ষোল আনা থেকে যদি ষোল আনা যায় হিসেবটা কষে দেখো দাঁড়াও কোথায় : সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

fail

১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে যে তিনজন কমিউনিস্ট প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁরা হলেন রতনলাল ব্রাহ্মণ, জ্যোতি বসু এবং রূপনারায়ণ রায়। রতনলাল ব্রাহ্মণ দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। জ্যোতি বসু নির্বাচিত হয়েছিলেন রেল-শ্রমিক কেন্দ্র থেকে আর রূপনারায়ণ রায় জিতেছিলেন দিনাজপুর কেন্দ্র থেকে। আর কলকাতা, হাওড়া আর হুগলীর তিনটি শ্রমিক আসনে পরাজিত হয়েছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় তিন কমিউনিস্ট শ্রমিক নেতা সোমনাথ লাহিড়ী, বঙ্কিম মুখার্জি আর মহম্মদ ইসমাইল। এই তিন আসনেই জয়ী হন কংগ্রেস প্রার্থী। অথচ নির্বাচনের আগে কংগ্রেস যে শ্রমিকদের জন্য খুব কাজ করেছিল এমন নয়। বরং নির্বাচন হয়েছিল ছেচল্লিশের মার্চে আর তার আগের দু’মাস জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বেই ভাষা-ধর্ম নির্বিশেষে শ্রমিক শ্রেণী লাল ঝাণ্ডার তলায় সমবেত হয়েছিলেন। একজোট হয়ে ধর্মঘট করেছিলেন। অথচ ভোটের ফল অন্য কথা বলল। কেন এটা হয়েছিল?
সেকথা বর্ণনা করেছেন ওই সময়কার ছাত্রনেতা ও পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক গৌতম চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বয়ানেই শোনা যাক সেই ইতিহাস। “নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ পরে বেলেঘাটা অঞ্চলের বেশ কয়েক হাজার শ্রমিক এক জঙ্গী ধর্মঘট করে সোমনাথ লাহিড়ীকে আমন্ত্রণ জানান। লাহিড়ীর সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। লাহিড়ীকে দেখে সমবেত সমস্ত শ্রমিক “লালঝাণ্ডা কি জয়” ধ্বনিতে মুখর হলেন। আমি একটু রেগেই লাহিড়ীকে বল্লামঃ বেশ লোক এই শ্রমিকরা, নিজেদের লড়াই-এর সময় লালঝাণ্ডার জয় বলবে, আর সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেবে কংগ্রেসকে। লাহিড়ী একটু হেসে একজন লড়াকু শ্রমিককে ডেকে বল্লেনঃ “দেখ, আমাদের ছাত্র নেতা রাগ করে কি বলছে”। শ্রমিকটি আমার মন্তব্যটা শুনে বল্লেনঃ “রুটি-রুজি কা লিয়ে লাল ঝাণ্ডা, লেকিন আজাদী কি লিয়ে তো কংগ্রেস”।”
এবারের, ২০২১-এর, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বামদের আসন শূন্য হয়ে যাওয়ার পর এই ইতিহাস মনে পড়ল। সত্তরের দশকে এমনই এক বিপর্যয়ের পর আরেক নির্বাচনের সময়ে সোমনাথ লাহিড়ী বলেছিলেন, এখন মানুষের জন্য কাজ করুন। নিজেদের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনুন। তারপর নির্বাচনে লড়বেন।
সোমনাথ লাহিড়ীর সেকথা আজকের বামনেতারা শুনবেন কিনা তা সময় বলবে। তবে আমরা আপাতত একটু চোখ বুলিয়ে নিই নির্বাচনে লড়া বামেদের দলগত অবস্থার ইতিহাসে। ১৯৫১-৫২তে, স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে মোট আসন ছিল ২৩৮। সেখানে সি পি আই পেয়েছিল ২৮টি আসন, প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ১০.৮%। আরেক বাম দল মার্ক্সবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক ৫.৩% ভোট পেয়ে পেয়েছিল ১১টি আসন। আর শাসক কংগ্রেস ৩৮.৮% ভোট পেয়ে দখল করেছিল ১৪৯টি আসন। ১৯৫৭এর নির্বাচনে বিধানসভার আসন সংখ্যা বেড়ে হয় ২৫২। সি পি আই পায় ৪৬টি আসন (প্রাপ্ত ভোট ১৭.৮%), ফরোয়ার্ড ব্লক পায় ৮টি আসন (প্রাপ্ত ভোট ৪.১%), ৪৬.১% ভোট পেয়ে কংগ্রেস পায় ১৫২টি আসন; ১৯৬২তে তা বেড়ে হয় ১৫৭ (প্রাপ্ত ভোট ৪৭.২%), বাড়ে বামপন্থীদের আসন আর ভোটের হারও। সেবার ২৫% ভোট পেয়ে সি পি আই পায় ৫০টি আসন, ফরোয়ার্ড ব্লক ৪.৬% ভোট পেয়ে ১৩টি আসন পায়, আর এস পি পায় ৯টি আসন (২.৬% ভোট)। অর্থাৎ বেশ বোঝা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ভোটের রাজনীতি বাম আর কংগ্রেস এই দুই মেরুতে ভাগ হয়ে গিয়েছিল সেই কবে! আর এবার, ২০২১-এ সেই দুই মেরুর বাগান আক্ষরিক অর্থেই মরুভূমি!
