‘শূন্য’ একটি দাগ মাত্রঃ দাগ আচ্ছে হ্যায়! – রাজদীপ্ত রায়

fail

করোনা অতিমারী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের প্রেক্ষিতে বিধানসভা নির্বাচনে সদ্য উঠে আসা বাম ও কংগ্রেস শূন্য ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি -অর্থনীতি-সাংস্কৃতিক-সামাজিক জীবনে কোন বার্তা বহন করে বা আদৌ কোনও বার্তা বহন করে কিনা — লিখতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে সে বিষয়ে কথা বলা খুব সহজ নয়।

কংগ্রেসের ফলাফল, হতাশার কারণ বা এ রাজ্যে তাদের দীর্ঘকালীন বিপর্যয় ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা মোটের ওপর একটাই অক্ষরেখা বরাবর চলে। আর সেসব নিয়ে রাজ্য বা জাতীয় উভয় কংগ্রেস নেতৃত্বেরই বিশেষ হেলদোল আছে বলে অন্তত লিখিত পড়িত কোনো প্রমাণ খুব একটা পাওয়া যায় না। সোজাসুজি বা সাংকেতিক যেভাবেই দেখি না কেন, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের রাজনীতি বরাবরই জমিদারির দুলকি চালে চলেছে। বংশগত জমিদারি, সামন্ততান্ত্রিক প্রভু-কীর্তন বাদ দিলে আরেকটা যে ধরণ কংগ্রেসের হাল ধরে রেখেছিলো গত প্রায় পঁচিশ বছর, তাকে একধরনের রবিন হুডিয় কায়দা বলা যেতে পারে। প্রধানত এই দুই ছাঁচে চলা রাজ্য কংগ্রেসের রাজনৈতিক ঘরানার ভালো মন্দ বিচার করা এখানে উদ্দেশ্য নয়। দল বাঁচানোর জন্য প্রচলিত ছকে বিশ্বাসী কংগ্রেসের সামাজিক বিযুক্তির যে একটা বৃত্ত আমাদের রাজ্যে মোটামুটি সম্পূর্ণ হলো, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়ার প্রেক্ষিতে সেটুকু বুঝে নেওয়াটাই শুধু দরকার। এরপর কংগ্রেস কিভাবে তার প্রাসঙ্গিকতা ফেরাবে, অথবা যে বাজার অর্থনীতির কাণ্ডারী তারা নিজেই আজ তার মুক্তকচ্ছ নব্য মসীহা বিজেপির চূড়ান্ত বোলবালায় কতক্ষণ প্রো-অ্যাকটিভ রাজনৈতিক সংগ্রাম শিকেয় তুলে শত্রুর ভরাডুবির আশায় হা-পিত্যেশ করে বসে থাকবে আর আন্দোলনের নামে রি-অ্যাক্টিভ মন্তব্যের ঢলেই ভরসা রেখে এগুবে, সে দায় নিতান্তই তাদের নিজস্ব দলীয় ব্যাপার।

রাজনৈতিক ভাবে রাজ্য বা দেশ দু-জায়গাতেই উদারবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ দক্ষিণপন্থার শক্তপোক্ত উপস্থিতির অভাব বা তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া যে ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী দলটির উগ্র দক্ষিণপন্থাকে বাড়তে অনেকটাই সাহায্য করেছে, সে সত্যিটা সকলেই বোঝেন। সেদিক দিয়ে একটি রাজ্যে কংগ্রেসের আসন শূন্য হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক, এবং কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক ভাবেও বটে (যদিও এ সন্দেহ থেকেই যায় যে কর্পোরেট পুঁজির একনিষ্ঠ সেবক মনমোহনীয় কংগ্রেস আদৌ কোনো অন্য পথে হাঁটতো কিনা, কেননা ডাঙ্কেল চুক্তি পূর্ববর্তী কংগ্রেস আর পরবর্তী কংগ্রেসের অর্থনৈতিক দর্শনে ফারাক দৃশ্যতই বিস্তর) যথেষ্টই গুরুত্বের ব্যাপার। সাংস্কৃতিক বা সামাজিক ভাবে সেই নেই হয়ে যাওয়া কতটা গুরুত্বের, তা নিয়ে যদিও ভিন্ন তর্ক আছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রায় পুরো স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির জায়গাটাই বহুযুগ হয়ে গেলো তৃণমূলের দখলে চলে গেছে। কাজেই তাদের আসন শূন্যতা সামাজিক বা সাংস্কৃতিক স্তরে কোনো প্রভাব সে অর্থে ফেলবে বলে মনে হয় না।

