অপ্রকাশিত কবি

[বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, বহু প্রতিভাশালী কবিই অপ্রকাশিত অপ্রচারিত থাকেন – কখনও বা তাঁদের ভাষা আঙ্গিক শৈলীর বিশেষত্বের কারণে, কখনও জনসংযোগ করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক ব’লে, আবার কখনও হয়ত কেবলমাত্র তাঁর ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিবেশের কারণে। এমন কত কারণই ঘুরে বেড়ায়। একজন প্রকৃত কবির কাজ লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশের আড়ালে।

“অপ্রকাশিত কবি” – অপরজন পত্রিকার একটি প্রয়াস, এমন কবিদের কাজকে সামনে আনার, যাঁরা ব্যপকভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত নন। যাঁদের লেখা হয় এর আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি, অথবা কেবলমাত্র দু’ একটি পত্রিকাতেই প্রকাশ পেয়েছে। অথচ যাঁরা লেখার মাধ্যমে আমাদের দেখাতে পারেন ভবিষ্যত বাংলা কবিতার বাঁক।

বিভাগ সম্পাদনা করছেন, রাহেবুল।]

আসরাফুল

জন্ম: ২৩ শে জুন, ১৯৯৬

জন্মস্থান: আলিপুরদুয়ার জেলার ফালাকাটা ব্লকের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম দেওগাঁও-এ।

কবিতা লেখার উদ্দেশ্য-বিধেয়: উনুনে ফুটত একমুঠো বোল্ডার চাল, দু’টো আলু। দেওয়ানির জমিতে বেগার খাটা আব্বা সবেমাত্র দ্যাশের বিয়ার-বুলে ঘাম ঝড়িয়ে বাড়ির দাওয়ায়। ভাত দাও, তখনও দু-একটু চাল ঠিকঠাক ফুটেনি। ধুলো উড়িয়ে গরু ও বাউদিয়া রাখাল বাড়ি ফিরল। চটের বস্তায় উবু হয়ে বেসুরো কবিতা পাঠ করলেও (আব্বা-মাবোকে শোনাতাম) লিখব তা কখনো ভাবিনি। এখনও প্রস্তুত নই। এমনকি অবচেতনেও ঈশ্বর বা কবি হওয়ার সাহস দেখাইনি। মাতাল অসুখে কেবল অশিল্পিত শব্দ বিমুখতার সিঁড়িতে সাময়িক পিপাসা মিটিয়েছি। আর মননের গোপনীয়তার বুনন ছিঁড়ে হয়তো প্রেম-ভালোবাসা, প্রণয়-বিচ্ছেদ, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, যানজট কিংবা একলা, মেঘ-মাটি-পাহাড়-সমুদ্র ইত্যাদি ইত্যাদির সাথে সখ্যতা। নয়তো পিণ্ডদান।

প্রথম প্রকাশ: ইবলিশ

সাধেও কেউ কেউ কবিতা লেখেন। আসরাফুল তা লেখে না। ওর ব্যক্তিগত জীবন-যাপন ওকে বাধ্যই করে মনেহয় লিখতে। সেই হিসাবে আবেগের জায়গায় ও ভীষণই সৎ। লেখায় ছড়ানো-ছেটানো প্রেমের পদচিহ্ন, মা-বাপ, বান্ধবজন। আর সমাজ-রাজনীতির সঙ্গে ওর সম্পর্ক-সংঘাত। পড়া যাক ওকে।

আসরাফুলের কবিতা

বেলা বয়ে যায়

নেই বস্তুর সাথে খেলতে খেলতে
কোনোকিছু না পাওয়াটা আনন্দ
মাথাটা আজ বড্ড মোটা
অগ্নিদগ্ধ দেহটায় ছাই কুড়োবার সময়
পাপের বোঝা টানতে
শ্বাসরুদ্ধ!
মুক্তি টানে শেষ কুয়াশায়
অস্তাচল চূড়ায় দাঁড়িয়ে
শেষটা দেখছি
থামাবার ইচ্ছা নেই…