কেন এমন হল এনিয়ে লেখা বের হচ্ছে, হয়েই চলেছে। সেইসব লেখা নিশ্চয়ই চোখ-কান খুলে রাখা পাঠকেরা পড়ছেন আর যাঁরা দলদাস হয়ে নিজেদের চোখ কান বিবেক তাঁদের পার্টির কাছে বন্ধক দিয়ে দেন নি তাঁরা হয়তো নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে তা উপলব্ধিও করছেন।
নির্বাচনের ভোটের শতাংশ আর আসন প্রাপ্তির ইতিহাসের নিরিখে দেখা যাচ্ছে ১৯৬৭ সাল থেকেই কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট এবং আসন কমছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ১৯৭২, যে ভোটকে রিগিং আর সন্ত্রাসের অভিযোগে সি পি এম ভোট বলেই স্বীকার করতে চায় না। তবে ১৯৬৭ থেকে কংগ্রেসের যে ভোট হ্রাসের ছবি দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ভাঙনও দায়ী। অজয় মুখোপাধ্যায় গোষ্ঠীর উত্থান, বাংলা কংগ্রেসের জন্ম কংগ্রেসের ভোট কমিয়েছে। তবে সেসব সামলেও কংগ্রেস ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৬ অবধি কংগ্রেস প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। অবস্থা পাল্টে গেল ১৯৯৮তে আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মের পরে। ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯এর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে তৃণমূল কংগ্রেসই এরাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের আসন দখল করে। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান পরবর্তী সময়ে প্রথম বিধানসভা ভোট হয় ২০০১এ। সেই ভোটে কংগ্রেসের জোটসঙ্গী ছিল তৃণমূল কংগ্রেসই। বস্তুত ২০০১ থেকে কংগ্রেস ২০০৬ ছাড়া আর কোনও বিধানসভা নির্বাচনেই একা লড়ে নি। একা লড়ার ফল যে খুব ভাল হয়েছিল এমন নয়। সেবার ২৬২টি আসনে লড়ে কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ২১টি আসন, প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ১৪.৭%। সেই হার থেকে শিক্ষা নিয়েই হয়তো কংগ্রেস তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধে ২০১১তে। মাঝে অবশ্য গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে।
২০০৪এ কেন্দ্রে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন যে ইউ পি এ ১ সরকার গড়ে উঠেছিল, তার সমর্থক ছিল চার বাম দল। ২০০৪ এর লোকসভায় এরাজ্যে বামফ্রন্ট ছিল ৪২এ ৩৫। সি.পি.এম. একাই ২৬ আর তিন শরিক তিনটি করে আসন। সারা দেশের নিরিখে বামফ্রন্ট ৫৯ আর সি.পি.এম ৪৩। বামদলের সমর্থনে ইউ.পি.এ-১ আমল শুরু হয়েছিল ২০০৪-এ। সেই যুগ্মযাত্রা হঠাৎ থেমে গিয়েছিল ২০০৮এ। তারা পরমাণু শক্তি প্রশ্নে সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় ২০০৮ সালে। ২০০৮ এর ৯ জুলাই, চার বামনেতা প্রকাশ কারাত, এ.বি.বর্ধন, দেবব্রত বিশ্বাস এবং চন্দ্রচূড়ন-এর স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের প্রতিবাদে ইউ.পি.এ.-১ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। এই সমর্থন প্রত্যাহারের পরেও ইউ.পি.এ.-১ সরকারের পতন ঘটেনি। বরং পতন শুরু হয় বামদলের। এই বাংলায় পরের লোকসভা ভোটে (২০০৯) সি.পি.এম.-এর আসন হয়ে যায় ৯ আর বামফ্রন্ট ১৫। ২০১৪তে সি.পি.এম. ২, অন্য বাম দল শূন্য। ২০১৯এ, রাজ্যে বাম দলের আসন শূন্য। আর এবার বিধানসভাও বামদলশূন্য। তাহলে কি পতন প্রক্রিয়ার শুরু পরমাণু প্রশ্নেই?