অন্যদিকে বাম শূন্য বিধানসভা নিয়ে আলোচনা করবার অনেক দিক বা স্তর থাকলেও এবারের নির্বাচনী ফলাফলের পর সমাজ মাধ্যমে যে হারে বক্তব্য উঠে এসেছে, তাতে করে খুব আনকোরা কিছু বলে ওঠা বেশ কঠিন কাজ। পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই-এম বৃহত্তর বামদল। সিপিআই, আর এস পি বা ফরোয়ার্ড ব্লকের মতো দলগুলি সেই বামফ্রন্ট-সরকার গঠনের আমল থেকে একজোট থাকায় তাদের সকলের বিপর্যয়কে আলাদা আলাদা ভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। সিপিআই-এম নিয়ে যা বলার সেসব তাদের ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য, ধরে নেওয়া যায়। বাকি রইলো সিপিআই-এমএল, অন্যান্য ছোট কয়েকটি নকশালবাদী দল এবং এসইউসিআই (কম্যুনিস্ট), যাদের কিছু কিছু অঞ্চলে জোর থাকলেও গোটা রাজ্যের প্রেক্ষিতে নির্বাচনী গুরুত্ব খুব বেশি একটা কখনোই ছিলো না। এবারেও যে থাকবে না, সে আগেই বোঝা যাচ্ছিলো। এদিকে বিজেপি যে আগ্রাসী হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলে, সবধরনের বিচ্ছিন্নতার আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে, বিজাতীয় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে যেন তেন প্রকারেণ বাংলা দখল করতে চাইছে, বৃহত্তর সাধারণ ভোটারের কাছে সে বার্তা স্পষ্ট ছিলো। তৃণমূলের দলীয় গা-জোয়ারি, সিন্ডিকেট, গ্রাম স্তরের চূড়ান্ত রাজনৈতিক খেয়োখেয়ি, গোষ্ঠী সংঘর্ষ, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতা-মন্ত্রীদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জোরে একটি বা দুটি করে মাতব্বরের ভয়ানক প্রভাব বৃদ্ধি, লুম্পেন দর্পে হাতে মাথা কাটা এবং প্রায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া আর্থিক দুর্নীতির উদাহরণগুলিও চোখের সামনেই ছিলো। কিন্তু এতকিছুর পরেও মানুষের কাছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষহীন সমাজ জীবনে ছোট্ট স্বস্তির চাহিদা যে অনেকটাই বেশি ছিলো অথবা কোনো না কোনো ভাবে তার প্রায় নির্জ্ঞানে সেঁধিয়ে থাকা দাঙ্গার কৌম স্মৃতি বা শ্রুত/প্রক্ষিপ্ত স্মৃতি যে নির্বাচনী সিদ্ধান্তে ভালোভাবেই প্রভাব ফেলেছে, সে তো ফলাফলেই বোঝা যাচ্ছে।

রাজ্যের বাম দলগুলির মধ্যে এই প্রাক নির্বাচনী গণ ইচ্ছের সমীকরণকে বুঝে ওঠা বা সেই অনুযায়ী শত্রু নির্বাচনে পরিষ্কার দুটো ভাগ ছিলো। সিপিআই-এমএল সহ অন্যান্যদের কাছে বিজেপিকে প্রতিহত করাটাই ছিলো সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের চাইতে বাংলার সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি রক্ষা করাটাকেই তারা বেশি প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন নিঃসন্দেহে। আর তাছাড়া, তেমনটা করলে গোটা দেশের নিরিখে কর্পোরেটের দালাল বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতেও সেক্ষেত্রে অসুবিধে হয় না।

কিন্তু সিপিআই-এম, বা সব শরিক সহ আদি অকৃত্রিম বামফ্রন্ট, অর্থাৎ বৃহত্তর বাম দল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচনে এগিয়েছে। বৃহত্তর দলীয় বামের এই সিদ্ধান্তের ভেতরেই সম্ভবত তাদের নির্বাচনোত্তর ফলাফলের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক তাৎপর্যের কিছু হাল হকিকত খুঁজে পাওয়া গেলেও যেতে পারে বলে মনে হয়।

