ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী-র কবিতা

fail

(১)

অনেকদিন ধরে আলোচনা চলছিল, আজ শেষ বৈঠক । গোল টেবিলের চারপাশে সবাই গম্ভীর মুখে বসে আছে। প্রথমে গ্রাভিটি বলে উঠল, “আপনাদের কি মনে হয়? আমরা ভালোবাসা কে কোর কমিটি তে রাখতে পারি ?“ সবাই এক বাক্যে বলে উঠল, “ওর প্রকার তো আলাদা, না হলে তো আপত্তির কিছু ছিল না।”
“কিন্তু সেটা তো আপ্লিকেশ্ন রিজেকশনে বলা যাবে না। আপনাদের ভাবতে হবে, ভাবুন? আমি বলি কি ওকে নিয়ে নিন, এরকম এলিটিস্ম ভালো না। একটু ভালো করে ভেবে দেখুন আমাদের সবার রুপক কিন্তু ওর মধ্যে ভালো ভাবে রয়েছে। যদিও এই নিয়ে ও কোনও দাবি পেশ করেনি। আর ওর জন সংযোগ টাও ভালো।”
অনেক আলোচনার পর সবার ধারনা হল যা দিনকাল পড়েছে, নিজেদেরকে আপডেট করতে হবে। কাল সেই ইতিহাসিক ঘোষণা হতে চলেছে, যে ভালোবাসাকে পাঁচ নম্বর মৌলিক বল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

(২)

নিঃশব্দ অনেকদিন ধরে জায়গা খুঁজছিল। অজস্র লাইনের মাঝে, কবিতার মাঝে, গদ্যের মাঝে। যদি কোনোভাবে দেহ টাকে ঢুকিয়ে নিতে পারে তাহলে এবারের মত ঠাঁই হয়ে যাবে।
যদিওবা জায়গা পেল, শব্দের সাথে শব্দের ধাক্কা ধাক্কিতে বেরিয়ে আসা রক্ত তার উপর দিয়ে বয়ে গেল, কেউ টেরও পেল না। এরকমই চলতে লাগল, তারপরে একদিন এক জ্ঞানী ব্যাক্তি এসে তাকে স্টেজে তুলে চেয়ারে বসিয়ে দিল। এবং তাকে দেখিয়ে সবাইকে বলল, “এঁকে দেখে আপনারা শান্তি পাবেন।”এরপরে নিঃশব্দকে রোজ হাজিরা দিতে হয়। তার এসব ভালো লাগেনা, এই মহৎ মহৎ খেলাটা। সময় পেলে এখনও তার জন্য ফাঁকা জায়গা খুঁজতে থাকে।

(৩)

কুশল রোজ আসে তার বাড়িতে। ডাকবাক্সে একটা করে চিঠি ফেলে চলে যায়। কোনদিন তাতে লেখা থাকে,”সব খবর ভালো তো?” আর কখন লেখা থাকে,”শরীর ঠিক আছে তো?” কুশল বাড়তি প্রশ্ন করে না। পরের দিন ডাকবাক্সে আগের দিনের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায়। কুশল উপাসনা করছে আজকাল সংযম শিখবে বলে। এরপর সব চিঠি গুলো পাশের খালি জমিতে পুঁতে দেয় আর জল দেয়, সার দেয়। অনেকদিন পরে তার থেকে বড় বড় গাছ হয়। বুড়ো কুশল সে গাছ থেকে নতুন করে অক্সিজেন পায়। আর দেখে সেই গাছের ছায়ায় অনেক নতুন ছেলে মেয়ে বসে আছে। সংযমের কথা ভেবে তৃপ্ত হয়।

(৪)

