নির্বাচন থেকে দূরে থাকা বামের চোখে নির্বাচনে শূন্য বাম : সদানন্দ ভট্টাচার্য

fail

“কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও”- শুনতে না পেলে শূন্য হাতে ফিরবে, গুমরে মরবে মনের গভীরে। বামের আবর্তে আমি এবার নির্বাচন থেকে দূরে থাকা নিরাসক্ত বাম। তবে কট্টর বাম, মধ্যপন্থী বাম, অস্ফুট প্রতিবাদী বাম সকলের সাথে দূরত্বের সীমা লঙ্ঘন না করে বা মুঠোফোনে যেটুকু যোগাযোগ আছে তাতে মনে হয় এখন অনেক বামপন্থীই নির্বাচন পর্বের ভাবনাচিন্তায় অনুতপ্ত অথবা অতীতের হিসাব কাটাছেঁড়া করে রক্তক্ষয়ের উৎস সন্ধানে ব্যস্ত।

“উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে, ওই যে তিনি, ওই যে বাহির পথে” – কখন যে যান্ত্রিক চেয়ার প্রতীকী রথ হয়ে উঠল, কখন নেত্রীর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর অসহায়তায় ঘেরা কিন্তু হার না মানার বার্তা দিল সেটা বুঝে উঠতে পারলেন না ঈষৎ ছড়ানো, ছেটানো বামপন্থী জোট বা শিক্ষিত, মার্জিত, পরোপকারী, দক্ষ সংগঠক তরুণ বামপন্থীরা। ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মেকী বাঙালী সাজার বা বাঙলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার ভঙ্গিমা- পরিশীলিত, উচ্চ-মধ্য-নিম্ন সকল বিত্তের বাঙালীর জাত্যাভিমানের দম্ভ (যা নিয়ে বাঙালী আজও বাঙালী), মনীষীদের নিয়ে গর্ব করবার ভিতকে এমন আঘাত করল যে শাসকদলের দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, প্রশাসনের গাফিলতি সব আমফানের ঝড়ের মতন উড়িয়ে নিয়ে গেল। ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে, প্রাণের মায়া ছেড়ে মানুষ যেন রথের রশি টানার মত শাসকদলের পিছনে ছুটল বাঁচার শর্ত খুঁজতে। চতুর ভাবে শাসকদল ও তাদের কৌশলী কর্মকাণ্ডের প্রণেতারা গ্রামে, নগরে মানুষের রক্তে দোলা লাগাতে পারলেন, পারলেন মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বন্যাবেগের মত বিপুলভাবে শাসকদলের পিছনে ছোটাতে। যে বেগের কাছে অবাঙালিয়ানা ও তাদের প্রদর্শিত আস্ফালন পরাভূত হল ভবিষ্যৎ গঠনের নিশ্চিত লক্ষ্যে। এই পথে সামিল হওয়া মানুষের মধ্যে বামপন্থী জোটের সংখ্যা চোখে পড়ার মত না হলেও ফলের ক্ষেত্রে একদিকে ঝুঁকিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাত্যহিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাসের মূল্য গগনচুম্বী, বে-রোজগারির সংখ্যা ক্রমবর্ধমান, পদে পদে কোভিডের ভয় অথচ প্রতিষেধকের দিশা নেই, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার রসদ ব্যাঙ্কের সুদ তলানিতে, এই সব সাধারণ কারণে সমস্ত অংশের মানুষ কেন্দ্র বিরোধী হয়ে পড়েন। পুঁজিপতি শব্দের সম্যক অর্থ না জানা থাকলেও এটা পরিষ্কার ছিল যে কিছু মানুষ এবং বেশ কিছু নেতা-মন্ত্রীর কাছে অঢেল টাকা ও ক্ষমতা আছে উড়োজাহাজে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করবার। তাই রাজ্য প্রশাসনের কুশাসনের ফল তাদের যতটা বিরূপ করেছিল, আট দফা ভোটে আস্ফালন, মিথ্যাভাষণ, অভব্য আচরণ ও কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি, ক্ষমতার লোভে দলবদল ও গুলি চালনার অসার যৌক্তিকতা সরকারের পক্ষে হাওয়া বদলে সহায়ক হয়ে ওঠে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে অসৎ বা দূর্নীতিগ্রস্ত নেতার সংখ্যা দু’তরফাই যখন রয়েছে তখন একপক্ষের ক্ষেত্রে মনোভাব নরম কেন? আসলে শাসকদলের নেত্রী নিজের অবস্থান এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন সমগ্র ভোটের প্রচারে, যেন তিনি একাই এই ভোট যুদ্ধ লড়ছেন প্রবল ও সবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বাঙালীর হয়ে। তাই মানুষের বিশ্বাস একজন অসহায়তায় ভরা দৃঢ়চেতা নারীর প্রত্যয়ের উপর আস্থা রেখেছে এবং মনে করেছে তিনিই পারবেন দুষ্টের দমনে রুখে দাঁড়াতে, সে নিজের দলের হোক বা বিরোধীই হোক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সত্যিই বাংলাকে তার মেয়েকে চাইবার মত পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন এবং সাফল্যও পেয়েছেন।
যেহেতু কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, চোরাচালান প্রতিহত করবার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা শুধুমাত্র ভোট পর্ব শুরু হলে দেখা দেন ফলে মানুষের মনের গভীরে যদি বা সন্দেহ থেকে থাকে তাকে উসকে তেজোদৃপ্ত করবার মত ধারাবাহিক তদন্ত বা গ্রহণযোগ্য তথ্য কখনও সামনে আসে নি। এর কারণ দুটো হতে পারে। হয় প্রমাণ সংগ্রহ করা যায় নি। অথবা প্রমাণ সামনে আনবার দায় এখনো তৈরি হয় নি। কোনও ঘোষিত দক্ষিণপন্থী দল যখন শাসনক্ষমতায় থাকে তারা কখনও চাইবে না যে এমন কোন তথ্যপ্রমাণ সামনে আসুক যাতে আর একটি দক্ষিণপন্থী দলকে বিপদে ফেলায় বামপন্থার সুবিধা হয় ।

