পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কোন বার্তা বহন করছে? : অতনু প্রজ্ঞান

fail

ভোটের রেজাল্টের পরে বাঙালির মনে একটা সার্বিক উল্লাস দেখেছিলাম এই মর্মে “আমরা হিন্দু মুসলমানের বিভেদ চাইনা, আমরা বাঙালি, তাইই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি ব্যর্থ করে দিয়েছি”।
কিন্তু আসলে হয়েছে উলটো। প্রবলভাবে মেরুকরণের সাফল্যই হলো এবারের ভোটের রেজাল্ট। একটি রিসার্চে দেখলাম বলা হচ্ছে মোটামুটি এই বাংলায় হিন্দুদের ৫০% পেয়েছে বিজেপি, ৩৯% পেয়েছে তৃণমূল। বাঙালি মুসলমানদের মোট ৩০% এর মধ্যে ২৭% ই পেয়েছে তৃণমূল। বোঝাই যাচ্ছে মুসলিমরা স্থির করে নিয়েছিল তাদের ভোট কিছুতেই ভাগ হতে দেবেনা, বাম-কং জুটি ও তার দোসর আব্বাস সিদ্দিকির আই-এস-এফকে দিয়ে লাভ নেই কারন তারা সরকারে আসতে পারবেনা। বিজেপিকে রুখতে একমাত্র দিদিই ভরসা। একমাত্র ভাঙরে একটি সিট আই-এস-এফ ছাড়া এই জোট আর কোনো সিট পায়নি। কান্তিবাবু , ফুয়াদ হালিমের মতো অসামান্য সমাজসেবক রাজনীতিবিদ, দীপ্সিতা-শতরূপ-ঐশি-মীনাক্ষী ও আরো অন্যান্য কয়েকজনের মতো ঝকঝকে শিক্ষিত পরিশ্রমী তারূণ্যেভরা মুখেদের ওপরেও ভরসা রাখতে পারেনি বাংলার মানুষ। কারন প্রবলভাবে “মেরুকরণই” ছিল এবারের রেজাল্টের মূল ভিত্তি।
মমতা ব্যানার্জীর পরামর্শদাতা প্রশান্ত কিশোর ভোটের রেজাল্টের পরে বার বার বলেছে বেশ কিছু জনকল্যানমুখী প্রকল্প যেমন “দুয়ারে সরকার”, “স্বাস্থ্যসাথী” ইত্যাদিই আসলে তৃণমূলের তুমুল সাফল্যের রহস্য। হ্যাঁ, পিকের সংস্থার ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রিসার্চ করে সরকারের প্রতি মানুষের চাহিদা, অভিমান, অভাব-অভিযোগ ইত্যাদির ‘তথ্য’গুলো তুলে নিয়ে এসে সেগুলো নিয়ে রিসার্চ করে নানা জনকল্যানমুখী পলিসী বানিয়েছে। কিন্তু শুধু সেইগুলোই সারা বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের রহস্য নয়। আসল প্রভাব হলো পোলারাইজেশন বা মেরুকরণের। বাংলায় ২ রকম মেরুকরণ ঘটে গেছে এভাবের ভোটে।
এক, ধর্মীয় মেরুকরন। অর্থাৎ হিন্দু মুসলিম পোলারাইজেশন। মুসলিম ভোট জোটবদ্ধ হয়েছিল অমিত শাহ-নরেন্দ্র মোদী-দিলীপ ঘোষের মুসলিম বিদ্বেষী বিজেপিকে বাংলায় ঢুকতে না দিতে।
দুই, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মেরুকরণ। নরেন্দ্র মোদী ও তার বাহিনীর অতি আগ্রাসী প্রচার, হিন্দী সংস্কৃতি বাঙালির ঘাড়ের ওপরে চলে আসা, দেশের প্রধানমন্ত্রীকে “দিদি ও দিদি” সুলভ ট্রোলারের ভূমিকায় দেখা, বাঙালি শিল্পীদের ওপরে দিলীপ ঘোষের আপত্তিকর কথাবার্তা ইত্যাদি এসব বাঙালির কাছে বিরক্তিকর ছিল। বাঙালি চিরদিনই তার ভাষা, তার সংস্কৃতিকে নিয়ে গর্ব করে। তার অপমান হোক বাঙালি কিছুতেই চায়না। এ আলাদা কথা বাঙালি নিজেই তার ভাষাকে খানিকতা অপমান করে হিন্দী আগ্রাসনকে জায়গা