আমি ততটা অবাক হইনি : দেবজ্যোতি রায়

fail

আমি এবারের নির্বাচনী ফলাফলে ততটা অবাক হইনি যতটা হয়েছেন সম্ভবত এরাজ্যের সংযুক্ত মোর্চার নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে সিপিএম দলের নেতারা যারা কে জানে কেন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন ক্ষমতায় ফিরে আসবার এবং আশ্বস্ত করেছিলেন দলের সদস্য ও সমর্থকদের, এবং শেষাব্দি নির্বাচনী যজ্ঞের ঘোড়ার পেছনের দুই পায়ের জোরালো লাথি খেয়ে এখন খোঁড়াতে খোঁড়াতে বলছেন যে তারা খুঁজে দেখবেন কেন হল, কেমন করে হল, যেখানে বিধানসভার একটি আসনও না তাদের না কংগ্রেসের কারো কপালেই জুটল না, তাদের এই খুঁজে দেখা শেষতক ওই ঘোড়ার পাড়া ডিমেরই সমতুল হবে কিনা সেটা ভবিষ্যৎ বলবে, কিন্তু একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার এবারে যে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের হাজারো অভিযোগ সত্ত্বেও এবং কোনোটাই অহেতুক নয়, মমতা এখনো এরাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী, বিজেপির মত একটা ভিন্ন সংস্কৃতির ও সংবিধানের মৌলিক ধারাগুলির বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মমতাই মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারেন, অন্য কেউ নয়, একথা শুধু যে সাধারণ মানুষই বিশ্বাস করেছেন তা নয়, বাম ও কংগ্রেসের নিচের তলার সাধারণ সদস্য-সমর্থকেরাও বিশ্বাস করেছেন নইলে এই বিপুল জয় যা গত দুবারের জয়কে ছাপিয়ে গেছে আসন সংখ্যা ও প্রাপ্ত ভোটের শতাংশের হিসেবে সম্ভব হোত না। কেবল নেতারাই একথা সত্যিকারের জনসংযোগের অভাবে বুঝতে পারেননি বা বুঝতে চানওনি।

এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে যে অভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটতে দেখা গেল সেটা হলো একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে ধরলেন চতুর্দিক থেকে কে নয় সেটাই হলো প্রশ্ন ! একদিকে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সিবিআই ইডি রাজ্যের রাজ্যপাল দেশের প্রধানমন্ত্রী যিনি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই প্রাতরাশ সারতে হেলিকপ্টারে চলে আসছিলেন এই রাজ্যে কেননা মারাত্মক কোভিড পরিস্থিতিতে দেশে যা কিছুই ঘটুক না কেন, বঙ্গাল তাঁর চাই এবং মেয়েদের স্কুল ছুটি হলে বাইরে সাইকেল নিয়ে অপেক্ষারত ছোকরার দল যেমন অনেকদূর পর্যন্ত মেয়েদের টিজ করতে করতে ধাওয়া করে তেমনই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘দিদি ও দিদি’ বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে টিজ করে যাওয়া! এবং যিনি গোটা দেশটাকেই কর্পোরেটের হাতে বেঁচে দিতে সচেষ্ট। তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীটিও ছিলেন আরো এক কাঠি ওপরে সরেস, প্রতিদিন সুনার বাংলা গড়বার দু’চোখের স্বপ্ন নিয়ে তিনি লাঞ্চ সারতেন বাংলার কোনো না কোনো গরীব অন্ত্যজের ঘরে, সম্ভব হলে হয়ত প্রাতঃপটিও করতেন সেই গরীব অন্ত্যজদের পায়খানায় এমনটাই মনে হচ্ছিল তখন বাংলার দখল নেওয়া ছিল এতটাই বালাই! দিল্লি এবং গোবলয়েরও আরো একাধিক নেতার ঘরবাড়ি সেসময় হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গ এবং তাঁরা হুমকিও দিতে শুরু করলেন এরাজ্যে জিতলে কীভাবে অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াড ও লাভ-জেহাদ চালু করবার আইন আনবেন যেন পশ্চিমবাংলা তাঁহাদের পৈতৃক সম্পত্তি, যা মুঞ্চায় করবার ইজারা তাঁরা মুঠিতে পেয়েই গেছেন এমনকি বিজেপির রাজ্য নেতাদেরও অনেকেই তখন রগড়ে দেবার ভয় দেখাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য ছিল বামেদের বিশেষ করে সিপিএম ও কংগ্রেসের এরাজ্যের নেতাদের ভূমিকা।

