শূন্য থেকে তা… : স্বপন রায়

fail

শূন্য পাওয়া ছেলের যেমন হয়, শোকগ্রস্ত মুখ, ঝুলে যাওয়া চোয়াল, হাহাকারি ‘রেটরিক’, এবারেও হল। বামেদের বাংলা দুর্গ ধুলোয় বিলীন দেখে আর যা হওয়ার ছিল, তাও হল। দোষারোপ, আত্মপক্ষ ইত্যাদি। শুধু কোভিডের মহামারী এই বামধ্বস্ত বাংলায় অজস্র তরুণকে ওই নির্বাচনী হারের আগে এবং পরে করে তুলল প্রকৃতার্থে বামপন্থী। ভোটে শূন্য, কোথায় ঘরে বসে হা-হুতাশ, সমালোচনা আর কোথায় অক্সিজেন সিলিন্ডার, ওষুধ, পথ্য নিয়ে অসহায় মানুষের দাঁড়ানো! ঠিকইতো, ঠিক কোথায় ছিল এই হার-না-মানা মনোবল?
সাহিত্যের আঙিনায় রাজনৈতিক শূন্যতা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে জানি না! সাহিত্য কিছুটা থমকে দিশেহারা হয়ে আবার সঞ্জীবিত হয়, এটা দেখেছি। আর ওই সঞ্জীবিত সাহিত্য কোনও নির্দিষ্ট দলের পথ্য হয়ে ওঠে না এটাও দেখেছি। রাজনীতি একটি বিষয়। আর বিষয় কথাটাই সামন্ততান্ত্রিক। অদ্ভুত ব্যাপার হল যে কোনও রাজনীতিরই নিয়তি হল বিষয় কেন্দ্রিক হয়ে ওঠা। বস্তু কেন্দ্রিক নয়, বিষয় কেন্দ্রিক! রাজনীতি বিমূর্ত হয় না। এরফলে নতুন ভাবনায় ভাবিত সাহিত্য ভাবনার সঙ্গে একটা বিরোধ গড়ে ওঠে আবহমানের বামপন্থার!
পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। সব ভাবনার মূলে আছে বস্তুগত শ্রেণি ভাবনা যা আন্তঃনির্ভরশীল ব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বে জারিত হয়, এটাই মার্ক্সবাদের প্রাথমিক পাঠ। বস্তুর এই ভিত্তিই হেগেলকে বিচ্ছিন্ন করেছিল মার্ক্স-এর দার্শনিক ভাবনা থেকে। দুনিয়া পেয়েছিল সেই অপূর্ব তত্ব, যা ‘ঐতিহাসিক ও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ হিসেবে পরিচিত। কি বলেছিলেন মার্ক্স?
‘Marx argued that all mental (ideological) systems are products of real social and economic existence. For example, the legal system reflects the interests of the dominant class in particular historical periods rather than the manifestation of divine reason. Marxist dialectic can be understood as the science of the general and abstract laws of development of nature, society and thoughts. It considers the universe as an integral whole in which things are interdependent, rather than a mixture of things isolated from each other. All things contain within themselves internal dialectical contradictions, which are the primary cause of motion, change and development in the world. Dialectical materialism was an effective tool in the hands of Marxists, in revealing the secrets behind the social processes and their future course of development.’ (Marxism and Literary Theory / Nasrullah Mambrol).
এই ‘Internal dialectical contradiction’ না বুঝে সৃষ্টি হল যান্ত্রিক প্রচার সাহিত্য, কিছুটা সময়ের দাবীতে এবং কিছুটা সংগত কারণেই (সোভিয়েত বিপ্লবের পরে অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে) যা ওই বিশেষ পরিসরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে রইল সামাজিক দ্বন্দ্বের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা সাহিত্য ভাবনা। এর কোনও সরলরৈখিক প্রবাহ ছিল না। থাকা সম্ভবও নয়। এমনকি প্রচলিত মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণে এই ছোট ছোট দ্বন্দ্বগুলির বহুমাত্রিক কিন্তু আপাত উদ্দেশ্যহীন চলনগুলি ধরা পড়ল না। তাদের কাছে মুখ্য হয়ে উঠল মূল দ্বন্দ্বটি। পুঁজির সঙ্গে শ্রমের বা সামন্ত প্রভুদের সঙ্গে ভূমিহীন কৃষকদের ইত্যাদি, তারা বিপ্লবের স্তর ঠিক করতে গিয়ে খেয়ালই করল না ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাতিগত বা ভাষাগত দ্বন্দ্বের বিকাশগুলি। এরফলে, এই দেশে, তেলেঙ্গানা রাজ্য’র সৃষ্টি হল, কমিউনিস্টরা ভাষাগত আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বটি অগ্রাহ্য করল, তেলেঙ্গানা আর অন্ধ্রপ্রদেশ দুটোতেই বামশক্তি প্রান্তিক হয়ে গেল! পঃবাংলায় বিগত দশ বছরে কৃষিজমির চরিত্র পরিবর্তন হয়ে চলেছে। বিশাল আকারের কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে মাছের ভেড়িতে। এই ভেড়িগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নতুন দ্বন্দ্ব, মাছের ভেড়ির মালিক আর মাছ-কৃষকদের দ্বন্দ্ব, পঃবাংলা-র বামশক্তির কাছে কোনও গুরুত্বই নেই এই প্রান্তিক দ্বন্দ্বের, তারা বস্তাপচা বিপ্লবের স্তর ভিত্তিক দ্বন্দ্বে আটকে আছে।এমনকি বর্গাবিভক্ত ছোট ছোট জমিগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক নতুন দ্বন্দ্ব, গরীব চাষি এবং সম্পন্ন দাদনকারীদের। এর থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে জমিগুলির ব্যক্তিমালিকানা অক্ষুণ্ণ রেখে কো-অপারেটিভের আওতায় নিয়ে আসা। এর জন্য প্রয়োজন আন্দোলনের। বামপন্থীরা প্রথম থেকেই কো-অপারেটিভ আন্দোলনকে গুরুত্ব দেয়নি। যদি দিত, ৩৪ বছরের শেষ ১৫ বছরে কৃষিজমিতে গুণগত পরিবর্তন দেখা দিত, মাছের ভেড়ি করার প্রবণতা কম হত, চাষির ব্যক্তিগত আয় দ্বিগুণ হত। বাম-শক্তি এসব না করে কাস্টমারি নবান্ন অভিযান, নির্বাচনের আগে ব্রিগেড ইত্যাদি করে আত্মসন্তুষ্ট হয়ে বসে ছিল। অন্যদিকে ফাশিস্ত শক্তি আর স্বৈরাচারী শক্তি বাংলার রাজনৈতিক জমি ভাগ করে নিচ্ছিল নিজেদের মধ্যে। ‘আমরা আক্রান্ত’ ইত্যাদি বলতে হবে, হবেই। কিন্তু বাংলার ভোট কোনদিকে যাবে ঠিক করে যে কৃষকরা তাদের ইস্যুগুলির সঠিক নির্বাচন করে আন্দোলনে না গেলে এই ৪% ভোটও কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকবে না!