করে দিচ্ছে, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ হিন্দী নিয়ে দাদাগিরি করবে এটা বাঙালি চায় না মোটেই। তার সঙ্গে সেকুলার সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা বাঙালি হিন্দুরা বিজেপির এই আগ্রাসী অনুপ্রবেশকে কিছুতেই মেনে নিতে রাজী ছিল না। উগ্র হিন্দুত্বের সুড়সুড়ি দিয়ে তাই ৫০% এর বেশি বাঙালি হিন্দুকে নিজের উগ্র হিন্দুত্বের সমর্থনের দিকে টানতে পারেনি বিজেপি।
যাই হোক, ভোট তো এখন হয়ে গেছে। তৃণমূল সিংহাসনে বসেছে। বিজেপি বসেছে বিরোধী আসনে। বামেরা রাজ্যশাসনের আলোচনাতেই নেই আপাতত। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই ফলাফল কোন বার্তা বহন করছে, সেইটা ভাবা যাক। আগামীতে বামেদের কী ভূমিকা হতে পারে তা নিয়েও খানিক ভাবা যাক।
এ রাজ্য সহ সারাটা দেশ এখন মহামারীতে বিধ্বস্ত। প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে রোজ। কেন্দ্র সরকার ভ্যাক্সিনের ঠিকঠাক বন্দোবস্ত করতে পারছেনা। এইজন্য বিজেপি বিরোধী তৃণ, কং, বাম মনোভাবাপন্ন অনেকেই দেখি ভাবছে নরেন্দ্র মোদীর সিঙ্ঘাসন টলোমলো। উনি অস্তমিত। টুটারে ফেসবুকে রিজাইন_মোদী হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হচ্ছে। বেণারসের শ্মশানে সারি সারি লাশের আগুন এসে পুড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ। গঙ্গায় ভেসে আসা লাশেরা দেশের কান্ডারীকে জিজ্ঞাসা করছে তাদের অপরাধ।
কিন্তু বাস্তবে ছবিটা হয়ত আলাদাই। এই মহামারীতে ভদ্রলোকের জনপ্রিয়তা টোল খায়নি। ভ্যাক্সিন তো অগাস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রায় সবার হয়ে যাবে। ২০২২ এ প্রবেশ করেই নরেন্দ্র মোদী নতুন করে মসিহা হয়ে উঠবেন এ দেশের। ২০২৪ এর ভোটের জন্য যা যথেষ্ট অনুকূল হাওয়া বিজেপির জন্য।
কিন্তু এইখানেই শুরু হচ্ছে তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামদলের ভূমিকা, আগামী দিনগুলোর জন্য। যে ৫০% হিন্দু বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে সেই সংখ্যাটা থেকে তুলে আনতে হবে মানুষকে। সরকারকে স্কুলে স্কুলে শেখাতে হবে সেকুলারিজমের গুরুত্ব। প্রকৃত সেকুলারিজমের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে বিজেপির বিরুদ্ধ দলগুলোকে। আমরা দেখলাম, তৃণমূল সুপ্রীমো সিংহাসনে বসেই ভুল করে ফেললেন। লকডাউন ঘোষনা করতে দেরী করে দিলেন। দেখা গেল ঈদের পরের দিনই লকডাউন শুরু হলো। ডিবেট করে মানুষের মনকে ভোলানো যায় না। মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে একটা পোলারাইজেশনের বার্তাই গেল। ‘দুধেল গরু’ নামক কুতসিত শব্দ ব্যবহার করে যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন উনি, লকডাউন দেরীতে ঘোষনা করে সেটাকেই উসকে দিলেন।
