শূন্য থেকে শুরু : পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতির আগামী দিক-নির্দেশিকা : প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়

fail

২০২১ বিধানসভা নির্বাচন একটা বৃত্য সম্পূর্ণ করলো—বাম-দুর্গ পশ্চিমবঙ্গ পর্যবসিত হলো বামহীন বিধানসভায় যেখানে স্বাধীনতার পর এই প্রথম একটিও বাম প্রার্থী জয়ী হতে পারলেন না সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে| সংসদীয় ব্যবস্থায় জয়-পরাজয় থাকেই কিন্তু বাম রাজনীতির কাছে বেদনাদায়ক হলো যে নির্বাচন-উত্তর পর্যালোচনায় বামেদের ভোট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস-এর স্বৈরাচারী রাজ্য শাসক দল এবং ফ্যাসিবাদী সাম্প্রদায়িক কেন্দ্রীয় শাসক দল বি.জে.পি-র মধ্যে| অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে যে বামপন্থী ভোট বামপন্থী দলগুলির কাছেই থাকতো আজ তারা হয়ে গাছে চলমান বা ফ্লোটিং ভোট| কখন সে যায় বি.জে.পি-তে (২০১৯ লোকসভা নির্বাচন) আবার কখনো সে যায় তৃণমূল কংগ্রেস ও বি.জে.পি-উভয়ের কাছেই (২০২১ বিধানসভা ভোট)| বামপন্থীরা স্বাধীনতার আগে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেয়নি এবং প্রাথমিক ভাবে তারা ভারতের স্বাধীনতাকে স্বীকার করেননি এবং বলেছিলেন ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় (বি.টি.রণদীভে লাইন)| বেশ হত যদি বামপন্থীরা ২০২১ নির্বাচনেই অংশগ্রহণ না করে বলতে পারতো ইয়ে মতদান ঝুটা হ্যায়| কিন্তু ১৯৪৭ যা সম্ভব ছিলো আজ ২০২১-এ গণমাধ্যম সচলতার যুগে এবং অংশগ্রহণমূলক সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তা আর সম্ভব নয়| কারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে যে কালের নিয়মে অবলুপ্ত হয়ে যেতে হবে ভারতীয় রাজনীতিতে তা আজ চরম বামপন্থী দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (লিবারেশন) টের পেয়েছে এবং তারা আজ সংসদীয় নির্বাচনী রাজনীতির জয়গান গাইছে| আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে জয়লাভ বা ক্ষমতা দখল সম্ভব নয় – তাই অগত্যা নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক আর নির্বাচনী কৌশল আয়ত্তে আনাও জরুরি| পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সাথে কেরলে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে এবং সেখানে বেশ কিছু দশকের রীতি (এক দল দুবার ক্ষমতায় আসে না উপর্যুপরি) ভেঙ্গে বামপন্থী জোট ক্ষমতায় ফিরে এসেছে| তাই একদিকে কেরলের সাফল্য আর অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিই কিছু অসুবিধার জায়গা আছে যেগুলো আলোকিত করা এবং সমাধান সূত্র খুঁজে বের করা আশু কর্তব্য| এই নিবন্ধে সেই প্রয়াসের চেষ্টা করা হয়েছে|