এবারের নির্বাচনে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ইস্যুর চাইতে রাজনৈতিক ইস্যু আর কর্মসংস্থানের মতো অর্থনৈতিক প্রশ্নকেই যে বৃহত্তর দলীয় বাম বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেই ইঙ্গিত প্রায় প্রতিটি বক্তব্যেই পাওয়া গেছে। ফোকাসের এহেন স্থিতির কারণে রাজ্যে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের দাবিকে তাদের মান্যতা দিতেই হতো। ধরে নিতে পারি, সেজন্যই হয়তো তারা তৃণমূল আর বিজেপিকে এক এবং অভিন্ন করে দেখেছে এবং এক জোড়া শত্রুকে নির্বাচনী যুদ্ধের লক্ষ্য করে তুলে আদতে সাধারণ ভোটারের আশু সামাজিক চাহিদাটাকেই আর বুঝে উঠতে পারেনি। স্মর্তব্য, রাজনৈতিক যুক্তির কথা নয়, সামাজিক বিড়ম্বনার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার যে অস্তিগত চাহিদা এবং সেখান থেকে উঠে আসা নির্বাচনী পছন্দের যুক্তি, সেই প্রসঙ্গেই এই না-বোঝার কথা আসছে।

সার্বভৌম ভারতের এযাবৎকালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ইতিহাস বলে যে আমাদের দেশে ভোট হয় অস্তিত্বের যুদ্ধ হিসেবে, ভাবাদর্শের যুদ্ধ হিসেবে নয়। এই একুশ শতকেও যে দেশে ধর্ম-জাতপাত-সম্প্রদায়-প্রাদেশিকতার হাজারো সমস্যা আর ন্যূনতম আয়ে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার লড়াইটাই মানুষের কাছে আজো মুখ্য, যে দেশে দু’টাকা প্রতি কিলোগ্রাম দরের চালকেও মহার্ঘ্য হিসেবে দেখতে বাধ্য হয় কাতারে কাতারে আধপেটা নির্বাচক, সেখানে কোন যুক্তিতে বৃহৎ পুঁজির কেন্দ্রীয় দালালের সঙ্গে রাজ্যে অধিষ্ঠিত পপুলিস্ট ডেসপট এক হয়ে যান, আর তাদের সঙ্গে সালিম গোষ্ঠীর শিল্প-তালুক স্থাপনে আগ্রহী শিল্পে ভবিষ্যত দেখা দলের ভাবাদর্শগত মৌলিক ফারাক কতটা — সেসব নীতিনিষ্ঠ কূটতর্ক করার বা বোঝার না আছে ড্রয়িং-রুম না আছে সময়। কাজেই কেন্দ্রে একটার পর একটা কৃষক-মানুষ-দেশ বিরোধী নীতি প্রণয়ন করে চলা উগ্র সাম্প্রদায়িক দলটির গোটা দেশ বিক্রি করে দেওয়ার এই বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে যে রাজ্য-নির্বাচনটি হলো, তাতে তৃণমূল ও বিজেপি নামক দুই-লক্ষ্যবিন্দুকে এক তিরে বিঁধতে চাওয়া বামেরা বিধানসভায় শূন্য আসন পেয়ে কেন অর্জুন বা রাম হয়ে উঠতে পারলো না, সে রহস্য নিয়ে কৌতূহল এবং বাম-ভোটার হিসেবে হতাশা থাকলেও বিস্ময়ের অবকাশ খুব একটা ছিলো না। বরং, সমীহ করবার মতো বিস্ময় জেগেছে মুখ বুজে ভোট দেওয়া সেই অতি-সাধারণ ভোটারদের দেখে যাঁরা সরকারি অনুদানের ওপরেই আপাতত ভরসা রেখে নিতান্ত অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বিজেপি নামক চরম ফ্যাসিস্টকে অন্তত এবারে বাংলা দখল করতে দেয়নি। ভবিষ্যতে কী হবে বলা মুশকিল। আপাতত তাঁরা সমাজ আর সংস্কৃতিরই লড়াই লড়েছেন, রাজনৈতিক পালা পরিবর্তনের নয়। সে কারণেই বিধানসভায় বাম-শূন্যতার সামাজিক স্তরে কোনো আলোড়ন আদৌ আছে বা থাকবে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না।