মুসলিমদের খুশি করার জন্য যে মেলোড্রামাটিক নাটকীয়তা দেখি তৃণমূল সুপ্রীমো ও তার সাঙ্গপাঙ্গোদের মধ্যে, তা বাংলার হিন্দুদের মনে পোলারাইজেশনের বার্তাই দেয় বৈ কি। আবার নিজেকে ধার্মিক হিন্দু প্রমানে খোলা মঞ্চে উঠে ভুলভাল মন্ত্রোচ্চারণ করে ও অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে যেভাবে লোক হাসান উনি এতে ধার্মিক হিন্দু খুব খুশি হন বলে মনে হয় না! এই জায়গাগুলোকে নিয়ে তৃণমূল সুপ্রীমোকে খুব সিরিয়াসলি কাজ করতে হবে। প্রকৃত সেকুলার পরিবেশ তৈরী করতে পারলেই সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে আটকানো যাবে। পিকে’র কথা মেনে নিলে ভোটে জিতে আসা সরকারকে সে সাহায্য করবেনা। পিকে বলেছে এই রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্টের পেশা ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতেই নামতে চায়। পিকে যদি চলে যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার কী আবার ওঁর সিগনেচার শাসনের ফিরে আসবেন? তাহলে কিন্তু তৃণমূলের এই রেজাল্ট ধরে রাখা অসম্ভব! তৃণমূল সুপ্রীমোর ‘দুধেল গরু’ ছাপ মুসলিম তোষন, মারধোর করে গুঁড়িয়ে দিতে চাওয়া বাম বিরোধী মানসিকতা ও সস্তা জনপ্রিয়তার রাজনীতি হিন্দু অধ্যুষিত বাংলার হিন্দুদের আরো বেশি করে বিজেপির মতো শক্তিশালী দৃঢ় অর্থবান দলের দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে। তৃণমূল সুপ্রীমো যদি ওই পথ ছেড়ে ম্যাচিওরের মতো পদক্ষেপ নেন এবং কংগ্রেস ও বামপন্থীদের বিরোধী হিসেবে কিছুটা জায়গা ছেড়ে দেন যাতে তারা বেশি ভোট পেয়ে বিজেপি বিরোধীতার কাজটা ঠিকভাবে করতে পারে, তবে আগামী নির্বাচনে তৃনমূল তো ক্ষমতায় থাকবেই, তার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিজেপির এই আগ্রাসী হিন্দুত্বের পথকে কিছুটা বাধা দিয়ে বাম ও কংগ্রেসও উঠে আসবে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী রূপে।
এবং ঠিক এই খানেই আসছে কংগ্রেস ও বাম দলগুলোর ভূমিকা। কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরেই সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সমস্যায় ভুগছে। যার প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও। আর বামফ্রন্টের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে তা হলো ভিতটা আলগা হয়ে গিয়েছে। ভোটার শিফট হয়ে গিয়েছে গত দশ বারো বছরে। স্বাভাবিক। সাধারন ভোটার কারো না, সে কেবল তাকেই চেনে যে তাকে বেঁচে থাকার ভরসা দেবে, পাশে থাকবে। বামফ্রন্ট সে ভরসা দেওয়ার ছাতাটা হারিয়ে ফেলেছে দিনের পর দিন ধরে। তৃণমুলতো ছিলই, তার সঙ্গে এই বাংলায় ঢুকে পড়েছে বিজেপি। সাম্প্রদায়ীকতাই তাদের তুরুপের তাস। হিন্দু অধ্যুষিত এই রাজ্যের গ্রাম বাংলার মানুষের মনের মধ্যে ধর্ম নিয়ে ভক্তি, ভরসা সবটাই ছিল। বামফ্রন্টের আমলে