটদিন পর্যন্ত শুধু দুধই খাওয়ানো হয়, যেন তারা নবজাতক এবং তাদের নতুন নাম পর্যন্ত দেওয়া হয়।
সুতরাং স্বাধিষ্ঠান চক্রের বিশ্বব্যাপী ধারণাটিই হল জল দিয়ে দীক্ষাকরণ, যার মধ্যে ডুবে যাওয়া বা মকর দ্বারা গ্রাসের যাবতীয় ভয় রয়েছে। বর্তমানকালে মকরের বদলে মনসমীক্ষণ সেরকমই বিপদজনক। একজন গভীর জলে প্রবেশ করে, সেখানে জলদানবের সঙ্গে পরিচিত হয়, তার ফলস্বরূপ আবার পূর্ণসুস্থতা বা সম্পূর্ণ ধ্বংসতাপ্রাপ্ত হয়। এবং সেই সামঞ্জস্যতা যদি সত্য হয়, তাহলে সূর্যসম্বন্ধীয় পুরাকথাও সামঞ্জস্য, কারণ এই সূর্য পুরাকথার মধ্যেই গোটা দীক্ষাকরণের গল্পটি নিহিত। বিকেলবেলায় সূর্য ধূসর আর দুর্বল হয়ে পরে, ফলস্বরূপ সে ডুবে যায়, সে পশ্চিম দিগন্তে অস্তমিত হয়, এবং পূর্বদিকে নবজাতকের মতো উদিত হয়। সুতরাং দ্বিতীয় চক্রকে দীক্ষাকরণের চক্র বা পুনর্জন্মের চক্রই বলা যায় অথবা ধ্বংসাত্মকতার চক্র – দীক্ষাকরণের ফলস্বরূপ দুই হতে পারে।
আমরা এই চক্রের চিত্রের বিষয়ে বিস্তারিত আরো কিছু আলোচনা করতে পারি। তীব্র লাল রঙটি বোধগম্যতা পায়। মূলাধার খানিক অন্ধকারাচ্ছন্ন, রক্তের মতো কালচে লাল বর্ণের, এবং অন্ধ আসক্তিতে পূর্ণ। বরং স্বাধিষ্ঠানের টকটকে লাল রঙে অনেক বেশি আলো এবং এর সঙ্গে সূর্যের গতির যদি কোন সম্বন্ধ থাকে, তবে তা হল উদীয়মান বা অস্তগত সূর্যের রঙ, ভোরের বা সূর্যের শেষ রশ্মির যে আর্দ্র লাল রঙ থাকে। দ্বিতীয় চক্রের পর নবজাতকের যে উদ্ভাসন হয়, আলোর দিকে যে উদ্ভাস হয়, তার তীব্রতা বা বেশি মাত্রার সেই ক্রিয়াই হল মণিপুর ( মণি অর্থে মুক্তা বা অলংকার এবং পুর অর্থে পূর্ণতা বা সমৃদ্ধতা, একে বলা যায় মণিমুক্তোর গুপ্তধন)। কিন্তু এ বিষয়ে বিশদে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় চক্রটিকে পুরোপুরি নিংড়ে বুঝে নেব। প্রাচ্য এইসব চক্রগুলিকে নিচের দিকে নয়, ক্রমশ উপরের দিকে ভাবে। আমরা মূলাধারকে সবচেয়ে উপরে রাখি কারণ তাই আমাদের চেতন জগৎ, আর পরবর্তী চক্র তার নিচে যা আমাদের অনুভূতি, কারণ আমরা উচ্চস্তর দিয়েই শুরু করি। এটা পুরোপুরিভাবে উলটো, আমরা তাই বলব মূলাধার পেটের নিচে অবস্থিত নয় বরং তার স্থান মস্তিষ্কে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সবকিছুই একেবারে উল্টোরকম হয়ে চলেছে।

জনৈকা: কিন্তু অবচেতনের গভীরে এরা তো সবাই সমান।

ইয়ুং: এখানেই শুরু হচ্ছে অবচেতনের খেলা যা চরম ‘হ্যাঁ বা না’তে সবকিছু বোঝে। আর তাই মূলাধার যেমন উর্দ্ধে তেমন নিম্নেও। তান্ত্রিক পদ্ধতির চক্র ধারণার সঙ্গে আমাদের সাদৃশ্য রয়েছে। আজ্ঞাচক্র, সর্বোচ্চ কেন্দ্রের সঙ্গেই বা মূলাধারের কী সাজুয্য? ( হেয়ার বলেছেন আজ্ঞাচক্র অর্থে ‘command’। এটি এরূপ যেখানে মানুষ জানে যে তাকে কী করতেই হবে, এবং জ্ঞানের সহায়েই তা করতে হবে। এটি নিজের প্রতি আজ্ঞা বা মান্যতা, যেন তাকে তার সবচেয়ে বড় কর্তব্যের কথা জানানো হয়েছে)। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রশ্ন।

