কবিতা ভাবনা : পাগল ও রূপসী – শংকর লাহিড়ী

fail

কবিতাভাবনা নিয়ে বেশি লেখাটেখা বা কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন আমি বুঝি না। যদিও এই নিয়ে অ্যাকাডেমিক কথাটথা অনেকেই লিখেছেন, পাঠক হিসেবে যা ক্লান্তিকর মনে হতে পারে। কবিতা নিয়ে একজন কবি কী ভাবছেন, সেটা তাঁর কবিতা পড়েই তো বোঝা যেতে পারে। পাওয়া যেতে পারে তাঁর কাব্যজগতের হাল হদিশ। তবুও জানতে চান পাঠক।
*
কখনো আমার মনে হয়, আমাদের মনের গভীরে অবচেতনে যে অবিরাম দোলক আছে, তার দোলন নির্দিষ্ট হয়ে আছে একটা ধীর লয়ে। বাইরের জীবনের গতি যত বাড়ে, ততই আমরা মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়ি। তখন আমরা আশ্রয় নিই একলা ঘরে, স্যানাটোরিয়ামে, নির্জন সমুদ্রতীরে, জঙ্গলের কোর এরিয়ায়। সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে একটা বিরাট পেইন্টিং-এর সামনে। রাগ মালকোষ, রাগ মারু বেহাগ। -সমস্ত শিল্পে সাহিত্যে সঙ্গীতে ভাস্কর্যে চিত্রকলায় আমরা চেষ্টা করি, প্রত্যেক যুগের সুপারসনিক গতি-জ্যামিতির মধ্যে থেকেও, ওই গহন দোলনের আন্তরিক লয়ের সাথে মিশে একবার সমে পড়তে।
অজস্র মৌলিক পদার্থের অসংখ্য পরমাণু মিলেমিশে হাত ধরাধরি করে তড়িৎচুম্বকে তরঙ্গায়িত হয়ে গড়ে তুলেছে বিশ্বসংসারব্যাপী লক্ষ কোটি অর্বুদ নতুন নতুন যৌগ পদার্থ। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি তন্তু কোষ আয়ন হাইড্রোকার্বন অম্ল ক্ষার লবণ হর্মোন প্রোটিন এনজাইম অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে কীভাবে স্বয়ং-বিন্যস্ত (সেল্‌ফ অর্গানাইজড্‌) হয়ে গড়ে উঠছে একটা সসীম ও সম্পূর্ণ শরীর ; ব্যাক্টেরিয়ার, শঙ্খচিলের, বালিহাঁসের, প্রজাপতির, স্যামন মাছের, মেরু ভালুকের, মানবশিশুর। তার ডাবল্‌ হেলিক্যাল স্ট্রাকচারে গড়া সম্পূর্ণ জিনোম, তার শ্বাসপ্রশ্বাস, পাচনক্রিয়া, কোষবিভাজন, প্রজনন, তার প্রাণশক্তি, অস্তিত্ববোধ, অনুভব, কল্পনা, অনুসন্ধান ও মেধা। এ-সবই কি সৃষ্টি হয়ে উঠেছে জড় জগতের সরল রূপাবস্থা থেকে অনুভবী জগতের জটিল স্তরে উত্তরণের পথে, শুধুই ‘স্বাভাবিক নির্বাচন’ প্রক্রিয়ায়? -এ প্রায় অবিশ্বাস্য একটা আব্দার, ক্রমে আমার মনে হয়েছিলো।
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা হিসেব কষে বিস্মিত হয়েছিলেন যে, চাঁদ যদি পৃথিবীর আর একটু কাছে থাকতো তাহলে সকাল সন্ধ্যায় সমুদ্রজোয়ারে উপকূলবর্তী সমস্ত শহরের বাড়িঘর পথঘাট ও স্থলভূমির একটা বিশাল অংশ ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যেত প্রতিদিন। -আমাকেও বিস্মিত করেছিল একঝাঁক মৌমাছির একত্রে বানানো মৌচাকের গঠন, আর বাবুইপাখির খড়কুটো-শিকড়-পাতা দিয়ে বুনে নেওয়া ঝুলন্ত বাসার কারিগরী। অবাক হয়েছিলাম বাগানে বুলবুল পাখির বাসায় সদ্যোজাত শাবকদের অন্ধচোখে ঠোঁট ফাঁক করে খাবারের জন্যে মায়ের কাছে চেঁচামেচি করতে দেখে। জন্মের পরেই কোন ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’ তাদের প্ররোচিত করে এভাবে ঠোঁট ফাঁক করে খাবার চাইতে? সবচেয়ে বিস্ময় জেগেছিল সদ্যোজাত বাছুরকে জন্মের একটু পরেই নড়বড়ে চারপায়ে উঠে দাঁড়িয়ে তার মা-গাভীর দুধের উৎসমুখ নিজে নিজে চিনে নিতে দেখে। জন্মক্ষণ থেকেই কীভাবে সেই গোবৎসের চেতনায় গচ্ছিত হয়ে থাকে তার প্রাণদায়ী দুধের জোগানের স্থানাংকের খবর, কে তাকে জানায়, আজও বলতে পারেননি বিজ্ঞানী বা মনোবিদ, আস্তিক বা নাস্তিক, ক্যাথলিক বা কম্যুনিস্ট, শিল্পী বা কবি। বালক বয়সে দমদমের গাঙ্গেয় হাওয়ায় প্রান্তিক এক গরু-মহিষের খাটালে একদিন এইমতো দাঁড়িয়ে থেকে আমি তারকাখচিত আকাশের নীচে অসীম রহস্যময় এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের শ্বাসরোধকারী উপস্থিতি অনুভব করেছিলাম।
