যখন সবাই ছিল সংখ্যালঘু অথবা বাথরুমের জানলা থেকে চাঁদ দেখা যাচ্ছে : নীলাব্জ চক্রবর্তী

fail

যখন সবাই ছিল সংখ্যালঘু অথবা বাথরুমের জানলা থেকে চাঁদ দেখা যাচ্ছে

শেষ পর্ব

৩৫

ঊরু এক বঙ্কিম জিজ্ঞাসা যেন। চিহ্ন হয়ে কুসুমে কুসুমে। লাল রঙের একজন নীল ছায়া হয়ে। ঈষৎ বাদামী ঘাসের দেশ। লিখতে লিখতে তবু স্মৃতির মতো কী যেন জ্যামিতির মতো আচ্ছন্ন। কোথাও পৌঁছবে না যে উভমুখী কথোপকথন। অভ্যাস, আসলেই একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বাক্যের সাধনা। ট্যাক্সি! ভেঙে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহের রাত। মাত্রা একটি চতুর্থ যাপন। যে সব বুদ্বুদ…

# * # * #

জুট মিলের কাছে
এই প্রথম
সন্ধ্যা আসে
এইসব ছদ্ম বৃষ্টির ওপর
কমলা রঙের একটা কালো বাক্স
কোথাও কিছু নেই
অর্থাৎ
একটা কাল্ট সুর হয়ে
সারাদিন আমার ভেতর এক নীলগঞ্জ রোড
ঝরছে
তার
খুব অন্যমনস্ক আঙুল
ফাঁপা শব্দগুলোর ভেতর বৃন্ত হয়ে
যেভাবে
ভাষার কাছে ফিরে গেছে জল…

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

এখানে স্বপ্ন ডিজাইন করা শেখানো হয়

জাস্ট দরজাটা ঠেলুন

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

# * # * #

— ভোজনের আয়োজন হইতে না হইতেই শয়নাকাংক্ষা ব্যক্ত করা!
— শুতে চাইনি তো এখনও…
— চাইলেও লাভ নেই…

*

নীচের অপশনগুলির মধ্যে থেকে ঠিকটি বেছে নিন –

ক) উপরের কথোপকথন সত্যিই ঘটেছিল
খ) উপরের কথোপকথন কখনোই ঘটেনি
গ) ক এবং খ – দুটোই সত্যি

# * # * #

— কাল একবার ফোন করব। কখন সময় হবে তোমার জানিও…

— উপন্যাসটা শেষ হয়ে এল। হাতটা একটু ধরি?

— আচ্ছা শোনো না, একটা কথা বলো তো… তুমি কি ঘুরেফিরে সারাদিন সারারাত বিষম খাও? জিভে কামড় খাও? … সারাদিনরাত… মাঝেমাঝেই? বারবার…

— ওসব সাহিত্য-ফাহিত্য আমি বুঝি না… বলছি তো, বুঝি না। শুধু ধাক্কা খেতে খেতে ভেঙেচুরে যাওয়া ভাষাটার কাছে থাকতে ভাল লাগে আমার…

— ১৯৭৩ সাল থেকে কলকাতা বন্দরের একটা ডকের নাম থেকে সুভাষচন্দ্র বসুর নামে। আর, গত বছর থেকে পুরো বন্দরটাই শ্যামাপ্রসাদের নামে করে দেওয়া হল! বাহ বাহ, একজন তথাকথিত নেতাজীভক্তের কাছে এটা বিরাট গর্বের ব্যাপার, না? বিরাট সম্মান দেওয়া হল নেতাজীকে, না? নিজেকে নেতাজীভক্ত বলে দাবী করে শাসকের দালালি করতে লজ্জা করে না?

— আজ আমি শ্রেয়সীকে স্বপ্নে দেখব বাবা… আমি, স্বস্তিকা, আহেলী আর শ্রেয়সী সবাই মিলে কালো জামা পরে আইসক্রিম খাচ্ছি… বৃষ্টি আসছে… মাঠের মধ্যে দৌড়চ্ছি… এমন দেখব… ওরা কেউ আমায় চিনতে পারছে না… কেউ ‘বংশিকা বংশিকা’ বলে কাউকে একটা চিৎকার করে ডাকছে এমন একটা স্বপ্ন দেখব আজ…

— রিঅ্যাকশন টাইম এত বেশী হলে কীকরে চলবে নীলুবাবু? হ্যাঁ ঠিকই, তুমি সরাসরি আমার কাছে চাকরী চাওনি বটে, তবে আমি ভেবেছিলাম… রানিং কাজটা ছেড়ে দিলে, জানালে, তুমি আগে আমাদের সাথে এত বছর কাজ করেছ… ফিরে এলে তোমারও ভাল হয়, আমিও, বুঝলে, বয়েস হচ্ছে আস্তে আস্তে, নিশ্চিন্ত হই… সেই সব ভেবেই তোমাকে বললাম ভেবে দ্যাখো, জয়েন করে যাও এখানে… তুমি সময় নিলে দুমাস… তারপর তো তিনমাসের ওপর পার হয়ে গেল… আর যোগাযোগই করলে না… স্পষ্ট করে হ্যাঁ না কিছু তো জানাবে একবার নীলুবাবু…

