শূন্য’র হারানোর কিছু নেই : দেবাশিস দত্ত

fail

ভূমিকা

নির্বাচন শেষ। ফলও বেরিয়ে গেল। বাংলায় এবারকার নির্বাচনে বামপন্থীরা ‘শূন্য’ আসন পেল। ‘অপরজন’ মে সংখ্যার থিম ঠিক করলো ‘আসন শূন্য নির্বাচন’। অনেককে যেমন আমাকেও এ বিষয়ে লিখতে বলা হল। শোনার পর মনে হল যেন শূন্য থেকে পড়লাম। এমনিতেই মন মেজাজ ভাল নেই। তার ওপর এমন একটা বিষয় নিয়ে লেখা, আমার পক্ষে বেশ কঠিন। নাছোড় হওয়ায় রাজী হতে হল। নির্বাচনের ফলাফল কি হবে তা নিয়ে অনেক কিছু ভেবেছি কিন্তু এমনটা হবে ভাবি নি। মনে পড়ে বন্ধুরা আড্ডায় কষে ধরেছিল ফলাফল সম্পর্কে কি ভাবছি জানতে। এক টুকরো কাগজ চেয়ে তাতে ফলাফল কি হতে পারে লিখে একটা খামে পুরে সিল করে রেখে দিতে বলেছিলাম (লিখেছিলাম যতদূর মনে পড়ে ১০ এপ্রিল, হুগলীর নির্বাচন শেষ হবার দিন)। তাই রাখা ছিল। বলেছিলাম ২ মে তারিখে খুলতে তার আগে নয়। খাম খোলা হলে দেখা গেল ট্রেন্ডটা ঠিক ঠিক মিলেছে কিন্তু সংখ্যা মেলেনি। মিলবে কী করে? আট পর্যায়ে নির্বাচন। প্রতিটি পর্যায়ে অঙ্ক বদলেছে। বদলানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে বামপন্থীরা প্রতিটি পর্যায়ে তার ক্ষেত্র কমিয়ে ‘শূন্যে’ পৌছবে এবং জামানত এমনভাবে বিশ্রীভাবে বাজেয়াপ্ত হবে তা ভাবিনি। ‘শূন্য’ পাবার পর পর্যালোচনা শুরু হয়েছে, এর পেছনেও অঙ্ক আছে, তাই বিন্দুমাত্র ভরসা নেই।

শূন্য কি শূন্য ?

বাংলার চেয়ে আজকাল আমরা ইংরেজি একটু বেশি না বুঝলেও বলি, প্র্যাকটিস করি। ভুল ইংরেজিতে তাই বেশ সড়গড়। ‘শূন্য’ কি, অভিধান বলছে cipher, nothing, the sky, space, the void, inexistence, absence … not (স্টেটসে বলা হয়) … আবার math অনুসন্ধানে জানা যায় ‘শূন্য’ হল একটি স্বাভাবিক পূর্ণ সংখ্যা, একাধারে একটি সংখ্যা এবং অঙ্ক। ‘শূন্য’ এককভাবে মানের অস্তিত্বহীনতা ও অন্যান্য সংখ্যার পিছনে বসে তাদের যুত পরিচয় প্রদান করে। একই সঙ্গে ‘শূন্য’ একটি জোড় সংখ্যা। একটি জোড় সংখ্যা হবার জন্যে যা যা শর্ত পূরণ করা দরকার শূন্য সব কয়টি শর্তকেই পূরণ করে। যেমন এক) জোড় + জোড় = জোড় এবং বেজোড় + বেজোড় = জোড় (০ + ০ = ০); দুই) কোন বেজোড় সংখ্যার আগের সংখ্যাটি জোড় হয় (১ এর আগের সংখ্যাটি ০); তিন) কোন সংখ্যাকে ২ দিয়ে গুণ করার পর যে সংখ্যাটি হয় তা হয় একটি জোড় সংখ্যা (০ x ২ = ০)। একটি জোড় সংখ্যাকে ২ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ অবশ্যই ‘শূন্য’ হতে হবে। সুতরাং ০ কে ২ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ শূন্য (০) হয়। তাই শূন্য (০) একটি জোড় সংখ্যা [প্রশ্নোত্তরে জানিয়েছেন Mahmudul Hasan, Geometry, Physics, Chemistry & Astronomy]। এই পর্যায়ে আসার পর একটি পোস্টের উক্তি ‘যেখানে মনে হবে সম্ভব না, সেখানেই খুঁজতে হবে সম্ভাবনা’ প্রাণিত করে, সেইজন্য ‘শূন্য’র মধ্যে নিহিত জোর শক্তি ক্ষমতা ও তার উৎস খোঁজার চেষ্টা শুরু। ‘শূন্য থেকেই শুরু করা যাক’ এমন বাক্যটি এই নির্বাচনের পরে বামপন্থীদের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। হয়তো দেখা যাবে শূন্য আসলে শূন্য নয়। শূন্যগর্ভ নয়।