*
কীভাবে প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্বব্রহ্মান্ডে? কী সেই সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ? কীভাবে সৃষ্টি হল গতি ও শক্তি? অণু-পরমাণুর নানান সহযোগে সংঘাতে রচিত এই বিপুল জগতে কীভাবে যুক্ত হল প্রাণ, কীভাবে যুক্ত হল চেতনা, -এর অন্বেষণ আজও শেষ হয়নি। গত শতাব্দীর সত্তর-আশির দশকে ‘সান্টিয়াগো গোষ্ঠীর বিজ্ঞানীদের মধ্যে যিনি এই বিষয়ে যুগান্তকারী কাজ করেছেন, ‘সান্টিয়াগো থিওরেম’-এর প্রধান প্রবক্তা সেই বিজ্ঞানীর নাম হামবার্টো মাচুরানা। মানবমনের সামগ্রিক বোধ-বুদ্ধি-চেতনার (Cognition) উদ্ভবের জন্য প্রাণশরীরে যে স্বয়ংক্রিয় ও সন্তুলিত ব্যবস্থাপনা, যাকে তিনি ‘অটোপোইয়েসিস’ আখ্যা দিয়েছেন, তারই সাহায্যে এই সমগ্র বিশ্বসংসার তার সম্পূর্ণতা নিয়ে প্রতিভাত হয় বিভিন্ন প্রাণীগোষ্ঠীর মনোজগতে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে। তাদের নিজ নিজ পার্থিব শরীরের অন্তর্গত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল এই বিশ্বজগতের রূপ।
জীবজগতে অটোপোইয়োসিস কাজ করে ইন্দ্রিয়লব্ধ ও স্নায়ুবাহিত সকল তথ্য এবং সমগ্র পরিবেশের সাথে সম্পর্কগুলোকে অতিশয় জটিল এক সামগ্রিক নির্ণয়ের মধ্য দিয়ে ; ক্রমাগতঃ নিজেকে পরিবর্তিত করে, সন্তুলান বজায় রেখে। কিন্তু যেসব প্রাণীর মস্তিষ্ক নেই, স্নায়ুতন্ত্রও নেই, যেমন ব্যাকটেরিয়া, তারাও, কি আশ্চর্য! এরকম পদ্ধতিতেই উপলব্ধি করে বিশ্বজগতকে। এইটাই জীবনের নিয়ত প্রাণবন্ত হয়ে থাকার পদ্ধতি : দা প্রসেস অফ লাইফ।
ক্লাসিকাল নিউটোনিয়ান মডেলের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে প্রাণজীবনকে বোঝার জন্যে এইসব যুগান্তকারী আবিষ্কার, যেখান থেকে সূচিত হয়েছে সমাজবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি, ও শিল্প সাহিত্যের সমগ্র দুনিয়ার জন্যই এক নতুন প্যারাডাইম, তার মূলে আছে এই ‘সেলফ অর্গানাইজিং অ্যান্ড পাটার্নিং সিস্টেমস’-এর ভূমিকা। কারণ, এত সহস্র বছরের বিশ্বাস, আবিষ্কার, মতবাদ, যার মূলে আছে ‘সারভাইবাল অফ দা ফিটেস্ট’-এর মতো পাশবিক দর্শন, যা এযাবৎ চালিত করেছে ব্যক্তি, সমাজ, ও রাষ্ট্রনীতিকে, আর বিশ্বসংসারকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সার্বিক ধ্বংসের মুখোমুখি, তাকে পরিত্যাগ করার সময় সম্ভবতঃ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এযাবৎ অধীত সমস্ত বিদ্যাকে ভ্রান্ত জ্ঞান করে, নতুন আলোয় এগিয়ে যাবার আগে, এই তবে কলম বন্ধ করে বুঝে নেওয়ার সময়।
*
যেকোনও শিল্পী, কবি ও লেখকের জীবনে ছেলেবেলার স্মৃতিচিহ্নের সাথে সাথে নিজের অর্জিত বিশ্ববীক্ষা, আত্মচেতনা ও সৃষ্টিরহস্যের অনুধাবন মিলেমিশে বিপুলভাবে প্রভাবিত করতে পারে তার সমগ্র শিল্পদর্শন ও কর্মকান্ডকে। প্রত্যেক বড় মাপের কাজে, -ভাস্কর্যে কালি-কলমে ক্যানভাসে সেলুলয়েডে, -এই হোল তার ‘এলান্‌ ভাইটাল’। জীবন ও জগতের নানা অভিঘাত, অনুভব ও অধ্যয়ন ছাড়া, সৃষ্টিরহস্যের স্বরূপের অন্বেষণ ছাড়া, আত্মদর্শন ছাড়া, শিল্পে সঙ্গীতে সাহিত্যে কবিতায় চিত্রকলায় সেই রোমাঞ্চকর অমোঘ মুহূর্তটি সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না, যা কালজয়ী, যা আমাদের গভীরে স্পর্শ করে।
