আসনসংখ্যা যখন শূন্য : রঞ্জন রায়

fail

ভূমিকা: চিন্তার দৈন্য

স্বাধীন ভারতে প্রথমবার এমন হোল যে বঙ্গের বিধানসভায়, কেন্দ্রের লোকসভায় একজনও বাঙালি কমিউনিস্ট প্রতিনিধি নেই।
বামপন্থীদের এই চরম বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়েও এ কথাই বলব যে যতদিন সমাজে বৈষম্য থাকবে, এক শ্রেণির মানুষের হাতে অন্য শ্রেণির মানুষের নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা অব্যাহত থাকবে, যতদিন সমাজের সব শ্রেণির মানুষ, সব সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষ দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে পারবে না, তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে, ততদিন বামপন্থী রাজনীতির প্রয়োজন থাকবে।

এখন কথা হচ্ছে এই পরাজয় কি খুব অপ্রত্যাশিত ছিল?

আমার মনে হয় না।

এর সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে কিছু বলব না কারণ তা’নিয়ে চর্বিত চর্বণ অনেক হয়েছে এবং হবে। আলোচনার সুবিধের জন্যে আমি এখানে বাম-আন্দোলনের প্লেস-হোল্ডার হিসেবে শুধু সিপিএমের পলিসি নিয়ে কথা বলব যেহেতু বঙ্গে এই দলটির নির্ধারিত রণনীতি ও রণকৌশল নির্বাচনের সময় অন্য ভাগীদার দলগুলোর উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রথা চলে আসছে।

যেমন, রণকৌশলে চারটে বড় ভুল।

এক, ওঁরা লড়াই করলেন ‘বিজেমূল’ বলে এক কল্পিত হাঁসজারু শক্তির বিরুদ্ধে। এঁদের ব্যঙ্গাত্মক শ্লোগান ‘নাগপুরের পদ্মফুল, বঙ্গে এসে তিনোমূল’ বাংলার ব্যাপক জনগণ গ্রহণ করেনি।

দুই, মমতার জনপ্রিয় রিলিফ প্রোগ্রামগুলো—করোনাকালে ‘দুয়ারে রেশন’, ’ফ্রি রেশন’, দু’টাকায় চাল, পাঁচ টাকায় ডিমভাত এবং মেয়েদের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী তথা মহিলাদের প্রতিনিধি করে পরিবারের জন্যে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড- নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং জনসাধারণের মধ্যে ‘ভিক্ষার দান’ বলে ব্যাপক খিল্লি করা হয়েছে। এঁরা বুঝতে অপারগ যে খাদ্য, শিক্ষা এবং চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া আধুনিক ওয়েলফেয়ার স্টেটের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। শিল্পোন্নয়ন চাই, কিন্তু সেটা এর প্রতিযোগী বা বিকল্প নয়। এরা খেয়াল করলেন না যে কেন্দ্রীয় সরকারের দেয়া তথ্যের হিসেবেই ভারতের জিডিপিতে রাজ্যগুলির যোগদানের তালিকায় বঙ্গের নাম ছয় নম্বর; গুজরাতের ঠিক পরে। এবং একশ’ দিনের কাজের খতিয়ান বা বিভিন্ন গ্রামীণ রোজগার প্রকল্পের ক্ষেত্রে বঙ্গের নাম সবচেয়ে আগে।

তিন, ওঁদের বিজেপিকে হারাতে আগে তৃণমূলকে হারানো প্রয়োজন বক্তব্যটি এই নির্বাচনে তাঁদের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে জনতার মনে সন্দেহের বীজ বুনেছে।
জনৈক ধর্মগুরুকে রাতারাতি সেকুলার ঘোষণা করে তার হাত ধরা, বিশেষ করে যাঁর কিছুদিন আগে করা মহিলাবিদ্বেষী মন্তব্য জনতার সামনে রয়েছে, এই সন্দেহে সার ও জল দিয়েছে। একজন ধর্মগুরু অসাম্প্রদায়িক হয়ে ব্যাপক জনগণের ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে সামিল হতেই পারেন। ভারতে বন্ধুয়া-মজদুর-মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা স্বামী অগ্নিবেশ, আশি-নব্বই দশকে কেরালায় মৎসজীবিদের অধিকারের আন্দোলনে যুক্ত ‘লিবারেশন থিওলজি’র সিস্টারেরা, অধুনা বিহারে খেটে খাওয়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে আশি বছরে জেলে বন্দী স্ট্যান স্বামী এর উজ্বল উদাহরণ। কিন্তু সেই আস্থা অর্জন করতে হয় বিভিন্ন জনস্বার্থের আন্দোলনে সকারাত্মক অংশগ্রহণ করে। ঠিক নির্বাচনের আগে হঠাৎ নতুন পার্টি গঠনের ঘোষণা করে নয়।

