কোথায় ভোট না কোথায় দেব না নাকি তিনের বিরুদ্ধে সাত? : উপল মুখোপাধ্যায়

fail

অনেক দিন ভোট দিই নি। নাম কাটা গিয়েছিল সে কারণে। সম্প্রতি নাগরিকত্বের নাড়ি টনটন করে উঠছে দেখে নতুন করে নাম নথিভুক্ত করালাম উচ্চ বর্ণের স্বভাব যোগাযোগ সূত্রে। মুখুজ্জে বাড়ুজ্জেদের যোগাযোগের অভাব হয় না। একটা ঝকঝকে ডিজিটাল কার্ড পেয়েছি আমাদের যৌবনে যাকে কিছুদিন শেষন কার্ড বলা চলত। শেষন কার্ড আর রেশন কার্ড। এখন এই কার্ড তো নাগরিকত্বের প্রমাণ। আইনে তাই আছে। আর ভোট এলে ভোট দিতে কাজে লাগে। যে হেতু জীবনের প্রায় চার দশক ভোট না দিয়েই বেশ চলে গিয়েছিল তাই এবারও যে তার ব্যত্যয় হবে এ সম্ভাবনা বড় কম ছিল। কিন্তু আগেই বলেছিলাম না নাগরিকত্বের নাড়ি টনটন করে উঠেছে তাই নতুন ভোটার কার্ডে নতুন করে ভোট দেওয়া কথা মনে হল। শুধু তাই নয় বেশ দরকারি বলে রোজই মনে হতে লাগল। বউ বলল, “তুমি যাই বল এবার ভোটটা আর হেরো পার্টিকে দেব না।” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” বউ বলল, “হ্যাঁ মানে।” আমি বললাম, “তুমিই তো শুরু করলে।” সে বলল, “এবার তৃণমূল।” আমি চুপ রইলাম। বউ বলল, “বিজেপি অসহ্য। দিদি দিদি।” ছেলেকে বললাম, “এবার বিজেপিকে আটকাতে হবে।” ছেলে বলল, “ও তুমি তৃণমূলকে ভোট দেবার কথা বলছ।” এ সব কথা একান্তই একান্তে বসে বসে লোকজন কয়েক মাস আগে থেকে কইছিল- বেশির ভাগ লোকজন তারা বলছিল “না বিজেপি” অর্থাৎ তৃণমূলের কথা। সেই সব লোকজন যারা সরাসরি রাজনীতির সিংয়ে সিং লাগিয়ে লড়াইয়ে থাকে না। এর বাইরে অবশ্যই তারা আছে যারা সিংয়ের লড়াইয়ের লড়াকু, তারা অনেকেই বিপরীত সিংয়ের গুঁতোয় ক্ষতবিক্ষত বা নয় কিন্তু তাদের পছন্দ বিজেপিই। তারাও সিপিএম আর ক্ষীণকায় কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে নষ্ট না করবার কথা কয়ে এসেছেন নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই। তাঁরা “না তৃণমূল দলের” অর্থাৎ বিজেপির। পশ্চিম বাংলায় এবার ভোটটা কী তবে এই দুই নায়ের নঞর্থক লড়াই? পুরোটাই নেগেটিভিটির চাষ? নেই রাজ্যে নায়ের গুঁতোগুঁতি ? এমন ভাবে দেখতে চাই না। চাইলে আকাঙ্ক্ষাকে, সমষ্টির প্রত্যাশাকে মনের রঙে রাঙাতে হবে যা একেবারেই না পছন্দ আমার। শুধু পছন্দের বা চয়েসের গণতান্ত্রিকতাকে মান্যতা দিলেও উৎকৃষ্ট নান্দনিক সৃষ্টি হয় তবে আলোচনা আপাতত সে নিয়ে হচ্ছে না মোটেই।
এত দিন ভোট দিই নি কেন? উত্তরটা খুব সোজা। আমার মত ও পথের কেউ পছন্দের ছিল না। থাকলে? দিতাম। জেতা হারা ব্যতিরেকেই দিতাম। না হয় হেরো দলকেই দিতাম। আদর্শের অনাদর হতে দিতাম না।
হয়ত বা দু হাজার চোদ্দ থেকে পরিস্থিতিটা অন্যতর হতে শুরু করল। সংঘ পরিবার নেহেরু নির্মিত রাষ্ট্রীয় মতাদর্শকে প্রতিস্থাপিত করল কেন্দ্রে বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদকে একটা সুযোগ দেওয়া শুরু হল। হিন্দু রাষ্ট্রের জোলাপ দিয়ে অনুন্নতির কোষ্ঠকাঠিন্য সাফ করার কথা ভাবল এক বড় অংশের মানুষ। একবার এ ফাঁদে পা দিলে যে এক্সক্লুসানের অর্গল মুক্তি ঘটে এটা খেয়ালেই এলো না। সব বাদ না দিলে সংখ্যাগুরুর মতবাদ স্থিত হতে পারে না এটা বুঝতেই পারা গেল না। লোহিয়াজির বর্গ ভিত্তিক সমতাবাদী ভাইচারা, পেরিয়ারের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধিতার অন্তর্বস্তু, নেতাজি বা শহীদ এ আজম ভগৎ সিংয়ের ইনকিলাবি আহ্বান সব একটা বড় অংশের মানুষকে যেন আর প্রভাবিত করছে না আর তাঁদের সবাইকে ছেনতাই করে হিন্দুত্বের ন্যারেটিভের অন্তর্গত করে নিতে এনডিএয়ের ট্রয়ের ঘোড়াকে ব্যবহার করে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলল হিন্দু রাষ্ট্রের অশ্বমেধের