অপ্রকাশিত কবি

fail

[বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, বহু প্রতিভাশালী কবিই অপ্রকাশিত অপ্রচারিত থাকেন – কখনও বা তাঁদের ভাষা আঙ্গিক শৈলীর বিশেষত্বের কারণে, কখনও জনসংযোগ করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক ব’লে, আবার কখনও হয়ত কেবলমাত্র তাঁর ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিবেশের কারণে। এমন কত কারণই ঘুরে বেড়ায়। একজন প্রকৃত কবির কাজ লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশের আড়ালে।

“অপ্রকাশিত কবি” – অপরজন পত্রিকার একটি প্রয়াস, এমন কবিদের কাজকে সামনে আনার, যাঁরা ব্যপকভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত নন। যাঁদের লেখা হয় এর আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি, অথবা কেবলমাত্র দু’ একটি পত্রিকাতেই প্রকাশ পেয়েছে। অথচ যাঁরা লেখার মাধ্যমে আমাদের দেখাতে পারেন ভবিষ্যত বাংলা কবিতার বাঁক।

বিভাগ সম্পাদনা করছেন, রাহেবুল।]

গোবিন্দ সরকার
জন্ম: ০৭/১১/১৯৯৫
জন্মস্থান: দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুশমন্ডি থানার অন্তর্গত এক প্রত্যন্তর গ্রাম সরলায়।
কবিতা লেখার উদ্দেশ্য-বিধেয়: জীবনের হিসেবের খাতায় প্রচুর গরমিল। অনেক কাটাকুটি করেও হিসেব মেলাতে পারিনি কখনও। ফলত প্যান্ডোরার বাক্সের মত অজস্র ভাবনা মনের মধ্যে কিলবিল করতে থাকে। ভাবনাগুলোকে রূপ দিতে না পারায় আসে তীব্র ছটফটানি। আর সেই ছটফটানি থেকে মুক্তি পেতেই আমার কবিতা-বোধের জন্ম। এখন কবিতার প্রাপ্তি বলতে অপার মুক্তি…মুক্তি…মুক্তি।
প্রথম প্রকাশ: নবপ্রয়াস সাহিত্য পত্রিকা (২০১৬)।

গোবিন্দ সরকারের পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ ২০১৬ সালে। খুব বেশি দিন হয়নি। এরইমধ্যে একটা বইও প্রকাশিত হয় উনিশে নাম ‘ডায়েরির পরীরা’। মজার ব্যাপার হলো তরুণ কবি নিজেই সে ভুলতে চান এতটুকু সময়েই! আসলে কবিতায় কার যে কখন কীভাবে জন্ম হয় বা পুনর্জন্মই হয় সে কে পারে বলতে?

এখানে থাকলো কবির সিরিজ কবিতা, ‘ফ্লেমিংগোদের অ্যাডভেঞ্চার’। আগের দুই পর্ব—জিয়াভাই আর প্রতিভার পর এবারে আমরা একটা অন্য ভূগোলে বেড়াতে যাচ্ছি। আশা করা যায় এ জার্নি পাঠককে বিরক্ত করবে না, বিমুগ্ধ করবে।

গোবিন্দ সরকার এর কবিতা

ফ্লেমিংগোদের অ্যাডভেঞ্চার

(১)

কাঁচা মৃতদেহের বচসায় অতিথির আমন্ত্রণ। মূল্যায়নের শীর্ষে বসা আমি পাতিকাক। দুই ঠোঁটের দূরত্বে কানাঘুষো, ফিসফিস। হিংসুটে দৃষ্টিতে প্রমাদ গুনি। বায়বীয় পৃথিবীর সিলেটি কুঁড়েঘরে লঙ্কালেবুর আমসত্ব। সেখান থেকে কবিত্ব চুঁইয়ে পড়ছে রোজ। হাতের শিরাগুলো হ্যাঁচকা টান মারছে। বুকের মধ্যিখানে গভীর সুড়ঙ্গ। তাই বুঝতেই পারিনি হার্টবিট না হাঁপানি। সুড়ঙ্গে খড়কুঁটো নিয়ে বাসা বেঁধেছে কাঠবেড়ালি। বেশ কিছুদিন হল নেকি কান্নার পোয়াবারো। অপেক্ষার প্রহর শেষে ফ্লেমিংগোদের মাল্টি ন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার। মৃতদেহটি সুবিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় মুখ গুমড়ে পাণ্ডুলিপিতে। আমি সেই পাণ্ডুলিপি কুট কুট করে কাটতে থাকি।

(২)

কুঁকিয়ে কাঁদছে ফসফরাস মেঘ। কচি বৃষ্টিরা আলপনা দিচ্ছে ধুলোয়। পরিধানে পরিপাটি।

যদিও ভাইফোঁটার অনেক দেরি। ঘুম ভাঙেনি বাঁশিয়ালের। শারদীয়ার কাশের ডগা এখনও দোলেনি পশ্চিমা হাওয়ায়।

বেশ কার্পন্য করছে ভাদ্র বউ। লেবুজলে ক্লেশ নিরাময়। শুনলাম মাইগ্রেনে বিপর্যস্ত হয়ে চোদ্দোদিন কোয়ারেন্টাইন।

জাবর কেটে সময় নষ্ট বিচালির উল্লাসে। পিঠ ঠেকা দেওয়ালে বেকায়দায় ঘরের ব্যালকনি। কিছুটা আরামের জন্য মুখ ডুবিয়ে হুকোতেই আত্মসমর্পণ।