প্রতিমাসে নৌকা করে এক একজন পাপী আসে দার্শনিকের কাছে। আর একটি করে মৃত প্রজাপতি দার্শনিকের কাছে জমা রেখে যায়। দার্শনিক কিছু বলে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। দার্শনিক সেই সব প্রজাপতি কবর দিয়ে ফেলে। তারপরে কাদা দিয়ে সেই সব প্রজাপতির মূর্তি বানিয়ে বেদীর উপর রাখে। আর উপাসানা করে। উপাসনার দিন পাপীরাও আসে, চুপ করে বসে থাকে আর উপাসনা দেখতে থাকে। একবছর পর আর কোনও পাপী মৃত প্রজাপতি নিয়ে আসে না । অনেকদিন চলে যায় কোনও পাপী আসেনা আর দার্শনিক কি উপাসনা করবে বুঝে উঠতে পারেনা। দার্শনিক তার কুটির ছেড়ে চলে যায়, পাপী খুঁজতে। পাপী সে খুঁজে পায় কিন্তু তাদের কারুর কাছে মৃত প্রজাপতি নেই। প্রজাপতি কি জিনিস তারা জানে না আর কেউ কেউ জানলেও তারা কখন প্রজাপতি পোষে নি।

(৫)

“আপনি খুব ভালো মানুষ” বলাতে যৌন গন্ধ সেখানে আর দাঁড়াল না, সোজা হাঁটা দিল। বাড়ির লোক সবাই অবাক হয়ে গেল, “এ কি কোথায় যাচ্ছেন?”। “না, আমি আজ যাই” বলে সে বেরিয়ে গেল। এমনকি ভালো মানুষ ও তাকে ডাকল “ভাই, যাস না” বলে। “তুই থাক, আমি চায়ের দোকানে আছি। বেরনোর সময় ডাক দিস।” বলে সে বেরিয়ে গেল। চায়ের দোকানে গিয়ে দুটো চা আর দুটো সিগারেট খায়। ভালো মানুষের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে চায়ের দোকান থেকে উঠে এদিক ওদিক হাটতে লাগল। সামনের মাঠে গড়াগড়ি খেতে খুব ইচ্ছা হয়। ভাবে যেন ঘাসগুলো সব সজীব হয়ে উঠবে। একটু দূরে একটা পুকুর ছিল, সেখানে কিছু জেলে মাছের জাল ঠিক করছিল। সেখানে গিয়ে বসে ওদের কাজ দেখতে থাকে। দূরে তাকিয়ে দেখে ভালমানুষ এদিক ওদিক খুঁজছে, সঙ্গে অনেক উপহার টুপহার নিয়ে এসেছে, ধরে রাখতে পারছে না, ওকে খুঁজছে আর ডাকছে। ভাবে আর সাড়া দেবে না, অনেক হয়েছে, এবার থেকে একলা থাকবে। বার বার নানান অনুষ্ঠানে গিয়ে অপমানিত হওয়া তার পোষাচ্ছে না।

(৬)

অনেকদিন পর ম্যাজিক তার গ্রামে ফিরে এল। ফিরে এসে সে চমকে যায়। দেখে গ্রাম অনেক বদলে গেছে। কেউ তার দিকে অবাক চোখে তাকাচ্ছে না। সমীহ করছে না। সে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘোরাঘুরি করে। তারপর ক্লান্ত হয়ে মাঠে বসে পরে। সেখানে বাচ্চাদের খেলতে দেখে আবার নতুন করে উৎসাহী হয়ে পরে। কিন্তু তাদেরকে নানান রকম খেলা দেখাতে গিয়ে হতাশ হয়। কারণ তারা হাসে আর বলে যে তারা ম্যাজিক আর বিজ্ঞানের তফাত বোঝে। বলার সাথে সাথে সত্যিকারের ম্যাজিক হয়, বাচ্চারা সব ব্ড় হয়ে যায়। তাতে তারা ভীষণ রেগে গিয়ে ম্যাজিককে তাড়িয়ে দেয়। ম্যাজিক এর পর ভীষণ কষ্ট পেয়ে সব ছেড়ে দাড়ি গোঁফ রেখে জঙ্গলে ধ্যান করতে চলে যায়। কয়েক বছর পর বড় হয়ে যাওয়া বাচ্চা গুলো ম্যাজিকের কাছে আসে আর পার্থনা করে যে সে যেন তাদের বয়স কমিয়ে দেয়। ম্যাজিক কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা, কারণ এমন পদ্ধতি তার জানা নেই। লোক গুলোকে ভালো করে দ্যাখে আর বোঝার চেষ্টা করে যে তারা কি আদৌ তাকে চিনতে পেরেছে?

Facebook Comments

Leave a Reply