প্রেমে আর বিপ্লবে ব্যারিকেড করুক বাংলা : ঋদ্ধি রিত

fail

২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল একটা ঐতিহাসিক ফলাফল তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ঐতিহাসিক কারন স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা এই প্রথম বাম, কংগ্রেস শূন্য। যেখানে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে দেখা গেছে সারা ভারতে প্রথম আন্দোলনকে যিনি এক সুতোয় গাঁথতে ছেয়েছিলেন তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। কংগ্রেস ছিলো সেই সময়ের একটা বৃহত্তর মঞ্চ। যার মধ্যে থেকেই বহু কমিউনিস্ট ও সোশালিস্ট বিশ্বাসের মানুষরা অংশ গ্রহণ করেছিলেন।কমিউনিস্ট পার্টি ও ভারতের জাতীয় কংগ্রেস আদর্শগত ভাবে বরাবরই বিবদমান ছিল।কিন্তু আদর্শগত বিরোধকে সরিয়ে রেখে একটা সময় পর্যন্ত কমিউনিস্টরা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে কাজ করে গেছে।নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু অবিভক্ত বঙ্গের কংগ্রেসের সভাপতি থাকার সময়ে বঙ্কিম মুখার্জি অবিভক্ত কংগ্রেসের সহসভাপতি ছিলেন।সোমনাথ লাহিড়ী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সহসম্পাদক ছিলেন।অন্যদিকে ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ, কৃষ্ণ পিল্লাইয়ের মত নেতারা সোশালিস্ট কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ছিলেন।
১৯৪৭ সালের আপোষমূলক স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগের পাঁচ বছর ধরে কংগ্রেস আর কোন আন্দোলন করেনি।কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মুক্তি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর মুক্তির জন্য কমিউনিস্টরাই সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের ঐতিহ্যের অধিকারী।কমিউনিস্ট পার্টি নিজের প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রথমবার দাবি তুলে গোটা দেশে সাড়া জাগায়।এর চাপে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানায় প্রায় দশ বছর পর ১৯৩০ সালে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বছরগুলিতে অবিভক্ত সিপিআই ছিল একাধিক গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী।তেলেঙ্গানা, ত্রিপুরা ও কেরলে এই দল সশস্ত্র বিপ্লবে নেতৃত্ব দান করে।যদিও পরবর্তীকালে সংসদীয় গণতন্ত্রে যোগ দিয়ে পার্টি পরিত্যাগ করে সশস্ত্র বিপ্লবের পন্থা।কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি তৈরির আগে থেকেই কমিউনিস্টরা শ্রমিক, কৃষক ও যুবদের মধ্যে কাজ করা শুরু করে দিয়েছিল।১৯৩৪ সালে কমিউনিস্টরা সফলভাবে সারা ভারত টেক্সটাইল ধর্মঘট সফল করে তাদের ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে।আন্দামান ও নিকোবরের বন্দী মুক্তি তাদের অন্যতম দাবী ছিল।কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের অভ্যন্তরে থেকে ও কাজ করলেও তাদের শ্রেনীচেতনা ও বৈপ্লবিক সংগ্রাম কোনদিন বিসর্জন দেয়নি।কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টি তৈরি হওয়ার পরে দেশ জুড়ে কমিউনিজমের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং সফলভাবে অবিভক্ত বাংলা, অন্ধ্র, বোম্বাই ও কেরালাতে ধর্মঘট সংগঠিত করে।এছাড়া কলকাতায় চেতলা রেড গার্ড ষড়যন্ত্র মামলা করে কমিউনিস্টদের আটক করে ব্রিটিশ সরকার। মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম বিপ্লবের একজন অন্যতম বিপ্লবী নেত্রী কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ১৯৩৯ সালে জেল থকে মুক্ত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যান। আরেক চট্টগ্রাম যুগান্তর দলের সদস্য গণেশ ঘোষকে ১৯৩২ সালে তাকে পোর্ট ব্লেয়ারে সেলুলার জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৪৬ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যোগ দেন। ভগত সিং-এর দল হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আয়াসসিয়েশন (এইচআরএ) বিপ্লবী জীবন মাইতির মতো মানুষরাও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন।