বর্তমানে ভারতবর্ষের সংসদে (লোকসভা) মাত্র পাঁচটি আসন, কেরলে এক দশক ক্ষমতায় থাকার পথে, অসম, উড়িষ্যা, মহারাষ্ট্র ও হিমাচল প্রদেশ বিধানসভায় একটি (১) করে আসন, তামিলনাড়ু বিধানসভায় চারটি (৪), রাজস্থান বিধানসভায় দুটি (২) এবং বিহার বিধানসভায় ষোলটি (১৬) আসন বামপন্থীদের হাতে| একসময়ের স্বীকৃত জাতীয় দল থেকে বামপন্থী দলগুলি বিলুপ্তির পথে সংসদীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে| পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রায় সাড়ে দিন দশক বামপন্থী শাসন ছিলও (১৯৭৭-২০১১)| ক্ষমতা হারানোর এক দশকের মধ্যে তারা নিশ্চিহ্ন নির্বাচনী রাজনীতিতে| ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন-এর সময়ে বামপন্থীদের একটাই লাভ হয়েছে এবং সেটা মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়ানে| বামপন্থীদের পাপের শাপমোচনের বার্তা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর জনসভায় ঘোষণা করেছেন যে ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে রাজ্য পুলিশ গুলি চালায়নি, চালিয়েছিল দশ বছরের বেশি সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেস দলে থেকে বর্তমানে বি.জে.পি দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারীর গুণ্ডা-বাহিনী| এবং এই অভিযোগ অস্বীকার করেননি শুভেন্দু অধিকারী, শুধু তার বাবা সাংসদ শিশির অধিকারী বলেছেন এই ঘটনার পেছনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সায় ছিল| ২০১১ সালে পরাজিত বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নন্দীগ্রাম কাণ্ড নিয়ে বয়ান – ‘নোংরা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র যা দশ বছর পর মানুষ বুঝবে’- আজ সত্যি প্রমাণিত হলো |
বামপন্থী ভোট ২০১৯-এ অনেকটাই বি.জে.পি-তে যাওয়াতেই যে বি.জে.পি-র আশাতীত সাফল্য সেটা আজ কারোরই অজানা নয়| গতবছর করোনা সময়েই পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ডাক দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলির কাছে বি.জি.পি-র বিরুদ্ধে একজোট হতে| নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেও বামপন্থী ভাই-বোনদের কাছে আবেদন করেছেন বি.জি.পি-কে ভোট না দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার| অথচ ব্রিগেড ময়দানে বামপন্থী দলগুলির পুরোধা সি.পি.আই(এম)-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি বললেন যে বিধানসভা ভোটের পর ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হলে তাদের অবস্থান কি হবে সেটার আগে জানার প্রয়োজন তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান তখন কি হবে কারণ তিনি নিশ্চিত যে তৃণমূল কংগ্রেস বি.জে.পি-র কাছে সমর্থন চাইবে তাদের কাছে নয়! অথচ ২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্তরেও সমস্ত বিরোধী শক্তির সমন্বয়কারী ভূমিকা নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়| নিজেদের দায়িত্বশীল অবস্থানের স্পষ্টভাবে ঘোষণা এড়িয়ে যাওয়া ভারতীয় রাজনীতিতে সি.পি.আই(এম) তথা বামপন্থী দলগুলির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ব্যর্থতা প্রকাশ করে| কমরেড ইয়েচুরি স্পষ্ট করতে পারলেন না যে বর্তমান সময়ে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও তৃনমূল কংগ্রেসের মধ্যে শ্রেণীগত বা মতাদর্শগত পার্থক্য কি – যার জন্য কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাস্ত করতে চাইছে সি.পি.আই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট| এর থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে বুঝে বুর্জোয়া দলগুলির মধ্যে তুলনামূলক পছন্দের নীতি নিতে হবে যা ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট দলের চেয়ারম্যান কমরেড শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে বলেছিলেন ১৯৭২ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে জন-সংঘের অস্থিরমতি নেতৃত্বের তুলনায় ইন্দিরা গান্ধীর জন-নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখে কারণ কমরেড ডাঙ্গে মনে করতেন ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে সামাজিক বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট মনভাবাপন্ন সেই সময়ের জন-সংঘ বা আজকের বি.জি.পে-কে পরাস্ত করা বামপন্থী তথা ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির ঐতিহাসিক দায়িত্ব|