সিপিএম দলটির বরাবর ছিল দুই শত্রুকে একসাথে পাঙ্গা লেবার বাসনা গোটা বিশ্বের কম্যুনিস্ট নেতারা সে যতই প্রধান ও অপ্রধান শত্রুতে শত্রুপক্ষের বিভাজন ঘটিয়ে প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে অপ্রধান শত্রুর সঙ্গে ঐক্যের কথা বলে থাকুন না কেন! এবিষয়ে একসময়ের কম্যুনিস্ট আন্তর্জাতিকের নেতা জর্জি দিমিত্রভের একটা বিখ্যাত লেখা বইও আছে যেখানে তিনি প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে অপ্রধান শত্রুর সঙ্গে শুধু ঐক্যের কথাই বলেন নি,বলেছিলেন ঐক্য-সংগ্রাম ও ফের ঐক্যের কথা যাতে যুদ্ধ জেতাটা সহজ ও সম্ভব হয়। এমনকি চিন বিপ্লবে আমরা দেখেছি লং মার্চের সময় লালফৌজের ১০ লক্ষ সৈন্যের প্রায় ৯ লক্ষ কুয়োমিনটাং সেনাবাহিনীর হাতে খুন হলেও জাপান যখন চিন আক্রমণ করে মাও সে তুং একমুহূর্ত দেরিও করেন নি জাপানের বিরুদ্ধে কুয়োমিনটাংসেনাবাহিনীর প্রধান ও সেসময় চিনের শাসক চিয়াং কাই শেকের সঙ্গে ফ্রন্ট গড়ে তুলতে এবং সেই অসম যুদ্ধে শেষপর্যন্ত চিনা কম্যুনিস্ট পার্টিই জয়লাভ করেছিল, চিয়াং পালাতে বাধ্য হন চিন থেকে। কিন্তু আমরা এদেশে সিপিএমকে দেখেছি ঠিক বিপরীতে হাঁটতে। একসময় কংগ্রেস ও বিজেপির সঙ্গে সমদূরত্বের লাইন তাঁরা প্রচার করেছিলেন। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তাঁরা দলের অসাধারণ বাগ্মী সাংসদ সৈফুদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কারও করেন। শুধু তাই নয়, ইউ পি এ সরকারের আমলে সরকারের ওপর থেকে আচমকা সমর্থন তুলে নিয়ে তাঁরা সেসময় দলের আরেক বাগ্মী সাংসদ ও লোকসভার স্পিকার সোমনাথ মুখার্জিকে নির্দেশ দেন স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করতে। সোমনাথ এই নির্দেশ নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলে তাঁরা তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। সময় প্রমাণ করেছে সেসময় সোমনাথের অবস্থান ঠিক ছিল। সিপিএম সেসময় এভাবে সমর্থন না তুলে নিলে এনডিএ অত তাড়াতাড়ি আসত কিনা সে সন্দেহ থেকেই যায়।

এবারের নির্বাচনেও তাঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে সংযুক্ত মোর্চা গড়ে সেখানে আই এস এফের মত একটা মুসলিম মৌলবাদী সংগঠনকে জুড়ে নিলেও বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্রাত্য রাখলেন মমতাকে। তাঁদের তাত্ত্বিক অবস্থান ছিল বিজেপি ও মমতা দুই-ই রাজ্যের মানুষের প্রধান শত্রু, এমনকি মমতা বিজেপির বি-টিম, এই প্রচারকেও রাজ্য কংগ্রেস তো বটেই, সিপিএমও সমানতালে চালিয়ে গেল গোটা সময় জুড়ে। অনেক হাস্যকর কথাও সেসময় বলা হচ্ছিল মমতার সম্পর্কে মোর্চার পক্ষ থেকে। কেউ-ই বুঝতেই চাননি যে মমতার সঙ্গেই বিজেপির লড়াইটা এরাজ্যে মূল নির্বাচনী লড়াই যেহেতু মমতাকে ব্রাত্য রেখে সেজন্য বিজেপি বিরোধিতা আসলে একটা ফাঁকা আওয়াজে পরিণতি পাবার দিকেই এগোচ্ছে। রাজ্যের সংখ্যাধিক মানুষ শুধু নয়, খোদ বাম তথা সিপিএমের নিচুতলার সদস্য ও সমর্থকেরা পর্যন্ত এই আজবপনায় বিশ্বাস করেননি, করলে বামেদের এবারের বিধানসভা থেকে এভাবে অন্তত নিশ্চিহ্ন হতে হতো না, কংগ্রেসকেও। গত লোকসভা নির্বাচনে যে বাম ও কংগ্রেস সমর্থকেরা তৃণমূলের নিচুতলার অত্যাচার থেকে বাঁচতে বিজেপিকে ভোট দিয়ে ১৮ টা সাংসদ পেতে এরাজ্যে সাহায্য করেছিল তারাই এবারে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিরোধী গোবলয়ের চিন্তা ও সংস্কৃতির মূর্ত আধার বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলকে ঢেলে ভোট দিয়ে তাঁদের আসন সংখ্যা ও প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ গত দুইবারের চেয়ে অনেকখানি বাড়িয়ে দিল, সাধারণ মানুষ ও দলের নিচুতলার সঙ্গে জীবন্ত যোগাযোগ না থাকায় সংযুক্ত মোর্চার ঠান্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল ঘরে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া নেতারা সেটা বুঝতেই পারেননি।

