একটি টেক্সট মেসেজের জঠরের ভ্রূণ : সৌগত ভট্টাচার্য

fail

“স্বপ্ন দেখেছি এক দেখে বাকরুদ্ধ
বিধান সভায় নেই গৌতম-বুদ্ধ”

আজ থেকে ঠিক এক দশক আগে ইংরেজি হরফে লেখা এই মোবাইল টেক্সট মেসেজটি ফোনে ফোনে ঘুরছিল বিধানসভা নির্বাচনে মহাজোটের কাছে বামেদের ধরাশায়ী পরাজয়ের পর। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ক্ষমতায় বাম থাকবে না এটা একাধারে দুঃস্বপ্ন ও অনেকের কাছেই বহুদিন ধরে দেখা স্বপ্নের মত ঠেকেছিল। কৌতূক মেসেজটি যেন কোথাও গিয়ে একটা ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিল, এগারোর নির্বাচনের ঠিক এক দশক পর, পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিত থেকে বাম-কংগ্রেস পুরোপুরি সাফ হয়ে গেল!

২০০৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে যে বাম বিরোধী হওয়া নিম্নচাপ তৈরি করেছিল এবং তা ২০১১-এ পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার দুই কূলে পরিবর্তনের সাইক্লোন হয়ে আছড়ে পড়ে। মনে করলে দেখা যাবে, চৌত্রিশ বছরের বাম শাসন “পরিবর্তন”-এর পক্ষে তৃণমূলের হাত যে দল সবচেয়ে বেশি শক্ত করে ধরেছিল সেটা জাতীয় কংগ্রেস। তৃণমূলের নেতৃত্বে তিরিশের বেশি সংখ্যক পার্টি নিয়ে তৈরি যে বাম বিরোধী মহাজোট হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল শরিক যেমন কংগ্রেস তেমনি মহাজোটের আসনের হিসেবেও সে ছিল তৃণমূলের ঠিক পরেই, দ্বিতীয় স্থানে। পশ্চিমবঙ্গের মোট বাম বিরোধী ও ডানপন্থী ভোটকে একজায়গায় জড়ো করে ওপরের মেসেজ লিখনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয় তৎকালীন রাজনীতি!

এক দশক পর সদ্য অনুষ্ঠিত বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল-বিজেপির বিরুদ্ধে বাম জোটের (সংযুক্ত মোর্চা) সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কংগ্রেস। একদিকে তৃণমূল ও অন্যদিকে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করার জন্য এক দশক আগের রাজনৈতিক শত্রু বাম শিবিরকেই কংগ্রেসের এবারের নির্বাচনের বন্ধু বলে বোধ হয়েছে। বিজেপির সাম্প্রদায়িকতার প্রচার ও প্রসার আটকাবার জন্য একমাত্র শক্তি হিসেবে বাম পক্ষকেই বন্ধু বলে মনে করেছে। জাতীয় কংগ্রেসের কাছে সম্ভবত এটা অজানা জানা ছিল না যে ২১-এর নির্বাচনে আর যাই হোক কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে না। ফলত, জাতীয় কংগ্রেস নিজের অস্তিত্বকে পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখবার জন্য বামের হাত ধরে। তার ফল হয়, সংযুক্ত মোর্চার ভোট শেয়ারের নিরিখে কংগ্রেস সেকেন্ড বয়। অন্যভাবে বলা যায়, জাতীয় কংগ্রেস বিগত এক দশক ধরে কোনো জোটের সঙ্গে না গিয়ে বিধান সভার ভোটে একক ভাবে অংশ নেয় নি। সুতরাং একক ভাবে ভোটে লড়াই করলে কংগ্রেসের ভোট শেয়ার কি হতে পারত সে বিষয়ে হাওড়া ব্রিজে তোতা পাখি নিয়ে বসে থাকা মানুষজন বলতে পারলেও রাজনীতির কারবারিরা বলতে পারবেন কি না সংশয় জাগে। আদতে, কেন্দ্রের দ্বারা পরিচালিত কংগ্রেস, কেন্দ্রের সরকারকে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে গিয়ে দিশাহীন রাজনীতি করে যাওয়া দলটি নিজেকেই নিজেই একটা ব্র্যাকেটে পরিণত করেছে। রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরে নিজেকে আত্মঘাতী ভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার দৃষ্টান্ত ভারতীয় রাজনীতিতে খুব বেশি নেই। জাতীয় ক্ষেত্রের পরিমাপে রাজ্য কংগ্রেসের অস্তিত্বকে ব্র্যাকেটে নিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যেতেই পারত। কিন্তু ২০১১-র আগে পর্যন্ত বাম ও কংগ্রেসের পারস্পরিক বিরোধিতার ইতিহাস, নীতিগত অবস্থানকে যদি অস্বীকার করা যেত।