যাইহোক, এতো গেল শুকনো কথাবার্তা। এবার আসি সাহিত্যে বাম-শূন্যতার প্রভাব ইত্যাদিতে। সাহিত্য’র বামপন্থা, কমিউনিস্টদের শাসন ক্ষমতা থেকে দূরে থাকার সময়ে অথবা কমিউনিস্টরা সংসদীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন দেশে গৌণ থেকে গৌণতর হয়ে যাওয়ার সময়ে আমার মতে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। বিপ্লব-পূর্ব বা বিপ্লব চলাকালীন রুশ সাহিত্য এবং রুশ বিপ্লবের পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুমোদিত সাহিত্য’র তুলনা করলেই এটা বোঝা যায়। পাশের দেশ পাকিস্তানের উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। স্বাধীনতার পরে তাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য প্রতিভাগুলোই বাম সাহিত্য আন্দোলনের ফসল। অনুসন্ধিৎসু পাঠকমাত্রই জানেন যে, এই ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যধারায় একটি সংহত রূপ গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। ব্রিটিশবিরোধী সেই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যায় সাধারণ মানুষের আর্তিও, অনুঘটক ছিল IPTA আর Progressive Writers’ association (১৯৩৬)। ধর্মমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের আখ্যান, ভাবনা, অনুভব উঠে আসতে থাকে। আজ যখন ফিরে তাকাই, কী সব নাম, কী যে তাদের সৃষ্টি, আর হয়ত এমন প্রতিভার বিচ্ছুরণ এই উপমহাদেশে আর হবে না! যাইহোক দেশভাগের পরে এই প্রগতিশীল কবি, লেখক, শিল্পী, কলাকুশলীদের একটা অংশ পাকিস্তানের অংশে চলে যাওয়ায় তাঁদের সেখানেই সক্রিয় হয়ে উঠতে হয়। আর তাঁরা অচিরেই একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। মান্টো, ফয়েজ, হাবিব জালিব, আহমেদ ফরাজ কিন্তু সেই আক্রমণে পিছু হঠেন নি। আরও জোরের সঙ্গে সেকুলার ভাবাদর্শের কথা বলেছেন। স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। বারবার তাঁদের বন্দী করা হয়েছে। বহুবার দেশান্তরী হতে হয়েছে কিন্তু আমৃত্যু মাথা নত করেন নি তাঁরা অসভ্য, বর্বর রাষ্ট্রের কাছে। এই দেশে অনেকেই এঁদের কথা জানেন না। না বুঝে, না জেনে হাস্যকর কমেন্ট করেন ওদেশের ধর্মান্ধদের মতই। এই ‘নজম’টি আহমেদ ফরাজ পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে একটি জাতি দাংগার বিরুদ্ধে লেখেন। এখনো এই কবিতাটি এই উপমহাদেশে কতটা প্রাসঙ্গিক পাঠক যদি পড়েন তাহলে বুঝতে পারবেন। আমি একটি ভাবানুবাদও দিলাম।

