পিশাচ : সেঁজুতি দত্ত

fail

রাত দশটার সময় খবর এল মালিনী এবং তার মেয়ে দু’জনকেই শেষ দেখা গিয়েছিলো বাড়ির পাশের পার্কে সন্ধ্যে ছ’টার সময়। তারপর আর কেউ তাদের দেখেছে বলে কিছু জানাতে পারল না। সাড়ে আটটার পর থেকেই বাড়ির লোকজন উসখুস করছিল। সাধারণত মালিনী পার্ক থেকে বেশি দেরী করে ফেরে না। সারাদিন অফিস করে সারে পাঁচটা নাগাদ বাড়ি ফিরে মেয়েকে পার্কে নিয়ে যাওয়াটা ওর রুটিনে ঢুকে গেছে ঠিকই কিন্তু চেষ্টা করে যাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসা যায়। দিনের ক্লান্তি মেটাবার তার একটাই পদ্ধতি, একটা লম্বা স্নান। চাইলে অফিস থেকে বাড়ি এসেই সে স্নান করতে পারে, মেয়েকে একা বা পাশের বাড়ির মেয়েদের সাথে পার্কে খেলতে যেতে দিতে পারে কিন্তু নিজে খুঁতখুঁতে বাতিকের জন্য মালিনী মেয়েকে একা ছাড়তে চায় না। পার্কটিও বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মিনিট পাঁচেকের হাটা পথ।
ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকা; বাচ্চা মেয়েটির খেলবার কোন সুযোগই হয় না প্রায়। অনেক দিন ধরেই তারা ভাবছে এই ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে গিয়ে উঠবে। আজকাল অনেক নতুন ধরনের কমিউনিটি কমপ্লেক্স হয়েছে। সেখানে ক্লাব, জিম, সুইমিং পুল থেকে শুরু করে ছেলেমেয়েদের খেলার জন্য পার্ক সবকিছু আছে। তাদের এর ফ্ল্যাটটি সেই দিক থেকে বেশ পুরনো ধরনের। একটা লম্বা ফ্ল্যাটবাড়ি এবং প্রত্যেক তলায় দুটো করে পরিবার থাকে। বেশ পুরনো বাড়ি বলে বেশিরভাগ পরিবারই বৃদ্ধ লোকেদের বাস। প্রায় সকলেরই ছেলেমেয়ে হয় বিদেশে চলে গেছে নাহলে পড়াশুনো করতে বাইরে থাকে। আর যে কয়জন পরিবার ছেলেমেয়ে নিয়ে আছে তারা সকলেই বেশ বড়, কলেজে পড়ে। মালিনীরা তাদের ফ্ল্যাটটি যে পরিবারের কাছ থেকে কিনেছিল তারা এখন তলপিতলপা গুটিয়ে পাকাপাকিভাবে দেরাদুনে ছেলের কাছে চলে গেছে। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই মালিনী আর স্বপ্নিলের যখন মেয়ে হল তখন তার সাথে খেলবার মত একজনও সমবয়সী কাউকে পাওয়া গেল না।
আজ প্রায় আড়াই বছর বয়স হবে মেয়েটির। বাবা মা যখন বাড়িতে থাকে না তখন স্বপ্না মাসি তার দেখাশোনা করে আর সেও একা একা নিজের মতো খেলনা, পুতুল এসব নিয়ে থাকে। এতসব কারণেই মালিনী প্রতিদিন নিয়ম করে মেয়েকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে যায়। শহরের একটা নামকরা কলেজের ক্যাশ সেকশনে সে চাকরি করে। সরকারি চাকরি তার ওপরে কলেজ তাই বেলা চারটের পর আর থাকতে হয় না। কিন্তু সব গুছিয়ে বাড়ি ফিরতে তার সাড়ে পাঁচটা বেজেই যায়। আজও ব্যতিক্রম হয়নি। বাড়ি ফিরেই স্বপ্নাকে ছুটি দিয়ে