ইয়ুং: হ্যাঁ কুণ্ডলিনী মূলাধারে লিঙ্গের সঙ্গে একাত্ম কিন্তু ঘুমপরিদের মতো ( হেয়ার মূলাধার প্রসঙ্গে বলছেন, এখানেও আছে যোনি ও লিঙ্গ আর কুণ্ডলিনী এখানে ঘুমোচ্ছেন। যোনি লাল আর লিঙ্গ কালচে বাদামি, যা তীব্র ও পূর্ণ যৌনজীবনের প্রতীক। কিন্তু তা হৃদয়চক্রের লাল রঙের থেকে থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন যেখানে যৌনতা উচ্চতর মানসিক অবস্থায় উন্নীত, মূলাধারে যা জাগতিক অর্থে কামনাময় লাল )। এবং সেই একই অবস্থা আজ্ঞাচক্রে হয় যখন দেবী ঈশ্বর বা দেবতাদের কাছে ফিরে যান এবং ফিরে গিয়ে আবার একাত্ম হয়ে যান। আবার তারা প্রজননক্ষম, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য অর্থে। যেমন তারা নিম্নে মিলিত তেমনই উর্দ্ধে। তাই এই দুই অবস্থা পরস্পরের পরিবর্ত।
এই ব্যবস্থাকে আমাদের মতো করে বুঝে নিতে হলে আমাদের আগে এটা বুঝতে হবে যে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। তবেই আমরা তা আত্তীকরণ করতে পারব। আমরা অবচেতনে নামি, উঠি না – এটা যেন পাতাললোকের দিকে যাত্রা। রহস্যময় প্রাচীন ধর্মানুষ্ঠানগুলোও অনেক সময় মাটির নিচে হত। পুরাতন গির্জাগুলিতে সমাধিগৃহগুলি অনেকসময় মাটির সমতল থেকে নিচে প্রোথিত থাকত। মিথ্রার ( খ্রিস্টপূর্ব রোম এবং ইরানের সূর্য ও যুদ্ধের দেবতা) ধর্মানুষ্ঠানগুলোও গুহার ভিতরে বা ঘরের ভিতরে হত। এই উপাসনাস্থলগুলি সবসময় হয় মাটির নিচে হত বা ঘরকে গুহার মতো সজ্জিত করে হত। খ্রিস্টের জন্মও বেথলহেমে এক গুহার মতো বদ্ধস্থানের ভিতরে হয়েছে বলে শোনা যায় ( আটিসের উপাসনাস্থল সেই স্থানটিই ছিল বলে জনশ্রুতি। যার জন্য বর্তমানে আটিসের সঙ্গে খ্রিস্টের সাযুজ্যের কথা প্রমাণিত হচ্ছে)। সন্ত পিটারের যে মূর্তি এখন রোমে স্থাপিত তার জায়গায় আগে আটিস ধর্মবাদীদের বলিদানের মাধ্যমে রক্ত দিয়ে দীক্ষাকরণের ক্রিয়া হত। এবং আটিস ধর্মবিশ্বাসীদের সর্বোচ্চ পুরোহিতদের এমনকি ‘পাপাস’ বলে সম্বোধন করা হত, এবং পোপ যিনি আগে ছিলেন শুধুই রোমের ধর্মাধ্যক্ষ তিনিও তার নাম ও পদমর্যাদা এখান থেকেই নিয়েছেন। আটিস নিজেও ছিলেন মরণশীল ও পুনর্জন্মময় দেবতা – যা সত্যিকারের ইতিহাসের পুনরাবর্তন ঘটায়।

জনৈকা: এই ইংরাজি আলোচনাসভায় আমরা যে যে দর্শন (ভিশন) নিয়ে আলোচনা করেছি তাতে সবসময় প্রাথমিকভাবে নামা আর তারপর ওঠা হয় বলে বলা হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না কিকরে তার ক্রম বদলানোর পক্ষে যুক্তি দেওয়া যাবে?