বর্তমানের রাজ্যের শাসক দল নব্বইয়ের শেষে জন্ম গ্রহণ করেছে, ফলত সেই অর্থে তাদের কোন ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নেই। তেমনি সংসদীয় রাজনীতিতে এবারের একমাত্র স্বীকৃত বিরোধী শক্তি বিজেপির ইতিহাস খুললে দেখা যায় জনসঙ্ঘ থেকে এই দলের উৎপত্তি। ১৯৪৯-এরপরে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্যরা তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে, যেখান থেকে জন্ম নেয় জনসঙ্ঘ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের একটি দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী, আধাসামরিক ও বেসরকারি স্বেচ্ছা-সেবক সংগঠন।১৯২৫ সালে নাগপুরবাসী ডাক্তার কে. বি. হেডগেওয়ার একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনরূপে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন।উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা ও মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরোধিতা।
উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, আরএসএস নিজেদেরকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছে, কিন্তু তারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে নিজেদেরকে বরাবরই দূরে সরিয়ে রেখেছিল।ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তারা কোন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি।গান্ধি মুসলিমদের সাথে মিলে কাজ করতে চাইলে তারা সেটাকেও প্রত্যাখ্যান করে।সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার পরে কে. বি. হেডগেওয়ার আরএসএসকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ঐতিহ্যের সূত্রপাত ঘটান।ব্রিটিশবিরোধী বলে পরিগণিত হতে পারে এরকম যেকোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেই আরএসএস সযত্নে পরিহার করে চলত।আরএসএস-এর জীবনীকার সি. পি. ভিশিকার-এর কথায়, হেডগেওয়ার সরকার নিয়ে সরাসরি যেকোনো মন্তব্য করা এড়িয়ে গিয়ে কেবল হিন্দু সংগঠন নিয়েই কথা বলতেন।আরএসএস ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের তেরঙ্গাকেও পরিহার করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আরএসএসের নেতারা প্রকাশ্যে অ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা করতেন।১৯৪০সালে মাধব সদাশিব গোলবলকার যিনি হেডগেওয়ারের পরে আরএসএসের পরবর্তী সর্বোচ্চ প্রধান হয়েছিলেন, তিনি হিটলারের বর্ণ-বিশুদ্ধতা মতবাদে অনুপ্রাণীত ছিলেন।এম. এস. গোলবলকার ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে আরএসএসকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।তার দৃষ্টিভঙ্গিতে, আরএসএস ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নয়, বরং “ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করার মাধ্যমে” স্বাধীনতা অর্জন করার প্রতিজ্ঞা করেছে।এমনকি গোলবলকার ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন, এবং একে “প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি” বলে মতপ্রকাশ করেছিলেন।তার মতে এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীনতা আন্দোলনের সমগ্র কার্যধারায় ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে।গোলবলকার ব্রিটিশদের আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবার কোন সুযোগ দিতে চাননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশদের সকল কঠোর নীতিকে মেনে নেন।এমনকি সেসময় ব্রিটিশদের কথায় তিনি আরএসএসএর সামরিকবিভাগেরও পরিসমাপ্তি ঘটান।ব্রিটিশ সরকার বলেছিল, আরএসএস তাদের বিরুদ্ধে কোন নাগরিক অবাধ্যতাকে সমর্থন করেনি, আর তাই তাদের কোন রাজনৈতিক কার্যক্রমে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন নেই।১৯৪২ সালে মূলত কংগ্রেসের নেতৃত্বে হওয়া ভারত ছাড়ো আন্দোলন বা ১৯৪৬ সালে হওয়া ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হওয়া ভারতীয় নৌবিদ্রোকে সমর্থন বা অংশগ্রহণ কিছুই করেনি বরং এর বিরোধিতা করে আরএসএস। চিরকাল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা বরাবর পিছন থেকে ছুরি মেরেছে।
স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাস বলছে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দেয়। সেই সময় দেশ জুড়ে এক অশান্ত হাওয়া বয়েছে। সেই সময় একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু নির্দেশ দিয়ে ছিলেন দাঙ্গায় করতে এলে মাথায় গুলি করে দিতে। সেই ভয়েই কি তখন এ রাজ্যে দাঙ্গায় হয়নি? এই প্রশ্ন এখন আসে। কারণ আজ বিধানসভায় বিজেপির আসন সংখ্যা ৭৭। প্রগতিশীল বাঙালির মধ্যে অচেতন ভাবে সাম্প্রদায়িকতাটা ছিলো, এটা কি তারই প্রমাণ!
