লৌকিক – অলৌকিক – অলীক মানুষ : উমাপদ কর

[কবি ও গদ্যকার উমাপদ কর বছর আটেক আগে গল্প ও উপন্যাসকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অনন্য উপন্যাস “অলীক মানুষ” নিয়ে চরিত্রভিত্তিক একটি দীর্ঘ আলোচনা তথা গদ্য লেখেন, যা প্রকাশ পায় “বিনির্মাণ” পত্রিকায়। সম্প্রতি অপরজন পত্রিকার তরফে সেই গদ্যটি প্রকাশ করতে চাইলে তিনি পূর্বোক্ত গদ্যটিকে সংযোজন-বিযোজন-বিবর্ধন ইত্যাদির মাধ্যমে পুনর্লিখিত করেন। গদ্যটি দীর্ঘ। লেখকের সম্মতিক্রমে আমরা বেশ কয়েকটি কিস্তিতে (৬-৭) আলোচনাটি প্রকাশ করব ধারাক্রমে প্রতিমাসে। এই সংখ্যায় তার তৃতীয় পর্ব।]

শফিউজ্জামান

শফিউজ্জামান বদুপিরের জীবিত ছোটছেলে। মা সাইদা বেগম। জন্ম মুর্শিদাবাদের কাঁটালিয়া নামে পদ্মাতীরবর্তী এক গ্রামে। মোটামুটি ইংরাজি সন ১৮৭৩-৭৪ খ্রিষ্টাব্দে।

শফি যখন মৌলাহাটে আসে তখন তার বয়স সতের। আমরা প্রথমে দেখে নেব শফির ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত বেড়ে ওঠা। অর্থাৎ তার শৈশব এবং কৈশোর। ফরাজি ধর্মপ্রচারক বাবার সঙ্গে সঙ্গে ঠাঁই বদল বারবার। তিনে কাঁটালিয়া ছেড়ে পোখরা, পাঁচে পোখরা থেকে বিনুটি-গোবিন্দপুর, দশে নবাবগঞ্জ, বারোয় কুতুবপুর, ষোলো খয়রাডাঙা, সতের মৌলাহাট। তার জন্মের আগেও ঘটেছে এমনটাই, যে বৃত্তান্ত রং চড়িয়ে মা তাকে শোনাতেন। সেখানে থাকত নানা অলৌকিক ঘটনা আর জিনদের গল্প। বাবার সঙ্গে নিশুতি রাতে তারা নাকি কথা বলত, তাদের কণ্ঠস্বর ছিল গ্রামাফোন রেকর্ডের মতো ধাতব ও সঙ্গীতময়। বাবার ‘ইত্তেফাক’ তথা কালো মশারির মধ্যে অবস্থান সে নিজে দেখেছে। আব্বার সঙ্গে কথা বলা বারণ, যদিও তার ইচ্ছে করত মশারিটা একবার খপ করে তুলে দেখেই পালিয়ে যেতে। প্রশ্ন জাগত সত্যি বাবা এর মধ্যে আছেন তো, এখানে কোনো জিন ঢুকে পড়েনি তো? ইত্যাদি। সে দেখেছে সারাবছর জুড়ে বিভিন্ন জায়গার লোক এসে হুজুরের দর্শনপ্রার্থী। নানারকম ভেট। টাকাকড়ি, গোরুরগাড়ি বোঝাই খন্দ, ফলমূল, শস্যের বস্তা, শাকসবজির স্তূপ, পুকুরের মাছ, মোরগ-মুরগী, আস্ত খাসি। কোরবানির পর খেজুর তালাইয়ে বিছানো মাংসের পাহাড়, শফির চেয়ে উঁচু। সে দেখেছে, দয়ালু মা-বাবা তার অধিকাংশই বিলি করে দিচ্ছেন হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গরীব-গুর্বোদের। কী খেয়ালে বাবা শফিকে কুতুবপুর থাকার সময় (বয়স বারো) নিসিং পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু বৃত্তি পরীক্ষার আগে কুতুবপুর ত্যাগ। পণ্ডিতের বেতের ঘা থেকে মুক্তিতে খুশিই হয়েছিল শফি। একদিন পাঠশালা ফেরত শফি তার এক বছরের ছোট ভাইয়ের মরে যাওয়ার কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। প্রায়ই কবরখানায় গিয়ে তার ভাইয়ের কাঁচা কবরের দিকে তাকিয়ে ঢিল ছুঁড়ত, শেষে রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেলত। তার বিশ্বাস ছিল তাদের বাড়ির কেউ মরতে পারে না। মুসলমানদের ধর্মশিক্ষা আবশ্যিক হওয়ায় তাকেও মসজিদে গিয়ে আরবি পড়তে হতো। বাড়িতে মা সাইদা পড়াতেন মেয়েদের। খয়রাডাঙা থেকে মাত্র একবছর পর মৌলাহাট যাত্রায় (যদিও গন্তব্যছিল সেকেড্ডা) সাতটা গোরুরগাড়িতে চলেছিল তাদের ঘরসংসার, মানুষজন। সে যাত্রা কিশোর শফির প্রথম মনে রাখার বয়স। শাদা-জিন কালো-জিনের অভিজ্ঞতা যেন তাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। কিছুটা পথ সে হাতে এক ছিপটি নিয়ে দুধারে ঝোপঝাড় সাপটে চলেছিল, যেন কোনো কালো-জিনের উদ্দেশ্যে তার ঐ আস্ফালন। এক ধরনের ভয় থেকে তার ঐ কীর্তি। তো, এইরকম অবাক ভরা গল্প-গাথা, দূরত্বের পিতার উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি, সামান্য কিছু পড়াশোনা, পণ্ডিতের বেতের ভয়, ভাইয়ের মৃত্যু আর নিজস্ব বিশ্বাসভঙ্গ, বারবার জায়গাবদল, মা-ঠাম্মার প্রচারমূলক কথাবার্তা, বয়স্ক লোকদের ধর্মগুরুর ছেলে হিসেবে তাকে আপনি-আজ্ঞে করা, বাবার মৌনী, জন্মপ্রতিবন্ধী দাদা, বহুমানুষের ভেট-এ চলা তাদের জীবনযাপনের মধ্যে এক অদ্ভুত, ঠিক যেন সাধারণের নয়, এমনভাবে তার বড়ো হয়ে ওঠা।

