ক্লস্ট্রোফোবিয়া : দেবাদৃতা বসু

fail

প্রতিরাতে ঘুমনোর আগে একই রিচুয়াল। ছোটবেলায় নেহাতই ছোট ছিলাম, তাই নিয়ম করে বড়দের আগে শুয়ে পরতে হত। বিছানায় শুয়ে দেখতে পেতাম পাশের ঘরে বাবার সিগারেটের ধোঁওয়ার স্পাইরাল, পাঁচিলের বাইরে হলুদ আলোর বৃত্ত, শুনতে পেতাম রান্নাঘর থেকে আসা জল আর বাসনের শব্দ বিনিময়। ওই মুহূর্ত আলাদা হতে ইচ্ছা করত। পাশের ঘরে বাবা, রান্না ঘরে বাবার মা, পাঁচিলের ওপাশে অসংখ্য জেগে থাকা মানুষের থেকে আলাদা। মায়ের কাছে একটা গল্প শুনেছিলাম – রাস্তার ধারে পরে থাকা একটা দস্তানার ভেতর একটা ইঁদুর বাসা বানায়, তারপর জোটে এক ব্যাঙ, তারপর এক কাঠবিড়ালী, এভাবে বাড়তেই থাকে দস্তানার সংসার, যোগ হতে থাকে সদস্য । আমিও মাথার ওপর চাদর টেনে নিয়ে হয়ে উঠতাম ওদেরই একজন। চাদরের ফুটো দিয়ে আসা এক জালি জালি হলুদ আলোর মধ্যে দস্তানার সংসার। খাট, আলমারি, থালা, বাসন, ফুটবল, ডিউসবল, বোরোলিন, বার্নোল মিলিয়ে সে এক জমজমাট ব্যপার। এদিক থেকে কেউ সদ্য সেঁকে ঝুড়ি ভর্তি রুটি নিয়ে আসছে, তো অন্যদিন থেকে কেউ এক গামলা কাপড় কেচে নিয়ে যাচ্ছে শুকোতে। দুজনের মধ্যে প্রবল ধাক্কা। তারপর সব রুটি, সব কাপড় মাটিতে গড়াগড়ি । কেউ রাগ করছে না, অভিমান নয়, শুধু মাথা নিচু করে কুড়িয়ে নিচ্ছে। সে এক বিবাদহীন সংসার, যেখানে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের কেউ জোর করে চুল বেঁধে দেয়না, কেউ স্কুলে যেতে বলে না, কারোর মা নার্সিং হোমে যায় না, কারোর বাবার চাকরি চলে যায় না। যত বড় হয়েছি নিজের সাধ্য মত দস্তানা কে রিপ্লেস করতে থেকেছি। কখনও ক্যাপ্টেন হুকের জাহাজের খোল, কখনও বিউটি আন্ড দা বিস্টের প্রাসাদের বন্ধ লাইব্রেরী। একটা চুড়ান্ত কনফিডেন্স তৈরি হয়েছিল, আমার আর যাই ফোবিয়া থাকুক না কেন, ক্লস্ট্রোফোবিয়া আমার কিছুতেই নেই।
ডেপ্রান এল – আগের লকডাউনে রঞ্জিতা দি দিয়েছিল। প্রয়োজন ফুরতেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। এখন চার দেওয়ালের মধ্য যত ড্রয়ার, যত শাটার সব হাতড়াচ্ছি, যদি এক পিস পাওয়া যায়। আবার মনে করছি পনেরো দিনের জন্য ওষুধ ডিপেন্ডেন্ট হওয়া কোনও কাজের কথা নয়। তাছাড়া আমি তো প্রিভিলেজড । তিন বোতল স্যানিটাইজার, থার্মোমিটার, অক্সিমিটার, প্রিয় প্রাক্তনীর দেওয়া সাধের কফি মাগে সাজানো আমার টেবিল। দরজায় নক করলেই চা, কফি, জুস । বন্ধুরা অর্ডার দিয়ে বই পাঠায়, খাবার পাঠায়। এছাড়াও দুবেলা সুস্বাদু হোম ডেলিভারি থালি, বেশ সস্তা । সস্তাই তো । মানুষের জীবন। এতটাই যে আরও সেলফিস হতে শেখায়। ডিনায়াল শেখায়। নিজের ভালো থাকার জন্য ডিনায়ালে থাকতে থাকতে বাকি পৃথিবীর থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধুই কাছের মানুষ নিয়ে উৎকণ্ঠা। কাছের মানুষ- তাও তো নেহাত কম নয়। ক্লস্ট্রোফবিয়া নয়। এ এক অন্য ভয়। হারিয়ে ফেলার ভয়, হারিয়ে যাওয়ার ভয়। সঠিক সময় দরজায় নকটা শুনতে না পেলে, একটা দিদি ডাক শুনতে দেরি হলে, একটা প্রত্যাশিত মেসেজ দেখতে না পেলে । এই তো, প্রান্তিকা আবার কাশছে, ইন্দ্রাণী ১৯ মিনিটের ভয়েস মেসেজে কেবলই কেঁদেছে, দেবা দার ঘাড়ে ব্যথা, বাইরে বেড়ালটা দরজায় আঁচড়াচ্ছে, ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা বিল, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থা … আমার সারাদিন এত খিদে পায় কেন?
যতবার ঘুমনোর চেষ্টা করি বিড়ালটা দরজায় আঁচড়াতে থাকে। এখন আর দস্তানার নস্টালজিয়া কাজ করেনা। এদিকে দরজা খুলে বিড়ালটাকে তাড়া করতে গেলেই গর্তে পরে যাব। আওয়াজটা ইগনোর করি। একবার পরলেই অনেকটা গভীরে, যেখান থেকে বেরনোর দরজাটা ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা, অ্যালিসের কখনো ক্লস্ট্রোফবিয়া হয়নি? ওই একটা মাত্র ঘরের মধ্যে? সারা গা ঘামে ভিজে যায় আর আমি মরিয়া হয়ে ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ কাটা ছেঁড়া করতে থাকি বুলিয়ান অ্যালজেব্রার অ্যাপ্লিকেশানের খোঁজে। চাবি ওর মধ্যেই আছে। নিজের রুট খুঁজে পাওয়ার চাবি। সেই একবার, বহু প্ররোচনায় নিজের বাড়ি, উঠোন, লাল কালো মেঝে ফেলে যে এসেছিলাম, তারপর থেকে আর রুট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রুট খুঁজতে গেলেই চারপাশে নিয়ন আলো জ্বলে ওঠে, অচেনা সুরে ঝাঁকড়া চুলের মানুষ ডারবুকা বাজায়, দেওয়ালে দেওয়ালে শ্লোগান, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হেয়’। ব্যারিকেডের পর ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাস ছড়িয়েছে কারা। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটাই একমাত্র রাস্তা। লা রেসিস্তেনশিয়া! অথচ কোথায় আমার রক্ত গরম হয়ে উঠবে তাঁর বদলে অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসছে ক্রমশ। কেন এত ইন্সিকিউরিটি? আরে বাবা, আমি তো বুলিয়ান অ্যালজেব্রাটাই বুঝে উঠতে পারছি না। আমাকে কে এবার পথ খুঁজে দেবে? রুট না জানলে আমি নিজের রুট খুঁজে পাবো কি করে? পথ থাকলে তবে তো মানুষ থাকবে। কতদিন মানুষের মুখ দেখিনি। দরজার বাইরে এক সুজন চক্রবর্তীর হাসি মুখ। এখনও হাসছে? অসহ্য লাগছে আমার। আমি ঘেমে নেয়ে অস্থির আর এই লোকটা গোটা জীবন একটা ভুল সত্যের খোঁজে খরচ করে দিয়েও এভাবে হাসে কি করে কে জানে! ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসি ধরফর করে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি প্রমান সাইজ। আমি ঠিক গলে যেতে পারব। আশ্বস্ত হই। অথচ বারট্রান্ড রাসেলের হাসিমুখ সারাদিন ধরে আমাকে মকারি করতে থাকে।
