বামদলগুলির নীতি নির্ধারণের অপারগতা এবং নির্বাচনী হার : পিয়াল দাস

fail

বামপন্থা একটি আদর্শ । সমাজ সংস্কারের পন্থা। ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের পর সোশ্যালিস্ট প্রতিনিধিরা সদলবলে স্পিকারের বামদিকে বসতেন। সেখান থেকেই পরে বামপন্থী, লেফটিস্ট, লেফট উইং ইত্যাদি বাম বিষয়ক নানা নামের উদ্ভব।
ফরাসি বিপ্লবের মূলে ছিল গরীব বনাম বড়োলোকদের শ্রেণি বৈষম্যের ধারণা। বামপন্থা মনে করে দরিদ্র শ্রেণীর অবদানকে তুলনামূলক ভাবে ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। বিপরীতে, দেখা গেছে, আমেরিকান বিপ্লবের সময়, যা ছিল ফরাসি বিপ্লবের অন্তত তেরো বছর আগের ঘটনা, কেন্দ্রীয় বিষয় ছিলো ‘অধিকার‘ (right) বা মৌলিক মানবাধিকার। কিন্তু দেখা গেলো সাধারণভাবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের তুলনায় ভারতীয় বাম বা কমিউনিস্টদের গরীব বা প্রলেতারিয়েত শ্রেণির স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা মুখ্য হয়ে উঠলো। রাষ্ট্রের ধারণা কেমন হবে, এই প্রসঙ্গে অধিকার ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার ইতিবাচক দিকটি তাদের বোধে অস্পষ্টই রয়ে গেলো। আন্তর্জাতিক পটভূমিকাতেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বক্তব্য কখনোই সুস্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। বরং সে অর্থে নাগরিকের ইগালিটেরিয়ান জীবনযাপনের প্রশ্নকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
এমনকি রাশিয়া এবং চীনে শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির যে ভিত্তি ছিল, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সেই ভিত্তি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলিতে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কোনো লক্ষ্য, রণনীতি ও কর্মসূচি ছিল না। জনগণকে পাশে নিয়ে বিপ্লব করার পরিবর্তে তারা ঢুকে পড়লেন প্রচলিত সংসদীয় রাজনীতির কোটরে ।
অতঃপর স্বাধীনতার সময়ে সংসদীয় রাজনীতি ও নির্বাচন ভারতবর্ষের রাজনীতির প্রকৃতিতে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। একের পর এক নির্বাচনে কমিউনিস্টরা অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। কিন্তু আদপে এই কাঠামোতে কমিউনিস্টদের প্রতিদ্বন্দ্বী তো কোনো বিপ্লবী শক্তি নয়, তারা অন্যান্য সংসদীয় রাজনৈতিক দল যাদের মূল চরিত্রই বুর্জোয়া।কাজেই কমিউনিস্টরা আসলে ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণীর বাম অংশ হিসেবেই ভূমিকা নিয়েছিলেন সেটা বলা হয়তো খুব ভুল হবে না।
পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাম দলগুলি রাজ্যের সাংবিধানিক প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘ তিরিশ বছরের শাসনকাল সম্বন্ধে সকলেই অবগত, এবং সেই ক্ষমতার পতন নিয়ে বহুল আলোচনা, সমালোচনা ও তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছে।
তবে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা আজ আশু প্রয়োজন তা হলো, বিগত ৪৭বছরে পশ্চিমবঙ্গবাসী যে বামপন্থা দেখে চলেছে, সেটাই প্রকৃত বামপন্থা কী না। আদৌ পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী দলগুলো [সিপিআই(এম) ও তার শরিক দলগুলি] কখন থেকে শোষণমূলক সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যটি ত্যাগ করে যেকোনো মূল্যে সরকারি প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর দখল টিকিয়ে রাখাকেই প্রাধান্য দিতে শুরু করলো।
যে সরকারের ক্ষমতা গঠনের পর ‘বামফ্রন্ট সরকার সংগ্রামের হাতিয়ার’ আশ্বাসে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাসের জোয়ার এসেছিল, সেই সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কোনো গণ আন্দোলনে পুলিশ যাবেনা- এই আশ্বাস মরিচঝাঁপির ঘটনায় ভেঙে গিয়েও ক্ষমতা টিকে থাকার প্রচেষ্টা বামফ্রন্টকে আদপে মূলনীতি ও পন্থা থেকে সম্ভবত দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