প্রকৃতি ও জীবজগতের সর্বত্র থরে থরে সাজানো আছে অসাম্যের নিদর্শন। বহুরৈখিক, বহুস্তরীয় জীবজগতের প্রধান লক্ষণই হল তার অন্তর্গত বিপুল বৈচিত্র্য ও অসাম্য, যা পরস্পরের সাথে জটিল সম্পর্ক-জালে (নেটওয়ার্ক) যুক্ত ও নির্ভরশীল হয়ে, সতত পরিবর্তনশীল, পুনর্নির্মিত হয়ে, সামগ্রিক বিশ্বপ্রাণজীবনকে রক্ষা করে আছে।

মার্ক্সীয় দর্শনে বিশ্বাসীরা মনে করেন, ঈশ্বরহীন এই বস্তু-পৃথিবীর সমস্ত রহস্যকেই বিজ্ঞান একদিন বেআবরু করে দেবে তার ল্যাবরেটরিতে, উলফ্‌স বোতলে, অসিলোস্কোপে, গিগার কাউণ্টারে, পিস্টনে, প্রেসে, কম্পিউটারে, স্যাটার্ন-ফাইভ রকেটে। আর আমি ভেবে শিহরিত হতাম ঈশ্বরবোধহীন পৃথিবীর রূপ কিরকম নিস্প্রভ ম্লান ম্রিয়মাণ হতে পারে ; যেখানে থাকবে না কোনও সূর্যমন্দির, গীর্জার ঘন্টা, মসজিদের আজান, বৈদিক মন্ত্রপাঠ, গাজনের সং, খাজুরাহ, গীতগোবিন্দ, হিন্দু বিবাহপদ্ধতি, দেবী দূর্গা, দেবী উর্বশী ও আফ্রোদিতি, মেঘনাদবধ কাব্য, দান্তে, সেক্সপীয়ার, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল এঞ্জেলো, রামায়ণ ও মহাভারত, অষ্টাদশ পুরাণ ও উপনিষদ, স্বর্গ ও নরকের ওপর আঁকা অজস্র স্কেচ ও ক্যানভাস, প্রেতলোক ও বৈকুণ্ঠলোক, মৎস্যকন্যা ও আকাশচারী দেবদূত, সুফি ও বাউল, ধ্রুপদ ও খেয়াল ; ভেঙ্গে পড়বে যুগে যুগে রচিত হাজার হাজার সাহিত্য শিল্প চলচ্চিত্র ভাস্কর্য ও সঙ্গীতের বোধ এবং বিশ্বাসের মূল কাঠামোগুলো।
ক্রমে আমার মনে হয়েছিল, মার্ক্সীয় দ্বান্দিক বস্তুবাদের গভীরে কোথাও বড় রকমের ভূল থেকে গেছে, যা আজ ক্রমশ: প্রকাশিত হয়ে চলেছে বিজ্ঞানীদের হাতেই, উন্নত বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির সাহায্যে। মার্ক্সীয় দর্শনে মনে করা হয় যে, এই বিশ্বপ্রকৃতির বস্তুজগতের স্বরূপের সমস্ত কিছুই বৈজ্ঞানিক নিয়মানুসারী, এবং একদিন সম্ভব হবেই তার সমস্ত কার্যকারণ ও চলাচলকে বুঝে উঠতে পারা। আজ যা অজানা রয়েছে, প্রকৃতির জটিল ব্যবহারের সেই সমস্ত সূত্রগুলোকে ক্রমে ক্রমে জেনে ফেলা যাবেই। -কিন্তু এর বিপরীতে আছে আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিদদের সুচিন্তিত অভিমত যে বিশ্বপ্রকৃতির অনেক সত্যই চিররহস্যময় থেকে যাবে, মানবশরীরে কখনও তাদের জানা যাবে না, কারণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তাদের অধ্যয়ন করার জন্য যেকোনো পরীক্ষাপ্রকরণের ব্যবহার বা পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিই নিমেষে পালটে দেবে তাদের প্রকৃত চরিত্র ও সত্যের স্বরূপকে। অর্থাৎ, এতদিন যা ছিল অনুমান মাত্র, মরজগতে আজ বিজ্ঞানীরা তার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন।