— সর্ষে ফোড়ন, আদা ফোড়ন, পাঁচ ফোড়ন মিশিয়ে উচ্ছে ছাড়া তেতোর ডাল করা যায় লাউ দিয়ে… জিরে ফোড়ন দিয়ে, লাউ দিয়ে, ধনেপাতা দিয়ে মুগ ডাল করলে সেটা আবার অন্য হয়ে গেল… সেটাও খুব টেস্টি হয় খেতে… আবার লাউ দিয়েও মটর ডাল রান্না করা যায়…

— আরে! সবসময় খালি রাম-রহিম রাম-রহিম… কেন? প্রতিমা আর ফতেমাকে নিয়ে কিছু বলা যায় না? কখনও? একবারও?

— আজকাল খালি মনে হয় লম্বনভ্রমের মতো চুম্বনভ্রম বলে একটা শব্দ থাকলে বেশ হতো…

— সারা ভারতে সুধু কমল ছাপ কণ্ডোম মিলিবে বাবু ইবার থিকে… আর কুচ্ছু মিলিবে না… দেখিয়ে লিবেন… সুধু কমল ছাপ কণ্ডোম… দেস কি সব দুকানে শুধু কমল ছাপ… চারো দিকে… সব কোম্পানি সুধু কমল ছাপই বানাইবে বাবু… এক দেস এক কণ্ডোম… পুরা মুলুক ছেয়ে যাবে বাবু কমল ছাপ কণ্ডোমের প্যাকেটে… হর ফ্যাক্টারিমে কমল ছাপ কণ্ডোম… হর গলিকে হর দুকানমে কমল ছাপ কণ্ডোম…

— দেবা দেবা… তোমার ভাইটা একেবারে পাগলের মতো ভাল… এমন একেকটা কথা লেখে… এই মাঝরাতে আমার চোখে জল এসে গেল…

— মেজাজ খারাপ না তো?

— কী অদ্ভুত একটা ব্যাপার হঠাৎ খেয়াল করলাম, যেদিন পছন্দের বোতলটা হাতের কাছে থাকে, জল বেশী খাওয়া হয় কাজের সময়…

— আমরা বারবার কেন হেরে যাই বলো তো…

— কখনও যদি বই হয়ে বেরোয় এই উপন্যাস, উৎসর্গপত্রটা ভাল করে লিখতে হবে…

— এসো, ভাষাহীন হই…

৩৬

পাড়ার লোহাবাবুরা ওদের বাড়ির ছেলের বিয়ে আর বৌভাত উপলক্ষে ক’দিন বক্স ফক্স এনে খুব জোরে হিন্দি গান-টান বাজালো। পুবদিকের সব জানলা বন্ধ রাখা হল ক’দিন। বাবার ছোটকাকা মানে আমার ছোড়দাদুর বাড়িও ঠিক পুবদিকেই। বিপিনবাবুর বাড়ি, একদা বলত লোকে। একদা নকশাল ছোড়দাদু মারা গেছে বহুদিন, ফ্ল্যাট উঠছে ওই বাড়িতে… বাথরুমের জানলা থেকে চাঁদ এখনও দেখা যায় বটে… সম্ভবতঃ আর ক’দিন পরে আর দেখা যাবে না…

# * # * #

অথচ ভাষার কাছে
রেখে আসা
এই বাক্য
দেখতে দেখতে ফেটে যাওয়া ছবির ভেতর
একটা গোটা দিন
ঢুকে যাচ্ছে
মাংসে
নুনে
পাথরে
স্ক্রিনশট নেওয়া হচ্ছে বলে
তোমারই রেফারেন্সে
ছায়া
খুব ক্যাজুয়ালি
মনে মনে
ঘনিয়ে উঠছে…

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

স্বপ্নের চেয়ে অত্যাশ্চর্য কোনও চলচ্চিত্র কখনও দেখিনি

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

# * # * #

কালো ডায়েরি

প্রিয় শেখর দা,

অনেক ধন্যবাদ। এত ব্যস্ততার মধ্যেও এতগুলো লেখা পড়ে আপনি যেভাবে যত্ন করে উত্তর দিয়েছেন… সত্যি, এ আমায় আপ্লুত করে বস। অফিস, বাড়ি, বউদির অসুস্থতা… আপনার ওপর দিয়ে কেমন যাচ্ছে সময়টা, আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারি। নিজেও কাজকর্ম, বাড়ি – এসবে বিব্রত থাকি আজকাল… কিছু করার নেই…