নিজেদের হিন্দু আইডেন্টিটি খুব বেশি ভাবার পরিবেশই ছিল না। এ রাজ্যে বামফ্রন্টের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সারা ভারতের মধ্যে বামফ্রন্ট শাসিত রাজ্যগুলো সেকুলারিজমের পরিবেশ বজায় রাখতে পেরেছে অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বামফ্রন্ট চলে যেতেই একদিকে মমতা ব্যানার্জী মুসলমান তোষনের তাস বের করতেই বিজেপি সোল্লাসে হিন্দুত্ব তাস খেলে দিয়েছে। এবং গত কয়েকবছর ধরে হিন্দুত্ব সেন্টিমেন্টের সে গাছ চারাগাছ থেকে শক্তপোক্ত গাছ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইখানে বামফ্রন্ট খুব নড়বড়ে জায়গায় আছে এখন। যেসব ভোট বাম থেকে বিজেওই চলে গেছিল, তারা এখন হিন্দুত্ব সেন্টিমেন্টের আইডেন্টিটিটা পেয়ে গেছে। এটা অবশ্যই একটা নরম জায়গা মানুষের। কটা মানুষ আর ধর্মের আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকে এ দেশে
এই ভোটারদের ফিরিয়ে আনতে বামফ্রন্টকে বেগ পেতে হবে আগামী দিনে। এমনিতেই বাংলার হিন্দু বাঙালির একাংশ বামেদের প্রতি বেশ বিরক্ত। ঘোষিতভাবে বহু বাম লোকজন দেব দেবীদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে, ধর্ম নিয়ে বিরোধিতা করে, অলৌকিকে বিশ্বাসী ভক্তিরসে জারিত মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। বামেরা এই বাংলায় মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের সমর্থন পেয়েছিল বর্গা আন্দোলন করে, জমির পাট্টা তাদের হাতে দিয়ে। কিন্তু সেদিন আজ বহূ অতীত। সে অতীত টেনে আর ধরে রাখা যায় নি মানুষকে। জেলাস্তরে বাম নেতারা শিকড় আলগা করে ফেলেছিল দীর্ঘদিন ধরে শাসনে থাকতে থাকতে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে তারা মানুষকে টেকেন ফর গ্র্যান্টেড ধরে নিয়েছিল। ঠিক এই জায়গাটাতেই ঢুকে পড়েছিল কালীঘাটের ওই দাপুটে মহিলা। একেবারে মাটিতে বসে পড়া নেত্রী, বাড়ির দিদির মতো আন্তরিক, দলের ছেলে মেয়েদের কিছু হলে সবার আগে দৌড়ে যায়, অনশনে বসে পড়ে যখন তখন… এইসব ইমেজের মাধ্যমে মানুষের কাছাকাছি চলে এসেছিল। মানুষ শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, রুচিশীল, খানিক দাম্ভিক ও শিকড়হীন হয়ে যাওয়া বাম নেতাদের বদলে দিয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা ওই মানুষটিকে শাসনে আনার কথা ভেবে নিয়েছিল তাই।
আবার যদি বামেদের শাসনে ফিরতে হয়, আগে ফিরতে হবে গ্রাম বাংলার মানুষের মাটির বাড়ির দাওয়ায়, জমির আলে, পুকুরের ঘাটে। মুসলমান বাঙালি যেভাবে ভরসা করে ফেলেছে দিদিকে, সেখান থেকে তাদের কিছুটা অংশ বামেদের দিকে মুখ ফেরাতে যেটা করতে হবে তা হলো, প্রধান শত্রু হিসেবে মমতা ব্যানার্জীকে ঠাউরানো চলবেনা। এই ভোটে বামপন্থীদের মিটিংগুলোতে দেখাগেল আধঘন্টা মিটিঙে কুড়ি মিনিটেরও বেশি