সে আলোচনায় যাওয়ার আগে কংগ্রেসের ক্ষমতার ক্রমহ্রাসমানতার কথাটা বলে কংগ্রেসের শূন্য হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে দাঁড়ি টানব। আগেই বলেছি ১৯৯৬ পরবর্তী যে পাঁচবার এরাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে তাতে একবারই মাত্র কংগ্রেস একা লড়েছিল। সেটা ২০০৬এ। একা লড়ে কংগ্রেস একুশটি বিধানসভার আসন পেয়েছিল বটে কিন্তু সেই সময়ে রাজ্যে কংগ্রেসের অবস্থান কী ছিল? তারা কি সরকারের সমর্থক ছিল না বিরোধী ছিল? মনে রাখুন ২০০৬এর ভোটে জেতার পরে তাঁর উন্নয়নের মডেল নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সময়ে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সেই বিখ্যাত উক্তিঃ “আমরা ২৩৫, ওরা ৩০”! এই হিসেবে ২১ আসন জেতা কংগ্রেস ধর্তব্যের মধ্যেই নেই; তারা ‘যে জন আছে মাঝখানে’! এরপর কংগ্রেস ২০১১তে তৃণমূলের সঙ্গে জোট বেঁধে ৩৪ বছরের বাম শাসনকে হারিয়ে মন্ত্রীসভার শরিকও হয়েছিল। তবে সেই বন্ধুত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। পরে ২০১৬তে বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট করে কংগ্রেস লাভবানই হয়। সি পি এম-এর থেকে কম আসনে নির্বাচনে লড়ে বেশি আসনে জয় লাভ করে। প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে। বিরোধী দলনেতা হয় কংগ্রেস থেকেই। কিন্তু সেই বিধায়ক-সংখ্যা ক্রমাগত কমতে থাকে অনৈতিক দলবদলের জন্য। বিধানসভায় কংগ্রেসে আছি বলেও অনেক কংগ্রেস বিধায়ক তৃণমূলের সভায় দলবদলু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কাজেই কংগ্রেসের ক্রমক্ষীয়মানতা শুধু নির্বাচকদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়াতেই সূচিত হয় না, দলের ভাঙন তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্ভব ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়তে থাকে। তাও মুর্শিদাবাদ মালদার মত অঞ্চলে কংগ্রেসের সমর্থন ভিত্তি ছিল যেটা এবারের বিধানসভা নির্বাচনে একেবারে অবলুপ্ত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে ১৯৬৪তে সি পি এম-এর আবির্ভাব আর ১৯৭৭এ রাজ্যে ক্ষমতা দখল এই একমাত্রিক আখ্যান বর্ণনা করলে সবটা বলা হয় না। স্বাধীনতার পর থেকেই রাজ্যে শাসক কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল কমিউনিস্ট পার্টি। তখন অবিভক্ত সি পি আই। পরে ১৯৬৪তে পার্টি ভাগ হয়। ভাগের পরে ১৯৬৭তে প্রথম বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে পালাবদল ঘটে। খবরের কাগজের শিরোনামঃ “পশ্চিমবঙ্গে প্রথম অকংগ্রেসী মন্ত্রীসভা” (যুগান্তর, ৩ মার্চ ১৯৬৭)। তবে এটা মনে রাখতে হবে ১৯৬৭এর অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা নির্বাচন- পূর্ববর্তী জোট ছিল না। সেটা হল ১৯৬৯এ। সেই ভোটের পরে যুক্তফ্রন্টের সাফল্যজনিত উচ্ছ্বাসের ছবি মেলে খবরের কাগজের পাতায়; “মহাকরণে জনতার দিন ২৫ ফেব্রুয়ারী” (যুগান্তর,২৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯)। প্রথম যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। সে মন্ত্রীসভা একবছরও টেকে নি। এই মন্ত্রীসভার পতন ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। সেই মন্ত্রীসভাও স্থায়ী হয়নি। ১৯৬৯ আর ১৯৭১এর ভোটের পরে অজয় মুখোপাধ্যায় ফের দুবার মুখ্যমন্ত্রী হন কিন্তু কোনবারই তাঁর কার্যকালের মেয়াদ বছর ঘোরেনি। জারি হয়েছে রাষ্ট্রপতি শাসন। সেই সময়কার রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত বিশ্লেষণের সুযোগ এই লেখায় নেই। শুধু একথাই বলা যায় নির্বাচনের পরের জোট, আগের জোট, দল ভাঙা ইত্যাদির সাক্ষী হয় পশ্চিমবঙ্গ। তারপরে ১৯৭২এর নির্বাচনে কংগ্রেসের বিপুল জয়। এরপরে ১৯৭৫এর জরুরি অবস্থা। আর তারপরে ১৯৭৭এর বিধানসভা নির্বাচনে সি পি এম-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের জয়। (তবে সি পি আই সেসময় বামফ্রন্টে ছিল না। ১৯৭২ এবং ১৯৭৭এর নির্বাচনে তারা অংশ নেয় কংগ্রেসের সহযোগী হিসেবে।) আক্ষরিক অর্থে পালাবদল। তারপরের চৌত্রিশ বছর ক্ষমতার সংহতিকরণের কাহিনী। ক্ষমতা থেকে কর্তৃত্ব, একাধিপত্য এবং ঔদ্ধত্য। এ গল্প আমাদের সবার চেনা। বরং বলা যাক দ্বিচারিতার কথা। আর তা শুরু করা যাক পতনের প্রথম ধাপ পরমাণু দিয়েই।

