রবীন্দ্রনৃত্য ভাবনাঃ প্রেক্ষিত ও চলন – সোমা দত্ত

fail

সপ্তম পর্ব

বাংলার গ্রামীন জনজীবনে প্রবাহিত নৃত্য গীতের ধারা ও শান্তিনিকেতনের নাচ:

বীরভূম জেলার রুক্ষ শুষ্ক প্রান্তের এক অংশে গড়ে উঠেছে বাঙালি শহুরে ভদ্রসমাজের শিক্ষা সংস্কৃতির ধারা যা ভবিষ্যতে অভিজাত বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় হয়ে উঠবে। সেখানে দেশি বিদেশি নানাকিছুর মিশ্রণ ঘটবে শুধুমাত্র সে মাটির আসল ভূমিপুত্রপুত্রীদের সংস্কৃতি ব্রাত্য থাকবে। কারণ? কারণ ওরা অশিক্ষিত, নিম্নবর্ণ অপরিশীলিত। আমার আলোচনা নৃত্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখব।
“বাঙালির জনতত্ত্ব নিরূপণের একতম এবং প্রধানতম উপায় বাঙলাদেশের আচন্ডাল সমস্ত বর্ণের এবং সমস্ত শ্রেণীর জনসাধারণের, বিশেষভাবে প্রত্যন্তশায়ী জনপদবাসীদের সকলের রক্ত ও দেহগঠনের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ, এক কথায় নরত্তত্বের পরিচয়।” – নীহার রঞ্জন রায়
এত বিস্তৃত কাজ তৎকালীন সময়ে না হলেও সাধারণভাবে কিছু বিষয় নিশ্চিতভাবে প্রত্যক্ষ করা যেত। যেখান থেকেই রবীন্দ্রনাথের নিজেরই কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা যেতে পারে।

“হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন-
শক-হুন-দল পাঠান মোঘল এক দেহে হল লীন।’’

একথা ভারতের ক্ষেত্রে যেমন তেমনি বাংলার জন্যেও সত্যি। তাই বেঁটে-লম্বা, কালো-ফর্সা, খেঁদা-চোখা নাক বিশিষ্ট বাঙালির সংস্কৃতিও এ তাবৎ গোষ্ঠী মানবের (মুন্ডারি থেকে নিগ্রয়েড, অষ্ট্রলয়েড, মঙ্গোলিয় ইত্যাদি-ও রয়েছে ইন্দো-ইরানিয়ান ইন্দো-ইউরোপিয়ান নর্ডিকদের সঙ্গে) বৈশিষ্ট সম্বলিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন নির্দিষ্ট কোনো অভিমুখে সে সংস্কৃতি চালিত হয় তখন সংযোজন বিয়োজন ঘটে সেই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই।

উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আগের পর্বগুলিতে বিস্তৃত আলোচনা করেছি, আবার বলা অপ্রয়োজনীয়। এককথায় বলা যায় নব্য হিন্দু জাতীয়তাবোধই সে সময় শিল্প সংস্কৃতির গতিমুখ নির্ধারিত করছিল। রবীন্দ্রনাথ খানিক তার বাইরে দাঁড়াতে চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ সফল হলেন না। তিনি বুঝলেন এই অভিমুখের সংকীর্ণতা, সমালোচনা করলেন, প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু নিজের কাজের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিকের চাপ এড়িয়ে আরো একটু ঋজু হয়ে দাঁড়ালেন না। ফলে আধুনিক বাংলার নাচ থেকে বাদ পড়ে গেল বাংলারই নিজস্ব উপাদান।
১৯৩১ শে ‘বর্ষামঙ্গল’ উৎসবে বর্ষার গানের সাথে কথাকলি আঙ্গিকে নাচ তৈরি করছেন শান্তিদেব ঘোষ। শ্রীমতি দেবী ইউরোপীয় নাচের আঙ্গিকে ‘ঝুলন’ কবিতার সাথে নাচ করছেন। এই উৎসবে একটিমাত্র লোকনৃত্য স্থান পাচ্ছে তা হল গরবা নাচ। গুজরাতী ব্যাবসায়ী মহল যে রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বভারতীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তা পাঠকদের জানা এবং আমিও আগের পর্বগুলিতে উল্লেখ করেছি। কিন্তু বাংলার নিজস্ব কোনো লোকনৃত্য নেই? শান্তিনিকেতনে কখনো সান্থাল, ধামাইল, বউনাচ, ঢালি, পাইক, ছৌ, রণপা, ঝুমুর কোনো নাচ দেখানোর শেখানোর ব্যবস্থা হয়নি। অথচ মজা হচ্ছে দেশের অন্যান্য যে অংশগুলিতে তথাকথিত শাস্ত্রীয় নৃত্য গঠনের কাজ চলছে সেখানে সেই সেই অঞ্চলের লোকনৃত্য, স্থানীয় বৈশিষ্টযুক্ত আচার, সংগীত ও নৃত্যভংগীকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বাঙ্গলায় একমাত্র একটি নাচ তৈরি হচ্ছে যা তথাকথিত শাস্ত্রীয় নয় কিন্তু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যযুক্ত শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলির নৃত্যভঙ্গী তাতে যুক্ত করা হচ্ছে।