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে তখনকার কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল সি.পি.আই(এম) দলের নেতৃত্বে সংযুক্ত বামফ্রন্ট (ইউ.এল.এফ) এবং অন্যদিকে সি.পি.আই দলের নেতৃত্বে গণ সংযুক্ত বামফ্রন্ট (পি.ইউ.এল.এফ)| কিন্তু তা সত্বেও জনসাধারণের রায় কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে যায় ও নির্বাচনে কংগ্রেস দল পরাজিত হয় এবং ইউ.এল.এফ এবং পি.ইউ.এল.এফ মিলিতভাবে অকংগ্রেসি যুক্তফ্রন্ট (ইউ.এফ) সরকার পশ্চিমবঙ্গে গঠন করে| প্রায় একই সময়ে ১৯৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও সি.পি.আই দলের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট (PDA) সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মুখ্যমন্ত্রীত্বে সরকার গঠন হয়েছিল| কিন্তু এই সরকার স্থায়ী হলেও সি.পি.আই-কংগ্রেস জোট বেশিদিন স্থায়ী হয় নি| কারণ সি.পি.আই দলের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য শাখা ১৮ মাস জোটে থাকার পর ১৯৭৩ সালে মাঝামাঝি সময়ে জোট থেকে বেরিয়ে এসেছিল| কিন্তু তার ফলে সরকারের পতন ঘটে নি| মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ১৯৭৭ পর্যন্ত স্থায়ী কংগ্রেসি সরকার চালিয়ে ছিলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়| ১৯৭২ সালে জোট গড়ে ১৯৭৩-এ জোট ছেড়ে গেলেও ফের ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস দলের সাথে সি.পি.আই জোট গঠন করে লড়াই করেছিলো| কিন্তু জরুরী-অবস্থার বিরুদ্ধে জনমত ঐ নির্বাচনে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যাওয়ায় কংগ্রেস-সি.পি.আই দলের জোট পরাজিত হয় এবং সি.পি.আই দল কংগ্রেস দলের সংস্রব পরিত্যাগ করে ক্রমে সি.পি.আই(এম) দলের ছত্রছায়ায় চলে আসে ১৯৮০ সালে বামফ্রন্টের দলভুক্ত হয়ে| ৫০ বছর পর সেই সি.পি.আই দল কংগ্রেসের সাথে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী জোট করছে সি.পি.আই(এম) দলের হাত ধরে| তবে এইবারে ২০২১ সালে নির্বাচনে কংগ্রেস দলের সাথে কমিউনিস্টদের সংযুক্ত জোট গঠনে নেতৃত্বে আছে সি.পি.আই(এম) দল| এটা অবশ্যই ইতিহাসের বিচারে এক সদর্থক দিক|

১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি ভারতে ক্ষমতার রাজনীতির ‘ভারতীয়তার’ (Indian-ness of Power Politics) সাথে সামঞ্জস্য তৈরি করে| কিন্তু ভারতীয় ইতিহাস ও ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের অন্দরে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার আলোকে আলোকিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের (মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস) ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রবক্তাদের (রামমনোহর লোহিয়া, জয়প্রকাশ নারায়ণ) সমালোচনা করার ফলে বামপন্থীদের সাথে ভারতীয় রাজনীতির ‘ভারতীয়তার’ (Indian-ness of Indian Politics) অসামঞ্জস্য রয়েই গেছে| ১৯৭৭ সালে যে ভূমি সংস্কার বামপন্থীদের রাজনৈতিক গর্বের কারণ হয়ে উঠেছিল তার প্রায়োগিক দিক নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে| ভারতীয় রাজনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে বামপন্থী দলের অন্দরে দুটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল – (ক) সংসদীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক এবং (খ) দেশের সাংবিধানিক পদে বামপন্থী দলীয় সদস্যের আসীন হওয়ার জন্য দলীয় সাংবিধানিক অভিমত|

ভ্লাদিমির লেনিনের ‘জাতীয় প্রগতিশীল বিপ্লব’ সংগঠিত করার কথা মনে রেখে দলের অন্দরে কমরেড এস.এ.ডাঙ্গে, প্রমুখ নেতা বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় রাজনীতির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষার জন্য এবং ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার জন্য অ-কংগ্রেসি রাজনৈতিক দলের তুলনায় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে নির্বাচনী রাজনৈতিক সুসম্পর্ক (unity-struggle-unity) বজায় রাখার কথা বলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে কখনো কোণঠাসা হয়েছেন আর শেষ পর্যন্ত বহিষ্কৃত হয়েছেন| ১৯৯৬ সালে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র দলীয় সংবিধানে কেন্দ্রীয় স্তরে সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার কথা বলা না থাকায় পশিমবঙ্গের ভূতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী ও বামপন্থী নেতা জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন নি যাকে পরবর্তীতে জ্যোতি বসু নিজে ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের ঐতিহাসিক ভুল (historical blunder) বলে ব্যাখ্যা করেন| ভারতের জোট-রাজনীতির নিয়মের ডাকে সাড়া দিতে দ্বিতীয়বার ২০০৪ সালে বামপন্থী দলগুলি ভুল করে নি এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (ইউ.পি.এ) সরকার-কে বাইরে থেকে সমর্থন যুগিয়েছে| কিন্তু আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সাথে ভারতের অসামরিক পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করে বামপন্থী দলগুলি ২০০৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে ভারতীয় রাজনীতিতে তাদের দ্বিতীয় রাজনৈতিক ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জটিল পরিস্থিতির সূচনা করে| অনেক বিশ্লেষকের কাছেই ২০০৮ সালের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর থেকে এই সমর্থন প্রত্যাহার ভারতের বর্তমান সময়ের রাজনীতির সমীকরণের বীজ রোপণ করেছিলো – মানুষের কাছে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ক্ষমতার অবলুপ্তি এবং ভারতীয় জনতা দলের বিপুল উত্থান| তাই বামপন্থী রাজনীতি ভারতবর্ষে কখনই ‘ভারতীয়’ (Indian) হয়ে উঠতে পারে নি, তারা নির্জীব মতাদর্শবাদী (passively ideological) এবং অন্তঃসারশূন্য আন্তর্জাতিকতাবাদী (vacuous internationalist) হয়ে রয়ে গেছে|