প্রশ্ন যখন পরমাণু

পরমাণু প্রশ্নে বামের সঙ্গে ইউ পি এ ১–এর বিচ্ছেদ ঘটেছিল। কিন্তু পরমাণু প্রশ্নটা ঠিক কী ছিল তা কি আমজনতা বুঝেছিলেন? বামদলগুলির তরফে বলা হয়েছিল ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি ভারতের সার্বভৌমিকতায় আঘাত হানবে। প্রেস বিবৃতি পড়ে দেখলে দেখা যায়, চার বামদল একজোট হয়ে বলছে, ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি ভারতের মৌলিক স্বার্থবিরোধী কারণ ভারতের স্বাধীন বিদেশনীতিকে তা ব্যাহত করবে। অর্থাৎ বাম আপত্তি পরমাণু শক্তি নিয়ে ছিল না, ছিল চুক্তিতে ভারতের স্বার্থ নিয়ে।
কিন্তু পরমাণু শক্তির ব্যবহার নিয়ে কী বক্তব্য ছিল সি.পি.এমের? ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে পরমাণু শক্তি প্রসঙ্গে আন্দোলনের ইতিহাস নেহাৎ কম নয়। গোড়ার দিকে অবশ্য প্রশ্নটা আবর্তিত ছিল পরমাণু বোমার ভয়াবহতা নিয়ে। রাজশেখর বসু পঞ্চাশের দশকে লিখেছেন, ‘পরমাণু বোমা আবিষ্কারের পূর্বে যুদ্ধ এত ভয়াবহ ছিল না’ (‘বিজ্ঞানের বিভীষিকা’)। বাদল সরকারের ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ (১৯৬৬) নাটক লেখা হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা এবং উন্মত্ততা নিয়েই। সত্তর-আশির দশকে বিজ্ঞান পত্রিকা, ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ ও ‘উৎস মানুষ’-এ পারমাণবিক অস্ত্র বিরোধিতার পাশাপাশি ‘পরমাণু শক্তির আসল রূপ’ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
এরাজ্যে সংগঠিতভাবে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের বিকাশ ঘটে আশির দশকে। ১৯৮২ র ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবসে ‘গণবিজ্ঞান সমন্বয়’–এর পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী বড় মিছিল হয় কলকাতায়। এর মুদ্রিত প্রচারপত্রে বলা হয়, ‘দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে ভেদ যতদিন থাকবে, প্রতিরক্ষার প্রয়োজন ততদিন ঘুচবে না। কিন্তু দেশের মানুষ যেখানে অভুক্ত, ক্ষুধা ব্যাধি গৃহহীনতার সমস্যা যেখানে বেড়ে চলেছে, সেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পরমাণু কর্মসূচির মাধ্যমে যে প্রতিরক্ষার পরিকল্পনা, তা কখনো সত্যিকারের জাতীয় প্রতিরক্ষা হতে পারে না’। তখনও অবশ্য সি.পি.এমের বিজ্ঞান সংগঠন ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ’ তৈরি হয় নি। ৮২র সেপ্টেম্বরে বামফ্রন্ট যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ করে। কিন্তু পরমাণু শক্তির বিপদ নিয়ে সি.পি.এম যে বিশেষ ভাবিত ছিল না তার প্রমাণ আশির দশকে বারবার মেলে। কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৮৪ এবং ১৯৮৭ সালে এরাজ্যে পরমাণু চুল্লি বসাবার প্রস্তাব নিলে বামফ্রন্ট সরকার তার বিরোধিতা করেনি অথচ তার আগে ১৯৭৯র ২৮ মার্চ আমেরিকার থ্রি মাইলস আইল্যান্ডে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে ঘটে গেছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
পশ্চিমবঙ্গে পরমাণু শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের এই প্রস্তাবের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন বিজ্ঞানকর্মীরা। ১৯৮৫তে গঠিত হয় পরমাণু শক্তিবিরোধী সংগঠন ‘অ্যান্টি নিউক্লিয়ার ফোরাম’। ফোরাম ধর্না-প্রচার-কর্মশালা আয়োজন, পুস্তিকা প্রকাশনার মাধ্যমে প্রতিবাদে শামিল হয়। ৮৭র এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতদিন যারা শুধু পারমাণবিক বোমার বিরুদ্ধে কথা বলতেন তারাও ১৯৮৬র ২৫ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিলের পরমাণুকেন্দ্রে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর বুঝতে পারলেন পরমাণু বিদ্যুৎ আদৌ নিরাপদ নয়। সমাজতন্ত্রী সোভিয়েতে দুর্ঘটনা, রাজ্যে বিজ্ঞানকর্মীদের প্রতিবাদ – এসবের পরেও ১৯৯২তে রাজ্যে ফের পরমাণু চুল্লি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবার প্রতিবাদী হন বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মীরা। বের হয় পুস্তিকাঃ ‘পরমাণু বিদ্যুৎ নয়, চাই বিকল্প’।
সি. পি. এম তার দীর্ঘ শাসনে বারবার বিকল্প উন্নয়নের কথা বলেছে। সেই হিসেবে ‘সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী’ পরমাণু বিদ্যুতের বদলে অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহারের বিকল্প সামনেই ছিল। এমনকি সেই সময়ে রাজ্যে ছিলেন সৌরশক্তি বিকাশের প্রধান স্থপতি শান্তিপদ গণচৌধুরীর মত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এনার্জি স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত অচিরাচরিত শক্তির প্রচারক প্রযুক্তিবিদ সুজয় বসু, অন্যদিকে ছিল পরমাণু শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঐতিহ্য। শিল্পী শ্যামলী তান খাস্তগীর পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন খোদ মার্কিন মুলুকে। নাট্যকার বাদল সরকার ‘ক-চ-ট-ত-প’ নাটকে (১৯৯৩) স্পষ্টই দেখান ‘পরমাণু বিদ্যুৎ পরিচ্ছন্ন, সস্তা ও নিরাপদ এই তিনটি কথাই ধাপ্পা এবং একেবারে মিথ্যে’। তা সত্ত্বেও এরাজ্যের বাম সরকার পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করল না। কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে বরাবর সোচ্চার বাম শাসক বারবার পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের সহযোগী হয়ে রইল।