শক্ত হাতে বৈঠা ধরার কোনও প্রয়োজন নেই। হাওয়া বইলে আমিও মাঝি। নৌকোর সাথে জানি তীরের আজন্ম পিরীতি।

(৩)

শরৎ এলে মাঝে মাঝেই আমি কাশবনে হারিয়ে যাই। খেই খুঁজে পাই জীবনের।

দু-পায়ে শিউলি ছড়িয়ে থাকে। আমি হেঁটেই চলি হাঁটু ভাঙা ‘দ’-এর সাথে।

শরীরের ছায়াটা যদিও পায়ে পায়ে; শিশিরের দু-তিনটি বিন্দু তখনও গড়াগড়ি খাচ্ছে।

নিবিড় চোখ দুটি পিঁপড়ের সাদা সাদা ডিম দেখে প্রশান্তি আনে। এগুলোও যে এক একটা জীবন্ত প্রাণ। ওরাও ঘর বাঁধবে, উল্কি দিয়ে স্বপ্ন সাজাবে।

স্বপ্নও বেইমানি করে; তা কেবল মানুষের সাথে। কারণ মধ্যবিত্তের খুচরো খুচরো স্বপ্ন; যার কোন মূল্য দিয়ে আসেনি কেউ।

(৪)

ঝাউ গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমস্টারডাম স্ট্রিটের ধারে।

জ্যোৎস্না সারারাত মোচড় খেয়ে উপচে পড়ছে গাছটির ওপর।

কৃষ্ণকায় সারঙ্গেরা বারবার মোসাহেবি কায়দায় ঢেকুর তুলছে আস্তাবলে।

পঞ্চবটী বনসাই ছেড়ে ইতিমধ্যে কাশ্যপ ঋষির উপত্যকায় শালপাতা কুড়োচ্ছি।

পাতাগুলির ওপর হলুদ লুকোচুরি খেলে পশ্চিমা হাওয়া। আর বারবার উড়িয়ে দিয়ে আমার থেকে বিস্তর দূরত্ব তৈরী করছে।

আমি শিস দিতে দিতে পাতাগুলিতে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিই। এক অদ্ভূত রকমের ভালোবাসা; যা কেবল প্রকৃতিই ছুঁতে পারে।

(৫)

অক্লান্ত সহবাস করে আমি ও আমার মাঝের মধ্যস্থ ইউরেশিয়া। কুঁড়ে পা দুটোর সাড়ে পাঁচটার ঘড়ি ধরে পায়চারি। দূর হতে ভাঙা কাঁচের মতো ইউরাল পর্বতের মেরুদণ্ড দেখা যায়। চূড়ায় ঝা চকচকে সোনাঝুরি রৌদ্র বিলি হচ্ছে। মৌন করলাম হাঁটা। বরফের স্তূপগুলো আস্ত সোনার মুকুট। অকপটে আমি ভ্যান গঘ হওয়ার চেষ্টা করি।

এ-ডাল থেকে ও-ডালে দুটি মুনিয়া পাখির খুনসুটি দেখছি। পালকে ঠোঁট গুজে শীত মুছে দিচ্ছে ওরা। আদানপ্রদান করছে একে অপরের দুঃখের জারণ-বিজারণ। টপাটপ শিশির পড়ার শব্দ একটুও বিরক্ত করেনি তাদের।

কিছু অ-বাংলাভাষী মানুষ এসে আবহাওয়ার ফোরকাস্ট শোনাচ্ছে। আমি ও মুনিয়াযুগল কান পেতে শুনছি। সংশয় হয় বরফবৃষ্টির অকস্মাৎ বিপর্যয়ে।

(৬)

উষ্ণতা ছড়িয়ে দাও আমার শিরা উপশিরায়। না জিরিয়ে ডালপালা ছড়াক অবলা রোদ। চনমনে ভাবটা লুকোনো কবুতর। ঠোঁট দিয়ে জল ছিটিয়ে প্রাতঃস্নান সারুক। রক্তিম আভার গা ঘেষে বয়ে চলুক স্কন্ধনদী।

খোলা বারান্দায় ইচ্ছেরাও উবু হয়। কারণ উষ্ণতারা রোজ ঘুমোয় উঠোনে কিচ্ছুটি না জানিয়ে। আমার প্রচণ্ড ঈর্ষা হয়। চোখে মুখে ঈর্ষা মেখে নিই। গোঙিয়ে ওঠে অপ্রত্যাশিত আগুনের ফুলকি। ধূসর চৌকাঠের পলাতক হৃৎপিন্ড তিলে তিলে ভস্মীভূত হয়। এদিকে গ্লিসারিনে খসে পড়ে নগ্নত্বকের পলেস্তারা।

(৭)

প্রিয় মেঘ গলে যাচ্ছে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে। মাটি বন্ধ্যা হলে মাস্তুল জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। লোকালয় জুড়ে সবুজ খসড়া পেশ হয়। ভৌগোলিক মানচিত্রে একটা হেস্তনেস্ত ব্যাপার। মানচিত্রের নৈঋত কোণে রডোডেনড্রন ট্রি শিস দেয়। শিস দিতে দিতে ধ্বনিভোটে জেতে কল-কাকলি। চওড়া খুশিতে মন্থর হাই ও এক আকাশ শূন্যতা। সেখানে সাদা পতাকা উড়িয়ে তাঁবু ফেলে প্যারাসুট। ইচ্ছেরা সওয়ারি হয়। শ-ক্রোশ দূরত্ব পারাপার করে খবরের শিরোনামে জুটি বাঁধে খাঁ খাঁ ও বাজপাখি।

Facebook Comments

Leave a Reply