শূন্য’র শুরু ও বাংলার বিধানসভা

আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু শুধু ‘শূন্য’ নয়, তবে এটা সবার জানা যে ‘শূন্য’ আকাশ থেকে টপকে পড়েনি, ছিল হয়তো, কিন্তু একে আবিষ্কার ও নির্মাণ করতে হয়েছে। Prof Robert Kaplan তাঁর গ্রন্থ ‘The nothing That is : A Natural History of Zero’ ‘The first evidence we have of zero is from the Sumerian culture in Mesopotamia, some 5,000 years ago.’ ভারতে ব্রহ্মগুপ্ত থেকে আর্যভট্ট, কাম্বোডিয়া থেকে চিনসহ অনেক দেশ ‘শূন্য’ আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একই ভাবে ‘নির্বাচন এবং শূন্য’ দীর্ঘকাল ধরে এককভাবে বা অনেকে যুক্ত হয়ে, জেনে অথবা না জেনে নির্মাণ করেছেন, অনুমান করা যায়। ‘নির্বাচন এবং শূন্য’ প্রাপ্তির ঘটনা আর কোথাও ঘটে নি, এই প্রথম বাংলাতেই ঘটল তা নয়। তবু বাংলার নির্বাচনে ‘শূন্য’ প্রাপ্তি আলোচ্য। কেন? শুধু বাংলা নয় এর কেন্দ্রীয় চরিত্র রয়েছে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে। লক্ষণীয় যে এবারের নির্বাচনে বাংলায়, এই প্রথম বার, জোট বেঁধেও বামপন্থীরা ‘শূন্য’ হল, সঙ্গে কংগ্রেসও ‘শূন্য’ হল। এখানেই ‘শূন্য’র উত্তরণ, ভিন্ন মাত্রা লাভ! এই স্তরে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন বঙ্কিমচন্দ্র সৃষ্ট চরিত্র প্রতাপ শৈবলিনী’র সংলাপ ও তার পরিণতিকে কি ক্রান্তদর্শী (!) বলা যাবে? বামপন্থীরা ‘শূন্য’ প্রাপ্তির নানা কারণ বা অজুহাত দেখাবে, এমনটা বলা হতে পারে যে এটা সাংগঠনিক বিপর্যয়। বলা হবে আমাদের understanding অর্থাৎ রাজনীতি ঠিকই ছিল, কিন্তু মানুষকে বোঝান যায় নি অথবা মানুষ বোঝেননি বা ভুল বুঝেছেন। বিপর্যয়টা রাজনৈতিক বলে মানা হবে এমনটা মনে হয়না। কেউ কেউ হয়তো বলবেন এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক। কংগ্রেস কী বলবে অনুমানের বাইরে, মোর্চা কি কিছু বলবে? আলাদা করে হয়তো বলার কিছু আর থাকবে না। মোর্চার বাইরে বামদল নির্বাচনে লড়েছে স্বচ্ছন্দে ‘শূন্য’ পেয়েছে, এমন ‘শূন্য’ আলোচ্য নয়। অর্থাৎ সব শূন্য’র মূল্য বা গুরুত্ব এক নয়। ‘মোর্চা’র শূন্য আলোচ্য তার কারণ মোর্চার শরিক বামপন্থীরা এরাজ্যে ৩৪+ বছর ক্ষমতায় ছিল। আর ‘মোর্চা’র অপর শরিক কংগ্রেস ২৫+ বছর বাংলার শাসন ক্ষমতায় ছিল। অর্থাৎ ৫৯+ বছর এই দুই দলের অবস্থান ছিল একে অপরের বিপরীতে, ময়দানে, রাজপথে, গলিপথে, আলপথে, কলোনিতে – সম্পর্ক ছিল সাপে নেউলে। যে ছবির নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল ৫৯+ বছরে সে ছবিটায় কে যেন এক লহমায় ‘এক দোয়াত কালি ঢালিয়া দিল’। মনে পড়ে তমলুকে নির্বাচনের আগে দুই কিষাণ মাঠে রাতের কাজ সেরে লন্ঠন হাতে ফিরছিলেন, দু’জনে বলাবলি করছিলেন, ‘শুনছ নাকি মেজবাবু কংগ্রেস হইয়ে গ্যাছেন’! গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা র’টি গেল ক্রমে। মেজবাবু সেদিন হেরে গিয়েছিলেন। আনন্দে কেহ কেহ বগল বাজাইয়াছিলেন। ২০১৬ সালে বাংলা, ছি ছিক্কার ছাড়া জোট পরিসরে ০ (শূন্য) রাজনীতির বোধন দেখল। এক লহমায় সব কেমন পাল্টে অহি এবং নকুল সম্পর্ক ‘… sail in the same boat brother’ হয়ে গেল। সেদিনের মাঠের অঙ্ক ০ (শূন্য) এদিনে ০ + ০ = ০ হল, এতে অবাক হবার কী আছে! সান্ত্বনা এই অদ্য বগল বাজাইবার আজ আর কেহ অবশিষ্ট নাই!!