১৯৯৮ সালের ১১ মে বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে ঘটল পোখরান বিস্ফোরন। এখনকার সার্জিকাল স্ট্রাইকের হাত ধরে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচারের মতই সেবারও ‘দেশপ্রেমের মানে পোখরান’ – এজাতীয় প্রচার শুরু হয়ে গেল। শুরু হল প্রতিরোধও। ১৮ সূর্য সেন স্ট্রীটে গড়ে উঠল ৯৭ টি গণসংগঠনের এক মঞ্চ যারা হিরোশিমা দিবসে এক মিছিলের ডাক দিল । যখন সেই মিছিলের ধারাবাহিক প্রস্তুতি চলছে তখন আচমকাই রাজ্যের শাসক দলের কর্তৃত্বপ্রবণতায় জন্ম নিল ‘৬ আগস্ট কমিটি’। ৬ আগস্ট দুটো মিছিলের সাক্ষী হল শহর কলকাতা। একদিকে শিয়ালদা থেকে বিড়লা তারামণ্ডল অবধি কয়েক হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল আর অন্যদিকে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের সংগঠিত মিছিল।
আশ্চর্যের ব্যাপার পোখরান-পরবর্তী পর্বেও সি পি এম এরাজ্যে পরমাণু শক্তিবিরোধী অবস্থান নিল না। অথচ সেই সময়ে একের পর এক লেখা বেরোচ্ছে নানান পত্রিকায়। পরমাণু শক্তি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ও লেখক প্রদীপ দত্ত একের পর এক বই -প্রবন্ধ লিখছেন। বিজ্ঞানী দেবকুমার বসু ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি-তে লিখলেন, পূর্ব ভারতে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কোন যুক্তি নেই (২৩ সেপ্টেম্বর ২০০০)। তার আগে সি পি এম-এর পার্টি মুখপত্র গণশক্তিতে বের হয়েছে দেবকুমার বসুর লেখা একটি চিঠি (১ মার্চ ২০০০), যাতে তুলে ধরা হয় পারমাণবিক শক্তির জ্বালানি ইউরেনিয়ামের মারাত্মক তেজস্ক্রিয়তার এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথা। বলা হয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তৈরী হয় প্লুটোনিয়াম, যা থেকে তৈরী হয় আণবিক বোমা অর্থাৎ আইনসম্মতভাবে বোমার উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ থাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে। আবার ২০০১–এর জানুয়ারিতে, সি পি এম- এর বিজ্ঞান সংগঠন বিজ্ঞান মঞ্চর প্রকাশনা ‘পরমাণু শক্তি কেন্দ্রঃ একটি বিতর্ক’-তে লেখা হয়ঃ ‘এই পুস্তিকার নানা তথ্য থেকে মানুষ পক্ষপাতমুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সমর্থ হবেন, এই আমাদের প্রত্যাশা’। এই পুস্তিকায় এমন কথাও বলা হল যে ‘পরমাণু বিদ্যুৎ ব্যবহার করা ছাড়া রাস্তা নেই’ ( পৃ ২৫)। এরপর সুন্দরবনে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হল ২০০৩এ। মথুরাপুরের পাঁচবারের সি পি এম সাংসদ রাধিকারঞ্জন প্রামাণিক পরমাণু শক্তিকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে ছিলেন। আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবু তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বললেন (রাধিকা) ‘বিজ্ঞান-টিজ্ঞান বোঝেন’। এমনই পরিহাস যে পরবর্তীকালে এই রাধিকা দল বদলে ২০০৪এর লোকসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে পরাজিত হন।
এখানেই গল্পের শেষ নয়। পরমাণু প্রশ্নে সি পি এম-এর দোলাচল তথা অবস্থানহীনতা আরও স্পষ্ট হয় ২০০৬এ। একদিকে জ্যোতিবাবুর উত্তরসূরী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর নেতৃত্বে ‘উন্নততর বামফ্রন্ট সরকার’ কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলতে প্রয়াসী হয়। অন্যদিকে লোকসভায় সি পি এম নেতা বাসুদেব আচারিয়া প্রশ্ন তোলেন ব্যয়সাপেক্ষ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার যৌক্তিকতা নিয়ে (পিপলস ডেমোক্রেসি, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৬)। হরিপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষ প্রতিরোধে সামিল হন। তাঁদের আপত্তির মূল কারণ ছিল মৎসজীবী, কৃষিজীবী ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ সহ পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের তাঁদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কা, পরিবেশের দূষণ, বিশেষ করে তেজস্ক্রিয় দূষণে স্বাস্থ্যহানির ভয়। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের পাশাপাশি হরিপুরের আন্দোলনও নেহাৎ ফেলনা ছিল না। মনে রাখুন এরাজ্যে সি পি এমের নির্বাচনী বিপর্যয়ের শুরু ২০০৮এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে; সেখানে পূর্ব মেদিনীপুরে জেলা পরিষদ হারাতে হয় তাদের।
অতীতে এরাজ্যের পরমাণু অস্ত্র-শক্তিবিরোধী আন্দোলনকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া দোর্দণ্ডপ্রতাপ সি পি এমের ভবিষ্যতে যে পরমাণু প্রশ্নে আঁধার নামবে তা কি কেউ ভেবেছিল! ২০০৯এর লোকসভা ভোটে কংগ্রেস-তৃণমূল আঁতাত আর এরাজ্যে সি পি এমের রক্তক্ষরণের সূচনার সঙ্গেই জড়িয়ে রইল পরমাণু প্রশ্ন। তার এক যুগ পর সেই রক্তক্ষরণ আজ রক্তশূন্যতায় পর্যবসিত।