যদি কিছুটা অন্য দিক দিয়ে দেখি, তাহলে বলতে হয় বাংলার সাংস্কৃতিক বা সামাজিক স্তরে বাম প্রাসঙ্গিকতার গালভরা নিটোল কথাবার্তা প্রচুর শুনে আসলেও, আদৌ সে বস্তুর কোনো অস্তিত্ব কখনো ছিলো কিনা সেটাও ভাববার বিষয়। বাংলার বাইরের বামপন্থী তাত্ত্বিকদের লেখালেখি পড়লে কিন্তু এ বিষয়ে বড়সড় প্রশ্ন জাগে। প্রায় চল্লিশ বছরের কাছাকাছি যে সময়কালটা বামফ্রন্ট শাসন ক্ষমতায় ছিলো, লোকাল, জোনাল, ডিস্ট্রিক্ট ইত্যাদি নানা কমিটির সহর্ষ উপস্থিতি আর রৌরবের মধ্য দিয়ে দলের ব্যুরোক্র্যাটিক একটা কাঠামো আর তার শৃঙখলার সঙ্গে সাধারণ সমাজের নিশ্চিত একটা পরিচিতি ছিলো। পার্টি-সোসাইটি গড়ে উঠেছিলো, যেখানে অনেকেই প্রায় নানা কিছু করার মতোই পার্টিটাও “করতো”। কিন্তু কিছু সুবিধে পাওয়া বা সাধারণ সমস্যা নিষ্পত্তির মতো ঘটনা গুলি বাদ দিলে সাধারণ সমাজের সঙ্গে বামপন্থী শিক্ষা বা সংস্কারের মেলবন্ধনের সব পথ বন্ধই ছিলো। ধর্ম, ধর্মীয় আচার, জাতপাতের বিষয়, লিঙ্গ রাজনীতির নানা পরিসর বা অন্যান্য আরও অনেক রকমের দৈনন্দিন বিষয়ের যে সামাজিকতা, সেসবের সঙ্গে প্রকৃত বামপন্থী দিগদর্শনের নিত্যচর্চার যোগাযোগ সাত বা আটের দশক পর্যন্ত কিছুটা থাকলেও নব্বই থেকে সবটাই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে। ভোটের কথা মাথায় রেখে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্তরে শুধু কিছু সংগঠন জিইয়ে রাখা বাদ দিয়ে সার্বিক বামপন্থী সংস্কৃতি চর্চাও খুব একটা দানা বাঁধেনি। সেরকমটা সত্যিই থাকলে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা সংগঠিত দলীয় ব্যবস্থার ২০১১ থেকে মাত্র দশ বছরে এমন রক্তশূন্য চেহারা হয় না।

বামফ্রণ্ট থাকাকালীন পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো দৈনিক পত্রিকার পাতায় যদি দশকওয়াড়ি চোখ রাখা যায় তাহলে দেখা যাবে বামফ্রন্টের ভোট বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জাতপাত ভিত্তিক পাত্র/পাত্রী চাওয়া, হাত দেখা, কোষ্ঠীবিচার, বশীকরণ বা তান্ত্রিক বিজ্ঞাপনের সংখ্যা এবং বহর। এই অদ্ভুত পরস্পর-বিরোধী সামাজিক বোধের মোবিলিটি বা গতিমুখ বামফ্রন্টে থাকা বাম দলগুলিই বাড়িয়েছে, এমন দাবী করা নিতান্তই অবিবেচকের কাজ হবে। কিন্তু সামাজিক স্তরে বাম মানসিকতার চর্চা না থাকা, রাজনৈতিক ক্ষমতাকেই শুধুমাত্র পাখির চোখ করে তুলে এইসব সাংস্কৃতিক বা সামাজিক বিষয় সম্বন্ধে তাদের উদাসীনতা বা বাম ভাবনার একধরনের লাগাতার এবং উদ্যোগহীন অনুপস্থিতি যে এই জাতপাতের চর্চা বা কুসংস্কার বা চোরা ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়ানোয় সহায়ক হয়েছে, সে বলাই বাহুল্য। সুতরাং, ২০১৪ পরবর্তী সময়ে কর্পোরেট পুঁজির পায়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের চুক্তিতে যে আগ্রাসী বিজেপির উত্থান ঘটলো গুজরাট জেনোসাইডের অবিসম্বাদী নায়ক শ্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে, যাঁর কাছে এমনকি পুরনো বিজেপির অটল-ঘরানার দক্ষিণপন্থী শিক্ষার লাইনও তুলনায় কম উগ্র বলে অচিরেই ব্রাত্য হয়ে গেল, তার ধর্মীয় মৌলবাদের জোয়ারে ভেসে যেতে বাংলার এক অংশের ইতিহাস-বিস্মৃত মানুষের অন্তত বেশি সময় লাগেনি। তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবাদর্শহীন ব্যক্তি-নির্ভর অ্যাজেন্ডায় যে বিজেপির বৃদ্ধি আটকানো যাবে না বা যায় না, সে কথা সহজেই বোধগম্য। কিন্তু কথা হলো, দায় শুধুই তৃণমূলের অপদার্থতার নয়। বাম-ভাবনা চর্চার দীর্ঘ সামাজিক বিযুক্তির ইতিহাস প্রায় চল্লিশ বছর ধরে চোখের আড়ালে যে নরম-সাম্প্রদায়িক সামাজিক মনকে বাড়তে দিয়েছে, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রাজনীতির গোটা প্যারাডাইমটাকে অস্বীকার করার সেই লম্বা বামদলীয় অভ্যেসের মধ্যে আজকের পশ্চিমবঙ্গের উগ্রতা চর্চার বীজ লুকোনো আছে ভালো পরিমাণেই।