তুম আপনি আকিদোঁ কে নেজে
হর দিল মে উতর যাতে হো
হম লোগ মোহাব্বতওয়ালে হ্যায়
তুম খঞ্জর কিঁউ লহরাতে হো

ইস শহর মে নঘমে বহনে দো
বস্তি মে হমে ভি রহনে দো
হম পালনহর হ্যায় ফুলোঁ কে
হম খুশবুকে রখওয়ালে হ্যায়
তুম কিস কা লহু পিনে আয়ে
হম প্যার শিখানেওয়ালে হ্যায়

ইশ শহর মে ফির ক্যা দেখোগে
যব হরফ ইহাঁ মর যায়েগা

যব তেঘ পে লয় কাট যায়েগা
যব শের সফর কর যায়েগা
যব কত্ল হুয়া সুর সাজোঁ কা
যব কাল পড়া আওয়াজোঁ কা
যব শহর খণ্ডহর বন যায়েগা
ফির কিস পর সংগ উঠাওগে
আপনে চেহরে আইনোঁ মে
যব দেখোগে ডর যাওগে
……..
তুমি কেন যে তোমার আস্থার তির
গেঁথে দিচ্ছ হৃৎপিণ্ডে সবার
আমরা তো সব প্রেমের কাঙাল
কেন খঞ্জর, কেন তলোয়ার
এই শহরেই থাক গান , বয়ে যাক বহু সুর
আমরাও থাকি গানের শহরে , হয়ে থাকি একাকার
আমরাই ফুল ফোটাতে জানি শহরের বাগিচায়
আমরা কজন জমিয়ে রাখি সুগন্ধ সমাহার
তুমি কার অশ্রুতে পিপাসা মেটাবে
আমরাতো আছি ভালবাসামোহে
এই শহরে আর কিইবা দেখবে
অক্ষরই যদি মুছে যায় দাঙ্গায়
হায় যদি সুর আর লয় কেটে দেয় ওই আত্মগর্বী অস্ত্র তোমার
কবিতাও যাবে, ঠিকই চলে অন্য পথে অন্য কোথাও
সুর আর গান কাটবে যখন
আছড়ে পড়বে শব্দরা সব
হয়ে যাবে এক ধংসাবশেষ এই জমাট শহর তোমার আমার
কার দিকে তাক করবে তুমি, কার দিকে আর ছুঁড়বে পাথর
আর আয়নার কাছে যখন দাঁড়াবে দিনান্তে হে
ভয়ে ভয়ে কেঁপে উঠবেই তুমি নিজেকে দেখে