আসলে বামপন্থী দলগুলির কাছে এখনো ক্ষমতা হারানোর সার-সত্য উপলব্ধ হয় নি এবং তারা মনে করে যে মানুষ তাদের নির্বাচনী মতামতে (electoral opinion) যেমন বামফ্রন্ট-কে ক্ষমতাচ্যুত করেছে আবার তারাই তৃনমূল কংগ্রেস ও বি.জে.পি-র উপর মোহভঙ্গ হয়ে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিকে আবার পরিবর্তিত নির্বাচনী মতামতের (transformed electoral opinion) মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবে| তাই বামপন্থী দলগুলি আর কমিউনিস্ট আন্দোলনের কঠিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথে না গিয়ে, বিকল্প নতুন নীতি তৈরিতে আগ্রহী না হয়ে দলীয় কার্যালয়ে বসে ভারতীয় রাজনীতির ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পরিবর্তনের ঘূর্ণাবর্তকে (চিড়িতন-রুইতন-ইস্কাবন, অতি সনাতন ছন্দে করিতেছে নর্তন) উপভোগ করছে, কৌতুক মিশ্রিত ব্যঙ্গোক্তি করছে এবং জনতা-জনার্দনের (electorate) কৃপা-দৃষ্টি (sympathy and support ) লাভের অপেক্ষায় আছে! ভারতীয় রাজনীতিতে বর্তমানের বামপন্থী নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে বলা যায় অপরিসীম রাজনৈতিক ক্ষমতা মার্কসবাদী দলের কাছে ‘আফিমসম’ (absolute political power is the opium of Indian Communist Parties)| তাই ক্ষমতা চলে যাবার পরেও ক্ষমতার ঘোর কাটে না! এই ক্ষমতার ঘোর এতটাই যে তারা পরাজয়ের মধ্যেও জয় দেখে! (দেশজুড়ে যখন ২০০৪ ও ২০০৯-এর তুলনায় ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে পশিমবঙ্গে বামপন্থীদের ভোট শতাংশের সিংহভাগ বি.জে.পি-তে যাওয়া নিয়ে বিশ্লেষণ হচ্ছে তখন অনেক বামপন্থী নেতা-কর্মী মনে করছে যে তৃণমূল কংগ্রেসকে শিক্ষা দিতে বামপন্থীরা বি.জে.পি-কে সচেতনভাবে এবার ভোট দিয়েছে কিন্তু পরেরবার নিশ্চিতভাবেই ভোটগুলি আবার বামপন্থীরাই পাবে! তাই বামপন্থী দলগুলির আভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও নীতি পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই)|

ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবার কারণসমূহকে দুভাগে ভাগ করা যায় – একটি দলীয় কাঠামোগত (party-structure) আরেকটি রাজনৈতিক মতাদর্শগত (political-ideological)| মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর দৃষ্টিভঙ্গিতে বুর্জুয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে কমিউনিস্ট দলের ভূমিকা হবে অগ্রণী (vanguard of proletarian revolution)| পরবর্তী সময়ে লেনিন দেখিয়েছেন যে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের পটভূমি, বিন্যাস এবং বিস্তার শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে থেকেই হবে আর দল শুধুমাত্র এই আন্দোলনের বিভিন্ন শাখাকে সংঘবদ্ধ করে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে| কিন্তু স্তালিন-এর সময় থেকে দলের অগ্রণী ভূমিকার অন্য ব্যাখ্যা করে বলা হয় দল ঠিক করবে আন্দোলন কখন কতটা মাত্রায় এবং কি লক্ষ্যে হবে| লেনিনের দ্বারা প্রচলিত গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার (democratic centralism) নীতির অপব্যাখ্যা করা হয়| লেনিন চেয়েছিলেন সমস্ত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের চাহিদা ও ইচ্ছের সম্মেলন ঘটাবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দলীয় নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে| কিন্তু বাস্তবে স্তালিনের সময় থেকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মাধ্যমে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব যে নীতি ও কর্মসূচি ঠিক করবে সেটাই সবাইকে মেনে চলতে হবে দলে থাকতে গেলে| ভারতীয় কমিউনিস্ট দলগুলি স্তালিনবাদী দলীয় কাঠামো মেনে চলায় তারা ‘মাটির বাস্তবতা’ (ground realities) থেকে ক্রমশ দুরে যেতে থাকে এবং একবার ক্ষমতা হারানোর পর দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখার কোনো আকর্ষণ (attraction) তৈরি করতে পারে না| একবিংশ শতাব্দীর ফরাসী মার্কসীয় দার্শনিক জাঁক রানকায়র (Jacques Rancaire) বলেছেন যে এই প্রক্রিয়ায় ‘বুদ্ধিমত্তার সাম্যের’ (equality of intelligence) পরিস্থিতি তৈরি হয় না| রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দলীয় কর্মী-সমর্থক থেকে দলের বুদ্ধিমত্তার ওপর আস্থা রাখার কথা প্রচার করার মাধ্যমে দলের মধ্যেই নেতা ও কর্মীদের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি হয়| ক্ষমতায় থাকলে এই বিভাজন কর্মী-সমর্থকরা মেনে নিয়েছিল কিন্তু ক্ষমতা হারাতেই সেই কর্মী-সমর্থকরা ‘দলের’ (Party) থেকে ‘ক্ষমতা’ (Power)-কে প্রাধান্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলে চলে যায়| তাই অনতিলম্বে বর্তমান দলীয় কাঠামোর পরিবর্তন আবশ্যিক হয়ে উঠেছে ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী দলের পুনর্জাগরণের জন্য|

রাজনৈতিক মতাদর্শগত জায়গাতে ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী দলগুলি ঐতিহাসিকভাবেই অসামঞ্জস্যতা তথা স্ববিরোধিতার (contradictions) দ্বারা আক্রান্ত| প্রথমে তারা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের বিরোধিতায় এতটাই অন্ধ ছিল যে ১৯৮৯ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রে সরকার গঠন ঠেকাতে ‘ভারতীয় জনতা দলের’ (বি.জে.পি) সাথে সমর্থন দিয়েছিল ভি.পি.সিংহ-এর সরকার-কে| ১৯৯৮-এর পর ভারতীয় জনতা দল দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে উপনীত হওয়ায় বামপন্থী দলগুলি জাতীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা দলের সাথে সম-দূরত্ব (equal distance) নীতি নিয়ে ‘তৃতীয় ফ্রন্ট’ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে| এই রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বিভ্রান্তি আসলে লেনিনপন্থা সম্পর্কে তাঁদের ভিন্নমত|

তাই ভারতীয় রাজনীতিতে ‘নতুন বামপন্থা’ (New Left) গড়ে ওঠেনি| ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের নির্বাচনী পরাজয়ের পর বামপন্থী-মনস্ক বুদ্ধিজীবীরা (সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শোভনলাল দত্তগুপ্ত, মুর্জাবান জাল, সুমন্ত ব্যানার্জী) মনে করেন যে ভারতবর্ষে স্ব-পরিচিতি অধিকার আন্দোলনের (Identity and Rights-based Movement) বিষয়গুলির (জাতি-গোষ্ঠীগত, নারী, পরিবেশ, মানবাধিকার, দুর্নীতিরোধক, ভাষা ও সংস্কৃতিগত, সমকামী) সাথে বামপন্থী দলগুলির একাত্মতা ও সংঘবদ্ধতার অভাব রয়েছে এবং তার ফলে নির্বাচনে এই বিষয়-ভিত্তিক (Single Issue-based) আন্দোলনের সাথে জড়িত কর্মী-সমর্থকদের ভোট পাওয়া যায়নি| তাই আগামী দিনে স্ব-পরিচিতি আন্দোলনের (Identity Politics) সাথে বামপন্থী দলীয় রাজনীতির মেলবন্ধন ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থী দলগুলির হারানো নির্বাচনী জমি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সাহায্য করবে|