দায় তাদেরও আছে, যে দায় কাটাতে বলা কওয়া নেই গোত্রের আইডেন্টিটি পলিটিক্সকে সম্বোধন করার নামে নির্বাচনের মাত্র তিনমাস আগে তৈরি হওয়া দল আইএসএফের সঙ্গে ধর তক্তা মার পেরেক জাতীয় জোট করা যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে করে ভবী ভোলে না। এমনিতেই ভারতীয় সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রশ্নে বামদলগুলির কাছে বিশ্বাসযোগ্যতার বিরাট প্রশ্ন আছে। যে কারণে ধর্মীয় কার্নিভ্যালের মিছিলে সাংস্কৃতিক আচার-অভিজ্ঞান মাথায় করে হেঁটে ইয়েচুরি সাহেব ভিন্ন বার্তা দিতে চাইলেও তিনি স্বয়ং দলে বা দলের বাইরে হাজারো প্রশ্নের সামনে পড়েন, সেখানে পূর্ব প্রস্তুতিহীন আকস্মিক সিদ্ধান্তে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর হাত ধরলে বা দলিত নেতৃত্বের হঠাৎ-দোহাই পেড়ে আইএসএফের সঙ্গে জোটের বৈধতা নিয়ে শত যুক্তি পাড়লেও সাধারণ ভোটার যে সে চেষ্টাকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখেই দেখবেন, তাতে আশ্চর্য কী!

শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাসী দলকে এই নব্য-উদারবাদী কর্পোরেট-দাস ভারতে নিজেকে আবারো প্রাসঙ্গিক করতে গেলে যে পরিচিতি রাজনীতি, দলিত-আদিবাসী-নারী-লিঙ্গ-পরিবেশ ইস্যু, ধর্ম-সম্পৃক্ত সমাজের নাড়ি নক্ষত্র ইত্যাদি বিষয়ে এনগেজ করতেই হবে, সংস্কৃতি রাজনীতি নিয়ে ভাবতেই হবে, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কাজেই আব্বাস সিদ্দিকীর সাথে জোট কেন বা তিনি কেন পীরজাদা পরিচয়কে মান্যতা দিয়ে মাথায় টুপি পড়েন, সেটাকেই একমাত্র বিবেচ্য ধরে নিয়ে যারা ভোট দেয়নি তাদেরকে নরম হিন্দুত্ববাদী বা ব্রাহ্মণ্যবাদী বা মনুবাদী বলে গাল পাড়লে নির্বাচনী ফলাফলে শূন্য হয়ে যাওয়ার ক্ষতে হয়তো মলম পড়ে, কিন্তু রোগের সুরাহা হয় না।

মনে রাখা দরকার যে প্রশ্নটা ট্রাস্ট বা বিশ্বাসযোগ্যতার। দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। নীতির চাইতেও বেশি করে কৌশলের প্রশ্ন। অবস্থানের প্রশ্ন নয়, অবস্থানকে গ্রহণযোগ্য করে তুলবার পরিসর পরিধি আর সময়ের প্রশ্ন। ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গে বামেদের অবস্থান, তা সে বড় বা ছোট যে দলই হোক না কেন, সকলের কাছেই প্রশ্নাতীত। অথচ দেখা গেলো এই নির্বাচনে সংযুক্ত মোর্চার প্রধান শরিক, সিপিআই-এমের সমস্ত প্রচার আর সমাজ মাধ্যমে তরজার একটা বড় অংশ ব্যয় হলো আব্বাসের নিরপেক্ষতা প্রমাণের চেষ্টায়। আইএসএফের বাকি কথাবার্তা বা নেতাদের দলিত পরিচয় তুলে ধরে তাদের এক ধরনের রাজনৈতিক বৈধতা তৈরিতে ব্যস্ত থাকলো প্রধান শরিক। আর বাকিটা জুড়ে রইলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জোরদার আক্রমণ। অতি সাধারণ ভোটার, যার কাছে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে কী হতে পারে যা কিনা সে রামনবমীর অস্ত্র মিছিল থেকে দিলীপ, সায়ন্তন, রাহুল বা শুভেন্দুর খুল্লমখুল্লা মুসলমান বিদ্বেষী লাগাতার প্ররোচনা আর হুঙ্কারে নাগাড়ে শুনে আসছিলো আর আতঙ্কিত হচ্ছিলো, তার কাছে সামাজিক সুস্থিতির কোনো বার্তা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ভাবে দিয়ে উঠতে পারেনি বৃহত্তর বাম দল। আব্বাসের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনেই দিন কাবার হয়ে গেছে।