বামপন্থীরা জোট করলেন কংগ্রেসের সাথে, তাহলে ২০১৯ সালের জোট হল না কেন? প্রশ্ন উঠেছে। জোট করবার জন্য এতটা মরিয়া হতে হল যে শাসকদলের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে চেয়ে হালে পানি না পাওয়া আই.এস.এফ-কে নিতে হল। সাধারণ কর্মীরা এতে সম্মত ছিলেন? কোন পরিসংখ্যান আছে? অনেক পরিচিত মধ্যপন্থী বাম এই কারণে বামকে ভোট নাও দিয়ে থাকতে পারেন। আই.এস.এফ ধর্মভিত্তিক দল না নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে সে বিষয় স্পষ্ট নয় তবে তাদের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যে ভাষা নারীর প্রতি প্রয়োগ করেছেন তাতে সহনশীলতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় ব্যক্তিনৈপুণ্যে টিকে থাকা দল। তাদের ছাত্র যুব স্তরে শক্তি নেই বললেই চলে। বামপন্থী অনেক দলই প্রায় শক্তিহীন, নেতা কেন্দ্রিক অবশ্যই দম্ভ ও ঔদ্ধত্যে ভরপুর। ফলে এই জোট থেকে কি পাওয়া গেল বোধগম্য হল না। আই.এস.এফ-কে বাদ রেখে বা একেবারেই জোট না হলে শূন্য আসন পাওয়া যেত এবং মেরুদণ্ডটা যে টানটান প্রমাণ করবার একটা পরিসর ভবিষ্যতে থাকত। কোভিড পর্বে লাল-স্বেচ্ছাসেবকরা যে অফুরন্ত কাজ করেছেন, করছেন ও করবেন সেটাই হয়ে থাকছে আগামীতে বামপন্থার একমাত্র সম্পদ। একগুচ্ছ তরতাজা মুখ এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। মানুষ মনে মনে তাদের ভালবেসেছে কিন্তু এখনও মানুষ তাদের দলকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন কারণ বামপন্থার বক্তব্য তাদের কাছে বোধগম্য নয়। তাই তরুণ প্রাণের সাথে যোগ হোক তরুণ ভাবনা, তারুণ্যের দিশা। অনেক কেন্দ্রে বামপন্থী প্রার্থী না থাকায় বামপন্থীরা অনেকে ভোট দেননি। মালদহ, মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের ভরসা ছিল সংখ্যালঘু ভোট, সেখানে শীতলকুচি পরবর্তী ভোট পর্যায়ে সংখ্যালঘু ভোটার বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে শাসকদলকেই বেছে নিয়েছেন নিরাপত্তার দৃষ্টিতে সঠিক গন্তব্য স্থল হিসাবে।