সে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছিল। স্বপ্নিল বাড়ি ফিরেছে প্রায় সাড়ে সাতটায়। বাড়ি এসে কাউকে না দেখে প্রথমে খুব একটা অবাক হয়নি, হবার কথাও ছিল না। এর আগেও কখনো এমন হয়েছে যে মালিনী মেয়েকে নিয়ে পার্ক থেকে পাশের পাড়ায় এক অফিস কলিগ প্রিয়ার বাড়ি গিয়েছে। প্রিয়ার সাত বছরের এক ছেলে আছে আর সে তাদের মেয়ে সাহানার সঙ্গে খেলতে খুব ভালোবাসে। তাই আজ বাড়ি সে যখন মালিনী এবং মেয়েকে দেখতে পেল না তখন স্বভাবতই খুব চিন্তা করার কথা মাথায় আসে নি। কিন্তু ধীরে ধীরে সময় যতই এগোয় কেমন একটা অস্বোয়াস্তিতে ভোগে স্বপ্নিল। প্রায় ন’টা নাগাদ প্রিয়ার বাড়িতে ফোন করে সে।
মালিনী খুব নিয়মের মানুষ। এক যদি না মেয়ে খুব জেদ করে থাকে সে পারতপক্ষে বিকেলের স্নান না সেরে কোথাও যায় না। আর গেলেও আটটার মধ্যে ফিরে আসবেই। তার সাধের স্নান এবং তারপর এক পেয়ালা চা না খেলে সে বাকি সন্ধ্যে আর কিছু করতে পারে না। তার ওপর আজ মঙ্গলবার কাল অফিস আছে, তাই বিশেষ অনিয়ম করার মেয়ে মালিনী নয়। প্রিয়ার বাড়িতে ফোন করেই প্রথম খটকা লাগে। মালিনী আর সাহানা আজ প্রিয়ার বাড়ি যায়নি। তবে? আচমকাই ফোন কেটে দেয় স্বপ্নিল। কোথায় গেছে হবে? খামখেয়ালী মেয়ে তো মালিনী নয়। তাহলে কি সাহানার কিছু হল? ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হল বা এমন কিছু? সে জানে মোবাইলে ফোন করে পাওয়া যাবে না। পার্কে যাবার সময় মালিনী নিজের ফোন চার্জে বসিয়ে যায় তাই ফোন বাড়িতেই থাকবে। তাও কিসের এক আসায় সে মালিনীর মোবাইলে ফোন করে। ফোন বেজে ওঠে। বেডরুমে খাটের পাশে ফোন চার্জে বসানো। এবার কী হবে?
পাশের ফ্ল্যাটে দাস বাবুরা থাকেন। তারা কি কিছু জানবেন? বেল দিয়ে খোঁজ নেয় স্বপ্নিল। না, তারা জানেন না। বিকেলে দু’জনকে বেরোতে দেখেছিল ব্যাস এইটুকু। কী করবে বুঝতে না পেরে খানিক অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কুড়ি মিনিট যেতে না যেতেই আর তর সয় না। দাস বাবু আর তার স্ত্রী এর মধ্যে দুবার খোঁজ নিয়ে গেছেন। প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ দাস বাবু বললেন, “একবার পার্কে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসব? হয়ত ওখানেই আছে”। উত্তরে তার স্ত্রী বললেন, “আরে, পাড়ার ছেলেরা পার্কে বসে নেশা করে বলে পার্ক তো নিয়ম করে আটটার সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওখানে পাবে না। কিন্তু গিয়ে দেখো কেউ ওদের দেখেছে কিনা। হয়ত আশেপাশেই আছে, কিছু কেনাকাটা করছে হয়ত। আর কিছু নাহয় পার্কের পাহারাদার তো বলতে পারবে যে সাহানার কিছু হয়েছে কিনা। সেটুকু জানলেও তো শান্তি। অন্তত বোঝা যাবে যে মালিনী মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে হবে। তুমি বরং যাও”। শুনে স্বপ্নিল বলল সেও যাবে। দাস বাবুর স্ত্রী বাধা দিয়ে বললেন “তুমি বেরিয়ো না এক্ষুনি। যদি ফোন করে। আমি আছি কিন্তু তুমি বাড়িতে থাকলে সুবিধে হবে। আমার ছেলে এই একটু আগে কলেজ থেকে ফিরল। কপাল দেখো, এমনি দিনে দেরী করে ফেরে কিন্তু আজই এত তাড়াতাড়ি ফিরেছে। ওকে পাঠাচ্ছি ওর বাবার সঙ্গে। তুমি বরং একটু চা খাও। চিন্তা করোনা ভাই। ওরা ঠিকই আছে। কত সময়ে কত কী হয়”।
দাস বাবুর স্ত্রী চলে যেতেই স্বপ্নিল হাতের ফোনটা শক্ত করে ধরে বসে রইল মালিনীর ফোনের আসায়। সময় যেন কাটতে চায় না। এর মধ্যে ভদ্রমহিলা এক পেয়ালা চা দিয়ে গেছেন আর সাথে কিছু বিস্কুট। খেতে ইচ্ছে হল না। থেকে থেকে মেয়ের কথা, স্ত্রীর কথা মনে হচ্ছে। সে কেন যেন নিশ্চিত যে সাহানা খেলতে খেলতে দোলনা থেকে পরে গিয়ে চোট পেয়েছে। আর তাতেই মালিনী ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। নিশ্চয়ই স্টিচ দিতে হয়েছে। খুব ব্যাথা পেয়েছে হবে মেয়েটা। ওর তো আবার এসব সময় বাবা ছাড়া চলেই না। মালিনী যে কী করে না! একটা ফোন করবে তো। নিজেরটা নিয়ে যায়নি ঠিক আছে, কিন্তু অন্য কোথাও থেকে তো একটা ফোন করতে পারত। এত কিছু ভেবে সে একটু রেগেই গেল মালিনীর ওপর। ওদিকে ঘড়ির কাটা বলছে দশটা বাজে। এখনও ফোন আসেনি। দাস বাবুর স্ত্রী বেশ কিছুক্ষণ ধরে এখানেই আছেন। ফ্ল্যাটের আরও কিছু লোকজন জড় হয়েছে ওদের বসবার ঘরে। সবাই ফিসফিস কথা বলে চলেছে। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বলার আছে। তিনতলার শকুন্তলা কাকিমা জোর দিয়ে যাচ্ছেন পুলিশে জানাবার জন্য। চার তলার মিস্টার বড়ুয়া বললেন ওর ভাইপো কোলকাতা পুলিশে চাকরি করে, স্বপ্নিল বললে কথা বলে দেখতে পারেন।
এর মধ্যেই দাস বাবু আর তার ছেলে ফিরলেন। সবাই কথা বলা থামিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। স্বপ্নিল জিজ্ঞেস করে ওঠার আগেই দাস বাবু বললেন, “সিকিউরিটির লোক তো বলল মালিনী মেয়েকে নিয়ে পাঁচটার সময় পার্কে এসেছিল কিন্তু তারপর কোথায় গেছে, কখন বেরিয়েছে কিছু জানে না। ওই সময়ের মধ্যে সাহানার কিছু হয়েছে বলেও তো কিছু বলতে পারল না। পার্কের পাশে যে ফুচকা ওয়ালা বসে সেও দেখেছে ওদের। অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে বলে তো কেউই বলল না। আমরা তো পার্কের গেট খুলিয়ে দেখে এলাম”। স্বপ্নিল যেন প্রায় ধরেই নিয়েছিল যে খেলতে খেলতে সাহানার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তাই দাস বাবুর কথাগুলো শুনে কতকটা খেই হারালো যেন।
“কী বলছেন দাস’দা? কিছুই হয়নি? ওরা আর বাকি পাঁচদিনের মতোই পার্ক গেছে? সাহানা ঠিক আছে? পার্কে পড়ে টরে যায়নি? কেউ কিছুই বলল না”?