বামের ব-এর তলায় ফুটকি

সি পি এম-এর শূন্য আসনে আজ আসীন বি জে পি। তারাই এরাজ্যের বিধানসভায় একমাত্র বিরোধী দল। (‘রাষ্ট্রীয় সেকুলার মজলিশ পার্টি’ নামক একটি রাজ্য দলের একমাত্র বিধায়ক কতটা বামমার্গীয় বিধায়ক জানা নেই।) কিন্তু কিভাবে এই অসম্ভব ঘটনা ঘটতে পারল? পুরো বাম ভোটার বি জেপি ভোটার হয়ে গেল কি করে? দুই প্রাক্তন সি পি এম বিধায়কও এবার বি জে পির পদ্মফুল প্রতীকে বিধানসভায় নির্বাচিত। কিকরে বামের ব-এর তলায় ফুটকি পড়ল ওপর-নিচ সবতলায়? নির্বাচক থেকে নির্বাচিত সবাই অবলীলায় বি জে পির লোক হয়ে যেতে পারলেন কি করে? ‘সি পি আই মা লে’র সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছিলেন যে কখনও কোনও বামপন্থী মিছিলে পা মিলিয়েছে সে যেন ই ভি এম-এ পদ্মফুলের পাশের বোতাম টিপতে একটু লজ্জা বোধ করে। কিন্তু সেই লজ্জা না পেয়ে এত বাম মানুষ নির্লজ্জ হয়ে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে গুরুত্ব দেওয়া এক কর্তৃত্ববাদী দলকে ভোটে ভরিয়ে দিল কি করে? মনে রাখুন ক্ষমতা না পেলেও বি জে পি এরাজ্যে ৭৭টি আসন এবং ৩৮.১% ভোট পেয়েছে।
প্রশ্ন হল, বামপন্থী মানুষের সমর্থন উগ্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী দল পাচ্ছে কি করে? তবে কি ‘বামপন্থা’র মধ্যেই গলদ ছিল? সেই বামপন্থা যথেষ্ট অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে নি? ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকে সি.পি.আই(এম) তাহলে কি শুধু এক নির্বাচন থেকে আর এক নির্বাচনের দিকেই যাত্রা করেছে? আর উন্নত থেকে উন্নততর সরকারের কথা বলে ভোট আদায় করেছে? মানুষের মধ্যে বস্তুবাদী চেতনা জাগানোর আদৌ কি কোন চেষ্টা করে নি?
সি পি এম ১৯৮৬ সালে বিজ্ঞান আন্দোলনের লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিল তার বিজ্ঞান সংগঠন বিজ্ঞান মঞ্চ। পার্টির নেতৃত্বে (পড়ুন কর্তৃত্বে) সেই বিজ্ঞান আন্দোলনে বৈজ্ঞানিক চেতনার বিকাশের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিজ্ঞান আন্দোলনে পার্টির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। (এই লক্ষ্যের সমর্থনে প্রামাণ্য নথি রয়েছে।) আর তা ছিল ভীষণভাবেই সরকারের মুখাপেক্ষী। কাজেই বিজ্ঞানমনস্কতার দিকে নজর দেওয়ার জরুরি কাজটাই আর করা হয়ে ওঠেনি। তাই বামপন্থী সরকারের ৩৪ বছরের শাসনে এরাজ্যে কোনভাবেই কমল না ধর্মান্ধতা আর জাতপাত। বাড়ল নানান ধরণের ধর্মব্যবসা। কেউ যদি বামপন্থী বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরলোকে বিশ্বাস না রেখে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর শ্রাদ্ধ না করেন তবে তার জন্য বরাদ্দ হওয়া নির্যাতনের খবর খবরের কাগজে মিলল, একই ভাবে মিলল ডাইনী সন্দেহে হত্যা বা ভিন্ন ধর্মে ও জাতে বিয়ে করার অপরাধে শাস্তি দেওয়ার খবর। নবযুগ তো এলই না, বরং আরও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতারই সাক্ষী হলেন এরাজ্যের মানুষ। এই প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইতে কিন্তু সামিল হওয়ার কথা ছিল বামপন্থী বিজ্ঞানকর্মীদের। কিন্তু দেখা গেল আদতে পার্টি ক্যাডাররাই হয়েছেন বিজ্ঞানকর্মী। তাদের কেউ কেউ দেওয়াল লিখলেন ‘মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান কারণ ইহা বিজ্ঞান’ আবার কেউ কেউ কব্জিতে লাল সুতো আর আঙুলে রত্নের আংটি পরে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তৃতা দিতে লাগলেন।
এই ফাঁকির সঙ্গে জুড়ে ছিল যেকোনভাবে ক্ষমতায় থাকার বাসনা। কাজেই আর পাঁচটা ভোটমুখী দলের সঙ্গে এদলের পার্থক্য যে বিশেষ ছিল তা নয়। সেজন্যই মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বক্তৃতার বিষয় হয়ে থেকে গিয়েছিল, ভোটের বাস্তবতা সব কেন্দ্রেই গরিষ্ঠ ভোটারের সঙ্গে ধর্ম মিলিয়ে পার্টির প্রার্থী ঠিক করত। আর তার সঙ্গে জুটেছিল সব কিছুতেই কর্তৃত্ব করার উদগ্র বাসনা। এল সি নামক সর্বশক্তিমান চাইত সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে, সালিশি বিচারে শামিল হতে।