ভান; না না

দ্যাখো; দূর থেকে দ্যাখো
অফুরান শূন্যতার ঢেউ
নির্লজ্জ ঠোঁটের আদল
বন্ধ খামের অনিশ্চিত বার্তা
কিছুই যেন তার করার নেই
মানচিত্রের অচিহ্নিত পথে পথে
কত দিনদুপুর, অজানা বিকেল কাটিয়েছি
“পিপাসায় কন্ঠজুড়ে অন্ধত্বের ভান”
শতাব্দী শেষেও সন্ধ্যা নামে
এখানে ওখানে— আত্মহত্যার অধিকারে

বন্ধ খামটি খুলতে আজ বড্ড ইচ্ছে করছে…

প্রস্তাব

ওই মেয়ে,
আসবি? আয়, আসবি
জীবন ব্যাকরণে
সম্ভাব্য পঞ্চবার্ষিকী-এ
সংসদ ভিত্তিক যা চাইবি
গিরগিটি ফেরিওয়ালার
—খাদ্য
—বস্ত্র
—বাসস্থান
—-শিক্ষা
—স্বাস্থ্য
—কাজ
ভ্যাবাচ্যাকা প্রস্তাবনায়
নিষিদ্ধ ধারাপাত মিস করবিনে
নথিভুক্ত হোক উপায়হীন ইতর শব্দার্থ/শব্দাবলী
ও গাঙ্গেয়
প্রায়শ্চিত্ত রাখব…
এঁটো চুমুক চা কাপ, অচ্ছুত স্পর্শ।

হ্যালো চেক

তুমিই,
গ্রামোফোনের লাজুক আলাপচারিতা
আর জটায়ু সন্ন্যাসীর অদৃশ্য সহজিয়া
নাকি কিউবিজমে কতটা ডুবলে?
অগ্রাহ্য প্রেমের ভাঁজগুলো লেপবন্দী
অতএব শব্দগুলো
আঙুলের ফাঁকে আঁচিলে নিরুদ্দেশ
স্বৈরিণী সন্ধ্যা আর সংযত বিপরীত চায়ের অচ্ছুত চুমুক
এছাড়াও
ক্রাসের ঘন আবদার, চেনা পারফিউম
গুজে রাখা ছন্দসুখ
আবোলতাবোল ঘেরাটোপে
হয়তো
এভাবেও খুলে রোদ্দুর বোতাম…

নালিশ

প্রিয় নারী,
“বয়েলিং ফ্রগ সিন্ড্রোম” মেটাফোরটি অপ্রযোজ্য শীতঘুমে
শুনেছি প্রেমে ও যুদ্ধে সব নীতিই জায়েজ;
আজের পর পরশু ভুলে গেছি, কলমতুলি ট্রেনপট্রির ফিলিংসে…

শুনেছি
লোক চক্ষুর খ্যাপা ভয়ে
ভালোবাসা সিঁকিয়ায় আলগা বেঁধেছো
প্রেমিকের ভয়ে…
—উনুনে বেল,
—হাঁড়িতে শিঙ্গি
—-দেওয়ালে ভূতের লাশ
—বিছানায় অসহ্য সুঁচ
আর সদর দরজায় কালো কুচকুচে দারোয়ান
না না, আর পারি না; অসুখ তো যুক্ত-ঠোঁটের আদর চায়।

প্রিয়

প্রিয় নারী,
তিক্ততা কি আতিথেয়তায় ভরা যায়? আর সময়ের নীরবতা বিদায়ে; শুধু সন্দেশটা খেয়েছিলাম বুঝলে, কমরেড সেদিন জিন্দাবাদ বলেননি, ফটোফ্রেমটি সাক্ষী।

তোকে সর্ষে খেতে লুকিয়ে রেখে জিও জিও বলা মাদকের নেশা ছাড়া ঘুমিয়ে পড়ার মতন।

রাতের নিঃশব্দ গর্জন, সঙ্গে গাড়ির গতিতে উষ্ণ ফিসফিস; পড়তি নাগোরদোলার দমবন্ধ হাঁসফাঁস, পিছু ফেরার সাহস নেই।

আজ গল্প চলুক ফোনে ফোনে নগ্ন ঠিকানায়। আয় খুঁজি প্রেম ত্রি-মোড়ে মোড়ে। জানালা ছুঁয়ে যায় একফালি রোদ ওপারে। তবে তাই হোক ড্রাগনের চোখ—বুকের তিলে।

“চুমু থেকে ঘুমু সবই মনে মনে।”

