নির্বাচনী কাটাকুটিতে দিস নে সময় কাটিয়ে বৃথা : অজয় ভট্টাচার্য

fail

এই রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতির সাময়িক বিরতি হয়েই আবারও কি অশান্তির ঘনঘোর? ১৭ তম বিধানসভার প্রথম অধিবেশন জুলাই এ আরম্ভ হবে যখন সেই সময়ে আবার পার্লামেন্ট এর বর্ষাকালীন অধিবেশনও শুরু- এরকমটাই এখনো সকলের অনুমান। আশা যে অতিমারি তার ভয়াল পর্ব পেরিয়ে, ইয়াস তার ক্ষতি চিহ্ন মুছে আবার একটু স্বাভাবিক চিন্তা ভাবনার জগতে ফিরিয়ে দেবে আমাদের জীবন। আবার অপেক্ষা কবে আসে পৌর নির্বাচন এর নির্ঘণ্ট প্রকাশ, আচরণবিধি জারির ঘেরাটোপ!

যত যাই হোক প্রশ্ন থাকবে শ্রম আইন এর প্রয়োগ তাড়না নিয়ে প্রকাশিত কেন্দ্রীয় সরকারি এক গুচ্ছ প্রস্তাবনা নিয়ে যা সুপ্ত রয়ে গেলো সামনের বছরে আবার “মহা প্রবল বলী” হয়ে ফিরে আসার। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে যুঝতে থাকা গরিব মানুষের কাছে তার স্বরূপ প্রকাশ কোন্ পথে করা গেলে রাজ্যের স্বার্থের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে সেটাই এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ। কেমন করে মোকাবিলা করলে শান্ত থাকবে রাজনৈতিক পরিবেশ, কাজের জায়গা, উপার্জনের নিশ্চয়তা? কি মন্ত্র আছে ঐ শ্রম কোড চারটের মধ্যে যা নাকি ২৯ টা আইনের মধ্যে দিয়ে আরো বহাল তবিয়তে রাখবে শিল্প ও শ্রমিককে আরো নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষায়, বৃহত্তর বিনিয়োগ উপযোগী আর আত্মনির্ভরশীল করে? ‘ওদের আছে অনেক আশা, ওরা করুক অনেক জড়ো।’ কিন্তু আমরা এই রাজ্যের ক্ষেত্রে এর ফলিত রূপটি কেমন দেখবো সেটাই ভাবনার। নতুন বা পুরনো ক্ষমতার কাছে কতটুকুই বা প্রত্যাশা করা যায়?

বাড়িতে আচার যেমন মজতে দিতে হয় তেমনই শ্রম আইনের নতুন চারটি বয়াম এখন আমাদের চোখের আড়ালে রোদ পোয়াক, এটাই মনে মনে বোধহয় কেন্দ্রীয় কর্তাদের বাসনা। “মই কিম্বা সিঁড়ি, দুটোরই বাসনা বিচ্ছিরি”; কোনও কথা না বলে বা শুনে এই আজব খাওয়াতে আমরা বসতে যাবো কিনা সেটা ভাবার বিষয়। তাই এর কাঠামো ওপরে ওঠার জন্যে কতটা নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করবে সেটা নির্ভর করবে আমরা কতটা প্রতর্ক-অনুরাগী হয়ে উঠবো তার অনুপাতে, সেই বিচারটি। আর তর্ক প্রিয় বাঙালি’র করায়ত্ত রয়েছে অনেক গুলো দশকের শ্রমিক সমাজ/গোষ্ঠীর সংগ্রাম এর দলিল। অনেক বিধি বিধান এর ভাঙ্গা গড়ার ইতিহাস। কেন্দ্র রাজ্য টানাপড়েন এর টালমাটাল সালতামামি। সেই ঐকতান আজও আসবে না, যা আগেও ছিলনা; কিন্তু বাংলার মানুষ এর কাছে নূন্যতম মজুরি, মহার্ঘ্য ভাতার চাল চলন, বোনাস, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা এদিকে ওদিকে তিনটি কৃষি বিল নিয়ে মিডিয়াতে যা জ্ঞান অর্জন হোলো সেই তুলনায় শ্রম-কোড নিয়ে আসার সময় আরো সরাসরি সংঘাত প্রতিঘাত এর সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে এখন কি কি করার আছে সেটাই রাজ্যর কাছে এখন চিন্তার বিষয়। কেমন হবে ট্রেড ইউনিয়ন এর পরিসর; কতটা থাকবে দর কষাকষির সুযোগ; নতুন কষ্টিপাথর এ সকলের কথা মান্যতা পাবে নাকি শুধু গরিষ্ঠ অংশের; কেমন ধরনের যন্ত্র কুশলতা থাকলে সরগরম থাকবে যুক্তি তর্কের সঠিক উপস্থাপনা, এসব নতুন বিধি বিধানের ‘এই দেখো নোটবুক, পেন্সিল এ হাতে’ তৈরি ইন্টারনেটে প্রতীক চিহ্ন নিয়ে তাত্ত্বিকরা। কেমন যেন ধাঁধা লেগে যায় চোখে। শ্রম আইন এর অ আ ক খ নাই বা জানা থাকলো! কিন্তু কাজের জগতের সাধারণ জ্ঞানে বোঝা যায় যে তার কর্তাব্যক্তিদের কথা শুনে চলাটাই দস্তুর, যদি ন্যায্য হয়। সাগিনা মাহাতো কী করে এতো জনপ্রিয় চরিত্র হয়েছিল ষাট এর দশকে! এতগুলো দশকের পরে এখনও কি শ্রম আইন কানুন নিয়ে আলোচনা হলে খুব মন টানবে নাকি ঐ সিনেমা দেখলে সাধারণ মানুষের মনে ধরবে সেটা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই। তাহলে গণমাধ্যম এখন কী উপায়ে এই নতুন আইন কানুন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটা অবলম্বন গড়ে দিতে পারে সেটা ভাবা ভালো; ক্লাস রুমে বা গেট মিটিং এ এই কাজ নিষ্পত্তি হবেনা। ভিডিও টিউটোরিয়াল কেমন করে অধিকার শেখায় সেটা আইএলও র সাইট দেখলে খানিকটা আমরা রপ্ত করতে পারি। বাকিটা আমাদের নিজস্ব লোক শিক্ষা আর সক্ষমতা বাড়ানোর সনাতন পদ্ধতি। স্কিল ডেভলপমেন্ট, রিসার্চ, স্টাডি, সার্ভে নিয়ে এবার নতুন ছেলে মেয়েদের অবদান কে স্বীকৃতি দিলে রাজ্য নেতৃত্বের ভবিষ্যভাবনার গতি-প্রকৃতিতে সদর্থক বদল আসার আশা করা যায়। জেলা স্তর থেকে উঠে আসা প্রশ্নের জবাব খুঁজতে যেন কলকাতাকেই শুধু গুরুঠাকুর যোগানোর দায়িত্ব না নিতে হয়; রাজ্যে এখন অনেক বিশ্ব বিদ্যালয়, ট্রেনিং সেন্টার, ম্যানেজমেন্ট কলেজ, সেখানকার মেধা সম্পদ কীভাবে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করার স্বার্থে কাজে লাগানো যায় সেটা ট্রেড ইউনিয়ন- বিধায়ক- পৌর প্রতিনিধিরা পরিকল্পনা করলে ভালো হবে।

ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের এই নতুন ধাঁচের আইন এর সাত- সতেরো নিয়ে ভাবার জন্যে অনেকগুলো উপায় বার করতে হবে নিজেদের মধ্যেই গঠনমূলক আইডিয়া র আদান প্রদান বাড়ানোর মধ্যে দিয়ে। ভার্চুয়াল মিটিং এর কৃতকৌশল, ইলেকট্রনিক উপায়ে বার্তা আদানপ্রদান, রিটার্ন জমা করা, সদস্য দের অভাব অভিযোগ শোনা, প্রকল্পের আওতাভুক্ত রেখে প্রয়োজনীয় তথ্য-ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এর ব্যবহারে গরীব মানুষের বিপদ আপদ এর সহায় হওয়া। এই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিক এর সমস্যা মেটানোর সময় সঠিক সমাধান আর যোগাযোগের সন্ধান দেবার অন্যতম শরিক কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন। মূল্য সূচকের জটিল ওঠানামা আমাদের শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরীতে কেমন প্রভাব বিস্তার করে থাকে সংগঠিত থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শিল্প- সংস্থায়? কেমন আছেন চুক্তি ভিত্তিক কর্মচারীরা নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন কর্মী, হোটেল রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, দোকান কর্মচারীরা কি করে পাবেন সঠিক মজুরী, ই পি এফ, ই এস আই? কি করে ঠিক জানা যাবে অন্য রাজ্য কীভাবে প্রয়োগ করতে চলেছে শ্রম কোড এর খুঁটিনাটি আইনি এবং কারিগরি দায়-দায়িত্ব,সেই খবর রাখার সময় এসেছে এখন সকলের।
আমাদের নিরাপত্তা’ সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে সুরক্ষা’হীনতায় থাকা অসংখ্য রক্ষী,পরিবহনকারী, গৃহকর্মী, গিগ ওয়ার্কার্স দের আরো নির্ভয় দান। মেয়েদের দিন-মজুরী, স্বাস্থ্য, সুরক্ষায় ঠিক কোন কোন অসংগঠিত ক্ষেত্রে কতটা খামতি আর সাবেকী বেখেয়ালি এখুনি মোকাবিলা করার দরকার সেই কথাটা মনে রাখার কথা ছিলনা তখন; কিন্তু এখন যখন সমীকরণ এর অঙ্কে সেই মেয়েদের ভোটে পছন্দ- অপছন্দ জানাবার চিত্র তে সেই চাওয়াটি পরিষ্কার। সেই খেলার বেলা কিন্তু যায়নি, সময় কিছু বাকি, বিদায় দ্বার খুলতে এখনও দেরী, তার আগেই অনেক কাজের কাজ আছে – চা বাগান, বিড়ি বাঁধাই, পাথর খাদান, জরি, হোসিয়ারি, তাঁত, নার্সিং হোম, নির্মাণ এর জগতে কেমন আছেন ওনারা সেটা জানা জরুরী কাজ এখন।

সোশ্যাল ডিসটেন্স কিন্তু কথা চালিয়ে যেতে মানা করেনি। আর তিন পক্ষের মধ্যে এই নলেজ ট্রান্সফার যেন নিতান্তই সোজাসুজি থাকে। তার প্রয়োগ যেন বন্ধুত্বটাকে আগে রাখে- রাজনৈতিক বৈরিতা নয়।এই বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সিনেমা টিভির কলা-কুশলীরা সাথী হতে পারেন। অনেকগুলো কাজ এসে পড়েছে; রাজ্যের মানুষের ভাত কাপড়ের ভাবনাটা একসাথে ভাবা দরকার; কথা বলা শুরু হোক। আইন প্রণেতা, প্রশাসক, বিচারক সবার নজরে পড়ুক এই সচেতনতা আর সহমর্মিতা।

লড়াইটার সবটা রাস্তায় হবে না। সব অবস্থার জন্য তৈরি থাকা সময় ও পরিস্থিতির দাবি।

[লেখক – প্রাক্তন অতিরিক্ত শ্রম কমিশনার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।]

Facebook Comments

Leave a Reply