চার, করাপশন প্রশ্নে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘চটিচোর, চালচোর’ ইত্যাদি বলে ক্যাম্পেন করা অথচ বিহারে যে দলটির মুখিয়া ব্যাপক করাপশনের প্রমাণিত অপরাধে জেলে আছেন এবং যাঁর পত্নী, পুত্রকন্যা সবাই রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে বিভিন্ন পদ শোভিতে করেছেন তাঁরই কনিষ্ঠ পুত্রের নেতৃত্বে যুক্তমোর্চায় অংশগ্রহণ করা। এই দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রশ্নকর্তাকে শত্রুশিবিরের লোক, লিব্যারাল ইত্যাদি বলে দেগে দেওয়া।
বিজেপি এতদিনে ‘সেকুলার’ শব্দটিকে গালির পর্যায়বাচী করে ফেলেছে। বড় বাম দলের লোকজন কবে থেকে যেন ‘লিব্যারাল’-কে অপশব্দ বানিয়েছে। আসলে এ’সবের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অহংকার এবং বুশ/ট্রাম্পের মত ‘আমার মতে সায় না দিলে তুমি আমার শত্রু’ এই ফ্যাশিস্ত দর্শন।

পাঁচবছরে একবার গর্জে ওঠা

গত এক দশক ধরে, ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২১ সালে নির্বাচনের ঠিক আগে ব্রিগ্রেডে চোখে পড়ার মত জমায়েত করে উদ্বেলিত হয়ে ভাবা যে এবারে তো ক্ষমতায় আসছি, ‘একটা চান্স তো দেখতে পারছি’—আর বাকি চারবছর মাঠেঘাটে কারখানায় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে গ্রাসরুট লেভেলে আন্দোলনের বদলে মিডিয়ায় বক্তব্য দেওয়া – এর পরে সাধারণ জনগণ কী করে বিশ্বাস করবে? কোন সন্দেহ নেই যে আমফানের দুর্যোগের সময় সরকারি তন্ত্রের রিলিফ দেয়ায় ব্যর্থতার সময় বাম যুবদের সক্রিয় উদ্যোগে গঠিত রেড ভলান্টিয়ার / শ্রমজীবি ক্যান্টিন জনগণের অকুন্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মুশকিল হচ্ছে এঁরা মানবিক সেবা প্রদানের তরীতে চড়ে ভোট – বৈতরণী পার হবেন ভাবছিলেন। সেই আশা অপূর্ণ থাকায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভক্তকুল ‘অকৃতজ্ঞ’ জনতার উদ্দেশে পিত্তবমন করে চলেছে।

কিন্তু জনগণ কি রেডক্রস বা রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রমকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে ভোট দেয়?

কমিউনিস্ট পার্টি ভোট চায় তাদের শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিতে। শ্রমিক শ্রেণীর এই সবচেয়ে বড় দলটি গত বছর সংসদে বিনা বিতর্কে পাশ হওয়া চারটে সংশোধনী শ্রম-আইনের বিরুদ্ধে কলে কারখানায় কোন আন্দোলন করেছে? কীভাবে মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট, আট ঘন্টা কাজের সময় এবং ছাঁটাই ও লকডাউনের বিরুদ্ধে মজদূরের সুরক্ষা কবচগুলো কেড়ে নেওয়া হোল এবং তার দূরগামী পরিণাম – এসব নিয়ে শ্রমিকদের সচেতন করার কোন প্রোগ্রাম নিয়েছে?

সুযোগ ছিল বঙ্গের কৃষকদেরও ফসলের মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস বা এম এস পি কতটা লাইফবেল্টের কাজ করবে সেটা বুঝিয়ে কৃষি রিফর্মের তিন আইন এবং শ্রমিক বিরোধী চার আইনের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষকের যুক্ত আন্দোলন গড়ে তোলার। তাঁরা সেই পথে হাঁটেন নি। ছ’মাসে ন’মাসে একটা কয়েক ঘন্টার ভারতব্যাপী বন্ধ যে গণ-আন্দোলনের হিসেবে বহুদিন ধরে জং-লাগা অকেজো হাতিয়ার হয়ে গেছে সেটা তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না।

আমরা দেখেছি কেজরিওয়ালের ‘আপ’ পার্টি দিল্লিতে ২০১৯’র নির্বাচনে সবক’টি সীটে গোহারা হারার পরও নিয়মিত জমীনী-স্তরে কাজ করে গেছে এবং কিছু কল্যাণকারী প্রোগ্রাম রূপায়িত করেছে। যেমন-সরকারি স্কুলে শিক্ষার মানোয়ন্নন, সরকারি হাসপাতালে সুলভে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং মেয়েদের যাতায়াতের সুরক্ষা, বিজলি ও জল গরীবদের জন্যে ফ্রি করে দেওয়া ইত্যাদি; যার ফলে মাত্র দু’বছর পরে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসীন দলটির বিশাল অর্থবল, লোকবল নিয়ে হাঁই ভোল্টেজ প্রচারের মোকাবিলা করে ওদের ভালভাবে পরাজিত করেছে। আমরা কি এর থেকে কিছু শিখব?