খ) সতেরর কিশোর শফির জীবনে প্রথম নারীর আবির্ভাব মৌল্লাহাটের রুকু রোজি দুই বোন। যখন মৌল্লাহাটেই তাদের ঠাঁই স্থিরীকৃত হলো, তখন ধীরে-ধীরে রুকুর প্রতি তার এক গভীর টান লক্ষ করা যায়। মেয়েদুটো একটু বাচাল, প্রগলভ। তবুও। এর মধ্যে যুবতী আয়মণিও তার মনে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করে থাকবে। পিতৃস্নেহে বঞ্চিত শফির মা-ই ছিল প্রাণ। এই প্রথম অন্য নারী তার জীবনে অন্য ভূমিকায়। রুকু রোজির সঙ্গে ঘোরাফেরা কথাবার্তা, পিরের থান থেকে পয়সা তুলে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ, কুষ্ঠরোগি আবদুলের বউ ইকরাতনের ডাইনি হয়ে নিশুতি রাতে শ্যাওড়া গাছে ভেসে যাওয়া ইত্যাদিতে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভব করত সে। এ-সময়েই সে পেল আলাদা এক স্বাদ, জীবনের অন্য ধরনের একটি দিক। মাধ্যম, আবদুল বারি চৌধুরী, অকৃতদার, নবাব বাহাদুরের দেওয়ান, রুকু-রোজিদের আত্মীয়, ইংরেজি শিক্ষিত, সর্বোপরি ‘নেচার’ (প্রকৃতি) ভক্ত। প্রথম দর্শনে আর আলাপেই তার কাছ থেকে শেখে নাস্তিকতার অর্থ, প্রতিদিনের সূর্যাস্ত প্রথম আলাদা অনুভূতিতে ধরা দেয়। মত্ত হাতিকে মাদি হাতি আনিয়ে বশ করাও যে প্রকৃতিরই আরেক খেলা শোনে তার বৃত্তান্ত। হাতিতে চাপানোর প্রতিশ্রুতি পায় আর নিজে দু-ক্রোশ দূরে হরিণমারার হাইস্কুলে পড়বার বিষয়ে সম্মতি দিয়ে বলে ‘হুঁউ’। শুরু হয় আরেক জীবন, মা কে ছেড়ে, রুকুকে ছেড়ে, বাবার অদ্ভুত এক জীবন ছেড়ে। “শফির মনে হচ্ছিল, এবারকার এই যাওয়াটাই যেন সত্যিকার নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তার মন নুয়ে পড়েছিল বারু চাচাজির দিকে।”

গ) ঘটনাক্রমের দ্রুততা শফিকে নিয়ে আসে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ উচ্চারণের প্রশ্নের সামনে। উলশুরার বনে বারুচাচার সঙ্গে হাতির পিঠে চেপে দুলন্ত পৃথিবী তার কাছে মোহময়। ঘোড়ার পিঠে চেপে বন পেরিয়ে যাওয়ার গতি তার কাছে লোভনীয়। বিস্তীর্ণ মাঠ, নিঃশব্দ বনানী একদিকে যেমন তার মধ্যে অনন্য ছাপ রাখে, অন্যদিকে প্রসন্নময়ী হাইস্কুল, তার সংস্কৃত পঠন, সহপাঠীরা এবং একই ঘরে থাকা রবির কাছে প্রথম যৌনতার পাঠ, বিড়ি ফোঁকা, কয়েকজন বন্ধুর একসঙ্গে আড্ডা মসকরা যৌন-আলোচনা, মেয়েদের শরীরচর্চা তাকে বড়ো করে চলে। একদিকে রুকুর জন্য মন কেমন করা, অথচ কাউকে বলতে না-পারা, হুহু কাঁদা, পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা, ক্রমাগত স্বপ্নে দেখা, এমনকি তার গোরে মাটি দেওয়া, ক্যালেন্ডারে পরীর মুখে রুকুর মুখ স্থাপন করা; অন্যদিকে বারুচাচার অমোঘ টান, মানুষকে প্রকৃতির প্রকৃত গোপনীয়তা দেওয়ার পাঠ, পড়াশুনার প্রতি সামান্য হলেও আগ্রহ এবং সর্বোপরী বারুচাচার ইচ্ছাকে শফির ওপর প্রক্ষেপণ করার আহ্বান— “তোমাকে লেখাপড়া শিখতে হবে। হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে মুসলমানকে। তুমি নিশ্চয়ই স্যার সৈয়দ আহমেদের কথা পাঠ্য বইতে পড়েছ। দেওবন্দ যেখানে তৈরী করেছে ছদ্মবেশী ভিখিরির দল, সেখানে আলিগড় তৈরী করছে নয়া জমানার প্রতিনিধিদের।” ইত্যাদি তাকে আকৃষ্ট করে। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে কী করবে সে?