ভারতবর্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে বামপন্থীদের নূতন পথের সন্ধানে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে :
(ক) সঠিক অর্থে বৃহত্তর বাম ঐক্যের বাস্তবায়ন করা| ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনী ফলাফলের পর থেকে বামফ্রন্টের সাথে সি.পি.আই (এম.এল) এবং এস.ইউ.সি.আই (সি) মিছিল ও সভা একত্রে করতে থাকে কিন্তু নির্বাচনের সময় আলাদা ভাবে প্রার্থী দেয় একই আসনে| বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের শরিক হয়েও আর.এস.পি বহরমপুর লোকসভা আসনে আলাদা করে প্রার্থী দেয় যখন ফ্রন্টগত অবস্থান ছিল জাতীয় কংগ্রেসকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার ফলে দৈনন্দিনের ঐক্য ছাড়াও নির্বাচনী বাম-গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রয়োজন| এই ঐক্য লাভ করার জন্য সি.পি.আই ও সি.পি.আই(এম) দুটি দল আবার একত্রে চলে আসতে পারে ১৯৬৪ সালের আগের মতন| তার কারণ বামফ্রন্টের শরিক হিসাবে থাকতে গিয়ে সি.পি.আই বিগত কয়েক দশকে কার্যত সি.পি.আই(এম)-এর নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছে বিনা বাক্যব্যয়ে| একমাত্র ব্যতিক্রম ২০১২ সালের ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে যখন দলীয় সম্মেলনের অবস্থান স্বরূপ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জীর পক্ষে সি.পি.আই(এম) ভোট দেয় আর সি.পি.আই দল ভোট বয়কট করে নকশালপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান নেয়| তবে এটা একেবারেই সামান্য একটি উদাহরণ যা এই দুই দলের আলাদা থাকার প্রয়োজনীয়তাকে কোনো যৌক্তিকতা প্রদান করে না| তাত্ত্বিকভাবে বৃহত্তর বাম ঐক্যের জন্য প্রয়োজন লেনিন-কে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করা যেভাবে তিনি বিপ্লব ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘দৈনন্দিন বাস্তবতা’-কে (ground realities) মার্কসীয় তত্বের (Marxian theory) থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন| লেনিন তাঁর জীবনের শেষদিকে নিজের সোভিয়েত কমিউনিস্ট দলের মধ্যেও তার বক্তব্যের জন্য কোণঠাসা হয়ে পড়ে ছিলেন এই বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য| কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতি-রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে লেনিনপন্থা একমাত্র গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক লাইন হওয়া উচিত|

(খ) ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে আন্দোলনের রূপরেখা এবং সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়ার জন্য গান্ধী এবং নেহেরু-কে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বামপন্থীদের| শ্রেণীগত অবস্থান অন্য হলেও “গান্ধী-নেহেরু মডেল বামপন্থীদের ভারতীয় রাজনীতিতে ‘ভারতীয়ত্ব’ (Indian-ness) অর্জন করতে সাহায্য করবে| গান্ধী হল অহিংস (non-violent) ও সহিষ্ণু (tolerant) এবং অবিচল (firm) আন্দোলনের প্রতীক আর নেহেরু হল জনকল্যাণকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ‘অ-পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথ’ (non-capitalist path of development)-এর প্রতীক – এই দুয়েরই যোগফলে বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক ভারত গড়ে উঠতে পারে| প্রবল বিশ্বায়নের যুগে ২০০৬ সাল থেকে বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার মার্কসীয় তত্ত্ব ও প্রয়োগকে মেলাতে পারে নি| পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৬-১১ সময়ে কৃষিজীবী মানুষের স্বার্থ’র থেকে বিদেশী পুঁজির ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে (সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ) কৃষিজীবী মানুষের আস্থা হারিয়েছিল বলে মনে করা হয়| বিদেশী পুঁজি সম্পর্কে নেহেরুর কৌশলী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুবিধামতো দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করা অর্থাৎ পুঁজি বিনিয়োগের ব্যাপারে কোথায় কখন কতটা বিনিয়োগ হবে সেটা ভারতীয় রাষ্ট্র ঠিক করবে| আগামী দিনে বামপন্থীদের মনোভাব বিদেশী পুঁজির ব্যাপারে সরাসরি প্রতিরোধ আর সরাসরি গ্রহণের মাঝে নেহরুবাদী মধ্যপন্থা হওয়া উচিত|