ডক্টর রণবীর সমাদ্দারের ‘ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ’ (সি আর জি) ২০১৯ সালে দিল্লি, বঙ্গ, তামিলনাড়ু, ছত্তিশগড় ইত্যাদি ছ’টি রাজ্যে এইধরণের কথিত ‘পপুলিস্ট’ প্রোগ্রাম নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল, সহায়তা দিয়েছিলেন জার্মানীর ‘রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশন’। তাতে অধ্যয়নের বিষয় ছিল তামিলনাড়ুর ‘আম্মা ক্যান্টিন’, দিল্লির কাজের মেয়েদের বাসে ফ্রি রাইড, ছত্তিশগড়ে দু’টাকা কিলো চাল এবং বঙ্গের কন্যাশ্রী ইত্যাদি প্রোগ্রামের জনমোহিনী ক্ষমতা কতখানি এবং এরা গরীব মানুষের কঠিন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ঠিক কীভাবে সহায়ক হয় ও এগুলো ভোটের সময় কতটুকু প্রভাব ফেলে? উত্তর পাওয়া গেল- ‘পজিটিভ’।
এহ বাহ্য। কথা বলতে চাই চিন্তার স্থবিরতা নিয়ে।

চিন্তার দৈন্য: ফ্যাসিস্ত শক্তির বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট প্রসঙ্গে

জার্মানিতে হিটলারের নির্বাচনী উত্থান এবং তারপর রাষ্ট্রশক্তিতে ক্ষমতা সংহত করার ক্রমিক ছবিটি আমার মনে হয় আজ প্রাসংগিক।
ঠিক একশ’ বছর আগের জার্মানিতে শ্রমিক শ্রেণীর দুটো পার্টি ছিল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বা এসডিপি এবং কমিউনিস্ট পার্টি বা কেপিডি। ১৯২৮ সালে পার্লিয়ামেন্টে হিটলারের নাজিরা ছিল ১২, কমিউনিস্ট ৫৪ এবং এসপিডি ১৫৩। কিন্তু ভাইমার রিপাবলিকের পতন, দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম, বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভার্সাইয়ের অসম অপমানজনক চুক্তির খেসারতের বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রচার করে লোকজনকে স্বপ্ন বেচে নাজিরা প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয় এবং ১৯৩২ সালে তাদের সীট বেড়ে হয় ২৩০। আর ওই চার বছরে ভোটের শতাংশ ২.৬ থেকে বেড়ে হয় ৩৭.৪।

এর পরের ইতিহাস, রাইখস্টাগ অগ্নিকান্ডের ষড়যন্ত্র, সংবিধান সংশোধন করে হিটলারের চ্যান্সেলর পদ হাতড়ে ফ্যুয়েরার হয়ে ওঠা –সবাই জানেন। এবার ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে ছকটা মিলিয়ে নিন।

সংবিধান থেকে মুহুর্মুহু ‘সেকুলার’ শব্দটি বাতিলের দাবি, ফেডারাল স্ট্রাকচারে ক্রমাগত পরিবর্তন, অনুপ্রবেশের ধুয়ো তুলে মাইনরিটিকে ঘুনপোকা বলা, কোটি কোটি চাকরি ও করাপশন দূর করার আশ্বাস এবং পার্লিয়ামেন্টারি ফর্মের বদলে আমেরিকার মত প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অফ গভর্ণমেন্টের ওকালতি – অশুভ সংকেতগুলো কি স্পষ্ট নয়?

আর একটা কথা ক্রমাগত বঙ্গের বামপন্থী মহলে বলা হয়—আমাদের এখানে ধার্মিক মৌলবাদ বা ফ্যাশিস্ত ঘৃণার দর্শন জমি পাবে না, এসব বঙ্গভূমিতে হতে পারে না। আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের মাইকেল, বিবেকানন্দ, ‘যত মত, তত পথ’ ঐতিহ্য, আমাদের সত্যজিৎ, আমাদের বামসংস্কৃতির আবহাওয়া—এরা উত্তর ভারত থেকে আমদানি করা অন্ধ জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচের কাজ করবে।

আমরা ভুলে যাই গ্যেটে, শিলার, বেঠোফেন, কান্ট, হেগেল, আইনস্টাইন এবং মার্ক্সের ঐতিহ্যে লালিত জার্মানির বিদ্বজন ও বুদ্ধিজীবারাও তাই ভেবেছিলেন।

তবু ১৯৩২ -৩৩শে হিটলারের উত্থান ঠেকানো যেত যদি সেই সময় শ্রমিকশ্রেণীর সমর্থনপুষ্ট দুটি পার্টি সোশ্যাল ডেমক্র্যাট এবং কমিউনিস্টরা জোট বাঁধতেন। সম্ভব হয়নি দুটো কারণে:-
এক.  কয়েকবছর আগে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ফলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক হয়ে গেছিল সাপে-নেউলে। জার্মান কমিউনিস্টদের দুই শ্রেষ্ঠ নেতা কার্ল লাইবনেখট ও রোজা লুক্সেমবার্গ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের হাতে নৃশংস ভাবে নিহত হয়েছিলেন।

দুই. কমিন্টার্ন থেকে সমঝোতার বিরুদ্ধে স্তালিনের নির্দেশ। স্তালিন তখন দলের মধ্যে তাঁর প্রাক্তন কমরেডদের ত্রৎস্কি, বুখারিন, জিনোভিয়েভ এবং কামেনেভদের পরাস্ত করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলে ব্যস্ত—কুখ্যাত মস্কো ট্রায়াল মামলা। তারপর এত জল ঘোলা হওয়ার পর ১৯৩৫ সালে স্তালিনের নির্দেশে দিমিত্রভ যখন জার্মান কমিউনিস্টদের সেই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এবং অন্য সমস্ত হিটলারবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফ্যাসিবিরোধী ফ্রন্ট গঠনের নির্দেশ দিচ্ছেন ততদিনে রাইন নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। হিটলার শক্তি সংহত করে নিয়েছে। যদিও এই ফ্রন্ট গড়ার ব্যর্থতার দায় জার্মান কমিউনিস্টদের ঘাড়ে চাপল। কারণ স্তালিন কখনো কোন ভুল করতে পারেন না।