ঘ) কিশোর সে, যৌনতাকে প্রাধান্য দিতে চায় না, অথচ রুকু তার পাশে শোবে স্বপ্নে ভাবে, রুকুর সঙ্গেই তার বিবাহ যেন স্থির; এ কাম না প্রেম সে বোঝে না, আবার অল্প বয়সেই বিয়ে ঠিক নয় এ প্রত্যয়ও জাগে; কারণ তার ‘সিনা চাখ’ (আত্মা বদল) হয়েছে বারি চৌধুরীর মাধ্যমে। সে নিজেও জানে না, সে কী করবে! বারী চৌধুরীর অনীহা (নাবালক অবস্থায় বিবাহ) ও বাবার নির্দেশে সে যে হারাতে চলেছে রুকুকে তা শিরোধার্য করে নেয়। দুই দাদার সঙ্গে রোজি-রুকুর বিয়েতে থাকবে না মনস্থ করে মায়ের আকূতিভরা পিছুডাক উপেক্ষা করে শুধু এক জোরালো অভিমানের জেরে ফিরে আসে। শুরু হয় এক ধরনের অবদমন। পরিচয় হয় গাজি সইদুর রহমান ওরফে বড়োগাজির সঙ্গে। ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ, নাস্তিক। ঘোড়ায় চড়েন, সঙ্গে থাকে সোর্ড। শফির ঘোড়ায় চড়ার ইচ্ছে জাগে মনে, ইচ্ছে জাগে তরবারি ছুঁয়ে পরখ করতে। সে ইচ্ছে পূরণও হয়। তবুও কোনো একসময় সে পালাতে চায় রুকুর কথা ভেবে। এক অদম্য আকর্ষণ তাকে রুকুর কাছে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু সে বন্দি হয়ে পড়ে বারুচাচা, বড়োগাজি, কাল্লু খাঁ এবং নিজের কাছেই। পরে তার জন্মপ্রতিবন্ধী দাদা মণিরুজ্জামানের সঙ্গে তারই স্বপ্নের হুরি-পরি, বাস্তবের সখা ও ভালোবাসার মানুষটির বিয়ে হয়ে গেলে সে যেন অন্য মানুষে পরিণত হয়। নিজেকে খুব ‘ফ্রি’ স্বাধীন মনে হয়। মনে হয়, “ভেসে যেতে পারব সেই প্রাকৃতিক স্রোতে।” নিতান্তই ঘোরের মধ্যে প্রকৃতির গোপনীয়তায় ‘আসমা’ নামে এক যুবতীর (মেহরুর বউ) সঙ্গে শারীরিক মিলনে জড়িয়ে পড়ে এবং নিজের শরীরটাকে অশুচি অপবিত্র ভাবতে থাকে। “আর এই মেহরুর যুবতী বউয়ের শরীর থেকে প্রতিশোধের ছুতোয় আমি যে শান্তি সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তারই বা মূল্য কতটুকু? ছি ছি! এ আমি কী করলাম! কেন করে ফেললাম এ পাপ? অন্ধকারে আমার দুচোখ ভিজে যাচ্ছিল……”। বোঝা যাচ্ছে মানসিক পক্কতা আসার আগেই তার জীবনে ঘটনাস্রোত বয়ে যায়, তাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে।

ঙ) রোজির সঙ্গে নুরুজ্জামানের আর রুকুর সঙ্গে প্রতিবন্ধী মণিরুজ্জামানের শাদি হয়ে যাওয়ার সংবাদে, নিজেকে স্বাধীন মনে করার উৎসাহে, রাগে-দুঃখে-অভিমানে ও প্রতিশোধ-স্পৃহায় চরম যৌন স্বাদে লিপ্ত হয়েও শফি কিছুই পেল না, কোনও জৈব সন্তোষও না। “বরং আমার গা ঘিনঘিন করছিল। ভরা স্রোতবতী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরকে, আমার নিষ্পাপ শুদ্ধ শরীরের নোংরামিটাকে ধুয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল।” ঘেন্নার কারণ দ্বিবিধ। এক— ‘আমার যে শরীরে নাকি পবিত্র পুরুষের রক্তধারা বয়ে চলেছে’; দুই— ‘আর যে শরীর নির্দিষ্ট ছিল অন্য এক নারীর (রুকুর) জন্য, যাকে আমি বেহেশতের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও কাম্য বলে গণ্য করতাম’, ‘সেই শরীরকে আজ হঠকারিতায় আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমি নিজের পবিত্র সত্তাটিকে হিজল জাম জারুলের জঙ্গলে ভিজে ঘাসের ওপর জবাই করে ফেলেছি।’ এই আত্মগ্লানি আর আসমার স্বামী মেহরুর দার্শনিক ভাবাপন্ন গান (“ভেবো না ভেবো না বিফল ভাবনা/ ভাবিলে ভাবনা যাবে না দূরে”) তার মাথায় বন্য ঘুণপোকার মতো ঢুকে পড়েছিল। “আর সেই ভাবনার কুটকুট কামড়ানিতে অস্থির হয়ে বাকি জীবন আমি ছুটে বেড়ালাম বিভ্রমণে। কী না করে বেড়ালাম। স্বেচ্ছাচারিতার চূড়ান্ত।” বোঝা যায় প্রথম প্রেমের ব্যর্থতা ও অনভিপ্রেত যৌনসঙ্গে সে এক আলাদা শফিউজ্জামানে রূপান্তরিত হয়েছে।