সংসদীয় গণতন্ত্র ও বিধানসভা

বামপন্থীরা সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবার পর সংসদীয় আবহে ০ (শূন্য) সংখ্যাটি ছাড়াও অনেক সংখ্যা যেমন ১৯২০, ১৯২৫, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৫৭, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৪, ১৯৬৭, ১৯৬৯, ১৯৭২, ১৯৭৫, ১৯৭৭-২০১১, ১৯৯৮, ২০২৫, ৩৫৬, ২৯৪, ৫৪৩ এবং এমন আরও অনেক সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সাংবিধানিক আখড়ায় ০ (শূন্য) একদিনে হয় নি। তার বাইরেও জগত আছে। সেই জগতই এতকাল সংখ্যার যোগান দিয়েছে। সেই জগতে এখন কি কারফিউ? নিশ্চিত বহু কৃতকর্মের ফল এবং অফলের পরিণাম এই ০ (শূন্য) অর্জন। বহু কিছু ত্যাগের মধ্য দিয়ে যা অর্জিত ভোগ-ব্যয়ের মধ্য দিয়ে আজ তা বর্জিত। এখানে মুশকিল হল সবগুলো সংখ্যা আলোচনার পরিসর পাওয়া যাবে না। কিন্তু উল্লেখ করে রাখা দরকার সার্বিক আলোচনার জন্য, কোন না কোন সময়ে আলোচনার জন্যে – কারণ ০ (শূন্য) সংখ্যাটা জোড়, এবং জোরের উৎস। এভাবে ০ (শূন্য)কে বোঝার সময় এসেছে। সেই সূত্র ধরেই কয়েকটি সংখ্যার প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে বলা যায় সেই ছোট্ট বেলায় বাবা মা, ঠাকুরদা, ঠাকুমার আদর করে দেওয়া নামটার অস্তিত্ব আজ সর্বত্র ‘ডোডো’ দশা প্রাপ্ত। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে পেনশন – এখন আধার শেষ কথা। আধার এনেছে বড় এক ‘আঁধার’। স্কুলে/কলেজে রোল নম্বর, চাকুরিতে ইএসআই নম্বর, পিএফ নম্বর, ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট নম্বর, জেলে কয়েদী নম্বর, হাসপাতালে বেড নম্বর, বিদ্যুৎ সরবরাহে কনজিউমার নম্বর, দূরভাষে টেলিফোন নম্বর, বীমায় বীমা নম্বর, আবাস স্থলে ফ্ল্যাট নম্বর, ভোট দেবেন ভোটার নম্বর – আধার সেও নম্বর, ইউনিক বটে! জ্ঞাতে অজ্ঞাতে, সাক্ষাতে অসাক্ষাতে একটি সংখ্যা বিপ্লব সমাপ্ত!! অথবা প্রতিবিপ্লব! কিছু বোঝা গেল কি? আজ ‘ওসব আমি বুঝিনা’ বললে কিন্তু ‘বিপ্লব’ কাউকে ছাড়বে না। কারণ সকলেই বিপ্লব করতে চেয়েছে, বিপ্লব করার তাগিদেই একদিন পৃথগন্ন হয়েছে, তালা চাবি আলাদা হয়েছে, ‘আমি সত্য, আমি ঠিক, আমিই শ্রেষ্ঠ’ দাবি – কোটেশনের পর কোটেশন তুলে ধরা হয়েছে – আজ যদি কোন চাবিতেই বিপ্লবের তালা না খোলে, ০ (শূন্য) হয়ে যায়, ঝাপসা হয়ে যায়, তবে কৈফিয়ত নিতে কেউ ছাড়বে না, ইতিহাস অন্তত: নয়। শূন্য’র ওপরে শূন্য, শূন্য শোভা পায়, শূন্যকে দেখিয়া শূন্য শূন্যতে পলায় – ধাঁধা লাগে বৈকি!