যদিও বিজেপির ০ থেকে ৩ এবং ৩ থেকে ৭৭ হবার পেছনে বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রচ্ছন্ন হাত আছে তার চিত্র পরিষ্কার। বিজেপি একটা নিওফ্যাসিস্ট দল। আর এই দলকে ডেকে এনে বাংলায় এক সাথে নির্বাচন লড়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। আবার বর্তমানের বাংলার বিজেপি দলের অর্ধেক হলেন প্রাক্তন তৃণমূল। তিনটে তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রীসভার মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই আছেন বা ছিলেন চোর, ধান্দাবাজ, জালিয়াতরা। আবার জাতীয় স্তরে বিজেপির মন্ত্রীসভার মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের হাতে লেগে আছে দাঙ্গার রক্ত। আসলে স্বৈরতন্ত্র ফ্যাসিবাদের একটা সিঁড়ি।
এই অবস্থা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে কি তবে নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে? এনিয়ে ভাবার ও আলোচনার সময় যে এসেছে তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। যে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন দশক বামপন্থীরা সরকার পরিচালনা করেছে, সেখানে আজকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ অপ্রত্যাশিত।সংস্কৃতি বা কৃষ্টি হলো জ্ঞান, বিশ্বাস, নৈতিকতা, শিল্প, আইন, আচার এবং সমাজের সামগ্রিকতা। সঠিক শিক্ষাই একমাত্র অস্ত্র যা সংস্কৃতির প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে সঠিক পথে নিয়ে চলে।
বাংলার সংস্কৃতিতে বিশ্বাস ও নৈতিকতাও আজ তলানিতে। উদাহরণ স্বরূপ বলাই যায় প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে সরকারি দলের চাল বা আমফান দুর্যোগে ত্রিপল চুরি। কিন্তু তার বিপরীতে দাঁড়িয়েও বামপন্থীরা তাদের ক্ষুদ্রতম পরিসর থেকে মানুষের কাছে পৌঁছেছে খাবার বা মাথা ঢাকার আচ্ছাদন দেবার তাগিদে। সেটা বামপন্থী দল বা বামপন্থী চিন্তার মানুষ উভয়ই।
হিন্দুস্থান টাইমসের অক্টোবর মাসের একটা রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালের আগস্টে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ২০০ শতাধিক ধর্ষণ এবং ৬০০-রও বেশি অপহরণ ঘটেছিল। রাজ্যপাল ধনখড় টুইটারে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং কলকাতা পুলিশকে ট্যাগ করেছিলেন, “২০২০ সালের আগস্টে রেপ -২২৩ এবং কিডন্যাপিংস -৩৩৯ নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের একটি উদ্বেগজনক অবস্থা নির্দেশ করে – উদ্বেগের কারণ”। রাজ্যে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের সংখ্যা, নারী ধর্ষণের তদন্তকারী অফিসারের বদলি, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ছুটে গিয়ে থানা থেকে দুষ্কৃতিদের জামিন করানো বা ২০১১র পরবর্তী সময়ে রাজ্য জুড়ে বিরোধীদের ওপর যে ‘vandalism’ চলেছে তা প্রমাণ করেছে আইন ব্যবস্থা ভেঙে পরেছে। এ ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশের যোগী রাজত্বের সাথে অমিল খুব একটা চোখে পড়ে না। এক সময় বাঙালিরা হিন্দি সিনেমাতেই এসমস্ত দেখতে অভ্যস্ত ছিলো।