এখানে ওই অতি সাধারণ ভোটার, যাদের ভোটে সরকার তৈরি হয়, তাকে অযথা মনুবাদী বলে গাল পাড়াটা অর্থহীন বলেই মনে হয়। যে উপায়ে উচ্চ শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের মানসিকতায় সূক্ষ্ম হিন্দুত্ববাদ আর ইসলামোফোবিয়া ধরা যায়, বিশ্লেষণ করা যায়, সেই একই উপায়ে এমএনরেগা নির্ভর একশ দিনের কাজ প্রত্যাশী কিন্তু সংখ্যার বলে সরকার-নির্ধারক আম জনতার নির্বাচনী পছন্দ বা অপছন্দকে মেপে ফেললে ভাবের ঘরে চুরি হয়, লাভ হয় না। অথচ, সংযুক্ত মোর্চাকে ভোটটা কিন্তু তাঁরাও দেননি। সেই না দেওয়াটাই শূন্যতার নির্ধারক হয়েছে, গুটিকয় নাগরিক ভোট নয়।

আসলে আব্বাস সিদ্দিকী কতটা মুসলমান, খারাপ মুসলমান না ভালো মুসলমান, তাঁর ফুরফুরা শরীফের ঐতিহ্য, হানাফি আর অন্যদের ভেদাভেদ, এসব কিছুই নির্ধারক ছিলো না। এমনকি, আব্বাস সিদ্দিকী আগে কী বলেছেন বা কতটা মৌলবাদী ছিলেন সেসব দেখিয়ে কোনো টিভি চ্যানেল যতই কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করবার চেষ্টা করুক বা না করুক, মানুষের মনে আব্বাস নয়, আব্বাসের সঙ্গে হঠাৎ এবং পূর্বাপর প্রসঙ্গহীন তড়িঘড়ি জোট নিয়ে প্রশ্ন ছিলো। রকম নিয়ে প্রশ্ন ছিলো বা আছে, বাম দলের যুক্তি শৈথিল্য নিয়ে প্রশ্ন আছে, পরিচিতি সত্তার রাজনীতি বা সাব-অল্টার্ন সম্বোধন নিয়ে নেই।

অত্যন্ত শিক্ষিত দল হিসেবে আমরা ঠিক কী করছি বা চাইছি, সেটা কেউ কিছুই বোঝেন না এই ভাবনা বোধহয় ঠিক নয়। বরং ভাবা দরকার কোনো একটা কাজ কেন করছি, তার একটা সুনির্দিষ্ট ইতিহাস বোধ নির্ভর বিশ্লেষনধর্মী ব্যাখ্যা সকলের কাছে আগে থেকে তুলে ধরবার প্রয়োজন বোধহয় বাম দল বলেই আরো বেশি করে ছিলো বা আছে। আলোচনা থিতু হতে দেওয়ার সময়ের দরকার আছে। যে জনতা ভোট দেয়, তার শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব বোঝার কোনো দায় কখনোই ছিলো না। সেটা বোঝা আর বাস্তবায়িত করার দায় একান্তই বামপন্থী দলগুলির, নির্বাচকের নয়। নির্বাচকের দায় সুস্থ জীবন যাপনের মাত্র। কাজেই সে বাম দলের পরিচিতি সত্তার রাজনীতিতে প্রবেশের যুক্তি নিয়েও যে একই ভাবে নিশ্চেষ্ট থাকবে, এবং হঠাৎ কেন এ কাণ্ড ভেবে অবাক হয়ে আরো অপরিচিত হয়ে উঠবে সেটাই স্বাভাবিক।

আব্বাস সিদ্দিকী ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মঞ্চে কী করবেন, কতটা পরিনমিত হয়ে উঠে আসবেন, বা আদৌ কোনোদিন সেভাবে আসবেন নাকি পুরনো ধর্মীয় মেহফিলের বক্তার জায়গাতেই ফিরে যাবেন, সে সিদ্ধান্ত নিতান্তই ওঁর নিজস্ব। সময় দিলে ওঁর নিজের কথাতেই শুধু মাত্র “হক বুঝে নেওয়ার রাজনীতি”র অন্যতম নেতা তিনি হয়ে উঠতে পারেন। আর সেরকম হলে অন্য দলের শিক্ষিত নেতাদের নাগরিক ডিসকোর্সের অনুমোদনে নয়, নিজের মাটির গন্ধের জোরেই ভারতীয় সেক্যুলারের অনন্য ঘরানায় এঁটে যাবেন। লোকে অনায়াসেই গ্রহণ করবে, সে ভোটেই হোক বা সাংস্কৃতিক আঙিনায়। কিন্তু মাত্র তিনমাসের দলীয় ইতিহাস কথায় কথায় ফতোয়া দেওয়া অতীতকে মুছতে যথেষ্ট নয়। যে যুক্তিতে যোগীর রাজনীতিকে পরিহার করেছে বাংলা, সেই একই যুক্তি যে এক্ষেত্রেও কিছুটা কাজ করেছে, সে কথা অনস্বীকার্য।