একবার দু’বার শান্তিদেব ঘোষের চেষ্টায় রায়বেঁশে জারি সারি ও বাউল নাচের ঝলক এসেছে সেই সময়ের নাচে কিন্তু সে সবের স্থায়ী চর্চা ও অন্তর্ভুক্তি হয়নি রবীন্দ্রনাথের নৃত্যভাবনায়। এখানে আবার একটি প্রশ্ন আসে। রবীন্দ্রনৃত্য কি শুধুই রবীন্দ্রনাথের চিন্তার ফসল? উত্তর অবশ্যই না। তাই কলকাতা জুড়ে যখন রবীন্দ্রনৃত্য শব্দের জনপ্রিয়তা বাড়ছে তখন শান্তিদেব ঘোষ তার বিরোধিতা করেছেন। প্রথম আগল খুলে গেলে মূলত প্রতিমা দেবীর নেতৃত্বেই শান্তিনিকেতনের নৃত্যচর্চার বাড়বাড়ন্ত। রবীন্দ্রনাথ প্রয়োজনীয় উপাদান ও বিষয় জোগান দিয়েছেন। মণিপুরি নাচ শেখানো হচ্ছে কিন্তু ধর্মীয় আঙ্গিকে তার উপস্থাপনা হচ্ছে না। মণিপুরী নৃত্যভঙ্গি দিয়ে সাজান হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গান, কাব্য, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য।

প্রতিটি বাঁকেই ভিড় করে আসছে নানা প্রশ্ন। গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য প্রসঙ্গেও অন্যথা হচ্ছেনা। রবীন্দ্রনাথ প্রথম গীতিনাট্য লিখছেন বাল্মীকি প্রতিভা, বিদেশ থেকে ফিরে অপেরা আংগিকে। তার আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বিদেশি সুরে বাংলা গান রচনার চেষ্টা করছিলেন। আবার জাভা বলি ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ নৃত্যনাট্য রচনার অনুপ্রেরণা পেলেন। জাভা বলির পত্রাবলি তে তিনি নাচ সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করছেন। কেন? বাংলায় গীতিনাট্য নৃত্যনাট্যের কোনো আদর্শ কি ছিল না কখনো?

চর্যাগীতিতে বুদ্ধনাটকের কথা আছে,যা নৃত্য গীতের মাধ্যমে কাহিনী বর্ণনার একটা মাধ্যম। আবার চর্যাগীতিতেও তৎকালীন গার্হস্থ্য জীবনযাত্রার ছবি আছে, এ সবই বস্তুত নৃত্য গীতের মাধ্যমে বর্ণিত কাহিনী। দরিদ্র গ্রামীন মানুষের জীবনে অভাব বেশ প্রকট থাকলেও তাদের আদিম কৌমগত যৌথ নৃত্য গীত বাদ্য ও গ্রামীন পূজা ও পালাপার্বনই ছিল তাদের আনন্দের উৎস। এছাড়াও পালাগান, আলকাপ, কবিগান, যাত্রা সকলই তো নৃত্যগীত ও অভিনয়ের মাধ্যমে কাহিনীই ব্যাখ্যা করছে, যা বাঙালির একান্ত নিজস্ব আঙ্গিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নৃত্যনাট্যের অনুপ্রেরণা পেলেন জাভা বলি দ্বীপে নৃত্যের মাধ্যমে কাহিনী বর্ণনার অভিজ্ঞতা থেকে। বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্যবাদের যে ধারা জাভা বলি দ্বীপে বহু আগে গিয়েছে এবং মিশে গিয়েছে – তাদের ধারার সাথে তা প্রাচীন স্বীকার করে মুগ্ধতা বর্ণনা করছেন জাভাবলির পত্রে!
তাহলে কি সেই প্রাচীনত্ব, সেই আর্য সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদিতে তাঁর মন বারংবার প্রভাবিত হচ্ছে? বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসতো সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ী কূলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে? প্রশ্নটা তোলাই চলে, উত্তর স্পষ্টত আশা করা যায় না। কেন না, এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজে অথবা অজস্র রবীন্দ্র গবেষকদের মধ্যে কেউই কোনো আলোকপাত করেননি।