আহমেদ ফরাজ যখন সক্রিয় এবং উর্দু কবিতার জগতে যখন তিনি উর্দু সাহিত্যের একজন সেরা কবি হিসেবে বিবেচিত তখন পাকিস্তানের কমিউনিস্ট তথা বাম আন্দোলন প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফরাজের মেন্টর ছিলেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। পাকিস্তানের এবং উর্দু ভাষায় এই উপ মহাদেশের সর্বসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ‘ফয়েজ’ কিন্তু সারাজীবন পাকিস্তানে বামপন্থার ক্ষয়ই দেখেছেন। তবে নিজের বিশ্বাস থেকে এক চুলও নড়েননি আজীবন। তাঁর অনুজপ্রতিম আহমেদ ফরাজও একইভাবে কখনোই মাথা নোয়াননি স্বৈরাচারী পাক শাসকদের কাছে। পঃবাংলার কবিদের সংগে তাঁদের তুলনা করাটা সংগত নয়। করছিও না। বরং পাকিস্তানের ক্ষয়িষ্ণু বামপন্থার আবহে বসে লেখা ফয়েজের এই কবিতাংশটি পড়া যাকঃ
‘নিসার ম্যায় তেরি গলিয়োঁ কে ওয়াতন কে জহাঁ
চলি হ্যায় রস্ম কে কোই না সর উঠাকে চলে
জো কোই চাহনেওয়ালা তোওয়াফ কো নিকলে
নজর চুরা কে চলে জিস্ম-ও-জাঁ বচা কে চলে
য়ুঁ হি হমেশা ওলঝতি হ্যায় জুল্ম সে খল্ক
না ওনকি রস্ম নঈ হ্যায় না আপনি রীত নঈ
য়ুঁ হি হমেশা খিলায়ে হ্যায় হমনে আগ মে ফুল
না ওনকি হার নঈ হ্যায় না আপনি জিত নঈ
(ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ)
#
ভাবানুবাদ:
#
‘রয়েছি তোমার অলিতে গলিতে নিহিত আমার জন্মভূমি
এখন এখানে নিয়ম হয়েছে তুলবে না চোখ তুলবে না মাথা
না মানার পথে যদি বা বেরোয় অযথাই কোন কাঙ্খি পথিক
মাথা নীচু করে যেন হাঁটে সে, নতজানু হয়ে জীবন বাঁচায়
#
এ ভাবেই চলে জোর টক্কর প্রতিবাদ আর অত্যাচারের
না ওদের এ ফতোয়া নতুন, না আমাদের রুখে দাঁড়ানোও
আমরা জিতবো, হারবে ওরা, এমন সত্যে নতুন কোথায়
জিতবে তো সেই যে বা যারা দাহ্য আগুনে ফুলও ফোটায়’

এই যে সাহিত্যের বামপন্থা ক্ষয়িষ্ণু সময়ে আরও জোরদার হয়ে উঠল এর জন্য কিন্তু বামপন্থাই দায়ী। বামপন্থা যত না ক্ষমতার সঙ্গে যায় তার চেয়ে অনেক বেশি গম্য হয় বিরোধিতার আবহে। সোভিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পরে ‘বামপন্থা’ কমিউনিস্ট পার্টির আশ্রয় ছেড়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে পরিবেশ আন্দোলনে, সোশাল ডেমোক্রেসির পরিসরে, ‘থিওলজির’ মিশ্রণে। ‘থিওলজি’র সংগে মার্ক্সবাদের মিশ্রণে যে বামপন্থা গড়ে উঠেছিল সেই ধারায় কবিতাকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন নিকারাগুয়ার আর্নেস্তো কার্দেনাল। আমার করা দুটো কবিতার অনুবাদ এখানে তুলে দিচ্ছি:

১.

ফর্সা দেবী

তো যে, বিশেষ বই মহিলাদের নিয়ে, এটা একটা বই, যে
পুরুষটি লিখেছে, সে প্রেমিক-স্বামী মহিলাটির।
যার সম্পর্কে কিছুদিন আগে ‘টাইম’ লিখেছিল, ইনি দুনিয়ার অন্যতম শিক্ষিত এবং সুভদ্র একজন মানুষ আর আমি সেই
বইটি পড়ছি
সূর্যস্নাত ‘ডেক’-এ বসে দেখছি সমুদ্র ঈশ্বর ‘পোসেইডনের’ ঢেউ ঢেউ কোঁকড়া চুল
সেই ফরাসী নৌকায় এই দৃশ্যগুলোই ছিল
আমি যাচ্ছিলাম নিউইয়র্ক থেকে ‘লা-হার্ভের’ দিকে, আমার প্রথম
ইওরোপ যাত্রা, আর তাই
আমি এখন নীল ভূমধ্যসাগরের উজ্জ্বল দিনটিতে একটা খাপছাড়া গ্রামে হাঁটছি
গ্রামটার নাম ‘দেয়া মাজোরকা’
এখানে রবার্ট গ্রেভস থাকেন, আর তাই
বই হাতে নিয়ে আমি টোকা মারলাম
তাঁর দরজায়
গ্রেভস দরজা খুলে নিজেই কার্দেনালকে ডেকে নিলেন ঘরের ভেতরে, আর সেই বিদ্বান মানুষটির স্ত্রী
জোর করতে লাগলেন তাদের সঙ্গে চিকেন-স্যুপের লাঞ্চ করার জন্য
গ্রেভস গ্লোব নিয়ে এলেন বসার ঘরে
ঘুরিয়ে দিলেন
একসময় নিকারাগুয়ার উপরে তাঁর আঙুল থামলো
গ্লোবও থামলো, তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের বলে উঠলেন, এই যে ছোট্ট বিন্দুটা
এটাই নিকারাগুয়া, আর আমরা এই যে এখানে
ছেলেমেয়রা ঝুঁকে দেখতে লাগল তারা ঠিক কোন বিন্দুতে রয়েছে
আর সেই ছোট্ট বিন্দু নিকারাগুয়া
কতদূরে
তারা খুব মজা পাচ্ছিল…