কিন্তু অন্যদিকে বাম দলের ক্ষেত্রে কিন্তু এই জোট শুধুই ধর্ম নিরপেক্ষতার নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ আর আইএসএফে শুধু আব্বাস নন বাকি দলিতেরাও আছেন, এমনতরো সোজা সাপটা তর্কে জেতার বিষয় ছিলো না। পরিচিতি সত্তার রাজনীতি, লিঙ্গ রাজনীতি, বা জাতপাতের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবিধ আচার আর প্রথা সর্বস্ব ভারতীয় সমাজকে দেখা, পড়া বা বিশ্লেষণ করার নতুন চেষ্টা কিন্তু বাম দলের অতিপরিচিত এবং প্রায় একরৈখিক শ্রেণী-নির্ভর বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গীর থেকে এক বিরাট অপসারন। ডিপারচার। প্যারাডাইম শিফটও বটে। কাজেই সেই ডিপারচারের একটা গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক apropos বা apology দরকার ছিলো।

সঙ্গে আছে আরেক সমস্যা। কোনো পরিস্থিতিতেই একটি বামপন্থী দল ক্লাস বাদ দিয়ে শুধু কাস্ট বা দলিত নির্ভর রাজনীতির আলোয় তার সংগ্রামের পথ ঠিক করতে পারে না। বিশেষ করে যতক্ষণ সে আন্তর্জাতিক কম্যিউনিস্ট পার্টির নীতি মেনে নিজেকে ভারতের কম্যিউনিস্ট পার্টি বলে, তা সে মার্ক্সবাদী বা মার্ক্স ও লেনিনবাদী, যাই হোক না কেন, ততক্ষণ তো নয়ই। সে রকম কিছু করতে গেলে হয় তাকে একান্তই “ভারতীয়” বামপন্থী দল হতে হয়, অথবা সুনির্দিষ্ট আলোচনা আর প্রকাশ্য বিতর্কের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের পরিবর্তিত অবস্থানকে জানান দিতে হয়। মোট কথা, নগর বা গ্রাম সব স্তরে এই পরিবর্তিত যুদ্ধনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতকে খোলসা করতে হয়। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির প্রতি যে দীর্ঘ উদাসীনতা, তাকে কাটিয়ে ওঠার একটা যুক্তিনিষ্ঠ পথরেখা আঁকতে হয়। নির্বাচনের আগে একটি রাজ্যে শুধু মাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার পট পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংস্কৃতি নির্ভর পরিচিতি রাজনীতির হাত ধরাকে মানুষ নেয়নি বলেই মনে হয়।

শ্রেণী সংগ্রামের নীতি মেনে চলা দলকে শুধু পরিচিতি রাজনীতির পরিসরে ঢুকলেই চলে না, উচ্চতর কোনো অবস্থান, কোনো “supra-caste belonging”, আম্বেদকরের স্বরে স্বর মিলিয়ে অ্যানাইহিলেশন অব কাস্ট বা কোনো “ideal of a ‘fraternity of equal citizens'” [Prabhat Patnaik. Caste, Community and Belonging. Social Scientist, Vol. 45, Nos.1-2, Jan – Feb, 2017. pp. 77 (73 – 79)] প্রভৃতির কথা আগে বলে নিতে হয়। বিতর্ক থেকে যুক্তি সহজ এবং মেঠো হয়। সরল হয়। বোঝাতে সুবিধে হয়। বুঝতেও। আর তখন শুধু প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রাখার অস্তিত্বের লড়াইয়ে দিনরাত ব্যাস্ত থেকে মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল দশায় পৌঁছে যাওয়া যে সাধারণ নির্বাচক, তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠলেও উঠতে পারে দলীয় নীতি বা পন্থার এই আভ্যন্তরীন বিবর্তন।