আবার ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি মেনে নিতে পারছেন না গোঁড়া ব্রাহ্মন্যবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যা বারবার তাঁর উপন্যাসে (গোরা, ঘরে বাইরে) তিনি প্রকাশ করছেন। শান্তিনিকেতনে প্রচলিত উৎসবগুলি খেয়াল করলেও দেখা যাবে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় উৎসব সেখানে পালিত হচ্ছেনা। উৎসবগুলি মূলত হচ্ছে প্রকৃতির সাথে যোগ রেখে- ঋতুরঙ্গ, গীতোতসব, মাঘোতসব, বসন্ত উৎসব। ১৯৩১ সালে উত্তর ও পূর্ব বাংলার বন্যাত্রাণের অর্থ সংগ্রহের জন্য কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় গীতোতসব ও শিশুতীর্থ একসাথে। এখানে একটু শান্তিদেব ঘোষের কথা তুলে দেব। “শান্তিনিকেতনের মেয়েদের মণিপুরী প্রধান মিশ্র নাচ, বাসুদেবের নাচ, শ্রীমতি দেবীর নাচ, কথাকলি, বাউল, রায়বেঁশে এবং হাঙ্গেরীয় ছাত্রীটির নিজস্ব নাচে এবারের অনুষ্ঠানটি খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ ও চিত্তাকর্ষক হয়েছিল।’’ যে কথা বলছিলাম, বাংলার লোকনৃত্য ব্যবহারের চেষ্টা অল্প হলেও হয়েছিল কিন্তু তা টিকতে পারল না। ক্রমে কথাকলি আর মণিপুরী প্রাধান্য বিস্তার করল শান্তিনিকেতনের নৃত্যাঙ্গিকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাসুদেব দক্ষিণ ভারতীয় একজন ছাত্র যিনি চিত্রকলা শিক্ষার জন্য এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। ভরতনাট্যম নৃত্যের আদলে নিজের তৈরি নাচ করতেন তিনি, যা রবীন্দ্রনাথের পছন্দের ছিল।

‘শিশুতীর্থ’ কে নৃত্যাভিনয়ের রূপ দেবার পরিকল্পনা করেছিলেন প্রতিমা দেবী। ইংরাজীতে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘চাইল্ড’ কথিকাটিকে নৃত্যাভিনয়ে রূপ দিতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ কথিকাটিকে বাংলায় রূপান্তরিত করে ১০ টি সর্গে সাজিয়ে নাম দিলেন ‘শিশুতীর্থ’। এখানেও সেই ইউরোপীয় ব্যালের প্রভাবই কাজ করল। ‘নটির পূজা’ ‘তাসের দেশ’ সবক্ষেত্রেই প্রথম পরিকল্পনা ছিল প্রতিমা দেবীর। লক্ষ্য করার বিষয় এই যে প্রতিমা দেবী ইউরোপীয় ব্যালে নৃত্য শিখেছেন এবং একপ্রকার ইউরোপীয় কায়দায় গড়ে তুলছিলেন নিজেকে।