স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিকের জেলাগুলির বাম আসন সংখ্যার শুষ্ক একটি পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার প্রতিটি নির্বাচনেই বামেদের প্রতিনিধিত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। মনে রাখা দরকার যে বামের সেই লড়াই ছিল অধুনা মিত্র জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। দেখা যাক সে সংখ্যা, ১৯৫২ সালে দার্জিলিংয়ের কালিম্পং ও মালদার গাজল থেকে বাম প্রতিনিধি সংখ্যা ছিল ২ জন। ১৯৫৭-তে বিধানসভার মোট আসন সংখ্যা বেড়ে হয় ৪০ টি, বাম বিজয়ী প্রতিনিধি সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ জন (সিপিআই ৩, আরএসপি ১)। ১৯৬২-র নির্বাচনে এক ধাক্কায় সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১১-তে। ১৯৬৭ সালে সেই বাম প্রতিনিধি সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬-এ। ১৯৬৯এ হয় ১০ এবং ১৯৭১-এ সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ৫ জনে।

১৯৫২ এর নির্বাচন ছাড়া উত্তরবঙ্গের বাম প্রতিনিধিরা কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতা ছাড়াও গণ আন্দোলন লড়াই-এর মধ্যে দিয়ে তিল তিল করে নিজের সাংগঠনিক ভীতকে সুঠাম করে তুলতে থাকে, তারাই ডুয়ার্সের মাটিকে সবুজ থেকে রাঙা করে তোলে। এভাবে বলা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত একদিকে তরাই ডুয়ার্সের সমতল ভূমিতে নতুন নতুন করে ছোট বড় চা বাগান তৈরি হচ্ছে, হস্তান্তর হচ্ছে, ছোটনাগপুর হাজারীবাগ থেকে মানুষ আসছেন চা বাগানে কাজের সন্ধানে অন্যদিকে তিস্তা তোরসা জলঢাকার পাড়ে বাংলাদেশ থেকে ক্রমাগত আসা অসংগঠিত মানুষর ঢল বাম ভোট ব্যাংককে মজবুত করে তোলে। ১৯৭২-এর বিতর্কিত নির্বাচনেও সেই মজবুত সাংগঠনিক ছবির আভাস পাওয়া যায়। মাদারী হাট কেন্দ্রে চা শ্রমিকদের ভোটে আর.এস.পি-র বেস্টার উইচ জয়ী হন। ১৯৭৫-এর জরুরী অবস্থা, খাদ্য সংকট প্রভৃতি কারণে রাজনৈতিক ক্ষোভ উত্তরভূমি মূলত তারাই ডুয়ার্সে এসে আছড়ে পড়ে। ১৯৭৭-এ জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট গঠন এক দিকে যেমন চা বাগান কেন্দ্রিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের পালে তুমুল হওয়া যোগায় তেমনি চা বাগান মালিক পক্ষকে চাপে রাখার জন্য একটা বাড়তি ক্ষমতা ভোগ করতে থাকে ট্রেড ইউনিয়ন গুলো। আবার পরবর্তী কালে সেই ট্রেড ইউনিয়নই চা বাগানে পঞ্চায়েতের ডাল পালা বিস্তারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইদানীং চা বাগানে সেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকেই কাজে লাগিয়ে তার মাধ্যমে তৃণমূল সরকার কল্পতরু হয়ে উঠেছে। চা শ্রমিকের মুজুরি বৃদ্ধি আন্দোলনে বাম সংগঠন ও কংগ্রেসি সংগঠনের কথা মাথায় রাখতেই হয়। মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্নে মূলত বাম নেতৃত্ব বারবার সোচ্চার হয়েছে বিধান সভায়। চা বলয় থেকে প্রান্তিক ট্রেড ইউনিয়ন নেতার উত্থান সংসদীয় রাজনীতিতে তরাই ডুয়ার্স অঞ্চলের এক পরিচিত ঘটনা।