উত্তরণ ও অবতরণ

স্বাধীনতার পর ১৯৫২য় প্রথম লোকসভা নির্বাচন। বামপন্থীরা অংশ নিল। সেটাই সংসদীয় রাজনীতির শুরু। ‘৫২য় সংসদে আসন ছিল ৪৮৯, ভোটার ছিল ১৭ কোটি ৩০ লক্ষ। (এখন ৫৪৩ আর ভোটার প্রায় ৯২ কোটি) কংগ্রেস পেল ৩৬৪ অর্থাৎ ৪৫% ভোটের বিনিময়ে ৭৬% আসন। (গণতন্ত্র’র প্রথম গ্যাঁড়াকল! সামনে এলো)। সিপিআই পেল ১৬ (৩.২৯%), স্যোশালিস্ট পার্টি ১২ (১০.৫৯%) আসন। হিন্দু মহাসভা ৩ (০.৯৫%), রাম রাজ্য পরিষদ ৩ (১.৯৭%), ভারতীয় জনসঙ্ঘ ৩ (৩.০৬%) ফরোয়ার্ড ব্লক ১ (০.৯১%) কৃষক লোক পার্টি ১ (১.৪১%), কৃষক মজদুর প্রজা পার্টি ৯ (৫.৭৯%), আরএসপি ৩ (০.৪৪%), পিডিএফ ৭ (১.২৯%)। এছাড়াও ছিল কিছু আঞ্চলিক দল যাদের উপস্থিতি সংসদে ছিল। নির্দল ছিলেন ৩৭ জন (১৫.৯%)। কংগ্রেস (শাসক পক্ষ) ৩৬৪ সেখানে বিরোধী পক্ষ ৫৮। দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী হিসেবে দেখলে দক্ষিণপন্থীরা ৩৭৩ (৫০.৯৮%) ও বামপন্থীরা ৪৩ (২৩.৭২%)। তার মধ্যে এককভাবে সিপিআই ১৬ আসন, বিশাল দূরত্ব সত্ত্বেও (৩৬৪ আর ১৬) সংসদে দ্বিতীয় স্থান সুবাদে বিরোধী দলের মর্যাদা পায়!

১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনে কংগ্রেস লাভ করে ১৫০ (৩৮.৮২%), কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি ১৫ (৬.৩৬%), সিপিআই ২৮ (১১.৮৬%), ভারতীয় জনসংঘ ৯ (৩.৮১%), ফরোয়ার্ড ব্লক (মা:) ১১ (৪.৬৬%), এবি হিন্দু মহাসভা ৪ (১.৬৯%), ফরোয়ার্ড ব্লক (রুইকর) ২ (০.৮৫%) ছাড়াও নির্দল ১৯, কেএমপিপি ১৫। [বামপন্থীরা দু’টি ফ্রন্টে লড়েছিল ইউএসওআই = সিপিআই ২৮, এসআরপি ০, এএফবি(এম) ১১ মোট ৩৯। পিইউএসএফ = এসপিআই ০, এফবি(আর) ১, আরএসপি ০]। দক্ষিণপন্থী বামপন্থী বিচারে বামপন্থীরা মোটের ওপর ৪১ হলেও, দক্ষিণপন্থীরা ছিল ১৬৩। কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব ছিল ১৫০ বনাম ৪১। সিপিআই বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে।

সংসদীয় রাজনীতিতে বামপন্থীরা অংশগ্রহণের পরে ১৯৫৭ সালে কেরালায় কমিউনিস্ট সরকার, ১৯৬৭ সালে ৯ টি প্রদেশে ৯ (বাংলা সহ) অকংগ্রেসি সরকার, ১৯৭৭-২০১১ বাংলায় বামফ্রন্ট, ১৯৭৮-১৯৮৮; ১৯৯৩-২০১৮ সালে ত্রিপুরায় অর্থাৎ একটা সময়ে এসে কেরালা ত্রিপুরা ও বাংলায় বামপন্থীদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। আহ্লাদিত হবার মত ঘটনা বটে। কিন্তু রথের চাকা এই পর্যন্তই আর এগোল না। ৩ থেকে ৪ হল না। এই পর্বে একজন বামপন্থী তাত্ত্বিককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ৪৫ বছর পার হতে চলল, সংসদ (দিল্লী) দখলের কি হবে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন ‘গরম পায়েস থালার মত কিছুতে ঢেলে পাশ থেকে কেটে কেটে খেতে হয়। মাঝখান থেকে নয়।’ সেদিন বোঝা গিয়েছিল দিল্লী দখল করতে হলে অমন পাশ থেকে কেটে কেটে খেতে হবে। ভাগ্যিস আজ তিনি বেঁচে নেই।

Number counts! আলবাত!