ইয়ুং: আপনি মূলাধার থেকে শুরু করলে নামতে থাকবেন, কারণ এটিই তখন সবচেয়ে উপরে আছে।

জনৈকা: কিন্তু মূলাধার তো মাটির নিচে আছে।

ইয়ুং: না, এটা যে সবসময় মাটির নিচেই থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই, এটি মাটি বা পৃথিবী বিষয়ক। এটা শুধুই কথা বলার ধরন বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। আমরা পৃথিবীর উপরে বা পৃথিবীর মধ্যে আছি। পূর্বের যে নারীটি শিকড়ে আবদ্ধ ছিলেন তিনি আসলে তার ব্যক্তিগত জীবনের সীমাবদ্ধতাতেই আবদ্ধ ছিলেন। বাস্তবেই তিনি সেরকম প্রকৃতিরই, তাই তিনি নিজের জীবনের দায়িত্বগুলির দ্বারাই আবদ্ধ; নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব এবং এরকম সব। তার কাছে সমীক্ষণে আসা নিশ্চিতভাবেই উর্দ্ধস্তরে যাওয়া, কিন্তু তা বলে জলের মধ্যে ‘নামা’ এই ব্যাপারটির প্রস্তাবনাকে আপত্তিজনক করে তোলে না। যিশু কিছু বেয়ে উঠতে উঠতে জর্ডনে পৌছোননি ( আমরা আগেই বলেছি সেখানে যিশুর জলেই দীক্ষাকরণ হয়েছিল- অ )।

জনৈকা: আপনার কি মনে হয় না যে প্রাচ্যের অবচেতন বিষয়ক ধারণা আমাদের থেকে ভিন্ন? তাদের অবচেতন যেন সম্পূর্ণ অন্য জিনিষ। এবং সংস্কৃত পুঁথি পাঠ বা বেদ পাঠের মাধ্যমে তাকে বোঝা যেতে পারে।

ইয়ুং: অবশ্যই। তবে আমরা সে বিষয়ে যেহেতু অতটা জানি না তাই তা নিয়ে খুব ভাবনার কারণ নেই। আমি বেশ কিছু এজাতীয় পুঁথি পড়েছি কিন্তু তাও আমি এটা পরিষ্কার বোধগম্য হয়নি। আমি এক হিন্দু পণ্ডিতকে মণ্ডলাকার চক্রগুলির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যিনি সংস্কৃতজ্ঞ। তিনি জানালেন এগুলি শারীরস্থানগত এবং এর সঙ্গে দার্শনিক অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই। এই ধরনের ধারণা তাদের মধ্যে স্থান পায় না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন।