৩৪ বছরের বাম শাসনের মধ্যে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে। তার একটি হল, এই সময়কালে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ, বন পর্যটন, কৃষি ও সমষ্টি উন্নয়ন, উচ্চ শিক্ষা, সমবায় ও শিল্প দফতরের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পায় উত্তরবঙ্গ । বলা বাহুল্য, কংগ্রেসি আমলে বিরোধী দলনেতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীত্ব অনেকাংশেই পেয়েছিল উত্তরবঙ্গ তা অনেকেরই জানা। বলা যায়, প্রথম দফায় বাম সরকারের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নীতি উত্তরবঙ্গের মানুষকে বামফ্রণ্ট সরকারের প্রতি যে বিশ্বাস বা আস্থা এনে দিয়েছিল, সেটারই আনুষ্ঠানকি সমাপ্তি ঘটে ২০১১ এর বিধানসভা নির্বাচনে।

২০১১-তে প্রথম বার তৃণমূল ক্ষমতায় আসা ছিল বামফ্রন্ট সরকার বিরোধী রায়ে মহাজোটের ক্ষমতা প্রাপ্তি । সেবারই উত্তরবঙ্গের জন্য একটা নতুন দফতর চালু হল, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর। মন্ত্রী হলেন উত্তরবঙ্গ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি। পরবর্তী কালে বন ও পর্যটনের ও আরো কিছু মন্ত্রীত্ব পেল উত্তরবঙ্গ। কিন্তু ২০২১-এর নির্বাচনের পর তৃতীয় মা মাটি মানুষ সরকারে মন্ত্রীত্ব পায় উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিরা বুলু চিকবরাইক পরেশ অধিকারী আর সাবিনা ইয়াসমিন প্রতিমন্ত্রী হয়েছে। আর বিপ্লব মিত্র পূর্ণমন্ত্রী। যা মোট মন্ত্রী সভার আয়তনের তুলনায় সামান্য।

২০২১-এর নির্বাচনে প্রথমবার বাম প্রতিনিধি শূন্য হওয়াটা খুব মামুলি বিষয় নয়। এই শূন্যতা আসলে অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলে আসা চা শ্রমিক আন্দোলের বা উত্তরবঙ্গের অন্যান্য গণ আন্দোলনের আদর্শগত, বৌদ্ধিক ও সাংগঠনিক ভীত নিয়েই প্রশ্ন তোলে। ২০১৬-র লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে তারাই ডুয়ার্সের ও দার্জিলিংয়ের চা বাগান ও সমতল ভূমির গোর্খা নেপালি বোরো রাভা মেচ সাঁওতাল আরো অন্যান্য জনজাতি ও বৃহত্তর রাজবংশী ভোটারদের একটা বড় অংশের সমর্থন লাভে সক্ষম হয় বিজেপি। এই অঞ্চলে ক্রমশ বিজেপির প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। তার হাতে গরম ফল পাওয়া যায় ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে। উত্তরবঙ্গের ৮ টি আসনের মধ্যে ৭ টি আসনই পায় বিজেপি। এর পেছনে বিগত শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের সাধারণ মানুষকে ভোট দিতে না দেওয়ায়, পরোক্ষ ভাবে ভোটদাতার প্রতিই শাসক দলের অনাস্থা এই ফলাফল ঘটিয়েছিল এটা একটা কারণ হলেও, বিজেপির বাড়বাড়ন্তর সবটা কারণ না। এই সাতটি লোকসভার অন্তর্গত ৪৯ টি বিধান সভা আসনের মধ্যে তৃণমূল ২০২১-এর নির্বাচনে কিছুটা হারানো জমি উদ্ধার করতে পারলেও এ বছর ভোটেও বিজেপির দাপট লক্ষ্যনীয়। বামেরা কিন্তু সূচাগ্র জমি উদ্ধার করতে ব্যর্থ শুধু নয়, ধারেকাছেও যেতে সক্ষম হয়নি। অর্থাৎ চা বলয় ও চাষযোগ্য উত্তরভূমিতে “বাম শ্রমিক আন্দোলন” বলে যা ছিল সেটা তাহলে কি শুধুই ভোটে জেতার একটা ম্যানেজেরিয়াল পাটিগণিত! তা না হলে তত্ত্বগত ভাবে সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে বাম শ্রমিক আন্দোলনের তো সম্পর্ক থাকার কথা না। যদি আন্দোলন থাকত তবে বিজেপিকে রোখা না গেলেও ভোটের নিরিখে তৃতীয় চতুর্থ বা তারও পরে বামপ্রার্থীরা!
এ শুধু আশ্চর্যের নয়, ভাবনারও !