সংসদীয় গণতন্ত্রে লাঠিসোটার স্থান নেই। সংখ্যাই একমাত্র বিচার্য। এককভাবে অথবা জোট বেঁধে ২৭২+ দেখাতে পারলেই ‘ক্ষমতা’ দখল! কিন্তু এই সংখ্যা অর্জন কীভাবে – সেটাই হল রাজনীতি ও কৌশল। বিগত লোকসভা এবং হালফিলের বিধানসভার ফলাফলে কি হল? ২০১৪ সালে বিজেপি নির্বাচনে জয়ী হয়েই দিল্লীর ক্ষমতায় এলো। ভারতীয় ফ্যাসিবাদ এতদিন কাগজে কলমে ছিল, কোথাও কোথাও দাঙ্গায় তাকে চেনা যেত। এবার তার ভয়ঙ্কর রূপ দেখা গেল এবং ২০১৯ সালে আরও সংহত রূপ হল: বিজেপি ৩০৩ (৩৭.৩৮%), [এনডিএ-৩৫৩]; কংগ্রেস ৫২ (১৯.৫৫%), বিএসপি ১০ (৩.৬৩%), টিএমসি ২২ (৪.০৭%), সিপিআই এম ৩, সিপিআই ২, আরএসপি ১ [এনডিএ ৩৫৩, ইউপিএ ৯০]। এই নির্বাচনেই বিজেপি ৪২ য়ের মধ্যে।য ১৮ দখল করে বাংলা দখলের কাজটা এগিয়ে রাখল। [রেকর্ডে আছে সংসদীয় ইতিহাসে একমাত্র ২০০৪ সালে লোকসভায় বামেদের সর্বোচ্চ আসন ছিল ৫৯ টি আসন।]

২০১৬ বিধানসভার নির্বাচনে দলীয় অবস্থানটা ছিল ২৯৪ আসনের মধ্যে টিএমসি ২১১, কং+বাম জোট ৭৭ (৪৪+৩৩), বিজেপি ৩। আর এবারে (২০২১) বিজেপি ‘বাংলা দখলের পরিকল্পনা’ করে যতরকম আটঘাট আছে সব বেঁধে নেমেছিল। দখল হয়নি ঠিক, কিন্তু বাকিটা হয়েছে। রাজ্য বিধানসভায় দলগত শক্তির বিন্যাস: টিএমসি ২১৩ (৪৭.৯৪%); বিজেপি ৭৭ (৩৮.১৩%); সংযুক্ত মোচা [বামফ্রন্ট ০ (৫.৬৬%): সিপিএম ০ (৪.৭২%), সিপিআই ০ (০.২০%), ফরোয়ার্ড ব্লক ০ (০.৫৩%), আরএসপি ০ (০.২১%); কংগ্রেস ০ (২.৯৪%), আইএসএফ ১] সিপিআই এমএল ০ (০.০৩%)। বিজেপি দ্বিতীয় স্থান শুধু দখল করল না, বামপন্থীরা ০ ‘শূন্য’ হল শুধু তাও নয় বিধানসভার দুই পক্ষ সমন্বিত কক্ষ অর্থাৎ সরকার পক্ষ + বিরোধী পক্ষ দুটোই এই প্রথম দক্ষিণপন্থীদের ‘উদ্দেশ্যমূলক সহযোগী’দের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে এলো। দক্ষিণপন্থীরা পৈতে বদলে নিয়ে (জনগণ নিন্দিত ও বর্জিত কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি) ক্ষমতা দখলে ‘সংখ্যা’ অর্জন করতে সমর্থ হল। ওরা মনে করে সংসদের বাইরে এবং ভেতরেও ‘লাঠি জিসকা ভৈস উসকা’। বিজেপি’র লাঠি ধর্ম ও জাত-পাত ভিত্তিতে ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, বৈরিতা ও বিভাজন জিতল। আর বামপন্থীদের লাঠি শ্রেণি বৈরিতা, শ্রেণিসংগ্রাম ও শ্রেণি সংঘর্ষ হারল।

যা উঠে এলো

১৯৫২ সাল থেকে ২০২১ অর্থাৎ গত ৬৯ বছর সংসদ পরিক্রমায় বামপন্থীদের পরিক্রমা অনেকটা সাপ লুডোর মত। একবারই ২০০৪ সালে ৬ এর কোঠায় পা দিয়ে ২০১৯ সালে সাপের মাথায় পা দিয়ে তরতর করে ৩ এ নেমে এলো। আর ৩টি রাজ্য থেকে আপাতত ১ টিতে বহাল আছে। সারা দেশে একটি রাজ্যে আঁকড়ে থাকলে দিল্লী থেকে দূরত্ব কমে না। অপরদিকে জনসংঘ + হিন্দু মহাসভা + রাম রাজ্য পরিষদ মিলিতভাবে ১৯৫২য় প্রাপ্ত আসন ৯ (৫.৯৮%) থেকে ২০১৪য় ক্ষমতায় এবং ২০১৯য়ে একচেটিয়া দখল (৩৫৩) ভাবা যায়! আর এই রাজ্যের বিধানসভায় ১৯৫২য় জনসংঘ ৯ (৩.৮১%) থেকে মাঝপথে ০ ছুঁয়ে ২০১৬য় ৩ থেকে এবং এবারে ৭৭?