বাংলার একটি মাত্র লোক আঙিক রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে গৃহীত হল, তা হল বাউল। বাউল গান ও শিল্পীদের নৃত্যসহ উপস্থাপনা রবীন্দ্রনাথ ও পরবর্তীকালে শান্তিদেব ঘোষদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা তথা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়। আবারও লক্ষ্য করতে হবে যে শুধু মাত্র গান ও তা প্রদর্শনের আঙ্গিক জনপ্রিয়তা পেল, তাদের দর্শন নিয়ে চর্চা ততটা হল না। বরং সামান্য অংশ বাদে বাকীটা নিম্নপ্রকারের দর্শন বলে ক্ষিতিমোহন সেন থেকে রবীন্দ্রনাথের দ্বারাও অবহেলিত হল। বাউলের সুরে, বাঙালি জীবনের আদি ধারা-মিশ্রধারার সুরগুলি যেভাবে অন্তর্লীন হয়ে আছে তা রবীন্দ্রগানেও এক অন্যধারা যোগ করল। বাউল গান জনপ্রিয় হওয়ার দরুন সাধনা ও দর্শন ব্যতিরেকে গানই হয়ে উঠল মূল আকর্ষণ। গায়ক বাউল নাম যশ অর্থ ক্রমে সবই পেল শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের কল্যানে শুধু দর্শনচর্চায় ফাঁকি পড়ল, অথবা বলা যায় প্রান্ত ধর্ম স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে এক কদম এগোল সেই সময়।
যেমন ভাবে ব্রাহ্ম ধর্ম তথাকথিত হিন্দু-সমাজে গৌণ ধর্ম হয়েই ছিল বলে তার ক্রমে হিঁদুয়ানির দিকে যাত্রা, বাউল-ফকিরদের দর্শনকেও সেই দিকেই কী টানা হল না খানিক? একদা বৈষ্ণবেরা একে গ্রাস করার যে চেষ্টা শুরু করেছিলেন শান্তিনিকেতনে সেই প্রচেষ্টাই কী আবার লক্ষিত হচ্ছে না দর্শন (জীবন যাপন ও চর্যা, যা ওঁদের ধর্মীয় অনুষঙ্গে আসে) বাদ দিয়ে গানের চর্চায়? ফলে বাউল নৃত্যাঙ্গিক আদিতে কী ছিল তার চিহ্নও কোথাও থাকছে না। শুধু পায়ের তাল, হাতের সামান্য মুদ্রা আর ঘুরে ঘুরে মাঝে মাঝে বাঁক (যা সুফী দরবেশী থেকেও আসতে পারে) এইতেই আটকে রইলো। শান্তিনিকেতনে এত সব প্রাচীন পুঁথি ও ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার নিয়ে কাজ হল, এ নিয়ে হল না। তাই নেপালের তরাই অঞ্চলের চর্যানৃত্য-ও আমাদের ধারণার বাইরে থেকে গেল, যার থেকে বাউলাদি নৃত্যের শুরু ও বিকাশ হয়তো হতেও পারে। জানা গেল না সে কথা আর।

আরো একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় এ যাবৎকালে রবীন্দ্রনাথ ধর্ম সম্বন্ধে তার চিন্তাভাবনাকে আরো স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। যার শেষে তিনি ‘মানুষের ধর্মে’ উত্তীর্ণ হবেন। এই ভাবনার পিছনে ভক্তি আন্দোলনের সন্তদের প্রভাব যেমন রয়েছে তেমনি বাউলের প্রভাবও ছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজে পৌঁছে গেলেন মানুষের ধর্মে, মানবতাবাদে কিন্তু তাঁর চারপাশের মানুষজন, বিশ্বভারতী, সর্বান্তকরণে গ্রহণ করল সেই ধর্ম? উত্তর বোধহয় সকলেরই জানা। তা হল না। সে চেষ্টা যারা করল তাদেরই বরং সরে যেতে হল বিশ্বভারতী থেকে। সে জায়গায় প্রগতিশীল ব্রাহ্মণ্যবাদের জায়গা হল বিশ্বভারতী। আবার নতুন এক ব্রাহ্মণ্যবাদ জন্মও দিল বিশ্বভারতী। “আমরা বিশ্বভারতীর ছাত্র ছাত্রী, তাই রবীন্দ্র সংগীত ও রবীন্দ্রনৃত্য বিষয়টা আমরাই ভালো বুঝি।“ এরপর কপিরাইট, যার বেড়াজালের বিরুদ্ধে তাবড় শিল্পীদের লড়তে হয়েছে সারাজীবন।

তৎকালীন ভারতে নৃত্যচর্চা:

১৯৩০ সালকে কেন্দ্র করে সংক্ষেপে আলোচনা করব বিষয়টি বোঝবার সুবিধের জন্য। এরকিছু আগে থেকেই শিক্ষিত ভদ্র অভিজাত ব্রাহ্মণ্য পরিবারগুলিতে নাচের চর্চা বাড়তে শুরু করে। বালা সরস্বতী, পারিবারিক দেবদাসী ধারা বহন করে নৃত্যচর্চা করেছেন। দেবদাসী প্রথা রদ হওয়ার পর বালা সরস্বতীই সম্ভবত প্রথম যিনি দক্ষিণ ভারতের বাইরে নৃত্য পরিবেশন করতে শুরু করলেন ১৯২৫ সাল থেকে। ১৯৩৪ শে তিনি প্রথম কলকাতায় নৃত্য প্রদর্শন করেন। এরপর পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, পৃথিবী জুড়ে নৃত্য পরিবেশন করেন তিনি।