আবার লকডাউন! আবার নাকি আম্ফানের মত ঝড় আসছে! গতবারের লকডাউনেও আমার খুব খিদে পেত। ইন্সিকিউরিটির সাথে খিদের কি যেন একটা সম্পর্ক আছে। এই বোধটুকু খুব অস্বস্থির। বার বার প্রশ্ন করে, “ওহে, তুমি কবে এই প্রিভিলেজড স্টেটাসটা অর্জন করলে? প্রতিদিন সকালে বাবা ঘুম থেকে উঠে, স্নান সেরে, পুজো আচ্চা করে, জামা-প্যান্ট-জুতো-মোজা পরে ধার করতে বেরত। যেদিন যেদিন ধার পেত, সেদিন দিনের মত চাল, ডাল, তেল নিয়ে ফিরত, দুপুরে ইলেক্ট্রিসিটি হুক করত আর রাতে মুড়ি জল। তবুও আমার খুব খিদে পায়। এমনকি আম্ফান রিলিফ দিতে গিয়েও পেয়েছিল। একে ভটভটি খারাপ হয়ে দু তিন ঘন্টা লেট, তারপর সুন্দরবনের কোন প্রত্যন্ত গ্রাম। না আছে জল, না আছে ছাউনি, শুধু ত্রান নিতে আসা মানুষের জটলা। যখন বুঝতে পারি কিছুতেই কুলিয়ে উঠতে পারব না, একে একে নৌকোতে ফেরত যাই আর আমাদের তাড়া করে হাড় মাস কালি হয়ে যাওয়া হাজার হাজার মায়েদের ভূতুড়ে হাত। চোখের সামনে এক মায়ের হাত অন্য মায়ের হাত থেকে অনায়াসে কেড়ে নেয় দুধের প্যাকেট। আমরা ভয় পাই এবং ফিরে এসে লাইন দিয়ে দাওয়ায় বসে গরম ভাত খাই। ফেরার পথে গাড়িতে বার বার চোখ লেগে আসছিল আর অনির্বাণ ভয় দেখিয়ে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করছিল। “বি জে পি এলে কি হবে দেবাদৃতা?” আমি বলছিলাম, এটাই একমাত্র ভয়ের কারন নয়। একটা সময় ছিল খিদে পেলে লজ্জায় কিছুতেই বলতে পারতাম না। এখন কত সহজে বলে ফেলি।
গত ৪৮ ঘন্টায় নতুন করে খিদে পায়নি আর। ঘুমোতে গেলেই এই এতটুকু একটা ঘর স্কুলের বিশাল চ্যাপেল হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় বার বার একটাই দুঃস্বপ্ন দেখতাম। আমার স্কুলের চ্যাপেলে একলা রাম্পেলস্লিটস্কিন নিজের নাম হারিয়ে ফেলার ভয় পালিয়ে বেড়াচ্ছে । সবাই জেনে গেলে নাম কি আর কারো নিজের থাকে? এত বড় হয়ে উঠছে ঘর যে সিলিং দেখতে গেলে ঘাড় এলিয়ে দিতে হয় পেছনে। অন্ধকারের মধ্যে সবাই নিজের মত নাম খুঁজতে ব্যস্ত। নিজের রুট হারিয়ে অন্য মানুষ হয়ে যাওয়ার ভয়, এতবড় হল ঘরে প্রিয়জনের থেকে দুরত্বের ভয়। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স যদি মেন্টাল হয়ে ওঠে ? খিদের ভয়, খিদে না পাওয়ার ভয়। বুলিয়ান অ্যালজেব্রা বুঝতে না পারার ভয়। এমনকি অনেক দিন পর স্ট্রেচিং করতে গিয়ে ডান হাতের আঙ্গুল বাঁ পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে ঠেকাতে না পারার এক আদিম ভয়।

Facebook Comments

Leave a Reply