অশোক মিত্র, অমর্ত্য সেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো চিন্তাবিদদের আলোচনায় এবং লেখনীতে বহুল জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকায় একাধিকবার বামপন্থীদের নির্বাচনী পরাজয়ের কারণগুলি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ হয়েছে।
এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বামপন্থীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আশ্চর্য স্বপ্নালু, এবং নস্টালজিক ছিলেন। ফলে যখন বিশ্বায়ন পরবর্তী সময়ে নিজেদের যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জরুরী ভিত্তিতে কোনো দিশা খোঁজার প্রয়াসের বদলে তারা সময় ব্যয় করেছেন গৎ বাঁধা পূর্বধারণায় আচ্ছন্ন রাজনীতিতে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে দেশকে একটি সুষ্ঠু সৎ প্রশাসনের পন্থা দেখানোর বদলে আনুগত্য ও দক্ষতার তফাৎ ভুলে, চাটুকারিতার এক দুষ্টচক্রের আবর্তে ঘুরতে শুরু করলেন।
জনগণকে ‘রিলিফ'(ত্রাণ অর্থে) দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁরা ক্ষমতাসীন হলেন, পরবর্তীতে সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে এগিয়ে চলার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার বিস্মৃত হলেন।ফলশ্রুতি হিসেবে আজ বামপন্থা তথা সিপিআই(এম) এবং তার শরিক দলগুলির রাজনীতির প্রতি পশ্চিমবঙ্গের জনগণের অনাস্থা বিগত তিনটি নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
বহুবছর ধরেই এরাজ্যে বামপন্থা নাগরিকের অধিকারের বদলে নাগরিকের ভোগ-স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর জোর দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুষ্ট করে চলেছে। তাহলে কি নির্বাচনী প্রক্রিয়া বামপন্থীদের লড়াইকে ক্ষমতার অলিন্দের নতুন কোন সুবিধাভোগী শ্রেণীতে পরিণত করেছে? কর্মসংস্থান নয় বরং ‘রিলিফে’র রাজনীতি নিয়ে তারা বহু বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিল? তথাকথিত শ্রমিক শ্রেণী বা গরিব মানুষদের কর্মসংস্থান বা তাদের শ্রেণী উন্নয়নের ব্যবস্থা কি করা হয়েছিল?
শহুরে মধ্যবিত্তদের মাঝে অন্তত সুযোগ বা কর্মের বণ্টন নিয়ে কোন উদ্যোগ বামপন্থী সরকারের মধ্যেও সেভাবে দেখা যায়নি। দল ও প্রশাসনের মধ্যে ব্যবধান ধরে রাখা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। দলীয় কাঠামোর অনুমোদন ছাড়া নির্বাচিত সরকারের তরফ থেকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বললেই চলে। এমনকি দলের মধ্যেও ক্ষমতার শ্রেণীবিন্যাস তৈরি হয়েছিল। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই আদর্শ ও সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাজে বিস্তর দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। এবং গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে কর্ম সংকট দেখা দেয়। নয়া অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল সেসব জায়গায় পৌঁছায় নি। ফলে সেখানকার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম শুধুমাত্র হয় দলীয় ক্যাডার অথবা গরিব শ্রেণীভুক্ত হয়েই রয়ে গেছেন। বাস্তবে সম্পদের বণ্টন যে শ্রেণীবিভেদ হ্রাস করার একমাত্র হাতিয়ার হতে পারেনা, এই বর্তমান শতকে এসেও বামপন্থী দলগুলি সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিক এই বাইনারি শ্রেণিপরিচয়ের বাইরেও আরো অনেক পরিচয় নিয়ে মানুষ বাঁচে। রাজনীতি ও অর্থনীতির নিরন্তর পরিবর্তনের সঙ্গে সেই পরিচয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পাদিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের কাছে সেটি বোধহয় এখনো স্পষ্ট প্রতীত হয়নি। নয়া অর্থনীতি, আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এবং বিশ্বায়নের যুগে প্রতিনিয়ত জীবনযাত্রার চরিত্র, চাহিদা ও যোগানের পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী দলগুলিকে নিজেদের সংগ্রামের অভিমুখের বিবর্তন ঘটাতে যথেষ্ট পরিমাণে সচেষ্ট করতে পারেনি। অতএব এটাতো আশ্চর্য নয় যে এই অবস্থায় বিগত শতকের ধ্যান-ধারণা ও মোটো নিয়ে চললে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও ব্যবস্থায় অধুনা প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী ছিল। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর থেকেও মানুষকে নিজেদের মহতী উদ্দেশ্য এবং নিজেদের ডিসিশন মেকিং প্রসেসে অন্তর্ভুক্ত করা যে বেশি জরুরি, এই শতকে এসেও বামপন্থী দলগুলির এটি বুঝতে এত সময় লাগার কারণ কি?