দেখুন, সিপিএম একই ভাবে তৃণমূলের হাতে ওদের দলীয় কর্মীদের উপর হামলার কথা বলছে। অভিযোগ সত্যি, কিন্তু আজকে প্রধান বিপদ কে? একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক মতাদর্শবিহীন রাজের মধ্যে সীমিত দল? নাকি হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে দেশব্যাপী সংগঠন ও কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে কয়েক দশক ধরে অহরহ ঘৃণার বীজ বুনতে থাকা ক্যাডার বেসড দলটি? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখুন।

সাধু সাবধান, ফির কহি কর অবধান!

চীনের মাওয়ের উদাহরণ দেখুন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২৮-২৯শে কমিন্টার্নের পাঠানো দুই প্রতিনিধি মাইকেল বরোদিন ও মানবেন্দ্রনাথ রায়ের পরামর্শের তোয়াক্কা করেনি। আবার ১৯৩৭ সালে জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করার পর মাও কুয়োমিন্টাং নেতা চিয়াং কাইশেকের সঙ্গে জাপ-বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। মনে রাখতে হবে এর মধ্যে চিয়াং-এর কুয়োমিন্টাং সৈন্য মাওয়ের কমিউনিস্টদের সমানে ‘ঘেরাও ও খতম’ অভিযানের মাধ্যমে পর্যুদস্ত করে ফেলেছে। তাড়া খেতে খেতে যতটুকু বেঁচেবর্তে ছিল তারা গিয়ে দেশের এক কোণে ইয়েনানের গুহায় আশ্রয় নিয়েছে।

তখন চিয়াং-এর কোন গরজ ছিল না। কিন্তু মাও চিয়াংয়ের এক জেনারেলের সাহায্যে তাঁকে অপহরণ করিয়ে সিয়ানে উড়িয়ে এনে সমঝোতায় হস্তাক্ষর করতে বাধ্য করেন।

সিপিএমের সমর্থকরা বলেছেন -মমতার দিক থেকে কোন প্রস্তাব নেই, আমাদের কিসের গরজ? মনে হয় গোটা দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এবার বিজেপির রাজ্য দখলের অশ্বমেধের ঘোড়া আটকানোর রণনীতিগত মহত্বকে সিপিএম আবশ্যক গুরুত্ব দেয়নি। আজকে রামে, ২০২৪শে বামে – চাইলেও হয় না। কমিউনিস্ট রাজনীতিতে এমন শর্টকাট চলে না।

চিন্তার দৈন্য (২) -আন্তর্জাতিক কম্যুনিস্ট আন্দোলন প্রসঙ্গে

প্রতিটি পরাজয়ের পর সব রাজনৈতিক দলের মত বড় বাম দলটিও আত্মবিশ্লেষণ করে থাকে। কিন্তু তার প্রকৃতি কী রকম?
গত এক দশক ধরে বামশক্তির ক্রমাগতঃ ক্ষয়ের কোন বিশ্লেষণ কি গত ১০ বছরে পলিটব্যুরোর বিভিন্ন পর্যালোচনা থেকে পাওয়া গেছে? মিলেছে কি কীভাবে তা ঠেকানো যাবে, সেই পথনির্দেশ? দল নিয়মমাফিক পর্যালোচনা নিশ্চয়ই করে। কিন্তু তা একান্তভাবেই দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্তরের পদাধিকারীদের নিয়ে করা হয়। দলীয় সংগঠনের বাইরে যাঁরা সমর্থক বন্ধু, তাঁদের ওই আলোচনায় অংশ নিতে দেওয়া হয় না। ফলতঃ, অনিবার্যভাবেই নেতাদের গা বাঁচিয়ে একটা দায়সারা রিপোর্ট তৈরি করেই দল তার দায় ঝেড়ে ফেলে। তাই প্রশ্নগুলি অমীমাংসিতই থেকে যায়। পরাজয়ের নৈতিক দায়িত্ব কেউ নেয় না। এবারেও নেবে না।

এটা শুধু ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২১ পর্যন্ত নির্বাচনী বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক নয়। আরও বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, সৎ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে দলের সর্বস্তরে প্রবল অনীহা।

একটু পিছিয়ে গিয়ে ১৯৯১ সালের দিকে তাকানো যেতে পারে। ওই বছরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অস্তিত্ব লোপ পায়। চীনে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় থেকে গেলেও তারা অর্থনীতির ক্ষেত্রে ধনতন্ত্রের পথে চলতে শুরু করে, এবং সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং স্বৈরতান্ত্রিক পথ আঁকড়ে থাকে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্নব থেকে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক ও অন্যান্য মেহনতী মানুষের সামনে একটা নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল, ধনতান্ত্রিক দুনিয়ার বিপরীতে এক সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার আবির্ভাব ঘটেছিল, তা মাত্র ৭৪ বছরের মধ্যে তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল, কেন? এই প্রশ্নটির কোন বিস্তারিত ব্যাখ্যা আজও বাকি রয়েছে।