কেউ তাঁদের বিজেপি ও আর এস এসের বিরুদ্ধে তাঁদেরকেই দেশ ও রাজ্যের প্রধান শত্রু বিবেচনায় (মনে রাখতে হবে বিজেপির পেছনের মূল শক্তি হল আর এস এস যারা দেশটাকে ৩ হাজার বছর পেছনে মনুর যুগের ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়) সার্বিক ঐক্য গড়ে তুলতে বলেননি তা নয়। আমার মত আরো দু’চারজন সেকথা সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার বলে বরং তৃণভোজী আখ্যায় সম্মানিত হয়েছিল খোদ বামপন্থী বন্ধুদের থেকেই,এমনকি সিপিআই (এমএল) (লিবারেশন)-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও প্রথম থেকে তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেসার ইভিল মেনে বিজেপি-আর এস এস বিরোধী সার্বিক জোটের কথা বারবার বলেছেন, তাঁকে এরাজ্যের এমনকি বামপন্থীরাও পাত্তা দেননি, দিলে তাঁদের আসন আমি মনে করি এভাবে শূন্য হতো না।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা থেকে বাম-কংগ্রেসের এভাবে মুছে যাওয়া তা কতটা সাময়িক সময় বলবে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসাবে বিজেপির উঠে আসা, হোক না আসন সংখ্যা ৭৭, মনে রাখতে হবে সেটাও ৩ থেকে ৭৭ এবং প্রাপ্ত ভোট ৩৮ শতাংশ,এরাজ্যের পক্ষে অশনিসংকেত তো বটেই। এর ফল আমাদের আগামী দিনে ভুগতে হবে তার সংকেত ইতোমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। আশা করি, সিপিএম সহ বামপন্থীরা ও কংগ্রেসও এটা টের পেতে শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় বামেদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং এখানেই ভরসা রাখা যেতে পারে যে, যে ভুল তাঁরা করে ফেলেছেন তার পুনরাবৃত্তি হবে না। অনুসন্ধান করে দেখাটা প্রকৃত অনুসন্ধান করে দেখাই হবে। নেতারা ঠাণ্ডা ঘর থেকে বেরোতে পারবেন অতিমারীর এই সময়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ঘর বেশি বিপজ্জনক বলেই বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। এবং জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে সিপিএম চাক বা না চাক কোনো লড়াই যে মমতাকে বাদ দিয়ে হতে পারে না সেটাও এখন দিনের আলোর মত স্পষ্ট। পাশাপাশি বামেদের পুনরুজ্জীবন বিশেষ করে যে ভয়ংকর আগামীর দিকে অসহায় তাকিয়ে আছে গোটা দেশ,এরকম একটা সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বলে আমি মনে করি। যেটা সম্ভব হতে পারে রাস্তার লড়াইকে রাস্তাতেই নিয়ে গিয়ে,বৎসরান্তে এক-আধদিন নয়,প্রতিদিন এবং শত্রুমিত্রের সংজ্ঞা পুনরায় সঠিক ভাবে নির্ধারণ করে। শতবর্ষের প্রাচীন দলটিকেও এসব কথা ভাবতে হবে গুরুত্ব দিয়ে।

[লেখক – বয়স ৬৭। থাকেন পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে। ১৬ বছর বয়সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তৎকালীন নকশাল আন্দোলনে। ১২ বছর গ্রামে কৃষকদের মধ্যে কাজ করেছেন। এখন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে না রাখলেও নিজের রাজনৈতিক ভাবনা লেখায় প্রকাশ করেন। ৮০-র দশকে উত্তরবঙ্গে হাংরি সাহিত্য আন্দোলন নতুন করে শুরু হলে দেবজ্যোতি সেই আন্দোলনের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেন। তাঁর তিনটি কবিতার বই ও দুটো গদ্যের বই এপর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কবিতার বইগুলি হল – ১) নির্মম বর্শার গান ২) স্বর ৩) একটি আত্মস্থ হল্লাবোল ও অন্যান্য কবিতা এবং গদ্যের বই – ১) নরকের থেকে একটুকরো অনির্বচনীয় মেঘ (উপন্যাস) ২) নষ্ট আত্মার নোটবই (২টি গল্প, ৯টি গদ্য ও ১টি নাটকের সংকলন)। দেবজ্যোতি নিজেকে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক বলেই মনে করেন।]

Facebook Comments

Leave a Reply