(গ) ভারতবর্ষে বর্তমানে দক্ষিনপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল অতি-জাতীয়তাবাদী বি.জে.পি সরকার আধিপত্য বিস্তার করছে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে| মোদী পুঁজিবাদী রাজনীতির প্রতীক যেখানে দেশের সংস্কৃতিকে (সহিষ্ণুতা) ও দেশের সাংবিধানিক মতাদর্শকে (ধর্মনিরপেক্ষতা) অগ্রাহ্য করে হিন্দুত্ব ধর্মীয় মন্ত্র (জয় বজরঙ্গবলী, জয় শ্রী রাম, জয় শ্রী কৃষ্ণ) ভিত্তিক রাজনৈতিক সমাজ গঠনে আগ্রহী যাতে একই ধরনের পণ্য/দ্রব্যের ওপর চাহিদা তৈরি হয় এবং পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের সেগুলো তৈরি ও বিক্রি করতে সুবিধা হয়| ফলে বর্তমানে দেশে তৈরি হচ্ছে একই ধরনের চাহিদা, একই ধরনের দেশজ ধর্মীয় রাজনৈতিক মূল্যবোধ (indigenous religio-political value), এক দেশ-এক নির্বাচন-এক দল (one Nation-one Election-one Party) গঠনের প্রচেষ্টা| এই সময়ে বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন ও তার নেতৃত্বের ভার নেওয়া উচিত| ভারতের জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে প্রাচীনতম হল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও ভারতের কমিউনিস্ট দল| আজ ২০১৯-এ যখন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দিশাহীন, নেতৃত্বহীন তখন বামপন্থীদেরই উচিত সমগ্র দেশজুড়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে কৌশলী নির্বাচনী রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা – যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সমস্ত শক্তির জোট ও ‘এক-আসন এক-প্রার্থীর’ (one-seat-one candidate) নীতিতে বিরোধী রাজনীতি সংগঠিত করবে|

স্বাধীনতার সময় থেকেই রাষ্ট্রের শ্রেণী চরিত্র বিশ্লেষণ করতে মার্কস, এঙ্গেলস, স্তালিন, ট্রটস্কি, মাও-জে-দং দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছে বামপন্থী দলগুলি যে তারা নিজেদের মতন করে রাষ্ট্রের চরিত্র বিশ্লেষণ করলেন কিন্তু লেনিনের কথা ভুলে গেলেন| লেনিন বুঝতে পেরেছিলেন মার্কস-এর বক্তব্য সমাজ বিপ্লব প্রসঙ্গে| মার্কস-এর মতে সমাজ বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য দুটি প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি দরকার – (ক) একটি রাজনৈতিক শক্তি সমাজের সমস্ত ক্ষেত্রের মুখপাত্র হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে (খ) শাসককে শয়তান হিসাবে সমাজের সমস্ত ক্ষেত্রের সামনে প্রতিভূত হতে হবে| মার্কস জার্মান সমাজের বিপ্লব প্রসঙ্গে এই কথা বলেছিলেম তার ‘কন্ট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অফ হেগেল’স ফিলসফি অফ রাইট’ গ্রন্থের ভূমিকায়| ভারতে কখনই সেরকম পরিস্থিতি গড়ে ওঠে নি আর তাই মার্কস-এর মতানুসারে সমাজ বিপ্লবের প্রেক্ষিত তৈরি হয় নি|

বামফ্রন্ট হিসাবে মূলত চারটি দল আলোকিত হয় – সিপিআই, সিপিআই(এম), আর.এস.পি, ফরওয়ার্ড ব্লক| এই সব বিভাজন, বিরোধিতা, মতাদর্শের কচকচানি ২০১৪-তে বি.জে.পি-র উত্থানের সাথেই ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসাবে এদের সামনে উপনীত হয় এবং ‘বৃহত্তর বাম ঐক্যের’ মন্ত্রে বামফ্রন্টের সাথে আন্দোলনে ও কর্মসূচিতে জোটবদ্ধ হয় সিপিআই(এম-এল) ও এস.ইউ.সি.আই-সি| বর্তমানে তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্য সত্বেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সিপিআই(এম)-এর ছত্রছায়াতেই বাকিরা থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে| তাই সিপিআই(এম)-এর ‘রাজনৈতিক বাস্তববাদিতার’ নামে দোদুল্যমানতা একটু বিশদে আলোচনার প্রয়োজন আছে|