না, দুনিয়াজুড়ে বামপন্থীদের এই বৃহত্তম ট্র্যাজেডির পরেও ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতো পণ্ডিতদের সুরে সুর মিলিয়ে End of History বা সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস ধনতন্ত্রে এসেই থমকে যাবে বলে উল্লাস করার কারণ দেখি না। বরং মনে করিয়ে দিতে চাই ইতিহাসের মাপকাঠিতে এই ৭৪ (১৯১৭ থেকে ১৯৯১) বছর কোনো বড় সময় নয়। আবারও ফরাসি বিপ্লবের বাঁকবদলের দিকে তাকালেই কথাটা স্পষ্ট হয়।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী পার্টির মধ্যে এ নিয়ে সত্যিকারের চিন্তাভাবনা হয়েছে কি? বলতে বাধ্য হচ্ছি, – না হয়নি। সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমী দুনিয়ার চক্রান্তের তত্ত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু যেটা স্বীকার করা হয় না তা হল, কমিউনিস্ট পার্টির একনায়কতন্ত্রের ফাঁসে কী করে দেশের মানুষ, বিশেষ করে শ্রমিক ও অন্য মেহনতি মানুষের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের দলদাসে পরিণত করা হয়েছিল। স্বীকার করা হয় না, রাশিয়ায় “সমাজতন্ত্র নির্মাণের” নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কীভাবে বন্দী করে সাইবেরিয়ায় খনিতে, জঙ্গল থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করতে দাসশ্রমিক হিসাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, কী ভাবে প্রচন্ড শীতের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, এবং পার্টির বিরোধিতা করার মিথ্যা অভিযোগে অসংখ্য নেতা ও কর্মীকে গুপ্ত পুলিশ হত্যা করেছিল, সে ব্যাপারে ইউরোপের কমিউনিস্টরা অবহিত থাকলেও এ নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট মহলে কোনো চর্চাই হয়নি।

বিস্ময়কর হলেও কোনো সন্দেহ নেই যে ফরাসি বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লব, তারপরে চিন বিপ্লব, – মানবসভ্যতার ইতিহাসের অগ্রগতির পথ। কিন্তু কী করে রুশ বিপ্লবে পৌঁছে মানুষ ফরাসি বিপ্লবের অর্জিত অধিকার (ব্যক্তি স্বাধীনতা) হারিয়ে বসল, তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করতে বা ভাবনাচিন্তা করতে কমিউনিস্টদের দেখা যায়নি। একটা বিপ্লবের অর্জিত সুফল (এক্ষেত্রে, ব্যক্তিস্বাধীনতা) পরের বিপ্লবে যদি হারিয়ে যায়, সেটা কি অগ্রগতি? নাকি, পশ্চাদপসরণ? লেনিনের “এক পা আগে, দুই পা পিছনে”র এরকম অমোঘ উদাহরণ আর পাওয়া কঠিন।

এ ব্যাপারে তাদের সহায়ক হয়ে ওঠে মার্কস এবং লেনিনের দুটি তত্ত্ব – শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব (Dictatorship of Proletariat) এবং গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা (Democratic Centralism)। সর্বহারার একনায়কতন্ত্র যে কার্যত অচিরেই প্রথমে সর্বহারার দলের একনায়কতন্ত্রে (এ ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টি) পরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে দলের ক্ষমতাসীন চক্রের একনায়কতন্ত্রে পর্যবসিতহয়ে যায়, তা রাশিয়ায় স্তালিনের নেতৃত্বে এবং চিনে মাও জে দংয়ের নেতৃত্বে দেখা গিয়েছে।

এই সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের আর একটি অমোঘ হাতিয়ার বিপ্লবী ন্যায় বা Revolutionary Justice। এর নামে নিজের দেশের নাগরিকদের (তারা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হতে পারে, না-ও হতে পারে) বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য কালা কানুন চালু করা।

স্তালিনের আমলে রাশিয়ায় যার বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ হত, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের দায়িত্ব নিতে হত, আর পুলিশ অত্যাচার করে যে স্বীকারোক্তি আদায় করত, আদালত সেটাই অম্লান বদনে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করত। স্তালিনের সমসাময়িক বলশেভিক নেতাদের অনেককেই এ ভাবে বিচার করে (মস্কো ট্রায়াল ১৯৩৬- ১৯৩৮) হত্যা করা হয়েছিল। আমাদের দেশেও হুবহু না হলেও এরকম কিছু আইন (যেমন UAPA এবং Sedition Act) রয়েছে, যেখানে বিনা বিচারে বন্দী করা ও নিরপরাধ প্রমাণের দায় অভিযুক্তের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায়।

এর মেঠো প্রয়োগ আমরা দেখেছি চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় লিউ শাও-চি (তৎকালীন রাষ্ট্রপতি), সাহিত্যিক লাও চাও (রিকশাওলা উপন্যাসের লেখক) এবং অন্য অনেক বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি ও অন্য চিন্তার কমরেডদের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে অপমানিত করা এবং সাধারণ ক্যাডারদের উস্কে দিয়ে তাদের কথিত স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্যে শারীরিক নির্যাতন করা। এর দেশি সংস্করণ কয়েক দশক ধরে ছত্তিশগড় এবং অন্যত্র মাওবাদীদের ক্যাঙারু কোর্টে আকচার দেখা গেছে।কাম্বোডিয়ায় খমের রুজদের কীর্তিকলাপের কথা নাই তুললাম।

এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে একুশের দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। ক্যাডারদের শিক্ষিত করা যাবে না।

চিন্তার দৈন্য: রাষ্ট্র, ধর্ম, জাতপাত, শ্রেণী
ধর্ম ও রাষ্ট্র

ভারতের মত প্রাচীন এশিয়াটিক সমাজে ধর্মের শেকড় কতটা গভীরে সেটা বুঝতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। দুই দশক আগে শুরু হওয়া রামমন্দির আন্দোলনের ফলে খেটে খাওয়া মানুষেরাও বিভক্ত হয়ে গেল, এবং ধর্ম, উগ্র জাতীয়তা ও রাষ্ট্রবাদের মোহক মিশ্রণ এমন একটি দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বিপুল সমর্থন দিয়ে পাঠাল স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে যারা প্রান্তিক অবস্থানে ছিল।
কার্ল মার্ক্স তাঁর “ক্রিটিক অফ হেগেল’স ফিলজফি অফ রাইট” প্রবন্ধে বলেছিলেন-—”ধর্ম হল নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস ; হৃদয়হীন দুনিয়ার হৃদয় এবং আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা। এ হল জনগণের আফিম”।

আমরা শেষ দুটো শব্দকে প্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে বলে বেরিয়েছি—ধর্ম হোল নেশার জিনিস, কাজেই পরিত্যাজ্য। কিন্তু প্রেক্ষিত দেখলে বোঝা যায় মার্ক্সের চোখে ধর্ম শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শোষণের তীব্রতায় ত্রস্ত ব্যতিব্যস্ত মানুষকে বাঁচার সাময়িক অক্সিজেন যোগায়। মনে রাখতে হবে মার্ক্সের সময়ে আফিম চিকিৎসায় বেদনানিরোধক বা পেইন কিলার হিসেবেও ব্যবহৃত হত। গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথস’ নাটকে আশাহীন মানুষকে আশ্বাস জোগানো লুকা চরিত্রটি মনে করুন। আবার ধর্ম বাস্তব দুনিয়ার বাস্তব বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার বদলে কাল্পনিক সমাধান দিয়ে শুধু তাৎকালিক উপশম করায়; আফিমের মত পেইন কিলারের কাজই তো তাই।
একই ভাবে ভারতে কবীর, চৈতন্য এবং ছত্তিশগড়ের সতনামী আদি ধর্মীয় আন্দোলনের আড়ালে যে নিপীড়িতের প্রতিবাদ ও কৌমী চেতনা প্রচ্ছন্ন থাকে তা’ নিয়ে আমরা অচেতন। অবশ্য দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঝায়ের মত অধ্যাপকদের কাজ ব্যাতিক্রমী। কিন্তু তারপর?

মার্ক্সের উপরোক্ত উদ্ধৃতিটিতে স্পষ্ট – মানুষ চাইছে ধর্ম বা ঈশ্বরের কাছে ন্যায়বিচার। তার বদলে করছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ— ‘মেলাবেন, তিনি মেলাবেন’।

আজ একুশ শতকে ওই উদ্ধৃতিতে ‘ধর্ম’ শব্দটির জায়গায় বসিয়ে নিন ‘রাষ্ট্র’। দেখতে পাবেন আমরা সব দুঃখের নিদান হিসেবে ভগবানের জায়গায় রাষ্ট্রকে। আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা এবং তার ঔচিত্যের যুক্তি আমরা শিখেছি পাশ্চাত্ত্য থেকে। কিন্তু উনিশ শতকের প্রুধোঁ, বাকুনিনের মত নৈরাজ্যবাদী দার্শনিকের সঙ্গে মার্ক্সও চাইতেন ঈশ্বর ও রাষ্ট্রের বিলোপ। তাঁরা রাষ্ট্রের নিপীড়নের শক্তির এবং স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার সম্ভাবনার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। ভাবতেন – স্বেচ্ছায় গঠিত সিভিল সোসাইটির সংগঠন এবং জনতার মিলিশিয়া রাষ্ট্রের পরিবর্ত হবে। মানবসমাজ কাল্পনিক সমাধানের বদলে সমস্যার বাস্তবিক সমাধান খুঁজবে। নির্ণয় নেবার ক্ষমতা অন্য কোন শক্তিকে—ঈশ্বর বা রাষ্ট্র – অর্পণ করবে না ।

অবশ্যি মার্ক্সীয় চিন্তাধারায় রয়েছে – সমাজতন্ত্রের পর রাষ্ট্রের ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গিয়ে মিলিয়ে যাওয়া। তাই অনেক কম্যুনিস্ট ভেবেছিলেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষয় শুরু হয়ে গেছে। ১৯৩১ সালে সাম্যবাদীদের পত্রিকা লেবার মান্থলি লিখল – আজকের সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রের ‘মিলিয়ে যাওয়ার’ লক্ষণ স্পষ্ট।

কিন্তু ছ’মাস পরে রাশিয়ার কাউন্সিল অফ পিপলস কমিসার্স এর চেয়ারম্যান মলোটভ ওই পত্রিকাতেই লিখলেন যে শ্রেণীসংগ্রাম শেষ হয়নি বরং তীব্র হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্র এখন থাকবে।
এই যুক্তিতে আজও রাষ্ট্র রয়েছে এবং দিনের পর দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি পুতিন ২০০০ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন । যখন ছ’লাখ এর বেশি নাগরিক ওদেশে করোনায় আক্রান্ত, তারই মধ্যে গণভোট হল তাঁকে ২০৩৬ পর্য্যন্ত টিকিয়ে রাখা যায় কিনা সেই প্রশ্নে।