চ) এবারে বিভ্রমণ ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রথমে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত শফির একটি বধ্যের তালিকা প্রস্তুত করা যাক। পরে প্রতিটি হননের প্রেক্ষাপট তুলে অগ্রসর হওয়া যাবে।
১) পান্না পেশোয়ারি – প্রথম নরহত্যা। বাংলা ১২৯৯ সন, ১০ বৈশাখ। ইং- এপ্রিল, ১৮৯২ (আনুমানিক)।
২) রিচার্ড স্ট্যানলি – দ্বিতীয় হত্যা। বাংলা ১৩০২ সন, ২ আশ্বিন। ইং- সেপ্টেম্বর, ১৮৯৫।
৩) একজন গোরা সাহেব – তৃতীয়। কৃষ্ণপুরে, পদ্মার চরে প্রায় সন্ধ্যায়।
৪) জমিদার অনন্ত নারায়ণ ত্রিবেদী – চতুর্থ। কৃষ্ণপুরে, গঙ্গাতীরে এক বিকেলে।
৫) কাল্লু পাঠান – পঞ্চম। লালবাগে, এক গভীর রাতে শয্যায়।
৬) মুন্সি আবদুর রহিম – ষষ্ঠ। কৃষ্ণপুরে, ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ এপ্রিল, রাত ৮-১০ মিনিট।
৭) ইকরাতন ওরফে করুণার দুগ্ধপোষ্য কন্যা – প্রথমে সে বধ্য স্থিরীকৃত হয়। পরে ঘটনাক্রমে অবধ্য মনে হয়। একসময়ে জীবনে তার জন্য কাঁদেও।

১) পান্না পেশোয়ারিকে শফি পায় লালবাগে। ততদিনে সে হরিণমারা থেকে লালবাগে স্থানান্তরিত। নবাব বাহাদুর ইনস্টিটিউশনের ছাত্র। বিড্ডু বন্ধু, নবাব খানদানের ছেলে। তার মতে পান্না পেশোয়ারি ‘খুদ শয়তান’, ‘ডেঞ্জারাস ম্যান’। সবাই তাকে সেলাম ঠোকে। একদিন শফি পান্নাসাবের পাল্লায় পড়ে। বিড্ডু দৌড়ে পালিয়ে গেলেও সে যায়নি। তাকে নিয়ে পান্না মসকরাও করে। চুল্লু এসে তাকে উদ্ধার করে। লালবাগেই পরিচয় হয় সিতারার সঙ্গে, এক মোহময়ী নারী। কাল্লু পাঠানের দুসরা বিবি। সিতারা বিড্ডুর এক চাচির মেয়ে। যে-কোনো কারণেই হোক ‘তখন থেকেই সিতারার দিকে আমার চোখ যায়’। একদিন বিড্ডুর পাল্লায় পড়ে বেশ্যালয়ে গিয়ে পড়ে শফি। সেখান থেকে একাই কোনোক্রমে পালিয়ে আসার পথে সিতারার সঙ্গে দেখা, কথাবার্তা, গঙ্গাস্নানের সঙ্গি দর্শক, তাকে ‘পুরা জওয়ান’ হওয়ার জন্য সিতারার আহ্বান। মাঝেমধ্যেই সিতারার সামনে, কোনোদিন তার ঘরে, যৌনবিষয়ক কোনো কার্যকারণহীন সিতারার প্রতি আকর্ষণ, হয়তো যা তার চেয়ে বেশি সিতারারই ছিল। বলা যায় “সেই বসন্তকালে মৃতদের শহরে সিতারা আর আমি যেন একটা অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছিলাম।” সেই সিতারার পিছনে কুদৃষ্টি নিয়ে লেগেছে পান্না পেশোয়ারি। ‘শরম’ এই অজুহাতে বারিচাচাকে বলতে পারছে না সিতারা, অথচ জুলুমের কথা বলছে শফিকে। ‘বোকার মত আমি সেই খেলার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম।’ ‘একটা চরম বোঝাপড়ার ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসল।’ অবশেষে বধ্যের মাথায় সামনে থেকে সজোরে ইটের ঢিল ছোঁড়া এবং দৌড় দৌড়। পরে জেনেছিল সেই ইটের ঘায়েই পান্না পেশোয়ারির মৃত্যু হয়।