সিপিআই(এম) দলের ২০০৫ সালের দলীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক পর্যালোচনার ২.১০৫ অনুচ্ছেদে বলা হয় “নীতি প্রণয়নের স্তরে বাম রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইউ.পি.এ সরকারের বিকল্প নীতির অনুসন্ধানে”| আবার ২০০৮ সালে ইউ.পি.এ সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের পর তাদের দলীয় সম্মেলনে রাজনৈতিক পর্যালোচনার ২.১০৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে “দল কংগ্রেস ও বি.জে.পি-র মধ্যে পার্থক্য করে মনে করে যে কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ বুর্জুয়া দল যদিও সে ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতার পরিচয় দেয় যখন বি.জে.পি উত্তুঙ্গ ধর্মান্ধতা দেখায়| দল বি.জে.পি-কে পরাস্ত করার জন্য কৌশল গ্রহণ করবে কিন্তু কংগ্রেসের সাথে কোনধরনের যৌথ ফ্রন্ট বা জোটের প্রশ্ন নেই|” আবার ২০১২ সালের দলীয় সম্মেলনে ২.১৩৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হচ্ছে “সি.পি.আই(এম)-কে রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেস ও বি.জে.পি উভয় দলের বিরুদ্ধে লড়তে হবে|” এই নীতিগত অবস্থান থেকে সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের অবস্থান না মেলায় বেশ কিছু নবীন বামপন্থী নেতা-কর্মী দলত্যাগ করেন| এর পরে ২০১৫ সালের দলীয় সম্মেলনে রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইনের পর্যালোচনা গুরুতর ভাবে করে বলা হয় ৫ নং অধ্যায়ে – “রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইন হল নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে নেওয়া পন্থা যার মাধ্যমে আমাদের কৌশলগত লক্ষের দিকে এগোতে পারা যাবে – জন-গণতান্ত্রিক বিপ্লব|” এবং ৬১ নং অধ্যায়ে লেখা হয় “বর্তমান সময়ে আঞ্চলিক দলগুলির অবস্থা মাথায় রেখে তাদের সাথে জাতীয় স্তরে নির্বাচনী জোটবদ্ধ হওয়া উচিত নয়| তার থেকে বিভিন্ন রাজ্যে অ-বাম ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির সাথে নির্বাচনী সমঝোতা করা যেতে পারে দলের স্বার্থের এবং বাম-গণতান্ত্রিক শক্তিবৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে|” সার্বিকভাবে দলগত অবস্থান এই সম্মেলনের রাজনৈতিক পর্যালোচনার ২.৬৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয় –“রাজনৈতিক সংঘর্ষের অভিমুখ যদিও বি.জে.পি কিন্তু দল কংগ্রেস বিরোধিতায় অটল থাকবে|” এই সবকিছু থেকে একটি ব্যাপার পরিষ্কার – দিশেহারা, দিশাহীন ও অন্তর্কলহে বিদ্ধ একটি রাজনৈতিক শক্তি যারা মতাদর্শের সাথে বাস্তব ভারতীয় রাজনীতির মিশেল খুঁজতে ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’-এর মত অবস্থায়! কেন্দ্রীয় স্তরের এই বিভ্রান্তি নিচুতলার কর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে – রাজনৈতিক লাইন হয়ে উঠেছে মরশুমি-লাইন!

লেনিন বলেছিলেন শূন্য থেকে শুরু করতে প্রতিবার এবং বারংবার| আর আজকের মার্কসবাদী ঘরানার রাজনৈতিক দার্শনিক স্লাভোই জিজেক সাবধান করছেন সেই সমস্ত ফুকায়ামাবাদী বামপন্থীদের প্রসঙ্গে যারা ধরেই নিয়েছেন বামপন্থীদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই এবং তাদের ধনতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে| লেনিন ও জিজেকের মতানুসারে ভারতবর্ষে এবং পশ্চিমবঙ্গে তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন সি.পি.আই(এম) দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তন যেখানে আশু কর্মসূচি ও লক্ষ্য হবে ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা, সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত মৌলিক অধিকার ও চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত নির্দেশমূলক নীতিসমূহের রূপায়ণ| নির্দিষ্ট আদর্শ, লক্ষ্য ও কর্মসূচী ঠিক না থাকলে কোন পদক্ষেপ সাফল্য আনতে পারবে না| ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতিতে আদর্শ বা মডেল হিসাবে উপস্থিত হতে পারে জাতীয় কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট দলের যৌথ নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ জোট|

[লেখক – কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।]

Facebook Comments

Leave a Reply