এবারের ভোটে বামপন্থী জোট শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় দলের বিরোধিতা করে লড়লে ভবিষ্যতে বিরোধী হবার পথ সুগম হত। এখন যা হল তাতে আগে রাম না হলেও দুই দক্ষিণপন্থার আপসে অদলবদল হলে পরে বামের দফা গয়া হয়ে গেল। দুই দক্ষিণপন্থী দলই জানে তারা আলগা দিলেই বামপন্থীরা ঢুকে পড়বে তাই শাসক-বিরোধী সমীকরণ বজায় রেখে চললে ভবিষ্যতে বেশ কিছুদিন বাংলায় বাম বর্জিত বিধানসভা থাকা আশ্চর্যের হবে না। ত্রিপুরার হাল দেখেও বামেরা শিখতে পারলেন না যে পরিবর্তনে ফিরছে আঞ্চলিক দল, বামপন্থীরা নয়, আর অত্যাচারিত হচ্ছে বামেরা। নির্বাচনে ছলে বলে কৌশলে পরপর জয় এবং দীর্ঘসময় আত্মসন্তুষ্টিতে থাকায় যে স্থবিরতা বামের ঘটেছিল তার ফল আজকের চিত্র। কেরালাতে বামপন্থার চর্চা আদর্শভিত্তিক ও কর্মী ভিত্তিক। সেখানে নেতা বদল হয় দ্রুত, নতুন মুখকে সুযোগ দেওয়া হয় সঠিক বয়সে ফলে শিকড় গজিয়ে দল বৃদ্ধাবাসে বদল হয় না, গতিময়তা বজায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলের শেষ তৃতীয়াংশে বেশীর ভাগ সমর্থক আদর্শহীন, প্রাপ্তির আশায় দলে থাকা, সূক্ষ্মভাবে তোলা আদায়ে যুক্ত ফলে রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে তারা পাওয়ার লোভে তৃণমূলে অথবা পিঠ বাঁচাতে বিজেপিতে। দল যখন আবার পাইয়ে দেবে তখন তারা ফিরবেন। আর শিল্পী, বুদ্ধিজীবী—তারা বাম আমলে সব সুযোগ নিংড়ে নিয়ে এখন আনুগত্য বদলে আখের গোছাচ্ছেন। এরা চোখের চামড়াহীন, শিল্প জীবনের মূল মন্ত্র নির্ভীক, নিরপেক্ষ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মত, সেটি তাদের মজ্জায় অনুপস্থিত, ফলে এরা আবার বিকোবেন সুযোগ পেলেই। বামপন্থী নেতৃত্বও এই পদলেহনকারীদের বেশ পছন্দ করেন। তাই তারা অক্লেশে ফিরবেন গুরুত্বপূর্ণ পদে আর অসম্মানিত হবেন কঠিন সময়ে লড়াই করা দুর্দম সৈনিকেরা। তাই আদর্শবাদী বামপন্থীরা যারা আছেন বা থাকবেন তারা মিলিয়ে যাবেন পাদপ্রদীপের অন্ধকারে। যতক্ষণ না নেতৃত্ব শোধিত হয়ে ঔদ্ধত্য ও আমিত্ব বর্জন করে যৌক্তিক বাস্তববাদী চিন্তায় এগিয়ে আসবেন ততদিন বামের কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