আক্রমণের লক্ষ্য শ্রেণী-জাতি-বর্ণ

বিরোধী নেত্রীর নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার বদলে ক্যাডাররা স্বচ্ছন্দ বোধ করেছে তাঁর হাওয়াই চটি পরা বা কালীঘাটের খালের ধারে টালির বাড়িতে থাকা নিয়ে ব্যঙ্গ করতে। তার মানে নেতা-নেত্রী হতে গেলে সাধারণ বেশভূষা হওয়া চলবে না? দামি জুতো না পরলে হতে হবে ‘চটিপিসি’? সরকারের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ধরণের অধিকারপ্রাপ্তি নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়েছে। তাঁর ভুল উচ্চারণ বা শব্দ ব্যবহার নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে সরগরম থেকেছে পার্টির আই টি সেল। দেখা যাচ্ছে, এই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ সাধারণ মানুষ খুব ভালভাবে নেন নি। বোধহয় যেহেতু ২০১১তে তাঁর কাছেই পরাজিত হয়ে চৌত্রিশ বছরের রাজ্যপাটে দাঁড়ি পড়েছে তাই তাঁকে হারাতেই আগ্রহী হয়েছে সি পি এম। আর সেজন্যই এক অদ্ভুত যুক্তির ফ্যালাসি হাজির হয়েছে, “বি জে পি কে হারাতে হলে তৃণমূলকে হারাতে হবে”। এর যে কী অর্থ তা বুঝে ওঠা যায় নি। এর সঙ্গেই হাজির হয়েছে বিজেমূল তত্ত্ব। এর কোন কথাই নির্বাচকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় নি।
আর যে শ্রেণীহীন সমাজ গড়ে তোলা বামপন্থীদের লক্ষ্য তার বদলে দেখা গেছে সেই শ্রেণীচরিত্র পার্টির মধ্যেই রয়ে গেছে। আর তাই বামপন্থী পার্টির সভায় দেখা গেছে মাটিতে ত্রিপলের ওপরে গরীবগুর্বোদের বসার ব্যবস্থা আর চেয়ার বাবুদের জন্য। তাতেও ভাগ আছে। গদিওলা চেয়ার ক্ষমতাশালীদের জন্য আর বাকিদের জন্য সাধারণ চেয়ার। এটা কিন্তু মঞ্চের ছবি নয়, দর্শকাসনের ছবি। শুনলে গল্পকথা মনে হলেও ক্রমোচ্চশীলতার এছবি বাস্তব চিত্র। স্বাভাবিকভাবেই নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে পার্টির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মুখে শ্রেণীহীন সমাজের কথা বললেও জাতি-বর্ণ বৈষম্য যে কতটা ছিল তা আজ এরাজ্যের দলিত মানুষের অভিজ্ঞতার কাহিনী পড়লেই বোঝা যায়।
এবার ভোটের আগে একদল কমবয়সী প্রার্থী বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনী ময়দানে হাজির হয়েছিলেন। কম বয়স ছাড়া তাঁদের আর একটা মিল ছিল তাঁরা সবাইই প্রায় উচ্চশিক্ষিত এবং মধ্যবিত্ত। তাঁদের সম্পর্কে প্রচারে এই শিক্ষার ব্যাপারটাই বড় করে তুলে ধরা হয়েছিল। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রথাগত শিক্ষাতে ডিগ্রিধারী হতে হবে কেন? কেন শ্রমিক কৃষকরা কমিউনিস্ট পার্টিতে নেতৃত্বে আসতে পারবেন না? প্রার্থী হতে পারবেন না? আর তাছাড়া এই তরুণ দলের দিকে চোখ বোলালেও দেখা যাবে তাদের কেউ প্রাক্তন সি পি এম মন্ত্রীর ছেলে, কেউ প্রাক্তন সি পি এম বিধায়কের নাতনি। তাহলে জন্মগত আভিজাত্যের এছবিও কি সামন্ততান্ত্রিক নয়?