বিজেপির এই উত্তরণ এবং বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং উত্তরবঙ্গে ক্ষমতা বৃদ্ধি আসলে তৃণমূলের হারের চেয়ে কম কিছু নয়। বিজেপির ক্ষমতায় না আসায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর “ফ্যাসিস্ট শক্তিকে আটকানোর” আত্মশ্লাঘা থাকলেও, ইলেক্টরাল পলিটিক্সের নিরিখে বিজেপির এই আসন সংখ্যা যথেষ্ট ভাবনার কারণ। উত্তরবঙ্গের বৃহৎ জনগোষ্ঠী রাজবংশী জনসমাজের সুপ্ত জাতি সত্বার আবেগকে ব্যবহার করে পৃথক রাজ্যের দাবি উঠবে এটাই স্বাভাবিক। ঠিক যেমন ২০০৯ সালে লোকসভায় দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে যশবান্ত সিংকে জেতানোর জন্য পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে সমর্থন করে বিজেপি, পরের বার ২০১৪-য় স্থানীয় স্তরের জোট করে একই আগুনে হাওয়া দিয়ে সুরবিন্দর সিং আলুয়ালিয়াকে জেতায়। আদিবাসী অনগ্রসর জনজাতি প্রধান অঞ্চলে মিশনারি কায়দায় আর.এস.এস-এর কাজকর্মের প্রচার ও প্রসার করতে থাকে বিজেপি সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে। যে কার্যকলাপের খেয়াল শহুরে “ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে” রুখে দেওয়া মধ্যবিত্তর রাখা একপ্রকার দুঃসাধ্য। দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে নেপালি ও গোর্খা জাতিসত্বার আবেগকে উষ্কানীমূলক গুরুত্ব দান করেছে বিজেপি আর.এস.এস, যা আদতে আইডেন্টিটি পলিটিক্সকেই ইন্ধন যোগাচ্ছে যেমন আঞ্চলিক দাবিতে রাজ্য গঠনের বীজ গুলিকে জল হওয়া দিচ্ছে। এদিকে মা মাটি মানুষ সরকারের উত্তরবঙ্গ এ মন্ত্রীত্ব না দেওয়া যেমন সরকারি ভুল সিদ্ধান্ত, সেটাকে ইস্যু করে উত্তরবঙ্গের মন্ত্রীত্ব থেকে বঞ্চনার জিগির তুলে নানা আড়ালে অন্যান্য আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে দিয়ে নিজের অভিলাষ পূরণের জন্য পৃথক উত্তরবঙ্গ গঠনের ডাক দিচ্ছে নব্য বিরোধী দলটি। যাঁরা নানা সামাজিক মাধ্যমে বা ক্ষুদ্র সংগঠন দিয়ে প্রচার চালিয়ে উত্তরবঙ্গকে এক জতুগৃহে পরিণত করেছে। উল্টোদিকে তৃণমূল স্তরের প্রায় গোটা দলীয় বাম আন্দোলন মাঠঘাট থেকে কুমীর ডাঙ্গা খেলতে খেলতে মধ্যবিত্তের ফেসবুক দেওয়ালে সংকুচিত হয়েই চলছে রোজ রোজ!

অন্যভাবে বলা যায়, বিগত এক দশকে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে কারচুপি স্বজনপোষন আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা প্রতিবাদের জ্বলন্ত ইস্যু থাকলেও তা নিয়ে বিধানসভা-প্রিয় বাম নেতৃত্ব রাস্তায় নেমে কোনো আন্দোলনের আগ্রহ প্রকাশ করে নি, (কিছু দিশাহীন ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।) যা গোটা বামফ্রন্ট-এর অস্তিত্বকে মূল স্রোতের রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করে তোলে। আবার বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্থান, তৃণমূলের জেতার থেকেও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপি নেতৃত্ব একই ভাবে ক্ষমতায় থেকে বা না থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভাজনের রাজনীতির কোনো বিরতি দেয়নি। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস যখন রাজবংশী ভোটের জন্য অতুল রায় বা বংশীবদন বর্মনকে মুখ করছে, অন্যদিকে বিজেপি ঠিক সেই সময় অনন্ত মহারাজকে তুলে ধরছেন। কিন্তু রাজবংশী ভোট ব্যাংককে ধরার জন্য কাউন্টার পলিটিক্স হিসেবে বামফ্রণ্ট নেতৃত্বর কোনো রাজবংশী মুখ দেখা যাচ্ছে না। যদিও এটা তাঁদের সামগ্রিকতায় বিশ্বাস। কিন্তু এই বিশ্বাস কখনোই ইলেক্টরাল পলটিক্সের জন্য মঙ্গলকর না, বিপক্ষে শত্রুর ক্ষমতা আন্দাজ করে রণকৌশল সাজানোই সহবত। শ্রেণী রাজনীতি করতে গিয়ে নিজেদের আপডেট না করায় এটা ঠাহর করতে পারেনি হয়ত যে উত্তরবঙ্গে শ্রেণী ও সাবকাস্ট সমর্থক নয়। যা প্রত্যাশিত তাই হয়েছে, রাজবংশী মুসলিম নস্য শেখ ভোট তৃণমূলে গেছে। বাকিটা হিন্দু ভোট বিজেপি নিজের পকেটে নিতে সামর্থ হয়। বামের হাতে রইল পেন্সিল! বামের ভোট রামে শিফট হওয়ার যে থিওরি এ ক্ষেত্রে তা প্রমাণিত। “অবহেলিত” ও “বঞ্চিত” উত্তরবঙ্গকে সফট টার্গেট করে বিজেপি যে বিভাজনের মারাত্মক খেলায় মেতেছে, তার সাহস ভরসা যোগাচ্ছে তো সেই ইলেক্টরাল পলিটিক্সের হিন্দু ভোটই, এটা তো অনস্বীকার্য ।