কয়েক লক্ষ বছরের মানবসভ্যতার ইতিহাস পেরিয়ে, আজ এই পর্বে এসে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীদের অভিমত আমাদের আশ্বস্ত করে। মার্ক্স এঙ্গেলস নয়, বেদ উপনিষদ পুরাণ নয়, অ্যারিস্টটল সক্রেটিস প্লেটোর যুক্তিবাদ নয়, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিদগ্ধ দার্শনিকরাও নয়। কারণ তাঁরা এই বিশ্বব্রহ্মান্ডকে নিজের নিজের মতো করে অনুমানে, নিশ্চয়তায়, অথবা ভ্রান্তিতে, সম্পূর্ণ জেনে নিয়েছিলেন। সম্ভবতঃ তাঁদের ভান্ডারে কোনও প্রশ্নই আর অমীমাংসিত হয়ে পড়ে থাকেনি। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এসে ক্রমশঃ ব্যতিক্রম দেখা গেল কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীদের অভিমতে ; শ্রোডিংগার, নীল্‌স বোর, ডিরাক, ফাইনম্যান, আইনস্টাইন, এনরিকো ফার্মি, হাইজেনবার্গ, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, স্টিফেন হকিং, রজার পেনরোজ, ফ্রিৎজফ কাপরা ও আরও অনেকে। সমস্ত কবি, চিত্রকর ও সৃজনশীল মানুষের জন্য আজ তাঁরা এক নতুন আলোর, নাকি এক নতুন অন্ধকারের সন্ধান এনে দিলেন ; যার অর্থ, এই বিশ্বপ্রকৃতির অনেক কিছুই চিরকাল অজ্ঞেয় ও রহস্যময় থেকে যাবে বিজ্ঞানীদের কাছে, কখনো তাদের সত্যরূপকে জানা যাবে না। পাওয়া যাবে না সমূহ উত্তরমালা। -অহংকারী ও আগ্রাসী সভ্যতার পায়ে এ কী কোনও নির্মম শৃংখল, না কি এর মধ্যেই নিহিত আছে কোনও অবাধ অফুরান স্বাধীনতা ? আমি ভাবি।
এই নতুন অন্ধকারে কবিকেও কি তবে লিখে যেতে হবে এভাবেই, সর্বজনের মনোরঞ্জনের জন্য, অসম্ভব বিপ্লবের জন্য, মিছিলের নিরূপায় অজ্ঞান মুখগুলোর জন্য ? এবং বারবার হার মেনে যোগ দিতে হবে শহীদ-সভায়, মোমবাতি-মিছিলে ? সম্বল শুধু শব্দ, অক্ষর, বাক্য ; জীর্ণ, ভঙ্গুর, চটকদার, অর্থহীন, বিবর্ণ, খন্ডিত, ভ্রান্ত। ব্যবহৃত, বহু ব্যবহৃত। অন্ধ বিশ্বাস, আরোপিত আবেগ। বিবমিষা। –এই তবে কলম বন্ধ করে একান্তে ভাবনার সময়। -কিন্তু ‘কেউ কি কখনো নিজেকে আবার বলবে– ভাবো?’ আশির দশকের শেষে ‘শরীরী কবিতা’ বইয়ে এই প্রশ্নই আমি করেছিলাম নিজেকে।
*
জামশেদপুরের একটা ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম, যার নাম সাকচি ; শাল-নিম-কুসুম-মহুয়া গাছের ছায়ায় যেখানে এক আদিবাসি দাইমা-র হাতে আমার জন্ম হয়েছিল। আমার কবিতায় কখনো আমি আদিবাসী শব্দ, তাদের কথ্য ভাষা, ব্যবহার করিনি। সেই কোলেকাঁখে বয়সে, আমি বেশি কাঁদলে বাড়ির সাঁওতাল পরিচারিকা সুরজমুনি মাকে বলেছে, ‘টুকুন আফিম খাওয়ায়ে দিস কেনে ইয়াকে’। দলমা পাহাড় জঙ্গল আর ডিমনা লেকের ওপার থেকে রোজ দশবারো কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে সে কাজে আসত। তবুও সাঁওতাল, মুন্ডা, হো, ওঁরাওদের ভাষা আমার লেখা থেকে দূরে থেকেছে। আমি জানতাম না, ‘ইশুভুকিন বুরু’ শব্দের অর্থ- ‘সুন্দর অরণ্য প্রকৃতি’; আমাকে থলকোবাদের জঙ্গলে ‘হো’-ভাষায় এই শব্দার্থ জানিয়েছিল এক আদিবাসী রাখাল বালক। তার হাতে ছিল তির-ধনুক, তার নাম ছিল ‘গুম্‌হিদেও হোন্‌হাগা’। সেগুন বনে প্রভাতী আলোয় প্রচুর ঝরাপাতার ওপরে একদিন মুখোমুখি সেই বালক কবি ও আমি।
বস্তুতঃ উত্তর কলকাতার শৈশবজীবন, গাঙ্গেয় হাওয়া, তাল-নারকেল সারি সারি, লাল দোতলা বাস, ঘুঁটের উনুন, চ্যাঙারীতে সিঁদুরমাখা প্যাঁড়া, আর জবাফুল পরিবেশকে এতটা শাক্ত করে তুলেছিল, যে আমি পাহাড়চটির দেবতা মারাংবুরুকে বেমালুম বিস্মৃত হয়েছিলাম। কৈশোরে, স্কুলের ছুটিতে, জামশেদপুরের পথে রাতের স্টীম-ইঞ্জিনে-টানা রাঁচী এক্সপ্রেসে, কৃষ্ণকায় শ্রমিক সাঁওতাল রমণীদের ঘর্মাক্ত নিমতেলের গন্ধে আমার বিবমিষা হয়েছিল। অনেক পরে, ভোরের আলোয় ধলভূমগড় স্টেশনের লাল মাটিতে ট্রেন থামলে, হিম কুয়াশায়, মহুয়া, শিরিষ ও নিমফুলের অপার্থিব গন্ধে ঘ্রাণে, আমার মনে পড়ে যেত জন্মভূমি বিহারের সেই সাকচি গ্রামের কথা।