“না তো ভাই। তাই তো শুনলাম। সাহানার বা মালিনীর কারোরই কিছু হয়েছে বলে তো কিছু শুনলাম না”।
এত চিন্তার মধ্যে স্বপ্নিলের মাথাতেই আসেনি যে মালিনীরও কিছু হয়ে থাকতে পারে। সত্যিই তো! মালিনী তো আর সাহানার মতো শিশু নয় যে পড়ে যাবে। তাই হয়ত ওর শরীর খারাপ লাগায় কাউকে কিছু না বলে মেয়েকে নিয়ে চুপচাপ ডাক্তারের কাছে গেছে। এটা তার এতক্ষণে মাথায় আসেনি কেন তা ভেবে যেন একটু লজ্জাই পেল স্বপ্নিল। এর মধ্যেই দাস বাবুর ছেলে বলে উঠল। “আমি পাড়ার যে দুটো ডাক্তারের চেম্বার আছে সেখানে খোঁজ নিয়ে এলাম কিন্তু। দুটো চেম্বারই খোলা। মালিনী কাকি ওখানে যায়নি। আমি নাম মিলিয়ে এসেছি”।
হঠাত যেন সবাই একসাথে কথা বলে উঠল। কেউ বলে পুলিশে খবর দাও তো কেউ বলে আত্মীয়ের বাড়ি ফোন করো। সবাই নিজের নিজের বুদ্ধি লাগিয়ে কী করা যায় ভাবছে। ওদিকে স্বপ্নিলের যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। দুটো জলজ্যান্ত মানুষ পার্ক থেকে বেরিয়ে হাওয়া? এও কী সম্ভব? পার্কে ঢুকতে লোকে দেখল কিন্তু তারপর কোথায় গেল কেউ জানে না? কোন চেনা লোক কিছু বলতে পারছে না? মুদির দোকান, ডাক্তারের চেম্বার, কাপড় ইস্তিরির দোকান কোত্থাও না? দাস বাবুরা ঠিকভাবে দেখেছেন তো? হয়ত কিছু জায়গা এখনো খোঁজা বাকি। স্বপ্নিল নিজে গেলে হয়ত আরেকটু ভালো করে খোঁজ করত। অফিস থেকে ফিরে তার এতটা সময় নষ্ট করা উচিৎ হয়নি। তক্ষুণি খুঁজতে গেলে হয়ত পেয়ে যেত। এখন সে কী করবে? আত্মীয় বলতে তো কাছাকাছি কেউ নেই যে মালিনী সেখানে যাবে। তাহলে?
এতকিছু ভাবছে আর বাকিদের কোন কথাই তার কানে ঢুকছে না। হঠাত শুনতে পেল দাস বাবুর ছেলে বলছে, “এখনই পুলিশে খবর দিয়ে কি লাভ আছে? পুলিশও বলবে আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে। বারো ঘণ্টা না পেরোলে পুলিশ সার্চ পার্টি বের করে না। তবে জানিয়ে রাখতে ক্ষতি নেই”। সবার মতেই ঠিক হল পুলিশ এক্ষুনি কিছু করুক বা না করুক রিপোর্ট এখন করতেই হবে। দেরী করলে চলবে না। স্বপ্নিলও জামা পড়ে তৈরি হয়ে নিল। এবারেও দাস বাবু আর তার ছেলে ওর সঙ্গে গেল। বাকিরা তখনও তাদের বসবার ঘরে জোট করে আছে। সকলের যেমন চিন্তা তারই সাথে কৌতূহল; সব মাঝবয়স্ক হুজুগে বাঙালি তাদের জীবনে এক সাসপেন্সের ছোঁয়া পেয়েছে। শুধুমাত্র দাস বাবুর স্ত্রী, হয়ত পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন বলে, রোজ মালিনী আর সাহানাকে দেখেন বলে, বাকিদের এই ভিড় পছন্দ করছিলেন না। তার স্বামী, ছেলে আর স্বপ্নিল বেরিয়ে যেতেই তিনি কপালে দুহাত তুলে দু’বার দুগগা নাম করলেন। আজ রাতে স্বপ্নিল তাদের ওখানেই খাবে।

আজ পার্কে আসা থেকেই মালিনীর কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কিছু একটা যেন ভালো লাগছিল না। কিন্তু মেয়ে এমন খেলায় মসগুল যে সময়ের আগে বাড়ি নিয়ে যেতেও মন চায় না। মেয়েটা বড্ড একা একা থাকে। বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে মেয়ে একা একা কথা বলে। সে জানে এ বয়সে এটা স্বাভাবিক কিন্তু মায়ের মন তো, মেয়ের এই বন্ধুর অভাবটাই যেন এতে বেশি করে চোখে পড়ে। সবাই বলেছিল প্লে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে কিন্তু মালিনী সেই দিক দিয়ে একটু পুরনোপন্থি। তিন বছরের আগে মেয়েকে স্কুলে দেবে না বলে ঠিক করেছে। যদিও আজ কাল তিন বছরে কেউ স্কুলে ভর্তি করে না কিন্তু তার কলেজের এক স্যারের স্ত্রী তার স্কুলে তিন বছরের সাহানাকে ভর্তি নেবে বলে জানিয়েছে। সব প্রায় ঠিক হয়েই আছে আর তাই যতটা সময় মেয়েকে নিজের কাছে, স্কুলের চাপ আর নিয়মের বাইরে রাখা যায় আর কী। একবার এই যাঁতাকলে ঢুকে পড়লে তো আর রক্ষে নেই। যতটা সময় পাওয়া যায় তত ভালো।