২) ইতিমধ্যে ভগবানগোলা থেকে মৌল্লাহাটের দিকে পালাবার পথে শফির পরিচয় হয় কপালীতলার জমিদারের ছোটতরফ বাবু দেব নারায়ণ রায়ের সঙ্গে। ইনি পাগল মানুষ এবং ব্রাহ্ম। খুব সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারেন। জাত-বেজাত মানতেন না। বলতেন— ‘একো ব্রহ্ম দ্বিতীয় নাস্তি’। তিনি ব্রহ্মপুরে এক ব্রাহ্ম আশ্রম গড়ে বিশাল কর্মকাণ্ডে যুক্ত। শফি সেখানেই ঠাঁই নেয়। তার জীবন গঠনমূলক কাজে কিছুটা স্বস্তি পায়। কিছু কাজ ভালোও লাগতে লাগে। “দেব নারায়ণ রায়ের আশ্রয় আর সাহচর্যে দিনে দিনে আমার ভেতর একটা রূপান্তর ঘটতে শুরু করেছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনের কোনো একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিশ্চয় আছে— যা বুঝে ওঠার জন্য একটা বয়স দরকার। দরকার একটা অনুকূল পরিবেশ। সেই বয়স আর পরিবেশ এতদিনে পেয়ে গেছি। আবছা টের পাচ্ছি দেবনারায়ণদা যাকে ‘কর্মযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেন, তার মধ্যে ‘আনন্দের’ স্বরূপ এবং ‘অব্যক্তের ব্যক্ত’ হওয়ার ব্যাপার আছে।” এখানেই পরিচয় ‘স্বদেশী’ যামিনী মজুমদারের সঙ্গে। তিনি অবশ্য কোথাও আনন্দ দেখেন না। দেখেন সর্বত্র নিরানন্দ, দুঃখ। অপমান আর অত্যাচার। অত্যাচারী রিচার্ড স্ট্যানলি, ইং ১৭৪৪ সনে ‘মেজর মনরো’-তে আড়াইশো বিদ্রোহীকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেয় যে ইংরেজ, তারই বংশধর সে। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে স্ট্যানলির পিতা বহরমপুরের ব্যারাকে বিদ্রোহ দমন করেন। আর নিজে নুরপুর কুঠির মালিক। সেখানকার তাঁতীদের সর্বনাশ করেছেন। ‘বন্দেমাতরম’-প্রিয় যামিনীবাবু পিস্তলের গুলিতে তাকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই স্ট্যানলির গুলিতে নিহত হন। বছর খানেক পর ব্রহ্মপুরে আসে যামিনীবাবুর মেয়ে স্বাধীনবালা ও তার মা। স্বাধীনবালার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে শফি। স্বাধীনবালা পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ চায়। তার সঙ্গে শফির সম্পর্ক অদ্ভুত। স্বাধীনবালার মধ্যে প্রেম নেই, শুধু জ্বালা। শফি তার মধ্যে মাঝেমধ্যে দেখে রুকুর আদল, সিতারার অভিনয়। সহ্য করতে পারে না তার কান্না। এড়িয়ে যেতে পারে না তার স্ট্যানলিকে হত্যার জন্য একজন বিশ্বাসী পুরুষের প্রয়োজনকে। স্বাধীনবালার মাধ্যমে পরিচয় হয় হাজারীলাল ওরফে হরিনারায়ণ ত্রিবেদীর সঙ্গে, পলাতক জেলখাটা, পিতৃবিদ্বেষী, জমিদার অনন্ত নারায়ণের ছেলে, স্বদেশী। রণরঙ্গিনী স্বাধীনবালার তর্জনী কাটা রক্তে তিলক পড়ে শফিও স্ট্যানলি হত্যায় সামিল। মূলত তারই আঘাতে স্ট্যানলির মৃত্যু নিশ্চিত হয়।

৩) স্ট্যানলি হত্যার পর এক প্রশ্ন তাকে মাথা কোটায়— ‘কেন তাকে হত্যা করলাম? কেন, কেন এবং কেন?’ “ক্রমাগত এই প্রশ্নের ফলে অবশেষে কয়েকদিনের মধ্যে ধর্ম জিনিসটাকে ঘৃণা করার অত্যদ্ভুত সিদ্ধান্ত আমাকে গ্রাস করে। জিনগ্রস্তের মতো একলা, জনহীন কোনো স্থানে থুথু ফেলে মনে মনে বলি, ঘৃণা ধর্মকে— যা মানুষের মধ্যে অসংখ্য অতল খাদ খুঁড়ছে। ঘৃণা, ঘৃণা এবং ঘৃণা। ধর্ম নিপাত যাক। ধর্মই মানুষের জীবনে যাবতীয় কষ্ট আর গ্লানির মূলে। ধর্ম মানুষকে হিন্দু অথবা মুসলমান করে। ধর্ম মানুষের স্বাভাবিক চেতনা আর বুদ্ধিকে ঘোলাটে করে।” ধর্ম সম্পর্কে মানসিক অবস্থা যখন এইরকম, যখন স্বদেশীয়ানা মাথায় চেপে বসেছে সেই একই সময়ে স্বাধীনবালাকে নিয়ে মনে অন্যরকমের টানাপোড়েন। একদিন, “হাজারীলাল একটা কোদালের বাঁটে বসে আছেন এবং তাঁর মুখোমুখি বসে আছে স্বাধীনবালা। সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, একটা প্রচণ্ড থাপ্পড় মারল কেউ।” আবার কখনো, “স্বাধীনবালা বলল, চুপ করো। শফিদা, লক্ষ্মীটি! আশ্চর্য, যখন ওর সঙ্গে পা বাড়ালাম, নিজের থাপ্পড় খাওয়ার অস্বস্তিকর জ্বালাটি আর নেই।” এমনই সেন্টিমেন্টাল অথবা অভিমানী মানসিক স্থিতি, অদ্ভুত টানাপোড়েন। “স্বাধীনবালা সন্ধ্যার অন্ধকারে আমার বাঁ হাতটি ধরে বলল, শফিদা! আমাকে ভুল বুঝো না! তার হাতের স্পর্শে আমার হাত মুহূর্তে নিঃসাড় হয়ে গেল। পরক্ষণে সে হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, তোমার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। …… আমাকে ঈশ্বর অনেক কিছু দান করেছে। একটি জিনিস বাদে। …… সেটি কি খুকু? …… পুরুষের প্রতি প্রেম।” এই অদ্ভুত স্বাধীনবালা শফিকে যেন আরও যান্ত্রিক কঠিন কঠোর করে তোলে। তবে কি স্বাধীনবালার প্রতি শফির কোনো প্রেম জন্মেছিল, মনের গভীরে? সে কি আবার এক প্রেমহারানো মানুষ হয়ে উঠলো? কিছুটা জটিল এই মানসিক অবস্থান।