*
সত্তরের দশক পেরিয়ে এসে দেখেছিলাম সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজবাঁধা দুই বাংলা। পরে, আশির দশকে এসে, তখনো কলকাতা-কেন্দ্রিক কবিতা, যা চিরকালীন চিৎকৃত, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’, অথবা কলেজ-পালানো ক্যান্টিনসেবীদের প্রিয়া-প্রেয়সী-পল্লবিনী, হাংরিদের এফোঁড়-ওফোঁড়, কলকাতার যীশু, আর মুক্তমঞ্চে তুষার রায়ের ‘তুমি ভাঙ্গা বাথরুমে ঝকঝকে মুতের বেসিন’! অন্ত্যমিল, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত। ‘ভুলগুলো সরাও আমার লাগছে’– বলেছিলাম আমি। সাদা কাগজের ধু-ধু নির্জনতা, দোয়াতের তরল টার্কোয়াজ– উভয়েই তখন স্থির প্রতীক্ষায়।
তখনও যাওয়া হয়নি শান্তিনিকেতন, দেখা হয়নি কবির রং-তুলির বাক্স, আলমারিতে ঘুমন্ত জোব্বা, আর নোবেল প্রাইজও। প্রতি বছর প্রাতিষ্ঠানিক ম্যারাপ ; দেদার রবীন্দ্র, আনন্দ, বিদ্যাসাগর, বিষ্ণু দে, আকাদেমি। ভূমিহীন কৃষকদের মতো পাঠকহীন কবিদের কাতারে আমি, আমরা ; যারা কবিতাকে জলোচ্ছ্বাসের মতো, বাজুকার মতো, অন্তর্বাসের মতো কর্তৃত্বময় দেখতে চেয়েছিলাম।
*
আশির দশকে আমি জামশেদপুরে, টাটাস্টীলে কর্মরত। শৈশবের সেই সাকচি গ্রাম থেকে তখন মহুয়া গাছের অন্তর্হিত ছায়া, আর বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সিয়েনা-রঙের সুবর্ণরেখা নদী। আমার সাদা পাতা একান্তে, ধীরে, ক্রমশঃ ‘শরীরী কবিতা’। -তার আবৃত রহস্য, জলের হিম চ্ছলাৎ-শব্দ, মধ্য উরুর ক্ষত, ভঙ্গুর ফ্রুটবোল, বিনাশী ঘ্রাণ, ফাঁকা কফির টিন, মারমুখী পতঙ্গ, পারলৌকিক শ্রাব, অদ্ভুত বোতাম, শিরাকাটা চীৎকার, বরফের দেওয়াল, হিম পেন্ডুলাম, রক্তঅস্থিময় মেঘ, যন্ত্রমানুষ, উন্মাদ ক্যাকটাস, উষ্ণ প্রশ্নবোধক স্যুপ, চাবুক ও সসেজ।
কবিতার মর্মে তার প্রবেশপথ কখনো ফানেল-শেপ্‌ড্‌। বৃত্তাকার সামগ্রিক থেকে ধীরে একটি কেন্দ্রিক অনুভূতিতে পৌঁছনো। বিভিন্ন অনুষঙ্গযোগে ও বিন্যাসে উপস্থাপিত হয় দুই বহির্মুখী ও অন্তর্মুখী বিপরীত বল। যে বল আর্কাইক, আমাদের সামগ্রিক জড় ও অজড়ে, দেহকোষে, নক্ষত্রমন্ডলে নিরন্তর কাজ করে। আমার মনে হয়েছিল, একান্তে নিজস্ব বাগানে বুঝিবা অর্কিড নিয়ে জেনেটিক কাজকর্ম করে চলেছি আমি। নব্বইয়ের দশকে, পরবর্তী বই ‘মুখার্জী কুসুম’– যেন এরই ফাঁকে একপাশে কিচেন গার্ডেনে কিছু নতুন প্রজাতির শালগম, টম্যাটো।

‘নতুন কবিতা, আমি পাইনা তোমাকে কেন
যেভাবে মুখার্জীর ছেলে
আপন শালীকে নিয়ে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে চ’লে যায়
অসংযত, কৈফিয়তহীন
খিল দেয় ঘরে আর রাত্রিযাম করে পারাপার’।

‘মুখার্জী কুসুম’ সিরিজের এই কবিতাতেই প্রকৃত প্রস্তাবে প্রথম রাখা হয়েছিল, ‘নতুন কবিতা’-এই কয়েনেজ ও তার লক্ষ্মণগুণ। কবিতার সঙ্গে তৈরী করতে চেয়েছিলাম এমন এক সম্পর্কের আশ্লেষ, যা প্রথাগত থেকে বিচ্যুত ও অবৈধ। কবিতাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম ম্যাকলাস্কিগঞ্জের মতোই এক নতুন ভূখন্ডে, অন্বেষণ যেখানে অন্তহীন, ‘অসংযত’। বিন্যাস ‘কৈফিয়তহীন’। সেই সময়ে, যখন কবিতাভুবন নিজস্ব ছন্দহীন, সমাসবদ্ধ এবং প্রকৃতই রাত্রিযাম। –সেই স্পেস-টাইমের প্যারাডাইম ভেঙ্গে শান্টিংয়ের শব্দমালা আলোড়িত করা গান, এবং কবিতার উন্মুক্ত শরীরে তাকে ছোঁয়ার জন্য ছিল এক অবিশ্বাস্য আর্তি !