এ ব্যাপারে এশিয়াটিক রাষ্ট্রগুলো এককাঠি সরেস। এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে এক একজন করে রাষ্ট্রনায়কের মানসমূর্তি যা প্রায় ভগবানের সমান। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনায়ক এক এবং অভিন্ন। তাঁকে প্রশ্ন করা মানে ব্লাসফেমি, এখানে রাষ্ট্রদ্রোহ বা দেশদ্রোহ। চীন, নর্থ কোরিয়া থেকে শুরু করে ভারত—শুধু ডিগ্রির তফাৎ। আমাদের দেশে ৪৬ বছর আগের ২৪শে জুন এমার্জেন্সির ঘোষণার পর সেই যে ‘ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা এন্ড ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া’ নামকীর্তন শুরু হল তার গুঞ্জন আজও বর্তমান, শুধু নামরূপ বদলে যায় । একইভাবে ঈশ্বর এবং রাষ্ট্র এই একুশের শতকে হাত ধরাধরি করে রয়েছে। জনগণনায় দেখা যায় স্বঘোষিত নাস্তিকের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। কিন্তু ব্যাপক জনমানসে তার প্রভাব অতি নগণ্য। আমার কিছু পরিচিত আর এস এস বন্ধুরা বলেন এবং লেখেন—নমো রাষ্ট্রদেবায়!

ভারতে শ্রেণী ও জাতি

শিল্পোন্নত ইউরোপে উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে উৎপন্ন ‘শ্রেণী’ ছিল সমাজের বেসিক ইউনিট। ভারতের সমাজকে বুঝতে এই ধারণাটি কতটুকু কাজে আসে? এখানে বিহার থেকে দুর্গাপুরে কাজ করতে আসা শ্রমিকটি ভাবে কীভাবে কিছু পয়সা বা বার্ষিক বোনাসের টাকা নিয়ে নিজের গ্রামে কিছু জমি কিনবে। সে যদি উঁচু জাতের হয় তো সোনায় সোহাগা। আমরা জাতির ব্যাপারে চোখ বুঁজে দেখতে পাইনি যে দলিত জাতির লোকজন আসলে দু’ভাবে শোষিত। প্রথমতঃ, অর্থনৈতিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে শ্রম বেচে। দ্বিতীয়তঃ দলিত সমাজের সদস্য হয়ে সমাজে কিছু অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং অপমানিত হয়ে।

১৯৭৮-৭৯ সালে এ’নিয়ে ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির পাতায় বিরাট বিতর্ক হয়েছিল। তাতে রণদিভে, অজিত রায় প্রমুখ সিপিএমের তাত্ত্বিকরা জাতপাতের কথা উড়িয়ে দিয়ে শ্রেণী বিশ্লেষণকে আঁকড়ে ধরে থাকার ওকালতি করেছিলেন। বিপরীতে ভারতের প্রেক্ষিতে জাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেবার কথা যাঁরা বলেছিলেন তাঁদের মধ্যে পূরণ চাঁদ জোশী, শরদ পাতিল এরা ছিলেন অগ্রগণ্য। কিন্তু এই বিতর্ক ক্যাডার স্তরে নিয়ে যাওয়ার কোন উদ্যোগ দেখা যায় নি। তাহলে আম্বেদকরবাদীদের সঙ্গে স্বাভাবিক ঐক্য হয়ে হিন্দুত্ববাদীদের অনেকটা আটকানো যেত।

মহিলারাও একই ভাবে দু’ধরণের শোষণের স্বীকার। আমরা দলিত ও মহিলা দু’জনকেই সান্ত্বনা দিই যে একটু ধৈর্য ধর, সমাজতন্ত্র কায়েম হলেই এই দুই ধরণের শোষণ গায়েব হয়ে যাবে।

শ্রমিক ও কৃষক

আরেকটি কথা। বাম ট্রেড ইউনিয়নের প্রভাব ফর্মাল এবং অরগানাইজড সেক্টরের শ্রমিকদের মধ্যে সীমিত। অথচ ভারতের শ্রমশক্তির ৮৫% থেকে ৯০% আছেন ইনফর্মাল সেক্টরে। এদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলা বা এদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরব হওয়া বিশেষ চোখে পড়ে না।

আমরা কৃষকদের ক্ষেত্রে সেই কয়েক দশক আগের অপারেশন বর্গার পরে আর কোন স্ট্রাকচারাল পরিবর্তনের কথা ভাবি নি। আজ সেই ভাগচাষীদের তৃতীয় প্রজন্ম গ্রামের সক্রিয় যুবাশক্তি। তাদের অধিকাংশই কৃষক থাকতে চায় না। একটা বড় কারণ বঙ্গের অধিকাংশ কৃষিজোতের আয়তন ০.৫ একরের কম, যা অর্থনৈতিক ভাবে লাভপ্রদ নয়। সেখানে এই গরীব এবং ছোট চাষিদের নিয়ে সমবায় গড়ে তাদের আলগুলো মিলিয়ে দিয়ে ট্রাক্টরের প্রয়োগে কৃষিকে লাভপ্রদ বানানোর সম্ভাবনা ছিল। এ’নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা চোখে পড়ে না। আসলে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে আমরা আমলাতন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়েছি, খেটে খাওয়া মানুষদের ‘প্রজা’সুলভ আনুগত্যকে পাওনা ভেবে নিশ্চিন্ত রয়েছি।