২.

সেলফোন

তুমি তোমার সেলফোনে কথা বলো বলেই যাও,
হাসো
এটা না জেনেই যে সেলফোন কিভাবে তৈরি হয়েছিল
বা কিভাবে এটা কাজ করে
তবে সমস্যা এটাই যে,
তুমি জানো না
যেভাবে আমিও জানি না যে কঙ্গোতে
হাজার হাজার মানুষ মারা যায়
এই সেলফোনের জন্য
কঙ্গোর পাহাড়ে সোনা আর হীরে ছাড়াও ‘কোল্টান’ নামের খনিজ পদার্থ আছে
যা সেলফোনের কনডেনসারে কাজে লাগে
(‘কোল্টান’ এমনি এক খনিজ প্রায় সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হয়। কঙ্গোতে এর অফুরন্ত ভাণ্ডার। এর ফলে সেই দেশের আর্থিক বিকাশ চূড়ান্ত রকমের হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। বরং কতিপয় ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতা এই সম্পদের দখল নিতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ‘ওয়ার-গ্যাং’-এর নামে মেরে ফেলেছে!)

একটা বা দুটো কথাই কিন্তু শেষ কথা নয়।এই আলোচনার প্রথমে যেমন বলেছি সাহিত্য আর বামপন্থী আন্দোলনের মধ্যে কোনও ভারসাম্য খোঁজা বৃথা। আমি নিজে গোঁড়া পার্টিজান বামপন্থা এবং যান্ত্রিক দ্বান্দ্বিকতার ঘেরাটোপ সেই ১৯৯৭ নাগাদ ছেড়ে এসেছি ‘অতিচেতনা’র খোঁজে। ‘অতিচেতনা’ মার্ক্সবাদ পরবর্তী এক বৈজ্ঞানিক খোঁজ যা দ্বন্দ্বে’র ভেতরের ভেতরে থাকা কেন্দ্র থেকে ভাবনাকে বের করে আনে আর সেই ভাবনাস্রোত সেই মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ফেলে আসা প্রথম পৃথিবীর বাস্তবতা থেকে। জন্ম নেয় কাল্পনিক অভিজ্ঞতা যা আপাতদৃষ্টিতে ক্ল্যাসিক্যাল মার্ক্সীয় ভাবনা অনুমোদন করে না। যাইহোক, সাহিত্য ভাবনা দলীয় নিগড় থেকে মুক্ত হলেই নানাবিধ সত্য ও মিথ্যার আবর্তকে নতুনভাবে দেখতে শিখবে। এই মুহূর্তে পঃবাংলায় বাম রাজনীতির যে অস্তিত্বের সঙ্কট চলছে তার থেকে মুক্তি পেতে রাজনীতিবিদদের ‘ইনোভেটিভ’ নতুনতর কর্মসূচিতে যেতে হবেই। তবে বাম রাজনীতির সঙ্কট হলে বামপন্থী সাহিত্যেও সঙ্কট আসে বলে আমি মনে করি না। বরং সামাজিক সংকটে শুধু বাম নয় যে কোনও সাহিত্য এবং শিল্পকর্মই আরও সমৃদ্ধ হয়,শূন্য যাত্রা শুরু করে পূর্ণতার দিকে।

[লেখক – কবি, গদ্যকার ও সম্পাদক।]

Facebook Comments

Leave a Reply