রাগিনী দেবী, জন্মসূত্রে যিনি আমেরিকান, বিবাহ করেন ভারতীয় পদার্থবিদ রামলাল বাজপায়ীকে এবং ভারতে এসে নৃত্যশিক্ষা করেন দেবদাসী মেল্লাপুর গৌরী আম্মার কাছে। আমেরিকায় “হাই ক্লাস ওরিয়েন্টাল ওম্যান” হিসেবে পরিচিত রাগিনী দেবী “হিন্দু নৃত্য” পরিবেশন করেন এবং আমেরিকা ইউরোপে এই নৃত্যকে জনপ্রিয় করে তুলতে চেষ্টা করেন। পরবর্তীকালে তাঁর কন্যা ইন্দ্রানী, যিনি বিবাহ করেন ভারতীয় স্থাপত্যবিদ হাবিব রহমানকে, তিনিও ভরতনাট্যম, ওডিশি, মোহিনীয়াট্টম নৃত্য পরিবেশন করেছেন দেশে বিদেশে। এই সময়ে ভারতীয় নৃত্যের নামকরণগুলো নৃত্য প্রচারকদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয়। “হিন্দু নৃত্য” “ওরিয়েন্টাল ডান্স” “এথনিক ডান্স” ইত্যাদি। ক্লাসিকাল শব্দটি আরো কিছু পরে যুক্ত হবে।

এতকাল যে নৃত্য ছিল মন্দিরের ভেতরে শুধু মাত্র দেবতার নামের আড়ালে ব্রাহ্মণদের জন্য প্রদর্শিত সেই নাচকে নিয়ে আসা হল মন্দিরের বাইরে শিক্ষিত বিত্তশালী সমাজের সংস্কৃতির আসনে বসান হল তাকে। প্রাথমিক কারণ দেবদাসীপ্রথা রদ। দেবদাসীপ্রথার আড়ালে যথেচ্ছ বেশ্যাবৃত্তি চলছে, শহুরে শিক্ষিতদের এক অংশের এই অভিযোগ এবং মামলার ভিত্তিতেই এই আইন প্রণয়ন করে ব্রিটিশ সরকার। অন্য আর এক শ্রেণি শহুরে শিক্ষিত ও ধনবান, অবশ্যই ব্রাহ্মণ্যবাদী, যারা ব্রিটিশ রাজত্ত্বেই গড়ে ওঠা নানা নতুন পেশায় ও ব্যবসায়ে প্রভূত উন্নতি করেছেন তারাই উদ্যোগী হলেন শাস্ত্রীয় নৃত্য গঠন ও প্রসারে।

আমার অনুসন্ধানে এর কারণ মূলত দুটি। এক, ব্রাহ্মণ এবং শিক্ষিত পরিবার থেকেই যখন মেয়েরা নাচ করতে আসবে তখন তা সমাজে স্বাভাবিকভাবে নূন্যতম সম্মান অধিকার করবে। দুই, মন্দিরের ভেতরের নাচ না দেবদাসীপ্রথা আসলে বেশ্যাবৃত্তির সামিল নয়, বরং দেবতার কাছে আত্মনিবেদন একটি পরম সৌভাগ্যের বিষয়, এটা প্রতিষ্ঠা করার বাসনা। তাই যদি না হত তবে ব্রাহ্মণ বা রাজা নিজে নিজের মেয়েদের এই বৃত্তিতে আসতে দিতেননা ভাবটা খানিক এইরকম। ভাব থাকতেই পারে কিন্তু এর সাথে সত্যের আসলেই কোনো সম্পর্ক নেই। কন্যা সন্তান এদেশে যে কত কাঙ্ক্ষিত আর তার কত সম্মান তা বোধ হয় আলাদা করে উল্লেখ করার প্রয়োজন হবে না। ব্যতিক্রমী মানুষ অবশ্যই আছেন কিন্তু তা স্বাভাবিকভাবে ধরার কোনো কারণ নেই।

আরো একটি বড় উদ্দেশ্য সাধিত হল তা হল এই নৃত্যের আধারে ব্রাহ্মণ্যবাদী ও নিবেদনের সংস্কৃতির বহুল প্রচার ও প্রসার। কে না জানে যে পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তা ঘরের মেয়েরা। মেয়েদের ধাঁচে ঢেলে খানিক মহান করে তুললেই সে তারই শোষণযন্ত্র পুরুষতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যবাদকে মাথায় করে রাখবে। হলও তাই। উপরি পাওনা হল বিদেশেও নব্য গঠিত শাস্ত্রীয় নৃত্যের বাজার তৈরি হল যা ভারতীয় সংস্কৃতির পরিচয় হিসেবে তুলে ধরল তথাকথিত হিন্দু সংস্কৃতিকে, আধ্যাত্মিকতা যে সংস্কৃতির মূল উপজীব্য। দৈনন্দিন জীবনে যত সমস্যাই থাকুক না কেন আধাত্মিক সাধনাই হল মুক্তি লাভের একমাত্র উপায়। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, বিপ্লব থেকে শত যোজন দূরে ঠেলে দেবে মানুষকে যে সংস্কৃতি, নিজের দূরাবস্থার জন্য নিয়তির ওপর দায় ঠেলে দেবতার ভজনা করে যাবে মানুষ মুক্তিলাভের আশায়।