‘শরীরী কবিতা’-র প্রচ্ছদে জীপার-খোলা জিনসের প্যান্ট, অথবা মুখার্জী কুসুমে দরোজার আর্চ, বা পার্কের ল্যাম্পপোস্ট, সবই ক্রমশঃ নতুন এক স্পেস-টাইম ডোমেন। ম্যাজিকাল মুভমেন্টস, ত্বরণ, মন্তাজ, মিউজিক্যাল অ্যাবস্ট্রাকশান, -এভাবেই আমি বোঝাতে চেয়েছি। যে শব্দ যে ভাষায় সঠিক ঝংকার তোলে তাকে আমি সেভাবেই ব্যবহার করেছি ; সর্বগ্রাসী বঙ্গানুবাদের সচেতন বিরোধিতায়।
আইজেনস্টাইনের মন্তাজ আমাকে প্রভাবিত করে। শব্দ-মন্তাজ নিয়ে নিজস্ব খেলাধুলো। পাশাপাশি কিছু শব্দ পরপর বসিয়ে একটা অ্যাবস্ট্রাকশান তৈরী করা, যখন কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া পদের প্রয়োজন হয় না। একটা ভিন্ন এফেক্ট হয় ; দেখা যায় তার ব্লুয়িশ চার্জ, তার আয়ন। “আগুন কামান রাঁড় রূপসী ও হাফ্‌প্যান্ট পাগল” (মুখার্জী কুসুম)। অথবা, “কোথাও যাওয়ার ছিল ; ছিল নখ, নক্ষত্র, পিস্টন” (বন্ধু রুমাল)। -কতদিন পৌষের শীতসন্ধায়, টেলিস্কোপে, আমার দৃষ্টি ছিল আকাশের গরিমায়।
আশি-নব্বইয়ের দশকে আমার কবিতায় কোনও প্রেমিকার নাম কখনোই ছিলোনা– রিনা, নীরা, সুলতা, সুকন্যা বা শ্যামলী। আমার দেখাশোনা ছিল সততই ওইসব চারতলা বাড়ি ছাড়িয়ে, দূরে। আরো অনেকটা চড়াই পেরিয়ে; গভীর হ্রেষার শব্দে একাকী জেগে উঠে– লাইলাক, রডোডেনড্রন, কুসুমিত পলাশ। এরই মধ্যে শহীদ-বেদী, অমর-বেদী ইত্যাদিও গড়েটড়ে ওঠে। বাবুর বাগানে সামিয়ানার নিচে ভিড় করে অসুস্থ স্তাবকেরা। তো এটা আমাকে চার্জড্‌ করে। আর আমি দেখি সফল মানুষদের। বোর্ডরুমে ও বাগানবাড়িতে, নাচঘরে। তারা সবকিছু, নারীকে, এমনকি কবিতাকেও লুঠ করে নেয়। একটা আতঙ্ক, একটা ইমিডিয়েসী আমাকে গ্রাস করে, যা আমি কবিতায় লিখতে পারিনি। ক্রমে আমাকে ছবিতে পেয়ে বসে। আমার প্রিয় বিষয় ছিল পোর্ট্রেট ; চিবুকের ডৌল, ভ্রূপল্লব, ঠোঁটের পাউট।

আমার মনে হয়েছিল একজন প্রকৃত কবি তিনিই, যিনি সতত মরণশীল, পুনরপি ক্যামেরাবাহক এক কূট পর্যটক। প্রচলিত কবিতাধারার দেহাতি রোদ্দুরে আমি চেয়েছিলাম কবিতা বাঁক নিক দুন-এক্সপ্রেসের মতো। ইচ্ছে হয়েছিল, ‘একটা দীর্ঘ সরলরেখাকে স্প্রিং-এর মতো গুটিয়ে এনে একপ্রান্ত ছেড়ে দিয়ে দেখবো কী প্রচন্ড বেগে লাফিয়ে ওঠে তেজঃপূর্ণ রেখাসকল। আমরা নকল করবো থান্ডার মেঘের গম্ভীর ডাক, আর যে রকম শব্দে শালের জঙ্গল থেকে লাল পিঁপড়েরা ছড়িয়ে পড়ে গভীর শিকড়ে। সেই শব্দ শোনাবো আমরা ফাঁকা খনিগর্ভে নির্বাচিত বন্ধুদের’। তখন নব্বইয়ের দশক শেষ হয়ে আসছে। আমার অন্বেষণ ছিল এক নতুন রহস্যময় ও গভীর জটিলতা।
“Alone you must seek the ether” – এই বাক্যে ভালো লাগে আমার ‘seek’ শব্দটি। ভালো লাগে প্রোডাক্ট ডিজাইন, পুরনো বাসন, তাম্রপত্র। আর নীল রঙ আমাতে একটা বিশেষ স্পন্দন এনে দেয় ; মনে হয় একটা নীল স্ফটিক থেকে জন্ম হয়েছিল আমার। সম্ভবতঃ গতজন্মে আমার মৃত্যু হয়েছিল আইন্ডহোভেনের কনসেন্‌ট্রেশান ক্যাম্পে, কিংবা আউজউইৎসের গ্যাস চেম্বারে, উলঙ্গ শিশু বয়সে ; ধূসর অন্ধকারে, অচেনা মানুষের ভীড়ে, সমবেত বিহ্বল ধারাস্নানের অব্যবহিত পরে, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। ক্রমে “নগ্ন আর্ত নীল—এইমতো জন্ম হয়েছিল”(শরীরী কবিতা)। -একটা সুস্থ সবল শরীরের চেয়েও সুন্দর গোলাপ আমি কখনো দেখিনি।
*
ক্রমে ভাষার অপদার্থতা আমাকে সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। ‘সিম্ফনি কবিতা’ লেখার আগে, নিজের ডায়েরিতে আমি লিখি : ‘ভয়ংকর খাদের ধার ঘেঁষে বেঢপ বেঁকা নড়বড়ে ট্রাইসাইকেল চেপে নক্ষত্রালোকে পোলো খেলছে হাজার হাজার পার্থিব নরনারী। -চীয়ার্স !’