আজ পার্কে আসা থেকেই মালিনীর কেন জানি মেয়ের প্রতি আদরটা একটু বেড়ে গেল। মনে হল আজ বাড়ি গিয়ে মেয়েকে বেশ করে চটকে দেবে। তারপর স্নান সেরে মেয়ের পছন্দের কোন একটা খাবার বানাবে। স্বপ্না রাতের খাবার রান্না করে দিয়েই বেরোয় কিন্তু তাও আজ মেয়ের জন্য ও নিজে হাতে কিছু তৈরি করবে। এইটুকু মেয়ে হলে কী হবে তার খাবারের বাতিকে শেষ নেই। শাঁকসব্জি সে মুখে তোলে না। রোজ রাতে বকা খায়। জোর করে খাওয়ালে আবার মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। মালিনী রেগে গিয়ে গালে দুটো ঠুসো দিলে তবে সে চিবোবে। ছোট ছোট দাঁত দিয়ে খাবার চিবোবে আর বাবার কাছে মায়ের নামে নালিশ করবে। স্বপ্নিলও কিছু কম যায় না। মেয়ে বলতে পাগল। খেতে না চাইলেই বলবে “জোর কোরো না”। আর যথারীতি এটা শুনেই মালিনী রেগে গিয়ে বাপ মেয়ে দু’জনকেই বকবে। ওদের বাড়ির এটা রোজকার গল্প। কিন্তু আজ মালিনী সাহানাকে জোর করবে না। বরং উল্টে ওরই পছন্দের কিছু রান্না করবে। একদিন পৌষ্টিক কিছু না খেলে ক্ষতি নেই।
কী রান্না করবে ভাবছে আর সেই সময়ে তার চোখ পড়ল পার্কের এক কোণে বসে থাকা এক লোকের দিকে। ভদ্রলোককে কেন জানি ওর একটু চেনা চেনা লাগছিল কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিল না কোথায় দেখেছে। খানিক বাদেই মালিনী লক্ষ্য করল যে লোকটা যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। হাসছেন কি? না তার চোখের ভুল? হঠাত পার্কে এক অচেনা মহিলাকে দেখে ভদ্রলোক হাসবেন কেন? কিন্তু পরক্ষণেই মালিনীর মনে হল হয়ত ভদ্রলোক ওকে চেনেন। এই চেনা অচেনার ভাবনার মধ্যেই সে একবার আড়চোখে সাহানাকে দেখে নিল। মেয়ে খেলছে। অনেকক্ষণ সে দোলনার সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল চড়বে বলে। কিন্তু এ কী! এইতো কয়েক মিনিট আগেও এক লম্বা লাইন ছিল দোলনার সামনে। প্রায় চারটি বাচ্চার পেছনে ছিল সাহানা আর এখন প্রায় কেউ নেই। সাহানা একাই দোলনায় দুলছে। এত ছোট মেয়েকে সে কখনোই একা দোলনা চড়তে দেয় না। নিজে গিয়ে পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রায় সবসময়ই দোলনার কাছে ভিড় থাকায় সে মেয়েকে লাইনে রেখে নিজে পাশের একটি বেঞ্চে বসে থাকে। মেয়ের দোলনা চড়ার সময় হলে এগিয়ে গিয়ে দোল দেয়। কিন্তু আজ যেন সে একটু অবাক হল। এত দিন হল পার্কে আসছে এমন তো কখনো ঘটে না। সেই লোকটিকে দেখতে পাওয়ার প্রায় কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখ ফেরাতেই পার্কের বাকি সব বাচ্চারা যেন উধাও হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, উধাওই তো। দোলনার সামনে তো বটেই এমনকি পার্কেও যেন বাচ্চারা হঠাত করে কেমন কমে গিয়েছে। এত বড় পার্ক, এতগুলো বাচ্চা, বেরিয়ে যেতেও তো সময় লাগে। কেমন যেন খটকা লাগে মালিনীর। চোখ ঘুরিয়ে সেই লোকটার দিকে চাইতেই দেখে এর মধ্যেই লোকটি তার দিকে কিছুটা এগিয়ে একটি বেঞ্চে এসে বসেছে আর সেইরকমই তাকে দেখে হাসছে। হাসিটা মালিনীর ভালো লাগছে না। কেন জানি এই হাসিটা দেখে তার দুটো শব্দ মাথায় এলো।
বোবা পিশাচ!