প্রশ্নটা হল বাম কংগ্রেস যদি কিছু আসনে জয় লাভ করত তবে কি হত? চা বাগানের শ্রমিকের দৈনিক মুজুরি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কৃষি চা বাগান বনবস্তি উন্নয়ন সম্পন্ন হয়ে যেত? কৃষি ক্ষেত্র অধ্যুষিত উত্তরবঙ্গ কার্যত শিল্প বিহীন এক তালুকে কি আমূল পরিবর্তন ঘটে যেত রাতারাতি? কখনোই হত না, আগেও হয় নি। তবে অর্থনৈতিক ভীত বিকাশের লক্ষ্যে মূলত যাঁরা বিধান সভায় সোচ্চার হতেন সেই বাম কংগ্রেস প্রতিনিধি থাকবে না সেটা অবশ্যই অন্য বার্তা বহন করে। অর্থাৎ পুরোটাই শাসকের দয়া দক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করবে, দাবি বলে কিছু থাকবে না। শাসক যেদিন বলবেন, “আমি করে দিলাম” সেদিনই একটা গোটা জনপদের “উন্নয়ন” হবে। অর্থাৎ দরকষাকষির কোনো অবকাশ থাকল না। আরো গভীরে দেখলে বোঝা যাবে, শাসক ও বর্তমান বিরোধী দলের অর্থনৈতিক অবস্থান কি ভাবে প্রভাব ফেলবে উত্তরবঙ্গ তথা গোটা বাংলায়। তৃণমূল সরকার যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমাজ কল্যাণকর রাষ্টের মুখোশের আড়ালে খয়রাতির রাজনীতি শুরু করেছে অন্যদিকে বিজেপি তার সম্পূর্ণ বিপরীতে বেসরকারি উদ্যোগের পক্ষে। অর্থাৎ বিরোধী দলের থেকে দাবি আদায় বা দরকষাকষির জায়গা শূন্য, আশাও শূন্য। দুটো দক্ষিণ মেরুর একটি জনমোহিনী অন্যটি ভূর্তকি তুলে দেওয়ার পক্ষের দলের এজেন্ডাগত কোনো পার্থক্য না থাকা, “ব্যালেন্স ফোর্সকে” নষ্ট করবে আগামীতে! কংগ্রেসি মধ্যপন্থার রাজনীতি থেকে বঞ্চিত হবে বিধান সভা। যা বহু দলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে কখনোই স্বাস্থ্যের লক্ষণ না।