সাংস্কৃতিক যুক্তির আবহেই মাথায় রাখা দরকার যে ইওরোপীয় পরিভাষার সরাসরি অনুবাদের ফলে এক বিরাট ভাষিক সমস্যা আমাদের দেশের প্রায় সমস্ত বামপন্থী কথাবার্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। নির্বাচক আগেও এই ভাষা বোঝেনি। বোঝানো যায়নি। কারণ রাজনীতিতে মার্ক্সবাদ থাকলেও জমাট বাঁধা মুঠো যখন বাম দলের মিছিলেও ওপরে উঠেছে তখন জামার হাতার আড়ালে তাবিজ নজরে এসেছে। আঙুলে আংটি। সেখানে রাজনীতির কথা আর ভীড় বাড়ানোর দায়গ্রস্ত সমাজনীতিতে দেখেও না দেখে কুসংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার আপাত-বিরোধ চোখে পড়েছে। কিন্তু তবুও রুটি রুজি আর সামাজিক স্বস্তির প্রয়োজনে দ্বিধাহীন আনুগত্য দিয়েছে সে। বিপ্লবের বাণী না বুঝলেও প্রত্যয় বুঝেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো হাতের কথা হাজার শুনেও কোনোদিন চোখে দেখেনি। বরং জ্যোতিবাবু জিতে গেলে লক্ষ্মীপূজা বন্ধ হয়ে যাবে বলে সেই সাতগাছিয়াতেও বহুবার শুনেছে সত্তরে বা আশিতে বা নব্বইয়ে। আর তারপর যখন বলা হয়েছে যে ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করা কম্যিউনিস্টদের উদ্দেশ্য নয়, তখন ভোট দিয়েছে। ভাষিক সন্দেহ ছিলোই। তবুও সন্দেহ কাটিয়ে রাজনৈতিক যুক্তিতে কানেক্ট করতে চেয়েছে। পেরেছে। কিন্তু ভোট রাখার তাগিদে প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকার অতিদীর্ঘ কাল পরিসরেও যখন আঘাত না করার প্রতিজ্ঞা ধীরে ধীরে অ্যাড্রেস না করার কঠিন অভ্যেস এবং কার্যত এড়িয়ে যাওয়ায় পরিণত হয়েছে, তখন রাজনৈতিক দল হিসেবে মান্যতা থাকলেও সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ভাবে যে একটা আড় তৈরি হয়েই গেলো, আর যে কানেক্ট করা গেলো না, সেটাও তো বাস্তব। আজ আইএসএফের সাথে আচমকা জোট হওয়ায় সেই আকস্মিক অ্যাড্রেস করাটা নিতে মানুষের অসুবিধে হবেই। এই ট্রাস্ট ডেফিসিট কাটতে কিছুটা সময় দরকার।

যদি সত্যিই বাম দলগুলির ভেতর caste-tribe-gender-religious minority-culture-environment প্রভৃতি নিয়ে শ্রেণী ভিত্তিক ভাবনার সমগুরুত্বের চিন্তার প্রক্রিয়া সদর্থক অর্থেই শুরু হয়ে থাকে, তাহলে আজ বিধানসভা বাম শূন্য কিনা সে বিচার অবান্তর। আগ্রাসী বাজার পুঁজির উলঙ্গ নৃত্যের এই পচে যাওয়া ভরা-কোটালকে পর্যুদস্ত করতে ভারতীয় বহুভাষিক সমাজ-সংস্কৃতির জন্য পূর্ণমাত্রায় প্রাসঙ্গিক ও প্রায়োগিক একটি সর্বৈব দেশীয় বাম দল বা দলীয় অবস্থান ভীষণ প্রয়োজনীয়। আজকের বিধানসভায় বামশূন্যতা, যার সুস্পষ্ট কারণ হয়তো ছিলো, যদি আগামীর সেই প্রতিস্পর্ধী সম্পূর্ণ ভারতীয় বাম মডেলের আগমন বার্তা বয়ে আনে, তবে এই শূন্যতাকে স্বাগত জানাতেই হয়। সামাজিক হয়ে উঠবার সকালে প্রস্তুতির অভাবকে সমালোচনা করলেও এই শূন্যের মাঝে ঢেউ আছে বলেই ভাবতে ভালোবাসবো। ঢেউ রাজ্যে বা দলেই আটকে থাকবে নাকি সামগ্রিক ভারতীয় বামপন্থাকে দিশা দেখাবে, সে ইতিহাস সময় লিখবে বা মুছে ফেলবে। আপাতত, শূন্য একটি দাগ মাত্র। আর নতুন করে শুরু করবার জন্য, কখনো কখনো, “দাগ আচ্ছে হ্যায়” বইকি!

[লেখক – জলপাইগুড়িতে বাস। ময়নাগুড়ি কলেজের শিক্ষক।]

Facebook Comments

Leave a Reply