কী ভয়ঙ্কর!
যেই ভাবা অমনি লোকটা মালিনীর দিকে তাকিয়ে দুটি দাঁত বার করল। লোকটার এই রূপ দেখে মালিনীর হাড় হিম হয়ে এল। মায়ের চোখ তক্ষুণি মেয়ের দিকে ফিরল। সাহানা এখনও দোল খাচ্ছে। হঠাত করেই যে সন্ধে নেমেছে সেটা সে বুঝতে পারছে। চারদিকে অন্ধকার। মুহুর্তের মধ্যে পার্কটি মানবশূন্য হয়ে পড়েছে। একটিও বাচ্চা বা তাদের বাবা মা কেউ নেই। এ কী করে সম্ভব? কেউ আলো জ্বালছে না কেন? মাথা ঘোরাতেই মালিনী দেখে যে লোকটি তার আরও কাছে ঠিক দুটি বেঞ্চের দূরত্বে বসে আছে। এত তাড়াতাড়ি সব ঘটছে যে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পৃথিবী, প্রকৃতি সব যেন পাল্টে যাচ্ছে। তার মনে হল আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। মেয়েকে নিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে হবে। লোকটার দিকে ফিরে চাইতে আর সাহস হল না। সে উঠে সাহানাকে নিতে যাবে, কিন্তু এ কী? তার হাত পা অবশ। শত চেষ্টা করেও সে উঠতে পারছে না। নড়তে পারছে না। সে বুঝতে পারছে যে লোকটি আরও এগিয়ে এসেছে। কী করবে, কাকে ডাকবে কিছুই ঠাউর করে উঠতে পারছে না মালিনী। একবার ভাবলো চিৎকার করে মেয়েকে বলবে এখান থেকে পালাতে। কিন্তু চেষ্টা করেই বুঝতে পারল সামান্য গোঙ্গানির শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোচ্ছে না গলা দিয়ে। ওদিকে সাহানা দোল খেয়েই যাচ্ছে।
হাতে পায়ে সার নেই, গলায় আওয়াজ নেই, এই অবস্থাতেই মালিনী প্রাণপণ চেষ্টা করছে একটু নড়বার, একটু কথা বলার। মেয়ে ছোট হলেও ও জানে একবার সাহানা পার্ক থেকে বেড়িয়ে গেলে ঠিক বাড়ি খুঁজে চলে যাবে, অথবা কেউ ওকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। আশেপাশের সব স্থায়ী লোকজন ওদের চেনে। সাহানা একবার বাড়ি যেতে পারলে নিশ্চয়ই স্বপ্নিল ওকে খুঁজতে চলে আসবে। এত ছোট হলেও সাহানা নিশ্চয়ই পারবে বাবাকে সব খুলে বলতে। কিন্তু মালিনীর শরীরের অচল ভাব যেন আরও বেড়ে গেল। সে খুব ভালো করে এখন বুঝতে পারছে যে লোকটা এবারে তারই বেঞ্চিতে, তার পাশে এসে বসেছে। মৃদু মৃদু লোকটার নিঃশ্বাস মালিনীর ঘাড়ে এসে পড়ছে। নিঃশ্বাস বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা। মনে হচ্ছে অসংখ্য ছোটছোট বরফের কুচি ওর ঘাড়ে এসে জমেছে। মালিনীর নিঃশ্বাস এবার দ্রুত হতে শুরু করেছে, গলা শুকিয়ে আসছে। একবার মনে হল ভয়ে প্রস্রাবের বেগ আসছে হয়ত। তার কপালের ওপরের দু-তিনটে চুল চোখের চোখের ওপর এসে পড়েছে কিন্তু সে হাত নাড়িয়ে সেগুলো সরাতে পারছে না। এই ভীত এবং অবশ অবস্থায় হঠাতই মালিনীর মনে পড়ল এই লোকটাকে সে কোথায় দেখেছে। এ তার খুবই চেনা এক মুখ। মাঝে মাঝেই স্বপ্নে সে তাকে দেখতে পায়। কখনো লোকটি একটি পায়রা হয়ে, কখনো ব্যাঙ বা কখনো গরু হয়ে তাকে ভয় দেখায়। আর এই প্রতিটি স্বপ্নেই মালিনীকে বোবায় ধরে। একবার তো সে লোকটিকে দেখেছিল এক জোড়া স্থির পাথরের চোখ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাড় হিম হয়ে আসে মালিনীর।