আবারও সবিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই… আমাকে, কবিতাকে আর আমার কবিতাকে – এই তিনজনকে আপনি ভাল না বাসলে এই চিঠি আমি পেতাম না। সবটা মনে রাখব, মনে রাখি… তবে, তরুণ দা-র কবিতার সাথে বহুদিন তেমন সম্পর্ক নেই আমার… কী জানি, কিছু চিহ্ন, লক্ষণ হয়তো রয়ে গেছে এদিক-ওদিক… আরও সতর্ক হব… নিরন্তর ভাবি, কবিতার ভাষা ও প্রকরণ নিয়ে… দেখি… লেখা একটু বেশী হচ্ছে আসলে হয়তো… কমালে ভাল হয় হয়তো… ইচ্ছে করে আসলে অনেক লিখতে… যতটা পারি…

আপনি যে ক’টি কবিতা “বিশেষ ভালো লেগেছে” জানিয়েছেন, খুঁটিয়ে পড়লাম আবার নিজে… আনন্দের…

আর, যে শব্দগুলোর কথা লিখেছেন “রঙ, সুর, বরফ ও পাখি” — এগুলো এবং আরও কিছু কিছু… “কাঁচ, বোতাম, ভ্যালেনটিনা, ছায়া…” নিজেই টের পাই, এরা বারবার চলে আসে আমার কাছে… পেয়ে বসে আমায়… এড়াবার চেষ্টা করব বস… আরও অন্যরকম চেষ্টা করব… কথা দিলাম নিজেকে… এ তো কন্টিন্যুয়াস প্রসেস… যে সিনট্যাক্স যে স্টাইল যে এবড়োখেবড়ো রাফ সারফেস আজ ভাল লাগছে কাল আস্তে আস্তে সেগুলোই অন্যরকম হয়ে যাবে… হতেই হবে…

ভাল থাকবেন… ভালবাসি আপনাকে…

নীলাব্জ

সবুজ ডায়েরি

স্বপ্ন দেখলাম লুডো খেলছি তোমার সাথে। লুডোই, তবে অন্যরকম, অন্য ভাবে, অন্য স্কেলে, অন্য ডায়মেনশনে। অমিয়ভূষণ মজুমদার রাজনগর না নয়নতারা কোথায় যেন লিখেছিলেন দাবার মতো খোপ কেটে চালে দিয়ে দিয়ে দুদলের পদাতিকদের মধ্যে অসিযুদ্ধের কথা, সেরকম অনেকটা। প্রাকৃতিক এবং আক্ষরিক অর্থেই ত্রিমাত্রিক বোর্ড যেন, ছক্কা চালার মতো পাথর গড়িয়ে পড়ছে টিলা থেকে নদীতেও পড়তে পারে, ঝোপঝাড়ে আটকেও যেতে পারে, তারপর আবার পরের চাল দেওয়া হবে… সে খেলায় কীই বা পয়েন্টসিস্টেম আর কীই বা হারজিত, স্বপ্নে অত ব্যাখ্যা পাইনি তার আর।

নীল ডায়েরি

লোকটা এখান দিয়ে বাড়ি ফেরে। সময়ের ঠিক নেই। কোনোদিন আটটা, কোনোদিন সাড়ে ন’টা। এই পার্টি অফিসটার সামনে দাঁড়ায় খানিকক্ষণ। সামনে দিয়ে একটা দুটো এসি ফিফটি ফোরের যাতায়াত দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কোনও কোনোদিন একটা থামস আপ কিনে খায়। একটা টোটোতে ওঠে। বাড়ি গিয়ে রোজ বুকাওস্কির একটা বই খুলে ঠিক ৭৮ নম্বর পাতায় চলে যায়… ওখানে লেখা আছে, ‘ক্রিসমাস আসছে একটা হারপুনের মতো।’ ওখানে লেখা আছে, ‘আমরা কাগজের মতো পাতলা।’ লোকটা রোজ এই বাক্যদুটো পড়ে… তারপর চলে যায় বুকাওস্কির ওই বইটারই ৬১ নম্বর পাতায়… পড়তে থাকে ‘আমি চিরকালই বলেছি, একজন লেখকের কাজ হল লেখা। এইসব বালের লোকজন খানকির ছেলেদের জন্য আমি যদি জ্বলে পুড়ে যাই সে দোষ আমার। ওদের প্রতি আমার আর কোনো উৎসাহ নেই।’

কিছুদিন আগেও লোকটা ছুটির দিনে বিকেলবেলা মাঝে মাঝে রিক্সায় চড়ে যেতে যেতে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকত… নাকি আকাশের ম্যাপ দেখত… কোথাও মাথার ওপর একরকম গাছ, কোথাও অন্যরকম, কোথাও আবার গাছ নেই… রিক্সা চড়ে কোথাও যাওয়ার এইটাই সুবিধা, নীচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না…

লোকটার মোবাইলে খাপছাড়া কয়েকটা ছবি… একটা ক্যারামবোর্ডের ওপর দাবার ঘুঁটি সাজানো… একটা গাছের ছবি… একটা মাথার ওপর ইলেকট্রিক তারের কাটাকুটির ছবি…

লোকটা আর প্রেমে পড়বে না…

(সমাপ্ত)

Facebook Comments

Leave a Reply