জনৈকা: ওরা আমাদের মতোই বহুমতে বিভক্ত।

ইয়ুং: প্রাচ্য এবিষয়ে বহুমতে ও বহুগোষ্ঠীতে বিভক্ত। তারা অচেতনকে স্বীকৃতি দেয় না। আর চেতন বলতে আমরা যা বুঝি তার খুব সামান্যই তাদের ধারণাগত। তাদের বিশ্ববীক্ষা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সুতরাং এ বিষয়ে আমরা ততটুকুই বুঝব যতটা আমরা আমাদের পরিভাষা দিয়ে বুঝতে পারি। তাই আমি একে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বোঝাতে চাইছি। আপনাদের আমি বিভ্রান্ত করার জন্য দুঃখিত, কিন্তু একে আক্ষরিক অর্থে নিলে আপনারা আরো বেশি বিভ্রান্ত বোধ করবেন। যদি আপনারা ভেবে থাকেন পাশ্চাত্য মনের মনস্তত্ত্ব দিয়ে আপনারা একটি আপাত হিন্দু ধর্মপ্রণালী গড়ে তুলবেন, আপনি তা করতে পারবেন না বরং নিজের চিন্তাকে বিষময় করে তুলবেন। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে যে আমাদের তাই করতে হবে, কারণ আমাদের অচেতনের গঠন একইরকম – আমাদের এই পদ্ধতিতেই এগোতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে বা মেনে নিতে হবে যে মূলাধার হল এই পৃথিবীর জীবন, এবং এখানে দেবতারা ঘুমিয়ে আছেন। তারপরই আমাদের আধ্যাত্মিক রূপান্তরণ হবে- আমাদের অচেতনেরও এবং তাকে আগের থেকে উঁচু কোন অবস্থা থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে বোধ করা যাবে, কারণ তখন আপনি জীবনকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখবেন। এবং সেই দশা আপনি শুধুমাত্র কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করার মাধ্যমেই প্রাপ্ত করতে পারেন। ( মূলাধারে কুণ্ডলিনী সুপ্ত। সুপ্তভাবেই সক্রিয়, যে সক্রিয়তা আমাদের বাহিরকে দেখায়। এর মাধ্যমে মানুষকে এই রূপ-গুণের জগতের বন্ধনে বাধ্য হয়ে আবদ্ধ থাকতে হয় আর বিশ্বাস করতে বাধ্য হতে হয় যে তাদের অহং আর তাদের আত্মন এক। কুণ্ডলিনী হল প্রচ্ছন্ন চিৎ (consciousness) এবং জেগে উঠলে সে তার প্রভুর কাছে ফিরে যায়। জীব-আত্মার (individual consciousness) পরিবর্তে সে হল বিশ্ব-চেতন ( world-consciousness )।
এখন কুণ্ডলিনী প্রকৃত অর্থে কী এবং তাকে কীকরে জাগানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা করব। ( হেয়ার বলেছেন – কুণ্ডলিনীকে এখানে পুরুষের যৌন-শক্তি ভাবার কোন কারণ নেই, বরং তা একটি নারীশক্তি যা শুদ্ধ জ্ঞান ছাড়া আর কিছুই নয়; নারীশক্তির ভিতরে জ্ঞানের একটি শক্তি বিদ্যমান থাকে, একটি বল যার সঙ্গে যৌনতার কোন সম্বন্ধ নেই। একেই মুক্ত করে দিতে হবে যাতে সে পুরুষের জ্ঞানের শক্তির সঙ্গে মিশে বিকাশের চরম বিন্দুতে পৌঁছোতে পারে।) প্রফেসর হেয়ার এখানে বলেছেন, উচ্চতর সত্তা থেকে আসা কিছু প্রণোদনা/ধাক্কাই কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করে তোলে এবং এও বলেছেন যে একে জাগানোর জন্য মানুষের শুদ্ধ বুদ্ধি বা শুদ্ধ প্রাণবন্ততা থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয় চক্রে যেতে গেলে সেই সর্পকে জাগাতে হবে এবং সর্পকে সঠিক মানসিকতা দ্বারাই জাগানো সম্ভব। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে ব্যক্ত করলে এর মানে দাঁড়ায় যে অচেতনের দিকে একটিমাত্র উপায়েই এগিয়ে যাওয়া যায় এবং তা হল শুদ্ধ মন, সঠিক মানসিকতা আর স্বর্গদেবতাদের আশীর্বাদ- যাই কীনা কুণ্ডলিনী। মানুষের মধ্যে কিছু তো একটা, একটি তাড়না থাকে যা তাকে এর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেটা না থাকলে কৃত্রিমভাবে কিছু করা যায় না। সুতরাং মানুষের মধ্যে অদ্ভুত কিছু, কোন তীব্র স্ফুলিঙ্গ, কোন উদ্দীপক যা তাকে জলে ঝাঁপাতে বাধ্য করে আর দ্বিতীয় চক্রে নিয়ে যায়। তাই হল কুণ্ডলিনী, যা পূর্ণত ধারণাতীত; যা নিজেকে ভয়, স্নায়ুরোগ বা প্রবল আগ্রহের মাধ্যমে প্রকাশিত করে; কিন্তু আর যাই হোক না কেন, তা মানুষের ইচ্ছাশক্তির ক্ষমতার থেকে অনেক উচ্চশক্তির। তাই এত সহজে কেউ এর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারে না। প্রথম বাধাটি এলেই, যেই মকরের সম্মুখীন হয় সে পালিয়ে আসে। কিন্তু যদি সেই জোরালো ডাক, সেই তাগিদ, সেই চাহিদা তাকে দিয়ে ঘাড় ধরে কাজটি করিয়ে নেয় তবে আর ফিরে আসতে পারে না; তাকে তখন সেই অবস্থার সম্মুখীন হতেই হয়।
আপনাদের মধ্যযুগের একটি বই থেকে বিখ্যাত ‘পলিফিওর স্বপ্ন’ নামে একটি উদাহরণ দেব যার বিষয়ে আমি আগেও বলেছি।। এটি পঞ্চদশ শতকের একটি বিখ্যাত রোমান বংশের খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসীর দ্বারা লিখিত। তিনিও অবচেতনে ডুব দিয়েছিলেন, যে অর্থে আমরা ধরি। এই কাহিনিকে দান্তের ইনফেরনোর মতো শুনতে লাগবে কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য নিহিতার্থ নিয়ে পরিবেশিত। তিনি দেখলেন যে তিনি কোনো ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন; তখনকার দিনের ইটালীয়দের কাছে যা সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান বা অভিযানে যাওয়ার জন্য হলেও চূড়ান্ত সীমা; যেখানে তখনও ইউনিকর্নরা ঘুরে বেড়ায় আর তা এখন আমাদের কাছে মধ্য আফ্রিকার জঙ্গলের মতোই অপরিজ্ঞাত। তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন আর একটি নেকড়েকে দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে তিনি ভয় পেয়ে যান, এবং তারপর ওই নেকড়ের পিছন পিছন গিয়েই একটি ঝরণা দেখতে পান ও জলপান করেন – যা কীনা খ্রিস্টীয় দীক্ষাকরণের ইঙ্গিত। তারপর তিনি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত পুরাতন রোমান শহরের কাছে এসে পরেন। তিনি তার প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢোকেন এবং বিবিধ মূর্তি ও অদ্ভুত সব প্রতীকী খোদাই লিপি দেখতে পান যা তিনি ব্যক্ত করেন এবং যার মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অপরিসীম। তারপর হঠাৎ তিনি ভীতি অনুভব করতে থাকেন ও বিপদগ্রস্ত বোধ করতে থাকেন। তিনি ফিরে যাতে চেয়ে আবার সেই প্রবেশদ্বারের কাছে যান কিন্তু সেখানে এক ড্রাগন বসেছিল যে তার বাইরে যাওয়ার পথ বন্ধ করে রেখেছিল। তাই তিনি আর পিছনে ফিরতে পারলেন না এবং এগিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। সেই ড্রাগন হল কুণ্ডলিনী। মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় কুণ্ডলিনী হল তাই যা মানুষকে চরম দুঃসাহসিক কোন অভিযানে নিয়ে যায়। কিন্তু যদি একবার ভয় পেয়ে ফিরে আসি তবে আমার গোটা জীবন থেকে অভিযানের মানসিকতা মুছে যাবে, তারপর আর জীবনে জীবন বলে কিছু থাকবে না, জীবনের সব রঙ আর স্বাদই হারিয়ে যাবে। এই হল কুণ্ডলিনী – যা জীবনকে যাপন করতে শেখায়, এই সেই পবিত্র তাগিদ, পরমের ইচ্ছা। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যযুগের নাইটরা যারা হারকিউলিসের মতো বড় বড় দুঃসাহসিক কাজ করত আর ড্রাগনের সঙ্গে লড়াই করে রাজকুমারীকে উদ্ধার করত – তারা সেই সব কিছু যে নারীর জন্য করত তাই হল কুণ্ডলিনী।