সামান্য হলেও আরো একরকম প্রচেষ্টা কিন্তু শুরু হয়েছিল এই সময়ে। ভারতীয় আধুনিক নৃত্যের ধারা, সাধনা বসু, বুলবুল চৌধুরী, উদয়শংকর প্রমুখ সাধারণ মানুষের জীবন ও যাপন নিয়ে নানান লোকনৃত্য, মূকাভিনয় সংযুক্ত একধারা প্রবর্তন করলেন বাংলায়, যা জনপ্রিয়ও হয়েছিল। উপভোগ ও ধর্মীয় বৃত্তের বাইরে শিল্প হিসেবে নৃত্যচর্চার সূচনাও হল এই একই সময়ে। রবীন্দ্র নৃত্যধারার বাইরেও নতুন এই ধারা গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল কলকাতা তথা বাংলায়। ফরাসী দেশের এক আধুনিক নৃত্যশিল্পী এসেছিলেন একবার শান্তিনিকেতনে। তাঁর নৃত্যের বিষয় ছিল মানুষের জীবনসংগ্রাম। শান্তিদেব ঘোষের ভাষ্যে পাই যে,এই রকম নৃত্যপদ তৈরি করতে বলেছিলেন তাকে রবীন্দ্রনাথ। নানারূপ প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বিশেষভাবে দু’টি নৃত্যপদ্ধতি গৃহিত হল শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারায়, এর একটি কারণ অবশ্যই এই দুই ধারা তখন পর্যন্ত একটু বেশি সংহত এবং নৃত্যের মাধ্যমে তাদের দর্শন প্রচারের কাজে বৈষ্ণবরা অন্যান্যদের থেকে অনেক এগিয়ে।

নৃত্যের বাজার অর্থনীতি:

নৃত্যের কি কোনো অর্থনীতি নেই, থাকলে তা কখন গড়ে উঠেছে? এ বিষয়ে না হয় পৃথকভাবে আলোচনা করব কখনো। আপাতত এতটুকু বোঝা দরকার যে, শিল্পের যে অর্থনীতি শিল্পী ও তার পৃষ্ঠপোষক রাজা বা মন্দির, এই বৃত্তের মধ্যে চরকীপাক খেত তা এবার কিছুটা পরিবর্তন হল। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম পর্যায়ে রাজারা মূলত পুতুল রাজা হয়ে পড়ল, ক্রমে রাজপাঠ ধনসম্পত্তি প্রায় দখল করতে শুরু করল ব্রিটিশ। ফলত একশ্রেণির শিল্পীগোষ্ঠী যারা রাজার পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন তাদের জীবিকা অনিশ্চিত হল। অন্যদিকে আইন করে দেবদাসিপ্রথা বন্ধে মন্দিরের উপর নির্ভরশীল শিল্পীগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। এই দুই ক্ষেত্রের শিল্পীদের জন্য লাগবে নতুন ক্ষেত্র নতুন অর্থনীতি। যা সৃষ্ট হল দেশ বিদেশের সামাজিক পরিসরে। এক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষক হলেন হিন্দুত্ববাদী দর্শনের প্রচারক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর ‘সংগীত নাটক একাডেমী’ স্থাপন হবে, ভারত সরকারের শিল্প সংস্কৃতির দপ্তর হবে যারা এই উচ্চকোটির মানুষদের সংস্কৃতিকে আর্থিক সাহায্য দেবে, এর প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে।

বাংলায় এসবের ব্যতিরেকে একটি অন্য পরিসর তৈরি হল শিল্পের অর্থনীতিতে যা স্বাধিনতার বেশকিছু বছর পর ধীরে ধীরে সম্পূর্ণত উপরোক্ত ধারায় মিশবে। এই অন্য পরিসর গড়ে ওঠার কারণ শুধুমাত্র শান্তিনিকেতনের নৃত্যচর্চা নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলার শিল্প সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার ভিন্নতর পরিবেশ। নবনাট্য ও গণনাট্য আন্দোলন যেভাবে বাংলায় গড়ে উঠেছে এবং প্রভাব বিস্তার করেছে তাতে বাংলার শিল্পচর্চা শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেনি, বরং মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষের কথা বলেছে। তাই বাংলার নৃত্যচর্চাকে যতই একই ধাঁচে বেঁধে ফেলার চেষ্টা হোক না কেন তা সম্পূর্ণ সফল হয় নি।