ইতিমধ্যে পরিচয় হয় জমিদার-কন্যা রত্নময়ীর সঙ্গে। রত্নময়ী আরবি ফারসি ইংরেজি শিক্ষিতা। ছিটগ্রস্ত। মাঝেমধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যায়। বাবা অনন্তনারয়ণকে অত্যন্ত ঘৃণা করে। মনে করে, “হি হ্যাজ কিল্‌ড মাই মাদার। হি লিভ্‌স উইথ এ কনকুবাইন— ইউ নো, এ বাইজি।” রত্নময়ীর চিকিৎসা করেছিলেন শফির বাবা। শোনা যায় তাতে তার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। মূলতঃ রোগটি হিস্টরিয়া। একইসঙ্গে তার দেখা হয় ইকরাতনের। শফি নিজের পরিচয় দিলেও, ইকরা তাকে না-চেনার ভান করে। ইকরাতনকে যে তার বাবা বিয়ে করেছিলেন, সে তথ্য শফির জানা ছিল না। জানার পর মনে হলো এ অসম্ভব। কিন্তু বাবার বিরুদ্ধে কেচ্ছা নিয়ে কিছু লোকের সঙ সেজে নাচ-গান তাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে বাধ্য করে। নিসর্গের ভেতর শঙ্খিনী নামে এক নদীর বালুচরে বসে পড়ে। মনের ভাব পালটে যায়। “আত্মস্থ আত্মসমর্পণ নহে। অবাধ্য হও।” “আমার মধ্যে স্বাধীন কথিত ‘দুর্দান্ত বাঘ গরগর করছিল’।” সুতরাং সে ছুটল হাজারীলাল ওরফে হরিবাবুর কাছে। অর্থাৎ আরও বধ্য দাও। স্ট্যানলির পিস্তলটি শফির করতলগত হলো। “উহার যান্ত্রিক পদ্ধতি এবং ক্রিয়া প্রক্রিয়া সমুদয় বদ্ধ ঘরে কোনো কোনো রাত্রে নাড়াচাড়া করিতে করিতে শিখিয়া ও বুঝিয়া লইয়াছিলাম।” অনেকদিন ধরে লালিত একটা বাসনা, নিজস্ব ঘোড়া, তাও হলো লাইব্রেরিয়ানের বেতনের টাকায়। ঘোড়ার নাম ‘পাহলোয়ান’। সুতরাং ঘোড়া রোগ চলল পূর্ণদমে। চলল স্বাধীনবালার সঙ্গে কৌতুক। রেহানা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে শফির বিয়ের প্রস্তাব নিমেষে প্রত্যাখ্যান করল সে। “আমার হৃদয়ে নারীপ্রেম বলিয়া কোনো পদার্থ নাই। তাহা গলিয়া পচিয়া দুর্গন্ধ ছড়াইয়া পঞ্চভূতে বিলীন হইয়া গিয়াছে।” বসন্তকালে ডাকপিওন দিয়ে গেল ‘র’-এর (রত্নময়ী) চিঠি। নিমন্ত্রণ, ও তার প্রতীক্ষা সম্বলিত। চলল রত্নময়ীর উদ্দেশ্যে। কৃষ্ণপুর জমিদার বাড়ি। প্রায় বিনা কারণেই রত্নময়ী ঢিপ করে শফিকে প্রণাম করে বসে। কেন যে এই প্রণাম শফি জানে না। দেখা যাচ্ছে, একদিকে ব্রাহ্মচেতনা ও কর্মকাণ্ড, একদিকে স্বদেশী আহ্বান, একদিকে স্বাধীনবালার প্রেমহীনতা, অন্যদিকে রত্নময়ীর আহ্বান এবং প্রণাম, দার্শনিক বৃদ্ধ মুন্সিজীর আত্মপোলব্ধি— “জীবনে অনেক ঠকে শিখেছি, মানুষকে খুন ক’রে মানুষের উপকার করা যায় না। আপনি কতজনকে খুন করবেন? এত বড় দুনিয়া, এত মানুষ! কতজনের ভালোর জন্য কতজনকে খুন করবেন?” অবশেষে পদ্মার চরে হাঁস শিকারে ব্যস্ত গোরাসাহেবের (যিনি কুঠিয়াল, অত্যাচারী, রেশম কারবারী, জমিদারবাবুর বন্ধু) তার দিকে বন্দুক তাক করে ‘ইউ ড্যাম নেটিভ কুত্তা! ভাগো!’ শুনে, ‘স্যার! আই মে হেল্প ইউ’ বলে সহসাই দুহাত দূর থেকে দূর থেকে পিস্তলের গুলি বর্ষণ, বুকে পা রেখে আবার মাথায়। মুহূর্তে মনে হলো, ‘কিন্তু কেন আমি এই কদর্য কর্মটি করিলাম?’ মুন্সিজীর উক্তির প্রত্যুত্তরদান? নাকি ‘নেটিভ কুত্তা’ বলার জ্বালা, আত্মসম্মানে আঘাত? ধর্ম সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ সে ধর্মদ্রোহী, আবার নারীপ্রেমের প্রতিও বিশ্বাসহারানো এক যুবক। অন্তরের জ্বালা তাকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলছে। আত্মজিজ্ঞাসা থাকলেও পরিত্রাণ মিলছে না তার।