জনৈকা: তিনি কি অ্যানিমা (পুরুষের অন্তর্স্থিত নারী)?

ইয়ুং: হ্যাঁ, অ্যানিমাই কুণ্ডলিনী। ( ইয়ুঙের কুণ্ডলিনীকে অ্যানিমা বলার উল্লেখ তার The serpent power গ্রন্থেও দেখা যায়। “মহিলাটি হলেন অন্তর্গত নারী”- এমন কথা বলা হয় যখন এ প্রসঙ্গ আসে যে ‘আমার জাগতিক নারী দিয়ে কি হবে? আমার নিজের মধ্যেই এক অন্তর্গত নারী বিদ্যমান’।) সেইজন্যই হিন্দুরা যতই এই অর্ধচন্দ্রকে পুরুষ বলুক, আমি এই দ্বিতীয় চক্রটিকে প্রবল নারীশক্তি বলি, কারণ জল হল পুনর্জন্মের গর্ভাশয়, দীক্ষাকরণের জলঝরণা। চাঁদ অবশ্যই একটি নারী প্রতীক এবং আমার বাড়িতে একটি তিব্বতী ছবি আছে যেখানে শিব নারীরূপে শ্মশানে মরদেহের উপর নৃত্য করছেন। সবধরনের প্রাচীন অনুষ্ঠানে চাঁদকে মৃতদের আত্মার আশ্রয়স্থলরূপে ধরা হয়। আত্মারা মৃত্যুর পর চাঁদে যায় এবং চাঁদ তাদের প্রসব করে সূর্যকে দেয়। প্রথমে সে মৃত আত্মায় ভরে যায় – তাই হল গর্ভাবস্থার পূর্ণচন্দ্র – তারপর সে তাদের সূর্যের কাছে পাঠায়, যেখানে আত্মারা নবজন্ম লাভ করে। সুতরাং চাঁদ হল পুনর্জন্মের প্রতীক। এবং এই চক্রেও চাঁদের অবস্থান নিচের দিকে, কাপের মতো, যেখান থেকে আত্মাদের নৈবেদ্য উর্দ্ধতন চক্রগুলিতে যায়, যারা হল মণিপুর ও অনাহত। এখানেও সূর্য বিষয়ক পুরাকথার ইঙ্গিত আবার পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

Leave a Reply