আরো একটি মজার বিষয় হল লোকশিল্পীদের কিন্তু তখনো সামগ্রিকভাবে পৃষ্ঠপোষকের দরকার পড়েনি। তারা তাদের শিল্প নিজেদের কৌমগোষ্ঠীর মধ্যেই নিজেদের জন্য নিজেদের মত করে উদযাপন করেছেন। স্বাধীনতার পর যদিও সরকারীভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষক হবে ভারতের সরকার এবং তাদের শিল্প সংরক্ষণের চেষ্টাও হবে।

উপসংহার:

একশ শতাংশ হিন্দু জাতীয়তাবাদী নন রবীন্দ্রনাথ, বরং তার সমালোচক। একশ শতাংশ ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কারাচ্ছন্ন দলের মধ্যেও পড়েন না তিনি। রবীন্দ্রনাথ তো কল্পনার মুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর দেবতা যে ভক্তের দুয়ারে আপনি এসে হাজির হয়, দেবতা ভক্তের সাথে মিলনের জন্য অভিসারে বাহির হয়। “আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরাণ সখা বন্ধু হে আমার।” তাহলে নৃত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কেনই সেই ধর্ম আশ্রিত নৃত্যগুলিকে সমন্বিত করছেন? এর উত্তর পেতে আর একবার পিছন দিকে তাকাব। কারণগুলো খুঁজব-
এক) জাতীয় বিদ্যালয়ের কথা বললেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়েই ছিল শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় পরে বিশ্বভারতী। ব্রিটিশ বড়লাট ছোটলাটদের অভ্যর্থনাও করেছেন শান্তিনিকেতন তথা বিশ্বভারতীতে। সরকারের কুনজর পড়েছিল একবার এবং বিদ্যালয় বন্ধের জোগাড় হয়েছিল।
দুই) নিজে বক্তৃতা দিয়ে অর্থ জোগার করা ছাড়াও ত্রিপুরার রাজা সহ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে নানান মহলের মানুষের অর্থ সাহায্য লেগেছে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় তথা বিশ্বভারতীতে। কমবেশি তাদেরও প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়ের কাজে।
তিন) নাচ সংক্রান্ত যে বিরুদ্ধ মনোভাব ছিল বিশ্বভারতীর অধ্যাপক মহলে তা খানিক অনুকূলে আনতে রবীন্দ্রনাথকে বিস্তর প্রযত্ন করতে হয়েছে। মেয়েদের মণিপুরী নাচ শেখানোর পর গোপনে বয়ষ্ক অধ্যাপকদের দেখানোর কথা মনে করলে বোঝা যাবে সে ছিল একপ্রকার অনুমতি সংগ্রহ। বয়ষ্ক বর্ণশ্রেষ্ঠ অধ্যাপকরা যখন দেখছেন বৈষ্ণব ধর্মের আধারে নিবেদন মূলক নৃত্য তখন আর আপত্তির কারণ থাকে না। এইভাবেই মণিপুরী নাচ গৃহিত হয়েছিল বিশ্বভারতীতে। ধর্মের প্রলেপ থাকলেও নাচটা অন্তত চালু হল। আঙ্গিককে ভেঙে জুড়ে নিজের ভাব অনুযায়ী সাজিয়ে নেবেন এমনটাই সম্ভবত ভেবেছিলেন তিনি। যে কারণে বার বার গানের ভাবের ওপর জোড় দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। গান রচনা করেছেন, নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন যেখানে ধর্মের চেয়ে প্রেমের ভাবই অধিক। বিষয় দিয়ে কি ভরে দিতে চেয়েছিলেন আঙ্গিকের অসম্পূর্ণতা? আবার না না আঙ্গিককে ভেঙে চুড়ে এবং জুড়ে যে নতুন নৃত্যভাষা নৃত্যপদ তৈরি হতে পারে তারো একরকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখিয়ে দিলেন।
চার) অতিরিক্ত ইউরোপীয় কায়দা যেমন অপছন্দ করেছেন তেমনি আবার ছেলে জামাই সবাইকে পড়িয়েছেন বিদেশে। প্রতিমা দেবী বারাবার বিদেশযাত্রায় সংগী হয়েছেন তাঁর। নাচ সম্বন্ধে তাঁর যে আগ্রহ তাও প্রথমবার বিদেশযাত্রার ফলশ্রুতি তাই ইউরোপীয় প্রভাব কাজ করেছে নিঃসন্দেহে।