তৃণমূল গত দশ বছরে বিজ্ঞাপনে যত টাকা খরচ করেছে তাই দিয়ে পঞ্চাশটা হাসপাতাল হয়ে যেত। কেন করেছে? কারণ বারংবার প্রচারে দশ শতাংশ সাফল্যকে পঞ্চাশ শতাংশ করা যায়। দক্ষিণের প্রয়াত নেত্রীর এইভাবে নূন্যতম সাফল্যকে বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে উচ্চতায় নিয়ে যাবার কৌশলকে প্রয়োগ করে শাসকদল সুফল পেয়েছেন। বাম আমলে পরিশীলিত উপস্থাপনা গ্রাম্যস্তরে পৌছয়নি, লক্ষ্যে স্থির থেকে রাজধর্ম পালনে কঠোর হতে পারেন নি নির্ধারিত শিল্পস্থাপনে। বামেরা একে অপরের কোঁচা ধরে ফেলে দিতে বেশী ব্যস্ত ছিলেন। তাই যমের দুয়ারে সরকার বা স্বাস্থ্য সাথী ফালতু বললেও লোকে প্রচারের গুনে ও তাৎক্ষনিক কর্মযজ্ঞ দেখে আশার আলো দেখেছেন। দু-চারজনকে সুফল পাইয়ে দিয়ে—প্রচার পাওয়া গেছে। ভিক্ষাই হোক বা ডোলই হোক মানুষ পেয়েছে। তাৎক্ষণিক সুখ্যাতিও করেছে। যে মানুষকে আজ খেলে কাল ভাতের চিন্তা করতে হয় তারা দূরের দিকে তাকাবেন কি করে। এই মানুষেরা তো বাম আমলেরই ফসল। কেন্দ্রীয় প্রকল্প নামের ফেরে রাজ্যের প্রকল্প করে প্রচারে লাভ দিয়েছে। গরীব মানুষ হাতে কিছু পেলে কার প্রকল্প দেখে না, দেখে কার ছবির নীচে দাঁড়িয়ে নিচ্ছে।

বিজেপি এখন বিরোধী ৭৭টি আসন নিয়ে। উল্লেখযোগ্য এর মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটা আসন তৃণমূলের আসন আর ২৭টার মত বামজোটের। অন্যদিকে বাম জোটের পঞ্চাশটার মত আসন গেল তৃণমূলের পকেটে। অর্থাৎ তৃণমূলকে গাল দিয়ে, প্রশাসনের গুষ্টির তুষ্টি করে, দুর্নীতির জিগির তুলে তাদের হাতেই বধ হতে হল। পক্ষান্তরে যে কেন্দ্রীয় নীতির ফলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বিপর্যস্ত, ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, মানুষে মানুষে বিভাজনের সৃষ্টি, দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষণ তাদের কুশাসনের আদ্যোপান্ত তুলোধোনা করে রাজ্যের শাসকের দুর্নীতির বিচার আমজনতার উপর ছেড়ে দিলে এর থেকে খারাপ ফল হবার ছিল কি? যেখানে শাসকদল অঙ্ক কষে সংখ্যালঘু ভোটকে এককাট্টা করে বিধানসভার ১৬০টির মত আসনে তাদের জয়ের সম্ভাবনাকে বাস্তব করল সেখানে বামপন্থী তাত্ত্বিকরা অঙ্কটা ধরতেই পারলেন না। মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে তার দলের প্রেক্ষিতে নন্দীগ্রাম নিয়ে মন্তব্য ভাসিয়ে দিলেন ব্যস ফাঁদে পড়লেন বাম। ফিরে গেলেন কুয়োয় নিজেদের বুদ্ধির সারবত্তা, নীতিতে কতখানি সঠিক প্রচারে ব্যস্ত হয়ে কিছু মানুষের পুরানো ক্ষতকে গভীর করলেন। রাজনীতির যাত্রাপথে অনেক বিষয় থাকে যাকে এড়িয়ে চলতে হয়। কোথায়, কখন ছাড়তে হবে সেটা বঙ্গ বামেরা এখনো শিখলেন না।