স্মরণ করা যেতে পারে এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করেছে। বিজেপি’র মূল আরএসএস-ও তাই। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কানপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ২৬ ডিসেম্বর, ১৯২৫ (মতান্তরে ১৯২০)। কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার অর্জন ও শোষণহীন সমাজ গঠন। ১৯২৫ সালেই সিপিআই প্রতিষ্ঠার ঠিক দু’মাস আগে দশহরায় নাগপুরে বিজেপি’র মেন্টর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। কমিউনিস্ট মতাদর্শ ছিল আরএসএস-এর ঘোষিত শত্রু। তাদের লক্ষ্য ছিল ‘হিন্দু রাষ্ট্র গঠন’। ইতিহাসের বিচারে দেখা যায় যে ১৯২৫-৪৭ কালপর্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার অকুতোভয় লড়াইয়ে সামিল হয়েছে, কোন ত্যাগ স্বীকারে পিছু পা হয়নি, বিশাল বিশাল গণআন্দোলন গড়ে তুলেছে, জনগণের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে, অবশ্য কখনও সখনও ভুলও করেছে, তবু মানুষের স্বার্থে লড়েছে। অপরদিকে আরএসএস স্বাধীনতার আন্দোলনে ব্রিটিশ স্বার্থের তল্পী বহন করেছে, তাদের দালালী করেছে, পদলেহন করেছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৪৮ সালে আরএসএস-এর ‘স্বয়ং সেবক’ নাথুরাম গডসে, তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ‘জাতির পিতা’ মহাত্মা গান্ধীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে খুন করেছে। এই কাজের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারতে আরএসএস-এর রাজনৈতিক আবির্ভাব ! তারাই আজ ক্ষমতায়!! দীর্ঘ কংগ্রেস জমানাতেই আরএসএস একটি ‘সামাজিক সংগঠন’ হিসেবে প্রায় বিনা বাধায় ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠনের লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করতে সংগঠনের বিস্তার ঘটিয়েছে। সেসব তো জানা ইতিহাস। কমিউনিস্টরা আজ কেউ শতবর্ষের মুখে দাঁড়িয়ে কেউবা সদ্য শতবর্ষ পার করেছে। আজ যখন এই সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে তখন কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের শক্তি তলানিতে ঠেকেছে, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন? কীভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তি তথা ফ্যাসিস্ট শক্তি ‘গণতান্ত্রিক’ পথে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একচেটিয়া ক্ষমতা দখল করতে পারলো? আর কেনই বা কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীরা এমন অপ্রাসঙ্গিক হল তার কারণ খুঁজে বার করতে হবে! নির্মোহ আত্মবিশ্লেষণ, আত্মসমালোচনা কি জরুরী নয়? কথাগুলো বলা হয়নি যে নয় কিন্তু করা হয়নি – আটকাচ্ছে কোথায়??