ফলত, রবীন্দ্র ভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরো একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি শাস্ত্রীয় নৃত্যের গুরুদের এ বড় অপছন্দের বিষয়। একজন শ্রদ্ধেয় নৃত্যগুরুর সাথে আলাপচারিতায় শুনেছি, তাঁদের ছোটবেলায় তারা যে মণিপুরী নাচ শিখেছে তা নিতান্তই ভুল ও অশুদ্ধ, পরে মণিপুরে গিয়ে শুদ্ধনৃত্য শিখেছেন। এই শুদ্ধ অশুদ্ধ কে ঠিক করবেন? মণিপুরের নৃত্যগুরুরা। তাঁরা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী, ধর্মের আধারে নৃত্যের শুদ্ধতা নির্মাণ করেছেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথের এমন কোনো দায় ছিল না। বরং তিনি নতুন নৃত্যপদ নৃত্যভাষা তৈরি করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন এবং তা করেওছেন।

আমাদের ছোটবেলায়ও যখন নাচ করতে শুরু করেছি মফস্বল অঞ্চলে খুব বেশি শুদ্ধ ও অশুদ্ধ বাছতে দেখিনি নৃত্য শিক্ষকদের। রবীন্দ্রনাথের গানে নিজের ভাব অনুযায়ী হাতপা নেড়ে চলে ফিরে নাচ করা যায়। এ একরকম মুক্তির স্বাদ দেয়। নিজের শরীরের মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশের এক নির্মল আনন্দ দেয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই হয়ত উন্নত শিল্প হয়ে ওঠেনি কিন্তু শিল্পের যে আনন্দ তা তো পাওয়া গেল। চলতে চলতে জানতে বুঝতে অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার যখন ভরে ওঠে তখন নৃত্যপদও পরিণত ও শিল্প সম্মত হয়ে ওঠার অবকাশ থাকে এক্ষেত্রে। চারপাশে গন্ডি কেটে নেচে যাওয়ার থেকে এ বরং অনেক বেশি আনন্দের।

ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু দর্শনের প্রভাব শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারার থাকলেও নতুন নৃত্যপদ গড়ে নেবার সক্ষমতাও তৈরি হয়েছিল নিঃসন্দেহে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় বার বার তাঁর লেখায় নৃত্যে শরীরের মনের ভাবের যে মুক্তির কথা রেখে গেলেন তা কি পরের প্রজন্মের কথা ভেবেই? যে কাজ সম্পূর্ণত তিনি করতে পারলেন না নৃত্য সম্পর্কিত লেখায় তার দিকনির্দেশ দিয়ে গেলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী কি সেই নির্দেশ নিল, নাকি চারপাশে গন্ডি কেটে রবীন্দ্রনৃত্যের শুদ্ধতা রক্ষায় প্রবৃত্ত হল? দ্বিতীয়টাই ঘটল, তাও একরকম আমাদের সকলেরই জানা। তবু এর বাইরেও একটা পরিসরে শিল্পীরা নতুন করে ভাবনার অবকাশ পেলেন। ফলত একশ বছর পর বর্তমানে রবীন্দ্রনৃত্য, রবীন্দ্রগান আশ্রিত নৃত্য, এমন যত ট্যাগ লাইনই তৈরি হোকনা কেন রবীন্দ্রগানে কবিতায় শিল্পী তাঁর নিজস্ব কল্পনা ফুটিয়ে তুলতে পারে।

বাঙালি মিশ্রজাতি এতে যেমন কোনো সন্দেহ নেই তেমনি তার শিল্প সংস্কৃতিতে এই মিশ্রধারাই প্রাধান্য পাবে তাও নিশ্চিত। যতই তাকে একের গন্ডিতে বাঁধতে চাও না কেন তা বাঁধা পড়েনি আজও। তাই সমস্ত শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রচার প্রসার সত্ত্বেও শান্তিনিকেতন ঘরাণার নিগড় সত্ত্বেও গণনৃত্য নবনৃত্যের সৃজনশীল নৃত্যের ধারা সমান গতিতে বয়ে চলেছে বাংলার নৃত্যশিল্পের পরিসরে। বর্তমান ও ভবিষ্যত শিল্পীদের বোধ ও জ্ঞান ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভর করছে নৃত্যশিল্পের ভবিষ্যৎ চলন।

সমাপ্ত

Facebook Comments

Leave a Reply