সময় ধরে মমতার সরাসরি বিরোধিতা, বাকি সময়টা কোনোরকমে বিজেপি বিরোধিতা। বহু লোক এটা ভালো চোখে নেয়নি। মমতা ব্যানার্জীর প্রতি ব্যক্তিকেন্দ্রক ও আক্রমণাত্মক সমালোচনার নীতি বন্ধ করে মূল শত্রু হিসেবে সাম্প্রদায়িক বিজেপিকেই প্রজেক্ট করা দরকার বেশি করে। মার্ক্স লেনিনের তত্ত্বে আকৃষ্ট করে গ্রাম বাংলার হিন্দু মুসলমানের ভোট কোনোদিনই পাওয়া যায় নি, যাবেও না। কিন্তু মমতা বিরোধীতার বাড়াবাড়ি ছেড়ে বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষের জঘন্য নীতির প্রতি তীব্র বিরোধীতা বেশি করে দরকার বাঙালি মুসলিমের ভরসা ফিরিয়ে আনতে।
পাশাপাশি বাম সংস্কৃতি কর্মীদের কাজ হলো সেকুলার ভাবনাকে সামনে রেখে নানা কর্মসূচী নেওয়া। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বাম লোকজন হিন্দু দেব দেবীদের নানা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ও হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও ইসলামের গোঁড়ামি ও ইসলামী ধর্মগুরুদের উগ্রতা ও ভন্ডামি নিয়ে ততটা সরব হচ্ছেনা। এই বৈপরীত্য ভালো চোখে নিচ্ছেনা বাঙালি হিন্দুরা। এই একচোখামি যত কমবে বামেদের আচরণে, যত বেশি করে বামেরা হিন্দু , মুসলিম উভয় ধর্মের গোঁড়ামি, অন্ধত্ব, কুসংস্কার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমহারে আওয়াজ তুলবে, ধর্মগুরু পীরজাদার বংশের লোকজনকে পার্টির সঙ্গে সুবিধেবাদের ভোট রাজনীতির হাত মেলানো থেকে দূরে রাখবে, তত হিন্দু বাঙালি বামেদের ওপরে ভরসা ফিরিয়ে আনবে। বর্তমান হিন্দু বাঙালির বড় একটা অংশ যারা নরেন্দ্র মোদীকে সমর্থন করে বা বিজেপি আর এস এস এর প্রতি সহানুভূতি মনো ভাবাপন্ন, অনেকেই নাস্তিক, ধর্ম নিয়ে তাদের আগ্রহ নেই বাড়াবাড়ি, কিন্তু তারা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছে। বামেদের একচোখামি সেকুলারিজম ও তৃণমূলের তোষন্ নীতির প্রতি বিরক্ত হয়ে তারা অনেকে ঝুঁকেছে বিজেপির দিকে। কাজেই নিজেদের সেকুলারিজম চর্চাকে স্বচ্ছ করতে হবে বামেদের । এবং হিন্দুধর্ম অধ্যুষিত এই দেশে ধর্মকে অপমান করে কখনোই পায়ের তলায় মাটি পাবেনা বামেরা। গ্রাম বাংলার মানুষ কেন ঈশ্বরের প্রতি, অলৌকিকতার প্রতি ভরসা রাখে সে নিয়ে সহানুভূতিশীল হতে হবে। হিন্দু ধর্মের বইগুলো পড়লে তবেই দর্শনটা সম্পর্কে তারা ভালো করে জানতে পারবে। গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কিছু বলতে হলে দর্শনের ভালো দিকগুলোকে নিয়ে আগে প্রশংসা করতে হবে বৈ কি। এই চর্চাটা বামেদের বিশেষ ভাবে দরকার।