দুই দক্ষিণপন্থী দলের আসন কেনা বেচা, বা ভোটের টিকিট “কেনার” জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ আদতে দারিদ্র একজন রাজবংশী কৃষক বা সাঁওতাল চা শ্রমিককে রাজনৈতিক ভাবে আরো প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর করে তুলবে। অর্থবানের আইন সভায় প্রবেশ আদতে সেই চা বাগান মালিক বা জোদ্দার, আলুর ভুঁইফোড় ইত্যাদি শ্রেণীরই প্রতিনিধিত্ব করবে। ভোটের টিকিটের “কেনার” জন্য যে অর্থ “ইনভেস্ট” করেছিল সেটা তুলতে যে কী পরিমাণ দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় বিধান সভায় প্রতিনিধিত্ব না থাকলে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা সংসদীয় রাজনীতিতে থাকে না। সে কারণেই দুই চার পাঁচটা আসনের সঙ্গে শূন্যতার কোনো পার্থক্য নেই। সংসদীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়েও সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা যায় বা রদ করা যায় সেই নজির ভারতের গণ আন্দোলনের ভিত্তি। “গণ” শব্দটার সঙ্গে সংসদীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। সেই আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নিবিড় জনসংযোগ, আর মানুষের সেই আন্দোলনকারী দলের প্রতি আস্থা। দুর্ভাগ্য বশত দলীয় বামপন্থার ক্ষেত্রের মানুষের সেই আস্থা ও বিশ্বাস দুটোই পশ্চিমবঙ্গে অনুপস্থিত। ১৯৫২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যে আস্থা বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাম কংগ্রেসের ওপর রেখেছিলেন, শেষ দশ বছর ফেসবুকের দেওয়ালে তার সমাধি রচিত হয়। একের পর এক তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গণ আন্দোলনের ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সেটাকে হাতিয়ার করতে যেমন ব্যর্থ হয় বামফ্রন্ট। ঠিক সেই সময় রাজ্য সরকারের জনমোহিনী নীতি রাজ্য তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গের সংখ্যা গরিষ্ঠ গ্রাম ও শহরতলির নির্বাচক মন্ডলীকে পরোক্ষ বা ব্যক্তিগত সুবিধা প্রাপ্তির জালে এমন ভাবে জড়িয়ে ফেলে তার থেকে মুক্তিদান সম্ভব না। যদি বা সম্ভব হয় তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় অন্য আরেকটা জনমোহিনী পার্টির কাছেই, যার নাম বিজেপি, যে আবার কেন্দ্রের সরকার বাহাদুর। ফলে তৃণমূল-বিজেপি বৃত্তের বাইরে সে না পারছে যেতে, আবার তাঁর চাওয়া পাওয়া নিয়ে আন্দোলন করবে তাঁর প্রতি নেই আস্থা ভরসা বিশ্বাস।

বিগত দশকে ১৭ টি জনজাতি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে রাজ্য সরকার। আবার অন্যদিকে বিজেপি ছোট রাজ্যর সমর্থক দল। তারাও সেই সুতোয় সেই একই জিপিলি ঝুলিয়ে দেয়। সচেতন ভাবে ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বাকে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ করে দেয়, আবার বৃহৎ জাতিসত্ত্বাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তরবঙ্গ এবং গাঙ্গেয় সমভূমিতে। কখনো ধর্মের ভিত্তিতে, কখনো জাত পাত বর্ণের ভিত্তিতে, যা আদতে বিভেদের দেশ তৈরি করে ক্ষমতা দখলের প্রয়াস। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি রক্তক্ষয়ী হতে বাধ্য। ফলে ১৭-এর বদলে ২৫ বা ৫০ টি উন্নয়ন বোর্ড গঠন হলেও প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। হিন্দুত্ববাদী আদর্শ বা ছোট রাজ্য মাথাচারা দিতে বাধ্য।

“No vote to BJP” এই তিন শব্দের মেসেজটা তো ছিল আদতে বিজেপির প্রবল অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়া। সেই এক দশক আগের ছোট্ট টেক্সট মেসেজটার জঠরে এই তিনটি ইংরেজি শব্দই ভ্রূণ হয়ে বেড়ে উঠছিল। সেই ভ্রূণ অনেকটা জল হাওয়া ও শূন্যতা পেয়েছিল হাত পা ছড়ানোর জন্য! শুধু আমরা অনেক দেরিতে খেয়াল করেছি মাত্র!

[লেখক – জলপাইগুড়ির বাসিন্দা। ইতিহাসের ছাত্র ও শিক্ষক। ময়নাগুড়ি কলেজে শিক্ষকতা করেন। মূলত: গদ্যকার। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব ওয়েবজিনে ও বেশ কিছু পত্রিকায় নিয়মিত লেখাপত্র প্রকাশিত। লেখার বাইরে ঘুরে বেড়ানো ও ক্যামেরায় গল্প বলা অন্যতম শখ।]

Facebook Comments

1 thought on “একটি টেক্সট মেসেজের জঠরের ভ্রূণ : সৌগত ভট্টাচার্য Leave a comment

  1. ভালো বিশ্লেষণ… তবে এর বাইরেও আরও অনেক কিছু লুকিয়ে আছে।

Leave a Reply