৪) কৃষ্ণপুরের জমিদারবাবু অনন্তনারায়ণ ত্রিবেদী ইংরেজের পা-চাটা কুকুর, অত্যাচারী, রত্নময়ীর মায়ের ঘাতক। রত্নময়ীর ফিটের ব্যামোর মূল কারণ। ঘৃণায় স্বদেশী হরিনারায়ণও চায় তার পতন। প্রবল বন্যায় ব্রহ্মপুর ও আশেপাশের জনপদে বহু মানুষ ও গবাদিপশু মৃত। শফির পাহলোয়ান আর নেই। হরিনারায়ণ কঙ্কালবৎ। স্বাধীনবালা শাদা থান পরিহিতা। তার মনে কি পুরুষপ্রেম ছিল না? প্রেম আর বিবাহ এক নহে? ‘জেলা সমাচার’-এ খবর— ‘পুনরায় কালেক্টর বাহাদুরের ওপর আক্রমণ/ পিস্তলসহ যুবতী ধৃত’। স্বাধীনবালার কীর্তি। শাস্ত্রিজী শফিকে আশ্রম থেকে পালাতে বলে। শফি পালিয়ে আবার কৃষ্ণপুর। মুন্সি আবদুর রহিম তাকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু গোবিন্দরাম সাদরে গ্রহণ করে। শফি ওরফে ছবিলাল গোমস্তা। বেতন সাত টাকা। গঙ্গাতীরে ছোট একতলা দালানে নিরলঙ্কৃত জীবন যাপন। যোগাযোগ ছিল পদ্মাতীরবর্তী গোবিন্দরামের সঙ্গে, যিনি বলতেন— ‘জ্বালাইয়া দাও। ভাঙিয়া ফেল। পুণ্য হইবে।’ শফি গোমস্তাকালীন অবস্থানে— “তুমি কৃষকদিগের বলিতে, যে মাটি চষিতেছে, উহা তোমারই। বলিতাম, কেহ কাহারও প্রজা নহে। রাজা মাড়াইকল। রাষ্ট্র খাঁচাকল। পেয়াদাপাইক বরকন্দাজ পুলিশ সেনাবাহিনী সমুদয় বেতনখোর দুবৃত্ত। খাজনা দিও না।” জমিদারবাবু প্রতি বিকেলে গঙ্গাতীরে বেড়াতে যান শৌখিনতা বশে। একদিন, “আমাকে নির্জনে দণ্ডায়মান দেখিয়া অনন্তনারায়ণ বলেন, এই বেটা, ঘোড়ার লাগাম ধর। মূত্র ত্যাগ করিব। তিনি ঝোপমধ্যে যোধপুরী ব্রিচেশের বোতাম খুলিয়া দণ্ডায়মান অবস্থায় মূত্রত্যাগে রত হন। কিন্তু কানে পৈতে জড়াতে ভোলেন না। ঝোপটি পুষ্পবতী সৌন্দর্যময় ছিল। উহা পৃথিবীতে প্রকৃতির চুম্বনের চিহ্ন। প্রকৃতি অপমানে জর্জরিত হইলেন দেখিয়া অশ্বের লাগাম ছাড়িয়া নিকটে গেলাম এবং মুখ ঘুরাইবার সঙ্গে সঙ্গে ………। কুকরি দ্বারা গর্দ্দানে কোপ মারিলে অশ্বটিও তুষ্ট হইল কারণ সে চিত্রার্পিত ছিল।” বলা চলে রত্নময়ীর জন্য ভেট। হরিনারায়ণের আত্মার শান্তি। জমিদার কর্মচারী গোবিন্দরামের সুপ্ত বাসনাপুরণার্থে বধ্য হিসেবে আগেই স্থিরিকৃত। হতে পারে তা মূলত রত্নময়ীর কারণেই, আবার এও ঠিক রাষ্ট্রকৃত ব্যবস্থার প্রতি অনীহাও এখানে সম্পৃক্ত, যেখানে অত্যাচারী শাসককে সমুচিত জবাব দেওয়ার চ্যালেঞ্জটাও রয়েছে।

৫) কাল্লুপাঠান দেওয়ান বারি চৌধুরীর দেহরক্ষী, সিতারার স্বামী। সিতারা এখন দুই সন্তানের জননী। কিছুটা শীর্ণ দীর্ণ। ‘পুরো জওয়ান’ শফির প্রতি কিছুটা উদাসীন। দেওয়ান বারি চৌধুরী চাকরি ছাড়ায় কাল্লু এখন পুলিশে চাকুরে কাল্লু সিপাহী। জমিদার হত্যার পর গোবিন্দরামের পরামর্শে শফির পলায়ন। স্থান আবার লালবাগ। সেখানে সিতারা আছে, কাল্লু পাঠান আছে। ‘সে বধ্য প্রাণী, যেহেতু সিতারাকে গৃহস্থলীর আসবাবে পরিণত করিয়াছে, এবং প্রেমহীনা করিয়াছে।’ সুতারাং সিতারার গৃহ। “সিতারা বৃক্ষের ভাষায় সম্মাননা করিল। কিন্তু কাল্লু আসিয়া অবাক হইয়া বলিল যে, শফিসাব ওরফে ছবিলালের নামে হুলিয়া জারি হইয়াছে। সতর্কতাহেতু রাত্রে কাল্লু পার্শ্বে শয়ন করিল। এবং নিঃশব্দে নিহত হইল…”। পালিয়ে বহরমপুরে রুগ্ন, বয়স্ক, পাকাচুল বড় বড়, পাঞ্জাবি লুঙ্গিতে বারিচাচার সামনে দাঁড়ালে উনি শফিকে চিনতে পারলেন না। শফি পরিচয় দিল। কাল্লু খাঁ-কে কোতলের কথা স্বীকার করল। “বারি চৌধুরী চমকে উঠে বললেন, কেন? সে কী দোষ করেছিল তোমার? বললাম, জানি না। তবে মনে হয়েছিল ওকে খুন করা দরকার।” এই দরকারটা কিসের? সিতারা? প্রাণহীনা, উন্মাদনাহীনা, তার প্রতি নির্বিকার ও প্রেমহীনা, এবং কাল্লুই প্রকারন্তরে এইজন্য দায়ী, তাই সাব্যস্ত করে? না, পুলিশে ধরিয়ে দেবার ভয় থেকে? ধরিয়ে দেওয়াকে অধিক গুরুত্ব দিলে সে রাত্রে পালাতে পারত সে। কিন্তু পালায়নি। ফলে তার প্রতি সিতারার উদাসীনতা ও সিতারার বর্তমান অবস্থার জন্য কাল্লু খানকেই দোষী সাব্যস্ত করাও এই খুনের পেছনের কারণ হতে পারে।