আজ এটা চোখে পড়ে যে কেরালায় চল্লিশ বছরের নিয়ম পালটে পরপর বামদলকে সরকার গঠনে নেতৃত্ব দেয়া পিনারাই বিজয়ন ওখানকার অতি-দলিত ইজাভা জাতির। সদ্য প্রয়াত হয়েছেন গৌরী আম্মা তাঁর ১০২ বছর আয়ুতে। যিনি ১৯৫৭ সালে কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট সরকারে মন্ত্রী হয়েছিলেন। এবং কয়েক দশক ধরে ওখানে অর্থমন্ত্রী এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। বঙ্গে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বে দলিত ও মহিলারা কোথায়?

অর্থাৎ নির্বাচনে এমন বিপর্যয়, শুধু সীটের ভাঁড়ারে শূন্য নয়, প্রাপ্ত ভোটের প্রতিশতেও বিরাট ধ্বস, বর্তমানে বাম রাজনীতির সংকটের সূচক।

‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে’!

পরিশেষে বলতে চাইছি যে ইস্যু শুধু গত কয়েকটি এবং সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে কৌশলগত ভুল নয়, গলদ চিন্তার গভীরে । সমস্যা হল একটি স্থবির অবস্থান আঁকড়ে থেকে বদলে যাওয়া সময়কে, তার সমাজ ও অর্থনীতির জটিলতা সমেত বুঝতে না পারা বা বোঝার চেষ্টা না করা।

খেয়াল করা দরকার আজ গোটা বিশ্বে বামপন্থা – সে লাতিন আমেরিকার কোন কোন দেশে বা ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ায়- যে জনকল্যাণকারী রাষ্ট্রের রূপে দেখা দিচ্ছে তার কোনটাকেই একশ’ বছর আগের একমাত্র সোশ্যালিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিরূপ বলা যায় না। মার্ক্সের দ্বন্দ্বতত্ব অমন অনড় অচল জগদ্দলে বিশ্বাস রাখে না। কাজেই সদ্য জন্মানো শত্রুপরিবেষ্টিত রুশী প্রজাতন্ত্রের পার্টির জন্যে যে ডেমোক্র্যাটিক সেন্ট্রালিজমের নীতি শুরু হয়েছিল তা’ আজ অপ্রাসংগিক। স্বীকৃতি দিতে হবে বিভিন্ন মতের সঙ্গে সহযোগিতার সংস্কৃতিকে। একই সঙ্গে চালাতে হবে মতাদর্শগত সংগ্রাম কিন্তু মিত্রতামূলক আবহাওয়ায়।

মাওবাদীদের বাদ দিয়ে যাঁরা আজ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ায় বিশ্বাসী তাঁদের এক হতে হবে। সামনে বড় বিপদ। মহামারী সামলাতে ব্যর্থ দক্ষিণপন্থী শক্তি জনগণের হতাশা ও রোষকে অন্য পথে চালিত করার চেষ্টায় কী করবে বলা কঠিন; কিন্তু যাই করুক তার ফলাফল ভুগবে সাধারণ মানুষ, বিষবাষ্পে ছেয়ে যাবে আবহাওয়া। গণতন্ত্রের শ্বাস নেওয়া কঠিন হবে।

বুঝতে হবে সমস্যা বিজেপি নয়, সমস্যা হোল আর এস এস। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সমিতি, দুটো দলই গঠিত হয়েছিল ১৯২৫ সালে। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

একসময় বামেরা ত্রিপুরা নিয়েও নিশ্চিন্ত ছিলেন। আজ শুধু কেরালায় গিয়ে ঠেকেছে। কিন্তু ওখানেও কংগ্রেসের ভোট প্রতিশত এবং একটা সীট না পেয়েও বিজেপির ভোট প্রতিশত বৃদ্ধির দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে—জেগে ঘুমোলে কেউ বাঁচাতে আসবে না।

[লেখক – জন্ম কোলকাতায়; গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরিসূত্রে ছত্তিশগড়ের গাঁয়ে-গঞ্জে বনেবাদাড়ে কয়েক দশক ধরে ঘুরে বেড়ানো। অবসর জীবন কাটে বই পড়ে, লেখালিখি করে।
প্রকাশিত বই: বাঙাল জীবনের চালচিত্র (গাঙচিল); রমণীয় দ্রোহকাল (লিরিক্যাল); দেকার্তঃ জীবন ও দর্শন (অনুষ্টুপ); যে আঁধার আলোর অধিক (সৃষ্টিসুখ); ফেরারী ফৌজ (ঋতবাক); ছত্তিশগড়ের রূপকথা (ঋতবাক); শহুরে ছত্তিশগড়ের গল্পগুচ্ছ (ঋতবাক); ছত্তিশগড়ের চালচিত্র (সুন্দরবন প্রকাশন); আহিরণ নদী সব জানে (জয়ঢাক প্রকাশন); তিনটি রহস্য গল্প (জয়ঢাক প্রকাশন)।]

Facebook Comments

Leave a Reply