শূন্য’র অসীম শক্তি

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, আগে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলার সংসদীয় রাজনীতির দুই কক্ষ অর্থাৎ সরকার ও বিরোধী, পুরোপুরিভাবে ‘উদ্দেশ্যমূলক সহযোগী’ – অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি এই দুই দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হল। এর অর্থ হল বাংলায় সংসদীয় রাজনীতির দুই কক্ষের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দক্ষিণপন্থীদের করায়ত্ত্ব হল। দুই শাসকের কাজিয়া বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে এমন এক মাত্রায় উন্নীত করবে, বা অনেকটাই করে ফেলেছে যাতে সাধারণের মনে হয় ‘এর বাইরে কোন জগত নেই’, সবটাই শূন্য, সুতরাং, বেছে নাও হয় তৃণমূল, না হয় বিজেপি – হল একে অপরের বিকল্প, এই হল ‘স্বাধীনতা’। কি খাব তার বিভিন্ন আইটেম, কি পরব তার বিভিন্ন ডিজাইন, ট্রেন্ডস, কি পড়ব তার শিক্ষাক্রম, গবেষণা (যার উৎস হবে গোমূত্রজাতীয়), কি চাষ হবে, কীভাবে হবে, কোন বীজ ব্যবহৃত হবে, দাম কি হবে থেকে সবটাই ‘বাজার’ নিয়ন্ত্রিত, সব কিছু বিভিন্ন আউট লেটে পাওয়া যাবে, ক্রেতা কেবল তার মধ্য থেকেই বেছে নেবে – ‘স্বাধীনতা’ শুধু এইটুকুই, আর এইটুকু ‘স্বাধীনতা’ও নির্ভরশীল যে ‘পকেটে’র ওপর তার ওপরেও থাকছে আর একটা নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ আষ্টেপৃষ্ঠে এই ব্যবস্থা মানুষকে ইতিমধ্যেই বেঁধে ফেলেছে। প্রতিবাদ মোকাবিলার জন্যে ধর্ম জাত-পাতের নামে অসহিষ্ণুতা, বৈরিতা ও বিভাজনসহ সরকারী বেসরকারি নানা দাওয়াইয়ের সংস্থান থাকছে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষের জীবন যাপন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি, সামাজিক সুরক্ষা ব্যাপক মাত্রায় বিপন্ন ও কলুষিত হবে, অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপরে দমন-পীড়ন, জুলুম-অত্যাচার বেলাগাম হবে, জাত পাত ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ ব্যাকওয়ার্ড ফরোয়ার্ড নির্বিশেষে শ্রমজীবী মানুষকে আঘাত করবে, তারা ক্ষুব্ধ হবে – একটা বড়সড় স্পেস খুলে যাবে। অবধারিতভাবে মাঠে-ময়দানে প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধের লড়াই-সংগ্রামের এক বাস্তবতা উঠে আসবে – যা হল দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে বামপন্থী রাজনীতির উৎস। অর্থাৎ এই লড়াইটা আর সংসদীয় চৌহদ্দির (সরকার বনাম বিরোধী) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেই স্পেস ও সম্ভাবনা পুরোটাই খুলে যাবে বামপন্থীদের সামনে। সেখানে বামপন্থীরাই ‘রাজা’ হয়ে উঠতে পারে, যেমন একদিন হয়েছিল, শাসক কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। ১৯৬৭ সালে ক্ষমতা এমনি এমনি পাল্টে যায় নি। ‘ক্ষমতা’ বামপন্থীদের হাতে এমনি এমনি আসে নি। ‘শূন্য’ সেদিন ‘ক্ষমতা’ দেখিয়েছিল। ১৯৭৭ সালেও ক্ষমতা এমনি এমনি আসে নি। ভুলে গেলে চলবে কেন! সেদিন মানুষ যাদের শত্রু হিসেবে চিনেছে জেনেছে আজ তারা মিত্র হতে যাবে কেন? কেউ মিত্র মনে করলে সেটা তাদের সমস্যা। খালি পায়ে হাঁটবেন ভাল, ছেঁড়া জুতোয়, পরিত্যক্ত জুতোয় মানুষ পা গলাতে যাবেন কেন? এই মান সম্মান বোধটা মানুষ প্রথম পেয়েছিল ‘বামফ্রন্ট’ আমলে। তারপর কেন ‘বামফ্রন্ট’ ক্ষমতা হারাল, তলিয়ে গেল – সেটা মানুষের ভুল নাকি ‘ক্ষমতা’র ভুল বারান্তরে আলোচনা করা যাবে।

এই হল শূন্য’র শক্তি, অভিব্যক্তি, যে শক্তি দারুণ একটা ঘূর্ণিঝড় তৈরি করতে পারে, সর্বত্র বইয়ে দিতে পারে, রাজনীতিটাই বদলে দিতে পারে। এই ‘উদ্দেশ্যমূলক সহযোগী’দের শাসন উৎখাত করে দিতে পারে। নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। প্রশ্নটা হল এরাজ্যে বামপন্থীরা কি করবে? প্রশ্নটা হল এটা কি কেবল আজ আর একটা রাজ্যের বিষয়? যা কিছু ব্যর্থতা তার কারণ অনুসন্ধান যদি কেবল রাজ্য রাজনীতির মধ্যে খোঁজা হয়, রাজ্যের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়, বাংলা বা কোন রাজ্যের পরিস্থিতি যদি জাতীয় পরিস্থিতি বিচারে করণীয় থেকে আলাদা করে দেখা হয় তবে, মনে হয়, মারাত্মক ভুল হবে। এরাজ্যে বামেদের শূন্যলাভ, অন্যান্য রাজ্যে বামপন্থীদের জনভিত্তি ক্রমাগত হ্রাস ঘটছে কেন, এই দেশের বিশাল ভূখণ্ড, সেই অঞ্চলের ব্যাপক মানুষ এখনও অধরা কেন তার উত্তর কেন্দ্রীয় রাজনীতির মধ্যেই খুঁজতে হবে। কেন্দ্রীয় রাজনীতি সেভাবেই নির্মাণ করতে হবে। কোন রাজ্যে বিশেষ পরিস্থিতি বিদ্যমান এই অজুহাতে সেই রাজ্যকে কৌশল নির্মাণের সুযোগ ‘সুবিধাবাদকে’ প্রশ্রয় দেয়, যার ফল ভাল হয় না, বাংলার ক্ষেত্রেও হয় নি। একটি দুটি এমনকি তিন তিনটি রাজ্যে জয় ঘটলেও সেই জয় অন্য রাজ্যে বা জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে যদি তা বিকল্প পথ নির্দেশ করে, ‘সীমাবদ্ধ ক্ষমতা’র মধ্যেও হাতে কলমে নির্মাণ করে দেখাতে পারে। বাংলার ৩৪ বছরের দীর্ঘ শাসন জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে এমন কোন বিকল্প হাজির করতে পারে নি। বরং এমন কিছু কাজ হয়েছে যা আজ বিপক্ষ শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সারা দেশে সমস্ত রাজ্যে বামপন্থী শক্তির আধার আছে তথাপি বাম আন্দোলন গড়ে তোলা বা শক্তিশালী করা যায় নি। সেটা করা না গেলে কোন একটি রাজ্য দ্বীপবাসী হয়ে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে! টিকে থাকলেই বা কী এসে যায়! এই সব সীমাবদ্ধতাকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিচার করা শ্রেয়। মনে পড়ে ৬০ পেয়েই বামপন্থীরা কেমন আপ্লুত দিশেহারা হয়ে পড়েছিল ! প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল ‘ওঁদের কান ধরে উঠতে বললে উঠবে, বসতে বলে বসবে’ ! ঔদ্ধত্য নয় !! অশ্লীল নয় !! মধ্যবিত্তর ‘বিপ্লবী’ আস্ফালন নয় !! লক্ষ্যটা হোক ভিক্ষে নয়, মাঠ ময়দানে মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই-সংগ্রাম – নিজ শক্তিতে ২৭৩/৫৪৩ অর্জন।