৬) উদ্দেশ্যহীন পালিয়ে বেড়ানো শফি মুখোমুখি কথা বলতে চায় রত্নময়ীর সঙ্গে। কৃষ্ণপুরের জমিদার বাড়িতে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়। সেখানে কাছের মানুষ গোবিন্দরাম চাকরি ছেড়েছেন, হাঁপানি রোগী, তিনি রত্নময়ীর সঙ্গে শফির আর দেখা করা ঠিক হবে না, এমন মত পোষণ করেন, কেননা সত্যিই সে বিকারগ্রস্তা। কিন্তু শফি নাছোড়। শেষে জমিদার বাড়ি মুন্সি আবদুর রহিমের মুখোমুখি। তিনি রত্নময়ীর সঙ্গে শফির ওরফে ছবিলালের দেখা করার উদ্দেশ্য জানতে চান রুক্ষস্বরে। চলে যেতে বলেন, দারোয়ান ডাকার ভয় দেখান। বলেন, “কেন— কী দরকার? – প্রশ্ন করবেন না, খবর দিন্‌। — কেন আগে বলো? – জানতে চাইবেন না। সবকিছু জানতে চাইলে মাথা খসে যায়। মুর্ধা ব্যপন্তৎ। মুন্সি আবদুর রহিম শ্বাসক্লিষ্ট স্বরে গর্জন করলেন, বলতে হবে, কেন এসেছ তুমি? কিসের জন্য? তারপর সত্যিই তাঁর মুণ্ডুটি খসে পড়ল ফোয়ারার বেদীর নিচে। শুকনো ঘাসে রক্ত উপচে পড়ল।” এক সেমিতীয় বৃদ্ধ দার্শনিক খুন হলেন। এই হত্যাশেষে বোঝা যাচ্ছে এখন সে তার মতের বিরোধী যে-কোনো মানুষকেই খুন করতে পারে। প্রায় বিশ্বজগতের বিরুদ্ধে দ্রোহী হয়ে উঠেছে সে।

৭) প্রথমে বধ্য বিবেচিত, পরে অবধ্য গণ্য এমন মাংসপুঞ্জ শিশু কন্যাটি আর কেউ নয়, ইকরাতন ওরফে করুণার একমাত্র মেয়ে। তারই পিতার ঔরসজাত সন্তান। দুটি উদ্ধৃতিতে বিষয়টি পরিস্কার করা যাক। এক) “সেদিন ফেরার পথে বিজয়পল্লীতে দেখলাম, মস্তানবাবা (আসলে ফরিদুজ্জামান, যা তখনও শফি জানত না) বুকে চিমটে ঠুকে ছ্যাতরানো গলায় গান করছে। ভিড় করে লোকেরা শুনছে। বাঁদিকে একটা চালাঘরের উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে আজিফা মাসি শিশুটির দেহে তেল হলুদ মাখাচ্ছে। স্বর্গভ্রষ্টা স্ত্রী লোকটি উঠোনের উনুনে পাতা ঠেলে জ্বাল দিতে দিতে মুখ ঘুরিয়ে শিশুটিকে দেখছে এবং তার মুখে কী এক হাসি। তখনই সিদ্ধান্ত করিলাম, শিশুটি বধযোগ্য। হত্যা কী? একটি উপাদানকে ভিন্ন উপাদানে পরিবর্তিত করা মাত্র।”
দুই) “মধ্যরাত্রে বেরিয়ে পড়লাম। ……… কিন্তু চালাঘরটির কাছে যেতেই আরও একটি জৈবিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম ক্রিয়াশীল হল। একটি অস্পষ্ট হুংকার, পায়ের শব্দ, অন্ধকারের কালো একটি জীব, ঝুনঝুন কোমল ধ্বনিপুঞ্জ, আবার হুংকার। ঘুরে দেখি মস্তানবাবা। ঝোপঝাড় ভেঙে নেমে গেলাম। ধানখেতে জলকাদা এবং সকল আদিম ব্যাপকতার আঠালো পিচ্ছিল স্তরগুলি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে পিছনে আবার হুংকার। তৎক্ষণাৎ জানিলাম, ক্ষুদ্র ওই মাংসপুঞ্জ আমার বধ্য নহে”। এই কৃতকর্মের গঞ্জনা ও বেদনা জেগেছিল কিছুদিন পর, যখন সে মাংসপুঞ্জকে বালিকা হিসেবে দেখেছিল। “একদা এই ক্ষুদ্র বর্ণাঢ্য মাংসপুঞ্জরূপী উপাদানকে ভিন্ন উপাদানে পরিণত করতে গিয়েছিলাম ভাবিয়া অনুশোচনা জাগিল। তোমার চক্ষু সেই প্রথম অশ্রুসিক্ত হয়, জীবনে একবার।”

Facebook Comments

Leave a Reply