বাম শক্তির বীজ নিহিত ছিল গ্রামাঞ্চলে। খেটে খাওয়া নিপীড়িত অভাবী মানুষের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বামেরা বন্ধু হয়েছিলেন। ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি তাদের গভীরে শিকড় প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল। কালক্রমে তোষণ ও পৃষ্ঠকূণ্ডয়নের ফলে উপদলের মাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী শ্রেণি ও একটি বঞ্চিত শ্রেণি তৈরি হল। শেষোক্ত অংশের ক্ষোভকে পুঞ্জীভূত করে পালাবদলে শাসকদল এসে যেই ক্ষমতা পেল অমনি পাইয়ে দেবার রাস্তা দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে বাম বিরোধী হয়ে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রী তাদের বলভরসা। তার দলের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রয়োজন হয় না, মুখ্যমন্ত্রী বললেই কাজ চালু। এই একক সিদ্ধান্তের যেমন বিপদ আছে তেমনি কাজ দেখাতে সুবিধা। বিশেষ করে সবাই এখুনি চায় আর ক্ষোভ তাড়াতাড়ি কমে। তাই এবারের নির্বাচনে গ্রামের গরীব মানুষ কোন দলকে বেশী বাম ভেবেছেন তার অনুসন্ধানে গভীরে প্রবেশ প্রয়োজন। সেই শক্তি কি আজ বামেদের আছে। না থাকলে অনেকদিন সাইড লাইনে দাঁড়াতে হবে।

এই নির্বাচনের প্রাক-পর্বে বামপন্থার একটা লাভ হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের বৃহদাংশ রাজনীতি থেকে দূরে সরে একটা উন্নাসিক ভাব বজায় রাখতেন যেন অন্য কোন গ্রহের জীব। কোভিড, দীর্ঘ লকডাউন, বেরোজগার, বিকল্প রোজগারে প্রাণপাত, চোখের সামনে আত্ম পরিজনের অসহায় অবস্থা দেখে ক্রমে ক্রমে সাহায্যে এগিয়ে আসা—এই ধাক্কার ফলে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ইচ্ছা, রাজনৈতিক মানদণ্ডে কে কোথায় দাড়িয়ে তার মূল্যায়ন ব্যক্তিস্তরে তারা করছে। এর ফল হয়ত বামেরা পরবর্তীতে পাবেন। এই চারাগাছ সমাজজীবনে লালন করতে পারলে এরাই ফেরাতে পারবে বামপন্থাকে, হয়ত সেই বামপন্থার পথ হঠাৎ বাঁক ফিরবে, তা ফিরুক, কিন্তু সুস্থ রাজনীতি, হিংসা বিহীন বাংলার জন্য এদের প্রয়োজন।

আজ পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতি, কেন্দ্রে দক্ষিণপন্থী দল যাদের ঘোষিত নীতি ব্যবসা ও ব্যবসায়ীর স্বার্থরক্ষা তারা খুচরো ব্যবসার স্বার্থ না দেখে বৃহৎ পুঁজিপতির মুনাফা বাড়ানোর জন্য যথোচিত ব্যবস্থা নেবেন এটাই স্বাভাবিক। মানুষ বিভিন্ন স্তরে সব হাড়ে হাড়ে বুঝছেন। মুশকিল হচ্ছে জোরালো বিরোধী নেই, বিরোধীরা সংঘবদ্ধ হতে পারেন না কারণ সবাই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভেবে শিশুপাল হন এবং নেতৃত্বে নিহত হন। খয়রাতী আর ডোলের রাজনীতির ফলে রাজ্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা ভাবনায় থাকবে না, তাৎক্ষনিক সুরাহাকে উন্নয়নের দিশা হিসাবে প্রচার চলবে। ফলে আগামীতেও প্রশাসনের কুফল সামনে আসবে কোভিড যুগ পেরিয়ে।