গ্রামাঞ্চলে, এমনকি শহরাঞ্চলেও গরিব মানুষদের ভোট কিনে নেবার জন্যে যথেচ্ছ অর্থ বিতরণ হয়েছে এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বেআইনিভাবে পাইয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল বামবিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে। দুর্ভাগ্যবশত বাম দলগুলির সাংগঠনিক শক্তি এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে এই ইস্যু সামনে এনেও তাঁরা পথে নামতে পারেন নি।
বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক ভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের মাঝে বাম শক্তি যেভাবে হারিয়ে গিয়েছে সেখান থেকে নিজেদেরকে তুলে ধরার জন্য কোনো পদক্ষেপ কি তাঁরা নিয়েছেন? মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য রিলিফ কর্মসূচি ছাড়াও অন্য কোন পন্থা কি তারা আজও ভেবে উঠতে পারেননি?
১৯৭৭ থেকে ২০১১ অব্ধি মেয়াদে বামপন্থী নেতৃত্ব অনগ্রসর জাতি বা শ্রেণিগুলির অধিকার স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিতে পারেনি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই পিছিয়ে পড়া জাতিগুলির মধ্যে নিরাশা ও দলের সদস্যদের দলীয় এলিটিজম এর প্রতি আনুগত্য শাসক দলের মধ্যে ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছিল। এটা কোন অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক বিপর্যয় নয়। জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রী অফিসের ওপরে দলীয় নেতৃত্বের চাপ প্রথম থেকেই ছিল। বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা অনেকেই শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন ফলে যুব নেতারা এবং তাদের একাংশ দলের অন্দরে নিজের ক্ষমতা স্থাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং মুক্ত অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের বাজারে নিজেদের প্রস্তাব বা সংগ্রামের আদর্শ বা বক্তব্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হন। জ্যোতি বসুর প্রতি বাঙালির, বিশেষত মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীদের একটা দুর্বলতা থাকায় তারা চিন্তার স্রোতকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তীতে, বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে নতুন ভোটারদের (২০২১- এর নির্বাচনে যা প্রায় সংখ্যায় ২০ লাখ মত) বামপন্থী দলগুলির দিকে আকর্ষণ করার জন্য নিজেদের মালিক-শ্রমিক বিভেদমূলক ধ্যান ধারণার বাইরে এসে যে প্রোপাগান্ডা প্রস্তুত করার প্রয়োজন ছিল, দলীয় নেতৃত্ব সেই দিকে মনোযোগ দেন নি।
দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব এবারের নির্বাচনেও একই ভাষা ও চিন্তাভাবনার প্রয়োগ করে প্রচারে নেমেছিলেন। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করার মত কোন চমকপ্রদ প্রোপাগান্ডা তৈরি হয়নি।
মুক্তবাজার অর্থনীতির সময়ে দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নশীল আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে নয়া দিগন্ত দেখানো যেখানে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত সেখানে এখনো সহানুভূতি ও রিলিফের রাজনীতি প্রাধান্য পেল। মেহনতি মানুষের তথা গরিবের অধিকার স্থাপন হলো না।

[লেখক – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পিয়াল দাস লেখালেখি শুরু করেছেন অতি সম্প্রতি। বিভিন্ন ওয়েবজিনে প্রকাশিত কবিতা ছাড়াও, পিয়ালের কিছু ছোট গল্পের নিজস্ব ব্লগ-সাইট আছে। সঙ্গীত এবং চিত্রশিল্পে উৎসাহী।]

Facebook Comments

Leave a Reply