সেটা ১৯৮১ সাল। এর ৩৩-বছর পরে, ২০১৪ সালে, গদার তৈরী করেন তাঁর ছবি ‘গুডবাই টু ল্যাঙ্গুয়েজ’। অক্ষরের অধিকার অস্বীকার করে, আমার মনে হয়েছিল, শুধুমাত্র প্রাকৃতিক শব্দমালা দিয়ে রচনা করা যায় নতুন কবিতা, যাকে আমি ‘সিম্ফনি কবিতা’ বলেছি। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত সেই সিম্ফনি কবিতার কয়েকটা কম্পোজিশানের নাম ছিল, ‘ব্রেকফাস্ট টেবিল’, ‘তরঙ্গ’, ‘ফেরা’, ‘লুঠ’ ইত্যাদি। মনে হয়েছিল, রবিশংকরের সেতারের চেয়ে কবিতা অনেক বেশী জটিল ও শব্দিত হ’য়ে রয়েছে ঝোড়ো হাওয়ায়, বুনো কুকুরের চীৎকারে। একজন মরণপণ গেরিলার ছুটে যাওয়া তীব্র বাজুকায়। ঝরাপাতা মাড়িয়ে যাওয়ার শব্দে। যেভাবে মাটি ঝরে পড়ে কবরে। -প্রতিটি শব্দই এক রহস্য। এক গাঢ় ও অসীম অনুভুতি। এভাবে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে শুরু হয় এক নতুন খেলা।
প্রয়োজন ছিল ভুলগুলোকে একে একে চিহ্নিত করা। ত্যাগ করতে হবে এযাবৎ অর্জিত সব শিক্ষা। প্রাণজীবন ও সভ্যতাকে ধ্বংস থেকে বাঁচাতে ভেঙ্গে ফেলা দরকার পুরোনো প্রকাশভঙ্গি, দৃষ্টিভঙ্গি, আর যুক্তির চিরায়ত ভঙ্গিমা ও কাঠামোগুলো। সমস্ত মতামতকে আমি তাই সন্দেহের চোখে দেখেছি। সমস্ত ওপিনিয়নই biased, and is valid only from a particular viewpoint, within a space-time domain –আমার মনে হয়েছিল। সমগ্র বাংলা শব্দকোষ থেকে ‘আপেক্ষিক’ শব্দটাই আজ সবচেয়ে মূল্যবান মনে হয়েছে।
এ-সবই একুশ শতকের শুরুতে আমার মনোযোগ অধিকার করে। এই সময়ে আমার যোগাযোগ হয় বিশ্বখ্যাত চিন্তা-বিজ্ঞানী ও ল্যাটারাল থিংকিংয়ের প্রবক্তা ডঃ ডি’ বোনো-র সাথে। ক্রমে নির্মাণের বিবিধ পর্যায় আমার চেতনায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যাবতীয় সমুদ্রবন্দর, লাইট হাউস, শততল মিনার, এবং অবশ্যই রন্ধন প্রণালী। কীভাবে আতার পুডিং, লেমন সুফ্‌লে, মাশরুম স্যুপ। ফ্রুটবোল, পানপাত্র, ব্লাডিমেরী, ব্লু লেগুন। পদার্থের কঠিন তরল ও বাস্পরূপ ক্রমে আমি লক্ষ করি। পাইনের বনে কীভাবে কুন্ডলি পাকিয়ে ধোঁয়া ওঠে, কীভাবে উপত্যকায় ধীরে ছড়িয়ে পড়ে কুয়াশা। টুটেনখামেনের সমাধির মতো, গ্রানাইটের অন্ধকার দেওয়ালে অঙ্কিত ইয়েরোগ্লিফের মতো, গাণিতিক ‘পাই’য়ের দশমিক মানের মতো (৩.১৪১৫৯২৬৫৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬২৬…), ‘ফিবোনাচ্চি’ সিরিজের সুবর্ণ অনুপাতের মতো, সর্বত্র আমি বোধের এক নতুন ছন্দকে, ছন্দের অবয়বকে, আবিষ্কার করি। ‘সৃষ্টি-ঘুম-বীজগণিত, ও নিবিড় কুয়াশা আমার / আমারই তরঙ্গ অবয়ব’… (বই: বন্ধু রুমাল) ।