বাম সমর্থক না হলেও যুক্তিবাদী মানুষ মনে করেন প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তোলা বা গঠনমূলক সমালোচনার ও বিজ্ঞানসম্মত চাহিদার আন্দোলনের ক্ষেত্রে বামেদের উপস্থিতির প্রয়োজন আছে এবং থাকবে। নির্বাচনে শূন্য হাতে ফেরায় বিধানসভার ভিতরে দাঁড়িয়ে বিধিসম্মতভাবে উপস্থাপনার সুযোগ নেই, দক্ষিণপন্থী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া-মালিকরাও বামেদের সুযোগ তো দেবেনই না বরং আলোচনায় তাদের অপ্রাসঙ্গিকতাকে বার বার টেনে আনবেন। একসময় তৃণমূল চেয়েছিল বিরোধী শূন্য বাংলা, তখন তাদের মাথায় ঘুরত বামেরা। বিজেপি গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ নিজস্ব ভাবনায় নিয়ন্ত্রিত দল আগামীতেও সেই তত্ব নিয়ে চলবে যা ছিল এই নির্বাচনে তাদের মূলধন। বামপন্থার এখন মূলমন্ত্র হওয়া উচিত তাদের বাংলা থেকে উৎখাতের রাজনীতিতে মনঃসংযোগ করা। আগামী দিনে অন্তত: বিরোধী হবার চেষ্টা করা। গঠনমূলক বিরোধিতার দ্বারা নিজের পায়ের তলায় মাটি পেলে কালক্রমে সঠিক জনমুখী রাজনীতির মাধ্যমে সাফল্য দেখার সম্ভাবনা থাকবে। তৃণমূল পেরেছে, বিজেপি পেরেছে, বামেরা না পারলে দুর্ভাগ্য। বাম ফিরুক সংসদীয় গণতন্ত্রে।

পরাজয়কে স্বীকার করতে হবে মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক কুশলতার নিরিখে। নির্বাচন উত্তরপর্বে তৃণমূলকে শত্রু হিসাবে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে বিজেপিকে। এই মনোভাব কাজে লাগাতে হবে। বামেদের পুরানো ভোট ব্যাংক শরণার্থীরা আজ পল্লবিত। পুরানো মুখ চলে গেছে ধরাধাম ছেড়ে। তাদের উত্তরসূরিরা আজ আর শরণার্থী নন, তাদের বামেদের হাত ধরার বিশেষ কোন কারণ নেই। অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল দুনিয়ায় তাদের ঝোঁক সেদিকেই সঙ্গত ভাবে থাকবে যেদিকে অর্থের যোগান সহজতর। বিপুল বেহিসাবি অর্থের বিরুদ্ধে বামেদের এই অসম লড়াই নতুন জনভিত্তি গড়ে তুলে নতুন শপথের লড়াই। মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে তোলা নিরাসক্ত বামেদের দিয়ে হবে না, প্রদীপ্ত, আলোকিত, উজ্জ্বল হৃদয়ের স্বপ্ন দেখার সাহস সম্পন্ন প্রাণ চাই যারা বামমনস্ককে গুরুত্ব দিয়ে দেশজ ভাবধারায় মানুষকে আশার আলো দেখাতে পারবেন যাতে আগামী দিনে শূন্য হাতে না ফিরতে হয়, না হলে শেষের সে দিন ভয়ংকর।

পরিশষে বলি—“ফিরে ফিরে ডাক দেখিরে পরান খুলে-দেখব কেমন রয় সে ভুলে”। রেখো না মনে কোন সংশয়, হবে—জয় অজানার জয় ।

[লেখক – গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।]

Facebook Comments

Leave a Reply