আরেকটা ব্যপার দেখতে পাচ্ছি, শ্রমজীবী ক্যান্টিন ও রেড ভলান্টিয়ারদের অভূতপূর্ব কাজ সত্ত্বেও ভোটের বাক্সে তা প্রতিফলিত না হওয়ায়, অনেক বামপন্থী মানুষই বিরক্তি প্রকাশ করছেন। কিন্তু ভোটারদের ওপরে মনে মনে বা প্রকাশ্যে অভিমান না দেখিয়ে তাদের বুঝতেই হবে, কতটা মরিয়া হয়ে গেলে মানুষ কান্তি গাঙ্গুলি বা ফুয়াদ হালিমের মতো তুমুল পরোপোকারী মানুষকেও জেতানোর ভরসা পান না! মানুষ এবারে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে, অসহায় হয়ে গেছে বলে। অতিরিক্ত আগ্রাসী প্রচারে নামা, দেদার পয়সাওয়ালা, বাঙালী সংস্কৃতিকে আক্রমন করা, সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে আটকাতে এ ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। কাজেই বামেরা যদি মমতা ব্যানার্জীকে মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না করে সেকুলারিজমের বিরোধী বিজেপির বিরুদ্ধে পথে নামে এবং যে ৫০% হিন্দু ভোট বিজেপিতে গেছে সেখান থেকে কিছু ভোটকে নিজেদের দিকে ফিরিয়ে আনার আসার চেষ্টা করে তাহলে সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বাংলার মুসলিমরা কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েই ভরসা রেখেছে পায়ের তলার মাটি আঁকড়ে থাকতে। বামপন্থীরা নিজেদের ভরসাযোগ্য করে তুলতে পারলে মুসলিম ভোটও আসবেই আগামীতে।
কিন্তু বাংলার এই হিন্দু-মুসলিম ভোটকে আবার নিজেদের ভোটবাক্সের অনুকূল করতে গেলে ফিরে যেতে হবে অতীতের বাম মেকানিজমে, যার দরুণ প্রত্যন্ত গ্রাম-মফস্বল-কোলকাতার কোন বাড়িতে কী ভোট, কোথায় কী হাওয়া ইত্যাদি সমস্ত তথ্য মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু পেয়ে যেতেন মহাকরণে বসেই, গ্রামের পথে পথে না ঘুরেই! পিকে বা প্রশান্ত কিশোরের টিম ঠিক সেটাই করেছে গত তিনটে বছর। বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষের কথা জানতে চেয়েছে। জনসংযোগ বাড়িয়েছে। বামেদের আবার সেই ভিত থেকে শুরু করতে হবে।
ফেসবুক লাইভ, মিডিয়াতে চটকদার ডিবেট, কোলকাতার রাস্তায় স্ট্রিট থিয়েটার বা নাচ-গান করে তেমন কিছু হবে না। ওসবের প্রভাব শহুরে কিছু মানুষদের জন্য। লাইক কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে গ্রাম-মফস্বলের ভোট হিসেব করতে গেলে আবার বড়সড় ভুল হয়ে যাবে। আম-বাঙালি সেরিব্রাল বা ইন্টালেকচুয়্যাল ব্যাপার স্যাপারে প্রভাবিত হয় না এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কালিঘাটের টালির চাল দেওয়া বাড়ির ভদ্রমহিলা।
রেড ভলেন্টিয়ার্স দেখিয়ে দিয়েছে প্রচুর ছেলে মেয়ের দল বামেদের জন্য রাস্তায় নেমে খাটতে তৈরী। দরকার বাম নেতৃত্বের। মিডিয়ায় মুখ দেখানো চকচকে জামা প্যান্টে সালোয়ার শাড়ির চৌকস ইংরেজি বলা মুখ দিয়ে আম বাঙালির মন ভেজানো যাবেনা। দরকার পথে নামা। মিছিলের ছবিকে গানের আবহ দিয়ে ফেসবুকে ভাইরাল করাটাকেই যারা রাস্তায় নামা জনপ্রিয়তা ভাবছে তাদের চোখ খোলার সময় এসেছে। সারা বাংলায় যেখানে যত দুর্নীতি হচ্ছে, স্থানীয় বাম নেতা নেত্রীরা সেখানে পৌঁছে ধর্ণা