যদি জানতে

যদি জানতে, ঠোঁটে চাপা সিফিলিস
একলা যাচ্ছো; যানজট শহর জুড়ে
দাঁড়িয়ে থাকছি। পেরোনোর কিছু নেই।
প্রেমিক হলাম কই? শহরের ভেজা শরীরে
এঁটো ঠিকরা গণ্ডোলায় আজও
ডেটলাইন বাকচাতুরী
অল্প বৃষ্টি; তবুও ফোন আসে না।
ভালোবাসা-প্রেম-কদমের গন্ধ ভরা বিকেল
আমি বলিনি, তুমি বুঝতে পেরেও বোঝোনি
ঘৃণা-অযত্ন জ্বর মাত্র কয়েকদিন
সানাই-সারিন্দা শহর জুড়ে হইচই
রেশমি চুড়ি, লাল পাড় শাড়ি
ছন্নছাড়া কবির বেদনার্ত পাণ্ডুলিপি, মেহেন্দি ঘিরে জয়নুল
অনামিকা সাজিয়েছো কর্পোরেট অহংকারে
নিকাহ! স্তব্ধতা।
আর কী পাওয়ার আছে? একটু একলা।
রক্ত! খুন আমাদের আঙুল।
ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে, একফোঁটা জল।
বিন্দু বিন্দু বিষ জমে বুকের ভিতরে। ভাঙন।

ঘেউ ঘেউ

ঘেউ ঘেউ; পাড়া তবুও ঘুমিয়ে, মাবোর দরজাটায় খিল ছিল না।
অগণিত জোনাকির ফাঁকে বেজে গেল ১২ টা।
ফুটপাতের আলে, চোখ শুধু ৪২০ নং ওয়ার্ডে।
ঘুম নয়, এই তো মওকা গুল্মের ডালে।
ত্রিমাত্রিক সীমানায়, দুঃসাহসিক ইচ্ছেরা প্রতিশ্রুতির ক্ষুধার্ত মালা জপে।
কে ওখানে? (উচ্চৈঃস্বরে)।
সঙ্গে পোষা কুত্তাটার ঘেউ ঘেউ।
কোণঠাসা বস্তির হিম্মতরা; আর কী ছাড়ে!
প্রেমিক নয়, লম্পট ছোকরা
আর শালা উধুম কেলানি (ঘুসি, কিল…)।
ক্ষেত্রফল ছড়িয়ে নাজায়েজ রক্ত

একটু পরেই
রুম নাম্বার ৭৮৬, গেণ্ডা তু-ই-ই
আধখোলা চুলে, ব্রা-হীন নাইটি পেঁচিয়ে
যা এতক্ষণ কোনো লুঙ্গির সংস্পর্শে ছিল।
এভাবেও দাঁড়িয়ে থাকা যায়!
প্রায় দিনের মতো মাবোকে আজও রাতে ডাকা হয়নি।

পরদিন …
ছেঁড়া কম্বল, ধুমধুমার আওয়াজ, পায়ে বেড়ি
শরীরের কিছু প্রেমাক্ষত…

টিং-টিং-টিং বেল…
দু’টি রুটি, একটু ডাল, হাফ বাটি ঘোলা জল
কয়েদি নাম্বার ১০০১।

ফিরব-ই

তোমার ওখানে বর্ষা এল?
আমার শহর জল থইথই।

ধানের আলিতে শিশিরস্নাত ব্যাং ফড়িং
আমার আমি। নিশ্চিত দুপুরে-অঘোরে তোমায় এঁকে যাওয়া, চল ফিরে যাই গোধূলির ওপারে।
পেনসিভ জ্বর— হারিয়ে যাওয়া ঘরে। “তোরে শুধু আমার আমার লাগে”( সারাক্ষণ)।

স্বপ্নের বাজারে বিকিয়ে দেওয়া রোদ/গুলদস্তা। অভিমানী চুড়ি। বলছি বেলা থাকতেই ফিরব। ইয়া! বিপর্যয়! বোকা লাশ!

সিলিং কিংবা কিলিং

সারাংশে; মনের অ্যানাবেটিক
অজুহাত খোঁজ মন
নেইল পলিস, নিকোটিন সহমত ঘামে
মুখবন্ধ প্রচ্ছদ দূরত্বে
গোল্লাছুটের বউ
প্রশ্ন মিছিলে…

Facebook Comments

Posted in: June 2021 - Serial, POETRY

Tagged as:

Leave a Reply