এই বোবায় ধরাটা এক অদ্ভুত ব্যাপার। খানিকক্ষণ স্বপ্ন দেখা তারপর এক আধা সচেতন ভাব কিন্তু ঘুম ভাঙে না। মনে হয় এক গভীর অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে। হাপ ধরে, শ্বাস নেবার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। এ অবস্থায় সে বুঝতে পারে যে তার পৃথিবী সচেতন এবং অবচেতনের মাঝখানে আটকে আছে। গোঙানির মাধ্যমে সচেতন জগতে ফেরত আসার চেষ্টা কিন্তু একা একা এবং নিজে থেকে সেটা করা প্রায় অসম্ভব। যতক্ষণ না কেউ তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গাচ্ছে ততক্ষণ এর থেকে মুক্তি নেই। মালিনীর খুব চেনা এই অভিজ্ঞতা। বিয়ের পর স্বপ্নিল যখন দেখেছিল যে তার বউয়ের বোবায় ধরার ধাত আছে তাতে প্রথমটা সে বেশ চমকে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরে এটা নিয়ে সে মালিনীর পেছনে লেগেছে অনেকবার।
এতক্ষণে মালিনী বোঝে তার সাথে কী হচ্ছে। তাকে বোবায় ধরেছে। ওদিকে সাহানা মনের আনন্দে দোল খাচ্ছে। আর লোকটা এবার ধীরে ধীরে মালিনীর সারা শরীর ঠাণ্ডা বরফের মতো শীতল করে দিয়ে এবারে তার মেয়ের দিকে এগোচ্ছে। মালিনী কিছুই করতে পারছে না। তার গলা দিয়ে অদ্ভুত এক গোঙানির আওয়াজ শুধু। সাহানা কেন তাকে শুনতে পাচ্ছে না? মালিনী বোঝে না। একটা সময় সে হাল ছেড়ে দেয় আর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। লোকটা এবারে ঠিক সাহানার দোলনার সামনে হাটু মুড়ে বসে আছে আর মুগ্ধ নয়নে ওর দিকে চেয়ে আছে। মালিনী আবার চেষ্টা করে উঠে যাবার। দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে ওখান থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা এবারেও বৃথা। বোবা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। এক অন্ধকার পার্কে একটা বেঞ্চে একা মালিনী, নিথর হয়ে বসে দেখছে তার চিরজীবনের ভীতি সেই লোকটি অত্যন্ত স্নেহের সাথে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আর সাহানা, তার আদরের মেয়ে একা একা দোল খাচ্ছে আর থেকে থেকে হেসে উঠছে। একবার যেন মালিনীর মনে হল যে তার মেয়ে হয়ত বোবার সাথে কথাও বলছে কিন্তু তার আর কিছুই করার নেই। বোবার হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে সে সারা শরীর এলিয়ে দিয়েছে বেঞ্চের ওপর। সজাগ অবস্থায় তাকে বোবায় ধরেছে, তার আর মুক্তি নেই।

ওদিকে পুলিশের কাছে গিয়েও কোন লাভ হল না। ইনসপেক্টর বললেন বারো ঘণ্টা না গেলে সার্চ পার্টি বের করা যাবে না। দাস বাবু আর তার ছেলের সাথে বাড়ি ফিরে এসেছিল স্বপ্নিল। সারারাত না ঘুমিয়ে আবলতাবল ভাবতে লাগল। কাকে জানাবে, কাকে ফোন করবে কিছুই আর বুঝতে পারছে না। দুটো মানুষ পার্কে গেল সবাই দেখেছে কিন্তু তার পর আর কেউ কিছুই জানে না? এও কি সম্ভব?