দেওয়া, প্রতিবাদ করা, আন্দোলন, অনশন এইসব যত বেশি করে করবে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জীকে গদিচ্যুত করার কথা না বলে “সিস্টেমের ইস্য্যুগুলো” নিয়ে আওয়াজ তুলবে, ইস্যুগুলোকে সমাধান করার জন্য প্রতিবাদে নামবে, পুলিশের মার খেলেও থেমে থাকবেনা এবং এসব আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তের খবর সোশাল নেটোয়ার্কিং সাইটগুলোতে ছড়িয়ে দেবে মোবাইল ক্যামেরা ও ইন্টারনেটের সাহায্যে তত মানুষ বাম আন্দোলনে আবার ভরসা করতে পারবে। “দুয়ারে সরকার” প্রকল্পে পিকের সাজেশনে তৃণমূল যেটা করেছে সেটা বামেরা আগেই শুরু করতে পারত, খাতা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভাব অভিযোগগুলো শুনতে ও লিখে নিতে পারত তারপর তাদের বিক্ষোভ, অনশন, আন্দোলনের রূপরেখা বানাতে পারত, সেটা কি তেমনভাবে করেছে তারা? টেট আন্দোলনে তারা আন্দোলনকারীদের পাশে গিয়ে চটকদার কথা বলে অনশনরীদের জল খাইয়ে হাততালি কুড়িয়েছে। কিন্তু নিজেরা রাস্তায় বসে পড়েনি অনশন করতে। মমতা ব্যানার্জী অনশন করেই সিঙ্গুর আন্দোলনে বুদ্ধদেব বাবুর সিংহাসন টলিয়ে দিয়েছিলেন। এন-আর-সি নিয়ে যখন রাজধানী ও দেশ উত্তাল বাংলার বামেরা দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন মানব-বন্ধন গড়ে তোলার আয়োজন করতেই পারতেন ধর্ম জাতপাত নির্বিশেষে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন দু একটা মিছিল আর ফেসবুকের ভিডিও ছাড়া আর কিছুই দেখিনি আমরা সেসময়। দেশে ৯২ এর দাঙ্গার পরে বাংলাকে দাঙ্গার হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিল বামেরা। এন-আর-সির পরে কোথায় তেমন উদ্যোগ বামেদের? সারা বাংলায় বাম নেতা নেত্রীদের মধ্যে তেমন মানুষগুলোকেই দরকায় যারা রাস্তায় নেমে মানুষের অধিকারের পাশে থাাকবে, তাদের কাঁধে হাত রাখবে, মানুষের জন্য নিজে কষ্ট পাবে। তবেই বাম নেতৃত্বদের ওপরে আবার ভরসা ফিরে পাবে বাংলার মানুষ।
আরেকটা মারাত্মক ভুল করেছে বামেরা, যেটা শুধরে নেওয়া দরকার আগামী দিনগুলোর জন্য। লিবেরাল ও নকশালবাদী বামেরা নো ভোট টু বিজেপি বলে যে মুভমেন্ট শুরু করেছিল, বাম লোকজন সেটাকে ব্যঙ্গ করে, বিরোধীতা করে বোকামি করে ফেলেছে। বাংলার সাধারন মানুষ বুঝে গেছে বাম মনস্ক মানুষদের মধ্যেই বিরাট বিচ্ছিন্নতা, ফাঁক। একে অপরের বিরূদ্ধে তারা লড়াই করে, ব্যঙ্গ করে। এই স্পেসটা দিয়ে বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক শক্তি হু হু করে ঢুকবেই। তাদের কাছে বাম মানে বামই। বাম মানে সিপিএম বা লিবেরাল বা নকশালবাদী নয়। নো ভোট টু বিরোধীতার মতো শিশুসুলভ বাম-অভিমান বহু আম আদমিকে হতাশ করেছে। সিপিএম সহ বাম জোট গুলোর কিছুতেই ঠিক হয়নি ‘নো ভোট টু’ নিয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য করা!