ঘোড়া। এক হিন্দুকুল তিলক যশস্বী রাষ্ট্রনায়ক মোদিজি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বপ্ন দেখালেন জগতসভায় বিশ্বগুরু ভারতের। একটার পর একটা রাজ্যে এনডিএ বা বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। কিন্তু এতকিছু ঝিংচ্যাকের পেছনে রয়েছে সেই সংখ্যাগুরুবাদের এক্সক্লুসানের নেকড়ের ল্যাজ যা ভেড়ার চামড়া দিয়ে আর কত দিন ঢাকা যাবে। তাই সব জিততে জিততে জেতার অভ্যাসে যে নাগরিকত্বের প্রশ্নটিও সে প্রশ্ন করে বসবে এতো অবধারিত ছিলই। আর বাস্তবে হলও তাই। প্রতিরোধের চর্চাও শুরু হল। শাহীনবাগ উঠে এলো রাষ্ট্রীয় প্রতীক হিসেবে। এলো অতিমারী। লকডাউন। পরিযায়ী শ্রমিকের পদযাত্রা। অতিমারীর সময়কালে বিজেপি আরএসএসয়ের বানিয়া রাষ্ট্রের নিষ্ঠুর উপেক্ষার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। যে ক্ষোভের প্রতীক হয়ে দশকের পর দশক জুড়ে নয়া উদার নীতির উপেক্ষা- অবহেলার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে শুরু হল নাছোড় কৃষক আন্দোলন। যে সব সমতাবাদী-সমাজবাদী বিপ্লবী আইকনেরা হিন্দু রাষ্ট্রের প্রোজেক্টে ছেনতাই হয়ে গিয়েছিলেন মনে হয়েছিল তারা সবাই যেন নতুন করে পুন:প্রতিষ্ঠিত হলেন। লোহিয়াজি- পেরিয়ার – নেতাজি -শহীদ এ আজম সবাই এসে মিললেন দিল্লীর সীমান্তে ধাবমান ট্রাক্টর মিছিলে আর গান্ধিজী কোথাও যেন বুলেটের ক্ষত থেকে ঝরে পড়া রক্তকে উপেক্ষা করে আবার শুরু করলেন।বাবাসাহেব আম্বেডকর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন -যাক তাঁর কল্পিত রিপাবলিকের স্বপ্নকে- সংবিধানকে রক্ষা করতে শুরু হয়েছে এজিটেশন। তিনটি কৃষক বিলের বিরুদ্ধে সাতরঙা রামধনু জোট। তিনের বিরুদ্ধে সাত। যার একহি নারা-“কর্পোরেট ভাগাও দেশ বাঁচাও”। আর প্রাসঙ্গিক নির্বাচনী রণকৌশল “নো ভোট টু বিজেপি”। বিহারের মাটিতে নির্বাচনী জঙ্গ এ শ্লোগানকে এগিয়ে নিয়ে গেল। বামপন্থীরা অদ্ভূতপূর্ব সাফল্য পেল। যার শ্লোগান ছিল “জয় ভীম লাল সেলাম”। জহর, জগদীশ মাহাতো ’মাস্টারসাব’, বিনোদ মিশ্র,পরশজির দল ‘মালে’ সামনে এলো লোহিয়াজির বর্তমান প্রতিনিধি আরজেডির হাতে হাত মিলিয়ে। ঐতিহাসিক বিরোধিতার ঐতিহ্য সংবিধান রক্ষার তাগিদে সমস্বরে শ্লোগান দিল ’নো ভোট টু বিজেপি’।
এ সবই ভাবছিলাম আমি যখন বউ ভোটটা আর হেরোকে না দিয়ে তৃণমূলকেই দিতে চেয়েছে। ও তো ওর মতো করে “নো ভোট টু বিজেপি” -র কথাই ভাবছে। এটা কি না-য়ের নঞর্থক শ্লোগান? না এক রামধনুর কথাই বলছে? তিন কৃষক বিলের বিরুদ্ধে সাতরঙা রামধনু জোট? আর আমি কি করব? আদর্শগত পছন্দের তালিকায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত নয় এমন বামপন্থী সিপিএমকে ভোট দেব বিজেপির বিরুদ্ধে? মন চায় না। আবার আদর্শের পরিসীমাকে প্রসারিত করতেও প্রবল ল্যাদ। কোথায় ভোট নাকি কোথায় দেব না এ সব ভাবতে ভাবতে করবেটের জঙ্গলে বেড়ানোর, বনবাংলোয় থাকার ব্যবস্থা করে ফেলে বন্ধু। ভোটের আগের দিনেই যাত্রা। বউ ভোট দেবে বলে রয়ে গেল তো আমার বয়েই গেল। দিল্লী থেকে রামনগর রওনা দিয়েছি। সেটা ভোটের দিন। ফোন এলো, “ভোটটা তৃণমূলকেই দিলাম। আমি আর মা।” রাজপথ জুড়ে একটা দিক দখল করে আন্দোলনকারী কৃষকদের সারি সারি ক্যাম্প। বড়সড় তোরণ। ওপরে লেখা- “কর্পোরেট ভাগাও দেশ বাঁচাও।” ভাবা ছাড়া কিই বা করা। ভাবা প্র্যাকটিস করছিলাম ’কোথায় ভোট না কোথায় দেব না’ নাকি তিন কৃষক বিলের বিরুদ্ধে সাতরঙা জোট ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে? তিনের বিরুদ্ধে সাত?

 

 

[লেখক – গল্পকার, প্রকাশিত বই চারটি। বাণিজ্যে সম্মানিক স্নাতক। পেশায় রাজ্য সরকারি কর্মী]

Facebook Comments

Leave a Reply