প্রশ্ন যখন উন্নয়ন

দ্বিচারিতা বা ভাবের ঘরে চুরি শুধু পরমাণু শক্তি, বিজ্ঞান চেতনা, শ্রেণী-জাতি-বর্ণ প্রশ্নে নয়, উন্নয়ন প্রশ্নেও। উর্বর জমি নষ্ট করে গাড়ি শিল্পে দেশের বৃহৎ পুঁজিকে ডেকে আনা বা পরিবেশ নষ্ট করে রাসায়নিক শিল্প গড়ার জন্য কুখ্যাত বিদেশী পুঁজিকে ডেকে আনার জন্য যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হয়েছিল তাকে গুরুত্ব দেওয়ার বদলে ‘ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে’ বলা নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক সংলাপ রচনা ছিল না। আর এটা কি একটা বামপন্থী দলের সরকারের কাজ ছিল? “কৃষি আমাদের ভিত্তি আর শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ” বলে গরীব মানুষের ওপর যে জবরদস্তি চালানো হয়েছিল তার জন্য কোনও ক্ষমা প্রার্থনা করতে আমরা বাম নেতৃত্বকে দেখি নি। বরং এনিয়ে কেউ কথা বললে তাকেই ‘উন্নয়নবিরোধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবারের ভোটেও সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম প্রশ্নে পার্টির বক্তব্য যে একই ছিল তার প্রমাণ তো প্রচারপর্বেই রয়েছে। তথাকথিত নবীন প্রার্থীদের মুখেও কোন নতুন কথা শোনা যায় নি। বরং সেই শিল্পোদ্যোগ যে কত ঠিক ছিল আর তাকে বাধা দেওয়ার জন্য রাজ্যবাসীর উচিত সি পি এম-এর কাছে ক্ষমা চাওয়া – এটাই যেন ছিল তাদের বক্তব্য। অথচ ওখানে বড় শিল্প গড়লে কি স্থানীয় মানুষ চায়ের দোকান করা আর ভ্যান চালানো ছাড়া কর্মসংস্থানের অন্য কোন সুযোগ পেতেন? যাঁরা খোঁজখবর রাখেন তাঁরা সকলেই জানেন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা সেজ (এস ই জেড, স্পেশাল ইকোনমিক জোন)-এ শ্রমিকের মূল অধিকারগুলোই স্বীকৃত নয়। তথ্য হিসেবে জানানো যাক যে কেন্দ্রীয় স্তরে ২০০৫ সালে স্পেশাল ইকোনমিক জোন জারি হওয়ার ঢের আগে ২০০৩ সালে এ-রাজ্যে সেজ আইন জারি হয়েছিল। সেই মর্মে রাজ্যের শিল্পসচিব নির্দেশনামা জারি করেন (মেমো নম্বর ১৮২৫/জে এস/ ডি সি/ ২০০৩)। এটা কি একটা বামপন্থী সরকারের কাছ থেকে কাম্য ছিল?

কাজেই শূন্যাবস্থা থেকে বামদের ফিরে আসা মানে বাম পার্টির প্রত্যাবর্তন নয়। প্রত্যাবর্তন ঘটা দরকার মানুষের স্বার্থ দেখবে আর ভাবের ঘরে চুরি করবে না এমন বামশক্তির। ‘অধিকার বুঝে নেওয়া প্রখর দাবিতে’ লড়াই চালানো সেই লাল ঝাণ্ডারই প্রত্যাশী মানুষ; তাদের মনে সেই পুরোন কথা, ““রুটি-রুজি কা লিয়ে লাল ঝাণ্ডা”।

[লেখক – এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়।]

Facebook Comments

1 thought on “ষোল আনা থেকে যদি ষোল আনা যায় হিসেবটা কষে দেখো দাঁড়াও কোথায় : সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় Leave a comment

  1. ভালো লাগলো, বিশেষত বিজ্ঞান আন্দোলন, পরমাণু প্রযুক্তির প্রসঙ্গে আলোচনা অভিনব।।পরমাণু বিদ্যুৎ নিয়ে বামফ্রন্টের ভেতরেও বিরোধিতা ছিল।সুন্দরবনের পরিকল্পনায় আর এস পি বিরোধিতা করেছিল। পরমাণু বিদ্যুৎ বিরোধী লেখাও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আসলে উন্নয়নের পথটাই হয়ে গিয়েছিল পুঁজি নির্দেশিত।

Leave a Reply