বাংলায় ইস্যুর অভাব নেই। তৃণমূল সরকার মোটেই সুশাসনের জন্যে জিতে আসেনি এবারের ভোটে। পোলারাইজেশনটাই মূল ফ্যাক্টর। কিছু সরকারী ফেসিলিটি তার পরের ফ্যাক্টর। কেন্দ্রে মোদী সরকারও ঠিক এই কারণেই জিতে চলেছে। বাম নেতা নেত্রীদের উঠে আসা দরকার গ্রাম মফস্বলের মাটি থেকে, রাস্তা থেকে, যারা কোনো ব্যক্তি আক্রমন নয়, ইস্যুকে আক্রমন করবে, সমাজে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চাকরিবাকরি ইত্যাদি নানা সামাজিক বৈষম্যকে তথ্যসহকারে চোখে আঙুল তুলে দেখাবে। লেনিন মার্ক্স নিকারাগুয়া ভেনেজুয়েলার উদাহরন দিয়ে বাংলার মানুষকে কানেক্ট করানো যাবে না। মানুষের ঘরের ভেতরের সমস্যার জন্য আওয়াজ তুলবে বাম নেতা নেত্রীরা।
নগর সভ্যতার মধ্যবিত্ত মানুষও শান্তিতে নেই। বহু কর্পোরেটে নিংড়ে নিচ্ছে তার চাকরিজীবন। ছাঁটাই করে দিচ্ছে নানা সময়ে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে টাকা পয়সার খাঁই আকাশ ছোঁয়া। রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক নানা স্তরে প্রবল দুর্নীতি। বাম আন্দোলনকে এই ফাঁকগুলোকে ভরাট করার জন্য রাস্তায় নামতে হবে। তবেই মানুষ আবার ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে পাবে। আগামী বছরগুলো বাম আন্দোলনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহামারীতে শ্রমজীবী ক্যান্টিন ও রেড ভলান্টিয়ারদের তুমুল কাজকর্ম মানুষের মন কেড়েছে। খেয়াল রাখা উচিত, ভলান্টিয়াররা বা বাম সমর্থকেরা যেন অতি-বিজ্ঞাপনের লোভ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে পারে। “আমি সাহায্য করছি, অতয়েব পরের বার ভোট দেবেন” এই রুচিহীন লোভী কথাটা যদি বেরিয়ে আসে এসব সমাজসেবার পেছনে, তাহলে মানুষ মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বিরক্ত হবে, ভরসা হারাবে। “সেবা” নিয়ে অতিরিক্ত মেলোড্রামাটিক প্রচার নয়, তার মধ্যে যেন ব্যালেন্স থাকে। মনে রাখা দরকার, বাংলার মানুষ সব দেখছেন। তাই আগামী কইয়েকবছরে বামেদের কাজ হলো সেই মানুষদের ভরসাটাকে ফিরিয়ে আনা। বাকিটা? সময় ঠিক দায়িত্ব নিয়ে নেবে।

[লেখক – অতনু প্রজ্ঞান একজন গদ্যকার, সোশাল ইনফ্লুয়েন্সার, মোটিভেশনাল স্পীকার, টেলিকম কর্পোরেট লীডার, পেশার সুবাদে সেমি গ্লোব-ট্রটার, সোশালিজম ও বেনোভেলেন্ট ক্যাপিটালিজমের মিশ্রনে বিশ্বাসী ফ্রি -থিঙ্কার। ২০১১ সাল থেকে নানা প্রিন্ট ও ডিজিট্যাল পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি। এখনো অব্দি প্রকাশিত বই ৪ টি। ২ টি গল্প-সংকলন, ১ টি গদ্য সংকলন, ১ টি উপন্যাস। শেষ দুটি বই হলো ‘ছেঁড়া ছবির কোলাজ’ (গল্প-সংকলন, অভিযান পাবলিশার্স, ২০১৮) ও ‘আমি আশাবরী’ (উপন্যাস, মিত্র ও ঘোষ, ২০২০)।]

Facebook Comments

Leave a Reply