পরের দিন সকালে কী মনে হওয়ায় স্বপ্নিল নিজে আবার একবার পার্কে গেল। যথারীতি পার্কের গেটে তালা। সে গার্ডকে ডেকে আবার জিজ্ঞাসা করল মালিনী আর সাহানার কথা, গার্ড বলল, “কাল তো আপনাদের ফ্ল্যাটের দাস বাবু এসেছিলেন। ম্যাডাম এখনও বাড়ি ফেরেননি? আমি তো ওনাকে আর বাচ্চাকে দেখেছি পার্কে কিন্তু বেরোতে দেখিনি। তবে পার্কে যে রাতে কেউ থেকে যায়নি আমি জানি। দাস বাবু তো আমাকে দিয়ে গেট খোলালেন। আমরা সব খুঁজেছি। পার্কে কেউ ছিল না”। গার্ডের সব কথা শুনেও স্বপ্নিল বলল “আবার একটু খুলবে গেট? আরেকবার দেখতাম। রাতের অন্ধকারে তো নাও চোখে পড়তে পারে, তাই না?” গার্ড বলল, “সেটা অসম্ভব দাদা। রাতে অন্ধকার হলেও পার্কে তো আলো থাকে। কেউ থাকলে ঠিক দেখতে পেতাম। তবে আপনি যখন বলছেন তখন আবার দেখতে দোষ কী? চলুন”। এই বলে গার্ড পার্কের গেট খুলল।
বেশ বড় পার্ক। এদিক থেকে ওদিক প্রায় দেখা যায় না। কিন্তু স্বপ্নিল কী যেন বুঝে এক ছুটে যে দিকে ছোটোদের দোলনা থাকে সেই দিকটার দিকে এগোল। ছোটোদের খেলার জায়গাটা একটু ভেতরে। স্বপ্নিলেড় পৌঁছতে মিনিট দুয়েক লাগল। গার্ড তার পেছন পেছনই আসছিল আর তাতেই আচমকা চিৎকার করে উঠল। “একি! এ দেখি ম্যাডাম আর ছোটবাবু। কাল রাতেও তো আমরা এখানে দেখে গেলাম। কেউ তো ছিল না। দাস বাবুও ছিলেন, ওনার ছেলেও ছিল, জিজ্ঞাসা করে নেবেন। এখানটায় তো আলোও থাকে। বিশ্বাস করুন কেউ ছিল না”। স্বপ্নিল জানে গার্ড ঠিক বলছে। পার্কের এই দিকটা রাস্তার যে দিকে পড়ে কাল পুলিশফাঁড়ি থেকে ফেরার সময় স্বপ্নিলও সেই রাস্তা পেরিয়েছে। গ্রিলের ফাঁকে পরিষ্কার দেখেছে কেউ নেই। কিন্তু এখন দেখছে মালিনীর দেহ মাটিতে লুটিয়ে আছে আর সাহানা তার থেকে খানিক দুরে দোলনার নিচে ঘুমিয়ে আছে। দু’জনেরই শ্বাস চলছে কিন্তু সাহানার শরীর গরম, তাপে পুড়ে যাচ্ছে।
কোন মতে তাদের বাড়ি নিয়ে এসেছিল সেদিন স্বপ্নিল। প্রায় সপ্তাহ দুয়েক লাগল সাহানার জ্বর সারতে। মালিনীও ঠিক হয়ে উঠল প্রায় মাস খানেকের মধ্যেই। কিন্তু কোন ডাক্তারই বুঝতে পারলেন না ঠিক কী জ্বরে মালিনী তার বাকশক্তি হারিয়েছে। সেই ঘটনার আজ প্রায় তিন মাস। পাড়াশুদ্ধ লোক বেবাক। কী হল, কিভাবে হল কেউ বুঝতে পারছে না। কিন্তু কিছু অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ বলছেন এসব পিশাচের কারসাজি। স্বপ্নিল জানে না সে কী বিশ্বাস করবে, সে শুধু জানে মালিনী এখন বোবা।

Facebook Comments

Leave a Reply