টোটেম ও টাবু এই দুই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সংমিশ্রণের বাংলার সমাজ বৈচিত্র্য সর্বদাই পূর্ণ। কলকাতা বা হাওড়ার সাথে কখনই বীরভূম বা দিনাজপুরের সমাজ জীবন মেলে না। দার্জিলিং আর সুন্দরবনের মানুষের সামাজিক জীবন ধারণের মধ্যে খুবই কম মিল চোখে পড়বে। এক জায়গায় পার্বত্য জীবন নির্বাহ তো অন্যটা সামুদ্রিক উপকূলবর্তী। আরও ভালো করে দেখলে দেখা যাবে হাওড়া শহর ও গ্রামীণ হাওড়ার সমাজ জীবনের মধ্যেই প্রচুর অমিল আছে। বাঙালি জীবনবোধের উপর গড়ে উঠেছে আমাদের সংস্কৃতি।তবে বিভিন্ন সময়ে আমাদের সংস্কৃতি পরিবর্তন হয়েছে।মূলত বিভিন্ন সময়ে এদেশ শাসন করতে আসা বিদেশিদের দ্বারাই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি প্রভাবিত হয়েছে।ফলে বাংলা সংস্কৃতিতে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনও।এই যে এত বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে বহমান বাংলার সংস্কৃতি তা সাড়া ভারতে বিরল।
বাংলার আচার বা রীতি বহুকাল ধরেই ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণেই তার নিজস্ব স্বত্বা সৃষ্টি করেছে। যা ভারতের অন্যান্য স্থানের থেকে আলাদা। এখানে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সহ নানা জাতির ধর্মবর্ণের মানুষের বাস।তারা সবাই মিলেমিশে প্রাণ খুলে তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে।পরস্পরের সাথে তারা আনন্দ ভাগ করে নেয়, একের উৎসব অনুষ্ঠানে অন্যরা যোগদান করে।তাই আজও যখন ভারতের অন্য স্থানে নিরামিষ খাবার খেয়ে নবরাত্রি পালন করে, তখন আমরা নবমীতে বিরিয়ানি ছাড়া ভাবতে পারি না। বাংলার প্রধান প্রধান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত, ঋতু ভিত্তিক উৎসব, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, খেলাধুলা, সামাজিক প্রথা প্রভৃতি রয়েছে।ঈশ্বরে বিশ্বাস, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে গ্রামীণ কবিসাহিত্যিকরা লোকসাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।যেমন উত্তর ভারতের রাম ফর্সা হলেও আমাদের এখান কার রাম শ্যাম বর্ণ। আবার বাংলার কবি রামকে নয় বরং রাবণের ছেলে মেঘনাদকে তার লেখায় নায়ক করেছেন।
উত্তর ভারতের যা হোলি তা চৈতন্যের বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা দোল। সুলতানি শাসন ও ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলার রাস্তায় প্রথম জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ ভেঙে সেইসময় পিছিয়ে পরা, সর্বহারা মানুষদের নিয়ে যে নগর কীর্তন চৈতন্য করেছিলেন সেটাই ছিল বাংলার ‘প্রলেতারিয়েত’ দের প্রথম মিছিল। তিনি চেষ্টা করেছিলেন সমাজের জাতিভেদ প্রথার অবসানের। সব রকম ভেদাভেদ পুরো দূর করতে না পারলেও, সেগুলিকে তুচ্ছ করা যায় – এই কথার চৈতন্য জোর দিয়ে প্রচার করেন।সেকালের তুলনায় ভাবলে এইটিই এক বড় সাফল্য ছিল।শুধুমাত্র প্রেম ও ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে তিনি মানুষের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব কমাতে সচেষ্ট হন। তবে চৈতন্যের আন্দোলনের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছিল বাংলা সংস্কৃতিতে।