এখন কি করণীয়

কমিউনিস্ট পার্টি আজ আর একটা নয়। একাধিক। অমুক পার্টি বড় তমুক পার্টি ছোট, আল কেটে কেটে জোতের জমি ছোট হয়েছে, তাই আর আল কেটে লাভ নেই। রয়েছে বেশ ক’টি বামপন্থী পার্টি। এই দীর্ঘ সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুশীলন বিপ্লবী আন্দোলন ও বিকল্প ব্যবস্থা নির্মাণের অভিমুখটাকেই বদলে দিয়েছে। বাস্তবটা দাঁড়িয়েছে আজ সব দল মিলে সংসদে ৫৪৩ আসনের মধ্যে ১৫০ আসনেও লড়তে পারে না। অধিকাংশ আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। একশ বছরের পার্টি। পায়ের নিচে মাটি নেই, যাওবা ছিল প্রতিনিয়ত ধসে যাচ্ছে। কোন পার্টি এককভাবে বা যৌথভাবেও টক্কর যখন নিতে পারে না, বিপ্লবের চাবির সন্ধান যখন কেউ দিতে পারেনি, তখন বিরোধের যায়গাগুলো সরিয়ে রেখে ‘শ্রেণি-সংগ্রামে’ বিশ্বাস করে এমন সমস্ত দল, শক্তি এমনকি ব্যক্তিকে একটা মঞ্চে যুক্ত করা প্রয়োজন। বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন, জাতীয় বিতর্ক ও একটি বিকল্প ‘কর্মসূচী’ প্রণয়ন করা দরকার। এই কর্মসূচির ভিত্তিতে দেশব্যাপী আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলা জরুরী। একই সঙ্গে সারা দেশে যে সমস্ত আন্দোলন হচ্ছে তার পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়ানো এক সূত্রে বাঁধা প্রয়োজন। সকলের প্রতিনিধিত্ব থাকে এমন একটি কেন্দ্রীয় কমিটি ও তার আচরণ বিধি দরকার। নিজেদের মধ্যে কোন প্যাচ পয়জার না করে, অতীতকে নয়, ভবিষ্যৎকে প্রাথমিকতা দিয়ে, দুটি কমিউনিস্ট পার্টি – সিপিআইএম ও সিপিআই যদি তাদের মিলন ঘোষণা করতে পারে তবে তা দেশ ও দেশের মেহনতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। নয়া ইতিহাস রচনার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে। ক্ষমতার পক্ষ থেকে যেমন বাধা আসবে আক্রমণ আসবে তেমনভাবেই সেই আক্রমণের মোকাবিলায় শ্রমজীবীদের সাংগঠনিক ভাবে প্রস্তুত হওয়া ছাড়া কোন পথ নেই। শূন্য একটি জোড় সংখ্যা, শূন্যর জোরটাও লড়াইয়ের ময়দানে। শূন্য তাই শক্তির বড় উৎস হতে পারে। শূন্য’র হারানোর কিছু নেই। জেতার জন্য আছে ২৭৩/৫৪৩ !

নিজ নিজ গণনা ছাড়িয়া সকলে একাগ্রচিত্তে একখানি নৌকার দিকে দৃষ্টি স্থির করা সময় ও পরিস্থিতির দাবি।

[লেখক – ‘অপরজন’ পত্রিকার সম্পাদক, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও সমাজকর্মী।]

Facebook Comments

Leave a Reply