প্রকৃত প্রস্তাবে একুশ শতকের শুরুতে এই ছিল আমার কবিতার নির্যাস। কীভাবে সৃষ্টি হয় কেওস, বিশৃঙ্খলা। কীভাবে ছন্দিত হয়, ভেঙ্গে পড়ে, পুনরায় গঠিত হয়ে ওঠে আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক। এই সুদূর বিস্তৃত প্রাণজীবন, যোনিরক্ত ও জরায়ুর জং। হ্যাঁ, সম্পর্কই আমার দৃষ্টিকোণ। সম্পর্কই আমার টেলিলেন্সে, তারজালিতে, খলনুড়িতে, বুনসেন বার্নারে। আমার মনে হয়েছিল, বিনির্মাণ সম্পর্কিত সমগ্র ডিসকোর্সকে অনায়াসে দেড় পাতায় লিখে ফেলা উচিত ছিল কিনা। আমি সমস্ত ভাষাবিদদের কাজকে নিতান্ত পন্ডশ্রম, ও জীবিকার্জনের জন্যে কত ভুল কাজই যে মানুষ করে যাচ্ছে ভেবে বিস্মিত ও পুলকিত হয়েছি। মৃত্যুর আগে দেরিদাও কি বুঝে গিয়েছিলেন সেই কথা ? ভুলগুলো সরাও, আমার লাগছে, বলেছি আমি।
আমার কবিতায় ক্রমবর্ধমান তৎসম শব্দের আধিক্যের কারণ ছিল আমার আগুন ও পাথরের কাছাকাছি অবস্থান। ব্লাস্ট ফার্নেসের প্রবাহিত গলনাঙ্কের পাশে, স্টিলমেল্টিং শপের দাউদাউ আগুনের মুখোমুখি আমি। দানবীয় রোলিং মিলের নীচে, সংকীর্ণ পাতালপথের তপ্ত গর্জিত বাস্পময়তায়, আদিবাসী কুলি-কামিনদের পাশাপাশি। কনভেয়রে, বাঙ্কারে, পিঙ্গল গন্ধক-বাস্পে, অন্ধকার খনিগর্ভে, সমুদ্রবন্দরে, খনিজ আকরিকের স্তুপে ; ঘর্মাক্ত, আপোষহীন। বিশেষতঃ একুশ শতকের প্রথম দিকে প্রকাশিত ‘বন্ধু রূমাল’ বইয়ে আমার সমস্ত শব্দচয়ন এসেছে এইসব স্পেস-টাইম পরিমন্ডল থেকে। জলপ্রপাতের মতো, জেট এঞ্জিনের মতো, অবিরল স্যাক্সোফোনের মতো একটা টানা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এইসব লেখার। -‘সময়-দুধের পাত্রে সময়-ঝিনুক ডুবে আছে’। বর্ণমালা নয়, ক্রিয়াপদ নয়, আমি তো দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম আমার পাঠককে ঐ সাসপেনসান ব্রীজের সামনে। ঐ লাল-হলুদ ডোরাকাটা চিমনির মাথায়, ধোঁয়া ও উত্তাপের মুখোমুখি।
*
একুশ শতকের প্রথম দশক পেরিয়ে আসতে আসতে আমার মনে পড়েছিল সেই ‘ভয়েজার’ নামক মহকাশযানের কথা। আমার কবিতা লেখার প্রত্যেকটি বাঁকে সেও অবিরল ছুটে চলেছে মাধ্যাকর্ষণের গণ্ডি ছাড়িয়ে, একে একে গ্রহদের কক্ষপথগুলো পেরিয়ে ; এখন সে সৌরমন্ডলের হেলিওপজ সীমানা ছাড়িয়ে দূরগামী নীহারিকাদের দিকে ধাবমান।
সেইমতো, ‘নীল কাগজ’ সিরিজের লেখাগুলোয় আমি চেষ্টা করেছি, একটা প্রান্তিক দূরত্ব থেকে, যাপিত জীবন সম্পর্কগুলোকে নিবিড় ও অন্তরঙ্গভাবে পুনরায় নিরীক্ষণ করতে। নতুন ডিকশানে। কবিতা অসমাপ্ত জেনে, জীবন অপূর্ণ দেখে।

‘আমি লিখছি আমারই জন্যে এইসব লেখা
কাগজে কলমে জলছবিতে, কাঠখোদাই করা
ঢালাই করা ধাতুর গায়ে, মৃৎপাত্রে জঙ্গল-লতায়…
আমি লিখছি সেই লেখা যা কখনো শেষ ও সমাপ্ত
হবে না, যা ভেসে থাকবে জলের ওপর জল হয়ে’

হয়তো এই সেই কলম বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকার সময়। আর কি নতুন নেই ? ভাবি আমি। ছিন্নভিন্ন দৃশ্যকে ছবি করে তোলাই এবার কবিতা। ঘুমে জাগরণে আজ তাদের ধীরে ধীরে সজ্জিত হয়ে উঠতে দেখি। কাঠ-খোদাইয়ের মতো, লিনোকাটের মতো, অরিগামীর মতো নিপুণতায় আমি রচনা করি সেইসব অসমাপ্ত কথারা।
অপলক চেয়ে থাকি। মনে হয়, এখনও এতদূর বিস্তৃত এই ভার্জিন ভূভাগ! -একা এক পাগল দেখছে অপলক, সেই রূপ ও রূপসীকে।

[ ছবি: লেখক]

Facebook Comments

Posted in: April 2021, PROSE

Tagged as: ,

Leave a Reply