বাংলার এই সংস্কৃতি আজ প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে তার কারণ, সারা দেশে লাভ জেহাদ, ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রেম আজ হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে। সারা ভারতে প্রায় হাজার দম্পতি যারা ভিন্ন ধর্মের মানুষ কে ভালোবেসে জীবনসঙ্গী বেছে নেন, তাদের পরিণতি দেখে। চৈতন্যের বাংলায় যে প্রেমের জয়ের কথা হবার ছিল তা আজ লাভ জেহাদের সামনে পরবে না তো? বাংলার মানুষ যেন গানের কথার মতোই ঠোঁটে ঠোঁট রেখেই ব্যারিকেড করে লাভ জেহাদের সামনে। ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দু ধর্মের মানুষ যেখানে বসবাস করে, সেখানে এবারো হয়তো বিজেপি জয়লাভ করতে পারেনি। কিন্তু ভবিষ্যতে জয় পাবে না এ কথা বলা যাচ্ছে না। এন ডি টিভি তে সম্প্রতি প্রকাশিত আশুতোষের একটা লেখায় লেখক জানাচ্ছেন আরএসএস প্রধান ও নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। অন্য এক সূত্রের খবর অনুযায়ী আরএসএস প্রধান মমতা ব্যানার্জীকে পছন্দও করেন, ও তাকে “দেবী দুর্গা” বলেও সম্বোধন করেন। সেক্ষেত্রে আরএসএস-এর কাছে বিজেপি বা তৃণমূল কংগ্রেস একই।
লিও ট্রটস্কি তার বই মাই লাইফে লিখেছেন, “প্রলেতারিয়েত ক্ষমতা অধিকার করেছে শ্রেণী সংস্কৃতির সমাপ্তি আর মানব সংস্কৃতির পথ উন্মুক্ত করবার জন্য”। এ কথা এখানে লেখার একটাই কারণ, প্রায় সাড়ে তিন দশক বামপন্থীরা সরকারে থাকার পরও পশ্চিমবঙ্গে সঠিক ভাবে বিজ্ঞান চেতনা ও শ্রেণী চেতনা উন্মুক্ত হয়নি। একটু লক্ষ করলে দেখা যায়, বামপন্থায় বিশ্বাসী বহু মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার অভাব আছে। হাতে তাগা বা আংটির মত অবৈজ্ঞানিক জিনিসের ওপর তাদের আস্থা আজও প্রকট।
এই সমস্ত কিছুকে উপেক্ষা করে এখানেও উত্তর ভারতীয় আগ্রাসী কায়দা প্রতিষ্ঠা করা খুব একটা সহজ কাজ নয় বলেই আমার ধারণা। মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়। তাই যারা এই সংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে চলার কাজে ব্রতী তারা মানুষের কাছে গ্রহণ যোগ্য থাকবেই। আর এটা তারাই করতে পারে যারা ভারতের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে। তাই সুন্দর সমাজ ও সুস্থ সংস্কৃতির জন্য ‘রেড ভলেন্টিয়াররা’ ছুটে চলা নয়, ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গিয়েই মানুষকে বোঝাতে হবে, ধর্মে যেমন পেট ভরে না, তেমনি ধর্মের নামে ভোট চাইতে আসা রাজনৈতিক ‘hooligans’ রা আদতে সবার পকেট কাটতে ব্যস্ত। তাই যার কাছে অক্সিজেন বা খাবার পৌঁছানো হয়, তারা যেন এই দেশে স্বাধীন ভাবে, সুস্থ ভাবে থাকতে পারে তাও বোঝানোর দায় আসে। দরকার থাকে বিজ্ঞান আন্দোলন ও শ্রেণী আন্দোলন গড়ে তোলার।

[লেখক – কবি, চিত্রপরিচালক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।]

Facebook Comments

Leave a Reply